শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২৯]

0
489

পর্ব ২৯

ব্যস্ত কোলাহলে বীভৎস নগরীর যাতনা যেন আজ আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। অসহ্য লাগে মনস্বিতার সব। তার ইচ্ছে মতোই চকবর্তীর বাড়ির পথে না গিয়ে গাড়িটা ঘুরে যায় শহরের বাইরের দিকে কোথাও। যাক, কোলাহল জানযট এসব ছেড়ে বোধ করি শহরতলীর দিকে চক্রবর্তীর গাড়ি। বুঝতে চেষ্টা করে মনস্বিতা। ধীরে ধীরে কোলাহল কমে আসতে থাকে। চারপাশে সবুজ বন আর গাছগাছালির ছায়া ছায়া মায়ায় ভরা যেন পথ। এমন সুন্দর শান্ত সবুজ এত কাছে কোথাও আছে এ তো জানতোই না মনস্বিতা। লোক-চলাচল কম এখানে। বেশ নীরব সময়। সূর্য ডুবতে চলেছে দিন শেষ করে। লালচে কুসুমের মতো নরম আলো ছড়িয়ে সারা আকাশ জুড়ে তার বিদায়ের কোমলতা বিছিয়েছে। সন্তানের বিয়োগের পর এই কটা দিন এমনি নিবিড় হয়ে আসতে থাকা সন্ধ্যায় মনস্বিতা একাই, পার করেছে দুঃসহ বেদনায় দিন-রাতের সন্ধিক্ষণ। সময়টা এমন যে দুঃখকে আরও ভারি করে তোলে। যাতনাকে করে প্রবল আর শরীরকে করে তোলে অসাড়। ছোটবেলায় মা বলতেন সন্ধ্যাবেলায় ঘরে আলো না জ্বাললে অমঙ্গল হয়। এই শুনে শুনে একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সন্ধ্যা হলেই সব ঘরে আলো জ্বেলে দেয়া। কিন্তু সে কি জানতো না, এত আলো জ্বেলেও ঘোর অমঙ্গলের সাথেই এতকালের বসবাস! না, জানতো না। আজও জানে না অন্য আরও কিছু। কেবল সন্তান বিয়োগের ব্যথাই তার কাছে আজ একমাত্র অমঙ্গল বলে মনে হয়। এই ঘোর অমঙ্গলের পর থেকে মনস্বিতা আলো জ্বালেনি ঘরে আর কোনো সন্ধ্যায়। বরং দিনের হালকা আলো ক্রমে নিষ্প্রভ হয়ে এলে, অন্ধকার ক্রমে গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলে, প্রগাঢ় অন্ধকারে ডুবে যেতে যেতে শুনতে চেয়েছে কান পেতে তার সন্তানের কায়াহীন আত্মার গাঢ় সংলাপ। সকল নিভে গিয়ে যখন নীরব নিথর চারপাশ, পৃথিবীর সব কোলাহল অপসৃয়মান, যাপনের যাবতীয় বস্তু আর কর্মপ্রক্রিয়া থেকে দূরে বহু দূরে দাঁড়িয়ে, এক আলোহীন অন্ধকারে কেমন অনুভূত হয় জীবন! সেখানে কী জীবিত আর মৃতের কোনো সংযোগ রেখা খুঁজে পাওয়া সম্ভব? কোথাও কী গোপনে রয়েছে মায়ের সাথে সন্তানের নহন্য আত্মার সংলাপের কোনো সূক্ষ্ণ ছিদ্রপথ! কোলে নিয়েছিল ঠিকই। অথচ নেই প্রাণ। মায়ের কোলে সন্তানের অস্ফুট দোলাচল, বিকট চিৎকারে পৃথিবীকে জানান দেয়া, আত্মজের শরীরে নিজের আত্মার ঘ্রাণ কিছুই পাওয়া হয়নি যে! অদ্ভুত এক প্রবল তৃষা এই প্রথমবারের মতো অনুভব করতে থাকে মনস্বিতা। স্বপ্নহীন একজন মানুষ ধীরে ধীরে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। একটি নরম শরীরের ছোঁয়া পেতে অপেক্ষমান নিশ্চিত মাতৃহৃদয় হঠাৎ হারালো সব। আর তাতেই সতৃষ্ণ হয়ে উঠছে মন ধীরে ধীরে। মনস্বিতা জানেনা এর কী পরিণতি রয়েছে। সম্মুখ চলার পথে দিনে দিনে এ অনুভব কী রূপ পরিগ্রহ করে সেটাই ভাবনার! নিজেই একা একা এসব ভাবতে ভাবতে চলে গেছে কত কত সন্ধিক্ষণে। হয়নি দেখা। হয়নি কথা। সংযোগে বাঁধা যায়নি কোনো জীবিত আর মৃতের আত্মা। অবুঝ হৃদয়। আজই প্রথম বেদনার নৈঃসঙ্গ্যে সঙ্গের তরঙ্গ তুলে ছুটে চলেছে চক্রবর্তীর গাড়ি। বিস্মিত মনস্বিতা, এইতো সেদিনের কথা, সেদিনও এই গাড়িতেই এই সিটেই বসেছিল মনস্বিতা। কোথা থেকে এই মানুষটি এসেছিলেন দেবতার মতো। তখনো শরীরে সপ্রাণ ছিল তার আত্মজ। অথচ আজ নেই… মনস্বিতার বিষাদাক্রান্ত একরৈখিক ভাবনার জাল ছিন্ন করে চক্রবর্তীই কথা বলে ওঠেন :
-ঐ যে, নদী, দেখো, সামনে।
মনস্বিতা চক্রবর্তীর হাতের আঙুলের নির্দেশিত পথে গাড়ির জানালা দিয়ে চোখ মেলে দেয় সামনে। নিকটবর্তী কোনো নদীর জলই হয়তো এতক্ষণ ধরে শান্ত করে নিয়ে এসেছিল চারপাশের বাতাস। তার ছোঁয়া গায়ে লেগেছিল। কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন চিন্তার জালে আটকে ছিল তার বস্তুগত অনুভবগুলো। তাই টের পায়নি এতক্ষণ।
-আহ, নদী!
-তুমি নামবে? সামনে ব্রিজ আছে। চাইলে নামতে পার। পাশেই একটা ছোট ক্যাফেও আছে। চাইলে কিছু খেয়ে নিতে পার। চা কফি? খাবে কিছু?
-এত কাছে কোনো নদী আছে?
বিস্মিত মনস্বিতা। ও তো জানতোই না। জানবে কী করে? এতকাল কী বেড়াতে বের হওয়া বলে কিছু কি ছিল তার জীবনে। উদয়াস্ত পরিশ্রমে ক্লান্ত বিষণ্ন মনস্বিতার মন কি চায়, সপ্তাহের কর্মক্লান্তির অবশেষে উদ্দেশ্যহীন কোথাও একটু বেড়াতে বের হয়ে পড়া, মনস্বিতাকে নিয়ে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়ানো, এসব কোনোদিনও ছিল না ফারুকের পছন্দের তালিকায়। অদ্ভুত জবুথবু জীবন। তার পরতে এসব সোনামোড়ানো আনন্দ থাকে না। অথচ এই মানুষটি কে? কেন এভাবে সেদিন তাকে এগিয়ে দিয়ে এলেন? আজ, ভাই বন্ধু স্বামী আত্মীয় সন্তানহীন অদ্ভুত এই বিষাদের ক্ষণেও তিনি? কে তিনি? কেনই বা মনস্বিতা এরই সাথে বাইরে বের হলো! হঠাৎ মনস্বিতার মনে এই প্রশ্ন উঠে আসে। আর তখনই তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে দু’চোখের দৃষ্টির প্রক্ষেপ। গাড়ি থেকে নেমে আসে চক্রবর্তীর কথার উত্তর না দিয়েই। সামনেই নদী। নদীর উপর সদ্য নির্মিত ব্রিজ। লোকজনের ভীড় নেই, কোলাহল নেই, শান্ত নীরব জলের উপর এসে দাঁড়ায় মনস্বিতা। নীচে গাঢ় জলে আকাশের নীল ছায়া। তবু সন্ধ্যা হয়ে আসতে থাকা সময়ের নিরবতা কী এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়িয়ে দিচ্ছে আকাশে আকাশে আজ। চক্রবর্তীও এসে দাঁড়ান মনস্বিতার পাশে। ঝুঁকে পড়ে জল দেখেন। নিচে নদী। দু-একটা নৌকা চলছে কাছে-দূরে। কলের নৌকাগুলো বেশ জোর শব্দে কাঁপিয়ে দিয়ে চলেছে যেমন সন্ধ্যার শান্ততা, তেমনি জলের গভীরে তুলে আনছে তীব্র অনুরণন। সেই জলের ঘূর্ণির দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ চক্রবর্তী। মনস্বিতা প্রশ্ন করে :
-আচ্ছা, এই সন্ধ্যায় আপনি ঘরে না ফিরে আমায় নিয়ে এখানে এলেন!
-কেন? তোমার ভালোলাগছে না?
-আমি বলছি, আমাকে আপনি কেন বাইরে বের করে আনলেন?
মনস্বিতার কথায় চক্রবর্তী না হেসে পারেন না। আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে সন্ধ্যার গাঢ় হতে থাকা অন্ধকার যেন তার হাসির শব্দে উড়ে উড়ে মিলিয়ে যেতে লেগেছে কোমলধবল জোৎস্নাধারায় :
-হা হা হা। হা হা হা।
মনস্বিতা অবাক হয়ে তার হাসি দেখে। নিজেকে খানিকটা বোকার মতো লাগে। আসলে কী সে বোকার মতো কিছু বলেছে? এই ভাবনার মঝখানেই হাসি থামিয়ে চক্রবর্তী বলেন :
-আচ্ছা, তুমি না এলে আমি কি তোমাকে বাইরে আনতে পারি?
এবার মনস্বিতা সত্যিই খানিকটা লজ্জা পায়। একটু আগের ঈষৎ রাগ, যা মনস্বিতার দৃষ্টিকে করে তুলেছিল খানিকটা বাঁকা, সেটা আর অস্তিত্বশীল থাকে না। প্রসঙ্গ বদলাতে চায় সে :
-আপনি সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন নি কেন?
প্রশ্ন শুনে চক্রবর্তী গম্ভীর হয়ে পড়েন। চোখে তার বিষণ্নতার ছায়া। মুখে পড়েছে সন্ধ্যার শেষ হয়ে আসা আলোর ঈষৎ প্রগাঢ় এক মায়া। তার দৃষ্টি নিচে নদীর কালো জলের দিকে নিবিষ্ট তখনও। চক্রবর্তীর এই ছবি মনস্বিতার বুকের গভীরে কোথায় যে এক অদ্ভুত মায়ার তরঙ্গ তুলে সরে সরে যায় দূরে। তারপর চোখ তুলে তাকান মনস্বিতার দিকে।
-তুমি তো জান না, প্রায়-প্রায়ই সন্ধ্যায় আমি বাড়ি ফিরিনা।
-লোকে তো কাজ সেরে বাড়ি ফেরে। ঘরে ফেরার আনন্দ আছে না আপনার?
-আনন্দ কাকে বলে বলতো? তুমি তো ঘরে ফেরো প্রতি সন্ধ্যায়। আমি ফিরি না।
-হুম।
মনস্বিতা কথা খোঁজে। তারপর বলে :
-স্ত্রী-পুত্র আছে। আপনি তো আর আমার মতো নন! আপনার জন্য তো কেউ অপেক্ষা করে থাকে।
-তোমার জীবন শুরু হলো মাত্র। তাই অভিজ্ঞতা কম। উপলব্ধির ব্যাপ্তি কোথায় লুকিয়ে থাকে তা হয়তো বিশদ জানা নেই। দিনে দিনে অভিজ্ঞতা বাড়বে। পরিবেশ পরিস্থিতি তোমাকে শেখাবে কখনো অপেক্ষা কী দারুণ আনন্দ। আবার কখনো অপেক্ষা কিংবা অপেক্ষমানেরা কতটা ভারাবনত করে!
মনস্বিতা এক সুগভীর বেদনার আভাস পেতে শুরু করে চক্রবর্তীর কথায়। দৃষ্টি সরে না তার। চোখে সোজা তাকিয়ে থাকে আরও কিছু শুনবে সেই আশায়। তিনি আবার বলতে শুরু করেন :
-আমি বিপ্লবী। সমাজবদলের স্বপ্ন ছিল একদিন বুকের গভীরে। সেখান থেকে ছিটকে পড়েছি। বহুদিন আগের কথা। বলেছিলাম না তোমাকে খানিকটা?
-হ্যাঁ, বলেছিলেন। আপনি নকশাল আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে গেছিলেন।
-হ্যাঁ। সেই সময় আমি চীনে গেছি মাধবীকে ফাঁকি দিয়ে। না জানিয়ে। ফিরে যখন আসি তার কিছুদিন পরই গর্ভস্থ সন্তানটি মারা যায়।
-কি বলছেন আপনি?
-হ্যাঁ। সে এক কন্যা সন্তান ছিল।
তিনি যখন নদীর শান্ত জলের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে মনস্বিতার মুখের দিকে প্রসারিত করেছেন, তখন পৃথিবীতে অন্ধকার ঘনিয়েছে। প্রগাঢ়। পৃথিবীর এই খোলা অবাধ প্রশস্ত প্রান্তর জুড়ে জোৎস্নার একাগ্র ধারা। সেই আলোতে দারুন স্নেহময় এক দৃষ্টির আবছায়া দেখতে পায় মনস্বিতা চক্রবর্তীর চোখে। হঠাৎ কেমন বদলে যায় তার কণ্ঠস্বর। কী এক বেদনা নাকি এক অদ্ভুত অযাচিত স্নেহ ঝরে পড়ে কথায়।
-জানো তুমি? মাধবী সেই কন্যা সন্তানের নাম ঠিক করে রেখেছিল মনস্বিতা!
-সত্যিই? আমি বিস্মিত!
-বিস্ময়ের কী আছে? পৃথিবীতে এমন হয়তো কতই আছে। কিন্তু আমার তোমাকে দেখার সাথে সাথেই সেদিন আমার কন্যার কথা মনে পড়েছিল। বেঁচে থাকলে তোমার চেয়ে হয়তো বছর চার পাঁচ বড় হতো। আর যখন তুমি তোমার নাম বললে, তখন আমি হতবাক। কোথায় যেন হারানো কন্যাকে দেখতে চাই তোমার মুখের ছায়ায়।
মনে-মনে নিজেকে অপরাধী ভাবে মনস্বিতা। চক্রবর্তী বলতে থাকেন :
-আমি শাস্ত্র-ধর্ম-পরকাল মানি না। নন বিলিভার।
-আচ্ছা। বাড়িতে দুর্গা পূজার আয়োজন চলছে। মাধবী টুলটুল দুজনেই খুব পূজাটুজা করে। একদিন পূজো দেখবে এসো।
-যাব।
রাত বেশ ঘনিয়ে আসছে। আশ্বিনের আসি-আসি শীতের আমেজে পৃথিবীতে দুর্গতিনাশিনীর আগমনের হাওয়া। বেশ বয়ে চলেছে। গায়ে শিরশিরে কাঁপন তুলছে। গাড়ি ছুটে চলেছে মনস্বিতার বাড়ির দিকে। বাড়ান্দায় অস্থির ফারুক। একবার বাড়ান্দায় আসছে আবার ভেতরে ঢুকছে। ঠিক এমন সময় গাড়ি এসে দাঁড়ায় মনস্বিতার বাসার সামনে।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব-২৮