শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩১]

0
506

পর্ব ৩১

বাড়ির খুব কাছের ফাঁকা মাঠটিতে একটা গাছের সাথে বেঁধে রাখা হয়েছে টুলটুলকে। যে মাঠটিতে প্রায়ই পাড়ার ছেলেরা অক্টোবর নভেম্বরে শীতের শুরু থেকে জানুয়ারি অবধি সন্ধ্যার পর পর ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলে। পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতায় উজ্জ্বল গায়ের রঙ টুলটুলের। বুকের ছাতি যতটা চওড়া হওয়া দরকার তা নয়, তবু বেশ সুঠাম দেখায় তার চেহারা। একহারা গড়নে দেহের উচ্চতা নির্দিষ্টের চেয়ে আরও দীর্ঘ বলে মনে হয়। ধনুকের মতো লম্বা ঘন ভুরুর নিচে বেশ বড় আর তীব্র অনুসন্ধানী চোখ। সে চোখে তার ক্ষিপ্র দৃষ্টি। মাথার ঈষৎ কোকড়ানো চুলগুলো কপাল বেয়ে নীচে গড়িয়ে পড়েছে। গায়ের সাদা রঙের শার্টটি কলারের কাছে ছেঁড়া। গায়ে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট। ঠোঁটৈর কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে তাজা রক্ত। দুহাত বাধা পেছনদিকে গাছের সাথে। তাই চোখের সামনে থেকে চুল সরাতে পারছে না। মাথাটা সামনে থেকে ডানে ঝেড়ে চুল সরানোর চেষ্টা করে। সামনে দাঁড়ানো ছেলেগুলোর বেশির ভাগই তার চেনা। পাড়ারই ছেলে-ছোকড়া ওরা। একজন তো তারই আপন কাকাতো ভাই। অর্থাৎ তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তীর ছোট ভাইয়ের একমাত্র ছেলে শৈলরাজ চক্রবর্তী। একই দালানে ওদের নিচের তলায়ই কাকা কাকিমা আর শৈল বাস করে। দাদার সম্পত্তির প্রাপ্য অংশীদার হিসেবে তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী আর তরুণকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী একই দালানের উপর-নিচে বসবাস করেন। বয়সে তার চেয়ে মাস ছয়েকের ছোট। অবিশ্যাস্য ঠেকছে না টুলটুলের, যদিও এতটা ভাবেনি সে। এখন সবকিছু তার কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু এই মুহূর্তে কী করতে চাইছে শৈল সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না সে। শৈলই কাছে এসে কথা শুরু করে।
-অনেক খেলা হয়েছে দাদা। এবার ছাড়ো।
কথার অর্থ টুলটুলের কাছে স্পষ্ট। তবু প্রশ্ন করে আবার।
-খেলা আর আমি খেলতে পারলাম কই। তবে এবার খেলবো। দেখতে চাইলে অপেক্ষা কর। এবার বল, কী ছাড়বো?
-আহা হা। কিছুই যেন বোঝো না সোনার চাঁদ।
বলে চু চু করে মুখে একটা বিকৃত শব্দ করে শৈল।
-অত ভনিতা করছিস কেন? মুখ ফুটে বল কি ছাড়বো? সকলেই শুনুক, জানুক।
টুলটুলের কথা শেষ হতে না হতেই আকাশ-বাতাস এলোমেলো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে শৈল।
-হা হা হা। হা হা হা। সকলেই শুনুক! হা হা হা। আছে না কি এখানে তোমার আপন কেউ। নাকি ফেউ নিয়ে এসেছ লুকিয়ে? সাক্ষী রাখবে? কই কই তাকেও একবার হাজির করো আমার সামনে? হা হা হা।
-জানিস তো? বেড়াল খাবার ভক্ত। আর কুকুর প্রভুভক্ত। তোর চারপাশে যা কতগুলো ঘুরছে, আমি সব বেড়াল দেখতে পাচ্ছি। আমি যদি খাবার ছড়াই তবে দেখবি সবগুলো চুকচুক করে খাবার খেতে এসে জড়ো হবে আমার কাছে, এটা মনে রাখিস।
-সে সুযোগও আশা করো দেখছি?
এবার তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে টুলটুলের নিজের রক্তের প্রতি ঘৃণা। আর তার সবটা প্রকাশ গিয়ে ঘটে হাসিতে।
-হা হা হা। হা হা হা। করি তো। দাবার ঘুঁটি কখন উল্টে যায় কে বলতে পারে? না তুই না আমি।
হঠাৎ এমনি পর্যুদস্ত সর্বশান্ত এবং আক্রান্ত অবস্থায় টুলটুলকে এমন দুঃসাহসী হাসি হাসতে দেখে খানিকটা স্খলিত হয় শৈলর আত্মবিশ্বাস। সাথে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি সব সাঙ্গপাঙ্গদেরও। টুলটুলের কথা থামে না।
-শোন শৈল, জেনে রাখিস।
-কী জেনে রাখবো?
-কাছে আয় বলছি।
হঠাৎ যেন কি এক অবিশ্বস্ততায় পেয়ে বসে শৈলকে। সে টুলটুলের কাছে যায়। কয়েক সেকেন্ডের একটুখানি সুযোগ মিস করে না টুলটুল। পেট বরাবর একটা লাথি বসিয়ে দেয় শৈলর। এই হাত বাঁধা রক্তাক্ত অবস্থায়ও লাথিটা মারাত্মক। টাল সামলাতে না পেরে পেটে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ে শৈল। মনে মনে বলে :
-শালার বদ্দা, শরীরে শক্তি ধরিস বড়ো। কি খেয়ে খেয়ে তোকে ওই ভারতে জন্ম দিয়েছিল কাকিমা ভগবানই জানেন। ফিরেই বা এলি কেন এখানে আমার খাবারে ভাগ বসাতে?
বেশি দূর আর ভাবতে পারে না শৈল। ততক্ষণে মুখে উগড়ে আসে একদলা রক্ত। সবগুলো সাঙ্গপাঙ্গ ততক্ষণে শৈলর আশপাশে এসে জড়ো হয়েছে। দূরে হালকা আলোয় ঠিক সেই সময় টুলটুল তাকিয়ে দেখতে পায় একটি ছায়ানারী, নাকি নারীর ছায়া! আলগোছে সরে গেল মনে হয়। মাথাটা আর একটু সামনে আগায়। নাহ। এতটুকুও ভুল নয়। হ্যাঁ, ঠিক দেখেছে। এ দীপার ছায়া। তার দীর্ঘ কিংবা হ্রস্বদৃষ্টির কোনোটাই নেই এ যাবত। চোখ ঝরঝরে। দৃষ্টি পরিষ্কার, দূরে কিংবা কাছে। বুকের ভেতরে নিকট অতীতের একটা নষ্ট ছায়া খামছি মেরে ধরে। কেউ কি ছিল এখানে দীপার সাথে! দূর থেকে হয়তো তাকে পর্যবেক্ষণ করছিল। কিংবা লুকিয়ে দেখতে এসেছিল কি এই রাতের অন্ধকারে! এর অর্থ কী! দীপার সাথেও তাহলে শৈলর কোনো বোঝাপড়া ছিল? সব তো চুকে বুকে গেছে। দীপা কোর্টে ডিভোর্সের জন্য অ্যাপ্ল্যাই করেছে। কোর্ট ছ’মাসের সময় দিয়েছিল। এর মাঝে দীপা কোনোই যোগাযোগ করেনি। তাহলে আর কী আছে আশা! ছ’মাস শেষ হতে চলেছে। এবার সাইন করে দিলেই সব শেষ। এইতো আগামী সপ্তাহে কোর্ট শুনানির জন্য ডেকেছে। পেপার সাইন করে দিলেই হলো। কিন্তু দীপার কি স্বার্থ এখানে! তার মানেটা পরে খুঁজে বের করা যাবে। দীপার ছায়াটা যতক্ষণ অন্তরীণ না হয়ে যায় ততক্ষণ সেদিকেই চেয়ে থাকে টুলটুল! বুকের গভীরে খামচি দেয়া নখগুলো বসে যেতে থাকে। এত লম্বা নখ কি রাখতো কখনো দীপা? খুব মনে করার চেষ্টা করে টুলটুল। কিন্তু পারে না। নখগুলো বুকের ভেতর গভীর থেকে গভীরে ঢুকে যেতে থাকে। হাতটা পেছন-মোড়া করে বাঁধা বলে নিজের হাতে দীপার হাত কিংবা নখ সে সরাতে পারে না। বুকের ঠিক মাঝখান থেকে গাঢ় লাল রক্ত ঝরে যেন খুব আয়েশে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকে। ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে শৈল। মাথায় রক্ত চড়ে গেছে তার। উঠে দাঁড়িয়েই হুঙ্কার ছাড়ে :
-এই এদিকে নিয়ে আয়।
বলতে না বলতেই একটা ধারালো লম্বা ছুরি চকচক করে। ঝিঁকিয়ে ওঠে চাঁদের আলোয়। সেই ঝিলিকের একটা ঝলক গিয়ে পড়ে টুলটুলের চোখেও। চোখ ঢাকতে হাত ওঠায়। তখন খেয়াল হয় যে তার হাত বাঁধা। মাথা নীচু করে আলোর ঝলকটাকে সামলে নিতে চেষ্টা করে। উত্তেজনার চরম মুহূর্তে পৌঁছেও কেমন নিরুত্তাপ দেখায় বাইরে টুলটুলকে। টুলটুল ভয় পাচ্ছে না কেন এটা এখনো বুঝতে পারে না শৈল। এটাই কী টুলটুলের চরিত্রের বিশেষ দিক! শৈল খুঁজে পায়না কিছুই। ক্ষিপ্র গতিতে ছুরি হাতে টুলটুলের দিকে তেড়ে আসে। ছুরিটাকে ঠিক যখন বসিয়ে দিতে যাবে টুলটুলের বুকে, ঠিক তখনই তমালকৃষ্ণের গাড়িটা এসে থামে। চারপাশের সব সাঙ্গপাঙ্গ মুহূর্তের মধ্যেই উধাও। গাড়ির শব্দে ভরকে গিয়ে তার হাত থেমে যায়। পেছনে তাকিয়ে দেখে কেউ নেই। এক সেকেন্ডের জন্য থমকে যায় শৈলরাজ চক্রবর্তী। গাড়ি থেকে নেমে আসেন তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী। পেছন থেকে চুলের মুঠি ধরে পেছনে টানেন শৈলরাজকে। তারপর হাত থেকে ছুরিটা নিয়ে টানতে টানতে গাড়িতে ঢুকিয়ে ড্রাইভিং সিটের পাশের সিটটাতে বসিয়ে দিয়ে দরজাটা লক করে দেন। টুলটুল প্রশ্ন চোখে তাকিয়ে থাকে। একসাথে তার মনে হাজারো প্রশ্ন ভীড় করে আসে। কে খবর দিল বাবাকে। ঠিক সময়মতো কী করে এসে পৌঁছালেন তিনি। আবার ফিরে আসেন চক্রবর্তী টুলটুলের দিকে। টুলটুলের মুখে একটি শব্দ অস্ফুট শোনা যায়।
-বাবা!
ততক্ষণে টুলটুলের হাতের বাঁধন খুলে গাড়িতে বসতে বলেন। বাড়তি একটি কথাও নেই তার মুখে। খুব ঠান্ডা চেহারা। কপালে এতটুকু ভাঁজ পড়েনি। কোনো উত্তেজনার ছায়া পর্যন্ত নেই কোথাও।
-শৈল, বসেছিস ঠিকমতো। টুলটুল? আমি গাড়ি ছাড়বো।
গাড়িটা শৈল আর টুলটুলকে নিয়ে বাড়িতে পৌঁছাতে রাত প্রায় দশটা বাজে। নিচের ঘরে কলবেল বাজালে দরজা খোলেন তমালকৃষ্ণের ছোট ভাইয়ের বউ শৈলর মা। পেছনে তার নিজের ছোটভাই টুলটুলের কাকা তরুণকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী। টুলটুল চক্রবর্তী আর শৈলকে একসাথে দেখে অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন। চক্রবর্তী আবার চুলের মুঠি ধরে পেছন থেকে শৈলকে একটা ধাক্কা মেরে তার মায়ের দিকে ঠেলে দেন । পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নেয় শৈল। মা তাকে নিয়ে ভেতরে চলে গেলে নিজের ছোট ভাই তরুণের হাতে শৈলর হাতে ধরা ছুরিটা ধরিয়ে দেন।
-নাও। যত্নে রাখো এটা। পরে কাজে লাগবে হয়তো আবার তোমাদের। আমাকে কিংবা টুলটুলকে হত্যা করতে।
তারপর কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা উপরে উঠতে থাকেন।
-এসো টুলটুল।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ৩০

http://www.teerandaz.com/1733-2/