শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩৫]

0
238

পর্ব ৩৫

“মনস্বিতা প্রথমবারের মতো ভালোবাসার পরশ পেতে শুরু করে। এতটা শ্রদ্ধা সম্মান আর আবেগের সমন্বয় থাকে প্রেমে, প্রথমবারের মতো বুঝতে শুরু করে। ভালোলাগা তীব্র হতে তীব্রতর হয়। তার গায়ের কালো রঙ, তার ঠোঁটের লুকোনো হাসি, তার কথা, তার উদ্ভ্রান্ত জীবনে তখন মনস্বিতার গভীর সমর্পণ।”

সবে সন্তান-বিয়োগাক্রান্ত একজন মায়ের সাথে যে ব্যবহারটি আজ ফারুক করতে পারলো, সে কী সত্যিই সম্ভব কোনো সন্তানের জন্মদাতার পক্ষে? দিন দিন এ কোন মহাযজ্ঞের আহুতি হতে চলেছে মনস্বিতা! তার উদারতা আত্মসম্মানবোধ সর্বোপরি তার আকড়ে ধরে রাখা পারিবারিক সম্মান আর সামাজিক ঐতিহ্যের প্রতি ফারুকের আচরণে যে অসম্মানের স্পর্ধা প্রকাশিত হয়েছে তাতে আজ এক দারুণ অশনিসংকেত বেজে উঠেছে মনস্বিতার মনের ঈষাণ কোণে। পুঞ্জিভূত মেঘের ঘনছায়ায় অন্ধকার হতে চলেছে পৃথিবী। বাতাসে দারুণ গতিবেগ। রাশ টেনে রাখা দড়িটাও কিন্তু সসীম। হয়তো খানিক বেশি তার স্থিতিস্থাপকতা। তাই কেঁপে ওঠে মনস্বিতা নিজের ভেতরেই, একা। শেষ রক্ষা হবে তো! নিজের মনে অসংখ্য প্রশ্ন ঘূর্ণিঝড়ের মতো তাকে ঘিরে দানা বাঁধছে। কে যেন তার ভাগ্যনিয়ন্তা! প্রশ্ন করে চলেছেন কোনো এক অজানা অচেনা গভীর কালের গহ্বর থেকে। ঠিক যেন একজন সংবেদনাহীন পরীক্ষক,
-কী রক্ষা করতে চাইছ তুমি মনস্বিতা?
-কাকে ছায়া দিয়ে চলেছ বটবৃক্ষের মতো?
-কেনই বা দিয়ে চলেছ ছায়া?
-যাকে রক্ষা করে চলেছ, সে কতটা বিসর্জনের কথা জানে কিংবা বুঝতে পারে? কতটা সময় আর সম্ভবনাকে তুচ্ছ করে বন্ধ করেছ সুন্দর কোনো পৃথিবীর আলো?
-আলো!
-হ্যাঁ, আলো আসতে দাও মনস্বিতা। আলো আসতে দাও। জানো না? মাটির গভীর অন্ধকারের মাঝে একটি বীজ থেকে কী গভীর ভালোবাসায় জন্মের জন্য আকুল হয়ে থাকে একটি চারাগাছ। আর সেই চারাগাছ কিন্তু মাথা তুলে দাঁড়ায় আলোতেই। এ কারণেই কী ভীষণ যুদ্ধ করে তাকে ভেদ করতে হয় কঠিন মাটির আবরণ! আর সেই আলো না পেলে গাছটি কিন্তু বাঁচে না। মরে যায় মনস্বিতা। জানো না?
-আলো!
সত্যিই কী আলো আছে কোথাও? সামনে, অদূর ভবিষ্যতেই যে আলো জ্বলবে, কে দেবে সেই নিশ্চয়তা! বিচ্ছিন্নতা! কোনো সমাধান হতে পারে হয়তো। তাছাড়া ফারুক নামের ছেলেটি তো তার নামেমাত্র বর। সত্যিকার অর্থে স্বামী। সেও বড় অসহায়। বাবা মা ভাই বোন কারো সাথেই তার বদমেজাজ আর প্রভুত্বকামী মনোভাবের কারণে ভালো সম্পর্ক নেই। সে বড় একা। কোথায় যাবে এই মানুষটি! তাছাড়া আপাতবাহ্যিক আচরণে যে নম্র ভদ্র স্বল্পবাক, কে বিশ্বাস করবে তার এমন পাশবিক আচরণের কথা! নিজের সাথে আজ এক তুমুল বোঝাপড়ার মাঝখানে এসে পড়ে মনস্বিতা।
-কাকে বোঝাতে হবে তোমার! কাকে করবে জবাবদিহি! কে এসে যাপন করবে তোমার জীবন! জীবনযাপন না করলে কী বোঝা সম্ভব এর ভেতরের কারুণ্য, ক্লেদ কিংবা কলুষতাকে! কেউ জানে না এসব কথা! তোমার চারপাশে কী একটি মানুষও নেই মনস্বিতা যে তোমার পাশে দাঁড়াবে? যে তোমার ব্যথা অনুভব করে কাঁদতে পারে! যে তোমার যাতনা অপরিসীম নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারে!
-হা হা!
নিজের মনেই হেসে ওঠে মনস্বিতা। কাঁধে তুলে নেবে মনস্বিতার দায়িত্ব, হা হা! মনস্বিতা তো চিরকালের এক ছায়াবৃক্ষ। সে-ই তো কাঁধে তুলে নিয়েছে সকল চারা গাছ, ঝোঁপঝাড় কিংবা উদ্ভিদকে ছায়া দেবে বলে। আজ হঠাৎ করে যেন সে ভাবতেই পারে না কেউ তার দায়িত্ব নেবে। তবে হ্যাঁ, মনে পড়ে একদিন নিজের ভার আর কাউকে দেবে বলেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু পৃথিবী উল্টে গেছে। কেউ একজন, কে আছে এই বিশ্বসংসারে যে মনস্বিতাকে ভালোবাসবে! হৃদয় উজার করে দেবে! এমন নিঃস্বার্থপরায়ন পুরুষ! নিজের মনের ভেতর এই প্রশ্নটি জেগে উঠতেই মনস্বিতা আঁতিপাতি করে খুঁজতে থাকে একটি মুখ। না তো! যাপনের বর্তমান কিংবা ভবিষ্যতের পাতায় এমন কোনো মুখ দেখা যায়না। কেবল পেছনে, দূর, বহু দূর থেকে কেউ একজন কথা বলে ওঠে। একটি মুখ বুঝি ছবি আঁকে। নিজেই অবাক হয়ে যায় মনস্বিতা, এখনও তার ছায়া আছে মনের ভেতর! একটি মুখ একটি হাসি আজও নিশ্চিন্তে বিহার করে তার বুকের গভীর অতলে…
একহারা গড়নের, পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি উচ্চতার গাঢ় কৃষ্ণ বর্ণে উজ্জ্বল তার চোখের তারায় মনস্বিতা আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে যেতে থাকে। ভীষণ গভীর সে চোখের নেশা। চোখের দ্যুতিতে সম্মোহন। দারুণ সে মুখের হাসি। অথচ সে-ই উল্টো মনস্বিতাকে বলে,
-তোমার চোখ সুন্দর।
হেসে প্রশ্ন করে মনস্বিতা :
-আমার চোখ?
সে আবার বলে :
-তোমার শরীর সুন্দর।
মনস্বিতা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে তার শরীরে। সে আলতো অনুভবে জড়িয়ে ধরে বলে,
-তোমার ঠোঁট সুন্দর।
মনস্বিতা তার ঠোঁটে একটা নম্র মধুর চুমু খেতে খেতে বলে ওঠে,
-আর একবার হাসো তো দেখি।
সে মনস্বিতার হাত ধরে কাছে টানে। টাল সামলাতে না পেরে মনস্বিতা গিয়ে পড়ে একেবারে তার বুকের ওপর। হাত ধরে টানতে টানতে কোথায় না কোথায় যেন নিয়ে চলে। মনস্বিতা তার পথ ছেড়ে দেয় তার হাতে। নারী, সুন্দর বলতে যে দুধে-আলতা রঙ বোঝায়, তার ধারেকাছে নেই মনস্বিতা। একহারা গড়নের শ্যামলা বাঙালি মেয়ে। সাদাসিধে চোখে গাঢ় দ্যুতি। গভীর চোখের ঘনকালো আইল্যাশের প্রেমে পড়েছে অনেকেই। এছাড়া আর কিসে যে অত সুন্দর পেলো, সে নিজেই তা জানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা যখন দামি গাড়ি নিয়ে আসা টাকাওয়ালা বন্ধুর হাজার টাকার উপহার পায়, সুগন্ধী পারফিউমে বাতাসে তরঙ্গ তুলে হেঁটে যায়, দামি জুতো পরে বেড়াতে বেরয়, তখন মনস্বিতার সাজ খুবই আটপৌরে। যখন বন্ধুরা বিউটি পার্লারে ফেসিয়াল করতে যায়, তখন হলের জনশূন্য রুমে সে একলা বসে কবিতা পড়ে। তার সুন্দর হওয়ার কোনো কারণই নেই। তার কথা বিশ্বাসও করেনা সে। তবু হাসে। তবে এটুকু বুঝতে পারে, রূপের ঝলক তাকে টানেনি মনস্বিতার দিকে। তবে? আর কী আছে? সে চিন্তা অবশ্য কখনো ঢোকেনি মাথায়। সে দিনে দিনে মনস্বিতাকে বুঝতে শুরু করে। মনস্বিতা বোঝে কী বোঝে না, সেটা তখনো উপলব্ধি করতে পারে না ঠিকঠাক। তবে দারুণ এক আকর্ষণ তার প্রতি, সেটাও অস্বীকার করতে পারে না। সে চোখে কাজল টানা পছন্দ করে। মনস্বিতা চোখে কাজল আঁকে। সে জয়ললিতা টিপ পছন্দ করে। খুব চেষ্টা করেও মনস্বিতা কপালে জয়ললিতা টিপ আঁকতে পারে না ঠিকঠাক করে। তার প্রিয় রঙ নীল। মনস্বিতা আলমারি খুলে নীল শাড়ি খুঁজে মরে। সে মনস্বিতার পায়ে সোনার মল পরাতে চায়। মনস্বিতা পা টেনে নেয়। তবু রোজ বিকেলে ওরা বেড়াতে যায়। দূর হতে দূরান্তে। হলের মাঠের কচি সবুজ ঘাসের পরশ ছেড়ে বহু দূরের হাওয়ায়। আকাশে আকাশে তখন কত না আনন্দ গান গেয়ে ওঠে, কবিতায় কবিতায় লেখা হয় কত না আদর। বাইকের পিঠে চড়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে মনস্বিতা তাকে। তার গায়ের ঘ্রাণ, বুঝি কোনো দেবতা নেমে এসেছেন পৃথিবীতে। স্বর্গ স্বর্গ ঘ্রাণে হাওয়ায় হাওয়ায় উড়িয়ে নিয়ে চলেছে অমরায়। মনস্বিতা প্রথমবারের মতো ভালোবাসার পরশ পেতে শুরু করে। এতটা শ্রদ্ধা সম্মান আর আবেগের সমন্বয় থাকে প্রেমে, প্রথমবারের মতো বুঝতে শুরু করে। ভালোলাগা তীব্র হতে তীব্রতর হয়। তার গায়ের কালো রঙ, তার ঠোঁটের লুকোনো হাসি, তার কথা, তার উদ্ভ্রান্ত জীবনে তখন মনস্বিতার গভীর সমর্পণ। কখনো চলে যায় এয়ার পোর্ট পার হয়ে আরও দূরে, উত্তরা জোয়ার সাহারা ছাড়িয়ে বহুদূর। টঙ্গী চৌরাস্তা। অতটা পথ বাইকে একটানা ভেসে ভেসে চলে যেন। আবার ফিরেও আসে।
সেদিন ছিল খর রোদ। দুপুরের রোদে নরম মোড়ানো সোনারঙ তখনো ধরে আসেনি। নেমে আসে নিচে। সঙ্গে বাইক নেই দেখে ভাবে,
-বসবো এবার ঘাসের মাঠে।
-এখানে নয়। ‍ওদিকে চলো।
হাঁটতে থাকে তার সঙ্গে সঙ্গে। হলের গেট থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলসীমা পার হতে বেশ লম্বা, প্রায় দুই তিন মিনিটের রাস্তা হাঁটতে হয়। এরপর মেইন গেট। গেটের বাইরে এলে সোজা আজিমপুর গোরস্তানের সীমানা-প্রাচীর। হাতের ডান পাশে বিডিআর তিন নম্বর গেট। বামদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের ছাত্রদের শাহনেওয়াজ হল। শাহনেওয়াজ হল পার হয়ে সোজা রাস্তা চলে গেছে নিউমার্কেট। সে অবধি ওরা হাঁটে। প্রখর রোদে যখন ম্লান হয়ে আসে গাছের পাতার রঙ, দুজনের মনে তখন শীতল পরশ। একটা বেবিটেক্সি ডেকে উঠে পড়ে দু’জনে। তারপর জানতে পারে মনস্বিতা, ওরা চলেছে সোনার গাঁ, পানাম নগর। ছুটে চলেছে বেবিট্যাক্সি। দিনের তীব্র আলো ক্রমে সহনীয় হয়ে আসে। বিকেলের কোলে গড়িয়ে পড়ে গেলে সূর্যের আদুরে ওম, দুজনে তখন মাঝখানের দূরত্বটুকু মুছে দিয়ে খুব কাছে চলে আসে। ঘন হয়ে বসে।
পানাম নগরে যখন নামে ওরা, তখন হিজল গাছের পাতায় দিনের শেষ আলো গলিত সোনার মতো যেন গলে গলে পড়ছে। তার সোনালি আভা ছড়িয়ে পড়ছে চোখে-মুখে। আর সেই হেমবর্ণ রশ্মি ঝলমল করছে মেঘনা শীতলক্ষার জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে। বিলাতি থানকাপড় আর বাংলার মসলিন কাপড়ের পাতলা ফিনফিনে কোমলতার ধার ঘেঁষে, ভেঙে ক্ষয়ে যাওয়া ইঁটের দেয়াল ঘেঁষে, গজিয়ে ওঠা বৃক্ষের হাহাকারের সীমানা ছাড়িয়ে, রাজসভা পেরিয়ে, রঙমহল, নাচমহল পার হয়ে চলেছে দু’জনে। তাই প্রতিক্ষণে অন্য আবেশ, রোমাঞ্চিত অনুভব। ইতিহাস-প্রকৃতি-মোঘল আর গ্রিক আর্কিটেকচারের মিশ্রণে তৈরি বাড়িগুলোর মাঝখানের সর্পিল রাস্তা ধরে যেন ওরা চলেছে কত-না যুগ ধরে- ভালোবেসে, হাতে হাত ধরে আছে, অনুভবের উষ্ণতায়, কতকাল। এই প্রকৃতি, এই ভগ্নস্তূপ, ভালোবাসার অন্য আরেক রূপ ছড়িয়ে আছে এখানে। কেউ নেই পরিচিত চারপাশে। রাস্তার দু’পাশে ব্রিটিশ আমলের নির্মিত শ্যাওলা ধরা পলেস্তারা খসে পড়া সারি সারি প্রাচীন বাড়িগুলো যেন ওদের পাহারায় দাঁড়িয়ে। এত বিরুদ্ধ পরিবেশ, চারপাশে যখন ক্রোধের মাত্রাতিরিক্ত প্রকোপে বাতাস তপ্ত, চুমু খাওয়ারও তিলমাত্র জায়গা নেই কোথাও, তখন পানাম নগরী খুলে দেয় ভালোবাসার চূড়ান্ত অবসর। সে কবি, রাজনীতি করে। নিজেকে ‘বাউল’ নামে ডাকে। ঘর-সংসার করার বিন্দুমাত্র বাসনা নেই যে মানুষটির, সে কীভাবে এতটা ভালোবাসতে পারে! কতটা গভীরতা তার ভালোবাসায় সে মনস্বিতার চেয়ে আর কে-ই বা বেশি জানে! মনস্বিতা বিস্মিত। তার বুকের গভীরেও তখন কবিতার ফুল ফোটে নিয়ত।
ঠাকুরের কবিতা পড়ে, কাদম্বরীর দুঃখে বুক ফেটে যায়, নজরুলের কবিতা পড়তে পড়তে ডুবে যায় নার্গিসের প্রেমে, রফিক আজাদের কবিতা পড়তে পড়তে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শামসুর রাহমানের কবিতা চোখে জল আনে। আবুল হাসানের ঊনত্রিশ বছরের ছোট্ট জীবনের প্রেম আর বিরহের করুণ রসে ডুবে যেতে যেতে জপে, ‘আমাদের প্রেম হোক বিষে জর্জর/ কাব্য চূড়ায় আমরা তো বাঁধি বাসা।’ কিংবা রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর কবিতা পড়ে নীল হয়ে থাকে তার বুকে বেদনার পঙ্‌ক্তিমালা। রুদ্রকে লেখা তসলিমা নাসরীনের চিঠির জলে চোখ ভিজে যায় কত কত রাতে। কাজী রোজীর কবিতায় আবিষ্ট হয়ে পড়ে গভীরতর বিরহে। এইসব কবি আর কবিতার ডিসেকশানে মনস্বিতা ক্ষত-বিক্ষত, আবিষ্ট আর নিয়ত স্নান করে পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে বেদনায়। প্রতিদিন মাইক্রোফোন স্টেজ রিহার্সেল কবিতা আর কবিতার মানুষদের ঘিরেই যত গল্পবাজি, আড্ডা ওর। সঙ্গে আরও আরও অনেক কিছু যুক্ত হয়ে নানা ফুল নিয়ত ফুটতে থাকে লাল নীল রঙে। মনস্বিতার কাছে ভালোবাসার রকম আর সংজ্ঞাটা তাই অন্য আরও অনেকের তুলনায় পুরোপুরি আলাদা। একজন স্বভাবতই কবি ও রাজনীতিক, আরেক জন কবিতামুখর মানুষের প্রেম কতটা অনন্য হতে পারে, তাই দেখতে থাকে দু’চোখ মেলে। অনুভব করে হৃদয়ে হৃদয়। সাড়ে চার শো বছর আগের বারো ভুঁইয়ার রাজত্ব- আজকের প্রকৃতিলগ্ন বিশুদ্ধ স্কেলিটোনের মাঝখানে, প্রাচীন বাংলার এই রাজধানীর কুড়ি বর্গকিলোমিটার এলাকার একটি প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকে দু’জন। ইতিহাসের বহু সফল আর ব্যর্থ প্রেমের, ভালোবাসার, বহুগামিতার, নর্তকীর যাতনার কিংবা উল্লাসের, উন্মুখ রাজা আর শাহজাদাদের উন্মাতাল জীবনযাপনের সাক্ষীগুলোর মাঝখান দিয়ে দু’জন নির্ভয়ে হাত ধরে হাঁটে। ঝিলের জলের দিকে ঝুঁকে পড়ে থাকা হিজলের ফুল দেখতে দেখতে ওরাও কাছে আসে। জলের আলস্যে বিকেলের নরম রোদে তপ্ত বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে আজ মনস্বিতার ভালোবাসাও। তাই স্বভাবতই ওরা আরও কাছে আসে। ভালোবাসার বিশুদ্ধতায় কাছাকাছি হয়। প্রকৃতি ওদের কাছে টেনে এনে ছেড়ে দেয় একান্তে। নাচঘরের সরু গলি দিয়ে ঢুকে পড়ে দুজন আরও কোন ইতিহাসের গভীরে জানা নেই। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গেলে মনে হয় এক্ষুণি ভেঙে পড়তে পারে সিঁড়ির সাঁকো কিংবা দেয়াল। তবু ভয় নেই, নেই কোনো জৈবিক তাড়নাও। মুগ্ধ বিস্মিত প্রথম যৌবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে এই নিরালা একাকী নিভৃতে পাওয়া দু’জন মানুষের মধ্যে নেই কোনো উন্মত্ততা। নেই কোনো অধিরতা; যেখানে জনবিরল জায়গা পেলেই খানিক জড়িয়ে ধরা কিংবা ঘন অন্ধকার পেলেই ঠোঁটে ঠোঁটে প্রগাঢ় চুম্বন, আরক্ত বেদনার প্রক্ষিপ্ত ধারা বয়ে চলে সদাই, সেখানে আজ এসবের কিছুই নেই। বরং মনস্বিতার কানে বাজতে থাকে :
এই, কি করছ?
-শুনছি।
-কী শুনলে?
-নূপুরের শব্দ।
-আর?
-কান্নার শব্দ।
-কান্নার শব্দও শুনতে পেলে?
-হুঁ, পেলাম তো!
-বাদশাহ-রানিকে ফেলে রাত কাটাচ্ছেন নাচঘরে। এসো, এখানে, কান পাতো, শোনো অবহেলায় বিরহে রাত্রিযাপনের কান্নার শব্দ।
-হা হা।
সে হাসতে থাকে মনস্বিতার কথা শুনে। ভুবনভোলানো হাসিতে কেঁপে কেঁপে ওঠে নোনাওঠা বাড়ির দেয়াল। তবু মনস্বিতা তাকে টেনে আনতে চায়। তবু সে কান পাতে না। বরং মনস্বিতাকে টানতে টানতে সিঁড়ি ধরে নিয়ে চলে সেইখানে, যে জায়গাটা আরও নীরব। ওটা এই নাচঘরেরই ছাদ। কেমন যেন চারপাশ থেকে ঢালু হয়ে আসা পুরনো অযত্নে অবহেলায় বাড়িগুলোর মাঝখান থেকে গজিয়ে ওঠা যে গাছগুলোকে দেখেছিল পথে আসতে আসতে, সেগুলো যে অত পুরনো আর অত বড়, সেটা টের পায় এখানে এসে। দোতলা ভবনের ছাদের বেশ কিছু অংশে গাছের ডালপালা হেলে-পড়ে আকাশটাকে আড়াল করে রেখেছে। এই ছাদে, এই নির্মল আকাশের নিচে, আর কেউ নেই। দর্শনার্থী যারা এসেছিলেন, তখন ফিরতে শুরু করেছেন। নিথর হতে শুরু করেছে সভ্যতার প্রাচীন নগরী। এ বিশ্ব নিখিলে আজ এই ক্ষণে, মনস্বিতা আর সে, দুই প্রাচীন মানব-মানবী যেন। মনস্বিতা নিচের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বার্ডস আই ভিউতে অদ্ভুত সুন্দর দেখায় পানাম নগরীর এক প্রান্ত। আর এরই মাঝে কখন যে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়েছে ছাদে, খেয়াল করেনি। তার ডাকে ফিরে তাকায়;
-এদিকে এসো।
কাছে এসে উপুড় হয়ে কোনুই দু’টো মাটির ওপর রেখে নিজের দু’হাতের কব্জির পিঠের ওপর মুখ রাখে মনস্বিতা। মুখোমুখি দু’জন।
-ডেকেছিলে কেন বলো?
তার ডান হাতটা মনস্বিতার পিঠের ওপর রাখে। মনস্বিতা ভয় পায় না। বিরক্ত হয় না। আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে না। সে মনস্বিতার মুখটা টেনে নামায় তার বুকের ওপর। মনস্বিতা নিভৃতে নিশ্চিন্তে তার বুকে মাথা রাখে। ওপরে তখন আকাশ বিছিয়ে দিয়েছে তার নীল। আকাশের কোণে কোণে আবির ছড়াতে শুরু করেছে দিনের শেষভাগ। সন্ধ্যাতারা জ্বলে উঠবে একটু পরেই। মনস্বিতার প্রেম রাতের আঁধারের মতো গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকে, এই প্রাচীর নগরীর বুকের নিভৃত ক্ষরণের ফাঁকে ফাঁকে।
কতকাল, কতকাল আগের অত কথা আজ সব যেন দুচোখ ছাপিয়ে একের পর এক সামনে দাঁড়াতে শুরু করেছে। কেন! কেন এতদিন পর এসব ভাবনা মনস্বিতাকে ঘিরে ধরছে। সে তো ভুলেছে সবই। তবু মনস্বিতা টের পায়, এসব ভাবতে ভাবতে সে ভুলে যেতে বসেছে এখনকার ঘন-নিবিড় যাতনার মহাকাল। সরে যেতে থাকে যেন চোখের অবাধ অজস্র খোলা জল। ভুলতে শুরু করেছে আজ রাতে ঘটে যাওয়া নিদারুণ পৈশাচিকতা। এমনকি মনস্বিতা ভুলে যেতে বসেছে হিমে জমাট মৃত কন্যার বরফশীতল মুখটিও। হায়, ভাঙা প্রেম! বস্তুগত যাতনার অশেষ ভুলে গিয়ে মনস্বিতা এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে যুগেরও পেছনে, সেদিনের পানাম নগরীতে। একজন কবি ও রাজনীতিক আরেক জন কবিতাঅন্ত প্রাণ মানব-মানবীর ঠোঁটের মাঝখানে একফাঁলি চাঁদ ওঠে প্রকাশ্যে পানাম নগরীর নীলাভ আকাশে। লুপ্ত হয়ে যেতে থাকে পৃথিবীর সব প্রাচীন ইতিহাস। হয়তো এর পর লেখা শুরু হয়েছে অন্য আরেক নতুন গাথা। এই ক্ষণে, এই মন্ত্রমুগ্ধ সন্ধ্যাতারার নিচে, জড়িয়ে থাকে যেন দু’জনের শরীর– প্রেমে আবেশে মুগ্ধতায়। দু’জনের পাঁজরের শব্দ শোনা যায় মধ্যরাতের নিরালায় ঘড়ির অস্ফূট শব্দের মতো। তবু কোনো আদিম জৈবিকতার গন্ধ নেই কোথাও। খানিক ধোঁয়া উঠে ঘুরে ঘুরে পাক খেয়ে শূন্যে মিলায় বস্তুগত সকল অনুভব। খোলা আকাশের মুক্ত বাতাসে মিশে যায় জটিল সম্পর্কের সূত্র আর অনুভব। হয়তো চারদেয়াল পেলে সেটা পৌঁছুতে পারতো কোনো এক উন্মার্গ আদিম প্ররোচনায়। হতে পারতো জৈবিক সম্পর্কও। তখন সন্ধ্যা পা বাড়িয়ে দিয়েছে রাতের গভীরে। নিঃশব্দে দুটো আচ্ছন্ন শরীর অন্ধকারের গহ্বর থেকে সন্ধ্যাতারার আলোর দিকে ঘুরে যায়। হাত ধরাধরি করে উঠে দাঁড়ায় দু’জনে। যেতে হবে বহু দূরের পথ।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব ৩৪
লিংক দেয়া হলো, কেউ পড়তে চাইলে পড়তে পারবেন :

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ac-%e0%a7%a9%e0%a7%aa/