শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩৬]

0
221

পর্ব ৩৬

ফেরদৌসী ম্যাডাম অসম্ভব সুন্দরী। ফর্সা দীর্ঘাঙ্গী অপ্সরা যেন এক। পড়ন্ত যৌবনা। কিন্তু মনস্বিতা তাকে মুগ্ধ চোখে দেখে। শুধু তার রূপ নয়, মু্গ্ধ হয় তার মেধার দীপ্তিতে, বিস্মিত হয় তার লিডারশিপ দেখে। বিশ জন পুরুষ মানুষের মাঝে একাকী একজন নারী অসাধারণ দক্ষতায় কাজ করে চলেছেন। কোনো প্রতাপ নেই, কোনো অকারণ নির্দেশ কিংবা শাসন নেই। তার বাক্য মধুর। তার আদেশ নম্র। নীল শাড়ি পরে লাল টুকটুকে প্রোটনসাগাতে বসে তার গাড়ি ড্রাইভ করার দৃশ্য তখন মনস্বিতার কাছে নারীর রুদ্র রূপের অপরূপ রূপ।

দুর্দান্ত রেজাল্ট করেছিল। তবু রাজনীতি ছিল তার রক্তে। মনে হয়তো খানিক ইচ্ছেও ছিল মনস্বিতাও রাজনীতিতে আসুক। তাই মনস্বিতাকে বুর্জায়া রাজনীতি আর সমাজতন্ত্রের মাঝে পার্থক্য বোঝাতে খুব চেষ্টা করেছিল। ঘরসংসার এসবের চিন্তা তার ছিল না কোনোদিনও। মনস্বিতাও এসব নিয়ে কখনো বিরক্ত করেনি তাকে। তবু সে মনস্বিতার কথা ভাবতো। এই রাজনীতি-অন্তপ্রাণ জীবনের সাথে মনস্বিতাকে জড়ানো ঠিক হয়েছে কী হয়নি এসব নিয়ে তার খুব দ্বিধা ছিল। মনস্বিতার মতো একটি ঘরসংসার-প্রিয়, কবিতাবিলাসী আর ভীষণ সংবেদী মেয়েটির সাথে জড়িয়ে তার জীবনটাই অর্থহীন করে তুলেছে কিনা এই প্রশ্ন করতো প্রায়ই। কিন্তু তাতে কী! নিয়তির গতি শ্লথ হবার নয়। তার কাজের গতিপ্রকৃতি অস্বীকার করবে কে আছে জগতে এমন! মনস্বিতার জীবনের যে নকশা বিশ্বকর্মা নিজ হাতে এঁকেছেন তা ছিঁড়ে ফেলে দেয়, সাধ্য কার!
একদিকে প্রেমে স্পর্শে নতুন অনুভবের সোনাঝরা দিন, পরষ্পরের সঙ্গলিপ্সায় স্বপ্ন স্বপ্ন রাত। অন্যদিকে ভীষণতর যাপিত জীবন। অস্থির চারপাশ। একটি চাকরি ভীষণ দরকার। মনস্বিতা চাকরি খুঁজছে শুনে সে অস্থির হয়। নিষেধ করে।
-আর একটা বছর বাকি। এমএ পাশ করে চাকরির কথা ভাবলে হয় না?
বরাবর সে স্বল্পভাষী। তার প্রতিবাদের ভাষা এর চেয়ে বেশি শানিত নয়। মনস্বিতাও কথা বলে না। এছাড়া নানাজনকে বলে রেখেছে সে চাকরির জন্য। বড় ভাই চায় না সে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকুক। আগে সে ঢাকায় ছিল না। তাই হলে থেকেছে সে অন্য কথা। এখন যেহেতু বড় ভাই ঢাকায় থাকে। তবে কেন তাকে হলে থাকতে হবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছাড়তে হবে তাকে। অন্যদিকে মনস্বিতা বড় ভাইয়ের টাকা নিতে চায় না। ছাত্রজীবনের শেষপর্বের এই একটা বছর নিজের মতো করেই নিজের খরচ চালাতে বদ্ধপরিকর। এ নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে প্রতিদিন কুরুক্ষেত্র লেগেই আছে। যখন যা না তা বাড়িতে বলে বলে বড় ভাই মনস্বিতার মনোবল আর শক্তি সাহসকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। বড় ভাইয়ের মুখে তাকাতে পারে না। নানা বিষয় নিয়ে বড় ভাই ভাবীর ক্রুদ্ধ মুখ দুটো, দুর্বৃত্ত চোখগুলো তার পড়ালেখা আর সুস্থ চিন্তার সব পথ রুদ্ধ করে রাখে। তার আবৃত্তির গুরু দেশের প্রখ্যাত আবৃত্তিকার। তাকেই বলেছিল চাকরি খুঁজে দেবার জন্য। তিনিই মনস্বিতাকে স্টার অ্যাডভার্টাইজার্সের ঠিকানা দিয়ে দেখা করতে বললেন রুবেলের সঙ্গে। মনস্বিতা কিছুই জানে না। কী কাজ করতে হবে জানে না। ইন্টারভিউ কী জিনিস বোঝে না। রুবেলকে চেনে না। চাকরির অভিজ্ঞতা নেই কোনো। তবু, একদিন রওনা হয়ে যায় বনানী ১১ নম্বর রোডে, স্টার এডভার্টাইজার্স নামক বিজ্ঞাপনী সংস্থাটির উদ্দেশে। রুবেল খুব লক্ষ্মী লক্ষী চেহারার ছেলে। খুব ভদ্র। মনস্বিতাকে সোজা নিয়ে বসিয়ে দেয় ডিরেক্টর আজাদুল হকের রুমে। সেখানে ম্যানেজার এসএন ফেরদৌসীও ছিলেন। নানা রকম কথাবার্তার পর মনস্বিতা হলে ফিরে আসে। এসব কিছুই মনস্বিতা বলেনি তাকে। মনে মৃদু ভয়। সে যদি হঠাৎ ভীষণ আপত্তি করে বসে! সে কী পারবে তার বাস্তবতা তুলে ধরতে ওর কাছে? তখন দেশে চলছে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন। বস্তুত তার লেখালেখি আর রাজনীতির চিন্তার বাইরে নিজের ব্যক্তিজীবনের নানা বিষয় নিয়ে মনস্বিতা তাকে একেবারেই ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে চায় না। মনস্বিতা জানে তার কাজের জায়গা ব্যাপক। বিস্তৃত পরিসরে তার কর্মযজ্ঞ। দেশ আর দেশের মানুষের জন্য যে রাজনীতি সেটা অনেক বড়। এমন একজন রাজনীতিকের পড়ালেখা রাজনীতির চেয়ে তার ব্যক্তিজীবনের জটিলতা ভীষণ তুচ্ছ একটি বিষয়। এ নিয়ে তাকে বিরক্ত করা সাজেনা। কারণ মনস্বিতা জানে তার ঘরবাইরের এই টানাপোড়েনের কথা শুনে অস্থির হয়ে উঠবে তার কবি । তাই সে কেবল এটুকুই বলে :
– আমি ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছি।
অবাক বিস্ময়ে তাকায় সে মনস্বিতার মুখের দিকে। কারণ সে জানে কতটা প্রয়োজন হলে মনস্বিতা এখন, পড়ালেখা শেষের এই সময়টিতে চাকরি খুঁজতে বের হয়েছে। তবু মনস্বিতা তার সে চোখের দৃষ্টিতে বেশিক্ষণ চেয়ে থাকতে পারে না। নিজেকে খুব একরকম অপরাধী মনে হয়। কিন্তু কী সে অপরাধ সেটা সে নিজেও আবিষ্কার করতে পারে না। সে জানতে চায় :
-চাকরিটা কি হবে?
-জানি না।
– যদি চাকরিটা হয়ে যায় তুমি করবে?
—হুম। করবো।
মনস্বিতা তার মতামতের জায়গা রাখে না। একমনে মাঠের সবুজ ঘাসগুলোর দিকে তাকিয়ে চোখে জল আসতে থাকে তার। লুকোতে পারে না। সে মনস্বিতার কাছে ঘেঁষে আসে। থুতনির নিচে ধরে মুখটা আলতো ছুঁয়ে সে বলে,
-একবার আমাকে জিজ্ঞাসা করলে না!
মনস্বিতার জল টলমলে চোখের কিনার গড়িয়ে এবার গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। মনে মনে বলে :
-কী হবে তোমাকে জানিয়ে। তুমি হয়তো চাকরি করতে দেবে না। কোনো না কোনোভাবে আমার শেষ বছরের লেখাপড়ার খরচটা জোগাড় করে দেবে। আমি তাতে ভীষন লজ্জিত হবো। লজ্জায় সারাটি জীবন মাথা নিচু করে চলতে হবে আমার নিজের কাছে।
বুকের গভীরে উচ্চারিত অস্ফুট এই কথাগুলো সে বুঝতে পারে কী পারে না মনস্বিতা সেটা জানে না। কবি তবু বুঝে নেয়, এখানে রয়েছে এক গূঢ় রহস্য, যা মনস্বিতা তাকে জানাতে বা বলতে চায় না। তাই সে আর ও-কথা নিয়ে আগে বাড়ে না। তার কথায় মনস্বিতা ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে ফেরে।
-যাক, বাদ দাও। রেজাল্টটা খারাপ করো না চাকরি করতে গিয়ে। একটা বছর মাত্র বাকি।
মনস্বিতা নতমুখে বসে থাকে। এ নিয়ে আর কোনো মতবিরোধ কিংবা মতদ্বৈধতাও বেশিদূর গড়ায় না। কোনো একটি কাজে পরদিন সে চলে যায় খঞ্জনপুর। মনস্বিতার ডাক আসে স্টার অ্যাডভার্টাইজার্স লিমিটেড থেকে, টেলিফোন কল অপারেটর হিসেবে যোগদান করার জন্য। এমডি সাহেব দারুণ ভদ্র, উচ্চশিক্ষিত, মার্জিত রুচির মানুষ। তাকে সব বলা আছে। এমএ পরীক্ষার সময় তিনি মনস্বিতাকে ছুটি দেবেন। অফিসে কাজের ফাঁকে তার লেখাপড়া করে নিতে পারবে। শেষ বেলায় কেবল জানতে চান :
-পাঁচ হাজার টাকায় তোমার পারপাস সার্ভ হবে তো?
এত সুন্দর আর সহৃদয় কথা শুনে চোখে জল আসতে থাকে মনস্বিতার। এমনও হয়! পৃথিবী এত সুন্দর! সব জানতেন ম্যানেজার এসএন ফেরদৌসীও। অসাধারণ একজন নারী আর পুরুষের সান্নিধ্য পায় মনস্বিতা এখানে এসে। যতক্ষণ অফিসে কাজ করে ততক্ষণ সবই আনন্দের। প্রাত্যহিক যাতনা ভুলে থাকার অসাধারণ এক সুযোগ তার এই চাকরিটা। যেদিন জয়েন করে সেদিন থেকেই তার ডেক্সে একটি পুরনো আমলের কম্পিউটার পড়ে রয়েছে। বিশাল তার মনিটর। মনস্বিতা সহজে তাতে হাত লাগায় না। সত্যি বলতে তখন কম্পিউটার বিষয়ে সে একেবারেই অজ্ঞ। আজাদ সাহেব প্রথম তাকে কম্পিউটার ধরালেন:
-কাজ তো খুব বেশি নেই এখানে। সময়গুলো নষ্ট না করে তুমি অবসর সময়ে এখানে টাইপ শিখবে।
-আচ্ছা।
-কিভাবে শিখবে?
-জানি না।
তিনি হেসে ফেলেন মনস্বিতার সরলতায়।
-হা হা হা। আমি শিখিয়ে দিচ্ছি।
প্রথম দিন তিনি মনস্বিতাকে কম্পিউটার ওপেন করা দেখান। তারপর বন্ধ করে আবার ওপেন করতে বলেন। বিজয় কীবোর্ড ওপেন করে দেন। মনস্বিতাকে সেটা মুখস্থ করতে বলে নিজের কাজে চলে যান। মনস্বিতা পারে না। কীবোর্ড দেখে দেখে দুই আঙুলে টাইপ করার চেষ্টা করে। যেতে-আসতে তিনি সেটা খেয়াল করেন। তিনিই শিখিয়ে দিয়েছিলেন পত্রিকা দেখে দেখে প্রতিদিন এক দেড়শো শব্দ টাইপ করতে। সেদিনও তাই করছিল মনস্বিতা। আজাদ সাহেব বাইরে একটা কাজে গেছিলেন বোধ করি। নিজের রুমে ঢুকতে যেতে গিয়ে থেমে যান। মনস্বিতা আড়চোখে সেটা খেয়াল করে ভয় পেয়ে যায়। তিনি আবার পেছনে এসে মনস্বিতার ডেস্কে দাঁড়ান।
-তুমি এভাবে টাইপ করছো?
মনস্বিতা লজ্জা পায়। কথা বলে না।
-কীবোর্ডে তাকিয়ে আছ কেন? কীবোর্ড দেখবে না। মনিটরে তাকাও।
মনস্বিতা মনিটরে তাকিয়ে থাকে। তার হাত চলে না। তিনি রেগে যান।
-ওঠো।
মনস্বিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে। পুরো অফিসে বিশ-বাইশ জন স্টাফের মধ্যে পিওনের ঠিক ওপরের একটি পদে চাকরি করে সে। সেখানে চেয়ারটিও পদ অনুসারে রাখা। তার চেয়ারে এমডি বসবেন না নিশ্চিত। তাই মনস্বিতা পিওনকে ডাকে।
-এই সালাম ভাই, চেয়ার দিন স্যারকে।
এমডি সাহেবের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি টেলিফোন কল অপারেটরের চেয়ারটিতেই বসে পড়েন। স্যারের রুম থেকে চেয়ার এনে পিওন সালাম দাঁড়িয়ে থাকেন। কে শোনে কার কথা! দ্রুত টাইপ করতে থাকেন স্টার অ্যাডভার্টাইজার্সের এমডি আজাদুল হক। দেখিয়ে দেন, কিভাবে কোনো আঙুল কোথায় রেখে বাকিগুলো কিভাবে মুখস্ত রাখবে।
মনস্বিতা মুগ্ধ হয়ে তার ঝড়ের গতিতে টাইপ করা দেখে। বিদেশে উচ্চশিক্ষিত, অসাধারণ সুন্দর, পৌরুষে দীপ্ত, উচ্ছ্বল দীর্ঘাঙ্গী এক পুরুষ তিনি। উজ্জ্বল তার গায়ের রঙ। মাথার সামনে খানিক চুল কম। তবু তাকে দারুণ দেখায়। বিত্তশালী পরিবারের ছেলে। কম্পিউটার সায়েন্সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন আমেরিকার কোনো এক নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। দেশে ফিরেছেন। তার টাইপ করার কী দরকার থাকতে পারে, মনস্বিতা বুঝতে পারে না।
কিন্তু নিশ্চিত তিনি নিয়মিত টাইপ করেন। না হলে এত স্পিড কী করে সম্ভব! তিনি আবার বলেন :
-যে অপারেটর বেশি বেশি মাউস ইউজ করে, সে ভালো অপারেটর নয়। মনে রাখবে।
মনস্বিতা মাথা দোলায়
-আচ্ছা।
-যে টাইপিস্টের টাইপ করতে গেলে আঙুল দেখা যায়, সে কোনো টাইপিস্টই নয়। জেনে রাখো।
একথা শুনে মনস্বিতা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে আজাদুল হক সাহেবের চোখের দিকে। তার প্রশ্ন চোখ দেখে আজাদ সাহেব হেসে ফেলেন।
-হা হা। অবশ্য সেটা আমার মতামত। হা হা।
হাসতে হাসতে নিজের রূমে চলে যান তিনি। মনস্বিতা মনে মনে শপথ করে, আমিও টাইপ করবো। আর আমারও আঙুল দেখা যাবে না্।
তারপর খুব দ্রুত বিজয় কীবোর্ড মুখস্থ হয়ে যায়। ফেরদৌসী ম্যাডাম অসম্ভব সুন্দরী। ফর্সা দীর্ঘাঙ্গী অপ্সরা যেন এক। পড়ন্ত যৌবনা। কিন্তু মনস্বিতা তাকে মুগ্ধ চোখে দেখে। শুধু তার রূপ নয়, মু্গ্ধ হয় তার মেধার দীপ্তিতে, বিস্মিত হয় তার লিডারশিপ দেখে। বিশ জন পুরুষ মানুষের মাঝে একাকী একজন নারী অসাধারণ দক্ষতায় কাজ করে চলেছেন। কোনো প্রতাপ নেই, কোনো অকারণ নির্দেশ কিংবা শাসন নেই। তার বাক্য মধুর। তার আদেশ নম্র। নীল শাড়ি পরে লাল টুকটুকে প্রোটনসাগাতে বসে তার গাড়ি ড্রাইভ করার দৃশ্য তখন মনস্বিতার কাছে নারীর রুদ্র রূপের অপরূপ রূপ। প্রায়ই কোনো কাজ না থাকলে তিনি মনস্বিতাকে দুপুর তিনটেতেও বাড়ি চলে আসতে বাধা দেননা। প্রয়োজন ছাড়া অকারণে আটকে রাখেন না। সেদিনও আজাদুল হক সাহেব অফিসে ফিরবেন না জানিয়ে গেছেন। ফেরদৌসী আপাও বাড়ি চলে আসবেন। মনস্বিতার কাজের অবস্থা জানতে চাইলেন। সব কাজ শেষ। আর কিছু বাকি নেই শুনে তিনি বললেন,
-চলো। আমি তোমাকে পৌঁছে দেই।
গাড়ি ছুটছে। বনানী ১১ নম্বর রোড থেকে মোহাম্মদপুরের দিকে। তিনি থাকেন মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটিতে। মনস্বিতা যাবে আজিমপুর, বিডিআর তিন নম্বর হলের কাছে বাংলাদেশ কুয়েত মৈত্রী হলে। পথে যেতে যেতে কথা হয়। নানা কথা।
-পড়ালেখার সাথে সাথে চাকরি করছ, ভালো। কিন্তু খেয়াল রেখো। পড়ার ক্ষতি যেন না হয়। রেজাল্ট ভালো করতে হবে। না হলে কিন্তু আমার কাছে তোমার আসতে হবে।
মায়াঝরা কথাগুলো মনস্বিতা নতমুখে শোনে। মানুষের বুকেও এত ভালোবাসা থাকে। নারীর বুকে! নারীর মনে! নিজের রূমমেট, তার চেয়ে তিন বছরের সিনিয়র করবীকে বড় ভাইয়ের বউ করে এনেছিল। চোখে-মনে কত স্বপ্ন ছিল। সেই মেয়েটি বড় ভাইয়ের বউ হয়ে একেবারে বদলে গেল। অত আদরে যে ভাই মাতিয়ে রেখেছিল মনস্বিতার কৈশোর, সেও আজ অদ্ভুত এক ক্রুদ্ধ শাসনে বিপর্যস্ত করে তুলেছে মনস্বিতার পুরোটা ছাত্রজীবন। ফেরদৌসী আপাকে মায়ের মতো লাগে। ভাবীর মতো লাগে। বড় বোনের মতো লাগে আজ তার। মায়ের পরে আর অমন আদরে কাউকে কথা বলতে শোনেনি সে। তাও দু’দিনের পরিচয়। তার ওপর আবার তিনি মনস্বিতার বস। মনস্বিতা অনভিজ্ঞ, ছোট, তুচ্ছ একটা চাকরি করে তার অধীনে। চোখে কান্নার জল লুকায়। মনে পড়ে মায়ের মুখ। মনে পড়ে ভাবীর অসংস্কৃত ভাষা। চোখের সামনে ভেসে ওঠে ভাইয়ের ক্রোধে রক্তাক্ত হয়ে ওঠা দুই চোখ। মনস্বিতা পরিবারের মানসম্মান ডুবাচ্ছে। এই বিংশ শতাব্দীর দোরগোঁড়ায় দাঁড়িয়ে কোনো ছেলেবন্ধুর সঙ্গে রিকশায় উঠেছে বলে বড় ভাই অনেক খারাপ খারাপ কথা বাড়িতে বাবা মায়ের কানে পৌঁছে দিচ্ছে। নাটকের গ্রুপের রিহার্সেল শেষে কোনো ছেলে-সহকর্মী বাড়ি পৌঁছে দিলে আজেবাজে ভাষায় যা-তা বলছে। ক্লাসে ঠিকঠাক পারসেন্টিজ নেই বলে ভীষ্মদেব চৌধুরী স্যার মনস্বিতাকে টিউটোরিয়াল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দিতে চাইছিলেন না। স্যারকে অনেক বুঝিয়ে পরীক্ষা দিতে হলো। ডিপার্টমেন্টে মামাদের ধরে কিভাবে উপস্থিত না হয়েও পারসেন্টিজ কাভার করতে হয়, সে বিদ্যা বন্ধুদের দেখে জানলেও মনস্বিতার সে সুযোগ ছিল না। ভোর সাতটায় বন্ধুরা যখন কলাভবনে ক্লাস করতে যায়, মনস্বিতা তখন দৌড়ায় অফিস। যখন ফেরে, তখন সন্ধ্যা লাগো লাগো। প্রতি মুহূর্ত বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত বিমুখ। সন্ধ্যায় ছাদে বসে থাকে। নিচে কত মানুষ আসে যায়। সেদিকে তাকিয়ে পার হয়ে যায় কত সন্ধ্যা। আবার কোনো কোনো দিন রূমে লেখাপড়া করে। কোনো কোনো রাতে ছাদে ওঠে। আকাশের তারাদের সাথে যাপনের বিপর্যস্ততার কথা বলা যেত যদি তবে বুঝি বুকটা খানিক হালকা হতো। কখনো কখনো লুবনাও ছাদে ওঠে। দুজনে আধোরাত পার করে ছাদের কিনারে বসে। কখনো তাকে খুব অনুভব করে। মনস্বিতা চাকরিতে জয়েন করাতে সেও একা হয়ে গেছে। যদিও তার রয়েছে বিশ্বকর্ম। কিন্তু তারও হৃদয়টা যে শূন্য পিপাসার্ত পড়ে থাকে তা বুঝতে মনস্বিতার কষ্ট হয় না।
বিকেলে একটুখানি দেখা হয় কোনো কোনো দিন। হাতে হাত রাখে। বহুদূর হেঁটে যায়। মাকে ছোট ভাইবোনদের দেখতে প্রায়ই খঞ্জনপুরও যেতে হয়। তখন আবার সারাদিনের পর মনস্বিতাও একা। এদিকে মনস্বিতার বিরুদ্ধে বড় ভাইয়ের এত এত অভিযোগ শুনতে শুনতে বাড়িতে মা বাবা ভীষণ উদ্বেগাক্রান্ত। তাদেরকে অন্তত শান্ত করতে হল ছেড়ে ভাইয়ের বাড়ি চলে আসতে বাধ্য হয় মনস্বিতা। শুরু হয় নরক যন্ত্রণা। সেদিন মনে আছে ভাইয়ের মেজাজ কোনো কারণে ভীষণ চড়া। খুব চিৎকার চেচামেচি করছে বাড়িতে। মনস্বিতা বাড়ি থেকে না খেয়ে বের হয়। বিকেলে বাড়ি ফিরে দেখে শূন্য ভাতের হাড়ি। একমুঠো ভাতও নেই। বুয়াকে প্রশ্ন করে জানতে পারে :
-ভাবী নিষেধ করেছে ভাত রাখতে।
-আমি এসে খাবো বলোনি ভাবীকে?
-বলেছিলাম। তিনি নিষেধ করেছেন।
চুপচাপ শুয়ে পড়ে। ভাই তখন দৈনিক পত্রিকায় চাকরি করে। রাত বারোটা নাগাদ বাড়ি ফেরে। দিনে প্রায় বেলা বারোটা নাগাদ তাদের বেডরুমের দরজা বন্ধ থাকে। দুপুরের খাবার হয়তো বিকেলে খেয়ে ভাই অফিসে যায়। তাই রাতের রান্না করতে ভাবী যায় রাত দশটা এগারোটায়। ঘরের এককোণে গুটিসুটি মেরে মনস্বিতা পড়ে থাকে একটা লজ্জিত শঙ্কিত অর্ধভুক্ত অযাচিত পশুর মতো! কখন কী নিয়ে লেগে যায়্। ভাবীর রুদ্রমূর্তি তাকে অপরাধী করে দেয়। রাতে ভাবী রান্না করতে করতে মনস্বিতার পরিশ্রান্ত শরীরে ঝিম ধরে যায়। সে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। তাতে দোষ। সকালে সাড়ে সাতটায় ধানমন্ডি থেকে না বের হলে সাড়ে আটটার ভেতর বনানী পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু ভাবীর রান্নাঘরে ঢুকতে বেলা হয়ে যায়। তাই সকালে পেটে ব্যথা নিয়ে না খেয়েই বের হয়ে পড়ে। পিওনকে দিয়ে খাবার আনিয়ে খায়। দুপুরে ভাত অফিসে খায়। বিকেলে বাড়ি ফিরে কোনো নাস্তা নেই। রাতের ভাত খেতে অনেক দেরি। মনস্বিতা ক্ষুধার্ত, বিষণ্ন। বেতনের এই কটা টাকায় দুবেলা অফিসে খাবার কিনে খাওয়া, স্কুটার ভাড়া, ভাইয়ের হাতে মাসকাবারে নির্দিষ্ট টাকা দেবার পর নিজের বেতনে কুলিয়ে ওঠা অসম্ভব ঠেকে। বেঁচে থাকবে কী করে! কাজ করবে কী করে, ভেবে ভেবে দিশেহারা। পরপর তিনটি দিন বাড়ি ফিরে কোনো খাবার পায় না মনস্বিতা। রাতের খাবার রাধতে বারোটা একটা। নিজে কোনো কিছুতে হাত দিলে বাড়িতে ভীষণ হট্টগোল। এটা সেটা ছুতো ধরে ভাবীর ত্রাহিকাণ্ড আর ভালো লাগে না মনস্বিতার। কেবল মনে হয় সে ভাইয়ের বাড়িতে থাকুক এটা ভাবী চাইছে না। ভাইয়ের বাড়িতে এসে মনস্বিতার জীবনের চূড়ান্ত বিপর্যয় তৈরি হয়। শারীরীক মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা তাকে চরম নৈরাশ্যের প্রান্তে নিয়ে যায়। বেঁচে থাকার জন্য হলেও এবার ভাইয়ের বাড়ি ছাড়বে মনস্থির করে। বয়স ২৫। ছোট্ট একটি চাকরি সম্বল। এই ইট-কাঠ-কংক্রিটের শহরে একা একজন নারীকে কে বাড়ি ভাড়া দেবে! কি করবে মনস্বিতা।
অনেক চেষ্টার পর এক বন্ধুর মামাতো বোনের পরিচয়ে ছাদের ওপর একটি একরূমের ঘর ভাড়া করা যায়। এটাচ্ড বাথ আর কিচেন। ছোট একটি রান্নাঘর। আর বাকি পুরোটা জুড়ে বিশাল ছাদ। দারুণ একটুকরো স্বাধীনতা কেনা হয় প্রতি মাসে পাঁচশত টাকা ভাড়ার বিনিময়ে।
এক ছুটির দিনে নিজের বাসায় উঠে আসে মনস্বিতা। সারাদিন একা-একা ঘর গোছাতে গোছাতে ক্লান্ত সে। এই সমাজের প্রেক্ষাপটে এভাবে নিরাপত্তাহীন বাইরে বের হয়ে আসাটা সে কিভাবে নেবে কে জানে। খুব চিন্তিত হবে নিশ্চিত। তবু তাকে সব জানিয়ে সাতদিন আগেই চিঠিটা ডাকে ফেলেছে মনস্বিতা।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ৩৪

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-28/