শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩৭]

0
345

পর্ব ৩৭

আহা, এ যেন স্বপ্নে দেখা স্বাধীনতা। মন ভালো করা সন্ধ্যা। মন আলো করা সন্ধ্যা। তবু অনেকের মুখ মনে পড়ে গেলে বুকের ভেতরটা খা খা করে ওঠে। নতুন ঘরের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যার খোলা আকাশের বুকে একটি আত্মীয়র মুখ দেখার খুব চেষ্টা করে মনস্বিতা। সবকটা মুছে দিয়ে একটি মুখ সবে ভেসে উঠতে গেছে সন্ধ্যাতারার মতো, তখনি সে-মুখের ছবি মুছে দিয়ে ছাদে এসে ঢুকে পড়ে বাড়িওয়ালার ছেলেটি।
ছেলেটি ‍যুবক। বয়সে মনস্বিতার চেয়ে দু-তিন বছরের ছোটই হবে। পুরোনো ঢাকার টাকাওয়ালা মানুষ। নতুন ঢাকায় এই বাড়িটাও তাদের নতুন করে করা। পড়ালেখা কম। চালচলনে পুরোপুরি পুরানা ঢাকার সংস্কৃতি বহাল। কেবল ভাষায় আধুনিক। তবু নিজেদের মধ্যে ঢাকাইয়া ভাষায়ই এরা কথা বলে। হাতে বহুমূল্য রিস্ট ওয়াচ। দামী বাইকে চলাচল করে। গায়ে, পোশাকে টাকার গন্ধ। হাতের আংটিতে লক্ষ টাকার দামী পাথর। কথায় কথায় ডলার ওড়ে তার। মনস্বিতাকে খোলা দরজায় দেখতে পেয়েই কাছে আসে।
-আপনিই এখানে থাকবেন?
-হুমম। আপনি?
-আমি এ ঘরটার মালিক।
-মানে?
-এ ঘরটা আমি করেছিলাম নিজে থাকবো বলে।
-আচ্ছা।
ছেলেটি আবার প্রশ্ন করে।
-একা?
-হুম।
-সাহসতো বেশ!
-কেন?
হেসে ওঠে ছেলেটি।
-এমনি।
মনস্বিতার ঘরে উঁকি দেয়। এলোমেলো অগোছালো মালপত্রের ভেতর হার্মোনিয়ামটি দেখে প্রশ্ন করে :
-বাহ, আপনি গানও করেন নাকি?
-একটু আধটু।
-আমি গান শুনতে আসবো কিন্তু মাঝে মাঝে।
মনস্বিতা কথা বাড়ায় না। তার কথায় বিরক্তির সুর।
-আমার সকালে অফিসের তাড়া আছে। আপনি আসুন। সারাদিন বেশ ধকল গেছে। আমি একটু গুছিয়ে শুয়ে পড়বো আজ। ছেলেটি মুখ টিপে হাসে।
-ঘরে আসবো? মানে ভেতরে আসবো?
মনস্বিতার দৃষ্টি তীর্যক। সোজা তাকায় ছেলেটির চোখে। ছেলেটির তাতে কোনোই ভাবান্তর নেই। তেমনি স্থূল রসিকতা তার।
-আরে চটছেন কেন? আমিতো মজা করেছি।
-আমার সাথে মজা করবেন না আর কখনও। সন্ধ্যা হয়েছে। এবার ঘরে যান।
-আরে আরে, আমার তো কোনো ঘরই নেই। আপনি আমার ঘর দখল করে বসে রয়েছেন।
ছেলেটির আচরণ ভালোলাগে না মনস্বিতার। তার চলে যাবারও কোনো উদ্যোগ নেই। মনস্বিতা দাঁড়িয়ে থাকে। ছেলেটি চলে না গেলে সে ঘরের দরজা বন্ধ করতে স্বস্তি পাচ্ছে না। কিন্তু খোলা ছাদ। ছেলেটি ছাদে দাঁড়িয়ে থাকলে নিষেধ করবারও কোনো অধিকার মনস্বিতার নেই। ছেলেটি মনস্বিতার মনে খুব একটা অস্থিরতা তৈরি করছে। তার আচরণে মনে হচ্ছে এটাই সে করতে চাইছে। অস্বস্তি দূর করতে মনস্বিতা একটু সামনে হেঁটে গিয়ে ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। দৃষ্টি বাইরে মেলে দিয়ে দেখে আকাশ। সন্ধ্যার আকাশ তার আবীর ধুয়েছে সবে। তারা জ্বলতে শুরু করেছে দুটি-একটি করে। রাতের অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। দূরে লম্বা রাস্তাটা সর্পিল। তাতে ঘরেফেরা মানুষের অস্থির চলাচল। বাড়ির সামনের গাছটায় অনেকগুলো কাক বাসা করেছে। কা কা করতে করতে ফিরছে কালো কাকের দল। কিশোর বেলার আকাশ, পাখি আর পাহাড় যাপন যেন খানিক ভুলিয়ে দিয়েছিল কিছুক্ষণ আগের অস্বস্তি। এরই মাঝে এসে একঝাঁক ধোঁয়ার গন্ধে বিরক্ত হয়ে রাস্তার দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে পেছনে তাকায় মনস্বিতা। ছেলেটি প্রায় তার গা ঘেঁষে এসে সিগারেট ধরিয়েছে। একরাশ ধোঁয়া কুণ্ডুলী পাকিয়ে ‍শূন্যে ছেড়ে দেয়। তারপর মনস্বিতার দিকে প্যাকেট এগিয়ে দিয়ে বলে :
-চলে?
মনস্বিতা বিস্মিত হয়।
-আপনি আমাকে সিগারেট সাধছেন!
ছেলেটি মনস্বিতার বিস্মিত চোখের দৃষ্টিকে থোরাই কেয়ার করে।
-বিদেশী ব্রান্ড। টেস্ট করে দেখতে পারেন।
-আমি স্মোক করিনা।
-পান-টান তো নিশ্চয়ই করেন?
-কী বলতে চাইছেন আপনি?
-আই মিন মদ? পান করেন না?
নিজেকে সামলাতে এবার বেশ কষ্ট হয় মনস্বিতার। তবু তার গলার স্বর শান্ত। প্রক্ষিপ্ত বাক্যে দুর্দমনীয় ঝাঁঝ।
-কি বলতে চান বলুন তো? আমি মদ খাই না।
-আহ্-হা চটছেন কেন? সুন্দরী, শিক্ষিতা। ঢাকা শহরে একা থাকার মতো আধুনিক। অথচ সিগারেট খান না। মদ খান না। মানায় আপনাকে?
-আধুনিকতার সংজ্ঞা আপনি এইটুকুই জানেন?
ছেলেটি মনস্বিতার কথায় কান দেয় না। মনস্বিতার ঘরের উপর যে ছোট ছাদটি সেদিকে আঙুল নির্দেশ করে বলে :
-ওই যে দেখুন দেখুন, আমি মাঝে মাঝে রাতে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ওই ছাদটাতে মদ খেতে বসি।
ছেলেটির আঙুল অনুসরণ করে এই প্রথমবারের মতো মনস্বিতা দেখতে পায় তার ঘরের কিনারায় লোহার রড দিয়ে বানানো ছোট্ট সিঁড়ি দিয়ে ছাদে ওঠার একটি সরু ব্যবস্থা রয়েছে। অবাক হয় নিজের কথা ভেবে।
-আশ্চর্য! বাসা দেখতে এসেছিল যখন, তখন তো এটি চোখে পড়েনি।
বিষয়টি ভেতরে ভেতরে বেশ খানিকটা অস্থিরতাও তৈরি করে। প্রাণপণ চেষ্টা করে সেটি লুকিয়ে রাখাতে। কিন্তু ছেলেটি বয়সে কম হলে কী হবে। সে ঝানু নারী-শিকারী বুঝতে অসুবিধে হয় না মনস্বিতার। এই মুহূর্তে সে বুঝতে পারে, এখানে তার খুব সাহসের সাথে পথ চলতে হবে। পৃথিবী অতটা সহজ নয়। জীবন এক অদ্ভুত প্রচ্ছদ। নিজেকে আরও কঠিনতর বাস্তবের জন্য প্রস্তুত করার সূচনাটা আজই শুরু হয়ে গেছে। ভ্রূ কুচকে প্রশ্ন করে :
-রাত-বিরেতে ছাদে বসে মদ খান বন্ধু বান্ধব নিয়ে?
ছেলেটি রাতের শান্ত হতে থাকা নিস্তব্ধতাকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয় হেসে।
-হা হা। হা হা। আরে মদ খাওয়া কি খারাপ? তাছাড়া আমার ছাদে বসে আমি মদ খাবো তাতে কে আছে কিছু বলবার বলুন? মাতাল হলে পর-না দোষ দেবেন।
মনস্বিতা বিদ্রুপ করে।
-মাতাল হন না?
ছেলেটি আরও জোরে হাসে।
-হা হা। মদ খাবো, মাতাল হবো না! এটা একটা কথা বললেন?
-মাসে কবার করে এই আড্ডা বসে আপনাদের?
-এর কোনো হিসেব নেই মিস আধুনিকা। যেমন ধরুন আপনার অনারে আজ রাতেই বসতে পারে আড্ডা।
এই মুহূর্তে কণ্ঠের কারুকাজে কঠোরতার প্রয়োজন অনুভব করে মনস্বিতা। আর চলতে দেয়া যায় না এভাবে। স্বরে এবার কাঠিন্য।
-আপাতত ছাদটা আমার। এটা আপনি মদ খাবার কাজে ব্যবহার করতে পারবেন না।
আবার হাসে ছেলেটি। প্যাকেট থেকে আরও একটি সিগারেট ধরায়। মনস্বিতার মাথা ধরে। আবার একটি সিগারেট মনস্বিতার দিকে বাড়িয়ে দেয়।
-টেস্ট তো করুন। না হয় আজই শুরু হোক।
মনস্বিতা আর নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না রাগ। নিজের ঘরের দিকে হাঁটতে শুরু করে ছাদের কিনার ছেড়ে।
-আমি ক্লান্ত। বিশ্রাম দরকার। আপনি নিচে নামুন। আমি দরজা বন্ধ করবো।
ছেলেটি ছাদের কিনার থেকে একপাও নড়ে না। দূর থেকে বেশ গলা চড়িয়ে বলে :
-শুনুন। আপনার ঘরের ভেতর, মানে, ছাদের নিচেরটুকু আপনার। কিন্তু উপরেরটুকু আমার। ওটা আমার ইচ্ছেমতো আমি ভোগ-উপভোগ করবো। আপনি আপনারটা ব্যবহার করুন।
মনস্বিতা কান চেপে ধরে। কিন্তু ভোগ আর উপভোগ শব্দ দুটো ভীষণ এক আতঙ্ক নিয়ে দুহাতে আঙুলের ফাঁক গলে মস্তিষ্কের কোষে কোষে গভীর থেকে গভীরে প্রবিষ্ট হতে থাকে।
রাত বাড়ে। টুকিটাকি সব গোছানো সম্ভব নয় একাহাতে একরাতের মধ্যে। কোনোমতে মাটিতে বিছানা করে শুয়ে পড়ে। সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি আজ। সেই সকালে বেরিয়েছিল মালপত্র নিয়ে। এখানে এসে কিছু একটা রেঁধে খাবে ভেবেছিল। বাড়িওয়ালার ছেলেটি ক্ষিধে আর খাবার মুড- দুটাই নষ্ট করে দিল। অথচ পেটে চিলিক দিচ্ছে ক্ষিধে। কিন্তু গলা দিয়ে এখন আর খাবার নামবার নয়। একটা বই চোখের সামনে মেলে ধরে বিছানায় গা এলিয়ে দেয় মনস্বিতা। কী সুনসান নীরবতা। রাত বারোটা বাজে- ঘড়ির কাঁটা জানান দেয়। প্রথম একলা রাত। বিশাল খোলা ছাদটিকে একটা গোরস্থানের মতো অনুভূত হয়। বাইরে তাকালে প্রান্তরের পর প্রান্তর। ধূ ধূ করছে। কোথাও কেউ নেই। একা। এই পৃথিবীর বিশাল আকাশের নিচে একা। একজন আদিমানব যেন মনস্বিতা। প্রকৃতিতে এখন চৈত্র। খর রোদ সারাদিন। কিন্তু এই মধ্যরাতের বাতাসে খানিকটা শান্ত চারপাশ। হঠাৎ একটা পাতা উড়ে যাবার শব্দে কেমন যেন বুকের ভেতরটা চমকে ওঠে। কারো পায়ের শব্দ! ছেলেদের জুতো পায়ে হেঁটে আসার শব্দ! বুকের ভেতর একটা অজানা শঙ্কা কাঁপন তোলে। তবু সাহস করে পর্দাটা তুলে বাইরে চোখ মেলে দেখার চেষ্টা করে। তারপর নিজের মনেই হেসে ওঠে। দুটো রাতজাগা পাখি, কিছু একটা নিয়ে টানাটানি করছিল। সে পর্দা তুলতেই আলোর ঝলকটা এসে পড়ে ঠিক তাদের চোখের উপর। আর অমনি উড়ে পালালো দুটিতে। বুকের উপর পড়ে থাকে গল্পের বই। বেশ লাগে মনস্বিতার। জানালা গলে একফালি চাঁদ যেন ঢুকে পড়ে ঘরের মেঝেতে। মৃদুমন্দ উন্মন বাতাস। এই একলা নীরব পরিবেশে তাকে পাশে পেলে মন্দ হতোনা। এই একা হুঁ হুঁ শূন্যতায় আজ প্রথমবারের মতো মনস্বিতার ঘরবাঁধার স্বপ্ন জাগে। এবার এলে তার রাজনীতিককে বলবে :
-চলো ঘর বাঁধি।
সে হয়তো বলবে :
-কী যে বলো, আমার দ্বারা ঘর সংসার হবে না।
তখন মনস্বিতা বলবে :
-ঘর হবে। তুমি কেবল ঘর বেঁধে দাও। তারপর দেশসেবা কোরো। আমি সংসার পাতবো।
তখন হয়তো সে একটা আলতো চুমু খাবে মনস্বিতাকে জড়িয়ে ধরে। পিঠের পেছনে হাতটা দিয়ে আলতো করে কাছে টেনে এনে বলবে :
-পারবে একা সামলাতে সব?
-রাজনীতিকের বউকে একাই তো সামলাতে হবে সংসার।
-কেবল সংসার হলেই হবে? আর কিছু লাগবে না।
তখন হয়তো মনস্বিতা লজ্জায় লাল হয়ে উঠবে। এমন একটি স্বপ্ন দেখতে দেখতে খানিকটা তন্দ্রায় ঢলে পড়েছিল সে। বেশ কতকগুলো মানুষের কথা বলার শব্দে ধড়মড় করে উঠে বসে। ভেতরে আলো জ্বালানো। জানালাটাও বন্ধ করা নেই। পর্দা টানা আছে। কিন্তু পর্দার এক চিলতে ফাঁকে দেখা গেল বেশকিছু যুবক হুড়মুড় করে ঢুকে গেল ছাদে। আরও কয়েকজন আছে পেছনে। সরু সিঁড়ি দিয়ে উঠতে পারছে না সকলে একসাথে। তাই নিচে অপেক্ষমান কজন। হবে আরও ছ-সাতজন। মনস্বিতার পুরো শরীরে হিম ধরে বরফ জমতে শুরু করেছে। উঠতে গিয়ে যেন পা সরছে না। পর্দার ফাঁকের একটু আলোতে দেখতে পায় সন্ধেতে যে ছেলেটি এসেছিল সেও আছে পেছনে। তার জানালার ঠিক সামনেই একবার দাঁড়িয়ে পড়লো ছেলেটি। মনস্বিতা নড়তে পারে না। এই মুহূর্তে লাইট অফ করে দেয়া দরকার। কিন্তু তাতে যদি ওদের চোখটা এদিকে ধেয়ে আসে! ওঠেনা। জানালাটিও বন্ধ করে লক করে দেয়া দরকার। কি করবে! কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা যাক। সবগুলো ছেলে একে একে ছাদে উঠে যায়। হাতে চকচকে বিদেশী মদের বোতল। জোৎস্নার আলোতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। সাথে কাঁচের গ্লাসের টুংটাং শব্দ। শব্দগুলো মাঝরাতের প্রহর কাঁপিয়ে নীরবতা ভেঙে দিয়ে ছাদের কার্ণিশে ধাক্কা খেয়ে বুঝি আরও দ্বিগুণ হয়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসছে। এত ঝড় চলছে কোথায়! এত প্রলয়ক্ষুব্ধ নাদ! এত ঘূর্ণি বাতাসের! নাকি এ তার হৃৎস্পন্দনের শব্দ। এতটা প্রকট! এতটাই বিকট! এলোমেলো অস্থির চিন্তার মাঝে সবগুলো যুবক উপরে উঠে গেলে যেন লাফ দিয়ে উঠে পড়ে মনস্বিতাও। যতটুকু সম্ভব নিঃশব্দে জানালাটা বন্ধ করে লক করে দেয়। আলোটা নেভায় দ্রুতহাতে। সুইচের শব্দটি যেন ঠাস করে অন্ধকার রাতের জানালায় কড়া নেড়ে দেয় সজোরে। ছাদের ফ্লোরে আলো হয়ে থাকা জানালার প্রতিকৃতিটা হঠাৎ নিভে গেলে অনেকটা জায়গায় ঘন অন্ধকার জমাট বাঁধে হঠাৎ। অকস্ম্যাৎ উধাও হয়ে পড়া আলোর বদলে গাঢ় অন্ধকার ওদের দৃষ্টিকে মনস্বিতার দিকে ফিরিয়ে আনবে না তো। সেকেন্ড দুই অপেক্ষা করে মনস্বিতা। না, কোনো সাড়াশব্দ নেই উপরের ছাদে। নিজের পা ফেলতেও ভয় করছে। মনে হচ্ছে ফ্লোরে তার খালি পায়ের শব্দেও উন্মত্ত হয়ে উঠতে পারে ছাদের যুবকেরা। পা টিপে টিপে জানালা থেকে সরে আসে। শুয়ে পড়ে। কিন্তু স্বস্তি নেই। হঠাৎ আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে হেসে ওঠে তারা। ঠিক গল্পে পড়া উল্লসিত জলদস্যুর দল কিংবা একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনির পিশাচদের উল্লাস; যেমনটা পড়েছে গল্পের বইতে। বুকের ভেতরে তার কেঁপে কেঁপে উঠছে, যে-কোনো সময় ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে যাবার আলামত। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাতাল হয়ে উঠবে যুবকের দল, নিশ্চিত মনস্বিতা। এতগুলো যুবক উন্মত্ত, অধীর, মাতাল। হঠাৎ যদি একজন ভেবে বসে মনস্বিতার দরজায় একটু নক করেই দেখা যাক না। তখন? তখন কী হবে! দরজা ধাক্কিয়ে খুলতে বাধ্য করবে তাকে। অতগুলো যুবক নেকড়ের মতো ঢুকে পড়বে তার ঘরে, মধ্যরাতের অন্ধকারে। ঝাঁপিয়ে পড়বে ক্রুদ্ধ বুনো উল্লাসে আদিম উন্মাদনায় তার শরীরে উপর! এই সমাজ এই সংসার, ভাই-বন্ধু তাকে ঠিক কীভাবে দেখবে এর পর! একসাথে অসংখ্য ঝড় আছড়ে পড়ছে ভেতরে। এক-একটি সেকেন্ড ঘন্টার চেয়েও দীর্ঘ এখন। বুকের ভেতরে রক্তের কণারা কি জমাট বাঁধতে শুরু করেছে? জমে যাবে কী কিছুক্ষণের মধ্যেই মনস্বিতার দেহ!
-হা হা।
ছাদের উপর মাতাল যুবকের দল। মধ্যরাতের নৈঃশব্দ্যকে অট্টহাসিতে ভেঙে দিয়ে একথাই জানান দিচ্ছে ওরা মনস্বিতাকে। কী করবে মনস্বিতা! ছাদের ওদিকে বাইরে যাবার দরজাটা খুব করে আটকে দিয়ে উল্টোদিকের দরজা খুলে নিচে নেমে যাবে সিঁড়ি দিয়ে? নেমে কোথায় যাবে? কোথায় কোন পথে এই মধ্যরাতের অন্ধকার নিরাপদ? নাকি আগেই অন্তর্হিত হবে পৃথিবীর এই জটিল-কুটিল অসহনীয় বর্তমান থেকে! হোক। তবে তাই হোক। সেকেন্ডগুলো আর মিনিটে যেতে পারছে না। ঘণ্টা তো বহুদূরের পথ। ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মনস্বিতার দরজায়। এভাবে ঘণ্টা দুই। রাত দুটো বেজে গেছে। হঠাৎ হঠাৎ কেঁপে কেঁপে উঠছে রাতের বাতাস। পূর্ণিমার চাঁদ। গলে পড়া জোৎস্নাও।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ৩৬

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-29/