শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩৮]

0
216

পর্ব ৩৮

রাত বেড়ে চলেছে। দুটো থেকে তিনটে। তিনটে থেকে চারটে। আরও আরও। অসংখ্য অসংখ্য রাত যেন পার হয়ে চলেছে একের পর এক। রাত্রির সেকেন্ডগুলো আজ আর কোনোভাবেই পৌঁছুতে পারে না মিনিট পেরিয়ে ঘণ্টায়। রাতের নিথরতায় মনস্বিতা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ঘরের একলা নিরালায়। উপরে ছাদের ওপর মুখর কোলাহলে উন্মত্ত মাতাল যুবকের দল। কখন সকাল হবে। কখন ফুরোবে এই সুকঠিন রাত্রির দারুণ দৈন্য! কখন কোলাহলে মুখর হয়ে উঠবে পাখি! সূর্য উঁকি দেবে সোনারোদ ছড়িয়ে আকাশে! আলোর পরশে পালাবে সব অন্ধকার! কখন! কখন! অস্থির অধীর মনস্বিতার একাকী নৈঃশব্দ্য হঠাৎ ভেঙে পড়ে খান খান হয়ে। লোহার আলগা ছোট সিঁড়িটা দিয়ে মাতাল একজন নামতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে এসে পড়ে যায় মনস্বিতার জানালার ধারে কাছে ছাদের উঠোনটায়। হঠাৎ ধপাস শব্দ শুনে উৎকর্ণ মনস্বিতা খুব সন্তর্পণে উঁকি দেয় জানালায়। একটুখানি সরায় জানালার পর্দা। একজনকে শুয়ে থাকতে দেখে ছাদের উঠোনে। পেছনে আরও আরও মাতাল যুবকের দল একে-বেঁকে টালমাটাল নামতে থাকে সিঁড়িটা বেয়ে। পেছন পেছন নেমে আসে বাড়িওয়ালার ছেলেটিও
-কি হয়েছে। কি শুরু করলি তোরা? এভাবে খেয়েছিস! এই এই কিরণ পানি নিয়ে আয়তো দেখি। চোখে মুখে পানি দিতে হবে এর।
এভাবে কত রাত। কে জানে! মনস্বিতা আর নিজের ভেতরে অযাচিত উত্তেজনা বহন করতে পারে না। মাথাটা ঘুরে উঠছে কী! কিন্তু এই সময়ে জ্ঞান হারানোও সম্ভব নয়। মুহূর্তে ঘটে যেতে পারে যে কোনো দুর্ঘটনা। প্রভু মঙ্গল করো। প্রভু নিশ্চিহ্ন করো অন্ধকার। আলো দাও প্রভু আলো দাও। সত্যিই আলো ফুটে ওঠে। রাতের বীভৎসতা দূর হবে এবার। পূব আকাশের কোণে একরত্তি সাদা আলোর আভাসখানি কেবল দেখা দেয়। যে আলো হয়তো কোনোদিনই দেখা হতো না মনস্বিতার। যে আলোতে মোটেও উজার হয়না হৃদয়ের কালো, পৃথিবীর বিপুল অন্ধকার। আজ সেই একফালি ধূসর আলো যেন জীবনমৃতের ভরসার আঁধার। নিথর স্তব্ধ মনস্বিতার সম্বিত ফিরে আসে বাড়িওয়ালার ছেলেটির ডাকে। খুব আনমনে কথা শুনতে কান পাতে। এখন আর আগের সেই ভীতিটুকু কাজ করছে না। কী অদ্ভুত এই আলোর পরশ। ক্ষণে দূর করে দেয় ভয়, কালো কিংবা সকল রিক্ততা। শুনতে পায় উঠোনে কথা বলছে ছেলেটি :
-ধর। ওকে ধর। দারোয়ান এই দারোয়ান।
উচ্চস্বরে ডাকে দারোয়ানকে। দারোয়ান বোধ করি ওদের পাহাড়ায় থাকে সতর্ক। ডাকার সাথে সাথেই এসে হাজির।
-কি হয়েছে ছোডসাব?
-ওকে ধরো। নিচে নিয়ে যাও।
দারোয়ানের সহযোগিতায় সকলে মিলে ছেলেটিকে নিয়ে যায়। মনস্বিতা বলতে শোনে ছেলেটিকে :
-কী যে করিস না তোরা। নতুন ভাড়াটিয়া এসেছেন এখানে। শিক্ষিত আধুনিক মানুষ। তিনি কী যে ভাববেন এসব শুনলে কে জানে!
হঠাৎ ভাবান্তর হয়। কী শুনছে মনস্বিতা এসব! বিকেলের সেই ছেলেটির মুখে এখন এই সময়টাতে এই কথা! অথচ রাতের অন্ধকারে মাতাল যুবকদের মধ্যে সে সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছিল একেই।  রাত পার হয়েছে। আলোর ধূসর ছায়া সরিয়ে আরো আলো ঢুকে পড়েছে পৃথিবীজুড়ে। মনস্বিতা বাইরে তাকিয়ে দেখে পৃথিবী উদ্ভিন্ন তরুর মতো নিটোল। নিকানো তার উঠোন। ঝটিতি দরজাটি খুলে দাঁড়ায়। সারারাতের ভয়ানক উদ্বেগ উৎকণ্ঠা নির্ঘুম সমগ্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এই সকালে মনস্বিতার মুখের ছায়ায়। অথচ ভীষণ রুদ্র তার মূর্তি।  তখনো বেশ কয়েকজন যুবক নেমে চলেছে একের পর এক। তারা নেশায় মাতাল। ঢুলুঢুলু চোখে মনস্বিতাকে দেখেছে কি দেখেনি সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। ছেলেটি তার চোখের সামনে পড়ে গিয়ে ইতস্তত করে। চোখে চোখ রাখতে পারে না। মনস্বিতার কণ্ঠ ঈষাণকোণের উত্থিত ঝড়ের আবেগে উন্মাতাল মেঘের মতো মন্দ্র। তাকে সইতে ছেলেটির বড় ভার মনে হয়। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়। খানিকটা কী কেঁপেও ওঠে।
-শুনুন। আজ রাতে যে কাজটি আপনি বন্ধুবান্ধব নিয়ে করলেন তা অসামাজিক। কলঙ্কিত। অন্ধকার। কুৎসিত।
ছেলেটি কিছু বলে না। মাথা নিচু করে থাকে। মনস্বিতার রাগ তখনো যুবক, টগবগ করে ফুটছে।
-তারুণ্যের শক্তিপ্রকাশের জায়গা অন্ধকার রাতে একাকী নারীর মাথার ওপর বা ছাদে নয়। মাঠে যুদ্ধে দ্রোহে বিদ্রোহে। কথাটা খুব ভালো করে মনে রাখবেন। কাপুরুষ অন্ধকারে অস্ফালন করে। কিন্তু জেনে রাখবেন নারী ভালোবাসে বীরপুরুষ।
ছেলেটি কী বুঝলো কী বুঝলো না বোঝা গেল না তার মুখ দেখে। তবে সে তার বন্ধুদের শেষবেলার কাজে লজ্জিত তা বোঝা যায়। খুব বেশি সাংস্কৃতি পরিমণ্ডলে তার বেড়েওঠা নয়। আদব কায়দা বিনয় তার জানা নেই, বোঝাই যায়। তাই দুঃখিত কিংবা সরি এসবের প্রকাশ কিংবা প্রয়োগ তার ভাষায় কণ্ঠে কিংবা আচরণে নেই। সে দ্রুতবেগে মনস্বিতার চোখের আগুন থেকে প্রস্থান করে।
তারপরের ঘটনাগুলো খুব দ্রুত ঘটতে শুরু করে। তবে হ্যাঁ, বাড়িওয়ালার এই ছেলেটিকে নিয়ে যা যা ভবিতব্য ভেবে নিয়েছিল মনস্বিতা তা আর ঘটেনি। ছেলেটি হয়তো মনে মনে খুব লজ্জা পেয়েছিল। কিংবা কোনো ভাবান্তর হয়তো হয়েছিল মনস্বিতার কথায়। কিন্তু তা মনস্বিতা জানতে পারেনি। পরের দেড় বছর মনস্বিতা আর একটি দিনও তাকে চোখে দেখেনি। হঠাৎ একটা রিংটোন বেজে ওঠে। অতীতের কুয়াশা কেটে যায়। মনস্বিতা ফিরে আসে বর্তমানে। ফারুক ভীষণ রাগ হয়ে অন্যঘরে শুতে যাবার সময় মনস্বিতার বিছানার ওপর তার ফোনটা ফেলে গেছে। সাধারণত এরকম ভুল তার হয় না। কিন্তু এটা তো ফারুকের ফোনের রিংটোন নয়। আর বাজছেও না। অন্যঘর থেকে ফারুকও টোনটা শুনে উঠে আসছে না। তবু অজানিতেই ফোনটা হাতে নেয় মনস্বিতা। ফারুকের মোবাইল ফোনে বরবারই পাসওয়ার্ড দেয়া থাকে। এ নিয়ে মনস্বিতার ভাবনা নেই। ফারুকের কোনো বিষয়েই তার কৌতূহল নেই। কিন্তু আজই হঠাৎ কেন এখানে পড়ে আছে ফোনটা। আর এই শেষ হতে থাকা রাতের প্রহরে কেই বা খবর পাঠালো ফারুককে। ওর বাবার বাড়ির কেউ অসুস্থ নয় তো! ফোনটার দিকে তাকাতেই বাইরে থেকে ম্যাসেজের যে লেখাটি ভেসে উঠলো মনস্বিতার চোখে তা তাকে নির্বাক করে তোলে। ম্যাসেজটিতে লেখা :
-আই লাভ ইউ ট্যু।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ পড়ে থাকে। অসাড় মনে হয় শরীর। কিছুক্ষণ আগে কেবল মাত্র মৃত সন্তানের বেদনার ক্লেশ কাটিয়ে উঠতে না পারা মনস্বিতার শরীরের ওপর পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়া ফারুকের মুখটা ভেসে ওঠে। অথচ কে এই নারী যে প্রভাতের শুরুতে আলোর বারতা নিয়ে এলো? ভালোবাসার খবর পাঠালো ফারুককে! নারীই তো কোনো! মনস্বিতা ভুল দেখছে না তো? নিজেকে বার বার প্রশ্ন করে। নিজের সমস্ত অভ্যাস কিংবা চর্চার বাইরে আজ তার অবস্থান। সব সংস্কৃতি কৃতবিদ্যা কিংবা আচারের বাইরে বার বার চোখ চলে যায় ওই বার্তার ওপর যা মনস্বিতা কখনো করেনি। কোনেদিন এই দীনতা তার চারিত্রিক নয়।
-আই লাভ ইউ ট্যু।
ভাবনটা থেকে যতই বের হতে চায়। পারে না। নিজের মনে বলে বারবার, ‘লাভ ইউ ট্যু?’ তার মানে আগে ফারুক লিখেছিল ‘আই লাভ ইউ?’। না হলে লাভ ইউ ট্যু আসে কী করে? এই ফারুক? চিরকাল যাকে গোঁয়াড় একরোখা অথচ সরল জেনে এসেছে মনস্বিতা। সে এক নারীকে ভালোবেসে অন্য নারীর শরীরে খোঁজে শরীরী সুখ! মন এক জায়গায়। দেহ অন্য কোনোখানে! ছিঃ। এত বেদনা কেন উছলে উঠছে আজ বুকের গভীর থেকে। কেনই তার দারুণ প্রপাত এই প্রভাতে। এই ফারুককেই তো কিছুক্ষণ আগে দুহাতে সরিয়েছে নিজের গায়েও ওপর থেকে। অনেক বিভ্রান্তি আর অপচয়ের জীবনেও তো সে ছায়া দিয়ে চলেছে ফারুককেই। কোথাও কোনো এক গভীর গিরিখাদের নিচ দিয়ে তো এখনো যে সংকীর্ণ ফল্গুধারা প্রবহমান সে তো ভালোবাসা নামেই পরিচিত? আর কিছু কী নাম দেয়া সম্ভব এর? কিন্ত ফারুক তবে অন্য কোথাও অন্য কারো কাছে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছে? না জেনেই কখন যেন চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে ভিজে গেছে বুকের আঁচল মনস্বিতার। টের পায়নি। তবু উঠে দাঁড়ায়। ফোনটা দিতে যায় অন্য ঘরে। সেখানে অপেক্ষা করছে আরও এক বিস্ময়।
-হ্যাঁ, আপনি কী তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্র্তী? হ্যাঁ। আচ্ছা। আচ্ছা। আমি একটু আপনার সাথে দেখা করতে চাই। কখন আপনার সময় হবে যদি একটু জানান। ও আচ্ছা। আচ্ছা। ঠিক আছে। আমি ঠিক সময় পৌঁছে যাব।
কথা শেষ করেই পেছনে ফিরে দেখে মনস্বিতা দাঁড়িয়ে আছে। তবু তার কোনো বিকার নেই। মনস্বিতা শোনা কথাগুলো নিয়ে আগে বাড়ে না। হাতের ফোনটা এগিয়ে ধরে বলে :
-তোমার একটা ম্যাসেজ এসেছে।
ফারুকের চোখে এই মুহূর্তে খানিক বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকে মনস্বিতার দিকে। সেদিকে মনস্বিতার কোনোই খেয়াল নেই। আবার বলে :
-আই লাভ ইউ ট্যু। পড়ে দেখ।
ফারুকের মনস্তাপ নেই কোনোই।
-তুমি আমার ম্যাসেজ পড়েছ?
-দেখো। তোমার পাসওয়ার্ড দেয়া আছে। ওপেন করতে পারিনি।
-তাহলে তুমি জানলে কী করে?
-মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখ। আরও হয়তো কথা আছে। বাইরে থেকে যতটুকু দেখা যায় আমি ততটুকুই দেখেছি। মনস্বিতা উচ্চারণ করে :
-আই লাভ ইউ ট্যু।
মনস্বিতা চলে যায়। নিজের উপর খুব রাগ হয় ফারুকের। কী কুক্ষণে যে গতরাতে গেছিল মনস্বিতার কাছে। তাতেই যত বিপত্তি ঘটে গেল। দ্বিতীয়বার মনস্বিতার মুখে বলা ‘আই লাভ ইউ ট্যু’ কথাটা কেমন যেন তার গালে ঠাস করে বসিয়ে দেয়া একটা চড়ের মতো লাগলো আজ ফারুকের।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ৩৭

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-30/