শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪১]

0
274

পর্ব ৪১

একসময়ের কারাতে ব্ল্যাকব্লেল্ট ফারুক। তার ঝরঝরে সুঠাম মেদহীন দীর্ঘাঙ্গ যুবক শরীর। এমন একজন শক্তিশালী পুরুষের কারাতে কায়দায় মুচড়ে ধরা হাতের ব্যথা মনস্বিতাকে ক্ষণিকের জন্য চেতনারহিত করে দিয়েছিল। চিৎকার করে ওঠার শব্দটা তাই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছিল বাইরে। পৌঁছে গেছিল দোতালায় বাড়িওয়ালা আন্টি মিসেস সুরাইয়ার কান অবধি। তিনিই কী নেমে এলেন নিচে?
-মনস্বিতা? মনস্বিতা? ফারুক? এই ফারুক? বেটা? দরজা খোলো। দরজা খোলো বেটা। কি হয়েছে? চিৎকার শুনলাম? তোমরা কী ঝগড়াঝাটি করছ? দরজা খোলো। দরজা খোলো বেটা?
দরজায় ধাক্কা আর একটানা কলিং বেলের শব্দ ফারুক-মনস্বিতার ছোট্ট ড্রইংরূমটা পার হয়ে সোজা বেডরুমে পৌঁছে যাওয়াতে অকারণ রাগে অন্ধ হয়ে পড়া ফারুক হঠাৎ বাস্তবে ফিরে আসে। থেমে যায় তার হাত। নেমে আসে মনস্বিতার বুকের ওপর থেকে। বালিশটা অমনি পড়ে থাকে মনস্বিতার নাকমুখের ওপর। ঘটনার আকস্মিকতায় মনস্বিতা বুঝতে পারে না কিছুই। হঠাৎ সবকিছু কেমন ভারশূন্য মনে হতে থাকে। একঝলক ঠান্ডা ইপ্সিত বাতাস যেন ঢুকে যায় নাক-মুখ দিয়ে বুকের ভেতর। গলায় আটকে থাকা শেষ প্রশ্বাসটুকু নেবার মুহূর্তে মনস্বিতা বুঝতে পারে না মৃত্যুর গাঢ় অন্ধকারটা হঠাৎ থেমে গেল কেন! সাথে সাথে থেমে গেল চির পুরাতন প্রিয়তম সুন্দর আর মিষ্টিমধুর একটি ডাক! একটি শব্দ! একটি আলোর ঝলক! হঠাৎ কোথা হতে থেকে থেকে আসে ওই আলোটি! মনস্বিতার জীবনের কালো আর অন্ধকারগুলোকে দুহাতে সরিয়ে দিয়ে এক অদ্ভুত রশ্মি ছড়িয়ে দিয়ে চলে যায় আবার কোন গহনে! ওই অতটুকু আলোর রশ্মিতে পথ চেয়ে চেয়ে চলতে থাকে মনস্বিতা গভীর থেকে গভীর অন্ধকারে বার বার। কোনো অভাব কোনো অভিযোগ আর তখন মুখ্য হয়ে ওঠে না তার কাছে। এর চেয়েও মধুর কী হতে পারে কোনো পাখির ডাক! মায়ের আদুরে আহ্বান। কিংবা প্রিয়তর আর কোনো মধুশব্দ কী রয়েছে এই পৃথিবীর কোথাও যা মনস্বিতাকে আলো দিতে পারে! মায়া দিতে পারে! ছায়াও দিতে পারে! বরং এমন মধুর ডাক শুনতে শুনতে মৃত্যুও পরমপ্রিয়তর হয়ে উঠতে পারে। এই মুহূর্তে মনস্বিতার তাই মনে হয়। এই ঘন অন্ধকারের পাশবিক আস্ফালনের কাছে পরাজয় স্বীকার করে মৃত্যুকে এতটা কাছে টেনে নিতে এতটুকু বাঁধেনি আজ মনস্বিতার। কী আছে এ ছাড়া আর তার এ ছো্ট তুচ্ছ জীবনে! কাকে বলে প্রেম! কাকে বলে ভালোবাসা! কত যে বীভৎস এখানে জীবনের রূপ কে জানে তার মতো করে! তবু মনস্বিতা প্রতি মুহূর্তে নতুন করে জন্ম নেয়। নতুন আলোর জানালা খোলে। নিজের জন্য একাকী নতুন করে ভালোবাসার পশরা সাজায়। এটা হারায় তো ওটা খুঁজে নেয়। এটা পায়নি তো ওটা নিয়ে খুশি হয়ে যেতে চেষ্টা করে। এক মহাশূন্যর অতল গহ্বর থেকে উঠে আসতে চেষ্টা করে সে খড়কুটোকে ধরেই। তবু তো কিছুটা চাই! তাই গাঢ় অন্ধকারে মৃত কন্যার মুখ দেখে দেখে শান্ততার চর্চা করে নিয়ত। কিন্তু কেন যে হঠাৎই থেমে গেল চারপাশের এই অদ্ভুত অষ্পষ্ট প্রলয়! ধীরে ধীরে কানে বেজে ওঠে দূর থেকে কারো প্রিয় ডাক।
-মনস্বিতা দরজা খোল। দরজা খোল।
ততক্ষণে ফারুক নেমে গেছে। মনস্বিতা বাড়িওয়ালা আন্টির কণ্ঠ চিনতে পারে। আর সাথে সাথে ভীষণ লজ্জায় অপমানে আরো বেশি কুঁকড়ে যেতে থাকে। কী বলবে তাকে! কী করে দেখাবে এই মুখ! সংসারে স্বামী স্ত্রীর ঝগড়া যখন খণ্ড প্রলয়ে গড়ায় আর তার রেশ পৌঁছে যায় প্রতিবেশির কান অবধি, এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে! আজীবনের শিক্ষা রুচি আর পারিবারিক আভিজাত্য যেন আজ তার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়ায়। ঠিক এ জায়গাটায় কখনো সে ভাবতে পারে না নিজেকে। লুকোনোর আজ আর জায়গা খুঁজে পায় না। ফারুকের খানিকটা বোধদয় হয়। দরজাটা না খুলেও পারে না। আন্টি একটানা দরজা ধাক্কা দিয়ে চলেছেন। বরাবার বাড়িওয়ালার ভাড়ার জন্য এসে দাঁড়ালে কিংবা দোকানদার বাকির জন্য তাগাদা দিলে মনস্বিতাকেই যে দাঁড় করায় সবের সামনে আজ আর ফারুক মনস্বিতাকে দরজা খুলতে বাধ্য করে না। নিজেই খুলে দেয়। আন্টি ঘরে ঢুকে কোনো ভনিতা না করেই জানতে চান :
-কী হয়েছে বেটা? মনস্বিতাকে তুমি মেরেছ?
ফারুকের মাথা নিচু হয়। এমন মৃদুস্বরে মিথ্যে কথা বলে মনস্বিতা আশ্চর্য হয়।
-না।
-তবে?
-তাকেই জিজ্ঞেস করুন।
নিজেকে কোনোমতে আড়াল করে মনস্বিতার ওপর সব ছেড়ে দিয়ে। ফারুকের এই ডিপ্লোমেসি চিরকালের। যে কাজের জন্য দায় এড়ানো যায় না কিছুতেই তার উত্তর সে নিজে কখনো করে না। পিছল স্বভাব তার। এমনভাবে মনস্বিতার ওপর দায়িত্ব চড়িয়ে দেবে, যে-কেউ ভাববে মনস্বিতার সব দোষ। এবারেও তার কোনো ভিন্নতা ঘটেনা। বাড়িওয়ালা আন্টি ওদের দুজনকেই ভালোবাসেন। অন্য আর দশটা ভাড়াটে বাড়িওয়ালার মতো সম্পর্ক নয় ওদের আন্টির সাথে। আঙ্কেল আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে গণিত পড়াতেন। রিটায়ার করার পর দেশে ফিরে এই বাড়িটা করেছেন। ছেলে মেয়ে তিনজন দেশের বাইরে পড়ালেখা পরে বিদেশেই সেটেল্ড। সারাজীবন দেশের বাইরে কাটিয়ে দেশের লোকজনের সাথে মানসিকতার কেমন একটা বড় দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে আন্টির। সবার সাথে মেলে না তার। বাইরে ভীষণ কঠিন অথচ ভেতরে নরম এই মানুষটিকে মনস্বিতা বেশ বুঝতে পারে। মনস্বিতার সাথে সরাসরি তার সাংসারিক বিষয়ে কথা না হলেও এতটুকু তার বুঝতে অসুবিধে হয় না যে মনস্বিতার কীভাবে সংসারের হাল ধরে রেখেছে। ভীষণ ভালোবাসেন তিনি মনস্বিতাকে। প্রায়ই ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন :
-এটা আমার আর এক বেটি।
বুড়ো-বুড়ি একা। তাই মনস্বিতার ছুটির দিনের কিংবা বিকেলের অবসরের অনেকটা সময় কাটে আন্টির সাথে। গল্পে গল্পে। ফারুকের উদাসীনতা সংসারের ছোটখাটো বাকবিতণ্ডা তিনি যে টের পান না তা নয়। কিন্তু মনস্বিতার মুখে কখনো ফারুকের কোনো দোষ শুনতে পাননি বলে তিনি এটাকে তেমন করে ধরেন না। ফারুক কি বলল তা না শুনেই আন্টি মনস্বিতা মনস্বিতা ডাকতে ডাকতে ভেতরে ঢুকে পড়েন। মনস্বিতা তখন নিজেকে লুকোতে ঢুকে পড়েছে স্নানঘরে। পৃথিবীর কোনো ক্লেদ আজ আর গায়ে মাখতে ইচ্ছে হয় না। সন্ধেরাতের আলোয় ঝর্ণাটা খুলে দিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে তার নিচে। জল ঝরে। জল ঝরে। জল ঝরে পড়ে মাথায় মুখে। চোখের পাতার জল সব ধুয়ে-মুছে যায় একলা নীরবে নৈঃসঙ্গ্যে। কিন্তু তাতে কী শীতল হবে চেতনার তুখোড় প্রখর অলিগলিগুলো! দিনে দিনে জমে স্তূপীকৃত হয়ে উঠেছে যে অভিমানের অজস্র শবাধার। সৎকারের ব্যবস্থা হয়নি কোনোকালে। শুরু হয়েছে ধ্বসে পড়া, ক্ষয়ে যাওয়া, দুর্গন্ধ ছড়ানো। আজ আর এসবকে অভিমান বলা চলে না। সব অভিমানগুলো দিনে দিনে রাগ অপমানে স্খলিত হয়ে পড়ছে। কবে যেন যুদ্ধবাজরূপে করে বসবে আত্মপ্রকাশ। মনস্বিতা এই ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। এত ঝড় এত অপমান এত বিক্ষুব্ধ চরাচরে বসেও জোড়া দিতে চায় শতচ্ছিন্ন আকাশ। পারবে কি? মনে পড়ে বিয়ের দিন, বাবারবাড়ি ছেড়ে আসবার সময় বড় খালা বলেছিলেন :
-মনে রেখ, আমাদের পরিবারে ছাড়াছাড়ি হয় না। সংসার বুদ্ধি করে চলার জায়গা। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর আর সেটা প্রবল আবেগের জায়গা থাকেনা। কেবল আত্মত্যাগ আর সংগ্রামের জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিনিয়ত সংগ্রাম। একজন মানুষের সাথে সুদীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকার ক্লান্তি ও একঘেয়েমিকে স্বীকার করে চলাটাই সংসার, মেনে নেয়াটাই জয়।
সাথে মা যোগ করেছিলেন :
-তোমার সংসারের বুদ্ধি তোমার নিজের কাছে। কখনো মনে করো না তোমার সংসারে মা বাবার কোনো বুদ্ধি পরামর্শ নিয়ে চলবে। যার যার সংসারের ধর্ম তার তার। বাবা মা হলেও সন্তানের সংসারে কথা বলবার মতো লোক কিন্তু আমি কিংবা তোমার বাবা নই। তাই বুঝে চলবে। তোমার সংসারের সকল সিদ্ধান্ত নিতে হবে একাই তোমার।
সেদিন মাথা নীচু করে বড়দের কথাগুলো শুনে নিজের ঘরের পথে পা বাড়িয়েছিল মনস্বিতা। পথিমধ্যে তুমুল বৃষ্টি। জুলাই মাসের তীব্র গরমের মধ্যে গায়ে অত গহনা আর ভারি বেনারসি শাড়িতে দম আটকে আসছিল মনস্বিতার। কে একজন বলে উঠেছিল :
-বিয়ের দিনে বৃষ্টি নেমেছে। বরবধূ খুব সুখী হবে।
ধুমল বৃষ্টিতে প্রশান্ত হয়ে এসেছিল বিবাহ নামক একটি ভীষণ বিরক্তিকর উৎসবে পরিশ্রান্ত শরীর। ফারুক জানতো মনস্বিতার বৃষ্টি পছন্দ। তাই গাড়ির জানালা খুলে দিয়েছিল। ভিজে যাচ্ছিল বেনারসি শাড়ির আঁচল। তবু ভালোলাগছিল বৃষ্টি। নিকানো জলের কণা সারাদিনের অবিশ্রান্ত ক্লান্তিকে একটু একটু করে ধুয়ে-‍মুছে সতেজ মনস্বিতাকে নিয়ে গেছিল নিজের সংসারে। কথাগুলো মনে পড়তেই দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জল। সমাজ সংসার বন্ধন ভালোবাসা ইতিহাস আর ঐতিহ্যের সুতোগুলো কেমন যেন অক্টোপাসের মতো আটকে ফেলছে মনস্বিতাকে চারপাশ থেকে। কেবল বাবার মুখ চোখে ভাসে। মায়ের কথা, বড় খালার কথাগুলো মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে খেতে একসময় গভীর হয়ে গেড়ে বসেছে কোনো এক ফাঁকে, বুঝতে পারেনি। স্নানঘরের এই সংকীর্ণ তীব্র নিঃসঙ্গতায় ফারুকের অকারণ আগ্রাসন মনস্বিতাকে বর্ষার ফলার মতো বিদ্ধ করে চলে। হৃদয় ছিঁড়েখুঁড়ে রক্তস্নান চলে অবিরাম আর ঝর্ণার শীতল জলে ধুয়ে যায় সব রক্তের দাগ। কৃত্রিম জলপ্রপাতের অবিশ্রান্ত শব্দে মূক হয় থাকে কান্নার বিষাক্ত চিৎকার।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব ৪০

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-33/