শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪২]

0
285

পর্ব ৪২

একটা বিধ্বস্ত রাত। বিষণ্ন বেদনার চাপা ক্ষোভ। একজন ব্যক্তিমানসের প্রচণ্ডতম অপমান। একজন দুর্বল ব্যক্তিত্বের স্বামী। উদাসী দায়িত্বজ্ঞানহীন পরগাছা পুরুষ। একটি ভাঙাচোরা সংসার। তবু কিছু আশা। স্বপ্ন। পুরোনোকে ধুয়ে-মুছে পরিশুদ্ধ করে গড়ে তোলার আনন্দ। কিছু আভিজাত্য। কিছু প্রত্যাশা। আজন্ম মজ্জাগত কিছু রীতিসিদ্ধ প্রকরণ কোনটা্কেই দুহাতে ঠেলে সরাতে পারে না মনস্বিতা। যে স্বপ্ন নিয়ে সংসার করতে এসেছিল তার প্রায় সবই এখন ধ্বংসস্তূপ। কেউ জানে না। কাউকে বলা যায় না এসব কথা। প্রথম প্রেমের ব্যর্থ মনোযাতনা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য একের পর চাপ। ঢাকা শহরের ই্ট কাঠ দালানের ভেতর একা একা একজন নারীর দিনরাত্রি যাপন মেনে নিতে পারেনি এ সমাজ। বাবা মা আত্মীয় কেউই। নিজেদের দুশ্চিন্তাগুলোকে মাথার ভেতর থেকে প্রবলভাবে ঠেলে বের করে দেবার একমাত্র সমাধান তখন মনস্বিতাকে বিয়ে দেয়া। তাই তখন বিয়ের জন্য ভীষণ তোলপাড় শুরু হয়ে গেল। মা রাতে ঘুমোতে পারেন না। তরুণী অবিবাহিতা কন্যা মনস্বিতা একা ঘুমিয়ে আছে ছাদের চিলেকোঠায়, এ কথা ভেবে রাতের পর রাত তিনি নির্ঘুম কাটিয়ে দেন। বাবার দুশ্চিন্তা। সবকিছু কেমন বিমর্ষ করে তোলে মনস্বিতার যাপিত জীবন। স্বাধীনতার আনন্দ উপভোগের শুরু হতে না হতেই নির্মম এক মহাযাতনার আগ্রাসন নিরবে গ্রাস করে চলেছিল সেইসব দিনগুলোতে মনস্বিতাকে। ভীষণ তোলপাড় চলছে মনস্বিতার বাড়িতে।
কবির সাথে প্রেমের শুরুটাও ছিল অদ্ভুত। কখন যে একজন আরেকজনকে প্রগাঢ় ভালোবেসে ফেলেছিল তা দুজনের কেউই জানতো না। তুখোর রাজনীতিবিদ আর দেশসেবী মানসিকতার কবিকে সে নিজেও ঘরসংসারের শৃ্ঙ্খলে আটকাবে এতটা হীনচিন্তা মনস্বিতার দ্বারা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কি করবে সে? একটি মেয়ে ছটি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের আবসিক হলে একা একা দিন কাটিয়ে দিল। আজ প্রাচীরের বাইরে বের হতেই তার নিরাপত্তা গেল ভেস্তে। তার চারিত্রিক শুদ্ধতা হয়ে পড়লো প্রশ্নবিদ্ধ। তার চলাফেরা আচার আচরণ হয়ে দাঁড়ালো সাধারণের আলোচনা আর গবেষণার মুখোরোচক বিষয়। আর এরই সামাধান বিয়ে! অদ্ভুত এই সমাজ, এই প্রথা, ধর্মাধর্মের ক্ষুরধার অজানিত শৃঙ্খল কিছুই মেনে নিতে পারে না মনস্বিতা। একজন  পুরুষের হাতে সমর্পণ করতে পারলেই নারীর সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বিধান হয়। এ সমাজ তাই জানে ও মানে। তার বাবা মা বড় ভাই-বোনেরাও এর বাইরে নয়। তবু বড় ভাইয়ের পছন্দ করা পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুকে বিয়ে করা সম্ভব হয়নি মনস্বিতার। আমেরিকার সিটিজেন, নিউ জার্সি কিংবা কানাডার মনট্রিলে গাড়ি-বাড়িওয়ালা বাংলাদেশী উচ্চশিক্ষিত, বিদেশী সংস্কৃতির সাথে মিলে-মিশে একাকার উন্নত দেশের নাগরিকত্বধারী একটি ছেলে তার জীবনসঙ্গী- নিজেকে এমন ভাবতে হাসি পেত মনস্বিতার।
চারপাশে মেশিনের মতো কিছু মানুষের কথা ভাবলেই কবিতা পড়ার প্রহরগুলোর চোখে বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কান্নার জল। এরা প্রবলভাবে মনস্বিতাকে বাধা দিয়েছিল। অবসরে প্রতিবেশী কিংবা বন্ধুবান্ধবের সাথে প্রয়োজনহীন প্রস্তুতিহীন গল্পগুজব, মায়ের ভাষায় প্রাণখোলা বাঁধনহারা কথাবলার পরিসীম আনন্দহীন ভবিষ্যতের এমনতর যাপিত দিনরাত্রির কথা ভাবলে দমবন্ধ হয়ে আসতো। কিন্তু মায়ের উদ্বিগ্ন কান্নার জলগুলোও তার বুকের গভীরে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরতো অবিশ্রান্ত ধারাপাতে। বাবার বিষণ্ন ব্যথাতুর মুখটি ভাবতে গেলেই বিষণ্নতা ভর করতো। কী করবে মনস্বিতা? যন্ত্রণাকাতর প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠেছিল উদভ্রান্ত। না করতে পারছিল কোনো কাজ, না করতে পারছিল চাকরিটা মন দিয়ে। বাড়ি ফিরতে সন্ধে হলেই এমনকি বাড়ির দারোয়ানটিও চোখেমুখে এমন কৌতুহলী দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতো যে মনস্বিতার সকল সততা পরিশ্রম প্রতিনিয়ত যেখানে এসে মিশে যেত ঘোলাজলে, এক একটি দিনের শেষে।
তারপর এই ঘর এই সংসার। প্রাণপাত করেও যে সংসারের খুঁটি ধরে রেখেছে সে আজও। কিন্তু ভীষণ বুঝতে পারে, যে-কোনো সময় যে-কোনো ঘটনায় খুঁটিটি উপড়ে পড়ে যেতে পারে। শেকড়হীন হয়ে উঠতে পারে তার জীবন। কিন্তু তাই বলে কী এভাবে দিনের পর দিন তুচ্ছতায় অবমাননার ক্লেদ বয়ে বেড়াবে সে শরীরে! আর মন? কেন যে সে আজও নিজের মনের ইচ্ছেটা বুঝতেই পারছে না! কী আছে এর শেষে! ফারুক কী কখনো মানুষ হয়ে উঠবে আবার! আর সেদিন কী সে মূল্যায়ন করবে মনস্বিতার উৎসর্গীকৃত জীবনের দাম!
-হা হা হা।
অন্য ঘরে হঠাৎ সন্ধ্যাগত রাতের নিরবতা ভেঙে ফেলা হাসিটি ফারুকের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত আশঙ্কার বীজ রোপন করতে শুরু করে। এই প্রথম ফারুকের মনে হয় মনস্বিতা নিজেকে, নাকি তাকেই তাচ্ছিল্য করতে শিখে গেছে! বসার ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেখে মনস্বিতাকে। মনস্বিতা নিচু হয়ে কিছু একটা গোছাচ্ছে বিছানার ওপর। বুঝতে পারে নিজের অজান্তেই দিগ্বিদিক উৎকণ্ঠিত করে হেসে উঠেছে মনস্বিতা। ছুঁড়ে দেয়া বালিশ উল্টোপাল্টা বিছানার চাদর ঠিক অমনি পড়ে রয়েছে। মনস্বিতা যা কখনো রাখে না তাচ্ছিল্যেও। যত তাড়াহুড়ো থাক, যত কাজের চাপ থাকুক, বিছানা থেকে নামার আগেই গোছানো তার অভ্যেস। ঘুম ভাঙতে দেরি হলে খুব তাড়াহুড়োয় কখনো যদি অফিসে বের হয়ে যেতে হয়, তাহলে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যায় ঠিক অমনি অগোছালো বিছানা দেখলে ফারুকের ওপর যত রাগ হয়েছে কিংবা কথা বলেছে মনস্বিতা তত কথা কোনোদিন একটা শাড়ি কিংবা গয়নার জন্য বলেনি মনস্বিতা। আজ ওই বিছানাটাকে অগোছালো ঝড়ের তাণ্ডবে বিধ্বস্ত অবস্থায় রেখেই তার ওপর উপুর হয়ে কি ব্যাগ গোছাচ্ছে মনস্বিতা! ফারুকের মনের ভেতর কোথায় যেন কী এক শঙ্কা জেগে ওঠে। আগে কখনো এরকম হলে মনস্বিতাকে ব্যাগ গোছাতে দেখেনি। ব্যাগ কেন, ঝগড়া হলেও কিংবা মার খেলেও বাড়ি থেকে বের হবার কোনো প্রবণতা ফারুক কোনোদিন মনস্বিতার মধ্যে দেখেনি। তাই রাগ চরমে উঠলেই মনস্বিতার ওপর হাত তুলতে কিংবা মাত্রাছাড়া তীব্র শারীরিক আঘাত করতেও দুবার ভাবেনি। ফারুক জানে মনস্বিতা মরে গেলেও মা বাবা ভাই বোন কিংবা ভাবীকে এসব কথা বলবেনা। এমনকি কোনো বন্ধুকেও না। আবার ঘরে উঁকি দেয় ফারুক। পেছন থেকে দেখা যায় যতটুকু, ব্লাউজের উন্মুক্ত অনাবৃত অংশ ভেজা চুলে ঢাকা। এখনও পিঠে ছড়ানো একঢাল খোলা চুলের নিচে টুপটাপ ঝরে পড়ছে স্নানের জল। ভিজে উঠছে শুকনো শাড়ির অংশবিশেষ।
রাত প্রায় দশটা বাজতে চলল। এসময় কোথায় যাবে ও! মনস্বিতা একজন তেজস্বী নারী। এই তেজের দাপট রুদ্র হলেও ধীর প্রজ্ঞায় সংহত। নিজের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। এটাই তাকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে রাখে। মনস্বিতা সাধারণের আধিপত্য মেনে নেবার মেয়ে নয়। একমাত্র ভালোবাসা আর সত্যাসত্য বাস্তবতা দিয়েই কেনা যায় ওর মন। নিজের দীনতা অপমান তার ওপর অন্যের আধিপত্য কিংবা আস্ফালন মনস্বিতা মেনে নিক, না নিক, কাউকে জানতে দিতে নারাজ। একথা ফারুক অস্বীকার করতে পারে না। অপরদিকে ফারুক শর্টটেম্পার্ড একজন মানুষ। খুব সহজেই তার হাত ওঠে মনস্বিতার ওপর। তবু মনস্বিতার চোখের চাহনি কিংবা তীর্যক বাকভঙ্গি ফারুককে ভর্ৎসনা করেছে বরাবর। কিন্তু তার কণ্ঠ বাড়ির বাইরে বের হয়নি কখনো আগে। তার পা বাইরে বের হয়নি কখনো আগে। তার অহংবোধের মাত্রা অসীমে বিরাজ করে। তার ধৈর্যর প্রাবল্য যে-কোনো সাধারণের সহনীয় মাত্রাকে অতিক্রম করে যেতে পারে। এতটাই সহনশীল সে। নিজের বন্ধুদের জীবনে দেখেছে হাত খরচের টাকা কিংবা দামী শাড়ি গয়না কিনে দিতে পারে না বলে বউ ছেড়ে চলে গেছে। সম্পদশালী অন্য কাউকে জীবনসঙ্গী করে সুখী হয়েছে নারী। কিন্তু মনস্বিতা স্বস্তা নয় অতটা। সম্পদে তুষ্ট করা তাকে অসম্ভব। মনস্বিতাকে এতটাই জানে ফারুক। কিন্তু কোথায় যেন এক করাল সামন্তপ্রভু তার মনের ভেতর বাস করে। এত লেখাপড়া। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সহযোগ কিংবা নানা ধরনের মানুষের সাথে মিশেও ফারুক বদলাতে পারেনি নিজের একরোখা তীব্র প্রভুত্বকামী মনকে। আজন্মকাল ধরে পুরুষালি দৌরাত্মকেই সে প্রাধান্য দিয়েছে সবার আগে। তা্ই নারী, সে স্ত্রী হোক আর সন্তানের মা, তার সাথে সমানাবস্থান সে মেনে নিতে পারে না। কিন্তু নিজের স্বভাব-চরিত্রের এই নেগেটিভ দিকগুলোর কারণে সে নিন্দিত এবং অবহেলিত, কখনো কখনো ধিকৃত হয়েছে। এর সবই তার কর্মক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলেছে। নিজের ক্যারিয়ার থেকে অনেক অনেক পেছনে দূরে ছিটকে পড়েছে। হয়তো ধীরে ধীরে সে বিমর্ষ বিধ্বস্ত। জীবনের আনন্দ-বেদনা থেকে বহুদূরে এক অদ্ভুত কুয়াশালোকে বিরাজ করছে। বাবা মায়ের সাথে তার সম্পর্ক ভালো নয়। বোনের বাড়িতে যেতে চায় না। আত্মীয় পরিজনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ থেকে বিরত। কেবল পড়ে থাকে মনস্বিতার পেছনে। আজকাল মনস্বিতার ছোটখাটো ত্রুটি ধরে সংসারে তার দান কিংবা আত্মত্যাগের সীমানাটাকে সে ছোট কিংবা তুচ্ছ করে দিতে চায়। এ এক অদ্ভুত যুদ্ধ। অজানা শত্রুতা।
মনস্বিতার ব্যাগ গোছানো হয়ে গেছে। এখানে আর নয়। সে নিজের ঘর থেকে বাইরের ঘরে আসে। ফারুক সোফাটায় বসে অপেক্ষা করে, এই বুঝি ফিরে আবার ব্যাগটা ফেলে দিয়ে রান্না ঘরে ঢুকে পড়বে। কিন্তু না। মনস্বিতা দীর্ঘ পা ফেলে ফেলে ড্রইং রূমটা অতিক্রম  করে বাইরের দরজাটার দিকে এগোয়। তখনো ফারুকের প্রত্যাশা মনস্বিতা নিজেই ফিরবে। তাকে থামানোটা ঠিক তার পৌরুষের সাথে যায় না। মনস্বিতা দরজা খোলে। কোনদিকে তাকায় না। বাইরে পা ফেলে। ঠিক বাইরে পা দেবার শেষ মুহূর্তে ফারুক বলে ওঠে :
-ঠিক হচ্ছে না। মনস্বিতা একদম ঠিক হচ্ছে না।
তার কণ্ঠে কোনো আকুতি নেই, প্রেম নেই, মায়ার আচ্ছাদনও টের পায় না মনস্বিতা। তাই ফিরে তাকায় না। তার উত্তেজনার মাত্রা খুব পরিশীলিত। কথা নেই কোনো। ভেতরের আগ্নেয়গিরির প্রচণ্ড উত্তাপ পুড়ে ছারখার করছে যখন সামগ্রিক ব্যক্তিমানসকে, যখন সমস্ত বাস্তবিক নষ্টামী, তুচ্ছতা আর কৃপণতার জরাজীর্ণ পথটাকে মাড়িয়ে চলে যেতেও তাকে পথরোধ করে দাঁড়াচ্ছে পারিবারিক মূল্যবোধ, তখনও পৃথিবী শান্ত সমাহিত। বাইরে ঠান্ডা শীতল তার অনুভব। তবু ভীষণ মানুষ এখনো মনস্বিতা। এখনো পেছনে পড়ে রয়েছে শুভ স্মৃতিগুলোর অদ্ভুত জড়োয়া প্রগলভতা, যদিও তা এই ক্লেদাক্ত জীবনের পরতে পরতে যত দুঃখ যত অপমান যত কান্না, সেসবের তুলনায় যৎসামান্য। যৎকিঞ্চিত। তাই তার হাঁটার ভঙ্গিতে নেই ত্রস্তভাব। তবু পেছনে কাউকে সে যেন প্রত্যাশা করে। এই বুঝি সে পেছনে ছুটে এসে দাঁড়ালো। এই বুঝি দুহাতে জড়িয়ে ধরে বলল :
-চলে যেওনা। প্লিজ, ফিরে চলো বাড়িতে। আর কখনো এমন হবে না।
রাত প্রায় সাড়ে এগারো। চারপাশেল বাড়িগুলোতে এখনো তুখোড় আলো। নাইট ইজ স্টিল ইয়াং। ল্যাগেজটা নিয়ে গলির মোড় অবধি একলাই অলস হাঁটে। পেছনে কেউ যদি আসে! যদি কেউ আসে তাকে ফেরাতে! তাহলে একবারেই তাকে ক্ষমা করে দেবে মনস্বিতা। তবু কেউ কী আসে! রিক্সা দু-একটা যাবে কি-না, জানতে চেয়েছিল, তাদের না করে দিয়েছে। রিক্সা নিয়ে কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে? ফারুক যদি ওকে খুঁজতে নামে তবে হয়তো গলির মোড়টা অবধি যেতে যেতে খুঁজে পাবে। রিক্সায় উঠে গেলে আর তাকে পাবে না ফারুক। এই তো প্রায় মধ্যরাত। মেইনরোডের কিনারটাতে দাঁড়িয়ে থাকে মনস্বিতা। ভাবে। বাড়ি ফিরে যাবে? মায়ের কাছে? মায়ের মুখটা যেমন বিষণ্ণ আর অপমানে জীর্ণ দেখা যাবে, সইতে পারবে তো মনস্বিতা! হয়তো চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল আঁচলে মুছতে মুছতে বলবেন :
-এভাবে কলঙ্ক এঁকে দিলে তুমি আমাদের মুখে?
ভাইয়ের বাড়ি যাবে? ভাবীর চেয়ে আর এক ডিগ্রি উঁচুগলায় বড় ভাই বলবে :
-মা, বলেছিলাম কিনা। যেদিন একা থাকতে গেছিল, সেদিনই বলেছিলাম এ মেয়ে পরিবারের মুখে চুনকালি দেবে।
সত্যের কাছাকাছি কাল্পনিক বাক্যগুলো বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে। আর তাতে ক্ষত-বিক্ষত রক্তাক্ত পাণ্ডুর হতে থাকে মনস্বিতা নামের একজন মানুষ। পেছনে কেউ আসেনি তখনো। কে আছে যে তাকে ফিরিয়ে নেবে!
মনস্বিতা ফিরে আসছে না দেখে অবশেষে ফারুক বের হবে যখন স্থির করে, তখন সবার আগে তার মনে পড়ে জুতো জোড়ার কথা। খুব যত্ন করে জুতো মোছে। একটা মোজা পায়ে লাগিয়েছে, আরেকটা মোজা পায়ে গলানোর মুহূর্তে বেল বাজে। উৎকর্ণ ফারুক। দুই সেকেন্ডের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে দরজায়। দরজাটা খুলেই দেখতে পায় মনস্বিতা অধোবদনে নির্বাক দাঁড়িয়ে। সরে দাঁড়ায়। জায়গা করে দেয় ভেতরে ঢুকবার। অপমানিত মনস্বিতা নিজের ঘরে ঢুকে ব্যাগের কাপড়গুলো ধীরে ধীরে বের করতে শুরু করে। মধ্যরাত তখন দূরাগত। পেছনে পিশাচের অট্টহাস্যে তোলপাড় রাতের নিরবতা ভেঙে পড়ছে আশ্লেষে তুমুল :
-হা হা হা। ধ্যাত্তেরি ছাই জুতো-মোজা।
পায়ের মোজোটা খুলে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে প্রক্ষিপ্ত বাক্যে নিজেকে সগর্বে প্রবল প্রতাপশালী স্বামী ভেবে ততক্ষণে ফারুক পৃথিবীটাকে একটা গণগণে চুল্লির ভেতর দাহ করতে শুরু করে দিয়েছে।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব ৪১

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%B6%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A6%B2%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BF%E0%A6%A4%E0%A6%BE-%E0%A6%B8%E0%A6%AE%E0%A7%8D%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%95%E0%A6%9F-34/