শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪৩]

0
239

পর্ব ৪৩

এক অদ্ভুত নীরবতা ফারুকের মধ্যে। যদিও সে খুব খুশি আজ। সে চুড়ান্তভাবে বিজয় অর্জন করেছে। যখন রাত দশটায় বাড়ি থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল তখনো সে মনস্বিতার চরিত্রের একাগ্রতা আর কাঠিন্যে প্রতি বিশ্বাসী। সে জানে মনস্বিতা বাড়ি থেকে বের হচ্ছে মানে হল সে আর ফিরবে না। একলহমায় ভুলুণ্ঠিত হবে ফারুকের সামাজিক পারিবারিক সম্মান। পৃথিবীতে আর যা কিছু মেনে নিক ফারুক, বউ তাকে ফেলে গেছে, লোকে আঙুল তুলে দেখাবে তাকে – এহেন অপমান মেনে নিতে পারবে না। তাই অবশেষে বের হতে নিয়েছিল মনস্বিতাকে ফেরাতে। মনস্বিতা বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলে তার বন্ধু-বান্ধবরা সব জেনে যেত। লোকে তার দিকে আঙুল তুলতো। হয়তো এ যাবত নীরব থাকা তার শ্বশুরবাড়ির কেউ না কেউ কোনো না কোনো দোষে তাকে দোষী করতো। মনস্বিতা চাইলে নারী নির্যাতনের মামলাও করে বসতে পারতো। মনস্বিতা না চাইলেও ফারুকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে মা বাবা ভাই বোনেরা সব জেনে যাবার পর কেউ না কেউ তাকে বাধ্য কিংবা বোঝাতেও হয়তো পারতো। ফারুক জানে এ যাবত যা কিছু অপমান মনস্বিতার হয়েছে স্বামী সংসারে, সে দায়িত্ব ছিল তারই। অথচ মনস্বিতা সেই দায়িত্ব নিয়ে চলেছে। মনস্বিতা এটা করছে নীরবে। তার কোনো শেয়ার পৃথিবীতে কারো কাছে হয়নি। মা বোন ভাই ভাবী কিংবা বন্ধুর কাছে এসব বলে আর কাউকে না হোক নিজেকে সবার কাছে তুচ্ছ, অবহেলিত কিংবা অসম্মানিত করবে, এমন চরিত্র মনস্বিতার নয়। এটা জেনেই এতকাল সে নিশ্চিত আছে। আজ যখন এই গভীর হতে চলা রাতের অন্ধকারকেও ভয় না করে খুব ধীরগতিতে মনস্বিতা এক-পা দু-পা করে এগোচ্ছিল, তখন ফারুক ধৈর্য্য ধরে তার গতিকে লক্ষ করছিল। এই ধীরগতি তাকে বলে দিচ্ছিল মনস্বিতা হয়তো থেমে যাবে। কিন্তু না। যখন থামেনি মনস্বিতা, তখন একটি-দুটি করে ইট খসে পড়তে শুরু করে চিড় ধরতে শুরু করেছিল ফারুকের বিশ্বাসের ভীতটাতে। কিন্তু না, মধ্যরাত পার হতে না-হতেই ফিরে এসেছে ফারুকের সেই বিশ্বাসের প্রাবল্য। মনস্বিতা তাহলে ভয় পেয়েছে। মনস্বিতার যখন প্রচণ্ড মার খায় আর ঠিক পরদিন ভোরে জেগে তার আর নিজের জন্য নাস্তা বানিয়ে রেখে অফিসে চলে যায়, তখন ফারুক বুঝতে পারে মনস্বিতা ভীতু। সমাজ সংসার সর্বোপরি পারিবারিক মর্যাদা আর আত্মসম্মান দুটোকেই মনস্বিতা খুব ভয় করে। আজ যখন অপমানের মাত্রাটি তীব্র হয়ে গেছিল বাড়িওয়ালা আন্টি না চলে এলে কি-নাকি হয়ে যেত, এটাই নিশ্চিত মনস্বিতা ভেবেছে। তাতে সে তার নিজের জীবন নিয়েও হয়তো একটা শঙ্কায় পড়েছে। যে ভয় তাকে ভীত করে রেখেছিল তার চেয়েও প্রবল হয়ে উঠতে পারতো আজকের জীবনশঙ্কা। কিন্তু তবু আজ ফারুকের মনে প্রশ্ন জাগে, মনস্বিতা কি এতটা বোকা যে নিজের জীবনের বিনিময়ে সমাজ পরিবার কিংবা আত্মসম্মানকে বড় করে দেখবে! কিন্তু ফারুকের বিশ্বাস আজ প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল। মনস্বিতা মরে গেলেও সংসার ছেড়ে যাবে না কখনো। এই ভেবে নিজের কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার পরিবর্তে মনের ভেতর খুব একটা সুখ-সুখ আনন্দ অনুভব করতে থাকে ফারুক।
বাকি রাতটা অপমানের জ্বালায় সুতীব্র দহনে গনগনে এক চুল্লির ভেতর দিয়ে পার হয় মনস্বিতা। এমন কোনো কাজ এ জীবনে কখনো মনস্বিতা করেনি যা থেকে তার পিছিয়ে আসতে হয়েছে। নিজের ভেতর এই বীরভাব তার চিরকালের। জন্মগত। যে মায়ের সান্নিধ্যে তার চরিত্র গড়ে উঠেছে তিনি তেজী। তার কৈশোর আর যৌবনে প্রতাপের সাথে বাবার জমিদারি সামলেছেন সেই নারী। স্বামী সংসারে তাঁর সন্তানদের কে কে এসব গুণ- তেজ কিংবা ক্ষীপ্রতা ধারণ করতে পেরেছে, তা মনস্বিতা জানে না। কিন্তু মনস্বিতার ভেতর কিছু গুণ কিংবা দোষ তার প্রকট। মিথ্যের সাথে আপোষ নেই মনস্বিতার। সত্যপ্রকাশে সে মায়ের মতই নিঃসঙ্কোচ। মানবিক চারিত্রিক গুণেও সে সংহত। তাই মিথ্যেকে মিথ্যে জানার কিংবা সত্যকে পুরোপুরি রূপে সত্য হিসেবে জেনে যাবার প্রামাণ্য দলিল হাতে পাবার পরই বরাবর সে অ্যাকশনে যায়। এটাই তার চরিত্র। আর এই মানবিকতার পরম অবস্থানে আজ সে চরমভাবে অপমানিত। পর্যুদস্ত। লাঞ্ছিত। কী করবে সে?
-মনস্বিতা, এ-কী তোমার পরাজয়?
-হুম। অন্যায় জেনে মনস্বিতা যা ছেড়ে যায় সেখানে কখনো ফেরে না তুমি জানো না? আমি আজ বের হয়েছি এবং ফিরে এসেছি। এ নিশ্চিত পরাজয়।
-আচ্ছা সংসারে কী জয়-পরাজয় বলে কিছু থাকে?
-না। থাকে না। এতকাল তাই জানতাম। আসলে ভালোবাসায় জয়-পরাজয় কিছু থাকে না। সংসারে যদি ভালোবাসা থাকে সব সয়ে যায়। অভাব অনটন কিছু কালো অন্ধকার কিছু অস্থিরতা কিংবা কিছু বিপন্নতা ভালোবাসা নামক অদ্ভুত আলোটা সব ঢেকে দেয়।
-তোমার সংসারে কী ভালোবাসা নেই!
-আজ আমি নিশ্চিত এখানে ভালোবাসা নেই। আজ ফারুক যা করেছে তা ওর স্বভাবজাত। এটা মেনে নেওয়া আমার নিয়তি। দিনে দিনে এটা আমি তাই মেনে নিয়েছি। তারপরও ভালোবাসা থাকলে ফারুক আর যাই হোক আমাকে ফেরাতে যেত।
-সে তো যাচ্ছিল মনস্বিতা। সে কি তুমি বুঝতে পারনি?
-পেরেছি। কিন্তু আমি ঘর থেকে বের হবার পর কেন? ও তো আমাকে ঘরেই আটকাতে পারতো!
-তা ঠিক। কিন্তু তুমি ছেড়ে গেলে ও কী কষ্ট পাবে না?
-পাবে হয়তো।
-ফারুক কী তোমাকে ভালোবাসে না?
-বাসেও হয়তো।
-হয়তো কেন?
-এ কারণে যে ভালোবাসার মতো অদৃশ্য একটি অনুভূতি প্রকাশেই মূর্ত হয়। দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে, অনুভূতির প্রকাশে, সম্মানে-শ্রদ্ধায়-প্রেমে তা জীবন পায়। কিন্তু ফারুকের প্রকাশ ভিন্ন। তাতে আমি দ্বিধান্বিত। তার কোনো আচরণ আমার কাছে তার ভালোবাসাকে স্পষ্ট করে না। এটা ভালোবাসা হলেও হতেও পারে আবার নাও পারে। আমার যতদূর মনে হয় ফারুক অস্তিত্বের সংকটে ভোগে।
-মানে কী?
-মানে হল ফারুক পরনির্ভরশীল। স্ত্রী নামক প্রাণীটির উপর নির্ভরশীলতা গোপন করেও সমাজে বুক উঁচু করে চলা সম্ভব। স্ত্রীকে বাধ্য করাও সম্ভব, যা প্রেমিকাকে করা সম্ভব নয়। এতে আবার সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন হবার সম্ভাবনাও কম।
-ফারুক কী তোমাকে সম্মান করে না?
নিজের মনে এ প্রশ্ন আসে মনস্বিতার। নিজের সাথে কথা বলতে বলতেই হেসে ওঠে।
-হা হা। ফারুক! আমাকে সম্মান করে কি-না! হা হা। মনস্বিতা! তুমিও এক অদ্ভুত প্রাণী। মনুষত্বের বোধ কি তোমারও লোপ পেল! এও তোমার কাছে আজ প্রশ্ন হয়ে উঠলো! এর নির্দিষ্ট উ্ত্তর যদি তুমি আজও পেয়ে না থাকো, আজও যদি দ্বিধা এসে ভর করে, তবে বলতে হয়, তুমি অযোগ্য। বলতে হয়, এই সংসারই তোমার যোগ্য জায়গা। তুমি এখানেই অনন্তকাল কাটিয়ে দাও গায়ে মাথায় যতই ছড়িয়ে পড়ুক ক্যান্সার। হা হা।
-অযোগ্য? কিসের অযোগ্যতা আমার এই সংসারে?
-এ সংসারে তোমার কোনো অযোগ্যতা নেই। তবে অযোগ্যতা তোমার প্রজ্ঞার। তুমি আজও জানতে পারনি কে তোমাকে ভালোবাসে। কোথায় তোমার দান করা দরকার আর কোথায় নয়। অপাত্রে দান করাও নিজেকে অপমান মনস্বিতা। তুমি নিজেকে অপমানিত করছ। ভীষণ অপমানিত।
-নিজেকে অপমান!
-হ্যাঁ।
-কিন্তু নিজেকে সম্মান করতে গেলে অজস্র বাধা। সামাজিক বিপর্যয়। বিচ্ছেদ। নিরাপত্তাহীনতা। এসব সামাল দিতে পারবো আমি একা! এই বৃদ্ধ মা-বাবা, তাদের কষ্ট দিয়ে আমি সুখী হতে পারবো কখনো।
-ছাড়তো মনস্বিতা। এবার ছাড়ো। মা-বাবা ক’দিন! ভাই-বোন! কে নেবে তোমার দায়িত্ব! আর তাদের কথা ভেবেই জীবনটাকে তুমি একটা নিরুদ্দেশ যাত্রার দিকে ছেড়ে দিয়েছ?
-কিন্ত ফারুক? ও কোথায় যাবে? ওর বাবা মা ভাইবোন কারো সাথে সম্পর্ক ভালো নয়। কোথায় যাবে ও?
-হা হা। বেশ বেশ। তোমারই জয় হোক মনস্বিতা। নিজের চামড়া পুড়িয়ে ছায়া দিয়ে চলেছ যুগের সমান হতে চলল। সন্তানের ভার বহন কিংবা মৃত্যুতেও যে তোমাকে একটা প্রশান্তির বাক্য বলতে পারলো না তার কী হবে ভেবে তুমি অস্থির! হা হা। ছাড়ো মনস্বিতা। এবার ছাড়ো এসব। তুমি বড় অনাধুনিক। বড়ো বেশি শেকড়গামী। এবার একটু ওঠো। নিজের কথা ভাবো কিছু অন্তত!
-ধুর। কী সব ভাবছি আজকাল।
ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে মনস্বিতা। এসব চিন্তাভাবনা নিয়ে পড়ে থাকাটা ঠিক হচ্ছেনা। মুখহাত ধুয়ে যেন ঝরঝরে মনস্বিতা। বিছানাটা তেমনি পড়ে রয়েছে অগোছালো। বালিশ কাঁথা ছন্নছাড়া। কী বিচ্ছিরি লাগছে ঘরটাকে। মনস্বিতা বিছানার চাদরটা পাল্টে টানটান করে বিছায় সাদা চাদরটা। বালিশগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে। একটু আগের আগুনটা তার গনগনে দহনটা নিয়ে কী করে যেন এক্ষণে উধাও। আহা। কি সুন্দর দেখাচ্ছে ঘরটাকে বলতো মনস্বিতা! এর চেয়ে সুন্দর আর শান্তির জায়গা পৃথিবীর আর কোথাও আছে! মধ্যরাত পার হয়েছে কখন খেয়ালই নেই! শরতের আকাশে একটু পরেই তুলো তুলো মেঘে ফুটতে শুরু করবে। বাইরে শিউলি গাছের তলে রাতভর ঝরবে শিউলি ফুল। ঝুরঝুর ছন্দময়। একটি-দুটি পাখি ডাকছে, আহা!
আজ ছুটির দিন। মনস্বিতা কিছু শিউলি ফুল তুলে এনে রাখবে তার ঘরে। সারাদিন কেটে যাবে শিউলি শিউলি ঘ্রাণে। কে ফারুক। কী অপমান। কি-ই-বা সম্মান। মনস্বিতা এক টুকরো ঘর চেয়েছিল। পরিপাটি ছিমছাম। এইতো সেই ঘর। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকবে কিছুক্ষণ! নীল আকাশে মেঘের রঙে ঈশ্বর এঁকে দেবেন তার রাজকন্যার মুখ!! ব্যস।
টুলটুল সানগ্লাসটা চোখে লাগিয়ে আয়নাটাতে দুচার বার ঘুরে-ঘুরে দেখে নিজেকে। আয়নার খুব কাছে গিয়ে একবার, দূরে গিয়ে একবার, পরখ করে কাঁচের গাঢ় অন্ধকারের ভেতর দিয়ে তার চোখের দৃষ্টি বোঝা যায় কিনা। একটা খুব গাঢ় বাদামি রঙের সানগ্লাস কিনে এনেছে। কোর্টে যাবে কিছুক্ষণ পর। দশটায় শুরু হবে কাজ। মনটা তার দু’ভাগ করে নিয়েছে। দীপা যদি বলে দেয় সে মামলা ডিসমিস করে দিতে চায়। ফিরে আসতে চায় টুলটুলের সংসারে। তাহলে সে মেনে নেবে। সব ভুলে যাবে। আবার নতুন করে শুরু করবে। আবার ভালোবাসতে শুরু করবে দীপাকে আগেরই মতো। আর যদি না মেনে নেয়, যদি বিচ্ছেদই তার সর্বশেষ সিদ্ধান্ত এবং প্রত্যাশা হয়, তাহলেও টুলটুল সাইন করে দেবে কাগজ। গাঢ় বাদামি রঙের পর্দা ভেদ করে দীপা দেখতে পারবে না তার চোখে ফুটে ওঠা প্রেম ভালোবাসা কিংবা প্রতিশোধের তীব্র সুচগ্র্য অনুভবের কিছুই। এও এক অদ্ভুত প্রতিশোধ টুলটুলের দীপার জন্য। টুলটুল সম্পূর্ণ প্রস্তুত। সে নিশ্চিত, চোখের সানগ্লাসের কাঁচ ভেদ করে দীপা কোনোভাবেই আজ দেখতে পাবে না।-মা। চলো…
মাধবী বার দুই তাগাদা দিয়ে যায়।
-টুলটুল গুছিয়ে নিয়েছ সব?
-হ্যাঁ মা। আমি প্রস্তুত।
মাধবী তমালকৃষ্ণকে প্রশ্ন করে :
-তুমি কোর্টে যাবে না?
খুব হতাশ আর দুঃখ ভারাক্রান্ত তমালকৃষ্ণের বুকটা আজ। এ ব্যথা বুঝিয়ে বলবার নয়। দেখানোর নয়। বাবা হয়ে সন্তানের বিচ্ছেদ বেদনা বহন করা বড়োই কষ্টের। কোর্টে বসে-বসে এই নাটক দেখতে তার ভালোলাগবে না এতটুকু। দীপার সিদ্ধান্ত তার জানা। একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে তমালকৃষ্ণের ‍বুক চিরে।
-নাহ্। তোমার যাও।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ৪২

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-35/