শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪৪]

0
173

পর্ব ৪৪

বিয়ে সে-তো ধর্ম। এ তো হিন্দু নারীর আচার। এ তো ইহজীবনে যাবতীয় পাপ শুদ্ধ করে পুণ্নাম নরকের হাত থেকে মুক্তির পথ। দীপা কি জানে না ‘তস্মাৎ পুত্র’ ইতি প্রোক্ত স্বয়মেব স্বয়ম্ভুবা?’

তমালকৃষ্ণ কোর্টে যাবেন না। খুব হতাশ তিনি। তার বুকটা দুঃখে ভারাক্রান্ত আজ। চিরকাল অধোমুখি। অন্তর্গত রক্তপাতে সসীম এক ব্যক্তিত্ব তমালকৃষ্ণ। বাইরে দেখে বোঝার কি উপায় আছে তার যাতনার বিষে নীল গভীরের সকল! এ ব্যথা বুঝিয়ে বলবার মতো নয়। দেখাতে পারার নয়। বাবা হয়ে সন্তানের বিচ্ছেদবেদনার গুরুভার যে কখনো না বয়েছে, সে কী করে বুঝবে এই কালানল! কী করে জানবে এই বিভ্রাটের বিস্তর আগ্রাসন। কোর্টে বসে বসে এ বিচ্ছেদের চুড়ান্ত সার্টিফিকেট পাবার আগের সাজানো নাটক দেখতে তার ভালোলাগবে না এতটুকুও। দীপার সিদ্ধান্ত তার জানা। এটা যে তার ছোটভাই তরুণকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী আর ভাইপো শৈলরাজের নীলনকশা তা বুঝতে আজ আর এতটুকু বাকি নেই। তার ধারণা টুলটুলের কাছেও এটা পরিষ্কার। বাপ-ঠাকুরদার পৈত্রিক সম্পত্তির ভাগ থেকে তো তাকে বা টুলটুলকে বঞ্চিত করার আইনত অধিকার নেই। টুলটুলকেও সন্তানের বাবা হতে দেবে না ওরা। আপাতত এটাই তার ছোট ভাই আর তার ছেলে শৈলরাজের নীলনকশা। দীপাকে তাই হাত করেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে তমালকৃষ্ণের ‍বুক চিরে। মনে মনে সব কিছুর জন্য তিনি মাধবীকে দায়ী করেন। তার একার নিভৃতে কে যেন বলে ওঠে;
-হায় মাধবী, কেন কেন এত সব!
মাধবী জানতে আসে তিনি কোর্টে যাবেন কি না।
-নাহ্। আমার ভালোলাগবে না। তোমার যাও।
মাধবীর বুকের ভেতর এখনও ক্ষীণ একটা আশা বাসা বেঁধে আছে। নারী চিরকাল মায়াময়। মায়ার বাঁধনে সন্তানের সাথে বেঁধে নেয় সন্তানের সকল চাওয়া-পাওয়া কিংবা পছন্দের মানুষকেও। তাই টুলটুলের বউ দীপাকেও তিনি বরণ করে নিয়েছিলেন। কিন্তু আজ কেন এই বেদনাপ্রপাত! সন্তানের আসন্ন যাতনার বীজটা যদি নিজের হাতে উপড়ে ফেলতে পারতেন। যদি দীপার দুটো হাত ধরে বলতে পারতেন।
-ফিরে এসো মা। তোমার কোনো অযত্ন অনাদর আমি হতে দেব না কখনো।
কিন্তু কী অদ্ভুত অন্ধকারে ছেয়ে আছে দশদিক! মেয়েটা কেনই বা তার ছেলেটাকে ভালোবাসলো। কেনই বা পালিয়ে বিয়ে করে বসলো। আর কেন-বা এভাবে কোনো কারণ না জানিয়ে একা একা বের হয়ে গেল কেউ জানে না। নিজের ছেলেকে তিনি খুব ভালো চেনেন। একরোখা, গোঁয়ার। ও কি আর এ জীবনে নতুন করে কাউকে ভালোবাসতে পারবে! মাধবীর বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বয়ে যায়। হিন্দু ধর্মে বাংলাদেশে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদের কোনো আইনগত বৈধতা নেই। ভীষণ অদ্ভুত লাগে মাধবীর আজকের মেয়েদের কথা ভাবলে। এ কেমন বিদ্যাশিক্ষা এদের, ধর্মাচরণ কি এদের পরিবারে ছিল না কোনোদিন। বিদ্যাধারী হলেই কি অধর্ম করা চলে! বিয়ে সে-তো ধর্ম। এ তো হিন্দু নারীর আচার। এ তো ইহজীবনে যাবতীয় পাপ শুদ্ধ করে পুণ্নাম নরকের হাত থেকে মুক্তির পথ। দীপা কি জানে না ‘তস্মাৎ পুত্র’ ইতি প্রোক্ত স্বয়মেব স্বয়ম্ভুবা?’ ও জানে না, পুত্রের পিণ্ড ছাড়া তার পিতার আত্মার পরিত্রাণ হয়না বলে নারীর মাধ্যমে ধর্মীয় আচার পালনের জন্যই কেবল হিন্দু নারী জন্ম গ্রহণ করে আর জীবন অতিবাহিত করে! হিন্দু নারী কেবল পুত্র জন্ম দেবে। পুন্নাম নরক থেকে সেই পুত্র তার পিতাকে পার্বণ শ্রাদ্ধের মাধ্যমে উদ্ধার করে নিয়ে চলে যাবে অনন্ত স্বর্গে! হিন্দু নারী স্বামীর আর পুত্রের সম্পত্তির দেখভাল করবে। অন্য কিছু নয়। টাকা পয়সা সম্পত্তি এসবে কি হিন্দু নারীকে কেউ স্বামী-সংসর্গ থেকে ছিন্ন করতে পারে! আর এ তো নিজে নিজে সম্পর্ক ছেদ করতে চাওয়া। কী করে সম্ভব! পাপ। এ তো জঘন্য পাপ। শিউড়ে ওঠেন মাধবী এই সময়ে দাঁড়িয়ে ধর্মাধর্মের ক্ষুরধার জটিল পাপপুণ্য আর তার ফলাফল হিসেব করতে গিয়ে।
কী চায় দীপা! হিন্দু আইনে তো বিবাহ বিচ্ছেদও সম্ভব নয়, যদি অন্য ধর্মাবলম্বী কাউকে বিয়ে না করে। তাহলে দীপা কি অন্য কাউকে ভালোবেসেছে? তা না হলে কেনই বা সে আলাদা বসবাসের অনুমতি চাইছে! মাধবীর বুকের ভেতরে তুফান ওঠে। তুফান চলে। সর্বগ্রাস করে নেয়। কেউ তা জানতে পারে না। খুব গোপনে সামাল দিয়ে চলেছেন তিনি এতগুলো দিন। চিরকাল ঈশ্বরে বিশ্বাসী মাধবী, আজকের শুনানির দিনটাতে মনটা আর বাধ মানতে চাইছে না। তিনিও তমালকৃষ্ণের মতোই জানেন ঘটমান সকল। তবু মনে মনে শেষ আশা। ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ প্রমত্ত সমুদ্রে যেন খড়কুটো ধরে বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছেন। আর অবশেষে না পেরে দৈবের হাতেই সমর্পণ করেছেন এ সংসার আর টুলটুলের ভবিষ্যৎ। যাবার সময় হলো। মনে মনে ঠাকুর দেবতাকে স্মরণ করেন।
-ঠাকুর। হায় ঠাকুর, তুমি দীপার সুমতি দাও। হঠাৎ কোনো মন্ত্রবলে হলেও তুমি ওর মতিগতি ঠিক করে দাও। আজ যেন শুনতে পাই সব ভুল বুঝে ও আমার টুলটুলের জীবনে ফিরে আসতে চায়। ঠাকুর, তুমি দেখো…
কোর্টে যখন পৌঁছালো মাধবী আর টুলটুল তখন ঝাঁ ঝাঁ দুপুর। রৌদ্রতপ্ত দিন। তপ্ত বাতাসে আগুনের জিভটা লকলক করে ঝুলছে। পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে টুলটুলের বুকের ভেতরের সব নদী। দীপাকে খুব একটা মনখারাপ চেহারায় কি আজ দেখবে টুলটুল! ভীষণ মনখারাপ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে হয়তো সে। এমনও হতে পারে টুলটুলের চোখ দেখে আবিষ্কার করার চেষ্টা করবে এখনও এতকিছুর পরেও টুলটুলের সেই গভীর ভালোবাসার ছায়াটা অম্লান আছে কী নেই। কিন্তু টুলটুলতো তা হতে দেবে না। তাইতো গাঢ় আর গভীর অন্ধকারের জাল জড়িয়ে নিয়েছে চোখে। যা যা করবে এবার দীপা, তার সবই তাকে নিজের বিশ্বাস আর আস্থার ওপর দাঁড়িয়েই করতে হবে। টুলটুল ফিরে আসুক। অথবা না আসুক। হয় তাকে মামলা ডিসমিস করে দিতে হবে। নিঃশর্তে ফেরত আসতে হবে। নয়তো টুলটুলের বিরুদ্ধে আনা দীপার বানোয়াট সকল অভিযোগ টুলটুল স্বীকার করে নেবে। কিন্তু না। টুলটুলের ইপ্সিত বাস্তবের মতো হবে না সব। হয় না এমন। তাইতো যুগে যুগে মানব মনের অতৃপ্ত কামনা বাসনার অচরিতার্থতা থেকে যায় যুগ যুগ। মানবের মাঝে ধীরে ধীরে জন্ম দেয় দানব। ছিনিয়ে আনতে চায় অখিল বিশ্ব নিজের হাতের মুঠোয়। দলে-পিষে চুরমার করে চলে যায় কখনও বা ঘাসফুলের শরীর। পুড়ে ছাড়খার করে দেয় কোমল নিখাদ। মানুষের নিয়তি বলেও কিছু একটা থাকে। ছো্ট্ট একটুকরো ভুল। তুচ্ছ এতটুকু অন্তরাল। মহানায়কের কর্মের সূক্ষ্ণতম ছিদ্রপথে ঢুকে পড়ে তীব্রতম বিষ। আর নির্দিষ্ট নিশ্চিত করে তোলে সকল সিদ্ধান্ত এবং অণুসিদ্ধান্তকে।
না। দীপার চেহারা ঝকঝক করছে। আজই প্রথম দীপাকে দেখে টুলটুলের মুগ্ধতা ছাড়িয়ে যায় আগের সকলকে। এত সুন্দর হয়েছে দীপা! তাকে ছেড়ে গিয়ে খুব সুখে আছে তো তাহলে। বিচারক সুনানির সকল বৃত্তান্ত পড়ে শোনাবার পর জানতে চান দীপার মত। দীপা এতটুকু দ্বিধান্বিত নয়। দীপার ঝলমলে চুল আর গাঢ় কাজল চোখে লেখা আছে স্পষ্ট করে টুলটুলের সর্বনাশ। খুব দ্রুতই দীপার পুরোটা শারীরিক অবয়বে টুলটুল পড়ে নিয়েছে সব। যত দ্রুত এই অসহ্য উপহাস্য সময়কে অতিক্রম করে যাওয়া সম্ভব ততটাই দ্রুত করে সে। মাধবীও দীপাকে দেখে নির্বাক। স্বামী ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে নারী এতটা প্রগলভ, এতটা সুন্দর, এতটা আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে!
-হায়, ভগবান!
মায়ের দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে পাণ্ডুর হয়ে ওঠা মুখটার দিকে একবার তাকায় টুলটুল। গালের শিরা উপশিরাগুলো ফরসা চামড়া ভেদ করে উঠে আসছে যেন রুদ্ধশ্বাসে অসংখ্য জটাজাল ছিঁড়ে পরিকীর্ণ সীমানার বাইরে। দীপা একবার তাকায় টুলটুলের চোখে অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কোর্টের সীমাবদ্ধ জায়গাটা থেকে। কিছুই দেখতে পায় না। এমনকি টুলটুলের চোখও। তারপর আবার নির্বিকার। ফিরে আসে তার মুখে ঝলমলে টলটলে জীবনের প্রবলতম আনন্দধারা। টুলটুলের সাইন করে দিতে লাগে এক সেকেন্ড। তারপর দ্রুতগতিতে বের হয়ে আসে। দীপা কি টুলটুলকে পিছু ডেকেছে একবারও!
-টুলটুল, এই টুলটুল শোনো… শোনো না…
ঘাড় ঘুড়িয়ে একবার তাকায় পেছনে। অবসন্ন হয়ে এসেছে তখন দুপুর। নিজের দীর্ঘ ছায়াটাকে তার বড়ো বেশি ক্লান্ত মনে হয়। ছায়ারও পেছনে এক প্রসিদ্ধ বটচ্ছায়া। এখনও দীর্ঘ হয়ে চলেছে।
-এসো মা। চল…
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব ৪৩
http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-36/