শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪৫]

0
199

পর্ব ৪৫

দুরন্ত এক নদী বুকে নিয়ে ঘরে ফিরে আসে টুলটুল। সে নদীর প্রতি পল ফেনায়িত। বিক্ষুব্ধ। তরঙ্গায়িত। ভীষণ সংক্ষুব্ধ তার ভাষা। আজ যেন তার বুকে অসংখ্য নাগিনির বাস। ফুলে ফুলে উঠছে যে কী দারুণ রোষে আর শরীরে প্রবাহিত রক্তের প্রতিটি কণাকে করে তুলেছে বিষাক্ত। এত বিষ শরীরে আজ টুলটুলের। কোথায় হবে তার স্খলন! ঘণ্টা সেকেন্ড মিনিটকে করে তুলছে প্রলম্বিত। দিনগুলো তার সুদীর্ঘ। রাত্রিও অধিক দীর্ঘায়িত আর ভীষণ প্রগলভ্। এতটুকু স্থির নয় বাতাস। চঞ্চল অস্থির প্রবহমান সময় ছিঁড়েখুঁড়ে নিঃশেষ করে চলেছে ক্রমাগত। মাথার ভেতর কোনো এক শৈলচূড়ার গোপনে লুকিয়ে থাকা অগ্নিগিরির তীব্র ধ্বংসোন্মুখ অভিমান। অতি দ্রুতই তা রূপান্তরিত হয়ে উঠছে রাগ আর ঘৃণায়। যে-কোনো সময় ঘটে যেতে পারে তার প্রবল প্রপাত। কেউ জানে না সামনে কী আছে! অন্ধকার। দিকভ্রান্ত টুলটুল। ঘরে একা শুয়েছিল দুচোখের ওপর ডান হাতটা রেখে। মাধবী কখন এসে টুলটুলের মাথার কাছে বসেন সে জানে না। মাধবী দেখতে পান টুলটুরের ঢেকে রাখা চোখের আড়াল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। সন্তানের চোখের জলের যে কী বিপন্ন ব্যথা তা তার আগে জানা ছিল না কখনো। আজ টুলটুলের বুকের ব্যথাটা জলের ধারায় গড়িয়ে পড়ছে পড়ুক। মা হয়ে এ ব্যথা সহ্য করবার ভার যেন বিধাতা তাকে দেন, সেই প্রার্থণা করতে করতে তিনি ফিরে যান। ডাকা হয় না আর টুলটুলকে দুপুরের খাবার খেতে। দুজনে কোর্ট থেকে ফিরে আসতে আসতে বিকেল। দুপুরে খাওয়া হয়নি তার আর টুলটুলের। তমালকৃষ্ণ কোথায় বের হয়েছেন মাধবী জানে না। ছেলেটির কাছে কী তার থাকা দরকার ছিল। আজ এই সময়টাতে টুলটুলের কাছে থাকলেই বা কী হতো তমালকৃষ্ণের! খুব অন্তর্মুখী স্বল্পবাক তমালকৃষ্ণ বড় বেশি সন্তান-বৎসল। এটা মাধবী জানে। কিন্তু তার প্রকাশ বড়ো বেশি নিয়ন্ত্রিত। তাই টুলটুলের ব্যথায় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরা কিংবা পাশে বসে সন্তানকে সামনের দিনগুলোতে কিভাবে চলবে এসব বুদ্ধি পরামর্শ দেয়ার মতো অবস্থায় তিনি নেই আজ। মাধবী তা জানেন। তিনি বাইরে গেছেন নিজেকে ‍লুকোতে। টুলটুলের বিষণ্ন বেদনার্ত মুখটা দেখতে তার খুব কষ্ট হবে। এ কথা মাধবীর চেয়ে বেশি আর কেউ জানে না। মাধবী তার গোপালের ঘরের দিকে আগান।
নিপাট গোছানো নিজের ঘরটার দিকে তাকিয়ে মনস্বিতার খুশি হয়ে যাওয়া আনন্দের দীপশিখাটি বিকেল হতে হতে নিভে আসতে থাকে। কিছুক্ষণ পরই সূর্য ডুবে যাবে। চারপাশে নেমে আসবে অন্ধকার, যদিও এখন বিকেলের সোনারোদে পরমক্ষণ। কিন্তু মনস্বিতার বুকের গভীরে একটা সূক্ষ্ণ সুঁই কোথা থেকে এসে প্রবল প্রতাপে যেন নেমে যাচ্ছে গভীর থেকে আরও গভীরে। অতিসূক্ষ্ণ একটা ব্যথার যন্ত্রণাকে খুব চেষ্টা করেও ভুলে থাকতে পারছে না মনস্বিতা। ঘরটাকে এই মুহূর্তে অসহ্য লাগছে। যেন এক নরক। যে ছায়াটিকে মুছে ফেলতে চাইছে সে প্রতি সেকেন্ডে সে জাপটে ধরছে তাকে অদ্ভুতভাবে। বার বার মনে পড়ে যাচ্ছে ফারুকের বীভৎস মুখ। তার বুকের উপর উঠে চেপে বসে থাকার নিকৃষ্ট নোংরা একটা ছবি কেন যে আয়নার মতো চোখের সামনে মেলে ধরছে! ফারুকের মুখ মনে হলেই ভয়ঙ্কর এক হত্যাদৃশ্য ভেসে উঠছে চোখের সামনে। সে তো আজ সকালের শিউলির ঘ্রাণে ভরে দিতে চেয়েছে এই ঘরকেই। গতরাতের জাহান্নামের আগুনে পুড়ে ছারখার ঘরটাকে সকালেই তো কী দারুণ ভালোবেসে গুছিয়ে নিয়েছে আবার। আর ভেবেছে এমন একটি শান্তির ঘরই সে চেয়েছে বরাবর। এমনি এক শান্ত পৃথিবী যা তার একান্ত, যা তার নিজস্ব। কিন্তু এই একার পৃথিবীতে নিজস্ব বলে কি আছে তার! স্বামী? হাহ্…
আনমনে হাসে মনস্বিতা। এই লোকটি অবশ্য স্বামী বা প্রভু হিসেবেই উপযুক্ত। বন্ধু বা বর তাকে বলা যায় না একেবারেই। কিন্তু এই প্রভুরও তো ন্যুনতম প্রভুত্বযোগ্যতা থাকা দরকার! না। শীত আসতে থাকা এই বিকেলের আলোটা খুবই নম্র। তবু আর এর উত্তাপ মনস্বিতার কাছে গণগণে লাগতে থাকে। ঘরটা আরও গুমোট ভ্যাপসা লাগছে। ঘরে থাকা দূঃসহ হয়ে উঠছে। একটু বাইরে বের হবে? কোথায় যাবে? কোথায় গেলে একা এই বয়সে নীরবে কিছুটা সময় সব ভুলে থাকা যায়? মনে পড়ে তমালকৃষ্ণ একদিন পাশেই একটি নদীর কাছে নিয়ে গেছিলেন। হুম। খুব কাছে তার বাসা থেকে।
বিকেলের তীব্র আলোটা নদীর কাছে এসে ফিরে পায় তার অকৃত্রিম চরিত্র। তাই সেটা এখন আর মনস্বিতার কাছে উত্তাপ ছড়ানো গণগণে লাগে না। ব্রিজের ও্পর দাঁড়িয়ে থাকে সে। বাতাসে ঠান্ডা ঠান্ডা ভাবটা যেন হৃদয় স্পর্শ করে। মাথার ভেতর উত্তপ্ত স্নায়ুকণিকাগুলোকেও বেশ খানিকটা আদরের পরশ বুলাতে পারে সেটা। তাই নিজেকে বেশ পলকা ভারহীন মনে হচ্ছে এই মহূর্তে মনস্বিতার। বিকেলের আলোয় দিনের শেষ বেলার পূজা সম্পন্ন হতে চলেছে। বালিতে তারই রেশ চিকচিক করে ম্লান হতে শুরু করেছে। ব্রিজের নিচ দিয়ে একটা কলের নৌকা চলে গেল। অনেক মানুষ তাতে চেপে কোথায় চলে যাচ্ছে মনস্বিতা জানে না। কয়েকটি নৌকা বৈঠা বেয়ে নিয়ে চলেছে মাঝিরা। তাতেও বহু মানুষ্। এপার থেকে ওপার যাচ্ছে। আকাশে পাখির ঝাঁক উড়ে চলেছে। শেষ সূর্যের পড়ন্ত রোদের স্তিমিত আলো যেন সোনালি বিভায় রাঙিয়ে দিয়ে চলেছে আজ আকাশের মুখ। এত সুন্দর পৃথিবী। এত সুন্দর আকাশ বাতাস নদী পাখি। তবু কেন অদ্ভুত আঁধার মনস্বিতার সব। এসব ভাবতে ভাবতে ধ্যানটা ছুটে যায় মনস্বিতার।
-তুমি এখানে?
প্রশ্ন শুনে পাশে তাকায় মনস্বিতা। তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তীকে দেখে যেন মনটা হেসে ওঠে। খুব খুশি হয়ে ওঠে।
-আপনিও? বাহ্। ভালোই হলো। আমিতো ভাবতেই পারিনি আপনাকে এখানে দেখতে পাবো।
-ভাবতে কি আমিই পেরেছি নাকি?
এইসব কথাবার্তার ফাঁকেই মনস্বিতার মনে পড়ে যায় ফারুক একদিন ফোন করে তমালকৃষ্ণর কাছে সময় চাইছিল দেখা করার জন্য। আদৌ দেখা হয়েছে কি-না। দেখা হলে না-জানি কি কথা হয়েছে। কখনো জানতে ইচ্ছে করেনি মনস্বিতার। না ফারুককে না তমালকৃষ্ণকে সে জিজ্ঞাসা করেছে কোনোদিন। কিন্তু ভালো কিছু ফারুক বলবে না এটা সে নিশ্চিত ছিল। আজ সেকথা ভেবে মনটা কেমন বিষন্ন হয়ে ওঠে। বিষন্নতার ভাবনাগুলোকে দূরে সরিয়ে দিয়ে তমাল কথা বলেন :
-আজ আমার মনটা খুব খারাপ।
-আমাদের কী মন খারাপেই দেখা হয়ে যায় বার বার?
-হুম। তাইতো দেখছি।
-কী হয়েছে বলুন না। আমি জানতে পারি?
তমালকৃষ্ণকে এতটা বিষন্ন দেখেনি মনস্বিতা আগে কখনো। তাহলে কি ফারুক কিছু বলেছে তাকে? আজই প্রথম মনস্বিতার ইচ্ছে করে জানতে। প্রশ্ন করার আগেই তমাল বলতে শুরু করেন আবার।
-আজ টুলটুলের বিচ্ছেদের মামলার রায় হয়ে গেল।
বুকের ভেতরটা কেমন হিম হয়ে আসে মনস্বিতার কথাটা শুনে।
-কি বলছেন? আজই?
-হুম। ছেলেটার মুখ দেখবো কেমন করে বলুনতো। বুকের ভেতরটা কেমন ফাঁকা লাগছে। তাই ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছি।
-হুম।
কম কথা বলা মানুষ হিসেবেই দেখেছে মনস্বিতা তমালকৃষ্ণকে। এতটা যে বলেছেন তাতেই সে বুঝতে পারছে তার ব্যথার প্রকোপটা কতটা ভেঙেছে তাকে। কী বলবে সে ভেবে পায় না। তার ভয়ঙ্কর বিপদের দিনে তিনি তাকে উদ্ধার করেছিলেন। ঈশ্বরের মতোই। আবার ঠিকসময় এসে মৃত কন্যাটিকেও কোলে তুলে নিয়েছিলেন। এও বোধকরি এক অদ্ভুত যোগ মনস্বিতার সকল ব্যথার সাথে তমালকৃষ্ণের। আজ তার ব্যথায় মনস্বিতা চুপ করে থাকবে? নিজের কাছেই কেমন ছোট লাগে নিজেকে। নিজের মনটাই এতটা ভারাক্রান্ত। অথচ আরও ব্যথা আরও ব্যথা। এ কেমন খেলা ঈশ্বরের। কেবল ব্যথা দেয়া। কেবল শূন্য করা। কেবল মুছে দেয়া সুন্দরের রূপ। শুধু ধোঁয়াশা করে তোলা সহজ পাথর। রাত নেমে গেছে বেশ কিছুক্ষণ। ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে। তমালকৃষ্ণ বার দুই খুক খুক করে কাশেন।
-আপনার ঠান্ডা লাগছে। চলুন আপনার বাড়ি যাই। আপনাকে রেখে আসি।
তমালকৃষ্ণ যেন কতকাল এমন স্নেহের কথা শোনেননি কারো মুখে। বুকটা তার শূন্য। প্রথম সন্তানটির মৃত্যুর সকল দায় যেদিন থেকে মাধবী তাকে দিয়ে রেখেছে সেদিন থেকেই অদ্ভুত হৃদয়হীন পৃথিবী এখানে। তার উপর টুলটুল যেদিন একা একা দীপাকে বিয়ে করে নিয়ে এলো, সেদিন তো তার মনে হয়েছিল এ সংসারে তিনিই বা কে? আর আজ দীপার সাথে টুলটুলের বিচ্ছেদ, এ যাতনাও আর সইতে পারা অসম্ভব যখন ঠেকেছে তখনই যেন মাতৃহৃদয় থেকে উচ্ছ্বসিত হয়ে আসে স্নেহের ভাষা! এ নিশ্চিতই তার প্রথম সন্তান। দ্বিতীয় জন্মে সে মনস্বিতা। ফারুকের স্ত্রী। নিজের এই অদ্ভুত মানসিক পরিবর্তনে নিজেই অবাক হয়ে যান তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী। চিরকাল তিনি সেকুলার। ঈশ্বরে বিশ্বাস নেই তার। পরকাল পরজন্ম এসব তো অসম্ভব। অথচ মনস্বিতার সাথে পরিচয়ের পর থেকেই তার বার বার কেন মনে হচ্ছে এ মেয়েটিই তার প্রথম সন্তান, যার পৃথিবীতে আসবার কথা ছিল, হেসে খেলবার কথা ছিল। অথচ আসেনি। হাসেনি। খেলাবার অবসর তাকে দেয়া হয়নি। তিনি আজ এই প্রথমবারের মতো মুখ তুলে তাকান মনস্বিতার দিকে। তখন রাত হয়েছে বেশ। মাথার উপর পূর্ণ চাঁদ। চাঁদের আলোতে মনস্বিতার মুখ দেখা যায়। চোখের নিচের কালি যদিও বা ধরা পড়েনি তখনও কিন্তু গালের দুই পাশে এক অদ্ভুত কালো দাগ। গালের দু’পাশে সজোরে চেপে ধরলে যেমন তেমনি কালো হয়ে আছে দেখতে পান। তিনি যেন আর নিজের মধ্যে নেই। এই প্রথম তার এমন কৌতূলহল মনস্বিতা লক্ষ করে। তিনি মনস্বিতার চিবুকটা আলতো করে ছুঁয়ে মুখটা চাঁদের আলোর দিকে তুলে ধরেন। কপালটা কুচকে যায়। চোখে ভীষণরকম এক অবিশ্বাস। তবু প্রশ্ন করেন :
-তোমাকে ফারুক মেরেছে?
গতরাতের পর থেকে দারুণ একটা পাথর বুকের ওপর বসে রয়েছে মনস্বিতার। তমালকৃষ্ণের হাত মনস্বিতার চিবুক ছুঁয়ে দিলেও কোনোরূপ অস্থির কিংবা অসৌজন্য তাতে অনুভূত হয় না তার। বরং এক ব্যথাতুর পিতৃহৃদয়ের কাছে পরাভূত হয় প্রথমবারের মতো মনস্বিতার সকল জেদ লজ্জা কিংবা সম্ভ্রমের আবরণ। কেন যে আজ সে ঢেকে রাখার প্রয়োজন মনে করে না তার ক্লেদ। কেন যে মনে পড়ে না কত ব্যথা কত যাতনার দিন আর রাত বুকের ভেতর গোপন করে নিয়ে হেঁটে চলেছে দীর্ঘতর কোনো এক বন্ধুর পখ। কতকাল! কতকাল! তাই আজ আর চোখের জলও যেমন বাঁধ মানে না, তেমনি তার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ রাখারও প্রয়োজন বোধ করে না মনস্বিতা। আর লোকে দেখবার জানবার যে লজ্জাবোধ সেটাও কোথায় আজ উধাও। দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জল আর লুকোয় না মনস্বিতা। তার বুকটাও হালকা হওয়া দরকার। তাই মনস্বিতার হাঁ-বোধক মাথা ঝাঁকায়। তাতে তমালকৃষ্ণের এক ব্যথার সাথে আরেক ব্যথা ক্রমান্বয়ে যোগ হতে থাকে। চোখ ছলছল করে ওঠে। তমালকৃষ্ণ পুত্র সন্তানের পিতা। কন্যা সন্তানের পিতা হবার সৌভাগ্য তার কেড়ে নেয়া হয়েছে ঠিক। তবু আজ তার হৃদয় কেন যে হাহাকার করে ওঠে মনস্বিতার গালের দুপাশে চেপে ধরার কারণে ফারুকের দু আঙুলের কালো হয়ে আসা ছাপ দুটো দেখে! এ কী অদ্ভুতভাবে তিনি তাকিয়ে আছেন মনস্বিতার চোখের দিকে চেয়ে। মনস্বিতাও তাকিয়ে দেখছে একজন বৃদ্ধ মানুষ ছলোছলো চোখে তার দিকে হৃদয়ের সমস্ত স্নেহ ঢেলে দিয়ে পরম মমতায় ছুঁয়ে আছেন তাকে। আরেকটা পাথর নেমে যাচ্ছে গলে যাচ্ছে ক্ষয়ে যাচ্ছে যেন ভীষণ যোগমায়ার বলে….
মনস্বিতাকে নিয়ে তমালকৃষ্ণ যখন তার বাড়ি ঢুকেছেন মাধবী বের হচ্ছেন তার গোপালের ঘর থেকে। তমালকৃষ্ণই পরিচয় করান।
-তোমাকে বলেছিলাম যার কথা।
-তুমি মনস্বিতা!
পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার বেলায় যদিও তিনি একটু দূরে সরে দাঁড়ান, তথাপি তাকে মনস্বিতার কেমন মা মা লাগে। তমাল টুলটুলের কথা জানতে চাইলে চা দিতে দিতে মাধবী জানান টুলটুল তার ঘরে।
-ওকে ডাকো। আমাদের সাথে চা খেতে ডাকো?
মাধবী গলা বাড়ান। টুলটুল তখনো একইভাবে বিছানায়। আধো-অন্ধকার ঘর। মাধবী ডাকেন।
-তমাল এ ঘরে এসো। চা দিয়েছি।
ডাক শুনে অন্ধকার ঘরটায় আলো জ্বালে না টুলটুল। যদিও উঠে বসে। মাথাটা ভার হয়ে রয়েছে। আকাশটা শূন্য। বুকটা ফাঁকা লাগছে। মায়ের কথায় উত্তর করে :
-চা-টা এ ঘরে দিয়ে যাবে মা?
মাধবী চা দিয়ে এসে আবার মনস্বিতার কাছে বসেন। নানা কথা গল্প আর হাসিতে তমালকৃষ্ণ আর মাধবী দুজনেরই মনটা একটু হালকা হয়। ফিরে যেতে হবে। দুবার ফোন করেছে ফারুক। মনস্বিতা, পা বাড়ায় দু’জনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে। টুলটুলদের বাড়ির বাইরে মনস্বিতা যখন পথের দিকে পা বাড়িয়ে দিয়েছে তখন বাড়ান্দায় এসে দাঁড়ায় টুলটুল। দীর্ঘাঙ্গি মেয়েটাকে দেখে তার কৌতূহল জাগে। পেছন থেকে যতটুকু দেখা যায়- একঢাল লম্বা কালো চুল যেন টুলটুলের অন্ধকার হয়ে থাকা বুকের ঠিক মাঝখানটায় বেলিফুলের সুবাস ছড়িয়ে দিয়ে উড়ে চলে যায়। টুলটুল মাকে ডাকতে ডাকতে মায়ের ঘরের লাগোয় বাড়ান্দায় চলে আসে।
-মা মেয়েটি কে গো?
মাধবী উত্তর দেন :
-তোর বাবার ধারণা এটি তার সন্তান। তারই কন্যা্ আবার জন্মেছে।
-কে?
-মনস্বিতা।
তখনো গাছের পাতার আড়ালে চলে যেতে থাকা মনস্বিতার দীর্ঘ পায়ের ছায়া পড়ে রয়েছে। রাতের আঁধারে চাঁদের আলোতে স্পষ্ট দেখতে পায় টুলটুল।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্ব ৪৪

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-37/