শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪৭]

0
166

পর্ব ৪৭

ফারুক যখন ফিরে এসেছে তখন মধ্যরাত। ঘোর অন্ধকার চারদিকে। আশে পাশের লোকজন সব ঘুমিয়ে পড়েছে বোধ করি। মনস্বিতার মাথার ভেতর তীব্র আগুন তবু জেগে আছে। জ্বালা ধরাচ্ছে সে আগুন অনেকক্ষণ ধরে। একটা বিষয় সে মেনে নিতেই পারছে না। অকারণে যা তা সন্দেহে ফারুক কত সহজে চেপে বসেছিল বুকের উপর। নাকে-মুখে বালিশ চেপে শ্বাসরোধ করেছিল মনস্বিতার। একটা ভুল এবং অকাট মিথ্যেকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল তমালকৃষ্ণের কাছে। এতটুকু লজ্জাও নেই লোকটির নিজের কাজের জন্য! আর সে কি না অন্য নারীর গলার সোনার চেন পকেটে নিয়ে ঘুরছে! কিন্তু কেন? এর কি অর্থ হতে পারে? দরজাটা খুলে দেয়। আজ সে অন্যরূপে দাঁড়াবে ফারুকের সামনে। তার আহত অহং ক্রমাগত উত্তেজিত করে তুলছে তার বোধ আর মেধাকে। এতকাল বুঝতে গিয়েও যা যা বোঝেনি সংসারে শান্তির জন্য আজ বোধ করি এসব বুঝে নেবার সময় তৈরি হতে লেগেছে। ফারুক নিজেই সে পথ করে দিচ্ছে। এর চেয়ে বেশি ছাড় বোধ করি মনস্বিতাও দিতে পারে না। ফারুক ঘরে ঢুকতেই ভেতরের ঘরে যাবার পথ রোধ করে দাঁড়ায় মনস্বিতা। হাতের চেনটা ফারুকের সামনে ধরে প্রশ্ন করে :
-এটা কার?
ফারুক একবার মাত্র চেনটির দিকে তাকায়। অবাক হবার কোনো ভান-ভণিতা নেই তার আচরণে। বরং খানিক হতচকিত দেখায়। মনস্বিতার প্রখর দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে সেটা হারাবার কিংবা লুকোবার নয়।
-জানি না।
আগাতে চা্য়। পেছন থেকে ফারুকের কাঁধে হাত রাখে মনস্বিতা।
-দাঁড়াও।
সেদিনের পর থেকে মনস্বিতার কোনো ধরণের স্পর্শ ফারুক পায়নি। খুব সচেতনভাবেই সে ফারুকের স্পর্শ থেকে নিজেকে দূরে রাখছে এটা ফারুক টের পায়। কিন্তু এখন মনস্বিতার হাত ঠান্ডা। তবু কেমন এক ঝাঁঝালো অন্তর্ভেদী তার আগ্রাসন। মনস্বিতার স্পর্শ এতটা স্ত্রস্ত ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে পার ফারুককে এ যেন ফারুকেরই কল্পনার অতীত। এত সাহস! অন্য সময় হলে ফারুক ‘ছাড়ো তো’ বলে হাতটা ছাড়িয়ে সামনে এগুতো। আজ মনে হচ্ছে এ করতে গেলে হয়তো অনর্থ ঘটে যেতে পারে মারাত্মক। এমনই কঠোর সে হাতের নির্দেশ। মনস্বিতা কথা আগায়।
-তোমার প্যান্টের পকেটে মেয়েদের সোনার চেন। প্রায় দুই ভরি ওজন। অথচ তুমি বলছ জানি না?
-আরে ওটা কার যেন। অফিসে আমার রূমের সামনে পড়েছিল। কেউ হয়তো ফেলে গেছে। সবাই বলল আপনি রেখে দিন। পরে খুঁজতে্ এলে ফের্ত দিয়ে দেয়া যাবে।
-তোমাকেই রেখে দিতে বলল সকলে? কেন? তোমাকেই কেন?
-আরে এটা আমার রূমের ঠিক বাইরেই পড়ে ছিল যে।
-হুম।
হঠাৎ মনস্বিতা চোখ দুটো বড় করে ঠিক ফারুকের চোখের দিকে গভীর সূক্ষ্ণ এক দৃষ্টির বিভ্রম ছুঁড়ে দিয়ে প্রশ্ন করে :
-আচ্ছা, সত্যি করে বলতো, চেনটা রূমের ভেতরে পড়েছিল না?
ফারুক ঠিক এ ধরনের জেরার প্রত্যাশী নয়। মনস্বিতা তাকে এই চেনটি নিয়ে এত প্রশ্ন করবে কেন? এসব ভাবতে ভাবতে তার চোয়ালের রগগুলো বেশ শক্ত হতে শুরু করেছে। বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে তার স্নায়বিক চাপের প্রগলভতা। মনস্বিতা তখনো প্রশ্ন করে চলেছে।
– তারপর আর আসেনি খুঁজতে?
ফারুক খানিকটা তোতলায়।
-নান, না।
-দুই ভরি ওজনের সোনার চেইন পড়ে রয়েছে তোমাদের অফিসে। অদ্ভুত তো! কেউ সেটা খুঁজতেও আসেনি? চেনটা তবে কার? ঠিক করে বলবে আমাকে।
মনস্বিতা গলাটা একটু নামিয়ে মারাত্মক সন্দেহপ্রবণ স্বরে ফারুকের অন্তরাত্মা কাঁপিয়ে দিয়ে এবার যে প্রশ্নটি করে সেটি ফারুকের কাছে একেবারেই প্রত্যাশিত ছিল না। আগে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে স্বভাবসুলভ বাহ্যিক হিংস্রতায় কাঁপিয়ে দিয়ে বরাবর যেমন বীতস্পৃহ করে তুলতো সে মনস্বিতাকে, সত্য মিথ্যের জটাজালে পর্যুদস্ত করে দিত, মনস্বিতার বিশ্বাস কিংবা সন্দেহকে; আর ফারুকের হুঙ্কারে গুটিশুটি মেরে মনস্বিতা পড়ে থাকতো ঘরের এককোণে, আজও ঠিক এমনি একটা পরিস্থিতি তৈরি করবার চেষ্টার কথা চিন্তা করছিল ফারুক। ভাবছিল হুঙ্কার দিয়ে প্রশ্ন করবে :
-তাতে তোমার কী হয়েছে?
সেই সময়ের ফাঁকটি খুঁজে বের করতে করতে মনস্বিতা ঢুকে যায় আরও ভয়ানক এক পর্বে।
-নাকি চেনটি কেউ খুলে তোমার পকেটে রেখেছিল? হুম?
চেনটিকে হাতের মুঠোয় নিয়ে তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মাঝখানে রেখে এমনভাবে আঙুলে জড়িয়ে ধরেছে মনস্বিতা যে ছোঁ মেরে তা নিয়ে নেবে সে অবস্থাও নেই। হাতের চেনটিসহই ফারুকের চিবুকটাতে উঁচু করে ধরে তার চোখের দিকে তাকায় মনস্বিতা। ফারুকের থুতনিতে লেগে আছে চেনের খাঁজকাটা গাটগুলো। আর চোখের ঠিক কয়েক ইঞ্চি নিচে নাক বরাবর তাকালেই চোখে পড়ছে থুতনীতে লেগে থাকা মনস্বিতার হাতে জড়িয়ে থাকা চেনটা। এক বিশেষ অস্বস্তি তৈরি করছে ক্রমাগত ফারুকের মনে এই পরিস্থিতি।
চিরকাল সে মনস্বিতাকে যা-যা মিথ্যে বলে এসেছে, তা-তা নিয়ে মনস্বিতা কখনো সেসব নিয়ে খুব একটা তর্কে যায়নি। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে কনভিন্স করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আজকের স্বরপ্রক্ষেপণ দৃষ্টিনিক্ষেপ কিংবা বাক্যের সুনির্দিষ্ট প্রয়োগ ফারুকের ভেতর বাহির একাকার করে দিতে লেগেছে। পেশীশক্তি কিংবা ‘লাইং অব এক্সিলেন্স’ দিয়ে কী আজ আর তাকে ঠেকানো সম্ভব হবে?
-ও-কে, তাহলে ওটি আমার কাছেই থাক।
-তোমার কাছে থাকবে মানে?
-তোমার প্যান্টের পকেট থেকে ওটি কাজের মেয়ের হাতে পড়তে পারতো। সে নিয়ে নিতে পারতো। ওটি আমার কাছেই থাক। কেউ খুঁজতে এলে তাকে আমার ফোন নম্বর দিয়ে আমার কাছ থেকে নিতে বলে দিও।
-মানে কি? তোমার কাছ থেকে নেবে কেন?
-তাহলে তুমি প্রায় লক্ষ টাকার সোনা নিজের পকেটে নিয়ে ঘুরবে? ওটা হারালে কি করে ফেরত দেবে?
বলে নিজের ঘরের দিকে আগাতে যায়। ফারুকের ঝাঁঝালো স্বরে পেছন ফিরতে বাধ্য হয়।
-সে চিন্তাতো তোমার নয়।
মাথাটা একটু কাত করে এমনভাবে পেছনে দাঁড়ানো ফারুকের দিকে তাকায় যেন সে ফারুকের সকল গোপন পরিষ্কার দেখে ফেলেছে। প্রশ্ন করে :
-আমার নয়?
ফারুকের দৃষ্টির অনমনীয়তা আর একরোখা বাক্যের ভিত্তিহীন বাস্তবতা অনেক প্রশ্নের উত্তর বলে দেয় তাকে। মনস্বিতা আর দাঁড়ায় না। নিজের ঘরে চলে যায় চেনটা হাতে নিয়ে। চেনটা তার নিজের কাছে রাখতে ঘেন্না হয়। মনে পড়ে যায় ফারুকের টেলিফোনে আসা মেসেজটি ‘আই লাভ ইয়্যু টুহ্’। একবার ইচ্ছে হয় ঢিল মেরে এই নিশুতি রাতের অন্ধকারে যত্রতত্র ফেলে দেয় এই নোংরা নাটকের প্রামাণ্য দলিলটি। আনমনে নিজের গলায় হাতটা চলে যায়। কতকাল তার গলায় একটা চেন নেই। সব বিক্রি করেছে। সংসারের এক-একবারের অভাবের অনটনে সব গয়না একে-একে বিক্রি করতে বাধ্য করেছে তাকে ফারুক। গয়নায় প্রতি তেমন দুর্বলতা মনস্বিতার নেই। কিন্তু হঠাৎ কখনো একটা সোনার গহনা পরার খুব ইচ্ছে হয় তার, যখন কলিগরা জন্মদিন কিংবা বিবাহবার্ষিকীতে বরের দেয়া বহুমূল্য হীরের আংটি আঙুলে পরে সগৌরবে সকলকে দেখায়। বর তাকে কতটা ভালোবেসে কত টাকা খরচ করে উপহার কিনে পরিয়ে দিয়েছে আঙুলে, এসব গল্প করে তখন কি কখনো বুকের গহীনে মনস্বিতারও এমন কিছু পেতে ইচ্ছে করেনি! খুব গোপনে নিজের খালি আঙুলের দিকে কী সে তাকিয়ে থাকেনি! কিন্তু তা আর সম্ভব হয়নি বিয়ের পরে কোনদিন। স্বামী যখন স্ত্রীকে গহনা কিনে দেয়, তখন মনস্বিতা শিখেছে গয়না বিক্রি করতে।
জানালায় হিম বাতাস আসছে। জানালাটা বন্ধ করতে গিয়ে খেয়াল হয় আশ্বিনের চাঁদের আলোটা ঝুমঝুম করে ঝরে পড়ছে মনস্বিতার বিছানায়, তার সমস্ত আলো নিয়ে। মনস্বিতা চাঁদের আলোতে নিজের মুঠোয় তুলে ধরে সোনার চেনটা। নিজেরই করতলে কেমন নিষ্প্রভ লাগে তার রূপ। বরং জোৎস্নাই আকাঙ্ক্ষিত তার। বুকের ভেতর হু হু করে ওঠে রাতের বাতাস। জোৎস্নার আলোয় ফুলের কলির মতো খুলে প্রস্ফুটিত হতে থাকে এই পৃথিবীর যাবতীয় জটিল জৈবিক সম্পর্কগুলো, মনস্বিতার চোখের সামনে। অদ্ভুত সমাজ সংসার আর তার মায়াজাল! বিস্তৃত ফেনিল তার ঘোর, অস্বস্তি। ভীষণ অস্বস্তি শুরু হয়েছে আজকাল তার যাপনের মাঝখানে। নিজেকে যে সাধনায় ব্যাপৃত রাখবে বলে শপথ করে নেমেছিল, এতকাল নিজের কাছে সেই পথের চাকাটা কে বা কারা যেন কেবল অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। শত শত অশ্বারোহী যেন ধেয়ে আসছে যুদ্ধের মাঠে তার দিকে। শত সহস্র তাদের অস্ত্র-তীর-ধনুক। মনস্বিতা একা। অস্ত্রহীন। তবু যুদ্ধবাজ। এই যুদ্ধের মাঠে অদ্ভুত এক আঁধারে ম্রিয়মান হতে হতে শূন্য। পালাবে মনস্বিতা? দাঁড়াবে মনস্বিতা? পালালে পিঠের দিকে তাক করা বিষাক্ত তীরর আঘাতে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু। ভীরুর তকমা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায়ের স্বপ্ন তো সে দেখেনি কোনদিন! কী করে দেখবে আয়নায় নিজের মুখ! দাঁড়িয়ে থাকলে সে নিশ্চিত জানে কৃষ্ণ ডুবিয়ে দেবেন যে কোনো সময় রথের চাকা। এই প্রখর চাঁদের আলোতেও ছায়াচ্ছন্ন লাগে তার সব। বুকের ভেতরের আগুনটা ক্রমে নিভে আসছে। সোনার চেনটা আবার ফারুকের প্যান্টের পকেটে যথাস্থানে রেখে দেয় মনস্বিতা।
যথারীতি ভোরের আলোয় ফুটে ওঠে গাছে গাছে রক্তগোলাপ। মনস্বিতার বুকের গভীরেও গতরাতের ফোটা গোলাপটি লাল রঙ ধারণ কর- নিভৃতে গোপনে ঘুমায়। অস্থির দু-হাতে আগেরই মতো রুটি বেলতে লাগে। নিজে খেয়ে ফারুকের জন্য নাস্তা রেখে অফিস যেতে হবে। ত্রস্ত পায়ে চলে এঘর-ওঘর। ভোর বেলা জেগে কর্মচঞ্চল সকালের দিকে নিয়ত যাতায়াত মনস্বিতার। তারপর স্নানের ঘরে ঢুকে পড়ে। ঘুম ভেঙেই রান্নাঘরে দ্রুতবেগে হাত-পা সঞ্চালনে আর চুলার আগুনের তাপে রক্ত চলাচল বাড়তে বাড়তে অস্বস্তিকর গরম হয়ে ওঠে শরীর। মাথার চুল, চোখের পাতা, গলার নিচের ভাঁজে গড়িয়ে পড়ে ঘামের ফোটা ফোটা অজস্র বিন্দু। এই সকল যাবতীয় শারীরিক আর মানসিক ক্লেদ মুছতে মুছতে মনস্বিতা ঠিক সকাল সাড়ে সাতটায় দাঁড়ায় ঝর্ণার নিচে। স্নান সারা হয়ে গেলে ডাইনিং টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে ড্রেসআপ করতে করতে বার দুই ডাকে ফারুককে। কিন্তু কোনেদিনই ফারুক আগে ওঠে না। ঠিক মনস্বিতার বের হবার মুহূর্তে জেগে ওঠে। কোনমতে বাইরের দরজার সিটকিনিটা লাগিয়ে দিয়েই আবার ফিরে যায় বিছানায়। আজ আর ফারুককে ডাকতে ইচ্ছে হয় না মনস্বিতার। ওর নামটাতেই কেমন যেন বিরক্তিকর এক ঘেন্নার জন্ম হতে শুরু করেছে। দিনে দিনে অর্জন করা অবিশ্বাস অশ্রদ্ধাগুলো আজ যেন এক অমীমাংসিত রূপ নিয়ে এসে দাঁড়াতে লেগেছে মনস্বিতার সামনে একের পর এক। তারই বেড়াজাল ডিঙিয়ে এভাবে সংসারের জটাজালে পড়ে থাকা যে কী ভীষণ ভয়ঙ্কর ক্লেদ, কে লিখবে তার ইতিহাস! আজ মনস্বিতা বেপরোয়া। কী আছে তার ঘরে! কী হারিয়ে যাবে। কেউ এসে নিয়ে যাবে কী আছে এমন সম্পদই বা এখানে। বাইরে বের হয়ে মনস্বিতা তাই আজ আর দরজা বন্ধ করার জন্য ডাকে না ফারুককে। কেবল একবার কলিং বেলটা টিপেই হনহন করে ছোটে অফিসের উদ্দেশ্যে। সরু গলি পার হয়ে আজও অজস্র মানুষের ভীড়ে এসে দাঁড়ায় সদর রাস্তায়। প্রচুর লোকের ভিড়ে এ-গাড়ি ও-গাড়ি খুঁজতে খুঁজতে একটাতে উঠে চলতে শুরু করে। যাবে গুলশান দুই। পাকিস্তান অ্যাম্বাসির ধার ঘেঁষে স্কলাসটিকা স্কুল ছাড়িয়ে আর একটু আগালে ৭১ নম্বর বাড়িটাই মনস্বিতার অফিস। চাকরিটা যেতে যেতে আছে। মেয়েটি মারা যাবার পর সেই যে অফিস যাওয়া বন্ধ করেছিল। কোনভাবেই কাজে মন বসাবে এই অবস্থায় পৌঁছুতে পারে নি এতকাল। এবার নিজেকে বাঁচাতেই কাজে যোগ দিতে হল। ঘরের বাতাস অস্থির গুমোট। দম বন্ধ হয়ে আসতে আসতে আবার যেন ফিরে পায় প্রাণ। নিজের চেয়ারটাতে বসতে বসতে বড় আপন লাগে সব। তাকে সাহায্যকারী ছেলেটি পরিপাটি ছিমছাম করে রেখেছে তার বসার টেবিল চেয়ার। ডেক্সটপ কম্পিউটারটিতেও পড়েনি এতটুকু ধূলোর আস্তর। মৃদুলয়ে একটা রবীন্দ্র সংগীত ছেড়ে দিয়ে কাজে মন দিতে শুরু করেছে মনস্বিতা মাত্রই, অমনি ফোনটা বেজে ওঠে। অত সকালে কে ফোনে!
-হ্যালো।
-আমি তামালকৃষ্ণ বলছি।
-হ্যাঁ। চিনতে পেরেছি।
-সেদিন রাতে চলে গেলে তারপর আর কোনো খোঁজ নেয়া হয়নি। তুমি অফিস যাবে আজ?
-আমি অলরেডি অফিসে এসেছি।
-ওহ্। আচ্ছা চলে গেছ? আমি ভাবছিলাম তোমাকে নিয়ে যাব। যা হোক, আমি বিকেলে তোমার অফিসের দিকটায় থাকবো। তোমাকে নিতে আসবো? ছটায় বের হবে?
-আপনি আমার অফিস চেনেন?
-তুমি ভুলে গেলে না-কি? তোমাকে তোমার অফিসে নামিয়ে দিয়ে এসেছিলাম কোনো এক ঝড়-বৃষ্টির দিনে?
মনস্বিতা লজ্জা পায়। এতসব ঘটনায় টালমাটাল গত ক’দিনের দিন-রাত্তির। ঠিক এসময়ে সেদিনের ঘটনাটা মনেই পড়েনি। মনস্বিতাকে নতুন করে পুরোনো দুঃখ খুঁচিয়ে তুলবেন না করে তমালকৃষ্ণও সেদিনের কথা বেশি একটা বাড়লেন না। মনস্বিতা উত্তর দেয় :
-তা বের হবো। কিন্তু আমি একাই চলে যাব।
-তোমার আর সঙ্কোচ গেল না। আজও আমাকে আপন করতে পারলে না। অফিস ছুটির পর বের হয়ে পোড়ো না, আমি আসছি।
অপর প্রান্তে মনস্বিতার চোখের কোণে অশ্রু জমতে থাকে। গত রাতের সারাটা সময়ের নোংরা আবর্জনার ক্লেদগুলো যেন বৃষ্টির জলে ধুয়েমুছে নিকানো উঠোনের মতো ঝকঝকে হয়ে ওঠে। জীবনটা হঠাৎ হঠাৎ কোনো মানুষের স্পর্শে কেমন সজীবতা ফিরে পায়। ঠিক শীতের শুষ্ক-রুক্ষ গাছের পাতা যেমন হঠাৎ বৈশাখী ঝড়ের সাথে ধেয়ে আসা বৃষ্টির প্রখরতর পাতে পরিষ্কার আর সতেজ হয়ে আসে, তেমনি তমালকৃষ্ণ এসে দাঁড়ান মনস্বিতার উত্তাল নৃশংস যাপনের মাঝখানে। নষ্টামি ভ্রষ্টামিগুলোর কলঙ্ক মুছে দিতে যেন আসেন তিনি! আসেন দেবতার মতো। আসেন বন্ধুর মতো। আসেন বড় ভাইয়ের মতো। আসেন পিতার মতো। ততক্ষণে অপর পাশে ফোন রাখার শব্দ শোনা যায়। মনস্বিতা না বলতে পারে না তমালকৃষ্ণকে। কী এক গভীর ছায়াচ্ছন্ন ঘোর লাগে তার। কী আছে তমালকৃষ্ণে মনের ভেতর! কী আছে এর বাহিরে! সবই তো সেদিন দেখেছে মনস্বিতা। তার বাড়িঘর স্ত্রী। একমাত্র সন্তান টুলটুলের সাথে যদিও দেখা হয়নি সেদিন। তবু এই বস্তুগত জটিলতার মাঝেও যেন মনস্বিতাকে জড়িয়ে তমালকৃষ্ণের কোনো এক অধরা অনামা অনস্তিত্বকে কাছে পাওয়ার প্রবল পিতৃত্বের বোধ জাগ্রত হয়ে ওঠে।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের [৪৬] লিংক
http://www.teerandaz.com/2094-2/

পরবর্তী পর্বের [৪৮] লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-40/