শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪৯]

0
188

পর্ব ৪৯

ফারুকের এমন নির্বাক প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে মনস্বিতার বাবা কিছু বুঝে উঠতে পারেন না। ঘর নিস্তব্ধ। ঘরের সদর দরজাটাও খোলা! ফারুক তার সাথে কথা না বলে নীরবে বেরিয়ে গেল! সত্তরের ওপর বয়েস মোহাম্মদ আবদুল হক সাহেবের। মুখে কাঁচাপাকা দাড়ি। একমাথা ধূসর শাদায় মেলানো ঘনচুলের মাঝারি গড়নের মনস্বিতার বাবা খুব ধীর গতিতে ভেতরের ঘরের দিকে আগান। তার মায়ের পাঠানো কিছু জিনিসপত্র হাত থেকে নামাতে ভুলে যান। মনস্বিতা তখনো মাথার আহত জায়গাটাতে হাত দিয়ে ঝরে পড়া রক্তস্রোতের প্রবল প্রত্যার্হণ প্রতিরোধে প্রাণান্ত। প্রস্ফুট দুচোখে তার বিস্ময় সীমানাবিহীন। তরল গরম রক্তের স্রোত উথলে উছলে পড়ছে তার দু’হাতের এক-একটি আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে। ধারাজলের মতো গড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। গায়ের জামা রক্তে রক্তে লাল। হঠাৎ টের পায় হাতের আঙুলে জড়িয়ে জড়িয়ে চুলে আর রক্তে মাখামাখি করে বেজে উঠছে কণা কণা কাঁচের টুকরো টাকরা। হাত দিতে গেলেই বিঁধছে মাথায়। মনস্বিতা জানে না এমন সময় কি করা যায়! ভীষণ এক বিপন্ন ব্যধিঘোরে কাটিয়েছে প্রায় দশটি বছর। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় যে তেমন করে অসুস্থ হয়নি সে এ সংসারে কোনোদিন। একটু মাথাধরা, অন্তঃসত্তা অবস্থায় একটু আধটু বমিভাব বা সামান্য দুদিনের জ্বর ছাড়া তেমন কোনো শারীরিক অসুস্থতা কাবু করতে পারেনি মনস্বিতাকে কোনোদিন। আজ একী দুঃসহ ঘটনা ঘটে চলেছে তার মাথা থেকে শরীরের আদ্যপান্তে! কে নেবে তাকে ডাক্তারের কাছে। আদৌ কি এ নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবার দরকার আছে? যে মনস্বিতা নিজের রোগবালাই নিয়ে কখনো ডাক্তারের কাছে তেমন করে যাবার দরকার মনে করে নি, সে আজ কি করে বুঝবে এই দুরন্ত দুঃসহ অবস্থায় প্রায় মধ্যরাত হতে চলা সময়ে কোথায় যাবে! কি করবে! কতটা ক্ষত মাথায়! কতটা ক্ষতই বা মনে অথবা মস্তিস্কের কোণায় কোণায় সচকিত! প্রিয়তম সন্তানের সংসারের অবিশ্রান্ত বিধ্বংসী পতনের সামনে হঠাৎ এসে গিয়ে হক সাহেবও ভীষণ কুণ্ঠিত। কলুষিত মন তার আজ, আহতহৃদয়। এতটা ব্যথা তিনি নিজে কখনো আগে কোনো কারণে পেয়েছেন কি না মনে করতে পারেন না। পুরুষের চোখে জল সহজ নয়। নিভৃতে কেঁদে কেঁদে সারা যে জল তারেই প্রবোধ দিতে আজ তিনি মর্মন্তুদ কোথায় কোথায় যে বেদনা বাজে! সন্তান শারীরিক যাতনায় আড়ষ্ট, এই ব্যথা তাকে যতটা না ক্লিষ্ট করছে এই মুহূর্তে তার চেয়ে বেশি আহত তিনি এই মারণযজ্ঞে প্রতিফলিত হয়ে ওঠা মনস্বিতার এ যাবত সকল অপমান আর ক্লান্তির অবশেষ আন্দাজ করতে পেরে। তার দুই চোখ যেন ফেটে পড়ছে জলে কিন্তু নেই তবু জলের লেশমাত্র। তিনি সম্ভ্রমহীন বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝখানে দুলছেন মাতালের মতো। সেই বিস্ফারিত নত চোখের দিকে তাকিয়ে মনস্বিতা মূক, বধির। কোনো কথা সরে না মুখে তার। কথাও ভুলে গেছে যেন সব। শুধু মন বলে চলেছে :
-হায় বিধাতা, এ মুহূর্তে আমার দুচোখ তুমি অন্ধ করে দাও। পৃথিবী দ্বিধা হোক…
পিতার মহাকাল ব্যপ্ত হয়ে দিকে দিকে প্রচণ্ড নিনাদে কেঁদে ওঠা অথচ আপাত মূক যন্ত্রণার কথা ভেবে মনস্বিতা আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। একদিকে নিজের মাথায় তীব্র যাতনা আর অন্যদিকে এতকাল গোপনে চুপিসারে লুকিয়ে রাখা তার নিভৃতে গোপন করে রাখা নিজস্ব প্রলয়ের সব জট খুলে গিয়ে যে বিষণ্ন বিধ্বস্ত বর্তমান তৈরি করছে তার জন্মদাতার মনোভূমিতে, সেই যন্ত্রণা নিয়ে এই মুহূর্তে সে মরণোন্মুখ। মনে পড়ে বাবার হাত ধরে কোনোমতে বড় রাস্তার পাশটাতে এসে দাঁড়িয়েছিল সে। কেউ কি তাকে দূর থেকে ডেকে উঠেছিল, ‘আরে মনস্বিতা না? কি হয়েছে’ বলে! তারপরের ঘটনা আর তার মনে নেই। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিল বোধ করি। বাবা তাকে কোনো এক হসপিটালে নিয়ে এসেছেন হয়তো। যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন তার চারদিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা দু’জন মানুষ দেখতে পায়। বাবা আর তমালকৃ্ষ্ণ! মনস্বিতার বিস্ময়ের ঘোর কাটেনা। তবু কী এক খোঁজ। সতৃষ্ণ চোখে চারপাশে চেয়ে দেখে কোথাও ফারুক নেই। বুকটা তবু এক নির্লজ্জ হাহাকারে ভরে উঠতে থাকে।
-মাথায় দুটো স্টিচ পড়েছে। একটু সাবধানে থাকবেন কদিন। শরীর খুব দুর্বল। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করা দরকার। পারলে কেউ পাশে থাকবেন সবসময়, বলেই ডাক্তার অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে এদিক সেদিকে তাকাতে তাকাতে বলেন :
-রোগীর হাজবেন্ড নেই? তিনি কোথায়?
কারো মুখে কোনো সারা নেই। অস্থির অসংলগ্ন মাটির গভীরে যেন ছড়িয়ে পড়তে থাকে কিছু শূন্যতা। গ্রাস করে অন্ধকার করে আসা যাবতীয় সম্মান অসম্মানের মৌলিক ভিত্তিভূমিটিকে। শূন্যতার অন্ধকারগুলো কেবল কালো ছড়াতে ছড়াতে মনস্বিতাকে নিয়ে ফেলে দিচ্ছে এক অজানা অনামা মহাশূন্যে। এরই নাম কি ব্ল্যাকহোল! কালো গহ্বর! বুকটা অত ভার লাগে কেন! লোকলজ্জার আর কোনো অবশেষ রইলো না আজ মনস্বিতার। যদিও তমালকৃষ্ণ বেশ আঁচ করতে পারেন মনস্বিতার মানসিক অবস্থাটা। আজ তার বাবা জানলেন। মাধবীও জেনে যাবেনই কোনো না কোনো সময়। এই যদি হবে, এতকাল তবে কি করেছে মনস্বিতা! কেন এতকাল যাবতীয় ক্রুদ্ধতা আর যাতনার অবশেষ গোপনে লুকিযে রেখে জ্বেলেছে ধুপের অবশেষ! পুড়িয়ে পুড়িয়ে তবে কি ভেসে ওঠেনি বাতাসে কোনোই সুঘ্রাণ! তবে কি আর মূল্যবান এ জীবন! চিরকাল মাথা নত করে চলা! বাবার বুকের বেদনা হয়ে ওঠা। মায়ের মনে মাকড়শা হয়ে কষ্টের জাল বোনা। পাড়া প্রতিবেশী লোকজনের চোখেমুখে সদা হাস্যরসকৌতুকের দারুণ সংশ্লেষণে আড়ালে আবডালে কানাকানি। লোকচোখে কৌতুকের নিদারুণ কটাক্ষ! এই কি তবে এই জীবনদানের শেষ পরিণাম! কোনোভাবেই এই দুর্বল শরীরে মনস্বিতা নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। কেন সে এতটা রেগে গেছিল। কেন সে ফারুককে এভাবে বলতে গেছে এই ভেবে অনুশোচনার চূড়ান্তে পৌঁছাতে থাকে। কিন্তু করারই বা আর কী ছিল! আবর্জনাগুলো দিনে দিনে জমতে জমতে কখন যেন পাহাড় হতে শুরু করেছিল। যার ভার মনস্বিতা একা আর নিতে পারছে না। হসপিটালের ছাড়পত্র পেলে পর মনস্বিতা নিজেই হেঁটে বাইরে আসে। পাশে পাশে আর সবাই। গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মনস্বিতা জানে তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী আজ আর তাকে একা ছাড়বেন না। তবু সে পরবর্তী ঝামেলা এড়াতে চায়। বাবার সাথে রিক্সায় করে নিজের বাসায় আলাদা চলে যাবার প্রাণপন চেষ্টাতেও বিফল মনস্বিতা অবশেষে উঠে বসে তমালকৃষ্ণের গাড়িতে। এখানেও আজ তার জন্য রয়েছে এক বিস্ময়ের বিমূর্ততা, কে জানতো এটা! ড্রাইভারের সিটে বসে আছে কেউ একজন। তার পাশে তমালকৃষ্ণ উঠে পড়েন। মনস্বিতার বাবা আর মাধবী মনস্বিতার সাথে পেছনে। সকলে উঠে বসতেই তমালকৃষ্ণের মুখে একটি নাম উচ্চারিত হয়। মুখ দেখা যায় না যার। পেছনে একবারও ফিরে তাকায় না মানুষটি। আর তখনই হঠাৎ খেয়ালে আসে তার, বরাবরই মনস্বিতা তমালকৃষ্ণের গাড়িতে ড্রাইভারের সিটে তমালকে দেখে এসেছে, পাশেই মনস্বিতা বসে থেকেছে। আজ অন্য কেউ ড্রাইভিং সিটে স্টিয়ারিং ধরে বসে! মনস্বিতার মাথায় নাকি সারা শরীর জুড়ে কি এক অদ্ভুত আলোড়ন সমুদ্রের প্রমত্ত ঢেউয়ের মতো পরাক্রান্ত এক ঝড়ের আভাস দিয়ে চলে যায় সে বুঝতে পারে না।
-টুলটুল, চলো। মনস্বিতাকে ওর বাসায় নামিয়ে রেখে আমরা বাড়ি যাব।
মনস্বিতা চমকে ওঠে। টুলটুল! বাবা ছেলে দুজনই এখানে!
সুপ্তোত্থিত ভীষণ এক অগ্নিগিরির পূর্ণ উদগীরণের ভয়ে মনস্বিতা কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকে। কেউ জানে না কী ভীষণ তার প্রকম্পন! কী ভয়ালরূপে পুড়ে ঝলসে যাচ্ছে মনস্বিতার আজীবন লালিত আভিজাত্যবোধ আর আত্মসম্মানের শক্ত দেয়ালটি, এই মুহূর্তে অগ্নিগিরির গলিত লাভার আশ্লেষে! কাকে বলবে তার গোপনে দহনের ব্যথা! কে দেবে এই মুহূর্তে সংগঠিত সব ঘটনা-দুর্ঘটনার সমাধান। সব তারই দোষ? সত্যিই কি তার দোষ? নাকি এই ছিল নিয়তি। কী ছিল সেই ছোট্ট ভুলটি? কী যেন ছিল সেই মিথ্যে? কোন ভুল সে করেছিল, যে ছিদ্রপথ দিয়ে ঢুকে গেল নিয়তির বিষ? ফনা তুলে ভয়ঙ্কর শাপের মতো আজ যে মনস্বিতার সকল স্বপ্নসাধ আর সামান্য বাসনার সর্বনাশ করতে উদ্যত! সত্যিই কি তাহলে মনস্বিতা এতগুলো বছর ধরে লালন করে এসেছে এই ঠুনকো ঘরবাড়ির কাগুজে দেয়াল! কীভাবে ঠেকাবে সেই লজ্জা আর ধ্বংসের আসন্ন অনভিপ্রেত ঘটনাটিকে! কিছু একটা বলতে যায় সে। কিন্তু ততক্ষণে গাড়ি স্টার্ট নিয়েছে। সশব্দ গতির তাণ্ডবে হারিয়ে যায় সেখানে মনস্বিতার অসুস্থ দুর্বল কণ্ঠের মৃদু নিষেধের সকল আলাপ।
মধ্যরাত অতিক্রান্ত হতে চলেছে। রাগ ফারুককে যখন উন্মাদ করে তোলে তখন তার পেছনের কোনো কিছু খেয়াল থাকে না। কে তার আঘাতে মরে গেল। পেছনে কে ভাত বেড়ে বসে আছে। এসব সে জায়গা ত্যাগ করলেও আর মনে রাখতে পারে না। বিয়ের পর প্রথম প্রথম মনস্বিতা যখন ভাত বেড়ে অপেক্ষা করতো তখন সে হয়তো বন্ধু বান্ধবের পাল্লায় পড়ে খেয়েই ঘরে ফিরেছে। নিজের কাজের দায়ে ঘরের বউয়ের মনরক্ষা করার জন্য মিথ্যে কথা বলা কিংবা অভিনয় করে আবার দু’নলা ভাত খেয়ে মনস্বিতাকে সঙ্গ দেয়ার মতো আদিখ্যেতা তার কোনো কালেই পোষায় না। আজও ফারুক যখন নিজের রাগ কমিয়ে বাড়ি ফিরেছে তখন ঘরে কেউ নেই। বিছানার পাশে বেডরুমের ফ্লোরে ছোপ-ছোপ জমাট রক্তের দাগ দেখে বুঝতে পারে বড়জোর হসপিটাল পর্যন্ত যেতে পেরেছে। তাছাড়া যেহেতু মনস্বিতার বাবা এসে গেছিলেন, তাকে ডাক্তারের কাছে নিতে তেমন সমস্যা হয়নি। প্রাণসংশয়ের আর কোনো সম্ভাবনা নেই। মনস্বিতাকে তার বাবা বাড়িতে নিয়ে যাবেন না। মনস্বিতাও তার এই সংসারটা ফেলে যাবে না। এই বিশ্বাস ফারুকের প্রবল। নিশ্চিন্তে তাই ফারুক অপেক্ষা করছিল বাপ বেটির ফিরে আসার। রাত শেষ হতে চলেছে যখন। সুপ্ত নিশা। ঘুমে যখন সমস্ত নগর মানবেরা। দূর থেকে এই গলিতে একটা গাড়ি ঢোকার শব্দটি তার কান এড়ায় না। গেটে তালা দিয়ে রাস্তার অন্য দিকটাতে গিয়ে দাঁড়ায়। গাড়িভর্তি এতজন লোক দেখে প্রথমে খানিকটা ভয় পেয়ে যায়। মনস্বিতার বাবা কী তবে ওর ভাইবোন সকলকে এনে জড়ো করলেন! কিন্তু স্থিতধী এই লোকটিকে মনে মনে সে খুব সম্মান করে। মনস্বিতার মাকেও। কারণ এত এত ঝামেলায় নিজের বেকারত্ব কিংবা সাংসারিক উদাসীনতায় অন্যান্য মেয়েদের মা বাবার মতো জামাতার কাছে তারা কখনো মেয়ের পক্ষ নিয়ে কোনো কথা বলতে আসেননি, এমনকি তার বড় ভাই বোনেরাও আসেনি স্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার কিংবা দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্নে তাকে বিদ্ধ করতে। এ কারণেই সে এখনো দারুণ পৌরুষ ধরে রাখতে পেরেছে মনস্বিতার কাছে। কিন্তু আজই প্রথম মনস্বিতার বাবা একেবারে ঘটনার মাঝখানে এসে পড়েছেন। কী করে লুকোবে এই ঘটনা কিংবা দুর্ঘটনার বিস্ফোরণ। তবু নিজেকে দোষী মনে হয়নি কখনো ফারুকের। তাই চুপচাপ বের হয়ে গেছিল নিজে ঘর ছেড়ে। গাড়িটা কাছাকাছি আসতে দেখেই সচকিত হয়ে ওঠে ফারুক। তমালকৃষ্ণ গাড়ি থেকে নেমেই দরজা খুলে ধরলে মনস্বিতা আর বাবা বের হয়ে আসেন। ফারুকের শরীরে রক্তে স্নায়ুতে চাড়াল রাগটা উল্লম্ফনে প্রমত্ত হয়ে ওঠে। ভালো করে খেয়াল করে বুঝতে পারে সামনে আর একজন বসা। ড্রাইভার হবে হয়তো। নির্বাক আর নির্মোহ সেই লোকটি চুপচাপ বসে। কিন্তু বেশ কয়েকবার ফারুক তমালকে নিজে গাড়ি ড্রাইভ করতে দেখেছে। মনে একটা গালি আসে ফারুকের :
-চুৎমারানি! তুই এখানেও এসে হাজির! বেটা আবার ড্রাইভার নিল কবে। ভাবতে ভাবতে নিজের মনেই হাসে।
-শালার বউ মনে হয় চরিত্র খারাপ বলে ড্রাইভার ধরিয়ে দিয়েছে। মেয়েদের নিয়ে গাড়িতে উঠলে যাতে রিপোর্টগুলো ঠিকঠাক মতো পেয়ে যায়। হা হা, মনে মনে হাসে। মাটিতে পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরা এত জোরে কিক্ করে যে পাশের বাড়ির নিচতলার জানালার কাচে একটা ছোট্ট ফাটল তৈরি হয়। কিন্তু বিভোর ঘুমে লোকজন হয়তো টের পায় না।
-শা…লা। আমার শ্বশুরজিকেও হাত করে ফেলেছিস দেখছি!
গাড়ি থেকে টুলটুল নামে না। তমালকৃষ্ণ রাজচক্রবর্তী মনস্বিতা আর ওর বাবাকে বাসার ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে বের হয়ে এসে গাড়িতে উঠে বসেছেন মাত্র। মনস্বিতার অস্থির মন ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ফারুককে না দেখে এক অদ্ভুত আশঙ্কায় বার বার দুলে উঠছে। বাবার নিষেধ অমান্য করে বাসার জানালার পর্দা সরায় আর অমনি চোখে পড়ে যায় দুঃস্বপ্নের বাস্তবরূপ। ফারুক গাড়ির বাইরে থেকে জানালার কাচে দু’হাতে ভর দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে তমালকৃষ্ণকে কী যেন বলছে। তমাল দেখলেন ফারুকের চোখ দুটো রক্তাভ, জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। মদ্যপান করেছে নাকি ছেলেটি! মনস্বিতা সাথে সাথেই জানালা থেকে সরে গিয়ে এক দৌড়ে বাইরে বের হয়ে আসে। ফারুক ততক্ষণে চাউর হয়েছে তমালকৃষ্ণের ওপর।
-ড্রাইভার! গাড়ি স্টার্ট করবে না। বাইরে বের হয়ে আসুন, তমালকৃষ্ণ।
টুলটুলের কানে আঘাত করে নিজের বাবার নাম ধরে ডাকছে একটি মানুষ যে তার বাবার চেয়ে অনেক ছোট। তমালকৃষ্ণ বিস্মিত নেত্রে অধোবদন। টুলটুলের সামনে কি করবেন বুঝে উঠতে পারেন না! গাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়া কি ঠিক হবে! একবার কী ভেবে মনস্বিতার বাসার দিকে তাকিয়েই শিউরে ওঠেন তিনি।
-সর্বনাশ! মনস্বিতা দৌড়ে আসছে এদিকে। এবার মেয়েটির না জানি কি সর্বনাশ হয়ে যায়! দুর্বল শরীর। প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। স্যালাইন দিতে হয়েছে শরীরে। এই অবস্থায় মেয়েটির শরীর আর মনের ওপর এই চাপ কি নিতে পারবে। ছেলেটি কি বোকা নাকি!
টুলটুল শুনতে পেল কথাগুলো। বুঝলো তার বাবা নিজের মনেই কথাগুলো বলে চলেছেন। দ্রুত গাড়ি থেকে বের হয়ে আসার প্রস্তুতি নেন তিনি। টুলটুল কিছু বুঝতে পারে না। বরাবরই তার কম কথা বলার স্বভাব। তবু বলে :
-লোকাটি কে বাবা? নেমো না। আমি দেখছি।
তমালকৃষ্ণ টুলটুলের প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বের হয়ে আসেন গাড়ি থেকে।
-না, তুমি বসো।
মনস্বিতা যতক্ষণে পৌঁছে গেছে গাড়ির কাছাকাছি, ফারুক ততক্ষণে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য। বাস্তবিক সামাজিক কিংবা পারিবারিক যে কোনো সম্মান অসম্মান কিংবা আত্মসম্মানবোধে্র স্খলিত অংশে অবস্থান করছে। তমাল এসে দাঁড়িয়েছেন ফারুকের সামনে। ফারুক তমালকৃষ্ণকে উদ্ধত অসংস্কৃত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত। শার্টের হাতা গুটিয়েছে কেবল, মনস্বিতা ক্রোধান্ধ বাঘিনী। এই দুর্বল শরীরে দুটো স্টিচ দিতে হয়েছে যে নারীর মাথায় ঘন্টা দুই আগে, কোথা থেকে তার শরীরে যেন দুর্গা এসে ভর করেন এই সুবেহসাদিকের আলোয় মহিষাশুর বধে! ফলে মনস্বিতাও জ্ঞানশূন্য। উদ্ধত। প্রতিশোধ পরায়ণ। যে কোনো মূল্যে রক্ষা করবে সে তমালকৃষ্ণের সম্মান। টুলটুলের সামনে নিজের বাবাকে অপমানিত হতে দেবে না সে কোনোমতেই। যেন উড়ে আসে সে ঈশ্বরের ডানায় ভর করে ফারুকের সামনে। শার্টের কলারটা টেনে ধরে দু’হাতের সর্বশক্তি দিয়ে। মাথাটা কি একবার ঘুরে উঠেছে তাতে। ওসব পাত্তা দেবার সময় নেই এখন। খামচে ধরে শার্টের কলার আরও শক্ত করে যাতে কোনোভাবেই ছুটতে না পারে। তার হাতটা সরে গেলেই সর্বনাশ।
-এসো। চলো। আমার ওপর বীরত্ব দেখানো শেষ হয়েছে তো! ভেতরে চলো।
টুলটুলের দিকে একপলক তাকিয়ে বলে :
-আপনি গাড়িটা বের করুন তো।
টুলটুল বাবাকে ডাকে।
-বাবা, চলে এসো।
তমালকৃষ্ণ শেষ চেষ্টায় প্রবৃত্ত হন…
-শোনো মনস্বিতা আ…
কথা শেষ হয় না।
-আপনি গাড়িতে বসুন।
ফারুক মনস্বিতার হাত থেকে ছোটার জন্যে তখনো প্রাণপনে চেষ্টা করে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে মনস্বিতার গালে কষে একটা চড় লাগিয়ে দেয়। অথবা মাথার ব্যাণ্ডেজটার ওপরই দেয় এক কোপ বসিয়ে যাতে ইহলীলা এখানেই সাঙ্গ হয়। অপমানে সে পুরোপুরি দাহ্য। মনস্বিতার হাত থেকে শার্টের কলার ছাড়াতে গিয়ে টের পায় অসুরের শক্তিতে ধরে আছে মনস্বিতা, মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়। তাও প্রাণান্ত চেষ্টা চালায়, দু’জন বাইরের মানুষের সামনে এভাবে সে হেরে যেতে পারে না। সর্বশক্তি দিয়ে একটা চড় মারে মনস্বিতার গালে। ঘাড়ের ডানপাশে মাথাটা হেলে পড়ে মনস্বিতার। কয়েক মুহূর্তের জন্য মাথাটাও আবার ঘুরে ওঠে। তবু শিথিল হয় না তার মুঠি। ফারুকের শার্টের কলারটা ধরে রাখে।
টুলটুল আর তমালকৃষ্ণ বিস্মিত। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। মনস্বিতা তখন ধমক লাগায়।
-গাড়িটা স্টার্ট দিচ্ছেন না কেন? ছাড়ুন…
কোনো কিছুর তোয়াক্কা করছে না এই ক্ষণে। মান-সম্মান-সমাজ-সংসার-লজ্জা-অপমান-ভয় সবকিছু থেকে অনেক অনেক দূরে তার অবস্থান এখন। ততক্ষণে গাড়ি বের করেছে টুলটুল। মনস্বিতা কেবল তাকিয়ে আছে গাড়িটা কতদূর এগিয়েছে সেই দিকে। গাড়িটি বাঁক নেয়ার মুহূর্তে তমালকৃষ্ণ দূর থেকে তাকিয়ে দেখেন পেছনে। তখনো মনস্বিতা চেপে ধরে আছে শার্টের কলার। চড়টা খেয়ে বুকের ঠিক মাঝখানে ঘনিয়ে ওঠা সকল ক্রোধ ঢেলে দেয় ফারুকের বুক বরাবর। ফারুককে একটা ধাক্কা মারে। নিজের হাত দুটোরও একটু বিশ্রাম দরকার। মনস্বিতার ক্রোধের আগুনে পুড়ে যেতে যেতে ফারুক ছিটকে পড়ে রাস্তায়। মনস্বিতার চোখে নিস্তরঙ্গ জলের ধারা। বাবার সাথে টুলটুলও পেছনে ফিরে বিমুগ্ধ বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখে ঘণ্টাখানেক আগের অজ্ঞান হয়ে থাকা মেয়েটির রুদ্রমূর্তি। শ্রদ্ধায় নিজের অজান্তেই তার হাতটি কপাল স্পর্শ করে। মনে মনে বলে ওঠে, ‘হ্যাটস অফ্’।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (৪৮) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-40/

পরবর্তী পর্বের (৫০) লিংক 

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-42/