শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৫১]

0
187

পর্ব ৫১

হক সাহেব নিজের স্ত্রীর কাছে সন্তানের যাতনার এইসব ঝাঁপি খুলে বসেননি। কিন্তু কিছু কথা না বললেই নয়। কী করে বলবেন এত কথা এত যাতনার প্রাগৈতিহাসিক জটাজাল। তার স্ত্রী স্থিতধী মানুষ। বাবার তালুকদারি সামলাতে একসময় সাথে সাথে থেকেছেন। এটা তার জানা। খুব বুদ্ধি করে চলতে পারেন। না হলে সরকারি চাকরি করে এত অল্প টাকায় ছ’টি সন্তানকে মানুষ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না কোনোকালেই। কিন্তু তিনি জানেন কত সাধনায় কত সাধ করে মেয়েদের তিনি বড় করেছেন। আজ মনস্বিতার এই যাতনার ইতিহাসটি কি তিনি সইতে পারবেন! এতকাল এসবতো কেউই জানতেন না তারা। সেদিনও হঠাৎ মাঝখানে না পড়ে গেলে কি মনস্বিতা এ-জীবনেও তার এই দুঃসহ যাতনার কথা বলতো তাদের! মনস্বিতাতো তার মায়েরই আদলে গড়া। স্বামীর মনুষত্বহীন বর্বর আচরণ, সংসারের প্রতি উদাসীনতা, মনস্বিতার ওপর অমানুষিক নির্যাতন তার কন্যা কোনোকালেই মুখ খুলে বলতো না বাবা মায়ের কাছে। কিন্তু হক সাহেবের আজ মনে হচ্ছে তিনি গিয়ে এই দুর্ঘটনার মধ্যে পড়ে একদিকে ভালোই হয়েছে। না হলে হয়তো আরও বছর বছর জানা যেত না এই সব ঘা-পুঁজ-রক্তের মধ্যে মেয়েটি তার কীরকম নিদারুণ জীবন যাপন করছে। তাই তিনি খানিকটা আঁচ দিতে চান মনস্বিতার মাকে। খুব সাবধানে কথা শুরু করেন তিনি।
-বলছিলাম, মনস্বিতার কিছু টাকা দরকার আমার মনে হল।
-কেন? হঠাৎ? কিছু বলেছে?
-না। তা বলেনি।
-ওর শরীর ভালো আছে তো?
কথাটির উত্তর দিতে হক সাহেবের জিভ সরে না। বুকটা ভেঙে আসে। হাহাকার করে ওঠে কোথাও। বলতে ইচ্ছে হয়। বুকে ফেঁড়ে যেন খানিকটা সত্যি বের হয়ে আসে
-না ভালো নেই মনস্বিতার মা। মেয়েটা আমার মরতে বসেছে। তুমি গিয়ে ওকে আমাদের কাছে নিয়ে এসো।
কিন্তু মুখে আনা সম্ভব নয় কথাগুলো। কিছু একটা অঘটন ঘটে যেতে পারে খুব দ্রুত। তবু তার মুখে মেঘের ঘনছায়া মনস্বিতার মায়ের তীক্ষ্ণ চোখ এড়ায় না। তিনি চেপে ধরেন মনস্বিতার বাবাকে।
-ঠিক করে বল, কি হয়েছে মনস্বিতার?
-মেয়েটা বড় কষ্ট করছে। আমি একা একা আর সইতে পারছি না মনস্বিতার মা। কাকে বলবো তোমাকে ছাড়া।
চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে থাকে তার। বিস্মিত নয়নে মনস্বিতার মা চেয়ে থাকেন হক সাহেবের দিকে কিছুক্ষণ। খুব সঙ্গোপনে নিরীক্ষণ করেন তার চোখের জল। নিরেট ব্যথার জল বুঝতে তার এতটুকু কালক্ষেপন হয় না। তারপর তার চোয়ালের তালুকদারি হাড়গুলো শক্ত হতে থাকে। রক্তে আভিজাত্য প্রবল তাণ্ডবে তুখোড় করে তোলে চেতনার সূক্ষ্ণতম রন্ধ্রগুলোকেও। চোখের সামনে যেন তিনি দেখে ফেলেন সিনেমার মতো অনেককিছু। তারপর খুব শান্ত কণ্ঠে বলেন :
-তুমি সব প্রস্তুত করো। আমি ঢাকা যাব।
এই মুহূর্তে খুব অসহায় লাগে হক সাহেবের। নিজের আবেগের অনিয়ন্ত্রিত আতিশয্যে তিনি কি মারাত্মক কোনো ভুল করে ফেলেছেন? এ-সময় যদি মনস্বিতাকে দেখতে যান তার স্ত্রী আর মেয়ের মাথায় রক্তাক্ত ঘা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করেন তবে কী ঘটতে পারে, তা তিনি আঁচ করতে পারছেন না।
বাবা চলে গেলে মনস্বিতা নীরবে নিজের ঘরে ফিরে আসে। শরীরটা খুব একটা সচল নয়। অফিসে ফোন করেছিল আগেই। আবার সাতদিন অ্যাবসেন্ট হয়ে গেল। তবু মনে হচ্ছে আরও দুটো দিন পার করে রবিবার অফিস শুরু করলে ভালো হয়। বাড়িতে আর কিইবা যত্ন তার। কে করবে তার যত্ন। ইন্টারসিটিতে চলা বাসে করে দু’বেলা দীর্ঘ দূরত্বের জার্নি তাকে আজকাল খুব বেশি পরিমাণে ক্লান্ত করে। মেয়েটি মরে যাবার পর থেকে আর কোনো কাজে গতি পায় না মনস্বিতা। আরও দু’দিনের ছুটিতে ওই জার্নি আর কাজের ধকল থেকে ক’দিন মুক্ত থাকা আর কি। ঘরে ফিরতে ফিরতে ফারুকের ‘ন্যাকামির শেষ নেই’ কথাটির রেশ কানে লেগে থাকে। বরাবরই এরকম নিষ্ঠুর ফারুক। কিন্তু আজ এমন কথা বলবার যথেষ্ট কারণ তার আছে। যে অপমান সেদিন তমালকৃষ্ণ চক্রবর্তী আর তার পুত্র টুলটুলের সামনে করেছে মনস্বিতা, তাতে তার রাগটা থেকে যেতেই পারে। এতে ফারুকের কোনো দোষ নেই। এভাবেই নিজের দোষের বিপক্ষে ফারুকের আচরণকে মনে মনে প্রশ্রয় দিয়ে আসছে মনস্বিতা বরাবর। তাছাড়া আজকের অপরাধ তো তার গুরুতরই। কিন্তু তার আর কী করার ছিল! ফারুকের অসংস্কৃত আচরণ দিনে দিনে মাত্রা ছাড়াচ্ছে। এই মানুষটা কি কোনোকালে ভালোবাসতে শেখেনি? এতগুলো বছর পাশাপাশি বসবাস করেও এই ভাবনাটি আজ উদ্বিগ্ন করে তোলে মনস্বিতাকে। যার বাবা মায়ের জন্য কোনো টান নেই, ভাইবোনের কথা যার মনে পড়ে কি পড়ে না, বোঝা যায় না, সন্তান মরে গেলে যে বিষণ্নতার ধার ঘেঁষে না, স্ত্রী না খেয়ে থাকলে যার কোনো বিকার থাকে না, চাকরিবাকরি না করেও যে দিনের পর দিন নিশ্চিন্তে থাকে, স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা যার খুব নগণ্য বিষয়, অকারণ সন্দেহে অপরাপর মানুষের ওপর চড়াও হতেও যে দ্বিধাবোধ করেনা, সে-মানুষটি কি আসলে তার সাথে চলার যোগ্য!
-কেন কার জন্য এত হাহাকার মনস্বিতা তোমার!
কেন যে এতটা বিয়োগ-ব্যথায় বিচ্ছিন্ন হতে চলেছে দিনের পর দিন, নিজের কাছে এ প্রশ্ন এতকাল অবান্তর ছিল। আজ সে প্রশ্নই এক বিকট আচ্ছন্নতায় আড়ষ্ট করে রাখছে মনস্বিতার দিনরাত। ভেবেছিল নিজের সন্তানটিকে নিয়ে ভুলে যাবে সব। একজন পুরুষের কাছে ভালোবাসা-সম্মান না পেলে কি হয়! সন্তানের বুকভরা ভালোবাসায় একটা জীবন পার করে দেয়া যায়। কিন্তু বিধাতা বাম হয়ে রইলেন। তার সন্তানটি দিয়েও আবার কেড়ে নিলেন। বরং তিনি তাকে বেঁধে দিলেন এই প্রগাঢ় সামাজিক বন্ধনে, শুধুই জৈবিক সম্পর্কে।
ক’দিন ধরেই মনস্বিতার রান্নাবান্না করতে মন চায় না। যে মনস্বিতা খুব যত্ন করে ফারুকের পছন্দ করা খাবার রান্না করতো। ঘরে আসবাবপত্রে একবিন্দু ধুলো জমতে দিত না, আজ সেখানে রাজ্যের উদাসী বালুকণারাই আশ্রয় নিয়েছে পরম সুখে। সংসারের শেষ জোড়াতালির সূঁইটিতেও আজকাল সূতো ভরতে তার মন চায় না। মনটাকে যতটা সম্ভব দোষী করে নিজের কৃতকর্মের দোষ নিজের ঘাড়ে চাপিয়ে যতই ফারুকের দোষ নিজের কাছে লঘু করতে চায়, ফারুক ততটাই উল্লম্ফনে মত্ত করে তোলে চারপাশ। লোকটি কি কখনো নিজের শেকড় কাকে বলে তাও জানেনি? কে কার জন্য জগৎ সংসারে, এ বোধ কি তার কোনোকালে জানার কিংবা বোঝার ক্ষমতা হয়নি? নাকি একজন বিকৃত মানসিকতার জীবনাচরণের শিকার হয়ে চলেছে মনস্বিতা দিনের পর দিন বছরের পর বছর! ভাবতে গেলেই মাথা ঘুরে ওঠে। এত ভাবনা কেন যে মাথায় ঘুরপাক খায়। বড় বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে এসব।
ফারুক অন্যঘরে ফ্লোরে বিছানা করে আজ। অনেক রাত। মনস্বিতার ঘুম আসে না। নিজের কাছে কেমন যেন অপরাধী লাগে নিজেকে। ফারুককে এভাবে অপমান করাটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। যাবে ও ঘরে? ফারুকের হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নেবে না হয়। কী হয়েছে, ওইতো তার স্বামী। সংসার তো ওকে নিয়েই। তাছাড়া এত ইগো ধরে রেখে ভালোবাসা কিংবা সংসার করা যায় না। কাউকে না কাউকে তো উদ্যোগী হতেই হয়। শীত আসছে। ফ্লোরটা ঠান্ডা হয়ে আছে। এর মধ্যে কাঁথা-কম্বল ছাড়া কেমন শুয়ে আছে লোকটি। কেমন যে মায়া লাগে মনস্বিতার। দোষ যদি করেই থাকে তার শাস্তি, লোকসমক্ষে অপমান সবই তো পেয়েছে ফারুক। এবার তাকে ক্ষমা করা যায়। অন্য ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে ফারুক মাত্র সিগারেটটা ধরিয়েছে। মুহূর্তেই পরিস্থিতি বদলে যায়। মাথায় রক্ত চড়ে ওঠে মনস্বিতার।
-তুমি স্মোক করছ?
একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায় ফারুক মনস্বিতার দিকে। ফ্লোর থেকে উঠে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে। কথা বলার প্রয়োজন মনে করে না। বরং মনস্বিতার দিকে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে তার উত্তেজনার গতিবিধি দেখতে থাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে। কারণ, ফারুক জানে এ কাজটা এখন করলে মনস্বিতার উত্তেজনার মাত্রা ঠিক কোন জায়গাটিতে গিয়ে পৌঁছোবে। এতেই তার পরমানন্দ।
-সিগরেটটা ফেল। আর ফ্লোরে না শুয়ে থেকে বিছানায় শুতে এসো।
বলে ভেতর ঘরের দিকে পা বাড়াতে থাকে। মাথাটা বিগড়েছে, সেটাকে খুব সম্ভব শান্ত করা চেষ্টা করে মনস্বিতা।
-ফালতু প্যাচাল রাখো। নিজের কাজে যাও।
কথাটি শুনেই পেছন ফেরে মনস্বিতা।
-তোমার লিভার সিরোসিস। ডাক্তারের নিষেধ আছে সিগরেট খাবে না।
-রাখো তোমার ডাক্তার-ফাক্তার। আর শোনো, আমার লিভার আমার। এসব নিয়ে তুমি ভাবতে এসোনা।
-আমি কিন্তু আমার-তোমার করে কিছু ভাবিনি কিছু। ভাবলে সব অন্যরকম হতো।
-কি হতো হ্যাঁ?
বলতে বলতে ফারুক আর একমুখ ধোঁয়া ছাড়ে ঠিক যেন মনস্বিতার মুখের ওপর। একটানে মনস্বিতা সিগারেটটা কেড়ে নেয়।
-স্ত্রী আর প্রেমিকা কিংবা গণিকা কিন্তু এক নয়। এ জ্ঞানটুকু তোমার হয়নি, নাকি?
কথাটা শুনে তেলে বেগুণে জ্বলে ওঠে ফারুক।
-কি বললে, হ্যাঁ? তুমি কি বলতে চাও?
-বলছি এখনো তোমার চিকিৎসা চলছে। আর আমার টাকায় তুমি এখনো ওষুধ খেয়ে চলেছ। ওষুধের কত দাম। ছ’মাস পরপর রক্তের নমুনা আমেরিকা পাঠাতে হয়, তার দামটাম সবই তোমার জানা। তারপরও যদি বলো, তোমার লিভার তোমার তাহলে…
নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ায় মনস্বিতা। সাথে ফ্লোর থেকে তুলে নেয় সিগারেটের প্যাকেটটাও।
-তুমি কিন্তু খুব বেশি বাড়াবাড়ি করছ মনস্বিতা।
-বাজে কথা বলো না। নিজে তো দু’দিন পর পর কাজকর্ম ছেড়ে ঘরে বসে থাকো। বউয়ের উপর বসে বসে খাও। চিকিৎসার টাকা জোগাতে আর সংসার চালাতে সব চিন্তা আমার করতে হয়ে। আয় ইনকাম আমার দেখেতে হয়। আমিতো তোমার মতো বসে থাকতে পারি না। কিন্তু আমার টাকায় চিকিৎসা করাবে আর চিকিৎসকের পরামর্শ মতো চলবে না, এ তো আমি হতে দিতে পারি না।
কথাগুলো শুনতে শুনতে ফারুকের গায়ে জ্বালা ধরে যায়। বলে কী মেয়েটি! সে বসে বসে খায়! আগুন জ্বলে ওঠে যেন সারা শরীরে। তার পৌরুষে এত বড় আঘাত!
-কি বলতে চাইছ তুমি?
-বলতে চাইছি, ডাক্তারের কথা মেনে চলো। আমার কথাগুলো শুনে চলো।
-সিগারেটের প্যাকেটটি দা্ও।
-না। ওটি আমার কাছেই থাকুক।
মনস্বিতার জেদও আজ মাত্রাছাড়া। ক্ষমা চাইতে এসে এসব দেখে তার আর হিতাহিত জ্ঞান নেই যেন। জেদ যা সে এতকাল করতই না, আজকাল সেটাই সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।
-দাও বলছি প্যাকেটটি।
মনস্বিতার হঠাৎ মনে হয়, এ কী করছি!
যার যা খুশি তাই করুক না। কেউ ওষুধ না খাক, চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাক, সিগরেট পান করুক, কী ছাই বিষ পান করুক, কার কি এসে যায়! এসব ভাবতে ভাবতে পেছন থেকে সিগারেটের প্যাকেটটি ছুঁড়ে দেবে বলে সামনে ফিরতে না ফিরতেই প্রচণ্ড একটা লাথি এসে বুকের মাঝ বরাবর লাগে। ঘোর বিপন্নতার বিস্তার দু’চোখে ছড়িয়ে পড়তে না পড়তেই টাল হারিয়ে ফ্লোরে পড়ে যেতে থাকে মনস্বিতা…

[চলবে]

আগের পর্বের লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-42/

পরের পর্বের লিংক : আসছে