শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৫৩]

0
257
সম্পর্কটি শুধুেই জৈবিক
পর্ব ৫৩

বুকের মাঝখানে ফারুকের পায়ের ছাপটা আরও প্রগাঢ় হয়ে বসে গেছে আজ। একটু আগেও যে মনস্বিতা ভাবছিল হয়তো ফারুকের কোনো না কোনো মনোরোগের কারণ ঘটেছে, কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে তার সব ভেসে গেল জলে। অর্থহীন মনে হতে লাগলো এতকাল ধরে নিজের এই বার বার ক্ষমার উদারতাকে। মনে হয় মনস্বিতাই বুঝি পায়ে ধরে পড়ে রয়েছে এই সংসারে। বোধ করি এই লাথিটারই প্রয়োজন ছিল মনস্বিতার। এরকম একটা কিছু না হলে এ-সংসার থেকে বের হওয়া মনস্বিতার পক্ষে এ-জীবনে সম্ভব হতো না। মনস্বিতা কখনো নিজের জন্য স্বপ্ন দেখতে শেখেনি। বরাবর অন্যের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে করতে কবে যে হারিয়ে ফেলেছে নিজের স্বপ্ন আঁকার ক্যানভাস- নীলাকাশটা! আজ আর মনে করতে পারে না। ওর চরিত্রের ধরণটিই এমন। বিশেষত অক্টোবর-নভেম্বর থেকে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত জন্মানো মানুষগুলো বোধহয় এমনই হয়! সহজে মায়া কাটাতে পারেনা। সহসা ছায়া সরাতে পারে না। ওদের পিঠে আগুন লেগে গেলেও ছায়া ধরে রাখে অন্যের মাথাও ওপর। এ-ধরনের মানুষের ডানা পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে হয়। ওদের বুকে পাথর মেরে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্ত ঝরাতে ঝরাতে নিঃশেষ করে দিতে হয়। তারপর একটা খোলস একটা শব কেবল পরে থাকবে। শবের মতো সোজা করে দাঁড় করিয়ে ছেড়ে দিতে হবে তাকে বিশ্বচরাচরে। ওই নিরোধকের প্যাকেটটা মনটাকে বিমর্ষ করে দিয়েছে। মেয়েটি মরে গেছে মাস সাত-আট চলছে। ওদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়নি। ঘরে যদি কনট্রাসেভটিভের প্যাকেটটা থেকেও থাকে এর একটা আলাদা করে ফারুকের পকেটে কেন যাবে? তার অর্থ তো পরিস্কার! ওয়ারড্রোব থেকে বের করে নিয়ে ওর শার্টের বা প্যান্টের পকেটে রাখা হয়েছিল জিনিষটা। কিন্তু কেন? এ তো বাইরে নিয়ে বের হবার জিনিষ নয়! কিংবা এ-কী ঘরে নিয়ে আসবার জিনিষ! এভাবে একটি করে আলাদা প্যাকেট! গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে মনস্বিতা কোনো একটি সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছুতে পারে। এর আগে আর কখনো মনস্বিতার এমন হয়নি। ফারুকের যদি অন্য কোনো নারীকে ভালোলাগে তাদের মধ্যে কোনো শারীরিক সম্পর্ক হয়, তাতে মনস্বিতার কী আর বলবার আছে? মন, সে তো এক অদ্ভুত জিনিস। যে-কোনো সময় তা পাল্টাতে পারে। কিন্তু সেই মন কী দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখবার মতো কোনো বিষয়! মনস্বিতা এমন কত নারীর কথা জানে, যারা চোখে-চোখে রাখে স্বামীকে। অন্য কোনো নারীর সাথে কী ধরণের সম্পর্ক আছে তার স্বামীর সেটা গোয়েন্দা লাগিয়ে খোঁজ-খবর নেয়। স্বামীর কলিগ কিংবা বন্ধুদের কাছে নিজেও নানা খবরাখবর নেয়। মন নিয়ে স্বামীর সাথে দেন-দরবার করার মানসিকতা মনস্বিতা পোষণ করে নি কোনোকালেই। ওসব দেখে বরাবরই মনস্বিতা বীতশ্রদ্ধ। মন জোর করে পাবার নয়। জোর করে সামাজিক পারিবারিক কিছু অধিকার হয়তো আদায় করে এমনকি ধরেও রাখা যায়। মনস্বিতার তাতে খুব অরুচি। যে-মানুষটি তার নিজের নয় তার প্রতি কিসের অধিকার থাকতে পারে তার! কিন্তু মনস্বিতার ঘাড়ে বন্দুক রেখে দিনের পর দিন যা খুশি করে যাবে ফারুক, এও কী এবার মেনে নেবে? সব কিছু বাদ দিয়ে রাখবে আজ থেকে মনস্বিতা? কিন্তু বাদ কী দেয়া যায়! যায় না। যায় না। তাই কোথায় কী এক অদ্ভুত অনুভব বেদনার মতো বাজে। একটানা সেই তখন থেকে রিনরিন করে বেজে চলেছে মনস্বিতার বুকের ভেতর। এর ভাষা নতুন, অভূতপূর্ব। জানা নেই কী সেটা। কিন্তু পোড়াচ্ছে ভীষণ। খুব দহন। একা একা এ-ভার সহ্যাতীত হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু কে আছে এমন, কার কাছে গিয়ে বলবে এসব। বললেই বা কী হবে। বলে দিতে পারলেই কি ব্যথার উপশম হবে। কমে যাবে এর দহন? এসব নিয়ে এক ছাদের নিচে বসবাস দুঃসহ হয়ে উঠছে। কোথায় যাবে! একটা চাকরি ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই তার। হাতের টাকা সংসারে দুহাতে খরচ করতে হয়। জমানো এক পয়সাও নেই তার কাছে। এই সমাজে একটি বিবাহিত মেয়ের একা থাকার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আর কী আছে। অঢেল টাকা নেই, পাশে কোনো মানুষ নেই, এভাবে কতদূর! কি করে সে আলাদা নিজের মতো করে বাস করবে! সেই আবার একার জীবন! একলা থাকার দিনগুলোতে ছাদের ওপর মদ্যপ ছেলেগুলোর তাণ্ডবের কথা মনে পড়ে যায় মনস্বিতার। নিজেকে খুব অসহায় লাগে এই মহূর্তে।
ঘরে ফিরবার পরেই অদ্ভুত অন্যরকম ভাব আজ ফারুকের। ঠিক বিয়ের পরপর কিছুদিন এমন লক্ষী লক্ষী নম্র অধোবদন দেখেছিল তাকে। মনস্বিতার খুব মন খারাপ। সেদিকে কোনোদিনই ভ্রূক্ষেপ ছিল না ফারুকের। আজও নেই। মনস্বিতার পাশে এসে ধপ্ করে বসে পড়ে। তার বসে পড়ার ভঙ্গিটা ভালো। কিছু সংবাদের আঁচও দেয়। মনস্বিতার ভালো লাগে না পাশে ফারুকের বসে পড়াটা। গা গুলিয়ে উঠতে থাকে। সে উঠে যেতে চায়। ফারুক মনস্বিতার হাতটা ধরে। কতটা কোমল অনুভবে ফারুক স্পর্শ করতে জানে, মনে নেই মনস্বিতার। অনুভবের ভাষা ভুলেছে অনেককাল হলো।
-মনস্বিতা। বসো।
কথা বলে না মনস্বিতা। বসে।
-আমাকে শোকজ নোটিশ দিয়েছে অফিসে।
-বেশ তো। জবাব দাও।
-জবাব লিখে দিয়ে এসেছি আমি অলরেডি।
-আর কি?
-অফিস তোমার সাথেও কথা বলতে চায়?
-আমার সাথে?
-আমার সাথে কী কথা?
-আমাকে যে-মেয়েটিকে নিয়ে শোকজ নোটিশ দিয়েছে, তার ব্যাপারে তুমি কি জানো সেটা নিয়ে কথা বলতে চায়।
-তুমি বলে দাও আমি সব জানি।
-তোমার সাথে কথা বলতে চায়।
মনস্বিতা হঠাৎ খুব কঠিন স্বর নির্ধারণ করে এই মুহূর্তে বাক্য প্রয়োগের জন্য। মনটা তার বিষাদে বেদনায় ঘৃণায় অপমানে পর্যুদস্ত হয়ে আছে। এই দুঃসহ পর্যালোচনার কাল সংক্ষিপ্ত করতে চায় মনস্বিতা। কতটা নির্লজ্জ হতে পারে মানুষ!
-তোমার কী এতটুকু লজ্জাও নেই? ছিঃ…
নির্বাক বিস্ময়ে ফারুক মনস্বিতার মুখের দিকে তাকায়। যেন বহুদিন পর সে খুব ভালো করে তাকিয়েছে মনস্বিতার মুখের দিকে। কী বিভৎস ঘৃণা ঝরে পড়ছে তার চোখের দৃষ্টিতে। বিধ্বস্ত তীব্র বিষণ্ন এ-মুখটি কবে সে দেখেছিল মনস্বিতার মনে করার চেষ্টা করে। পারে না। কিছুতেই আবিষ্কার করতে পারে না এত অত্যাচারিত হবার পরও মনস্বিতার এমন কোনো মুখ দেখেছে কখনো। বিগত কালের যাপিত দিনরাতের কোণাকানায়। আজ এই বিপদগ্রস্ত সময়ে মনস্বিতা তাকে এভাবে ঠেলে দিচ্ছে পেছনে! ভয় আর বিস্ময় মেশানো আরেক তীব্র অপমানের বোধ বুকে নিয়ে নির্বাক হয়ে থাকে ফারুক। কথা আগাতে এগিয়ে নিতে না পেরে অসহায় বোধ করে। মনস্বিতার মন ভীষণ আক্রান্ত আজ। অতিক্রান্ত বুঝি পূর্বাপর সব মায়ার জটিল যন্ত্রণা। ব্যবচ্ছেদ শুরু হয়ে গেছে ভেতরে ভেতরে। অন্য সময় হলে খুব উদগ্রীব হয়ে পড়তো। কী করতে হবে না-হবে এসব নিয়ে অস্থির হতো। একটা উপায় বের করার নানান চেষ্টা করতো। কিছুতেই মনে হতো না ফারুকের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিন্দুমাত্র দোষ ফারুকের রয়েছে। খুঁজতেও যেত না কোনো কারণ কিংবা সন্দেহের লুকোনো বিষাক্ত বীজ। কিন্তু দিনে দিনে বিধাতা তাকে সংকেতে সংকেতে সৃষ্টি করছেন কোনো নতুনের জন্য। খুব টের পায় মনে মনে। তবু আজ কেন যে সব অর্থহীন লাগে!
ছুটির দিন পেরুলো। আগামীকাল রবিবার। আর বেশিদিন অফিস বাদ দিয়ে ঘরে বসে থাকা যায় না। মাথার ঘা শুকোনোর চেয়ে মনের ঘাটা শুকোনো বেশি দরকার মনে করে। ঘরে বসে বসে এই সব জটিল অংকের জাল বোনা তার আর সইবে না। বরং অফিসে গেলে নানান কাজে আর কথায়, হাসি আর গল্পে কত কত বেদনা ভুলে গেছে মনস্বিতা! বিগত দিনেরা সাক্ষী আছে তার। আগামীকাল থেকে অফিস করবে বলে স্থির করে মনস্বিতা। আজ বেশ সকাল সকাল তাই শুয়ে পড়ে বিছানায়। রাতটা শেষ হয় না সহজে। হঠাৎ টের পায় চোখের কোণ ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। কান্নার জল লুকোনোর চেষ্টা করে। চোখটা দুহাতে মুছে তাকায় অন্ধকারে। অন্য ঘরে তখনো আলো জ্বলছে। ফারুক আজ আর শোয়নি তার পাশে। বোধ করি অন্য ঘরটাতে শুয়ে পড়েছে। আলোটাও জ্বালায়নি। এক গ্লাস জল খাবার জন্য উঠে ডাইনিং টেবিলে যেতে গিয়ে দেখে যেমন করে এসে বসেছিল তার পাশে, ঠিক তেমনি করে বসে রয়েছে। বাইরের কাপড়ও বদলায়নি। হাত-মুখ ধোয়নি। টেবিলে রাখা খাবারও খায়নি। কেমন উদাস হয়ে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ওর মুখটা দেখে মনস্বিতার বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে মুচড়ে ওঠে। ফারুক ভ্রূক্ষেপ করেনা। মনস্বিতা আজ থেকে নিজেকে শাসন করার খুব চেষ্টা করবে ঠিক করেছে। জানে না সে পেরে উঠবে কি না। কিন্তু শপথের বাক্যগুলো বেশ জোরেসোরে ওকে আগলে নেয় এই মুহূর্তে।
-যে তোমার বুদ্ধি পরামর্শ কোনোদিনই কানে তোলেনি তার জন্য তোমার আর কিছুই করার নেই মনস্বিতা। তুমি মনে রাখো তুমি সীমান্তে অবস্থান করছ।
আবার নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে। আশ্বিনরাতের শেষ প্রহর। বাইরে ঝরে পড়ছে শাদা শিউলির দেহ। অথচ কী যে মধুর তার ঘ্রাণ! সারা রাত শেষ হলে ভোর হয় শিউলির ঘ্রাণে। মনস্বিতার প্রিয় প্রিয় রাত-ভোর। হালকা শীতের আমেজে সারারাত শিউলি গাছের তলা ভরে থাকতো শিউলির পড়ে থাকা দেহে। সেই কিশোরবেলার কথা। প্রিয় সখী শিউলিফুল। ভোর হলেই ফুলের সাজি নিয়ে ছুটতো মনস্বিতা ফুল কুড়াতে। সমস্তটা বছর পড়ে থাকতো সে আশ্বিনের শিউলির অপেক্ষায়। এখানে এই বাড়িটাতেও শিউলিগাছটি তার বড়ো প্রিয়। আগের মতো ফুল কুড়ানোর সময় কোথায় এখন! কোথায় সাজি ভরে তোলার সময়! আজ চিরচেনা প্রিয় সুঘ্রাণে ভরা দিনের প্রথম প্রহরগুলি কেন এত শূন্য শূন্য লাগে! জানালাটা খুলে দিলে একপ্রস্থ হিমেল হাওয়া যেন ঝাঁপিয়ে পড়ে মনস্বিতার মুখের ওপর। বাইরে তাকিয়ে দেখে, শিউলিতলা নয়, যেন আলসে এক শ্মশান।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (৫১) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-44/

পরবর্তী পর্বের (৫৩) লিংক : আসছে