শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৫৪]

0
530

আগে যা ঘটেছে

মনস্বিতার স্বামী ফারুক মনস্বিতাকে শারীরিকভাবে আঘাত করেছে। ফারুকের কাছে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মানসিক আর শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত মনস্বিতা এসব আর মেনে নিতে পারছে না। তারপর…পড়ুন এই পর্বে, কী ঘটলো।
পর্ব ৫৪
সকাল হতেই খুব দ্রুত অফিসে ছোটে মনস্বিতা। ফারুকের দিকে চোখ পড়ে। সেই যে রাতে এসে বসেছিল সেখানটাতেই ঠাঁয় বসে রয়েছে এখনো। তবু নাস্তা বানানোর প্রয়োজন বোধ করে না মনস্বিতা আগের মতো। নিজেও খায় না। আজ সে অফিসে গিয়ে পিওনটাকে দিয়ে নাস্তা আনাবে দোকান থেকে। দরজাটা ভিড়িয়ে দিতে দিতে যাবার সময় কেবল বলে;
-নাস্তা করে নিও।
এতক্ষণ থম্ মেরে বসে থাকা ফারুক মনস্বিতার কথাটা মাটিতে পড়বার আগেই জিরাফের মতো একটা লাফ দিয়ে উঠে দরজার কাছে আসে। বিকট শব্দে মনস্বিতার মুখের ওপর দরজাটা বন্ধ করে দিতে দিতে চিৎকার করে বলে ওঠে;
-গেট লস্ট।
কোনোমতে মনস্বিতা আঙুলটা সরায়। না হলে চাপা খেয়ে আঙুলটা ফেটেই যেত হয়তো। তাৎক্ষণিক উদগ্রতায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে পড়ে মনস্বিতা কয়েক সেকেন্ডের জন্য। দরজা বন্ধ করার প্রচণ্ড শব্দটা মাথার কোণায় কোণায় রিন্রিন্ করে ব্যথা ছড়ায়। কেটে যাওয়া অংশের সেলাইটাতে ঝিনঝিন করে অসংখ্য মৌমাছি কামড়াতে শুরু করে দিয়েছে, অনুভবটি ঠিক এমন। সাথে সমস্তটা আকাশটা যেন তার সব ভার নিয়ে এক নিমেষে এসে দাঁড়ায় মনস্বিতার মনের ওপর। একা একাই বলে ওঠে;
-গেট লস্ট! গেট লস্ট?
-কাকে? কে? কেন? হা হা।
মুহূর্তে যেন উত্তরটাও খুঁজে পেয়ে যায় এবং উত্তরটা খুঁজে পেয়ে যাবার সাথে সাথে তিরোহিত হয় মাথা মন মগজের সমস্ত বেদনার মৌমাছিগুলো। রক্তে স্নায়ুতে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র বিষ। এ এক নতুন মনস্বিতা। বিধাতা গড়েছেন। ফারুক গড়েছে। মৃত কন্যাটি গড়ে দিয়েছে এ মনস্বিতাকে। মনের গোপনে কোথায় যেন এক কুচক্রি-ক্রূঢ় মনস্বিতা অট্টহাসি হেসে ওঠে। বাতাস বুঝি গোপনে এক কুখ্যাত মনস্বিতার আভাস দিয়ে যায়! ড. জেকিলের মতো কেউ একজন মনস্বিতার ভেতরে জেগে উঠছে ধীরে টের পেতে শুরু করে মনস্বিতা। খুব শান্ত ভদ্র মিস্টার হাইড নিজেরই আবিষ্কৃত ওষুধ নিজের রক্তে ঢেলে নিজেই হয়ে উঠতেন ঠিক উল্টো চরিত্রের বিধ্বংসী পিশাচ জেকিল। তেমনি কিছু একটা। কেন যেন মনস্বিতাকে কোনো ক্ষরণ দহন একাকীত্ব আর অবশ করে দিতে পারছে না। সমুদ্রের গভীর তলদেশে শুরু হয়েছে ভূকম্পন। দারুণ তোড়ে ধেয়ে আসছে ব্যাপক-বিধ্বংসী এক ঝড়। ভেতরে উৎক্ষিপ্ত হবার অপেক্ষাতে কোনো সুনামি। বহুদিন আগের আবৃত্তি করা কবিতার কটা লাইন মনের অজান্তেই রিমঝিম সুরে বেজে ওঠে মনস্বিতার মনের কোণে;
-তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা…
দিন দুয়েক আগের মনোভার দূরীভূত হয়ে গেছে কখন মনস্বিতা টেরও পায় না। আকাশে আকাশে কালো মেঘে সরে গেছে নিয়ে তার ভয়াল থাবা। হালকা নির্ভার লাগে সব। বাইরে আশ্বিনের শীতল বাতাস। অথচ নিজের মনে অজানা বসন্তভাব। এত হালকা লাগে নিজেরই ওজন। যেন এক চঞ্চলা হরিণী মনোহারিণী মনস্বিতা ছুটে চলেছে বাতাসের আগে আগে। আরও একদিন মনস্বিতাকে ফারুক বলেছে চলে যেতে। তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তীর সাথে চলে যেতে;
-হা হা। ফারুক। তুমি সুতো ছাড়ছো? তোমার হাতের লাটাই দিলাম তুলে। তুমি ছড়াও সুতো তোমার ঘুড়ির কথা ভেবে। হা হা।
ফারুকের হাতে ঘুড়ির লাটাই দিয়ে বছরের পর বছর খুব নিশ্চিন্তে ছিল মনস্বিতা। সে লাটাইয়ের সূতোটা নিয়ে এতদিন খুব ভাবনায় পড়ে রয়েছিল। আজ যেন তার রহস্যের জালটা ছুটতে শুরু করে দিয়েছে। হাসতে হাসতে মনস্বিতা বের হয়ে যায়। চঞ্চল তার গতি। উচ্ছ্বল প্রগলভ। অফিস পৌঁছুতে আজও দেরি হতে হতে দু’চার সেকেন্ড রয়ে যায়। কার্ডটা পাঞ্চ করেছে যখন, তখন জাস্ট সাতটা আটান্ন বেজেছে। নিজের রূমে বসে রবীন্দ্র সংগীতটা মাত্র ছেড়েছে কম্পিউটারের প্লেতে। আহা, ঠাকুরের গান। মনটাকে কেমন ঠান্ডা করে দেয়। যত যাতনা যত বিধ্বংসের বিশেষ তাঁর বাণী শুনতে শুনতে অশেষ হয়ে ওঠে। রিসেপশন থেকে একটা কল আসলে দ্রুত ছুটে যায় মনস্বিতা। ইয়াসমিন খান- তার ইমিডিয়েট বসের রূমে। পুতুল পুতুল চেহারার মিষ্টি হাসির মিষ্টি নারীটিকে বয়সের তুলনায় দেখতে খুব ইয়াং দেখায়। পুতুল পুতুল চেহারার ইয়াসমিন খানকে মনস্বিতার কেমন ক্রূর আর বিষাক্ত শাপের মতো দেখতে লাগছে এখন।
-মনস্বিতা, আমার মনে হয় তোমার একটা দীর্ঘ ছুটির প্রয়োজন।
মনস্বিতা দীর্ঘ আইল্যাশগুলো ছড়িয়ে দিয়ে উন্মীলন করে তার দারুণ দুটি চোখ। যে-চোখে লেখা আছে,
-আর যা কিছু বাকি রয়ে গেছে তার সকল বলবার দরকার নেই ইয়াসমিন খান।
চোখের ভাষায় বাক্য এইটুকুই। ইয়াসমিন খান আর কিছু বলার আগেই চেয়ারটা ছেড়ে উঠে পড়ে মনস্বিতা। নির্বাক চোখে তাকিয়ে দেখেন ইয়াসমিন খান মনস্বিতার চলে যাওয়া। কোনো কথা নেই মেয়েটির। তবু কেন যেন গালে একটা চড়ের মতো অনুভব করেন তিনি। কত যোগ্যতাহীন ছেলে-মেয়েকে সুপারিশে দরকার নেই তবু ঢের বেশি বেতনে কমিটিতে পাশ করিয়ে ধরিয়ে দিয়েছেন চাকরি। অথচ সংগ্রামী সংসার চালানো মেয়েটির অসুস্থতা- নানা পারিবারিক বিপর্যয় এতসব জানার পরও এভাবে বিদায় করা ন্যায়সঙ্গত নয় বলে মনের কোথায় যেন একটা কাঁটা বিঁধিয়ে দিয়ে গেল নির্বাক চোখে- হেঁটে চলে যাবার ভঙ্গিতে। সারা দিন অফিসকক্ষের দরজাটা বন্ধ করে ঠাকুরের অনেক গান শোনে আজ মনস্বিতা। ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে যায়। তখন খুব গান শুনতো। বিয়ের পর বাড়িতে তার গান শোনা হয়নি আর কখনো তেমন করে। বই পড়া হয়নি মন লাগিয়ে। এখানে অফিসে কাজের ফাঁকে প্রায়-প্রায়ই গান শুনতো। আজ এত-এত গান শুনলো। আজ খুব মন লেগেছে। ব্যথা বেদনার অপরূপ আর একটি সুরও রয়েছে। সব ব্যথাই বিতাড়নের নয়। গান শুনতে শুনতে নেশাখোরের মতো কিছু লিখতে থাকে কম্পিউটারে। অনাগত সন্তানটিকে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখতে শুরু করেছিল মনস্বিতা গর্ভধারণ করার পর থেকেই। কন্যাটি মরে যাবার পরেও সেটা চলমান ছিল। মানুষের যাতনার একটা পারগেশন তো দরকার! কাউকে কিছু না বলে বলে এতটা দিন কী করে মনস্বিতা পার করেছে কেউ জানে! কেউ জানে না। কেউ জানে না – এই সেই চিঠি! এই সেই কন্যা মনস্বিতার। যে জন্মেই মরেছে অথচ চিরকালের জন্য দিয়ে গেছে কিছু শাদা পাতা। দিয়ে গেছে যথা-অযথা লেখার অবসর। দিয়ে গেছে হৃদয় খুলবার জানালাটাও। যে মরেও খেলা করে মনস্বিতার সাথে। হাসে কাঁদে। জড়িয়ে ধরে। মনস্বিতা তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বুক হালকা করে। মরেও সে অমর। জন্মাবে সে মনস্বিতারই গর্ভে আবার। পূণর্বার জন্ম নেবে সে, মনস্বিতার প্রবলতম বিশ্বাস। এখানে এসে মনস্বিতার ধর্মাধর্ম জটিল আর ক্ষুরধার পথ সব একাকার হয়ে যায়। মুসলিম পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা মনস্বিতার এ কেমন বিশ্বাস! বারবার জন্ম ইসলাম ধর্মের বিশ্বাসে নেই। অন্য দিকে জন্মে সনাতন- চিরকালের নাস্তিক তমালকৃষ্ণ রাজচক্রবর্তীর বিশ্বাস তার মৃত কন্যাটিই দ্বিজজন্মে মনস্বিতা। সন্ধ্যা লাগো লাগো। বাতাসে হিম ঝরতে শুরু করে দিয়েছে। তড়িঘড়ি অফিস থেকে বের হয়ে আসে। একটা লোকাল বাস ধরে এসে নামে মোহাম্মদপুর বাসস্টপেজে। কোথায় যাবে! বাড়ি? বাড়ি বলে কি কিছু আছে মনস্বিতার? আজ প্রথমবারের মতো বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না মনস্বিতার। কোথায় যাবে। সেই নদীর পাড়ে ব্রিজটার ওপর গিয়ে দাঁড়ালে ক্ষণিক স্বস্তি হবে কী? কিন্তু বাতাসের হিম মাথার কাটা জায়গাটিতে কেমন চিনচিনে ব্যথা ছড়াচ্ছে। এই অবস্থায় নদীর ওপর গিয়ে দাঁড়ানোটা ঠিক নয়। সেদিনের পর থেকে মনস্বিতা আর তমালকৃষ্ণের খোঁজ নেবার সাহস সঞ্চয় করতে পারে নি। আজ কোথা থেকে এক প্রকাণ্ড সাহসের দৈত্য বুঝি এসে ভর করেছে মনের ভেতর। ফোন করে। রিং বেজে চলেছে। রিসিভ করে না কেউ। আবার ফোন করে। বাজে। কেউ রিসিভ করে না। এবার খানিকটা শঙ্কিত হয়ে পড়ে মনস্বিতা। কি হলো! ফোনটা রিসিভ করছেন না কেন তিনি? এতটা দিন খোঁজ নেয়নি বলে আজ নিজেকে খুব স্বার্থপর আর অবিবেচক মনে হতে লাগে। তার ছেলে কিংবা স্ত্রীর ফোন নম্বরটিও রাখা হয়নি কখনো নিজের কাছে। কি করবে? মনটা অস্থির করছে বড়ো। নিজের বাড়ি না ফেরার অর্থবহ অনিচ্ছে কী এক অদ্ভুত মায়াবলে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। বুকের ভেতরে এক অশনি কু ডাক ডেকে যায়! ফারুকের ভয় সামাজিক অসম্মানের ভয়, কিছুই মনস্বিতার পথের রেখা আজ আর বদলে দিতে পারে না। দ্রুত পায়ে হাঁটতে শুরু করে। চাকরিটা নেই। খুব বুঝে খরচ করতে হবে। যে ক’টা টাকা আছে, সেগুলো দিয়ে মাসটি চলতে হবে আজ থেকে। অযথা খরচ করার সামর্থ নেই আর। এ-পথটি অন্য সময় হলে হেঁটেই যেত মনস্বিতা। কিন্তু অস্থির মনোদ্বৈরথ তাকে আর হিসেবে ধরে রাখতে পারে না। একটা রিক্সা নিয়ে উঠে পড়ে। মোহাম্মদী হাউজিং সোসাইটির ৯৬ নম্বর বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়ায়। ধূপের গন্ধে ভরে উঠেছে পূজোবাড়ির ভেতর বাহির। মিসেস মাধবী চিরকালের আস্তিক। পুজোআচ্চা বর্ণভেদ আর শুচি-অশুচির ধার ধেরে চলেন তিনি মনস্বিতা জেনেছে তমালকৃষ্ণের কাছেই। ছেলে টুলটুলও মায়ের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, জানে মনস্বিতা। দুর্গাপুজোর আজ অষ্টমীর শেষতিথি। ধূপধুনোর গন্ধে মাতাল মাতাল লাগে। এই বাড়িটি তমালকৃষ্ণের পৈতৃক সম্পত্তি। নিচে বাস করেন তার ছোটভাইয়ের বৌ ছেলেপেলে। অরুণকৃষ্ণের ছেলেটি কাকাতো দাদা তমালকৃষ্ণের ছেলে টুলটুলকে হত্যা করার অভিসন্ধিতে প্রায়ই মতলব আঁটে মনস্বিতা জানে সে কথা। নিচতলার পাশ কাটাতে গিয়ে সে কথাটি মনে পড়ে যায় মনস্বিতার। কেমন গা ছমছম করে ওঠে। নির্জন বাড়ি। খুব একটা মানুষের হুল্লোড় নেই। নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজো করেন তারা, এটা জানা আছে মনস্বিতার। বুঝতে পারে না এ-সময়টিতে এভাবে আসা ঠিক হলো কি না তার। এসে পড়ে মনে পড়ছে একের পর এক এতসব। তবু তমালকৃষ্ণের খোঁজ না নিয়ে আজ সে ফিরবে না। যাই ঘটুক বাড়ির ভেতর আজ তাকে ঢুকতেই হবে।
একটি একটি করে সিঁড়ি ভাঙতে থাকে মনস্বিতা ভীতসন্ত্রস্ত মনে। বাড়ির নিচতলা থেকে কেউ একজন বের হতে গিয়ে মনস্বিতাকে দেখে। কী এক অদ্ভুত ঔৎসুক্য তার চোখে! মনস্বিতার দৃষ্টি এড়ায় না। উপরে উঠতে থাকে সে। নিচে থেকে চোখটি উপরের দিকে উঠতে থাকা মনস্বিতাকে অনুসরণ করছে খুব, বুঝতে পারে মনস্বিতা। খুব সম্ভবত এটিই অরুণকৃষ্ণের একমাত্র পুত্র শৈলরাজ চক্রবর্তী। দরজা নক করতেই দরজা খুলে দেন মাধবী। প্রণাম জানায় মনস্বিতা। মাধবীর অত্যাশ্চর্য চাহনি। অষ্টমীর শেষ কয়েক মিনিট চলছে। সন্ধিপুজোর লগ্ন। টুলটুল বসেছে সন্ধিপুজোর আসনে। কলিং বেলের শব্দে তমালকৃষ্ণও আসেন। মনস্বিতাকে দেখে মুখটা তার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মনস্বিতাও যেন তাকে সুস্থ দেখে আশ্বস্ত হয়।
-মাধবী ওকে ভেতরে আসতে দাও।
মাধবী খুব দ্রুত সরে গিয়ে মনস্বিতাকে বসার ঘরের দিকটা দেখিয়ে বলেন :
-ওদিকটায় বসো তুমি। এখানে পুজো চলছে। এদিকটায় মাড়িয়ো না।
‘এদিকটা মাড়িয়োনা’ কথাটি মনস্বিতার মনে লাগে বেশ। তমালকৃষ্ণ বেশ লজ্জা পেয়ে বলেন :
-এ কী কথা মাধবী!
তমালকৃষ্ণের দিকে মাধবীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি অনেক কথা মনস্বিতাকে জানিয়ে যায়। মনস্বিতার বিষয়েও তার মনোভাব বুঝতে বাকি রাখেন না কিছুই।
-তুমি নাস্তিক। তোমার কোনো বাছ-বিচার নেই জানি। কিন্তু আমি টুলটুলতো পুজারী!
বাকি কথা আর বলার দরকার পড়ে না। খুব অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে মনস্বিতা।
-আমি বরং চলি। আপনার ফোনটা বেজে গেল কেউ রিসিভ করলেন না। অনেকদিন যোগাযোগও নেই। ভাবছিলাম আপনি অসুস্থ কি না। তাই না এসে পারলাম না। মাসীমা আমি বরং চলি! সামনে পা বাড়ায়।
-বসো ও-ঘরে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুজো শেষ হবে। প্রসাদ খেয়ে যাবে।
মাধবীর কণ্ঠে এক অদ্ভুত আদেশ না কি নির্দেশ, বুঝতে পারে না মনস্বিতা। অন্য ঘরটির যেখানটিতে সে বসে, সে-জায়গাটি থেকে পূজোর আসনে বসে থাকা টুলটুলকে বেশ দেখতে পায় মনস্বিতা। সোজা টানে বসে রয়েছে এক সুঠাম যুবক। তাগড়া জোয়ান। বুকের সিনা টানটান। মুখে হালকা সেভহীন ছোট করে রাখা দাড়ি। হালকা গোঁফে উজ্জ্বল পৌরুষ। গৌড়বর্ণ মুখ, শরীর। ঠিক তমালকৃষ্ণের যুবকবেলা ভেবে ভুল করতে পারে যে কেউ। ঈষৎ কোঁকড়ানো চুলের টুলটুলকে দেখে। মনস্বিতা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখছে টুলটুলকে। হৃদয় ভেঙে ভেঙে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো। বুকের ভেতর কী এক অদ্ভুত কাঁপন টের পায় বহু বহুদিন পর। একজন অজানা অচেনা পুরুষ এমনভাবে তোলপাড় করছে কেন, মনস্বিতার সকল নদী কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। একদৃষ্টিতে টুলটুলের দিকে তাকিয়েই রয়েছে। নবমীর তিথি শুরু হয়ে গেছে। জ্বলছে ১০৮টি প্রদীপের শিখা লকলক করে। দেবী চামুণ্ডারূপে আবির্ভুত হয়েছেন। দয়ামায়াহীনরূপ তার। দৃষ্টি পরিস্কার। টুলটুলের চোয়ালের হাড়গুলো মনস্বিতা স্পষ্ট দেখতে পায়। কি এক অদ্ভুত প্রতিশোধ স্পৃহা নাকি কি ক্ষোভ নাকি রাগ নাকি অভিমান ঝরে পড়ছে ওর দৃষ্টিতে, মনস্বিতা কী করে এতটা দূর থেকে দেখতে পাচ্ছে সে জানে না। জানে না আদৌ কী এক অদ্ভুত যোগমায়া খেলা করে চলেছে এই মুহূর্তে মনস্বিতার মনকে কেন্দ্র করে। পুজোর লগ্ন শেষ হয়। টুলটুল উঠে দাঁড়ায়। ফিরে এদিকে আসতে গিয়ে মুখোমুখি হয়ে যায় মনস্বিতার। টুলটুলের বুকের ভেতর হঠাৎ দুটো পা হেঁটে যায়। সেই যে আলোছায়ায় দেখেছিল কোনো মানুষী নয়, কেবল খুব ত্রস্ত দুটি পা চলে গেল ছায়ার মতো। এ কি সেই মায়াবিনী। হ্যাঁ এই তো সেই। সেদিন যাকে দেখেছিল অসুস্থ। মাঝ রাস্তার বাবার সাথে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ঢলে পড়েছিল আর তমালকৃষ্ণ গিয়ে তুলে এনেছিলেন বুকে করে। এই তো সেই। সেদিন বিধ্বস্ত বিবর্ণ মনস্বিতাকে আজ ছায়াদেবীর মতো দেখায়। টুলটুলের চোখের আলো ক্রমশ উজ্জ্বল হতে থাকে সে-মায়াবিনীর দৃষ্টিতে এতটা প্রখরতা!

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (৫৩) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-45/

পরবর্তী পর্বের (৫৫) লিংক 

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-47/