শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৫৭]

0
637

আগে যা ঘটেছিল >>

ফারুকের সঙ্গে সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটার পর রাজচক্রবর্তীর বাড়িতে মনস্বিতার দেখা হয়েছিল তার ছেলে টুলটুলের সঙ্গে। মনস্বিতা ও টুলটুল দু’জন দু’জনকে দেখে মুগ্ধ। তমালকৃষ্ণের কাছেই তাঁর ফেলে আসা জীবনের কথা শোনে মনস্বিতা। কথা আরও এগিয়ে চলে। এরপর কী ঘটেছিল, পড়ুন তীরন্দাজের এই পর্বে।

পর্ব ৫৭

-পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে তখন পাখির মতো গুলি করে মারা হচ্ছে মানুষ। তবু জনমনে ভয় নেই। তুমি জানো তো বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস? মনস্বিতা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস তোমার জানা আছে?
-হুম। বাবা মায়ের মুখে মুখে শোনা। বইয়ে ইতিহাস পড়ে সামগ্রিক যতটুকু জানা হয়েছে।
-হা হা হা। হা হা হা।
মনস্বিতার কথা শেষ হতে না হতেই তমালকৃষ্ণ বেশ উচ্চস্বরে হেসে ওঠেন। মনস্বিতা বুঝতে পারে না কোথায় কি কিছু ভুল বলেছে? চোখে প্রশ্নবোধক বিস্ময় দেখে মনস্বিতার সংশয়কে নিবৃত্ত করতে তমালকৃষ্ণ সচেষ্ট হয়ে ওঠেন। বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মতো বলেন;
-আসলে জানতো, রাষ্ট্রই মূলত ইতিহাস নির্মাণ করে? লিখিয়ে নেয়।
মনস্বিতা চোখ বড় বড় করে শুনতে শুরু করেছে ততক্ষণে;
-জনইতিহাস জানতে হবে মনস্বিতা, জনইতিহাস। জনমানুষের মুখ থেকে। চাক্ষুষ সাক্ষী থেকে। প্রত্যক্ষদর্শী থেকে। ইতিহাস হবে জনইতিহাস। চেয়ে দেখো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ আসলে করেছে কারা। গ্রামের সাধারণ ছেলেটি। জোয়ান কৃষকটি। মজুর। ছাত্র। সাধারণ জনতা। সাধারণ কৃষাণী কিংবা অশিক্ষিত অক্ষরজ্ঞানহীন মূর্খজননী কিংবা উচ্চশিক্ষিত তার একমাত্র সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়ে দিয়েছেন। বুঝলে, সাবঅলটার্ণ মানুষের কথা। জনমানুষের কথাই আসল ইতিহাস। কটা কাহিনি লেখা আছে তাদের। দেখবে কারো কারো নাম উচ্চারণ করতেও দেবে না রাষ্ট্র। অথচ দেশকে স্বাধীন করার যুদ্ধে তাদের অবদান অস্বীকার করা অসম্ভব। খেয়াল করে দেখবে প্রতিটি সরকারই তার তার মতো করে ইতিহাস তৈরি করে।
-হুম।
-তাই ইতিহাস বদলে যায় এক-এক সরকারের শাসনামলে।
-আচ্ছা। কিন্তু কে লিখবে এ ইতিহাস? কে প্রকাশ করবে?
-কাউকে না কাউকে তো নিতেই হবে সে দায়িত্ব। কিন্তু রাষ্ট্রকে খুশি রেখে জনইতিহাস লেখা খুব একটা সহজ কাজ নয়। ভীষণ দুরূহ কাজ। সে যাগগে তোমাকে যা বলছিলাম…
-হুম। ১৯৬৯ সাল। বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের কথা বলছিলেন।
-আমি তখন সিপিআইতে (কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া) সে তো তুমি জানোই। নকশাল আন্দোলনে পর্যুদস্ত হয়ে লুকিয়ে পালিয়ে আছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি বাংলাদেশে ফিরবো টুলটুল আর মাধবীসহ।
-হা হা।
কিন্তু হঠাৎ হেসে ওঠেন তমালকৃষ্ণ রাজচক্রবর্তী। তারপর থামেন কিছুক্ষণ। কী জানি কী মনে পড়ে যায়। ঘনঘোর আবছায়ায় ভেসে ওঠে তার মুখে গভীর অন্ধকার।
-কিন্তু এখানে। এই বাংলাদেশে। কাপুরুষের মতো পালিয়ে তো আসবোই। কিন্তু তারপর?
অস্থির নিরুৎসাহিত শংকিত অন্য আর এক ভয়াল রূপদর্শন হয় আজ তমালকৃষ্ণের চেহারায়। বুকের ভেতর পুষে রাখা যত ক্লেদ আজ মনস্বিতাকে আশ্রয় করেই তিনি বের করে দেবেন ভেবেছেন? সত্যিই নিজের পক্ষে ‘কাপুরুষ’ শব্দটা এমনভাবে উচ্চারণ করেন তমালকৃষ্ণ যে মনস্বিতার মনে হলো তিনি এতকালের জমানো ক্ষোভ ক্রোধ আর দগ্ধতার সারৎসারের পারগেশন ঘটালেন নিজের গালে একটি থাপ্পড় মেরে। কিছুটা ব্যালেন্স দরকার মনে হয় মনস্বিতার এই মুহূর্তে। সহজতর করার জন্য খুব সতর্কভাবে উচ্চারণ করেন :
-ইপিসিপির অর্থাৎ ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির কি অবস্থা ছিল তখন?
-ও হ্যাঁ। পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাম রাজনীতি চারুমজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত সিপিআই (এম-এল)-এর রাজনীতি অনুসরণ করে আসছিল ১৯৬৯ সাল থেকেই।
মনস্বিতার রাজনীতির দখল খুবই সাধারণ পর্যায়ের। খুব উপরভাসা আবেগ থেকে হঠাৎ সে বেশ খুশি হয়ে যায়। আর বলে বসে :
-তাহলে তো হলোই। আপনি বাংলাদেশে এসেই…
মনস্বিতার কথা শেষ হয় না।
-আরে না না। ১৯৭০ সালে এসে তো কমরেড চারু মজুমদারের গণসংগঠন ওরা বর্জন করে। কমরেড এ নিয়ে যে প্রবন্ধটি লিখেছিলেন সেটি প্রকাশিত হবার পর ইপিসিপির আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা এই সব নেতারা কৃষক সমিতি এসব গণসংগঠন থেকে পদত্যাগ করেন।
-আচ্ছা পার্টির ভেতর দ্বিধাবিভক্তি তাহলে শুরু হয়ে গেল?
-হুম। সেটা ১৯৬৯ সালের শেষ দিক। ডিসেম্বর মাস হবে। বেশ পরিমানে দ্বিধা।
-পরবর্তীতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতাযুদ্ধ বিষয়টিতেও এ দ্বিধা চলমান ছিল। এ বিষয়ে পরে আসছি।
-কিন্তু তখন তো এ-দিকে গণঅভ্যুত্থান তুঙ্গে- ইস্ট পাকিস্তানে।
-হুম। মারাত্মক পরিস্থিতি তখন এখানে। ইয়াহিয়ার গদি টলোমলো।
-উনসত্তরের জানুয়ারি থেকে একের পর এক মারাত্মক ঘটনা ঘটতে লাগলো। বাঙালি যে ক্ষুব্ধ ব্যথিত ক্রোধান্ধ তা আইয়ুব ইয়াহিয়া বুঝতে পারলো। বাঙালি জাতি নিজেরাও হঠাৎ টের পেতে শুরু করলো নিজেদের শক্তিকে। আমার মনে হচ্ছিল কি জানো? এই বুঝি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেল বাঙালি। জানিনা ভেতরে ভেতরে কি চাইছিলেন তারা কিংবা শেখ মুজিবুর রহমান কী ভেবে আগাচ্ছিলেন। কিন্তু বাইরে থেকে আমরা বুঝতে পারছিলাম যেভাবে যা কিছু ঘটে চলেছে, কিছু দিনের মধ্যেই হাতে অস্ত্র তুলে নেবে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যাবে, তার সমস্ত লক্ষণ প্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।
-স্বাধীন করে ফেলবে? আসলে তো প্রশ্নটা ছিল স্বায়ত্বশাসনকে ঘিরে।
-হ্যাঁ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তো স্বায়ত্বশাসন নিয়েই ভাবছিলেন। এগিয়ে যাচ্ছিলেন ১১ দফা বাস্তবায়নের দিকে। ছয় দফার প্রশ্নে কৌশলগত অবস্থান নিয়ে তিনি একথা বলেছিলেন।
-এই ১১ দফার ভেতরেই ছয় দফাও আছে। আর তাতে যা যা অন্তর্ভুক্ত ছিল সেটা স্বায়ত্বশাসনকেই মেনশন করে।
-হ্যাঁ। ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষও যুক্ত হয়ে গেছিল ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে। হরতালে অংশ নিয়েছে লাখো জনতা।
-মতিউরকে পুলিশ গুলি করে মারলো।
-হুম। নবকুমার ইন্সটিটিউটের ছাত্র মতিউর।
-তখন তো সাধারণ মানুষ মারাত্মকভাবে বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।
-আমরা ভারত থেকে সব খবরাখবর রাখছিলাম তখন বাংলাদেশের অর্থাৎ পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক অবস্থার। খবরে শুনছিলাম, কী পরিমানে অ্যাডামেন্ট ছিল তখন বাঙালি যে সচিবালয়ের এয়ারকন্ডিশনের জানালা ভাঙতে উঠে যাচ্ছিল ইলেকট্রিসিটির তার বেয়ে। নিচ থেকে উপরে উঠতে থাকা সাধারণ মানুষকে উদ্দেশ্য করে গুলি করছিল ক্রমাগত। গুলি খেয়ে সেই তার থেকে যখন ছিটকে পড়ছিল একজন দুজন…
-হ্যাঁ হ্যাঁ। মা বলেছিলেন ঘটনাগুলো। তখন একজনকে গুলি খেয়ে ছিটকে পড়তে দেখেও অন্যজন পিছু হটেনি। বিন্দুমাত্র ভীতি বা শঙ্কা কাজ করেনি মানুষের মধ্যে তখন। বরং মরতে দেখে আরও মৃত্যুর জন্যেই যেন তৈরি হয়েছিল। এমন বেপরোয়া।
-আইয়ুব সরকারের গদি টালমাটাল হয়ে উঠেছিল ঊনসত্তরের গণঅভুত্থানে।
-তার মাঝে ঘটে গেছে আরও ঘটনা।
-সার্জেন্ট জহুরুল হক…
-হ্যাঁ হ্যাঁ। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার এক নম্বর আসামী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান আর সতেরো নম্বর আসামী ছিলেন সার্জেন্ট জহুরুল হক। প্রথমে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়। তারপর স্থানান্তরিত করে কুর্মিটোল কারাগারে নেয়া হয়।
-তখন বিকেলের পর পর। সন্ধ্যার খাবার খাওয়ার পর যে উচ্ছিস্ট থাকতো সেগুলো নিতে বা খেতে আসতো কয়েকজন বাঙালি দরিদ্র শিশু। সেদিন ছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা। যথারীতি উচ্ছিষ্ট কুড়োচ্ছে কিছু অভুক্ত শিশু। হঠাৎ তাদের দিকে তেড়ে এলো একজন পাকিস্তানি সৈনিক।
-হট যাও। হট যাও…।
বলতে বলতে যেন উড়ে এসে কচি কচি শিশুটিগুলোকে একের পর এক কিল ঘুষি লাগালে শিশুরা আহত হয়।
-সালা ভুখা বাঙাল। দূর হ যা। দূর হ যাও…
কয়েকজন শিশু ধাক্কাধাক্কি করে পালাতে গিয়ে পড়ে যায়।
-সালে মাদারচোদ…।
বলে গালাগাল করতে করতে এক পাকিস্তানি সৈনিক তার পায়ের শক্ত বুট দিয়ে একটি বাচ্চার লিঙ্গ বরাবর সজোরে লাথি মারলো।
আহ হ হ হ… বলে আর্তনাদ করে মুমূর্ষুভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই সার্জেন্ট জহুরুল হক চিৎকার করে বলেন :
-ঠ্যারো। থামো। তুম পাকিস্তানি সারে বাঙালি মজলুমকো জুলুম কারতেথে অর আবিভি কররাহে হো। তুম হট যাও। ছোড় দো উস মাসুম বাচ্চেকো। ছোড়ো। যাও। হট যাও।
সার্জেন্ট জহুরুল বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিতেই রক্তচোখে তাকায় বন্দীশিবিরের হাবিলদার মজনু শাহ।
-সালে বাঙালি ই ই ই…
দাঁতে দাঁত ঘষে প্রচণ্ড রোষে চিৎকার করতে করতে রাইফেলের বেয়োনেট উঁচিয়ে ধেয়ে আসে সার্জেন্টে জহুরুলের দিকে মজনু শাহ।
-তুঝকো হাম মারডালুংগা।
সার্জেন্ট জহুরুল বাচ্চাটিকে এক হাতে আগলে রেখে অন্য হাতে হ্যাঁচকা টানে ছিনিয়ে নেন মজুন শাহর বেয়োনেট।
-শালা পাকিস্তানি। বাঙালিকে এখনো চিনে ওঠোনি তুমি। হা হা…
মজনু শাহর আপাত পরাজিত রক্তে তখন ক্ষুদ্ধ আস্ফালন। প্রতিশোধ স্পৃহা ঝলকে ঝলকে উঠছে নীললোহিতে। জ্বলে জ্বলে নিভে যাচ্ছে দুটি ক্রমাহত বিস্ফারিত চোখ। তার হাত হতে বেয়োনেটসহ রাইফেল ছিনিয়ে নিয়েছে যে বাঙালি সার্জেন্ট তাকে অত সহজে ছেড়ে দেবে কি সে? না।
মজনু শাহর এই সব ভাবনার আগুনে ধুপের কণাগুলো ছিটিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করেন না সার্জেন্ট জহুরুল হক। বন্দুকটি খাড়া করে ধরেন। উপরের দিকে উদ্ধত্ বেয়োনেট মাথা তুলেছে তখন সগৌরবে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বাঙালি সৈনিকের হাতের যাদুতে সাহসের আর দেশপ্রেমের দারুণ স্পর্শ ঘোষণা করছে দোর্দণ্ড অহংকারে। সাজেন্ট বাচ্চাটিকে আর একজন বাঙালি সৈনিকের হাতে দিয়ে এগিয়ে আসেন মজনু শার দিকে। প্রমাদ গুনতে থাকে মজনু শাহ। প্রাণটাই কি তাহলে এবার দিয়ে দিতে হবে এর হাতে? ঠিক এমনি করেই বেয়োনেটসহ বন্দুকটিকে খাড়া করে ঠেসে ধরেন মজনু শাহর বুকে।
-লে লে। তেরা বেয়োনেট তেরা বন্দুক লেভ
বিজয়ী বীরের মতো হেঁটে চলে যান নিজের কামড়ার দিকে জেলের ভেতর। কিন্তু এই তাচ্ছিল্যের শব্দ বাক্য কিছুই ভুলতে পারে না মজনু শাহ। ঠিক পরদিন ছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি। তক্কে তক্কে থাকে মজনু শাহ। ভোর হয় হয়। মজনু শাহ সার্জেন্ট জহুরুল হকের কামড়ার দিকে টার্গেটে থাকে। সার্জেন্ট বের হতে না হতেই গুলি ছোঁড়ে। পেটের নিচের দিকে গুলি লেগে লুটিয়ে পড়েন সার্জেন্ট জহুরুল হক জেলের ভেতরেই। রাত প্রায় ১০টার দিকে মৃত্যু বরণ করেন বীর জহুরুল।
-এর তিন দিন পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ডক্টর জোহাকে খুন করা হয়। একের পর এক আসাদ মতিউর জহুরুল জোহা আর অসংখ্য নাম না জানা মানুষের খুন বাঙালি জনতার রোষ আর ক্ষোভকে ক্রোধে পরিণত করে।
– তখনও কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খাঁ পদত্যাগ করেনি। আবার হরতাল ডাকা হয় মোনায়েম খাঁর পদত্যাগ ও ১১ দফা বাস্তবায়নের দাবিতে।
-হুম। রাতের অন্ধকারের মোনায়েম খাঁ পরিবার নিয়ে পালিয়ে যান। ২৫শে মার্চ ১৯৬৯ আবার দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তান সেনাবাহিনির প্রধান ইয়াহিয়া খান।
ঘড়িতে ঢং ঢং করে ঘন্টা বেজে উঠলে মনস্বিতার খেয়াল হয়। ত্রস্ত অস্থিরতায় ঘড়ির দিকে কাটার দিকে তাকায়;
-আহ হা। রাততো প্রায় বারোটা বাজতে চললো।
বিমর্ষ চোখে দেখে তমালকৃষ্ণকে। তমালকৃষ্ণও হঠাৎ অস্থির হয়ে পড়েন। আসলে এইসব রাজনৈতিক আলাপ এতটাই গভীরে প্রবেশ করেছিল যে মনস্বিতা কিংবা তমালকৃষ্ণ সময়ের কথা ভুলে গিয়েছিল। তমালকৃষ্ণ এবার অধীর হয়ে উঠলেন। ভেতরে ভেতরে মনস্বিতাও ভীষণ বিপর্যস্ত। ফারুক তো একবারও ফোন করেনি আজ। কী ঘটছে ওদিকে। বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসে। কণ্ঠে তেমন শক্তি নেই। ভয়বিহ্বল কণ্ঠেই উচ্চারণ করে :
-আমি যাই তবে।
-দাঁড়াও। এত রাতে একা কী করে যাবে?
-অইটুকুই তো পথ।
-না না।
-চলে যেতে পারবো। ঢাকা শহরে এ আর এমন কি রাত?
মনস্বিতার কথা কানে যায় কি যায় না তমালকৃষ্ণ গলা ছেড়ে টুলটুলকে ডাকতে থাকেন। টুলটুল বোধকরি ভেবেছিল মনস্বিতা চলে গেছেন। প্রায় মধ্যরাত কী তারও পর অব্দি বাবা তমালকৃষ্ণ যেমন বইটই পড়েন, তেমনি হয়তো তিনি পড়ছেন। মনস্বিতাকে দেখেই চমকে ওঠে। ঘড়ির দিকে তাকায়।
-এত রাত হলো?
-হুম। কথা বলতে বলতে রাত হয়ে গেল। তুমি একটু যাও তো মনস্বিতাকে এগিয়ে দিয়ে এসো।
মনস্বিতা বিমর্ষ। রাত কত হয়েছে তা ভেবে যতটা না উদ্বিগ্ন, তার চেয়ে বেশি ফারুকের কথা ভেবে। না-জানি কী করবে এই অবেলায় বাড়ি ফিরতে দেখলে। আর তার ওপর যদি টুলটুলকে দেখে সাথে।
-না না। আমি একাই যাব। আপনি তো জানেন ফারুক দেখতে পেলে অরাজকতা বাধিয়ে দেবে।
-কিন্তু তাই বলে এই মধ্যরাতে আমি তোমাকে একা ছাড়তে পারি না। আমারই ভুল হয়েছে। এতটা রাত হলো আমারই খেয়াল করা দরকার ছিল। না হলে আমিই যাই চলো।
তমালকৃষ্ণের শরীরটা ভালো নেই। মনস্বিতা জানে। বরং এইসব গল্পে নিজের জীবনের নানা স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে তিনি খানিকটা ভালো ছিলেন। কিন্তু তাই বলে এই অবেলায় তমালকৃষ্ণকে সাথে নিতে মনস্বিতার মন সায় দেয় না। কিন্তু তারও আগে টুলটুল দ্বিধা প্রকাশ করে।
-এই শরীরে তুমি যাবে বাবা?
-তুমি বসো। আপনি চলুন তো। চিন্তা করবেন না। আপনার স্বামী দেখতে পাবার আগেই আমি আপনাকে ছেড়ে আসবো।
মনস্বিতা আর টুলটুল যখন এগুচ্ছে তখন আকাশে পূর্ণতিথির চাঁদ। গাছ-পাতার আড়ালে মাঝ বরাবর বড় রাস্তায় মনস্বিতা আর টুলটুলের বড় বড় দীর্ঘ ছায়াগুলো কেমন এক আবেশ ছড়াতে থাকে দুজনের মনে। কেন কে জানে! মনস্বিতার গায়ে কেমন এক অজানা ফুলের নাকি বন-পাহাড়ের ঘ্রাণ। টুলটুলের মনে একটা অদ্ভুত দ্যোতনা তৈরি হয়। মনে মনে ভাবে :
-ধুর। এই ইট-কাঠের শহরে নারীর গা থেকে বন-পাহাড়ের ঘ্রাণ আসবে কোথা থেকে।
মনস্বিতার ভাবান্তর বোঝা যায় না। দুজনের কথা নেই। নীরবে পথ চলছে।
-কি হলো। ভয় পাচ্ছেন না কি?
-না। কেন?
-ওই যে একজন আছেন না আপনার?
মনস্বিতা কথা বাড়ায় না। ফারুকের প্রসঙ্গটি তার কাছে বিব্রতকর। বিশেষত সেদিন গাড়িতে তমালকৃষ্ণের সাথে যা করেছে আর তার নিজেরই্ যা করতে হয়েছে লোকসম্মুখে তা ভাবলে লজ্জায় মুখ পুড়ে যায়। টুলটুল নাছোড়বান্দা।
-আপনার বাড়িটি প্রায় এসে গেল । ওই যে…
-হুম।
-বাড়িতে আলো জ্বেলে এসেছিলেন?
-কই নাতো। তবে তিনি বোধ করি এসে গেছেন। আলো জ্বলছে।
কথাটা বলে টুলটুল হাতের আঙুলে মনস্বিতার ঘরে জ্বলতে থাকা আলোটা দেখায়। মনস্বিতা কুঁকড়ে যায় ভেতরে ভেতরে।
-আপনি চলে যান। আমি একটু একা যাই। এই ভালো।
মনস্বিতা আর কোনো কথা না শুনে টুলটুলের দিকে না তাকিয়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে চলে। টুলটুল কিন্তু নিজের জায়গা থেকে এক পা-ও টলেনি। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকে। মনস্বিতা একবার কল-বেল বাজাতেই দরজাটা খুলে যায়। জানালার পর্দাটা সরানো। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। ফারুক দরজা খোলে। আর সাথে সাথে একটা হ্যাঁচকা টানে চুলের মুঠি ধরে মনস্বিতাকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। টুলটুল আরেকটু আগায়। সামনের ঘরটার জানালার কাচ ভেদ করে যতটুকু দেখা যায় দেখে। ফারুক টানতে টানতে মনস্বিতাকে ভেতরের ঘরটাতে নিয়ে বিছানাও ওপর ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। ভেতরের ঘরের দরজাটাও সজোরে বন্ধ হয়ে যায়। একটা ঝড়ের পূর্বাভাসী রাত বুকে নিয়ে টুলটুল নীরবে ঘরে ফেরে। কাউকে বলা যায় না। কিচ্ছু বলা যায় না। সব এমন কেন। এত বিচ্ছেদ এত বিষণ্নতা এতটা ক্রূর কেন চারপাশ।
(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্ব (৫৬)

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-48/

পরবর্তী পর্ব (৫৮)

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-50/