শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৬০]

0
318

পর্ব ৬০

পথে যেতে যেতে নীরবতা প্রগাঢ় হতে থাকে টুলটুল এবং তমালকৃষ্ণের মধ্যে। বাপ-বেটা বিমূঢ় দুজনেই। নিভৃতচারণ চলে দুজনের ভেতর, একাকী। গতরাতের চাপা আতঙ্ক আর আজ সকালে তার বীভৎস ছায়াছবি তমালকৃষ্ণের সামনে সাজানো মুখোশগুলোকে যেন ছিঁড়েখুঁড়ে ছিঁবড়ে করে দিয়ে গেছে। মনুষত্বের সংজ্ঞায় পড়ে না তার কিছুই। সভ্যতার আড়ালে লুকোনো বীভৎস ক্লেদাক্ত ছাইগুলো কেবল উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়ছে দিগন্ত জুড়ে। কিছুতেই কিছু মেলাতে পারেন না তিনি। মানুষের ভেতরের আলো তিনি খুঁজে ফেরেন মানুষেরেই ভূমধ্য তিমিরে! এ কি বিস্ময়! ভাষা যেন হারিয়েছে স্তব্ধতায়। কেন এত বিষণ্ন আজ চারপাশটা। তমালকৃষ্ণ ভীষণ ভারাক্রান্ত মনে হাঁটছেন। ভেঙে পড়েছেন কেন যে এতটা তিনি! গতরাত থেকে আরও ব্যাপক আর বিধ্বংসী তার রূপ। যদিও মনস্বিতার সাথে পরিচয়টাই হয়েছিল তার যাতনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু তিনি কখনো ভাবেননি এভাবে একের পর এক ঘটনাগুলো ঘটতে থাকবে আর মেয়েটির সাথে উপর্যুপরি দেখা হতে থাকবে তার। হৃদয়ের মাঝ বরাবর এসে বসবে মনস্বিতা নামের সেই মেয়েটি স্বকন্যার রূপ ধরে। এও যেন এক অদৃশ্য কোনো সত্যাসত্যের কাজ। বয়সের কারণে শরীর ও মন সবই আজকাল ধরে এসেছে তমালকৃষ্ণের। গতরাত থেকে বুকের ব্যথাটা ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে। এখন সেখানটাতে চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব করছেন। সময়টা বরাবরই তার বুকে এঁকে চলেছে ক্ষতচিহ্ন। শুধু তার কেন হবে। সময় সকলেরই বুকে ক্ষতচিহ্নগুলোই এঁকে দিয়ে চলে। আর সেই ক্ষতের নিরাময়ে অক্লান্ত মানুষ চিরকাল। কিন্তু কই। পরিত্রাণ কি কিছু আছে? হয়তো কোনো সুসময় কোনো অজানা সুখ কিংবা অজানা আনন্দই উপশমের আশ্রয় এই সব ক্ষতের। না হলে মানুষ বেঁচেই বা থাকতো কি করে? কিন্তু এই মেয়েটি কি নিয়ে বেঁচে থাকবে? জীবনের কোনো যুদ্ধেই যে জয়ী হতে পারলো না? মনস্বিতার চেহারাটি তার চোখে ভাসতে থাকে। সেই চোখ মনে পড়ে যায়। সন্তানহারা মায়ের সে করুণ রূপ যা তমালকৃষ্ণের বুকের গভীরে এঁকে দিয়েছিল এক চিরকালীন ব্যথা। আরও এক সন্তানহারা পিতার শোককে উথলে দিয়েছিল যুগেরও বেশি সময় পর। কোনোভাবেই মুছে ফেলতে পারেন না তিনি। গোপনে নীরবে তার বুকের ভেতর যে প্রলয়ের আগুন জ্বলছে রয়ে রয়ে। যার কারণে ক্ষয় লয় জরাজীর্ণ আগ্রাসন যা তিনি কোনোকালেই জানতে দেননি কাউকে, তারই আরেক রূপ আর এক জীবনে। এই হয়তো প্রকৃতির বাসনা। কেউ পরিতৃপ্ত হবে না একটা জীবন নিয়ে। কেউ পৌঁছুতে পারবে না ইপ্সিত লক্ষ্যে। স্মৃতিগুলো মলিন করে দিয়ে আবার ভেসে ওঠে মনস্বিতার মুখ। কপালে ছড়িয়ে পড়ে থাকা চুলের আড়ালে কলঙ্করেখা। চোখের কোলে গতরাতের গড়িয়ে পড়া জলের শুকানো গোপন লেখা। এতটা বিমর্ষ বোধ করি মেয়েটিকে সেদিনও দেখেননি যেদিন প্রথম দেখেছিলেন। এবার আর বাঁধা মানে না কিছুই। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জল অসহনীয় সে ব্যথার দারুণ আঘাতে।
টুলটুল একাকী নীরবে হাঁটছে। কি বলবে? কি কথা বলা যায় নিজের বাবার সাথে এই দৃশ্যের পর। মেয়েটির মুখ সে আর মনে করতে চায় না। বরং পা দুটিই ভালো। সেই যে, মনস্বিতা হালকা চটুল পায়ে চলে যাচ্ছিল ওদের বাড়ি থেকে বের হয়ে। টুলটুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখেছিল নদীর ছলাৎছল গতি। সেই পা দুটিই বড় সুন্দর। এর বেশি আর কিছু ভাবতে চায় না সে এই মুহূর্তে। কিন্তু নিজেকে নিয়ে বড় অবাক হয় সে। দীপা তাকে ছেড়ে যাবার পর নারীর প্রতি কি এক দারুণ বিদ্বেষ তৈরি হয়েছে তার। নারী বড় স্বার্থপর। বড় লোভী। টাকা সোনাদানা বাড়িগাড়ির লোভে সে যে কোনো কিছু করতে পারে, এটা সে তার নিজের জীবন দিয়ে জেনেছে। এ জীবনে কখনো অন্য আর কোনো নারীর সংস্পর্শে যাবার মতো মমতা কিংবা ভরসা অথবা সাহস তার হবে কি? সম্ভব নয়। কিন্তু মনস্বিতার জন্য তার কি আসলেই কোনো মায়া জন্মেছে? মায়া সে তো মারাত্মক এক ব্যধির ঘোর। ওই দিয়ে জীবন চলে না। জীবন চলার জন্য চাই টাকা। প্রচুর টাকা। বাড়ি গাড়ি। জীবন সাজাতে চাই প্রচুর মাল-মশলা। এই মেয়েটির কথাই ধরা যাক। মনস্বিতার কথা। ওর যদি আজ প্রচুর টাকা থাকতো জৌলুষ থাকতো চাকচিক্য থাকতো তবে কি এভাবে মার খেতো। কিন্তু তারপরও তো সে এই জীবনের জন্য প্রাণপাত করে চলেছে। কিন্তু দীপা? কী করে পেরেছিল টুলটুলের এতটা ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলতে। দুজনই তো নারী। একজন একের পর এক বিসর্জন দিয়ে চলেছে। একজন দু পয়সার লোভে ফেলে দিয়ে চলে গেছে পরশপাথর। কি আশ্চর্য কথা। দীপার সাথে আজ মনস্বিতাকে তুলনা করতে বসেছে কেন সে? নিজের ভেতরের ভাবনায় নিজেই অবাক হয়।
বাড়ির প্রায় কাছাকাছি এসে তমালকৃষ্ণের বুকের ব্যথা প্রবল হয়। বুকে হাত দিয়ে হাঁটতে থাকেন তিনি। হঠাৎ টুলটুল খেয়াল করে।
-বাবা, কি হয়েছে?
হাতের ইশারায় আশ্বস্ত করতে চান টুলটুলকে।
-কিছু নয়। চলো।
-বুকে ব্যথা?
-আরে নাহ।
-চলো।
-এই তো প্রায় চলে এসেছি।
-টুলটুল একটা কথা বলি তোমাকে।
-বল।
-সারাজীবন তো আর তোমার সাথে মাধবীর সাথে আমার মতের মিল হলো না, তবু কথাটা বলা বেশ প্রয়োজন মনে করছি এই বেলাতে।
-কি হলো? এখন কি না বললেই নয়?
-হুম। না বললেই নয়।
-আচ্ছা, বল।
-মেয়েটি বড় অসহায়। সে অর্থে নয়, পরিস্থিতি আসলে মেয়েটিকে এই অসহায় অবস্থায় নিয়ে এসেছে।
-হুম।
বলতে বলতে পথের ওপর থেমে পড়েন তিনি। ছেলের হাত ধরেন। টুলটুল অবাক হয়। তমালৃকষ্ণের চোখে চোখ রেখে তাকায়। বিস্মিত হয় বাবার চোখে নোনাজলের ধারা দেখে। তিনি চোখের জল মোছার প্রয়োজন মনে করেন না। ছেলের হাতটি ধরে থাকেন।
-যদি কোনোদিন মনস্বিতা তোমার কাছে কোনো দরকারে আসে তুমি তাকে ফিরিয়ো না।
-আমার কাছে কেন?
-আমার মনে হলো তোমাকে কথাটি বলে রাখা প্রয়োজন। যদি কখনো আসে সেদিন জেনে নিও কেন তোমার কাছে? তবে সত্য জানার চেষ্টায় থেকো বরাবর। যে কোনো বিষয়ে নিজের তৃতীয় শক্তির ওপর ভরসা করো। চোখ থাকতে অন্ধত্ব কিন্তু প্রকৃতি সহ্য করে না।
দিন পেরোয়। দুপুর বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হতে থাকে। তমালকৃষ্ণের গলায় খাবার নামে না। রাত নামতে থাকে প্রগাঢ় অন্ধকার ছড়িয়ে। একটা চেয়ার টেনে আজ তমালকৃষ্ণ বাগানবিলাস ফুলের গাছটা যেখানে শাখা প্রশাখা মেলে জড়িয়ে আছে, গ্রিলের ধারে সে জায়গাটাতে বসেন। তার ঠিক নিচেই গোপন শলাপরামর্শ চলতে থাকে। হঠাৎ হালকা স্বরে কিছু আলোচনা কানে আসে তমালকৃষ্ণের। তরুণকৃষ্ণ আর শৈলরাজ বাপ ছেলেতে চলছে কথাবার্তা। তমালকৃষ্ণ বাড়ির বাড়ান্দায় মধ্যরাতে শরীর খারাপ নিয়েও বসে থাকবেন সকলের অগোচরে এই ভাবনা হয়তো শৈল কিংবা তরুণ কারোর মাথায়ই আসেনি।
-শোন শৈল, টুলটুলের কাছ থেকে দীপাকে তো সরানো গেছে। আপাতত টুলটুলের সন্তান হবার কোনো আশঙ্কা নেই।
-হুম আপাতত সম্পত্তির নতুন ভাগীদারের চিন্তা নেই বাবা।
-কিন্তু দলিল?
-হুম। দলিলটা কোথায় কার কাছে আছে?
-আমি যতদূর আন্দাজ করতে পারি দলিলটা দাদার কাছেই রাখা আছে।
ওদের কথায় উৎকর্ণ হন তমালকৃষ্ণ। ভবিষ্যতের দিনগুলো চোখে দেখবার চেষ্টা করেন। নিজের অনুপস্থিতিতে টুলটুল কিংবা মাধবীর কি হবে এসব ভাবনাও এসে ভীড় করে তার মনে। উঠে পড়েন চেয়ার ছেড়ে। ডাকতে থাকেন গলা ছেড়ে।
-মাধবী। মাধবী।
-কি হলো। এত রাতে অস্থির হলে কেন এমন?
-বাবার দলিল দস্তাবেজের ফাইলটা বের করো তো এক্ষুণি।
-কাল সকালে হলে চলে না?
-না না। এক্ষুণি বের করো।
ওদের কথা শুনে টুলটুলও চলে আসে। ফাইলটা খুলে তমালকৃষ্ণ বাড়ির দলিলটা নিজের হাতে পরখ করেন। ঠিক আছে। আশ্বস্ত হয়ে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়েন। রাতমধ্য হতে হতে বুকের ব্যথা বাড়ে।
মা চলে গেছেন মনস্বিতার। আজ বাড়িটা খা খা করছে। মনটা খুব অশান্ত মনস্বিতার। এই ভোরের আলোয় মায়ের উপস্থিতিটা মনে হয় নতুন জীবন দিয়ে গেল তাকে। যাবার বেলায় কি যেন সব বলে গেলেন।
-শোনো মনস্বিতা। জীবন তোমার। কিভাবে এ-জীবন চলবে তার গতিপথ ঠিক করবে তুমি।
-হুম।
-যদি মনে করো অস্বস্তি আছে কিছু। উপড়ে ফেলো। মনে রেখো যা কিছু অস্বস্তি তা যত দ্রুত উপড়ে ফেলা যায় ততই মঙ্গল।
-কি বলছ তুমি মা?
-হুম্। ঠিক বলছি। নিজের মঙ্গলের জন্য যা তা তাই করো এখন থেকে।
তারপর ব্যাগ খুলে একটা কাগজ বের করেন। ব্যাংকের চেক বই। টেবিলের ওপর রেখে খসখস করে টানা সাইন করে চেকটা হাতে ধরিয়ে দেন। মনস্বিতা দেখে না। তার চাকরি নেই। ফারুকেরও নেই। বরাবরের মতো কিছু টাকার যোগাড় করে রেখে গেলেন ভেবে চেকটা হাতের মুঠোয়ই ধরে থাকে। মা বলেন
-চেকটা খুলে দেখো।
চেকটা খুলে তাকিয়েই মনস্বিতা ভীষণ অবাক চোখে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। মা বুঝতে পারেন মনস্বিতার বিস্ময়ের কারণ।
-মা। এ কি? দুই কোটি টাকা?
-হুম। দুই কোটি টাকার চেক। টাকাই শক্তি। নিজের ভালো করো। মঙ্গল করো।
মনস্বিতার বিস্ময়ের ঘোর যেন কাটেই না।
-ব্যাংকে প্লেস করবে আগামী কালই সকালে।
মনস্বিতা কিছু বলতে যাবার আগেই হাঁটতে শুরু করেন তিনি। আর পিছু ফিরে তাকান না। যাবার বেলায় আর কোনো কথা নয়। কোনো আশীর্বাদ নয়। মাথায় হাত ছোঁয়ানো নয়। আদর করে চিবুক ধরে কপালে চুমু খাওয়া নয়। মনস্বিতার শরীরের কোথায় হাত দেবেন তিনি? পুরো শরীরে তার সভ্য মানুষের কদর্যতার ছাপ দহনের পোড়া ছাই অসুস্থ বিকৃতি আর নিস্পেষণের নিদাঘ। সেগুলো হাতে ছুঁয়ে দিলে নিজেরই ভেতর যে আগুন লুকোলেন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠবে সে হোমাগ্নি। বরং সব যাতনার বিশেষ বুকের গভীরে লুকিয়ে নিয়ে তিনি চললেন। কেবল এক জলছলোছলো নদী দুচোখ ভরে তুলে নিয়ে চলে গেলেন মনস্বিতার মা। জলের প্লাবনে ভাসতে থাকে মনস্বিতারও চোখ। পেছন থেকে ডেকে ওঠে :
-মা মা মা…।
মা আর পেছন ফেরেন না। দু’হাতে কান চেপে ধরেন। ত্রস্ত তার গতি। কী যেন হারিয়েছে তার। খুব তাড়া। খুঁজে বের করতে হবে নিজের হারানো সম্পদ নিজেকেই। মনস্বিতা নির্বাক চোখে তাকিয়ে থাকে মায়ের হেঁটে চলে যাবার পথের দিকে। ছায়া ক্রমে দীর্ঘ হয়। দীর্ঘতর হয়। ছায়া হারায়। বুকের ভেতর এক প্রবল হুতাশ। আকাশ বাতাস একাকার করে বইতে থাকে ব্যথা। এত ব্যথা! কোথায় কোথায় কোথায় যে বেদনা বাজে।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের লিংক 

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-51/

পরবর্তী পর্বের লিংক আসছে