শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৬১]

0
354

সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক

-আই ওয়ান্ট ডিভোর্স।
-হোয়াট? কি বললে তুমি?
-আমি মুক্তি চাইছি এই নষ্ট জীবন থেকে।
আলগা হয়ে আসে ফারুকের মুঠোর ভেতর মনস্বিতার চুলের বাঁধন। ভয়ঙ্করতম অবিশ্বাসে বুঝি কেঁপে ওঠে তার অন্তরাত্মা।
-না না এ হতে পারে না। তুমি ঠিক বলছ?
-হুঁ। একদম ঠিক বলছি। এই নষ্ট যৌথজীবনের দায় তোমার। কিন্তু সকল ভার আমার। আমি আর এই ভার নেব না। অনেক তো হলো।

পর্ব ৬১

মনস্বিতা বরাবর আস্তিক। আজ তার ভাব বিষণ্নতর। তাতে দহনও প্রচুর। আগুনের তাপে প্রজ্জ্বলনের আতিশয্য, সেও প্রবল। চারপাশে তার বিপুল চরাচর অথচ নিরঞ্জনে নিমগ্ন আত্মা। কঙ্কালবিহীন নির্মল পরমব্রহ্মে তার বিশ্বাস। জন্মতিথিতে কিংবা বোধের মাত্রস্ফুরণের সময়ে তার ঈশ্বরের দীক্ষা ছিল পারিবারিক। কিন্তু দিনে দিনে বয়স শিক্ষা আর বাস্তবজ্ঞান অর্জনের সাথে সাথে মুক্তবুদ্ধির বিকাশের কালে সেই বিশ্বাস শূন্যরূপ এক দেবতায় গিয়ে ঠেকেছিল। যেখানে তার অগাধ আস্থা। সৃষ্টির এক মহাকর্মার প্রতি স্থির আর যুক্তিযুক্ত ভাবনায় তার অধিষ্ঠান। কেউ একজন এই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন। সাথে সাথে ভার নিয়েছেন তা নিয়ন্ত্রণেরও। তা না হলে এতসব জটাজাল এত সহজে সমাধানে পৌঁছুতে পারতো না। এই বিশ্ব এই ব্রহ্মাণ্ড সাংঘর্ষিক মহাকালানলে পতিত হয়ে কবেই সৃষ্টির বিনাতারে জট লেগে যেত। আর যে নিরঞ্জন এত আদরে এত সম্ভারে এত সহিষ্ণুতায় সৃষ্টি করেছেন, সেই সৃষ্টের প্রতি তার ভালোবাসা নিজের সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার চেয়েও অগাধ-অবাধ। সৃষ্ট জীবের প্রতি নিরঞ্জনের দান অফুরান, অনন্য। এই প্রথিত বিশ্বাস এতকালের পড়াশোনায়ও সে ভেঙে ফেলতে পারেনি। ধর্ম পরম চর্চা। এ নিয়ে তার ভাবনা অন্যরকম। সে মুসলিম পরিবারে বেড়ে উঠেছে বলে তিরিশটি রোজায় নামাজে সেজদায় ভক্তি প্রদর্শন করে। সনাতনের গর্ভে জন্মালে হয়তো উপবাসে পূর্জো আর্চায় ভক্তিনত হতো। তাই তার কাছে ধর্ম একটা রীতি। ধর্ম নিজের মনকে শাসন করার একটি দিকনির্দেশনা। এটি ব্যক্তিগত। যার যেভাবে খুশি করুক। না করলে নয়। এ নিয়ে বাড়বাড়ি তার সয় না। পরম শান্তির পথ নিজে নিজেই খুঁজে নিক না সকলেই। তার নিজের অসহায় মুহূর্তেও সে নত হয়, নত হয় নিরঞ্জনে কিংবা শিবে ঈশ্বরে আল্লাহ ভগবানে। এই বিমূর্ত যাতনার মহাকাল পার হতে আজ ভয়ঙ্কর কষ্ট মনস্বিতার। হৃদয় ভারাক্রান্ত। কেউ একজন তার দরকার। কোন্ এক আধিদৈবিক সত্তার কাছে সমর্পণ না করলে প্রাণ তার ওষ্ঠাগত। এই একা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে সে নিজেকেই বা ভালোবাসবে কি করে? নিজেকে ভালোবাসতে না পারলে সে বেঁচেই বা থাকবে কি করে? এখনো তো নিভে নিভে জ্বলছে তার দ্বিতীয় সত্তার পরম আত্মার শিখা। নিয়ত নিভৃতে মনস্বিতা টের পায় এর উত্তাপ। শোনে মা মা মা… ডাকের ধ্বনি। প্রতিধ্বনিত হতে হতে যে শব্দ ছড়িয়ে পড়ে অতীত থেকে বর্তমানে। বর্তমানকে পেছনে ফেলে যে ছুটে চলেছে ভবিষ্যতেও। কী এক প্রখর অন্তর্দৃষ্টিতে সে দেখতে পায়। হ্যাঁ স্পষ্ট দেখতে পায় তার সচল অস্তিত্ব। কোনো একদিন কি আসবে সেই শুভদিন! মা-ওতো চলে গেলেন তাকে একা ফেলে। আরও দীর্ঘ দিন যাবে। কেউ কি আসবে না তাকে ভালোবাসবার মতো কিংবা সে ভালোবাসবে এমন, কোনো আত্মজও নয়? তবু সে নিজেকে একা ভাবতে নারাজ। তাই বহুদিন পর খুব পাক পবিত্র হতে ইচ্ছে হয় রীতিমত। গায়ে লেগে থাকা আবর্জনা, মনের গভীরে ছড়িয়ে পড়া নোংরা গন্ধ, রাতের গভীরে প্রথিত যত ক্লেদের মহাওঙ্কার সে মুছে স্তব্ধ করে দিতে চায় এই রীতিবদ্ধ শুদ্ধতায়। হায়, কী বিমর্ষ এই রাত! কত যে প্রলম্বিত এই রাত্রির আস্ফালন! বেশ গভীরে আজ একাকীত্বের বোধ মনস্বিতাকে খুব অসহায় করে তু্লেছে এইকুকু টের পায়। চোখের ওপর একটি কদর্য মুখ ঘুরে ফিরে বেড়ায়। জায়নামাজে বসে নামাজের রাকাতগুলো ভুলে যায়। অনেক সুরা রুকুর তসবি গোনাও ভুল হয়। কিন্তু এক পরম শান্তি বোধ করে নিজের ভেতর। কী এক শক্তি খেলে যায় নিজের ভেতর? শরবিদ্ধ কোনো ভয়ঙ্কর হিংস্র পশুর চোখ হঠাৎ অন্ধকারে জ্বলে উঠে ক্রোধান্ধে লাফিয়ে পড়ে যখন শিকারীর ঘাড়ের ওপর, সর্বশক্তি দিয়ে যেমন শেষ চেষ্টার নিষ্ফল ক্রোধে জ্বলে ওঠে তীব্র আলোকচ্ছটা, তেমনি কি এক আলো জ্বলছে নিজের ভেতরে, মনস্বিতা টের পায়। ঠিক তখনই মেঝেতে জায়নামাজে বসে নামাজ শেষ করার মুহূর্তে টের পায়, ফারুক এসে মনস্বিতার উচ্চতায় খানিকটা উবু হয়ে ডাইনিংয়ের চেয়ারটা টেনে বসেছে। রান্না ঘরে কোনো খাবার নেই। রান্না নেই। ড্রেসিং টেবিলটার ওপর চিরুনি ক্লিপ এলোমেলো পড়ে রয়েছে। ঘরের সিলিংয়ে মাকড়শার জাল, সব অগোছালো। ওয়ারড্রোর্বের ওপর কয়েকদিনের ধূলো। এসব খুব খেয়াল করে ফারুক প্রস্তাবনা শুরু করে।
-নামাজ শেষ হলো? কী হবে আর নামাজ পড়ে। ঘরে রান্নাবান্না নেই কিছু দেখলাম। মন তো তোমার এলোমেলো অগোছালো। এখানে সেখানে পড়ে থাকা ধূলো ময়লাই বলে দিচ্ছে তোমার মন উচাটন।
জায়নামাজে বসে থাকা অবস্থায়ই তীক্ষ্ণ চোখে মনস্বিতা একবার তাকায় ফারুকের দিকে।
-নিজের রান্না রেধে খাও আর দূরে সরে বসো।
কথাটা শোনামাত্রই আগুন জ্বলে ওঠে ফারুকের বুকের ভেতর। তার চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসে লেলিহান শিখা। মনস্বিতার চুলের মুঠিটা খপ করে জোরে শক্ত করে ধরে ডানহাতে। মনস্বিতার কথা তখনো শেষ হয়নি। কাজও নয়। বোধের গভীর থেকে উঠে আসে নিরপেক্ষ কালো ঘৃণা।
-থু।
একদলা থুতু সে ফারুকের মুখের ওপর ছিটিয়ে দিলে ক্রোধে অন্ধ হতে শুরু করে বলিষ্ঠ পুরুষ। এই প্রথম মনস্বিতার সজোর প্রতিবাদ। ঘৃণার বিশুদ্ধ প্রকাশ। মনস্বিতা ঠাঁয় বসে থাকে জায়নামাজে। যেন সে এইমাত্র পরিশুদ্ধ হয়ে উঠেছে এতকালের সংশয় ক্লেদ যাতনা কিংবা অপমানের যন্ত্রণা থেকে। এই মুহূর্তের একপ্রস্থ বাতাস যেন বহুবছর পর তার প্রশ্বাসে ঢুকে যায় এবং তীব্রতর মানসিক শক্তি এসে করে তার উপর। সব নির্মল। বিশুদ্ধ। সব সুন্দর যেন আবার তারই। এতকালের মনস্বিতা মরে গেছে। এইমাত্র সম্পাদন হয়েছে তার শেষকৃত্য। এই যে নতুন মনস্বিতা, সে দ্বিধায় নয় ভালোবাসার ইন্দ্রজালে কিংবা ভ্রান্তির ছলনায় নেই আর। তাই তার মুখে যা-যা উচ্চারিত হয়, তা যেন সেই আধিদৈবিক শক্তির প্রচ্ছায়ায় নিজেরই প্রবল প্রতাপে উচ্চারিত ধ্বনিতরঙ্গ। নিজের সম্মানবোধের শেকড়টা আজ অনেক দৃঢ়। নিজেই উচ্চারণ করে আর বাতাসে ভাসিয়ে দেয় কঠোরতম শব্দ-বাক্যের বিষাক্ত তীর।
-আই ওয়ান্ট ডিভোর্স।
-হোয়াট? কি বললে তুমি?
-আমি মুক্তি চাইছি এই নষ্ট জীবন থেকে।
আলগা হয়ে আসে ফারুকের মুঠোর ভেতর মনস্বিতার চুলের বাঁধন। ভয়ঙ্করতম অবিশ্বাসে বুঝি কেঁপে ওঠে তার অন্তরাত্মা।
-না না এ হতে পারে না। তুমি ঠিক বলছ?
-হুঁ। একদম ঠিক বলছি। এই নষ্ট যৌথজীবনের দায় তোমার। কিন্তু সকল ভার আমার। আমি আর এই ভার নেব না। অনেক তো হলো। অনেক দিন তো দেখলাম তোমার সামন্ততান্ত্রিক আস্ফালনের রূপ। দেখলাম চরিত্রের সূক্ষ্ণতম দারিদ্র্য আর লুকানো অলিসন্ধি। মনুষত্বের ন্যূনতম অবশেষ কোথায় খুঁজে খুঁজে আমি অন্ধকার কানাগলিতেই এসে পৌঁঁছুলাম। যে দীপ ধরে রাখতে চেয়েছি, যে ঘর উজ্জ্বল করে তুলতে চেয়েছি, অন্ধকারের ছায়া থেকে সেই আলোর রেখাটি মুছে গেছে। এবার মুক্তি চাই। আমার মুক্তি।
-বাজে কথা বলো না। আমার ওপর সব দোষ দিয়ে বেলেল্লাপণা করতে চাইছ, সেটাই বল।
-আসল আর নকলের প্রভেদ বুঝবার ক্ষমতা তোমার রহিত হয়েছে বলতে পারি না আজ। বরং দিনে দিনে এটাই নিশ্চিত হয়েছি যে তোমার কোনো দিন সেটা ছিলই না।
ফারুক ভাঙবে কিন্তু মচকাবে না।
-ওকে। কি করতে চাও?
-আমি আলাদা থাকতে চাই।
-বাহ্। হুম। এইতো, এইতো খেলার শুরু।
বাঁকা হাসি মুখে ফুটিয়ে তুলে মনস্বিতাকে হুল ফোটানোর ব্যর্থ চেষ্টা ফারুকের চলতেই থাকে। যদিও মনস্বিতার মতো করে তাকে আর কেউ চেনে না। তাই এইসব বাঁকা কথার ফাঁকে ফাঁকে ফারুকের আত্মবিশ্বাসহীন চোখে চোয়ালের হাড়ে ক্রমাগত রক্তসঞ্চালনের তীব্র গতি তাকে বলে দিচ্ছে শত অন্যায় করেও ফারুক ভাবতেই পারে নি মনস্বিতা কোনো দিন তার ওপর থেকে ছায়া সরিয়ে নেবে। ভেতরে ভেতরে শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টায় প্রাণান্ত আজ সে, যদিও সেটা সে মনস্বিতার কাছ থেকে লুকানোর চেষ্টা করে। আর মুখে উচ্চারণ করে :
-ঠিক আছে। আমাকে ডিভোর্স দিয়ে তারপর যাবে।
-ওকে, দেন আই ওয়ান্ট টু স্টে সেপারেটলি। আমার ডিভোর্স দেবার দরকার নেই।
-কেন?
-সে প্রশ্নের উত্তর তোমাকে দেব না। তবু বলছি আমার প্রয়োজন নেই।
-হা হা হা। হা হা হা।
আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে হাসে ফারুক। হাসিতে ব্যর্থ একজন অত্যাচারী পুরুষের চোখের কোলেও চিকচিক করে ওঠে জলকণা। মনস্বিতার কোনো দ্বিধা নেই। সে জানে ফারুক তাকে ভালোবাসে। তাই সে মনস্বিতার বিচ্ছেদের ভাবনাটাকে সত্যি বলে মেনে নিতে পারছে না এই ভোর হতে চলা শেষ রাতের প্রহরে। কিন্তু ফারুকের ভালোবাসা নিছক একটা শব্দ যা বুকের ভেতরে থাকে। এর প্রকাশ নেই। আয়োজন নেই। ভালোবাসা নামের চারাগাছটিকে কী যত্নে জল ঢালতে হয়, কখন পাতার গায়ে ধুলো মুছে দিতে হয়, কখন তীব্র সূর্যালোক থেকে কোমল ছায়ায় সরিয়ে রাখতে হয়, কখন অকারণে কিছু কথার মালা পড়িয়ে অলঙ্কৃত করতে হয়, এসব তার জানা নেই। তাই সম্মান-অসম্মানের সীমারেখা তার কাছে খুব অস্পষ্ট। যে বায়বীয় শব্দটি নানা কাজে মূর্ত হয়ে ওঠে অহংকারে, তাকে ফারুক পায়ে ঠেলেছে চিরকাল। পুরুষতন্ত্রের ভয়ানক কালো থাবায় ছিন্নভিন্ন করেছে। এটা ভেবে যে-কোনো নারী একা-একা সুখ পেতে পারে, কিন্তু এ দিয়ে জীবন চলে না। জীবনের পরতে পরতে জমতে থাকে ক্লেদ। নিভে যেতে থাকে আলো। ছড়িয়ে পড়তে থাকে মারাত্মক অসুখের জীবাণু। এই অসুখ থেকে মনস্বিতা সবেমাত্র সেরে উঠেছে। ফারুক পারেনি। পারছে না। আরও হয়তো বহুকাল সে পরে থাকবে এখানেই। স্থবির মানুষ জড়ের মতো জীবন নিয়ে পথচলার ক্লান্তি আর রুদ্ররোষে পরিণত মনস্বিতার। হঠাৎ ফোনটা বেজে ওঠে।
-হ্যালো।
-কে মনস্বিতা?
-বাবা?
-তোমার মা গতকাল বাড়ি ফিরে ঘুমিয়ে গিয়েছিলেন। আর জাগেন নি।
-মা…!
-ডাক্তার বলেছে গতকালই একটা মেজর হার্ট অ্যাটাক হয়ে গেছিল।
-মা…
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্বের (৬০) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-52/

পরবর্তী পর্বের লিংক আসছে