শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৬২]

0
309

করুণায় জীবন চলে না ফারুক। জীবনের জন্য যাই প্রাচুর্য। ভালোবাসার প্রাচুর্য। চাই আনন্দ। প্রচুর আনন্দ। যাপনের শুদ্ধতা। চাই পূণর্জন্ম। ক্ষণে ক্ষণে চাই আশ্চর্য বিনির্মাণ।

পর্ব ৬২

মা—একটা নদী। বাইরের সকল যার নিঝুম। আপাত শান্ত। ভেতরে সমুদ্রের অভিমুখে তুখোড় স্রোতস্বীনি তার চলা। মনস্বিতা এমনই দেখেছে বরাবর মাকে। স্রোতের অনুকূলে তার তুমুল গতি। প্রতিকূলেও সর্বস্ব বাজি রেখে চলমান গতিধারা। নিজের আভায় সে নদী স্বয়ংপ্রভ। প্রচুর সুখ দিয়ে গেছেন যাকে-তাকে তবু দক্ষিণ নয় তার নিজের সুখের রঙ। ছিলেন সংসারে সশ্রম। নদী তার শেষ শান্ততার রেশ দিয়ে গেছে সেদিনও। ভেতরের আগুন বুঝতে দেননি মনস্বিতাকেও। অথচ একটি দিনের ব্যবধানে সে-নদী আজ মৃত। এ কী বিস্ময়! গতকালও যিনি প্রচণ্ড রোষে ধাবমান তিনি ভেতরে এতটা স্বস্থ! এতটাই গতিহীন হয়ে পড়ে রয়েছে মরা নদীর সোঁতাখানি আজ। এ বিস্ময়ের ঘোর কাটাবে কী করে মনস্বিতা জীবনভর? অথচ তারও বেশি বিস্ময়, অস্ফুট উত্তেজনার মুহূর্তেও তিনি দিয়ে গেছেনে তার আত্মজাকে প্রবল স্রোত। খুলে দিয়েছেন একটা বিপুল পথরেখা। মনস্বিতাকে পড়তেই হবে সে রেখাটির ভাষা। প্লাবনের শেষ পলিটুকু এখনো পড়ে রয়েছে তারই ঘরে। তারই ভাগ্যে।
আহা, বুকটা হু হু করে ওঠে বেদনায় বেদনায়। আকাশ বাতাস চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ছে গোপনে একা একা মনস্বিতার বুকের ভেতর। কাঁচের টুকরোর মতো ধার এই বিষাদের। রক্তাক্ত হৃদয়ে মনস্বিতা খানিক অস্থির, খানিক প্রগলভ, খানিক দিশেহারা। মনস্বিতা কী করে ধারণ করবে এই বেদনার অশেষ, যা বিশেষ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গতকাল থেকে তার জীবনব্যাপী? বুকের চাপরাশ ঘিরে অজস্র নীল ধোঁয়া ওড়ে। উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে পাক খায়। অতঃপর নীল আকাশের পাড়ে শূন্যে মিলায়। তার ভেতর নেমে আসে যেন স্বর্গের সিঁড়ি। ওই তো, মনস্বিতা দেখতে পায় মা চলে যাচ্ছেন। চলেছেন তিনি মনস্বিতার চোখের সামনে গিয়ে। চলেছেন সকল ছেড়ে। মনস্বিতাকে ছেড়ে। এক পরাক্রান্ত বহুবচন চলে যাচ্ছেন মনস্বিতাকে একা করে দিয়ে। অসাবধানে মনস্বিতা ডেকে ওঠে,
– মা। মা যেও না। আমাকে একা রেখে তুমি স্বর্গে চলে যেও না!
না। মা কিছুই শুনতে পাননি। মনস্বিতার কোনো দুঃখ কোনো যন্ত্রণা আর আজ মাকে পেছনে ফিরিয়ে আনতে পারবে না। মা। তিনি জন্মে এক। তারপর একের ভেতর বহু। একের ভেতর অনেক। তার রক্তজাত এক এক জনের শূন্যতা পূর্ণতা ব্যথা বেদনা কিংবা দহনের আনন্দ উত্তাপ তাই তাকেই দহন করে চলেছে যুগেরও অধিককাল ধরে। জীবনে প্রথমবারের মতো তাকে দেখতে এসে যে আগুন লেগে গেছে মনে, তারই শিখায় পুড়ে গেছে তার শরীর মন মগজ সমগ্র সত্তা। এড়াতে পারেননি তাকে সেই লৌহমানবী। তাই আজ তার তুমুল পরাজয়টুকুই মনস্বিতার বুকে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। ক্রমাগত রক্তাক্ত করে তুলছে সময়। বুক ফেটে কান্না আসছে। কাকে বলবে সে যাতনার কথা! সে মানুষ নিজের সন্তানের মৃত্যুতেও অবিচল তাকে মনস্বিতার মায়ের মৃত্যুসংবাদ দেবে? কেন দেবে? বিশেষত আজ যদি সে বলে তার মা আর তার সন্তানের মৃত্যুর কারণ ফারুক। কে নেবে এই দ্বিবিধ বেদনার ভার? কে নেবে দায়? আর নিলেই বা কী এসে যায়। যে গেছে সে তো দীর্ঘ গেছে। ফেলে গেছে মায়া। কায়ারূপে তাই আসে চোখের সামনে বারবার। ঘুরে ঘুরে ফিরে ফিরে আসে আর কাঁদায় অলক্ষ্যে। নীরবে। গোপনে। ফারুকের সামনে নিজের ভাঙন সেদিনও খুলে ধরেনি মনস্বিতা। আজও নয়। দেবে না দেখতে বিশ্বচরাচরকে তার গোপন-গভীর প্লাবন। ঘরে তার বিরুদ্ধ বাতাস। কাঁদবার ফুরসৎ নেই। ফারুকের চোখে ধরা পড়েনি টেলিফোনে মনস্বিতার বাবার সাথে কথোপকথনের শব্দ। তাকিয়ে দেখেনি মনস্বিতার চোখের রঙ কিংবা কপালের কুঞ্চন। বুঝবার মতো সময় হয়নি বাপ-কন্যার কথায় ভাবাবেগের ব্যাকুল অস্ফুট যাতনার বিশদ। চিরকাল এমনই বোবা মনস্বিতার সকল যাতনা। বুকের ভেতরে যখন অজস্র নদীর পাড় ভেঙে ভেঙে পড়ছে মনস্বিতার তখন ফারুক অস্তিত্বের প্রবল সঙ্কটে এলোমেলো। টলোমলো পায়ে হেঁটে কোনোমতে বিছানায় গিয়ে এলিয়ে পড়ে উপুড় হয়ে। পেছন থেকে তার এলোমেলো মাতালের মতো পা ফেলা দেখে কান্নায় ফুলে ফুলে ওঠা পিঠ দেখে আরও আরও ঘৃণায় ভরে ওঠে মনস্বিতার মন। এতটা ভীরু দুর্বল আর কাপুরুষের সাথে বাস করে এসেছে মনস্বিতা। নিজেকে আজ মনস্বিতার রাজ্যজয়ী রাজ্যেশ্বরী মনে হয়। বীর নারী সে। তাই বীরপুরুষই মনস্বিতার যোগ্য। এই ভীরু এমন দুর্বল পুরুষ মনস্বিতার যোগ্য নয়। সন্তানের বিয়োগে যে অতটা অস্থির হয়নি আজ নিজের অস্তিত্বের সংকটে এতটা ম্রিয়মান সে। ছিঃ!
কয়েকটি কাপড় গুছিয়ে নিয়ে হাতব্যাগটা ঘাড়ে ফেলে মনস্বিতা বের হয়ে আসে। বের হয়ে আসে দশটি বছরের অযাচিত যাতনার বিপুল বিষাদ পেছনে ফেলে। পার হয়ে আসে ক্লান্ত বিষণ্ণ অপমানের সর্পিল দীর্ঘ পথ। বাড়ির বাইরে যাবার বেলায় তার এতটকু হৃৎকম্পন নেই। এতটুকু মায়া হয় না শেষ বেলায়। কিছু নিয়ে যেতে ইচ্ছে হয় না নিজের হাতে গড়া সংসারের কোনো টুকিটাকি।
সে বাইরে পা ফেলে। ফারুককে কিছুই বলবার নেই তার। কিছু হারায়নি তার এ জগতে, কেবল একটি স্রোতস্বিনী নদী ছাড়া। কিছুই বেদনা নেই তার সংসারে কেবল একটি সম্পদ হরণের যন্ত্রণা ছাড়া। সম্পত্তি আর যা কিছু আছে থাক পড়ে এখানেই।
দরজা খোলার শব্দে সচকিত হয়ে ওঠে ফারুক। বুকের গভীর তার আজ ফাঁকা। শূন্য। নীল আজ আকাশের রঙ। মনস্বিতার কেমন অস্থির লাগে। প্রবল পেশীশক্তির আস্ফালন দেখেছে চিরকাল যার মুখে, চোখে, হাতে আর পায়ে, আজ তার এমন দীন-হীন কাতর রূপ একজন নারীর জন্য। করুণা হয় মনস্বিতার পুরুষটির প্রতি। অজানা অচেনা এই পুরুষ তার। ফারুক পথ আগলে দাঁড়ায়। কণ্ঠে তার মিনতি।
-মনস্বিতা!
ফারুকের কণ্ঠে রৌদ্রতপ্ত চৈত্রের মাঠ-ফাটা নিনাদ। হাহাকারে বিষাক্ত বাতাস। মনস্বিতা ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকায়। তারপর খুব সহজ স্বরে শান্ত মনে বলে :
-আমার মা মরেছে।
একমুহূর্তে ফারুকের চোখে কী এক আনন্দের নাকি আশার ঝিলিক খেলে যায়। মনস্বিতার চোখ এড়ায় না সে আলোর কণা। ফারুক চোখের জল মোছে।
-দাঁড়াও, আমিও যাচ্ছি তোমার সাথে। একটু বসো। আমি তৈরি হয়ে আসছি।
সুযোগ একমুহূর্তের জন্যেও হাতছাড়া করতে নারাজ সে। কোনোদিকে না তাকিয়ে অন্ধের মতো দ্রুত হাঁটে ফারুক। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সোফায় ধাক্কা লেগে পড়ে যেতে চায়। মনস্বিতার সেদিকে তাকিয়ে হেসে বলে :
-এসো না। দরকার নেই।
হঠাৎ থমকে তাকায় ফেরে ফারুক।
-কী বলছ?
-আমি ছেড়ে যাচ্ছি। আমার সংগ্রাম শেষ হয়েছে। নতুন কোনো যুদ্ধ আমার সামনে।
-আমি যাব তোমার সাথে যুদ্ধে।
-হা হা হা! ফারুক, এবারের যুদ্ধটা আমার একার।
-মনস্বিতা, অনুরোধ করছি। যেও না। সব ঠিক করে নেব আবার। তুমি আমার পাশে থাকলে সব আবার নতুন করে হবে। তুমি যেভাবে চাইবে সেভাবেই হবে সব।
ফারুকের কথা শেষ হতে না হতেই যেন কলজেটা খামচে ধরে তার আটমাসের মৃত সন্তানটির জীবিত আত্মা। সুতো ছিঁড়ে মনের গভীরে একটা ঘুড়ি ভোকাট্টা হয়ে ঘুরে বেড়ায় আকাশের অন্তর শূন্য করে দিয়ে। একটা তীক্ষ্ণ ছুড়ির ফলা দু-ফাঁক করে কেটে ফেলে দেয় তার হৃৎপিণ্ডটি। মনস্বিতা শরীরের ভেতর মগজের কোষে-কোষে একটা তীব্র কালোরাত একটা বিষাক্ত নীল আবেগ একটি শিশুর মৃতদেহ আগলে ধরে চিৎকার করে হেসে ওঠে।
-হা হা হা! ফারুক, তোমার জন্য আমার করুণা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই আজ।
-তোমার এই করুণার কণাটুকু নিয়েই আমি বাকি জীবন তোমার সাথে থাকতে চাই।
মনস্বিতা হাসে। ফারুকের মনে হয় এ তো মনস্বিতা নয়। মনস্বিতার ভেতরে অন্য কেউ। এ অন্য কেউ। তবু মনস্বিতা হাসতেই থাকে।
-করুণায় জীবন চলে না ফারুক। জীবনের জন্য যাই প্রাচুর্য। ভালোবাসার প্রাচুর্য। চাই আনন্দ। প্রচুর আনন্দ। যাপনের শুদ্ধতা। চাই পূণর্জন্ম। ক্ষণে ক্ষণে চাই আশ্চর্য বিনির্মাণ।
-হ্যাঁ, ওকে, তাই হবে মনস্বিতা, তাই হবে।
মনস্বিতার সময় নষ্ট হয়। মায়ের মৃতদেহ পড়ে রয়েছে ওখানে। মাকে শেষ দেখাটা দেখতেই হবে তার। পায়ে মাথা ঠেকিয়ে তার জীবন সংশয়ে ফেলে দেবার পাপমোচন না করে বেঁচে থাকবে কী করে সে! ফারুকের এই কনফেশন আজ অর্থহীন মনস্বিতার কাছে। তার চেয়ে ঢের বেশি দরকার তার দ্রুত বাস স্টেশনে পৌঁছানো। অনেক বেশি প্রয়োজন নির্মল প্রশ্বাস নেয়া। অক্সিজেন দরকার তার। প্রচুর অক্সিজেনের ঘাটতি হয়েছে তার হৃৎপিণ্ডে এতটা কাল ধরে। ফারুকের কথায় তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে ঘৃণায়, অবজ্ঞায়। স্বপ্নহীন দুটো চোখ বেয়ে কেন যে আজ অঝোর ধারায় জল ঝরে পড়তে চাইছে এই ক্ষণে মনস্বিতা বুঝতেই পারছে না। খুব কষ্ট হয়ে যাচ্ছে সে জলের রুদ্ধ স্রোতের মুখে বাঁধ দেয়া। ততক্ষণে মনস্বিতার পায়ে ঝুঁকে পড়েছে ফারুক।
-ক্ষমা করো, মনস্বিতা, ক্ষমা করো। এতটা নিষ্ঠুর হয়ো না!
মনস্বিতার ইচ্ছে করে একটা লাথি মেরে ফারুকের মুখটা থেঁতলে দিতে। সেটা করতে পারলে বেশ হতো আজ। পারে না। চিরকালের শিক্ষা রুচি আর মনুষ্যত্ববোধ তাকে আগলে ধরে। হাসতে হাসতে বের হয়ে যায়।
-হা হা হা! হা হা! টাইম এক্সপায়ার্ড ফারুক।
তারপর আবার দাঁতে দাঁত ঘষে প্রচণ্ড রোষে দ্বিতীয়বারের মতো উচ্চারণ করে।
-টাইম এক্সপায়ার্ড! মনস্বিতা ইজ নো মোর ফর ইউ।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (৬১) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-53/

পরবর্তী পর্বের লিংক আসছে

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-55/