শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৭৫]

0
277

পর্ব ৭৫

এর পর বেশ অনেক্ষণ এভাবেই ঘরের চৌকাঠটাতে বৃষ্টির জলে ভিজে ভিজে বসে থাকে মনস্বিতা মৌন। সাথে টুলটুল। কারো মুখে কোনো কথা নেই। মনস্বিতার আজ কী এক ধ্যান। কে জানে, হয়তো তার বৈবাহিক সারাজীবনটাই পর্যালোচনা করছে মনে মনে। কিন্তু মনস্বিতাকে দেখে টুলটুলের আজ বড় মায়া লাগে। ওর হাতটা ধরবে একবার? মেয়েটির ঝাঁঝালো চরিত্রের যে ধার কি না কি বলে বসে, অতসব ভেবে ভেবেও অবশেষে দ্বিধাদ্বন্দ্বসহই মনস্বিতার হাতটা আলতো করে নিজের হাতে নেয় টুলটুল। অবাকও হয়, মনস্বিতা কোনো কথা বলে না ফিরে তাকায়ও না তার দিকে। বৃষ্টির জলে স্নাত একটা মৃণাল যেন আলতো পড়ে থাকে টুলটুলের হাতের মধ্যে। তবু সে হাত কিন্তু সাধারণত মেয়েদের যেমন হয় তেমন নরম তুলতুলে নয়। কোমল কঠোরে সৃষ্ট সে হাত বোধ করি ভগবান নিজ হতে বানিয়েছেন। বৃষ্টির জলে পুরুষের মতো দৃঢ় অথচ নারীর মতো ঋজু হাতের করতল ছুঁয়ে ছুঁয়ে টুলটুলের পরমব্রহ্মের কথা মনে পড়ে যায়। নিজের গভীরে গোপনে কোথায় কোনো এক ধ্রুব সত্যের উদ্ভাস টের পায় এ হাতের দিকে তাকিয়ে। করতলের রেখাগুলো অদ্ভুত রকমের গাঢ়। মেয়েদের হাতের রেখা এমন গাঢ় হয় খুব কমই দেখেছে টুলটুল। এমন দৃঢ় যেন একটা হাতই বলে দেয় এর চারিত্রিক বলিষ্ঠতা। কিন্তু এই বিষাদ সে কী আদতে ফারুকের জন্য? এতকিছু করেও মেয়েটি সংসারটা টেকাতে পারলো না। কিন্তু ফারুকতো তার উপস্থিতিতেই একদিন এসেছিল মনস্বিতার কাছে। মনস্বিতাই ফিরে যায়নি। ফিরিয়ে দিয়েছে। তবু আজ এক বিস্তৃত হাহাকার কেন আলসে ছায়া মেলে শুয়ে আছে মনস্বিতার পুরো মুখটা জুড়ে! এ-তুমুল হাহাকার কি কেবল একজন মানুষের জন্য? নিজের মনেই নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে চেষ্টা করে টুলটুল। হাহাকার জীবনের নষ্ট হয়ে যাওয়া মধুময় ক্ষণগুলোর জন্য। ব্যক্তির নিজস্ব ভুলের জন্য, হয়তো হারিয়ে ফেলা কিছু অনুভবের জন্য। বৃষ্টির দাপট বাড়তে বাড়তে ছড়িয়ে পড়ে দাপাদাপি। বাতাসের জোর গাছেদের ডালে ডালে পাতায় পাতায়। জানালার শিটের কাঁচগুলো বাতাসের ঝাপটায় নড়েচড়ে দুমদাম শব্দ করে এক একটা যেন ভেঙে পড়বে এক্ষুণি, এমন শব্দে মনস্বিতা সচেতন হয়ে ওঠে। ওঠার জন্য হাতটা টেনে নিতে চায়। টুলটুল ছাড়ে না। আরও শক্ত করে ধরে;
-থাক না।
মনস্বিতা চমকে তাকায়। টুলটুলের চোখের ভাষা পড়তে চেষ্টা করে। কিছু যেন মিনতি রয়েছে সেখানে!
-সে কি আপনিও ভিজে গেলেন যে পুরোপুরি।
-তাতে কি?
-এভাবে কতক্ষণ ভিজে বসে থাকবেন। জ্বর আসবে যে?
মনস্বিতা খুব চিন্তায় পড়ে যায়। আকাশের দিকে তাকায়। বৃষ্টির দাপট কেবল বেড়েই চলেছে। ধরে আসবার কোনো লক্ষণ নেই। ইতস্তত করে সে;
-বলুন তো কি করি? ছেলেদের জামা কাপড় নেই আমার কাছে।
-হায়। আপনাকে তো তাহলে মহা ঝামেলায় ফেলে দিয়েছি। আমি তো ভেবছিলাম আপনার বাড়িতে নিশ্চিত ছেলেদের কাপড় আছে।
টুলটুলের চোখে দুষ্টুমীর হাসি। মনস্বিতা হাসে। টুলটুলের হাতে হাত ধরা তখনো। টুলটুল মনস্বিতার হাতটা ধরে টেনে ছাদের মাঝখানে নিয়ে যায়। বৃষ্টির তোড় বেড়েই চলেছে। কিছুই গ্রাহ্য করে না দুজনের কেউ। অদ্ভুত সব কী কী ঘটে যায়। প্রকৃতির পাগলাটে চরিত্র কী আজ হঠাৎ মনস্বিতা আর টুলটুলের মাঝে প্রবলভাবে সঞ্চারিত হয়ে পড়লো! মনস্বিতার মন আর শরীরেরও সবগুলো আগল খুলতে থাকে এক এক করে। টুলটুল প্রাণভরে গলা ছেড়ে গান ধরে;
-যা না চাইবার তাই আজ চাই গো/ যা না পাইবার তাই কোথা পাই গো/ পাব না পাবো না মরি অসম্ভবের পায়ে মাথা কুটে/ পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে পাগল আমার মন নেচে ওঠে।
খুব সুন্দর সুরেলা কণ্ঠ টুলটুলের, মনোমুগ্ধকর। টুলটুল কী গান করে বরাবর? এত মিষ্টি গলা। আর তারই কণ্ঠে ঠাকুরের গান! সে কি জানতো আনন্দ আর বিষাদযাপনে মনস্বিতার আশ্রয় ঠাকুরের গানে? তার কবিতায়?
গান গাইতে গাইতে ছাদের কিনারে বৃষ্টিতে আলুথালু পড়ে থাকা শিউলি কুড়ায়। দু’হাতের অঞ্জলিতে নিয়ে মনস্বিতার দিকে এগিয়ে ধরে। মনস্বিতা পেতে দিলে করতল উপচে পরে শিউলির ঘ্রাণ আনন্দ আর উদযাপনের মুখরতা। কি আশ্চর্য এই কিছু আগেই তালাকনামাটা পড়ে মনস্বিতার মনটা যে গভীর বিষাদে ভরে গিয়েছিল তা কেমন যেন হারাতে শুরু করে। বৃষ্টিতে ভিজে মনস্বিতাকে একটা শালিক পাখির মতো দেখাচ্ছে। টুলটুল নিবিষ্ট চোখে তাকিয়ে দেখছে মনস্বিতাকে। গায়ের কাপড় ভিজে হালকা আভাসে দেখা যায় বুকের ভাঁজ। ছেড়ে দেয়া চুলগুলো ভিজে আলুথালু গড়িয়ে পড়ে আছে পিঠের ওপর। বড় বড় টানা চোখের পাপড়ি বেয়ে গড়িয়ে বৃষ্টির জল পড়ছে দুই ঠোঁটের মাঝে গভীর খাঁজের ওপর পাতলা ছিপছিপে ঠোঁটের ওপর। টুলটুলকে আজ কী এক গভীর প্রাণ ভীষণ টানতে থাকে। খুব ইচ্ছে করে আজ ওই ঠোঁট চুইয়ে গড়িয়ে পড়া বৃষ্টির জলে পান করে অমৃত। মনস্বিতা ফুলেল অঞ্চলিতে নাক মুখ ডুবিয়ে ঘ্রাণ নিতে নিতে চোখ তুলে দেখতে পায় টুলটুলের রূপমুগ্ধ চোখ। চোখের ভাষায় কামনার রং। রঙের ভেতর দূরন্ত আকর্ষণ সাতরঙে খেলা করে এই মহূর্তে। এই প্রথম মনস্বিতার ঠিক এমনটা অনুভূত হয়। কোথায় যেন এক অজানিত সুন্দর বৃষ্টিদিনের সাক্ষী হয়ে আযাচিত আক্রান্ত করে মনস্বিতাকেও। টুলটুলের একমাথা আধো কোকড়ানো চুল বৃষ্টিতে ভিজে চুপচুপে হয়ে পড়ে আছে কপালেরও ওপর। ফর্সা মুখের ওপর বৃষ্টির জলকণাগুলো হঠাৎ বিজলির ঝলকের আলো পড়ে হীরের মতো জ্বলে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে আর টুপটাপ গড়িয়ে পড়ছে গায়ের জামাটা ভিজিয়ে বুকের গভীরে। জলের কিছু ফোঁটা লেগে আছে গোঁফে, কিছু লেগে আছে ঠোঁটের কোণে। মনস্বিতা চোখ ফেরাতে পারে না। কী এক মাধুকরী রাগ বেজে চলেছে আজ কোথায় কোন্ অলক্ষ্যে কে বলতে পারে! আজ অত্যাশ্চর্য সুন্দর ছবির মতো সব। এমন সুন্দর আগে কখনো কী এসেছে তার জীবনে? সে কি আজ এই বৃষ্টিমুখর প্রকৃতির কারণে? নাকি দীর্ঘদিন কোনো স্পর্শবিহীন নারী নামক একটি শরীরযন্ত্রের পুরুষ নামক আর একটি শরীরযন্ত্রের প্রতি স্নায়বিক টানাটানি! এসব ভাবতে ভাবতেই আচমকা টুলটুল মনস্বিতার ঠোঁটের ওপর তর্জনী ছুঁইয়ে আঙুলের ওপর একফোটা জল ধরে;
-কী ভাবছেন?
মনস্বিতা লজ্জা পায়। তার মনের কথাগুলো কী টুলটুল বুঝে গেল এই ভাবনা মনস্বিতার গালে লালচে আভায় বিকশিত হয়ে ওঠে। মনস্বিতা নিজেকে আজ চিনতে পারছে না কেন? টুলটুলকে কিছু বলতেও পারছে না? সরেও যেতে পারছে না? বরং টুলটুলের ক্ষণিক স্পর্শে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলছে আজ তার শরীরে? বাতাসটা বাড়তে থাকে। শরীরে কাঁপন ধরাচ্ছে এইক্ষণে। শীত শীত লাগে। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। মনস্বিতা কাঁপতে থাকে। আকাশের দিকে তাকায়। বৃষ্টি ধরে আসার কোনো নাম নেই এখনো;
-ঘরে চলুন। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। আমার জ্বর এসে যেতে পারে।
-আপনি ঘরে যান। আমি আর কিছুক্ষণ থাকি?
-ঠান্ডা লাগবে। চলে আসুন, প্লিজ।
-লাগবে না।
টুলটুল রয়ে যায় ছাদে আরো কিছুক্ষণ। একা বৃষ্টি দিনের অলসতায় এক্ষুণি এই ভিজে মাতাল অলস বিবশ মন আর শরীরে ঘরে ভেতর গেলে কোন প্রলয়ের ঘণ্টা বেজে উঠতে পারে কে বলতে পারে। ছাদের রেলিঙে ঝুকে পড়ে নিচের ঘাসের মাঠে জমে থাকা জলের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে মনকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। হঠাৎ চোখ আটকে যায় নিচের রাস্তায় তাকিয়ে। কে? কে আসছে এদিকে? হ্যাঁ, এই বিল্ডিংয়ের দিকেই তো! ততক্ষণে মনস্বিতা আলমারী খুলে বড় একটা তোয়ালে বের করে টুলটুলের জন্য। তারপর বাথরূমে ঢুকে শাওয়ার নিয়ে একেবারে গায়ের জামাটা চেঞ্জ করে বাইরে এসে অবাক চোখে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে যায়;
-কে? কে ওখানে? কে?
বলতে বলতে চোখ রাখে। আরে এতো শৈল? সর্বনাশ। এ ছেলে তাহলে তাকে ফলো করে এ-বাড়ি চিনে গেছিল। আজ এ্সময়ে? একেবারে সিঁড়ির দরজা দিয়ে ছাদে? টুলটুল কি জানতো ও আসবে? জানার কথা নয়। কী কথা বলছে ওরা দুজনে। তার কি এগিয়ে যাওয়া উচিৎ হবে দুজনের মাঝে?
-অবশ্যই মনস্বিতা। এটা তোমার বাড়ি। তোমার জানতে হবে শৈলরাজ এখানে কেন।
মন থেকে সায় পেয়ে মনস্বিতা আগায়। কি যেন বাকবিতণ্ডা চলছে দুজনের মধ্যে, খানিক দূর থেকে এটুকু বুঝতে বাকি নেই। মনস্বিতা আগাতে আগাতে দুজনের উচ্চৈস্বরের কথাবার্তা শুনতে পায়। গতি স্ত্রস্ত তার। কাছে পৌঁছে যায় আর তখনই রাগারাগির একপর্যায়ে দেখতে পায় শৈলরাজ একটা ছুরি বের করে তড়িৎ গতিতে বসিয়ে দিতে যায় টুলটুলের গায়ে। মনস্বিতা রূদ্ধশ্বাস দৌড়ে সেখানে পৌঁছেই ছুরিটা ডানহাতে মুঠো করে ধরে আকাশের দিকে উঁচু করে সরিয়ে নেয় শৈলর হাত।
-কি প্রচণ্ড শক্তিরে বাবা এই নারীর হাতে!
শৈল বেশ খানিকটা হোঁচট খায় মনে মনে। মনস্বিতা ক্রোধে চিৎকার করে ওঠে;
-তুমি এখানেও এসে পড়েছ?
ছুরিটা তখনো শৈলর হাতে ধরা। সে ক্রোধে অন্ধ প্রায়। তার চোখ মুখ জ্বলছে;
-ওহ। আমি তো আপনাকেই খুঁজতে এসেছিলাম। এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?
-কি চাই আমার কাছে?
-দলিলটা আমাকে দিয়ে দিন।
-হাউ ডেয়ার ইউ…
-দলিলটা দিতে হবে।
-কে বলেছে ওটা আমার কাছে আছে?
-আমি জানি।
টুলটুল চেঁচিয়ে ওঠে;
-শৈল ছুরিটা ছেড়ে দে। মনস্বিতা আপনি কেন এখানে এলেন? ছেড়ে দিন ছুরিটা। হাতটা কেটে যাবে।
টুলটুলের কথা শেষ হতে পারে না মনস্বিতার ধরে থাকা মুঠির ভেতর থেকে হ্যাচকা টানে ছুরিটা বের করে নেয় শৈলরাজ। মুহূর্তেই মনস্বিতার করতল কেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। মনস্বিতার করতলের কয়েক পরত কেটে গিয়ে কোনোমতে হাতের অবশিষ্টাংশ লেগে থাকে। টুলটুল কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে চেয়ে তাকে একটু আগেই তার হাতের ভেতর ধরে থাকা সেই মৃণার লতার মতো হাতের দিকে। বৃষ্টির জলের সাথে মিশে লাল রক্তের ধারায় ভেসে যেতে থাকে ছাদটা। টুলটুল বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে মনস্বিতার হাতের দিকে। দুহাতে চেপে ধরে ওর করতল। কি করবে বুঝতে পারে না ঠিক। শৈলর খুব ঠান্ডা মাথা। পকেট থেকে একটা টিস্যুপেপার বের করে রক্ত মোছে নির্বিকার। তারপর বলে;
-দলিলটা আমার চাই
টুলটুল চিৎকার করে ওঠে;
-শৈল।
শৈলরাজ চক্রবর্তী কোনোদিকে না তাকিয়ে কোনো কথায় কান না দিয়ে যেতে উদ্যত। টুলটুল কী করবে বুঝে উঠতে পারে না। কাউকে ডাকাটাও ঠিক হবে না। মনস্বিতা নির্বাক। ঘটনার দ্রুততায় খানিক হতভম্ব। টুলটুল হঠাৎ মনস্বিতার ওড়নাটার একপ্রান্ত টেনে নিয়ে জোর শক্তিতে হাতটা পেঁচিয়ে শক্ত করে বাঁধে। লাভ হয় না। ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্তপ্রবাহ ব্যহত হয়, কিন্তু মুহূর্তেই রক্তে ভেসে যেতে থাকে এতটা পুরু করে বাঁধা কাপড়।
(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বের (৭৪) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-64/

পরবর্তী পর্বের (৭৬) আসছে