শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৭৬]

0
290

পর্ব ৭৬

হাতের বেশ অনেকগুলো ভেইন কেটে গেছে। সূক্ষ্ণ নার্ভও কেটেছে প্রচুর। সেগুলোতে সেলাই লাগে। চামড়ার উপরিভাগে চারটি স্টিচ পড়েছে। নিচে আরও। মারাত্মক জখমে কিছুক্ষণ আগের হাতটা ক্ষতে ক্ষতে বীভৎস দেখাচ্ছে। মনস্বিতাকে সেই ঝড়ঝঞ্ছা-বিক্ষুব্ধ-বিকেলে বাড়িতে ফিরতে দেয় না টুলটুল। নিজের বাড়িতে একপ্রকার জোর করেই নিয়ে চলে। তমালকৃষ্ণরাজ চক্রবর্তীকে আসল ঘটনা বলা যাবে না এই শর্তে মনস্বিতা যেতে রাজি হয়, তাকে সব জানতে দিলে তার চিন্তা বেড়ে শারীরিক সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করতে পারে এই সন্দেহ মনস্বিতার। বিশেষত দলিলটার বিষয় ফায়সালা করার পর তার কাছেই আবার সেটা ফেরত দিতে পারলে মনস্বিতার দায়িত্ব শেষ হবে আর তাতেই শান্তি। তমালকৃষ্ণ যখন টুলটুলের বানানো গল্প শুনে মনস্বিতার হাতের ব্যান্ডেজ দেখে তটস্থ হয়ে ওঠেন, মাধবী তখন খুব রেগে যান টুলটুলের ওপর;
-টুলটুল এদিকে আসো তো একটু, ভেতরে আসো।
বলে ভেতর ঘরে ডাকেন। টুলটুল একবার মনস্বিতার দিকে তাকায়। ওর চোখ দেখে বুঝতে বাকি নেই মনস্বিতা ততক্ষণে মাধবীকে পড়ে ফেলেছে। তমালকৃষ্ণ অভয় দেন;
-কি ঘটেছিল বলতো? হাতটা এভাবে কাটলে?
নির্বাক চোখে মনস্বিতা তাকায় তমালকৃষ্ণের দিকে। কী যেন কী মায়া বাঁধা থাকে বরাবর তমালকৃষ্ণের শব্দবাক্যে। মনস্বিতা আজ আর নিজেকে স্থির রাখতে পারে না। তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। অশ্রু তার নিজের জন্য নয়। যে-মানুষটা তার বিপদন্মোমুখ সময়ে দেবতার মতো এসে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই মানুষটাকে খানিক স্বস্তি দেবার জন্য মনস্বিতা কি না করতে পারে! আজও তার স্বজনহীনতায় শুশ্রূষার হাত বাড়িয়ে পরম স্বজন হয়ে রয়েছেন যিনি তার জন্য হাতের এতটুকু আঘাত তো সামান্য। টুলটুল মনস্বিতার চোখে তাকাতে পারে না। কেমন যেন অপরাধী লাগে নিজেকে। মাধবী একবার মনস্বিতার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলের দিকে তাকান। তারপর টুলটুলকে ভেতর ঘরে ডাকেন। মাধবী আর টুলটুলের বাকবিতণ্ডা চলতে থাকে;
-টুলটুল তুমি একে বাসায় কেন নিয়ে এসেছ?
-মা। মেয়েটির এই অবস্থা। হাতটা প্রায় দু টুকরো। এই অবস্থায় একা ছেড়ে দেয়া কি ঠিক হতো?
মাধবীর চোখে ক্রোধের আগুন ঝলকে ওঠে, যেদিকে টুলটুল তাকাতে পারে না;
-তাতে তোমার কী? তুমি ওকে কোথায় পেলে?
টুলটুল কথা বলে না। মাকে কী করে বলবে যে সে মনস্বিতার বাড়ি গেছিল। কেনই বা গেছিল। সে নিজেও জানে না। শুধু জানে গিয়ে ভালোলেগেছিল। ভাগ্যিস হসপিটাল হয়ে অপারেশন শেষ হতে হতে গায়ের কাপড় গায়েই শুকিয়ে গেছে। ইতস্তত করে বলে;
-ওই, মানে, এই আর কি, আমার গাড়ির সামনেই এক্সিডেন্টটা ঘটেছিল রাস্তায়।
চিৎকার করে ওঠেন মাধবী;
-কি আশ্চরয কথা, এই মেয়েটির সব দুর্ঘটনাই কী তোমাদের বাপ-বেটার চোখের ওপর আর গাড়ির সামনেই ঘটে আর ঘটতে থাকবে?
টুলটুল কথা বলে না। মুখ নিচু করে পায়ের বুড়ো আঙুলে ফ্লোর খুঁটতে থাকে।
-শোনো, একবার একটা ভুল সিদ্ধান্তে তুমি দীপাকে বিয়ে করে এনে ঘরে তুলেছিলে। এতে যদি তোমার শিক্ষা না হয় তবে তোমাকে আবার স্মরণ করিয়ে দেয়া ভালো।
টুলটুল নীরবে মায়ের কথা শুনে যায়;
-তুমি উচ্চবর্গীয় হিন্দু। মেয়েটি মুসলিম। সনাতন ধর্মে অন্য ধর্মের প্রবেশ নিষেধ। আমি আশা করি তুমি ধর্মাধর্মে নির্দেশিত পাপাচার থেকে মুক্ত থাকবে।
টুলটুল বুঝতে পারে না মাধবী কী করে মনস্বিতার প্রতি তার গোপন আকর্ষণকে নোটিস করলেন;
-মা!
-তোমার কিছু বলার থাকলে বলতে পারো।
-মা। মেয়েটির কাছে এই বাড়ির দলিল।
-তুমি নিশ্চিত?
-একপ্রকার।
-আচ্ছা।
মাথাটা নিচু করে কিছু একটা ভাবেন মাধবী।
-শৈল, ওকে ফলো করে ওর বাড়ির ঠিকানা জেনে নিয়েছে।
মাধবী শঙ্কিত হন;
-কি?
-হ্যাঁ।
-এই অবস্থায় ওকে ওর বাড়িতে যেতে দেয়াটা কি ঠিক হবে আজ?
মাধবী দ্বিধায় পড়ে যান। মেয়েটির কথা ভেবে খানিক মায়াও লাগে। কিন্তু কেন যেন তিনি ধর্মের শুচিশুদ্ধতা আর জাতবর্ণের প্রশ্নে মেয়েটিকে মেনে নিতে পারেন না। কিন্তু নিজের ভেতরের এই অনুভবকে তিনি বাইরের কাঠিন্যে ঢেকে রাখবেন বলেই পণ করেন। মনস্বিতার আজকের অবস্থান বিষয়ে টুলটুলকে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত দেন না।
-কিন্তু যেদিনই সে বাড়ি ফিরুক শৈল তো তাকে বিরক্ত করতেই থাকবে? কদিন তুমি তাকে আগলে রাখবে?
খুব স্থির বুদ্ধির দরকার এই সময়ে। টুলটুলকে দায়িত্বটি ঠিক এখনই দেয়া দরকার। আর দ্বিধাবোধ করেন না। তার স্বর প্রক্ষেপণ কঠিন প্রগাঢ় আর নির্দেশবাচক;
-দলিল উদ্ধার করো।
-দেখছি।
-আর শোনো, তোমার বাবা না জানেন।
টুলটুল খানিক নিশ্চিন্ত হয়, খানিক দোদুল্যমান। দায়িত্বটা নিজেই অনুভব করে। তমালকৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে তাদের মা আর ছেলের অস্তিত্বের সংকট তাকে বরবারই অস্থির করে। বিভ্রান্ত করে তোলে। জানে না, সে বা তার মা থাকতে কেন তমালকৃষ্ণ মনস্বিতার কাছে দলিলটি রেখে দিয়েছেন, যদিও সে দলিলটির নিরাপত্তার কথা খানিকটা আন্তাজ করতে পারে। কিন্তু হঠাৎ যদি বাবার কিছু ঘটে যায় তখন এর বিহিত কি হবে ভেবে উচাটন হয় তার মন। কিন্তু মনস্বিতার মতো একজন স্থিতধী নারীর কাছ থেকে এটি উদ্ধার করে নিজের হাতে নেয়া কঠিন কাজ, তাছাড়া এখন এটি নেয়া ঠিকও হবে না। কিন্তু মনস্বিতার কাছেই বা দলিলটি কতটা নিরাপদ আজকের ঘটনার পর সেটা ভেবে দেখা দরকার। যদিও সে জানে মনস্বিতা তমালকৃষ্ণের দেয়া দায়িত্ব আর বিশ্বাসকে নিজের জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবে। এইসব নানা ভাবনার মাঝে সন্ধ্যা লাগে পৃথিবীর কোণে কোণে। আকাশ এখনো অন্ধকার যদিও বৃষ্টি ধরে এসেছে। পূজার ঘরে শাঁখ বাজান মাধবী। মনস্বিতা শাঁখের শব্দে উতলা হয়ে ওঠে। ধূপধূনোর গন্ধে মন মাতাল হলেও এ-বাড়িতে পূ্জা আহ্নিকের সময়টাতে অবস্থান করলে মনস্বিতার নিজেকে অস্পৃশ্য লাগে। সেবার সন্ধিপুজার সন্ধের কথা মনে পড়ে যায়। মাধবী মানুষটি এমন কেন? পৃথিবীর কোন ধর্মে অন্য ধর্মাবলম্বীকে এমন ঘৃণা করার কথা লেখা আছে? মনে পড়ে, মনস্বিতা তখন কৈশোর পেরিযে যৌবনে পা পা করছে। এক হিন্দু পরিবারের বাবা ছয় ছেলের মাঝে সমান ভাগ করেছেন তার বাড়িটি। বাবা মারা যাবার পর এক ছেলে স্ত্রীপুত্র রেখেও ভিন্ন জাতের অন্য আর এক নারীকে বিয়ে করে নিজের জমিটি বিক্রি করে অন্য জায়গায় বাড়ি কিনে চলে গেলেন। সেই বাড়িটি মনস্বিতার বাবা কিনলেন। মা কিছুদিন খুব ঘ্যান ঘ্যান করলেন;
-ওরা সকলেই আত্মীয়। মাঝখানে আমরা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী অনাত্মীয়। ওরা আমাদের কীভাবে নেবে কে জানে।
বাবা বলেছিলেন;
-হিন্দু-মুসলিম সকলেই মানুষ। অত চিন্তা করো না তো।
দুই পাশে হিন্দু পরিবার। মাঝখানে মনস্বিতাদের বাড়ি। সন্ধ্যাবেলা দূর মিনার থেকে ভেসে আসে যখন মুয়াজ্জিনের আজান, দুপাশের বাড়িগুলো থেকে তখনই ভেসে আসে শঙ্খসুর। ধূপের গন্ধে মনস্বিতাদের বাড়িটাও ভরে ওঠে প্রাণে প্রাণে। অসাধারণ সেইসব কোনো কোনো সন্ধ্যায় পাশের বাড়ির কোনো ভাইয়ের বউ এসে বসতেন মনস্বিতাদের বাড়িতে। মনস্বিতা তাকে মাসি বলে ডাকতো। মা তখন উন্মুখ হয়ে বই পড়ছেন। মাসি মনস্বিতার চুলে বিলি কেটে নারকেল তেল লাগিয়ে দিতেন। মাকে ডেকে বলতেন;
-দিদি, দেখেন দেখেন, আপনার মেয়ের মাথায় যে এত তেল দিলাম বোঝাই যায় না।
তারপর মাথার মাঝখানে নিজের করতলটা চেপে ধরে বলতেন;
-মাগো মা কী গরম, কী গরম। মেয়ের মাথা এত গরম ক্যান দিদি? মাথায় প্রতিদিন তেল দিবা, বুঝলা। মাথা ঠান্ডা রাখা দরকার।
তারপর চিরুনিটা নিয়ে ঘন চুলে আঁচড় কাটতেন। কত যে আদর প্রতি আঁচড়ে। পরম মমতা প্রতি স্পর্শে। কেন যে আজ বার বার এত জল আসে চোখে! এতকালের পুরোনো কথা কেনই-বা এই সন্ধ্যায় মন ছেয়ে আসে, ধুর। রোজার শেষে ইফতারের আয়োজনে হিব্দু বাড়ির পাঁচ বছর বয়েসের বাচ্চা ছেলেটার জন্যও আজ মন কেমন করে ওঠে। একটা ইফতারের প্লেট সাজানো হতো তার জন্য আলাদা। একসাথে বসে ওরা ইফতার করতো। কই কখনো তো দেখেনি ওই পাশের বাড়ির মাসিরা তাদের ঘৃণা করেছেন। অস্পৃশ্য কিংবা অশুচি ভেবেছেন? কিংবা ওই ছেলেটিকে মনস্বিতার মা কিংবা বাবা ভাইবোনেরা কখনো ঘৃণা করেছে কিংবা একসাথে বসে খেতে কুণ্ঠা প্রকাশ করেছে! কিন্তু তমালকৃষ্ণের মতো একজন উদারপন্থী মানুষের জীবনসাথী হয়ে মাধবীর এই রূপ কী যে অসহ্য ঠেকে, মনস্বিতার কাকে বলবে? টুলটুলও অদ্ভুত ধরনের একজন মানুষ। স্বশিক্ষিত একজন মানুষ এতটা মৌলবাদ পোষে মনে, মনস্বিতা টুলটুলের অনেক আচরণের সাথে মেলাতে পারে না। মনস্বিতাকে কোনো অবস্থায় তমালকৃষ্ণ নিজের বাড়িতে ফিরতে দেন না সেই রাতে। রাতে শরীরে ঝিমঝিম কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসে। রাত গভীর হলে তমালকৃষ্ণ একটা চেয়ার টেনে বসেন মনস্বিতার কাছে। সারাবাড়ির আলো অন্ধকার করে মনস্বিতার শিওরে একটি নিস্পন্দ প্রদীপ জ্বলে। জ্বরের ঘোরে মনস্বিতা কখনো মৃত কন্যাকে ডেকে ওঠে। কখনো মৃত মায়ের সাথে কি সব কথা বলে তমালকৃষ্ণ সব বুঝতে পারেন না। টুলটুল বারান্দায় পায়চারী করে। বারান্দা থেকে মনস্বিতার ঘরটা জানালা দিয়ে দেখা যায়। ওরও ঘুম আসে না। আকাশে ঘনকালো মেঘের ত্রস্ত আনাগোনা চলে। মনস্বিতার জীবন সংশয় হবে না তো? তাহলে দলিলের কি হবে? আইনগত ভাগ-বণ্টন হবার আগেই যদি দলিলটা হাতছাড়া হয়ে যায়, শৈল আর কাকা ওদেরকে বাড়িছাড়া করবে। হয়তো মা-বাবাসহ তাকে এই বাড়িতে ঢুকেই হত্যা করবে। আচ্ছা আজকের ঘটনায় মনস্বিতাকে দিয়ে একটা জিডি করিয়ে রাখা দরকার না? কাজটা কি ঠিক হবে? শৈলর জিঘাংসা মারাত্মক। আইন-আদালত-পুলিশ-কোর্ট-কাচারি ওদের বাপ-বেটাতে রপ্ত করে রাখা। জেনে গেলে আরও হিংস্র হয়ে উঠতে পারে ওরা। কী বীভৎস! দমবন্ধ করা এই পরিবেশে বসবাসের জীবন গুমোট। টুলটুল আর পেরে ওঠে না। ভাগ-বণ্টন হয়ে গেলে নিজের ভাগটা বিকি করে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাবে। একটা জমি কিনে ঘর তুলে নেবে। বিজলি চমকায়। ভাবনায় ছেদ পড়ে। মনস্বিতার ঘরে যেতে ইচ্ছে করে টুলটুলের। তমালকৃষ্ণ এক সেকেন্ডও ঘুমোন নি। বাবার উপস্থিতিতে ও-ঘরে ঢোকাটা কেমন দেখাবে, এসব ভাবে। একটা চেয়ার টেনে বারান্দায় বসে থাকে। তার চোখে ঘুম আসে না। দীপা চলে যাবার পর থেকে তার ঘুম এমনিতেই কমে গেছে। বিছানায় গা এলিয়ে দিলেই দীপা এসে ওর পাশে শুয়ে পড়ে। ওকে আদর করে। চুলে বিলি কেটে দেয়। ঠোঁটৈ চুমু খায়। বুকে মাথা রাখে। দীপার ঠোঁটের পরশে টুলটুল জীবন ফিরে পায়। যখন আবেশে বিভোর হতে হতে টুলটুলের দুচোখে ঘুম নেমে আসে, তখন দীপা টুলটুলের ঘন কোকড়ানো চুলের মুঠি ধরে দুটো থাপ্পড় দিয়ে ভোর হতে থাকা রাতের অন্ধকারে দরজা খুলে বেরিয়ে কোথায় যায়, টুলটুল জানে না। এভাবে প্রতিটি রাত বিমর্ষ হতে হতে শুকিয়ে পাণ্ডুর। দুচোখে ঘুম আসে না আর। সেই সব রাতে টুলটুল বারান্দায় চেয়ারটা টেনে এমনি বসে একটা সিগারেট ধরায়। হান্সুহেনার ঘ্রাণ ভেসে এলে অসহ্য ঠেকে তখন। মাথার ভেতর উঁইপোকার মতো কিছু একটা যেন স্নায়ুগুলো কেটে-কেটে আলসে ঘুমিয়ে থাকে। সারাদিনের পর রাত হলে আবার জেগে ওঠে। মনস্বিতার জ্বরটা কমেছে কি? একবার উঁকি দেবে ও-ঘরে? বাবা কিছু ভাববেন? ভাবতে ভাবতে পা বাড়ায়। মনস্বিতার অস্থিরতা কমেছে। জ্বরটা কমে গেছে বোধ করি। মনস্বিতা কি বোধের ভেতর আছে? আবছায়া অন্ধকারে বোঝা যায় না কিছুই। অনেক্ষণ হলো প্রলাপ বকা বন্ধ। ঘরে ঢুকতে গেছে যখন, মনস্বিতা তমালকৃষ্ণের দুটো হাত টেনে নিয়ে কথা বলে ওঠে;
-আপনি কি কোনো আইনজ্ঞের সাথে কথা বলেছেন?
তমালকৃষ্ণ কেঁপে ওঠেন মনস্বিতার এমন শারীরিক অবস্থায় একথা শুনে। হ্রাস টানতে চান প্রসঙ্গটির;
-সেকথা পরে হবে। সুস্থ হয়ে ওঠো তুমি মা।
-না না। আপনি বলুন। কি অবস্থায় আছে আপনার কাজগুলো আমাকে জানতে দিন।
মনস্বিতা মরিয়া। তমালকৃষ্ণ নিরুপায়;
-আমার এক বন্ধু আছেন ল-ইয়ার। তাকে জানিয়েছিলাম। সেই সব করবে। আমাকে বলেছে ওর চেম্বারে যেতে।
-গিয়েছিলেন?
-হুম।
-কি বললেন তিনি?
আজ এসব কথা আর না বাড়ালে চলে না মা?
-হুম।
মনস্বিতা আশ্বস্ত হয়। তাহলে তমালকৃষ্ণ বসে নেই। আবার প্রশ্ন করে;
-দলিলটা তো তিনি দেখতে চাইবেন?
-হুম।
-আপনি সপ্তাহখানেক আগে জানাবেন কবে দলিল নিয়ে যাবেন তার কাছে।
-জানাবো।
টুলটুল আর এ-ঘরে ঢুকবার প্রয়োজন বোধ করে না। ছুটে যায় মাধবীর ঘরে। মাধবী আজ রাতে ঘুমোননি। মাথার কাছে ল্যাম্পটা জ্বেলে হয়তো শ্রীমদ্ভগোবত গীতা পড়ছেন। টুলটুল ডাকে;
-মা।
মনস্বিতার শক্তি আজকের মতো নিঃশেষ। জ্বর সেরে গা-টা এলিয়ে পড়ে তার। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে;
-দলিলটা আপনাকে ফিরিয়ে দিলে আমার ছুটি হবে।
তমালকৃষ্ণের বুকের ভেতর ছুটি শব্দটা তুমুল এক শূন্যতা নিয়ে আঘাত করে। ততক্ষণে মনস্বিতা ঘুমিয়ে পড়েছে। তমালকৃষ্ণের মনে অজস্র প্রশ্নের ভীড়। ভোর হয়। নিচের বাগানের গাছে গাছে পাখি ডাকে। মাধবী চঞ্চল। নাস্তা বানাতে ব্যস্ত। টুলটুল খুশি খুশি চেহারায় আয়নার সামনে দাঁড়ায়। চুল আঁচড়ায় মন দিয়ে। তমালকৃষ্ণ মনস্বিতার মাথার কাছ থেকে একচুল সরেন না। মনস্বিতার ঘুম ভাঙে না। বেলা বাড়ে। মেঘের আড়াল ভেঙে সূর্য ওঠে। তবু তমালকৃষ্ণের মনে প্রগাঢ় এক অন্ধকার সূর্যর আলোর রং তাড়িয়ে হা-করা এক বিকট শূন্যের মতো গ্রাস করে চলেছে দশদিক।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বের (৭৫) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-65/

পরবর্তী পর্বের লিংক (৭৬)

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-66/