শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৭৭]

0
307

পর্ব ৭৭

বেলা বাড়ে। রাস্তানিকানো জল আর গাছের পাতার ধুলো ধুয়ে-মুছে ঝকঝকে নতুন, এই দুই ছাড়া বোঝার উপায় নেই গত সারাটি দিন আর রাতের আকাশ মেঘে মেঘে অবলুপ্ত ছিল। সূর্য আজ তেজোরাজ। মাধবী টেবিলে নাস্তা সাজান। গতরাত থেকে এ-পর্যন্ত একবারের জন্যও মনস্বিতার ঘরে যান নি। টুলটুল কিংবা তমালকৃষ্ণ কেউ তাকে মনস্বিতাকে দেখতে যেতে বলেনওনি। একটা অচেনা রাগ ক্ষণে ক্ষণে উথলে উঠছে তার মেয়েটির ওপরসহ সকলের ওপর। তবু পরিস্থিতিতে তিনি সর্বংসহা? টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে মনস্বিতার ঘরে গিয়ে দেখেন অঘোরে ঘুমোচ্ছে মেয়েটি। ডাকতে গিয়েও ডাকেন না। স্বজনহারা মেয়েটির আহত হাতটি ছেড়ে ক্রমে মুখের দিকে প্রসারিত হতে থাকে তার দৃষ্টি। এতদিন যেমন দেখেছেন তার সাথে আজ বড় অমিল। ঝড়ঝঞ্ছার ছোবল সহসা মেয়েটির চেহারায় বোঝা দুষ্কর। বরাবর ঝলমলে সরল সাধারণ তার সুন্দরতা। অথচ আজ খুব মলিন। কোনো কুটিলতার ছায়া কী পড়েছে ওই মুখে! তমালকৃষ্ণের ধারণা এ তার প্রথম সন্তানটির দ্বিজ। অদ্ভুত সব। তমালকৃষ্ণের মতো একজন পূর্ণাঙ্গ নাস্তিক যিনি কস্মিনকালেও পূজাআর্চা দেবাদিদেবে বিশ্বাসী নন তিনি বিশ্বাস করেন এই তার কন্যা সন্তান! একবার এসে দেখা গিয়ে চলে গেছিল। আবার ফিরে এসেছে ভাগ্যের নানা উত্থান পতনের মাধ্যমে তারই কোলে! মেলে না মাধবীর কোনো হিসেব। একমনে তিনি তাকিয়ে থাকেন মনস্বিতার ঘুমন্ত মুখের দিকে। বেশ চাপা গায়ের রং মেয়েটির। যুগল টানা কালো দুটি ভ্রূ। দুটি পাতা এক করে বোঁজা চোখটি এই মুহূর্তে একটি দীর্ঘ রেখায় বিস্তৃত হয়ে ভ্রূর কোণায় গিয়ে মিশেছে। অনুচ্চ নাক। বিশদ বিস্তৃত নয় কপাল বরং খানিকটা অপ্রশস্ত কিন্তু তাতেই যেন আরও সুন্দর। ঘনকালো দীর্ঘ চুল একপাশে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। হঠাৎ করে চোখে পড়বার মতো সুন্দরী নয় মেয়েটি তবু অব্যাখ্যমান লুকোনো মাধুরী। খণ্ড সৌন্দর্যর ব্যাখ্যায় কোনো মার্গে পড়ে না এ মানবী। কিন্তু অখণ্ডে অপরূপ। ফুলদানিতে সাজানো বাসি ফুলের মতো এলিয়ে পড়ে রয়েছে আজ, অথচ তীরের মতো শানিত লতানো শরীর। যে কোনো পুরুষকে আকর্ষণ করার মতো তীব্র সম্বোহন মেয়েটির শরীরে আর মুখের লাবণ্যে। বুক কেঁপে ওঠে মাধবীর – মেয়েটি দলিল ফেরত দেবে তো? নাকি ভাসিয়ে নেবে সব! কোনো পাপাচার ঘটতে চলেছে কী এই সংসারে! রাশ টানবেন! টুলটুলকে ওর কাছাকাছি পাশাপাশি চলতে দেওয়া কী ঠিক? তাকে কীভাবে আটকে রাখবেন ঘরে! কী করে রাখবেন চোখে চোখে! এসব ভাবতে ভাবতে ফিরে যান মাধবী। সকলকে নাস্তার টেবিলে ডাকেন। খেতে বসে তমালকৃষ্ণ অস্থির। খাওয়াতে মন লাগে না। মাধবী মৌন। স্থির লক্ষ্যে নিবন্ধ করেন তার দৃষ্টি। খেয়াল করেন টুলটুল নিঃশব্দ। মাধবী নীরব, মাথা নিচু করে খেয়ে চলেছেন। শেষ নলাটা মুখে দিয়ে কেটলি থেকে চা ঢালেন। তমালকৃষ্ণ চায়ের কাপটা নিয়ে উঠে পড়েন। টুলটুল একবার মায়ের দিকে তাকায়। উঠবে কী উঠবে না, ভাবে। পরক্ষণেই বাবার পেছন পেছন ছোটে। মাধবী একা টেবিলে বসে তাকিয়ে গুণতে থাকেন পিতাপুত্রের প্রস্থানের অধীরতা।
ঘরে ঢুকেই তমালকৃষ্ণ দেখেন মনস্বিতা চোখ মেলেছে। ঘনঘোর বরষায় হঠাৎ সৌরালোকে উজ্ব্বল কোনো দিনের শুরুর মতো মনটা তার উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মনস্বিতার কপালে একবার হাতটা রেখে দেখেন জ্বর আসেনি। তড়িৎ উঠে পড়েন;
-আমি তোমার নাস্তাটা এ ঘরে নিয়ে আসছি।
তমালকৃষ্ণের মুখ জুড়ে এক অস্থির আনন্দ ছড়িয়ে পড়ছে।
-না না। আমি যাচ্ছি। আপনি অস্থির হবেন না।
কে শোনে মনস্বিতার কথা। আজ আনন্দে ত্রস্ত তমালকৃষ্ণের চলাচল। তিনি যেতে থাকেন। টুলটুল বহুদিন বাবাকে এমন দেখেনি। বাবার ওপর একটা অবদমিত রাগ তার বরাবর। বা হাতে ভর দিয়ে বিছানায় উঠে বসতে গিয়ে টাল সামলাতে পারে না মনস্বিতা। পরে যেতে যেতে ব্যান্ডেজ লাগানো ডান হাতটাই আগায় কিছু একটা ধরার জন্য। মনস্বিতাকে পড়ে যেতে দেখে তৎক্ষণাৎ টুলটুল এসে হাতটা ধরে;
-আবার তো হাতটার বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছিলেন। কি হয় একটু সাহায্য নিলে?
মনস্বিতা মৃদু হাসে;
-আভ্যেস নেই।
-একা দাঁড়াতে পারবেন? নাকি আমাকে ধরবেন?
মনস্বিতা হাসে।
এই ছবিটা ঘনবরষার মেঘমন্দ্রতা মুছে দেয়। অদ্ভুত আলোকচ্ছটায় ভরিয়ে তোলে ঘরটা। বের হয়ে যান তিনি। টুলটুল মনস্বিতার হাতটা ধরে উঠে বসতে সাহায্য করে। মনস্বিতা উঠে দাঁড়ায়। জানালা দিয়ে সবটা দৃশ্যই দেখতে পান তমালকৃষ্ণ। যেন তার বুক চিরে আজ বহুকালের আবদ্ধ একটা গুমোট বাতাস বের হয়ে যায়। নিভৃতে খুব গোপনে একটা পলকা ভালোলাগা ছড়িয়ে দিয়ে নিমেষে কোথায় হারায়। আকাশে একপলক তাকান তিনি। দিনের আলো প্রখর যদিও আকাশে মেঘের আনাগোনা অবিরাম। এসব দিনের কোনো বিশ্বাস নেই। যে কোনো সময় সূর্যকে ঢেকে দিতে পারে মেঘ। নামতে পারে মুষল ধারা। তবু আজ তিনি বের হবেন;
-মাধবী, আমি বাজারে যাবো।
মাধবী পেছন পেছন আসেন;
-গাড়িতো গ্যারেজে।
-তাতে কি?
দুদিনের মাথায় চলাচল খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে মনস্বিতার। ছ’দিনের দিন স্টিচ কেটে ড্রেসিং দিতে যেতে হবে। তার আগে মনস্বিতার এবাড়ি থেকে যাবার অনুমতি কিছুতেই মেলে না। যদিও মাধবী মৌন। গম্ভীর তার চলাচল। আবডালে তার তীক্ষ্ণ নজর। মনস্বিতা কিংবা টুলটুলের চলাচল তিনি নখের আগায় রাখেন। মাধবীর দৃষ্টির শানিত প্রত্যাদেশ ব্যতীত আর কিছুই এ বাড়িতে বিব্রত করে না মনস্বিতাকে। তমালকৃষ্ণের সঙ্গ-সাহচর্যের মায়ায় মনস্বিতা ক্ষণে ক্ষণে ভুলে যায় মাধবীর তীব্র-বিষাদ মুখ। কিন্তু সে জানে ছায়া হয়ে ওই চোখ তাকে নীরবে অনুসরণ করে চলেছে। তবু টুলটুলের সঙ্গও কী মুহূর্তগুলোতে উপভোগ করছে না মনস্বিতা! নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তরটা জেনে নেয়। বারান্দায় চেয়ারটাতে বসে সংবাদপত্র পড়ছিল মনস্বিতা। হঠাৎ আকাশ অন্ধকার হয়ে আসে। তুমুল বর্ষণে ভিজে যায় বাড়ির উঠোন। নিচে হাস্নুহেনার বাগান জলমগ্ন। বাড়ির সামনে একহাঁটু জলের মাঝে চোখ যায় মনস্বিতার। চুপচুপে ভিজে বাজারভর্তি ব্যাগ নিয়ে জল সরিয়ে কোনোমতে বাড়ির দিকে এগুচ্ছেন তমালকৃষ্ণ;
-হায়। জলে ভিজে মাখামাখি।
মাধবী বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে একই দৃশ্য দেখে টুলটুলকে ডাকতে ডাকতে নিচে নেমে যান। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুকনো কাপড় পরে তোয়ালে দিয়ে মাথাটা মুছতে মুছতে মনস্বিতার কাছে এসে চেয়ারটা টেনে বসেন;
-এই অসময়ে আপনার না বের হলে হতো না?
-আরে, কে জানতো যে বৃষ্টি আসবে?
-তা ঠিক।
-বর্ষাকালের আকাশ বুঝলে স্বামী-স্ত্রীর নিত্য দিনযাপনের মতো। এই রাগ এই ঝগড়া এই অভিমান আবার ভাব, হা হা।
মনস্বিতা তমালকৃষ্ণের রসবোধ দেখে হাসে। হাসতে হাসতে কাশি শুরু হয়ে যায়। তমালকৃষ্ণ বুকের ওপর হাতটা রাখেন। একটা ভারী প্রশ্বাসের কষ্ট টের পাওয়া যায় তার মুখের দিকে তাকালে;
-বুকে ব্যথা?
তমালকৃষ্ণ হাঁ-বোধক মাথা নাড়েন।
-আজই প্রথম?
আবার লম্বা শ্বাস নেন চোখ বন্ধ করে। মুখটা গাঢ় কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে;
-আপনার খারাপ লাগছে? কাউকে ডাকবো?
তমালকৃষ্ণ হাতের ইশারায় নিষেধ করেন। মনস্বিতা বলে;
-বুকে ঠান্ডা লেগে গেছে বোধ করি।
-সে তো কবেই।
-মানে?
-ওদেরকে বলা হয়নি।
-কি বলা হয়নি?
-ইনফেকশন। বড় রকমের।
-হায়। কি বলছেন? এর মধ্যে আপনি বৃষ্টিতে ভিজলেন?
-আরে তাতে কি?
-তুমিতো জানো না নেপাল বর্ডারে কিংবা চীন-তিব্বতের সীমানায় কী প্রচণ্ড বরফের মধ্যে দিয়ে আমি আর কৃষ্ণভক্ত শর্মা হেঁটেছি দিনের পর দিন।
-জানি তো। বলেছেন। কিন্তু তখন বয়স অল্প…
মনস্বিতার কথা শেষ হয় না;
-ওহ হো তোমাকে বলেছিলাম, না?
মাধবী বারান্দায় আসেন। কোনো কথা বলার সুযোগ তিনি মাধবীকে দেন না;
-মাধবী খাবার দাও।
মাধবী তমালকৃষ্ণ কাশছেন শুনে এসেছিলেন।
-আচ্ছা মনস্বিতা আজ কেমন বোধ করছ?
-ভালো। এই তো সেরে গেছে।
-আচ্ছা।
-বাড়ি ফিরে গেলে ভালো হতো।
-এখানে ভালো বোধ করছ না?
-তা নয়। আমার একটা ইন্টারভিউ কার্ড আসার কথা। যদি এরই মাঝে ডাকে?
-ওহ হো। তাহলে তো ফিরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু এই হাত নিয়ে নিজের রান্না খাবার কাজকর্ম করবে কি করে?
-হয়ে যাবে।
তমালকৃষ্ণ হাসেন, মনস্বিতার মনবোল অটুট।
-হাতটা ড্রেসিং হয়ে যাক। দেখি ডাক্তার কি বলেন। তারপর তোমাকে আমিই বাড়ি দিয়ে আসবো।
মনস্বিতা বোঝে তাকে ছাড়বেন না তমালকৃষ্ণ। কে ভাববে তার কথা আর এমন করে! পরক্ষণেই মনে পড়ে যায় তার আর তাৎক্ষণিক চেপে ধরে তমালকৃষ্ণকে;
-একাত্তর সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। নকশাল আন্দোলন তখন পিছনটানে। নকশালদের গুম, জেলের ভেতর হত্যা, বিনাবিচারে ধরে নিয়ে গিয়ে খুন, এসব চলছিল। চারু মজুমদার পালিয়ে। সরোজ দত্ত ধরা পড়লেন।
-ওহ। তোমার মনে আছে?
-হুম। বাকিটা আজ শুনবো?
-এই শরীরে?
-শরীর ঠিকই আছে। অলস বসে থাকা ছাড়া আর কি কাজ। বরং আপনার কথা শুনলে ভালোলাগবে।
এই কথাগুলো মাধবী এসে শুনতে পান। কেন যে তিনি তমালকৃষ্ণের এই ইতিহাসের বয়ান সহ্য করতে পারেন না। রাগ হয় খুব। তিনি ফিরে যান বিরক্ত হয়ে। তমালকৃষ্ণ কিংবা মনস্বিতার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই।
-শোনো। এটা আসলে একটা গল্প।
-কোনটা?
-তমালকৃষ্ণরাজ চক্রবর্তীর যৌবন এবং জীবনের ব্যর্থতার গল্প বলতে পারো। এছাড়া আর কিছু নয়।
-কি বলছেন?
-হ্যাঁ। যে পিতা সন্তানের শেকড়ের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, স্ত্রীর অধিকার পূর্ণ করতে পারে না, সে ব্যর্থ বৈকি।
মনস্বিতার মন খারাপ হয়। তমালকৃষ্ণের উজ্জ্বল মুখটাতে ছাইরঙ মেঘ নামে। যৌবনের উল্লাসে নেমে পড়া একটা তীব্র আন্দোলনের বিফলতার বিষ তাকে ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করে চলেছে বহুদিন। স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আরও এক বিপন্ন সময়ের কাছে পদানত। ছোটভাইয়ের দেশদ্রোহীদের সাথে হাত মেলানো আর টুলটুলের বুর্জোয়া চিন্তাধারার বেপরোয়া ভাবনা তাকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে এতটা বছর ধরে। শেষে এসে যোগ হয়েছে অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা। স্বাধীন বাংলাদেশ এই মানুষটি কতটা উপভোগ করেছেন? মনস্বিতার মনে নানা ভাবনার উথালপাথাল আস্ফালন চলতে থাকে। দুটো কাছাকাছি দেশ। দুটো কাছাকাছি আলোড়ন-আন্দোলন- জনযুদ্ধ। একটির বিপর্যয় অন্যটির সফলতা। কিন্তু তিনি কোনটির দায়ভোগী! অবশ্যই নকশালবাড়ি আন্দোলনের ব্যর্থতার দায়ভোগী। তিনি একা নন, তার পরিবারও। সে কারণেই নিজেকে হয়তো তিনি ক্ষমা করতে পারেন নি। মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারেন নি স্বাধীন বাংলাদেশেও ছোট ভাইয়ের সামনে। দাঁড়াতে পারেন নি নিজের সন্তানের সামনে নিজের আদর্শ নিয়ে। জমাট ব্যর্থতার গ্লানি একা বইতে বইতে কী করে যে তিনি এসে মনস্বিতাকে পেয়ে গেলেন। বরফ গলতে শুরু করলো। মনস্বিতা বরফটা পুরোপুরি গলিয়ে ঠান্ডা শীতল জলের নির্ঝর বইয়ে দিতে চায় তমালকৃষ্ণের বুকের গভীরে। এ মানুষের কাছে তার অটল ঋণ। টুলটুল এসেছিল কিছু বলতে। হয়তো মাধবীই পাঠিয়েছেন কোনো দরকারে। কিন্তু দুজনের গম্ভীর মুখ দেখে বলা হয় না। চেয়ার টেনে তমালকৃষ্ণের পাশে বসে। মৌনতা ভাঙে তমালকৃষ্ণের কথায়;
– তুমি শুনে চলো। যদি কিছু নতুন আবিষ্কার করতে পার!
-অবশ্যই। আমি আপনাকে আবিস্কার করছি। এতো এক সংশপ্তকের জীবনবীক্ষা।
তমালকৃষ্ণ বিস্ফারিত চোখে তাকান মনস্বিতার দিকে। সে চোখের দৃষ্টিতে খানিক আনন্দ খানিক উচ্ছ্বলতা খানিক বিশ্বাস খানিক প্রগলভতায় মাখামাখি করা। যেন এক মাতৃহারা শিশু অকস্ম্যাৎ কোনো মধুরতম ডাকে বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রয়েছে অজানিত অথচ ইপ্সিত মুখের দিকে;
-হুম। আপনার গল্প আমাকে যুদ্ধের সাহস জোগায়।
মনস্বিতা তমালকৃষ্ণের হাতের ওপর তার ব্যন্ডেজ বাধা ডান হাতটাই রাখে। একটি আহত হৃদয় একটি ক্ষরিত বেদনাবিধুর করতল কি এক মেলবন্ধনে উদযাপন করে মধুরতম সময়! স্নেহের বর্ষণে সিক্ত দৃষ্টি মনস্বিতার মুখ থেকে আনত হয় নিজের হাতের ওপর রাখা একটি সাদা ব্যন্ডেজে মোড়ানো হাতের ওপর;
-আহা, কী নিশ্চিত এই হাত! কী অসাধারণ নির্ভরতা্ এই জিঘাংসাদগ্ধ আহত হাতের করতলে!
ভাবতে ভাবতে দুচোখে বিস্ময়ের আলো ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয়ে পরম পাওয়ায় উদ্ভাসিত করে তোলে তমালকৃষ্ণের কপাল আর আনত মুখের ভূগোল। সেই উজ্জ্বল সৌরকপাল আর স্তিমিতপ্রভ মুখের দিকে চেয়ে থাকে মনস্বিতা অপলক;
-আহা। অপরূপ..
মনস্বিতার মুগ্ধদৃষ্টি। এতটুকু প্রত্যাশার প্রাপ্তিতে মানুষ কতটা সুন্দর হয়ে উঠতে পারে! কতটা? নিজেকেও এই প্রশ্ন মনস্বিতার। এতটুকু কথা এতটুকু শব্দ, তুচ্ছ কিছু অপ্রয়োজনীয় বাক্য কিছু অনাকাঙ্খিত সুন্দরতায় ভরিয়ে তুলতে পারে জীবন, দিতে পারে নতুনের প্রেরণা। কে জানতো? কতটুকু জানতো ফারুক!
-ধ্যাৎ। কি সব ভাবনা যখন-তখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে!
নিজেকেই অবজ্ঞা করে মনস্বিতা। একজন ছায়াবৃতের কাছে সূর্যালোকের প্রত্যাশা যথারীতি প্রজ্ঞাহীনতা। বৃক্ষের মাথার ওপর কোনো ছায়া থাকে না। পথিক খানিক জিরোয় তার নিচে। ঝড়-জল-বৃষ্টি কিংবা রোদ অনাকাঙ্খিত অনিবার্য হলেও শত শত বছর ধরে এসবই বৃক্ষকে করে তুলেছে যোগ্যতর।
-সত্তরের নির্বাচনে ১৬৩ আসনের মধ্যে ১৬১টি আসন পেল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান সরকার গঠন করতে পারলেন না। অন্যদিকে পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান সব মিলে ১৩১টি আসনে পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেল ৮৩টি আসন। ভুট্টোও সরকার গঠস করতে পারছেন না আইনত। শুরু হলো গোপন ষড়যন্ত্র। শুনতে পাচ্ছ?
মনস্বিতার আনমন ভেঙে যায়। প্রসঙ্গান্তরটা দরকার ছিল। মন দেয়;
-আচ্ছা। ইয়াহিয়া খান কি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এরকম কঠিন পরিস্থিতিতে?
চলো তোমাকে শোনাই তার বাক্য ও বাণীর ভারসাম্যহীনতার কথা। তা থেকে ষড়যন্ত্রের একটা রূপরেখা তুমি আঁকতে পারবে নিশ্চিত।
১৯৭১। ১১ জানুয়ারি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান প্রথমবারের মতো এলেন পূর্ব পাকিস্তানে।

(চলবে)

পূর্বে প্রকাশিত পর্বের (৭৬) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-66/

পরবর্তী পর্বের (৭৮) লিংক আসছে