শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৭৮]

0
208

পর্ব ৭৮

১১ জানুয়ারি, ১৯৭১ সাল। ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর। সমগ্র পাকিস্তান তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের দিকে। পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মনে মনে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের জায়গাটি দিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতা হস্তান্তরের কালক্ষেপণে তারা অস্থির। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রথমবারের মতো এলেন বাংলাদেশে। ফিরে গেলেন ১৪ জানুয়ারি। দু’বারই সাংবাদিকদের সমাবেশ জনাকীর্ণ।
সাংবাদিক : ইয়োর এক্সিলেন্স, ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পর্কে কিছু বলুন?
ইয়াহিয়া : আমার যা দায়িত্ব ছিল তা শেষ হয়েছে।
সাংবাদিক : কি বলছেন? এখনো তো ক্ষমতা হস্তান্তর করা হলো না। দায়িত্ব শেষ করলে চলবে কেন?
ইয়াহিয়া : জাতি পরিচালিত হবার পথে আমি গতিসঞ্চার করে দিয়েছি।
সাংবাদিক : তাহলে কি আমরা জনগণ ধরে নেব শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হতে চলেছেন?
ইয়াহিয়া : আমি এখনো বলতে পারছি না।
সাংবাদিক : কেন স্যার? আপনিতো আগে একবার ঘোষণা দিয়েছেন যে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। তাছাড়া শেখ মুজিবুর রহমানই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা!
ইয়াহিয়া : আমি ভুট্টোর এলাকা সিন্ধুতে পাখি শিকারে যাচ্ছি।
সাংবাদিক : ইয়োর এক্সিলেন্স আপনি জাতিকে অপেক্ষমান রেখে এই সময়ে পাখি শিকারে যাবেন? তাহলে বিষয়টি…
ইয়াহিয়া : শুনুন আমি বড় ক্লান্ত। আমার একটু অবকাশযাপন দরকার।
সাংবাদিক : কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরে কালক্ষেপণে বাংলার জনগণ…
সাংবাদিকের কথা শেষ হতে দেন না ইয়াহিয়া
ইয়াহিয়া : বুঝতে চেষ্টা করুন, পার্লামেন্টারি ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাই প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকেন। কিন্তু শেখ সাহেব যদি প্রধানমন্ত্রী হতে না চান তাকে জোর করবারও কিছু নেই।
সাংবাদিক : কি বলছেন স্যার! তিনিতো অসম্মতি জানান নি। তাছাড়া পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ (বাংলা ভাষাভাষী) জনগণের নেতা তিনি। জনগণ তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়।
ইয়াহিয়া : আসলে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রপ্রধান কে হবেন তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েই গেছে।
সাংবাদিকরা বিস্ময়ে হতবাক। সাংবাদিক সম্মেলনে ইয়াহিয়া খানের কথাবার্তা দু’রকমের আর অসংলগ্ন। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ উদ্বিগ্ন। পাকিস্তানের রাজনীতির বিশ্লেষকরা শঙ্কিত। ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে এসেই লারকানায় গেলেন। ভুট্টোকে নিয়ে তিনি পাখি শিকারে গেলেন। কিছু বালিহাঁস বন্দুকের গুলিতে শিকার করলেন বটে বাকি যা করলেন তা হলো পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ শিকারের নীলনকশা চূড়ান্তকরণ। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে কি করে পাখির মতো গুলি করে খুন করে জখম হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতা কেড়ে নেবেন সেই ষড়যন্ত্রটা পাকাপোক্ত হলো লারকানায় বসে রাতের আঁধারে। ভুট্টো এরপর সক্রিয় হলেন। সংবাদ মাধ্যমে দেখালেন নানা অজুহাত।
-আমি আওয়ামী লীগের ছয় দফার প্রথম দফাটি মেনে নিতে রাজি আছি যাতে পাকিস্তানে একটি প্রকৃত ফেডারেশন গঠনের কথা বলা আছে।
এরই মাঝে কোনো কারণ ছাড়াই জুলফিকার আলী ভুট্টো ভারতের বিরুদ্ধে নানা রকম বিদ্বেষী কথাবার্তা বলতে শুরু করলেন প্রচার মাধ্যমে। ঠিক এই সময়টাতেই বিশ্বকাপ হকি প্রতিযোগিতা পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত হবার কথা ছিল। কিন্তু ভুট্টো পাকিস্তানে ভারতের খেলোয়াড়দের প্রবেশ করতে দেয়া হবে না বলে ঘোষণা করলেন্। আসলে তখন ভুট্টো চাইছিলেন ভারত বিদ্বেষী কথাবার্তা বলে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হতে চলেছে এধরণের একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির ধারণা দিতে। এটা ছিল দৃষ্টি সরিয়ে নেয়ার একটা চাল।
২৭ জানুয়ারি ভুট্টো ঢাকায় আসেন শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে।
বিমানবন্দরে পড়লেন তিনি সাংবাদিকদের কবলে;
-স্যার, এবারের সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলবেন?
-আওয়ামী লীগের সাথে কী কী বিষয়ে ঐক্য ও সমাঝোতা করা যায় সে উদ্দেশ্যেই এসেছি।
-স্যার, বিশ্বকাপ হকিতে ভারতকে অংশগ্রহণ করতে না দেবার বিষয়টা কি পুণর্বিবেচনার সুযোগ আছে?
কথা শেষ হতে দেন না ভুট্টো। খানিকটা উত্তেজনা তার কণ্ঠে।
-আমি অত সহজে নিজের নীতি থেকে বিচ্যুত হচ্ছি না।
বঙ্গবন্ধুর নিজের বাসায় ভুটো-শেখ মুজিবুর রহমান আলোচনা হলো। সাথে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ। ভুট্টো ও শেখ মুজিবুর রহমান দু’জনকেই আলোচনার শেষে উৎফুল্লচিত্ত দেখা গেল। তাজউদ্দীনেরও আনন্দমুখ। কিন্তু সকলেই আলোচনার বিষয় গোপন রাখলেন। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করলেন। ততদিনে আওয়ামী লীগ আইন প্রণয়ণের খসড়া প্রকাশ করে ফেলে। অথচ ভুট্টো পাকিস্তান ফিরেই ঘোষণা করলেন :
-আমি ডালের বহুদূর এগিয়ে গিয়ে বসেছি। আর সামনে আগালে পড়ে যাব। আমি ছয়দফার ফেডারেশন সম্পর্কিত দফাটিও মেনে নিয়েছি। কিন্তু কর আরোপের ক্ষমতা সংক্রান্ত দফাটি মীমাংসা হবার সম্ভাবনা খুবই কম। আসলে এখন শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে তো ঢাকা যেতে হচ্ছে না। যেতে হচ্ছে প্রণীত শাসনতন্ত্র গ্রহণ করতে। ছয় দফার বিষয়ে আপোষ ও পুনর্বিন্যাসের আশ্বাস না পেলে আমি জাতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা যাবো না।
সারা পাকিস্তান ভুট্টোর কথায় বিমর্ষ বিস্মিত। ক্ষণে ক্ষণে তিনি তার সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছেন।
-আমাদের কথা শোনা হবে এবং গৃহীত হবে সে-নিশ্চয়তা দিলে তারপর অধিবেশনে যোগ দিতে যাব। নইলে নয়।
ভুট্টো এভাবেই কার্যত ছয় দফাকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালেন। নানান রাজনৈতিক নেতা নানান বুদ্ধি পরামর্শ দিতে থাকলেন। কোনোই কাজ হল না। আসলে সকলেই আশা করছিলেন অধিবেশনে সব দল অংশগ্রহণ করুক। দরকারি বিতর্কগুলো অধিবেশনেই হোক। ভুট্টোও তার এসব কথা অধিবেশনে বসে বলুন। সেটাই হতো গণতান্ত্রিক চর্চা। কিন্তু না। তাকে অধিবেশনে যোগদানে সম্মত করা গেল না। বরং যতটা ছাড় দেয়া যায় ততটা দিয়েই এরপর মুখ খুললেন শেখ মুজিবুর রহমান।
-পাকিস্তানের কোনো প্রদেশের ওপর ছয়দফা চাপিয়ে দেয়া হবে না। পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো প্রদেশ স্বায়ত্তশাসনের পূর্ণ সুযোগ নিতে না চাইলে চাপানো হবে না তাদের ওপর। তবে বাংলাদেশের বিষয়ে ছয়দফা পূর্ণরূপে কার্যকর হতে হবে। আমি এবং সমগ্র পাকিস্তান দেখছে আর পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ জনগণও খুব সহজেই বুঝতে পারছে একটি গোষ্ঠী পাকিস্তানের অস্তিত্ব নিয়ে খেলছে। পাকিস্তানের শিল্পপতিরা বাংলাদেশকে বাজার বানিয়ে রেখেছে। আমরা আর সেটা হতে দেব না। কর সংক্রান্ত দফাটি কেন ভুট্টো মেনে নিতে পারছেন না সেটা সহজেই অনুমেয়।
এমতাবস্থায় বাংলাদেশের সাংবাদিকরা এক সংবাদ সম্মেলনে মুহূ্র্মুহু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রশ্ন করে করে জর্জরিত করতে থাকেন।
-ভুট্টো সাহেব তো আপনার কাছে আশ্বাস চেয়েছেন ছয়দফা পুনর্বিন্যাস করার।
শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তর দিলেন :
-জাতীয় অধিবেশনের ডাক দিয়েছেন কে বলুন তো? শেখ মুজিবুর রহমান? নাকি ইয়াহিয়া খান? তাই কারো ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষার আবদার এখানে চলাটা কি যুক্তিযুক্ত?
-স্যার, এই মুহূর্তে কি পাকিস্তানের অস্তিত্ব বিপন্ন?
সাংবাদিকের এই প্রশ্নে বঙ্গবন্ধুর ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। কণ্ঠস্বর খানিকে উঁচুতে তুলে বললেন :
-কি বলছেন এসব? পরিস্থিতি অতটা মারাত্মক তো নয়। কেবল বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণের কথা এলেই পাকিস্তান বিপন্নতার ধোঁয়া উঠে যায়। কেন বলুন তো? পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বরং পশ্চিম পাকিস্তানিদের তুলনায় ভালো পাকিস্তানি। আপনারা কেন আগেই অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন?
ভুট্টো-ইয়াহিয়া দু’জনের কথা উল্টোপাল্টা করা আর ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াকে ধীরগতি করায় সমগ্র পাকিস্তানের জনমনে এটা চাপা উত্তেজনা ছড়াতে থাকে। ঘটনা খুব স্বাভাবিক ঠেকে না কারো কাছে। সাধারণ জনগণ অধীর হয়ে আছেন কখন তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা দেশের প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে বসবেন। কিন্তু না। জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধতে থাকে। কোথাও কিছু একটা গোলমাল হচ্ছে, জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হয়তো আর বসছে না। সাধারণ জনগণ আর রাজনীতি বিশ্লেষকদের সব ধারণাকে সত্য প্রমাণিত করে পহেলা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটা বিবৃতি রেডিও পাকিস্তানে ঘোষণা করা হল।
-আমি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করছি।
বঙ্গবন্ধু তখন ব্যারিস্টার আমীরুল উল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, তাজউদ্দীন আহমদকে নিয়ে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি লোকজনের সাথে হোটেল পূর্বাণীতে অবস্থান করছিলেন। পথে যেতে যেতে গাড়িতে বসেই তার কানে এসে গেছে গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত হবার কথা। তখনই তারা দুটি খসড়া প্রস্তাব লিখে বঙ্গবন্ধুকে দেখান। একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার সাথে কোনো রকম আলাপ আলোচনা না করে অধিবেশন স্থগিত করার নিন্দা প্রস্তাব। আর একটি পাকিস্তানের পরিবর্তিত রাজনৈতিক অবস্থায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একক সিদ্ধান্ত দেবার সর্বময় ক্ষমতা দেয়া। সেখানে লেখা হয়, ‘পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সকল নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করা হলো। এখন থেকে তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন তাই গণপরিষদের সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হবে।’ সর্বসম্মতিক্রমে পার্লামেন্টারি সদস্যদের দ্বারা প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। তখন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা স্টেডিয়ামে চলছিল পশ্চিম পাকিস্তান ও বিশ্ব একাদশের মধ্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। দর্শকভরা গ্যালারি। ইয়াহিয়ার অধিবেশন স্থগিতের বিবৃতি শোনার সাথে সাথে গ্যালারিভরা দর্শকেরা নেমে আসে মাঠে। প্রথম আক্রমণের শিকার হয় পাকিস্তানি ক্রিকেটাররা। স্টেডিয়ামের ভেতর প্রবেশ করে সাধারণ জনগণ ব্যাট-বল-স্ট্যাম্পে আগুন লাগায়। ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত করে তোলে আকাশ বাতাস। স্টেডিয়াম থেকে জনগণের জঙ্গী মিছিল বের হয়ে শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত করে তোলে রাজপথ। ততক্ষণে অফিস-আদালত-স্কুল-কলেজে বেতার মারফত অধিবেশন স্থগিত হবার ঘোষণা সকলের জানা হয়ে গেছে। মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায় সব কলকারখানা স্কুল অফিস ব্যাংক এমনকি রাজধানীর টাউন সার্ভিসের বাসগুলোও। স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়া জঙ্গী মিছিলে দলে-দলে অফিস-ব্যাংক-স্কুল-কলেজ-কারখানা থেকে শ্রমিক কৃষক অফিসার শিক্ষক ছাত্র জনতা যোগ দিয়ে শহর প্রদক্ষিণ করে। ডাকসু ও ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে শুরু হয়ে যোগ হয় এই বিশাল গণমিছিলে। মিছিলের পর মিছিল যেতে থাকে হোটেল পূর্বাণীর দিকে। পূর্বাণী থেকে স্টেডিয়াম পর্যন্ত উপচে পড়া ভীড়। দেশি বিদেশি সাংবাদিকে হোটেল উপচে পড়ছে। সকলেই শেখ মুজিবুর রহমানের দিক নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করছে। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত সারা ঢাকা নগরী।
ছয় দফা না এক দফা/ এক দফা এক দফা
পিন্ডি না ঢাকা/ ঢাকা ঢাকা
তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা
তুমি কে আমি কে/ বাঙালি বাঙালি
বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো/ বাংলাদেশে স্বাধীন করো। শুরু হয়ে যায় অসহযোগ আন্দোলন। কয়েক জায়গায় প্রতিবাদরত জনতার ওপর সামরিক জান্তা গুলি চালায়। পাকিস্তানি সামরিক জান্তার উদ্দেশ্য, নাটক করা আর ভুট্টোর ষড়যন্ত্র পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে আর দেশবাসীর কাছে নগ্নভাবে স্পষ্ট হয়ে পড়ে। বাঙালি অস্তিত্ব রক্ষায় মরিয়া হয়ে ওঠে। শায়ত্বশাসনের আন্দোলনে ছয়দফাকে কেন্দ্রে রেখে অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে বাংলাদেশ নামক একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম। কাণ্ডারি বাংলার নেতা বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দোসরা মার্চ সকাল এগারোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে বটতলায় প্রথম সবুজ জমিনের মাঝে লাল সূর্যগ ও ভেতরে সোনালি রঙে আঁকা বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন আসম আব্দুর রব।
৭ মার্চ, ১৯৭১। লোকারণ্য রেসকোর্স ময়দান। জনতা জঙ্গী ও দারুণ বিক্ষুদ্ধ। চোখে মুখে রোষানল। সকলেই অধীর, এই মহা-অন্ধকারে আলোর দিশা দিতে কখন আসবেন প্রিয় নেতা। সেদিন ঢাকাকে ঘিরে সারা বাংলাদেশেরই হৃদয় হয়ে উঠেছে বিকেলের রেসকোর্স ময়দান। ফুলের উদ্যানে শোভিত মাঠটিকেও ঢেকে দিতে উড্ডীন লক্ষ-লক্ষ হাত। একখণ্ড আকাশ যেমন বিপুল বিস্তৃত তবু অখণ্ড, ঠিক তেমন সারা বাংলাদেশের সবুজ যেন এসে আজ খণ্ডহীন হয়ে মিশেছে রেসকোর্সের সবুজে। উদ্দীপ্ত প্রাণের জোয়ারে উদ্দীপ্ত রেসকোর্স ময়দান। কারখানার লোহার শ্রমিক এসেছে কপালে ঘাম মোছার গামছাটি কপালে বেঁধে। লাঙল-জোয়াল কাঁধে আধো-উলঙ্গ কৃষকও নেমে এসেছে ময়দানে। পুলিশের বন্দুক কেড়ে নেবার মতো সাহসী যুবকও এসেছে অসংখ্য। মৃত্যুর হাতছানি তবু চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক। এসেছেন কবি। সাংবাদিক। এসেছেন অফিসার ও কেরানি। এসেছেন ভবঘুরে নারী শিশু এমনকি বৃদ্ধ এবং বৃদ্ধতর জন। একজন মানুষের জন্য কী ব্যাকুল অপেক্ষা। যিনি আলোর দিশারী, পথ দেখাবেন নিকষ অন্ধকারে। নিয়ে আসবেন প্রদীপ্ত সময়, যা উজ্জ্বল করে তুলবে চিরতরে মহাঅন্ধকারকে দূর করে। রেসকোর্স ময়দানের পাতাকুড়ানি শিশুগুলো হতবাক। মূক। বিস্মিত। তারা উদ্যানে পাতা কুড়িয়েছে কতকাল! কই কখনো কি এমন দেখেছে! এত এত মানুষ! দেখেছে কী মানুষের ঢল! সমুদ্রের জোয়ারের মতো মানুষ! দিশেহারা, সন্ত্রস্ত চোখে ভাবছে পালাবে নাকি দেখবে কী ঘটতে চলেছে এই উদ্যানের আধো-তন্দ্রায় অভিভূত বিবর্ণ বিকেলে? তাদের পা অসাড়। অপেক্ষা আর কৌতূহলের অবসান ঘটালেন অবশেষে তিনি। এসে দাঁড়ালেন। দৃপ্ত তাঁর পদক্ষেপ। চোখে শতবছরের বাঙালির অপমান শোষণবঞ্চনা আর অধিকার কেড়ে নেয়ার বিরুদ্ধে জাগ্রত অহং। অপেক্ষমান জনতার শোণিতে ধাবমান রক্তপ্রবাহে তখন দ্রুত বেগ। আবেগের গতি মাত্রাছাড়া। বুকের কাছে জড়ো হয়ে আছে ক্রোধ। রক্তবর্ণ চোখ। হৃদয়ে ছলকে-ছলকে উঠছে নামছে সেই স্রোতধারা। জনতার চোখেমুখে উন্মাদনা আর সমুহ ভয়াবহতা একনজরে পড়ে ফেললেন প্রাজ্ঞ মহারাজনীতিক। জনতা ধরেই নিয়েছিল বঙ্গবন্ধু সেদিনই স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন আর জনতা ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করতে এগিয়ে যাবে। আন্ডারগ্রাউন্ড অবস্থায় থেকে কমিউনিস্ট পার্টির বিপ্লবী নেতারাও নিজেদের যথাসম্ভব গোপন করে উপস্থিত হলেন রেসকোর্স ময়দানে। উদ্দেশ্য বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পেলেই ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করবেন। না এখনই নয়। বাঙালিকে প্রথম আক্রমণকারী হিসেবে পৃথিবীর সামনে উপস্থিত করবেন না বঙ্গবন্ধু। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। স্তিমিত করতে হবে এই আগুন কিন্তু স্বাধীনতার জন্য প্রজ্জ্বলিত রাখবেন লেলিহান শিখা। জনতার মঞ্চে এসে প্রত্যক্ষ করলেন নিজচোখে, জনতার বিশাল একাত্মতা আজ এক জাগ্রত অগ্নিগিরি, জ্বলছে। গণগনে তার তেজ। বিস্ফারিত হতে দিলেই উদ্গীরিত লাভায় মুহূর্তে পুড়ে ছাড়খার করবে দশদিক। আজ কেবল একটি নির্দেশ, একটি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মানুষ। হঠাৎ মঞ্চ কেঁপে উঠলো মন্দ্রস্বরের অনুরণনে। বজ্রকণ্ঠের উচ্চারণে একটি অমোঘ আঙুলের ঈশারায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষণা করলেন তার সর্বশেষ কর্মসূচি :
-আমরা ৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ’৬৯-এ আমার ছেলেদের গুলি করা হয়েছে। ১০ বছর মার্শাল ল দিয়ে আমাদের গোলাম করে রেখেছে। রক্তের দাগ শুকায়নি। ২৫ মার্চ তারিখ গোলটেবিল বৈঠকের তারিখ ঘোষণা হয়েছে। কিসের বৈঠক? আমার দেশের মানুষের বুকের রক্তের ওপর পাড়া দিয়ে আমি বৈঠকে যাব না। মার্শাল ল’ উইথড্রো করুন ইয়াহিয়া সাহেব। সমস্ত জোওয়ানদের ব্যারাকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। আমার ছেলেদের হত্যার বিচার করুন। ক্ষমতা হস্তান্তর করুন। তারপর বিবেচনা করবো আমি এসেম্বলিতে বসবো কি বসবো না। আজ থেকে স্কুল কলেজ কোর্ট কাছারি আদালত ফৌজদারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। ২৮ তারিখ কর্মচারীরা বেতন নিতে যাবেন। যদি বেতন না দেয়া হয় যদি আর একটা গুলি চলে তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদরে যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করো। আমরা এবার ভাতে মারবো। পানিতে মারবো। সেনাবাহিনীর জওয়ানরা তোমরা ব্যারাকে থাকো। কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের ওপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাতকোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা মরতে শিখেছি। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আর এক পয়সাও পশ্চিম পাকিস্তানে যাবে না। খাজনা ট্যাক্স বন্ধ করে দিন। শত্রুবাহিনী ঢুকেছে। নিজেদের মধ্যে কলহ সৃষ্টি করবে। লুট-তরাজ করবে। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলিম বাঙালি-অবাঙালি সকলেই আমার ভাই, তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়। রেডিও টেলিভিশনে যদি আমাদের খবর প্রচার না করতে দেয় তবে তবে কেউ রেডিও টেলিভিশন স্টেশনে যাবেন না। রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরও দেব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাহআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।
ঢাকা বেতার বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সরাসরি প্রচার করার জন্য প্রস্ততি নিয়ে রেখেছিল। ভাষণ শুরুর আগে ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা এই গানটি বাজতে থাকে। তার পরপরই হঠাৎ সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। বেতারের সকল কর্মচারী মিছিল করতে করতে বেতারভবন ছেড়ে রেসকোর্সে সমবেত লক্ষ লক্ষ মানুষের সাথে যোগ দেন। একই সাথে বন্ধ থাকে ঢাকা টেলিভিশনও। গভীর রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষের সাথে আপোষে পৌঁছান যে, পরদিন আটই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কোনো ধরণের সম্পাদনা ছাড়াই প্রচার করা হবে। আর তা হলেই রেডিওর কর্মকর্তা কর্মচারীরা কাজে যোগ দেবেন। ৮ মার্চ সকালে সমগ্র বাঙালি জাতি বঙ্গবন্ধুর রেকর্ড করা ভাষণটি ঠিকই শুনতে পেল। একইসাথে একই দিনে কলকাতার আকাশবাণী থেকেও ভাষণটি প্রচার করা হয়। বাংলার ঘরে ঘরে রূদ্ররোষ ফুঁসে-ফুঁসে জ্বলতে থাকে। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বুঝতে আর বাকি থাকলো না যে বাঙালিরা ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের লক্ষ্যে। ইপিআর, পুলিশ ও বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সদস্যদের কাছেও এই ভাষণ স্বাধীনতার সবুজ সংকেত হিসেবেই মনে হলো। বাঙালি সেনা অফিসার এই ঘোষণাকেই স্বাধীনতার ঘোষণা হিসেবে ধরে নিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি শুরু করে দিলেন। অন্যদিকে গোপনে সামরিক জান্তা বাঙালি নিধনের নীল নকশা প্রণয়ন করলো। অথচ বাইরে চলতে থাকলো আই ওয়াশ। জনতাকে ভুল বোঝানোর বা ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা হিসেবে ভুট্টো চর্মচক্ষুর সকল লজ্জা ভুলে এক অসম্ভব প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। ১৪ই মার্চ তিনি বললেন :
-ইয়াহিয়া খান, আপনি পশ্চিম পাকিস্তান ও পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দুই দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন।
শেখ মুজিবুর রহমান যখন সর্বোচ্চ ছাড় দিয়েছেন পাকিস্তানকে অখণ্ড রাখবার জন্য, তখনই যে-কোনো মূল্যে পাকিস্তান ভেঙ্ ভুট্টোর ক্ষমতার মসনদে বসবার এই নির্লজ্জ কাণ্ড দেখে বাংলাদেশরে মানুষ তখন হতবাক। কারণ তখন পাকিস্তানের এক ইউনিট ভেঙে দিয়ে ইয়াহিয়া খান আবার আগের মতো পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তরপশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এই চারভাগে ভাগ করলেন। ভুট্টো কেবল সিন্ধু ও পাঞ্জাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন। বেলুচিস্তান ও উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল ওয়ালী ন্যাপ। রাজনৈতিক মহলে ওলামায়ে ইসলামের নেতা মুফতী মাহমুদ প্রথম এর প্রতিবাদ করে বললেন, দুটো প্রদেশে গরিষ্ঠতা না পেয়ে ভুট্টো কি করে ক্ষমতা আশা করেন? এটা ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে যায় যে গণপরিষদের অধিবেশনে যোগ না দেয়ার পেছনে আসলে জুলফিকার আলী ভুট্টোর কোনো জাতীয় স্বার্থ নিহিত ছিল না। ক্ষমতা ভাগাভাগির জন্যই তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে চাপ দিয়েছেন। মুফতী মাহমুদ স্পষ্ট করে বললেন, দেশে একটিমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থাকতে পারে আর তা হলো আওয়ামী লীগ। এতএব ভুট্টোর এই ফর্মুলা উদ্ভট ন্যাক্কারজনক ও ক্ষমতালিপ্সার চুড়ান্ত দলিল। সত্যিকার অর্থেই ভুট্টো ক্ষমতার লোভে পাকিস্তান ভেঙে দু’টুকরো করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। কারণ দু’দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার মানে হলো দুই পাকিস্তানকে স্বীকার করে নেয়া। রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষ এটা সহজেই বুঝতে পারলো পাকিস্তানের সংহতি নষ্ট করার জন্য ভুট্টোই লাগাতার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এয়ার ভাইস মার্শাল (অব) আসগর খান দুঃখ করে বললেন, ‘ইসলামের নাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি দেশের জন্মের পর ২৫ বছর যেতে না যেতেই ধ্বংস হয়ে গেল।’
এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে চলতে থাকে মানুষ হত্যা্। অবাঙালি ও বিহারিরা ঢাকা ছাড়তে শুরু করলো। ডাচ ও ব্রিটিশ নাগরিকেরা দূতাবাসের নির্দেশে ঢাকা ছেড়ে গেল। পাকিস্তান থেকে কোনো নাগরিককে পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকতে দেয়া হলো না। ৭ই মার্চের পরপরই বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. নুরুল উল্লাকে অনুরোধ করলেন একটি রেডিও ট্রান্সমিটার তৈরি করদে। তড়িৎকৌশল বিভাগের অন্যান্য শিক্ষকের সহায়তায় এভাবেই গোপনে তৈরি হয় প্রথম রেডিও ট্রান্সমিটার। শর্টওয়েভ। এর সম্প্রচার ক্ষমতা ছিল প্রায় সমগ্র বাংলাদেশব্যাপী। বঙ্গবন্ধু এদিকে জেনারেল এমএজি ওসমানির সাথে সশস্ত্র সংগ্রামের খুঁটিনাটি নিয়ে আলোচনা করলেন। ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসাররাও বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেছিলেন। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা ঢাকায় প্রকাশ্যে ট্রেনিং নিতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবনের সামনে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপের কর্মীরা সামরিক বাহিনীর সাথে পাল্লা দিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ শুরু করে। মাওলানা ভাসানীও যোগ দেন ঐক্যে :
-পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবে। পাকিস্তান আর অখণ্ড থাকবে না। ইয়াহিয়ার বাপেরও ক্ষমতা নেই ঠেকায়। দরকার হলে আপনারা দু‘দিন পরই আসুন। এসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেন।
১১ মার্চ ঢাকা সফর করেন এয়ার মার্শাল আসগর খান। ফিরে গিয়ে জানান, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্নতার হাত থেকে রক্ষার জন্য এখনই ব্যবস্থা না নিলে সর্বনাশ ঠেকানো সম্ভব হবে না। পূর্ব পাকিস্তান এক আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ হয়ে আছে। কুর্মিটোলা বিমানবন্দর ছাড়া আর কোথাও পাকিস্তানের পতাকা উড়ছে না। তিনি ইয়াহিয়াকে অনুরোধ জানিয়ে বললেন :
-দ্রুত পূর্বপাকিস্তানে যান আপনি। ২৩ বছরের বঞ্চনায় বাঙালি রোষে প্রজ্জ্বলিত। ৬ দফার এতটুকু নড়চড় তারা সইবে না। বরং শেখ মুজিবুর রহমানের সকল শর্ত মেনে নিয়ে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করুন।
কাজী জাফর, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, মান্নান ভুইয়ার নেতৃত্বে কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের একটা সমম্বয় কমিটি এই সিদ্ধান্তে আসে যে, শেখ মুজিব আর ভুট্টো-ইয়াহিয়ার দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত রয়ে গেছে। পূর্ব পাকিস্তান যেহেতু এখন স্বাধীনতা আন্দোলনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেই হেতু গ্রাম এলাকায় গেরিলা স্কোয়াড তৈরির কাজ করা দরকার। চলে অস্ত্র সংগ্রহ ও বোমা বানানোর আয়োজন। মনি সিংহের নেতৃত্বে মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে ভিন্নভিন্নভাবে বিপ্লবের ছক কষে। মার্কসবাদী লেলিনবাদী তোয়াহা আবদুল হকের ইস্ট পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (ইপিসিপি) যুদ্ধ শুরু অবধি দ্বিধাবিভক্ত ছিল। কেউ কেউ সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকে জরুরি মনে করেছেন, কেউ ভেবেছেন দুটোই বুর্জোয়া রাজনীতির কৌশল, অর্থাৎ দুই কুকুরের কামড়া-কামড়ি। এখানে সমাজতন্ত্রের কোনো সুরক্ষা হবার নয়। তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত দেখা গেল।
এদিকে ১৫ মার্চ কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এলেন। ১৬, ১৭, ১৯, ২০ – পর পর চারটি মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে কোনো ফলপ্রসু সিদ্ধান্ত এলো না। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে খুব একটা বলার কিছু থাকেনা শেখ মুজিবুর রহমানের। তিনি কেবল বলেন, আলোচনা চলছে। এরই মাঝে ১৭ই মার্চ শেখ মুজিবের জন্মদিনে জনতা আর রাজনৈতিক নেতারা শুভেচ্ছা জানাতে এলে দুঃখভরা মনে তিনি বললেন,
-এই দুঃখিনী বাংলায় আমার জন্মদিনই কী আর মৃত্যুদিনই কী? এখানে পশ্চিমাদের ইচ্ছেমতো প্রাণ দিতে হয়। এ-দেশের জনগণের কাছে জন্মের আর কোনো মহিমা নেই।
জুলফিকার আলী ভুট্টোর ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত যখন জনতা, তখনই ইয়াহিয়ার ইচ্ছায় ২১শে মার্চ জন-বিক্ষেোভের মাঝেই ভুট্টো এলেন ঢাকায়। ২২শে মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া-ভুট্টোর বৈঠকেও ফলপ্রসু কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারলেন না শেখ মুজিবুর রহমান। বিষণ্ন মনে বিস্রস্ত চেহারা তাঁর। কেবল বললেন :
-আমাদের সাবধান থাকতে হবে।
২৪ তারিখেও আবার বৈঠকে চললো সমঝোতার চেষ্টা। বৈঠকের পর বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন :
-ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যপারে আমরা মতৈক্যে পৌঁছেছি। আমি আশা করি প্রেসিডেন্ট এবার তা ঘোষণা করবেন।
শ্লোগানে-শ্লোগানে আনন্দিত জনতা মিছিলে মুখর করে তুললো রাজপথ। কিন্তু না, ২৫শে মার্চ সকাল ৯টা অবধি ক্ষমতা হস্তান্তরের কোনো ঘোষণা এলো না। জনতা আবার বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকলো। সারাদিন সামরিক তৎপরতা দেখা গেল ঢাকায়। ১১০ জন বাঙালিকে হত্যা করা হয়। উপরে উপরে সমঝোতার বৈঠক আর ভেতরে ভেতরে বাঙালি নিধনের নীলনকশা চূড়ান্ত হয়ে যাবার পর কাউকে কিছু না জানিয়ে ইয়াহিয়া এবং ভুট্টো গোপনে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করলেন। বঙ্গবন্ধু এই খবর ঠিকই পেয়ে যান। সেই নীল-নকশারই প্রথম ‘অপারেশন সার্চলাইট’ তখন পুরোপুরি প্রস্তুত। ২৫শে মার্চের কালোরাত। ইয়াহিয়া ঘোষণা করলেন :
-ওদের ত্রিশলক্ষ হত্যা কর, বাকিরা আমাদের থাবার মধ্যে থেকেই নিঃশেষ হবে…

(চলবে)