শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮০]

0
264

পর্ব ৮০

-মনস্বিতা, দেখবে অকূল পাথারে পড়ে গেলে তুমি বাঁচবে না জেনেও একটা ছোট্ট ভাসমান কুটোকে আঁকড়ে ধরবে নিশ্চয়ই?
-এ কথা বলছেন কেন?
-এজন্য যে, বাঙালি বুঝতে পেরেছিল মুক্তি পেতে হলে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতেই হবে। তবু শেষ আশা, যদি ইতিবাচক কিছু ঘটে। সেই রাতে একটু তাড়াতাড়িই ঘুমোতে গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ। কারণ, ২৫শে মার্চ সকালেই আসার কথা ছিল ইয়াহিয়া-ভুট্টো-শেখ মুজিবের সমঝোতার ঘোষণা। শুভাশুভের আশা করতে দোষ কী, তাই না?
-মানে কী?
-মানে হলো হয়তো শুভ একটা হবে, এই প্রত্যাশা ছিল সাধারণ পূর্ব পাকিস্তানিদের।
-তাতো হলো না।
-না, হয় নি। বরং কী হলো শোনো। সেই রাতের কথা বলছি, শোনো।
-বলুন।
-২৫শে মার্চ। মাঝরাত। ফুলার রোডের অ্যাসেম্বলি হলের উল্টো দিক। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষকদের আবাসিক ভবনগুলো এখানেই। লাগোয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিন্দু ছাত্রদের জগন্নাথ হল আর মুসলিম ছাত্রদের ইকবাল হল। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় নিরস্ত্র বাঙালিদের। গুলি মর্টারের শব্দে আতঙ্কিত হয়ে সাধারণ মানুষ সব আলো নিভিয়ে দেয়। সকলে সন্ত্রস্ত। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে আছ ঢাকা শহর। স্ট্রিট লাইটগুলো সব নেভানো। কিছু সময়ের মধ্যেই জগন্নাথ হল আর ইকবাল হল ছেয়ে গেল পাকিস্তানি মিলিটারিতে। দুটো হলের বেশকিছু কক্ষে আগুন ধরে গেলে সেই আলোতে দেখা গেল কিছু মিলিটারি একটার পর একটা কক্ষে তল্লাশী চালাচ্ছে। ভেতরে আরও কিছু ঘটছিল কি না, আলোহীন ঢাকা শহরের এই বিকট অন্ধকারে বোঝা যায় নি। ভোর হতে না হতেই প্রচণ্ড আলো নিয়ে আজ যেন সূর্য সেঁধিয়ে পড়েছে পৃথিবীতে। সেই আলোতে দেখা গেল, সাদা চাদরে সামনের রাস্তাটি ঢাকা। কিছু ছাত্রকে টেনে টেনে নিয়ে আসা হলো চাদরটার সামনে। সাদা চাদরটা কে যেন সরালো। দেখা গেল অনেকগুলো মৃতদেহ পড়ে আছে সাদা চাদরের নিচে। উল্টো দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেগুলোকে লাশগুলোর মুখোমুখি এনে দাঁড় করালো মিলিটারিরা। ছেলেগুলো হাত জোড় করে কাকুতি-মিনতি করলে গুনে গুনে তিন-চারটি গুলি চললো ওদের গায়ে-মাথায়-বুকে। কিছুক্ষণ পর আরও কিছু আহত মানুষকে নিয়ে আসা হলো ছাত্রাবাস থেকে। ঠিক আগের মতো মৃত শরীরগুলোর পাশে এনে দাঁড় করালো সবাইকে। তারপর আবার চলল গুলি। কেউ বসে ছিল। কেউ দাঁড়িয়ে। সামনে এত কাছে থেকে গুলি করছিল যে এক-একজনের বুক ফুটো করে পিঠ দিয়ে বের হয়ে সেই গুলি গিয়ে পড়ছিল পেছনে মাঠের ধুলোতে। আর সেই ধুলোতে ঝড় উঠেছিল মানুষের শরীর ভেদ করে আসা মাটিতে পড়া গুলির আঘাতে। ধুলি উড়ছিল প্রতিটি গুলিবিদ্ধ শরীরের পেছনে। ঠান্ডা মাথায় লোকগুলোকে এভাবেই হত্যা করা হয়।
-মা…
মনস্বিতার বুক চিরে একটা ব্যথা কেমন যেন ‘মা’ শব্দে প্রকট হয়ে ওঠে।
এগুলো কে দেখছিলেন সেই মধ্যরাত থেকে সকাল অবধি, জানো?
-না।
-প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর নুরুল উল্লাহ তাঁর বাসভবন থেকে। সেটা ছিল শুরু।
-আপনি বা আপনারা কী করে জানলেন এসব?
-আলোকচিত্র, ভিডিও ফুটেজে বহু রেকর্ড আছে এ-সবের।
-এই তাণ্ডবের ভিডিও ফুটেজ? কী করে সম্ভব? ওরা নিশ্চিত এ বিষয়টিও আমলে নিয়েছিল যাতে কোনো প্রমাণ না থাকে?
-অবশ্যই। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নূরুল উল্লাহ কীভাবে ভিডিও করেছিলেন শোনো।
স্বাধীনতার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে তার কথোপথনটি বলছি।
সাংবাদিক : অতগুলো খুন জীবনে প্রথমবারের মতো চোখে দেখবার পর ভিডিও করার চিন্তাটা কীভাবে আপনার মাথায় এলো?
নূরুল উল্লাহ : ধীরে ধীরে আমি ধাতস্থ হই। গণহত্যা শুরু হয়ে গেছে বুঝতে পারি। পরপর দু’বার এভাবে  এতগুলো ছাত্রকে ঠান্ডামাথায় গুলি করা দেখে বুঝলাম আজ আরও খুন হবে। সারাদেশ জুড়েই চলবে এমন হত্যাকাণ্ড। এটা আমি একা নই পূর্ব পাকিস্তানের সকলই বুঝতে পারছিলাম। আমি নিজে নিজেই বলে উঠলাম, ‘আরো খুন হবে। গণহত্যা মাত্র শুরু হয়েছে।’ তখন আমার চাচাতো ভাই বলে উঠলো : ‘ছবি তোলেন ভাইজান, ছবি তোলেন।’
মনস্বিতা আঁৎকে ওঠে;
-ওরা টের পেত যদি, এ তো মারাত্মক রিস্ক ছিল?
-অবশ্যই। শোনো, কীভাবে তিনি ভিডিও করেছিলেন।
নূরুল উল্লাহ : চাচাতো ভাই নসীমের কথা শুনে মনে পড়লো আমার বাসায় ভিডিও ক্যামেরাসহ একটা ভিসিআর আছে। জাপানে তৈরি প্রথম যুগের এই পোর্টেবল ভিসিআর ছিল খুব ভারী। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্যামেরা সেট করে একটা কালো কাগজ ফুটো করে ক্যামেরার লেন্সটা তার ভেতর গলিয়ে দিয়ে জানালার তাকের ওপর রাখলাম। ঠিক যেটুকু ক্যামেরা গেল ততটুকু। আর বাদবাকি অংশ পর্দা দিয়ে ঢাকা থাকলো। জানালা সামান্য ফাঁকা করে তার মাঝ দিয়ে সরু মাইক্রোফোনটা একটুখানি বের করে রাখলাম। যতটুকু কথা ধরা যায়, এই আর কি।
-জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন দেখছি!
সাংবাদিকদের নূরুল উল্লাহ : ততক্ষণে আরও দুটো দলের মানুষ হত্যা শেষ হয়ে গেছে। আরও বন্দী আনা শুরু হয়েছে মাঠে। ওদের পরনে লুঙ্গি-গেঞ্জি। কারুর খালি গা। দেখেই বোঝা যায় এরা সকলে ঘুমন্ত অবস্থায় ধরা পড়েছে। সকলকে গুলি করে ফেলে দেয়া হয়েছে ততক্ষণে। লম্বা ফর্সা পাঞ্জাবি সৈনিক এরা, যারা গুলি করছিল। এবার এলো নয়-দশ জনের মতো কালো বেটে সাইজের কিছু সৈন্য, সাথে পঁচিশ-ছাব্বিশ জন মানুষ। আমি ভাবলাম লাশ সরানোর জন্য এদের নিয়ে এসেছে হয়তো। কিন্তু না। ওদেরও পুরোনো লাশগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে রাইফেল তাক করলো। এদের মধ্যে একজন লোক, যার মুখে দাঁড়ি, হাঁটু গেড়ে প্রাণভিক্ষা করছিলেন। অন্যদের গুলি করা হলো কিন্তু দাড়িওয়ালা লোকটির গায়ে গুলি লাগে নি। সকলেই পড়ে গেছে কিন্তু ওই লোকটি তখনো করজোরে প্রাণভিক্ষা করছে দেখে একজন সৈনিক তার বুকে পা দিয়ে একটা জোরে লাথি মারলো আর সঙ্গে-সঙ্গেই পেছন থেকে একটা গুলি এসে তার বুক ফুটো করে পেছনের মাঠে ধূলি ওড়ালো। অদ্ভুত জানেন, এভাবে মানুষের বুক ফুটো করে গুলি নেমে গিয়ে মাটিতে ঠেকে, ধুলোর ঝড় ওঠে, এ-কেবল ওয়েস্টার্ন মুভিতেই দেখেছিলাম। বাস্তবে এমনও ঘটতে পারে… এমন নৃশংসতা! এমন খেলা!
-এতগুলো খুন এক রাতে!
-আরে, এতো মাত্র রাত বারোটার পর থেকে সকাল অব্দি ঘটেছিল মাত্র, মানে কয়েক ঘণ্টায় একটি জায়গার হত্যাকাণ্ডের কথা বলছি মনস্বিতা। মাত্র একটি জায়গার।
-তারপর কি করলো ওরা? অতগুলো লাশ নিয়ে গেল?
-কোনো কোনো সেনা পড়ে থাকা দেহগুলোর চারপাশে ঘোরাঘুরি করলো কিছুক্ষণ। যারা তখনো মরে নি, হয়তো পানির জন্য কাকুতি-মিনতি করছে, কারো হয়তো চোখের পাতা মিটমিট করছে, শেষবারের মতো চোখ বন্ধ করার আগে। কারো হয়তো হাতের আঙুলগুলো কিছুক্ষণের জন্য নড়ছে, এক্ষুণি স্তব্ধ হয়ে যাবে। সেইসব পড়ে থাকা প্রায়-লাশগুলোর মৃত্যু নিশ্চত করার জন্য আবার গুলি করে কিছুক্ষণ পর সকলে চলে গেল। নিস্তব্ধ পুরো কোয়ার্টার এলাকা। ওদিকে জগন্নাথ হলের ছাত্রাবাসের মাঠে পড়ে রয়েছে অসংখ্য লাশ, অগুনতি লাশ!
-ওহ্।
মনস্বিতা এভাবে মুক্তিযুদ্ধের সত্যি ঘটনাগুলো আগে কখনো শোনে নি। তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। ব্যথিত হৃদয়। একবার তাকিয়ে দেখলো টুলটুলের দিকে। টুলটুল ভাবলেশহীন মনোযোগের সঙ্গে শুনছে সমস্ত ঘটনা। মনস্বিতার মুখে ঘনমেঘ। কালো অন্ধকার দেখায়। টুলটুলের কথা ভাবে;
-এ তো টুলটুলের দেশ নয়! কিন্তু তাতে কী? এতগুলো মানুষের খুনের ঘটনা তার মনে কী কোনো প্রতিক্রিয়াই তৈরি করবে না! অদ্ভুত!
হঠাৎ টুলটুল কথা বলে উঠলো;
-এতগুলো লাশ কী করলো ওরা?
-বেলা তখন ১০টা বাজে। একটা পুরোনো বুলডোজার এলো। মাটি খুঁড়তে শুরু করলো। লাশগুলো পুঁতে ফেলার জন্য।
-ওহ্…
মনস্বিতার বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে;
-এই মানুষগুলোর পরিচয় বাংলাদেশ এবং পৃথিবীর ইতিহাস থেকে মুছে গেল চিরতরে, তাই না?
-হুম।
তমালকৃষ্ণের হৃদয় ভারাক্রান্ত। বয়স হয়েছে। সূর্য তার পশ্চিমে হেলেছে। বুকের ব্যথাটা ক্রমবর্ধিষ্ণু। টের পান ক্ষণে ক্ষণে। এ ব্যথার ইতিহাস তাকে রক্তাক্ত করে দ্বিবিধ কারণে। তার তুমুল যৌবন, তার তীব্র আবেগ, তার নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম কিংবা আদর্শ-বিশ্বাস পৃথিবীতে কোনো গৌরবের অংশ হতে পারলো না। বুকে হাত দেন। মনস্বিতা শংকিত;
-ব্যথা?
-না না। ওসব কিছু নয়। সময় হয়ে এসেছে না?
কথাটি শুনে মনস্বিতার চোখ জলে ছলছল করে ওঠে। টুলটুল মনস্বিতার দিকে তাকায়। হালকা করার চেষ্টা করে;
-কাঁদবেন নাকি?
মনস্বিতার ভালোলাগে না টুলটুলের কথাটি। লজ্জাও পেয়ে যায় খানিক্টা। কথা ঘোরাতে চেষ্টা করে। তমালকৃষ্ণ মরিয়া, এই কথাগুলো মনস্বিতাকে বলে যেতে হবে। কেন? নিজেকে প্রশ্ন করে উত্তর খুঁজে পান না। বলতে পারেন না কিছুই। কেবল মনে হয়, কী এক অদৃশ্য জানাকে এক অজানা সত্যের কাছে তিনি রেখে যাচ্ছেন। এ যে ইতিহাস। এ তারই রক্তের ইতিহাস। এ তার অস্তিত্বেরও ইতিহাস। শুধু জানেন, সত্যের কাছে রেখে যেতে হবে তাকে এইসব বয়ান;
-শোনো, শুরুতেই পাকিস্তান আর্মি সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে করতে পূর্ব পাকিস্তানের সবগুলো শহর দখলে নেয়ার চেষ্টা করে। ২৫শে মার্চের রাত শেষ হলে এলো ২৬শে মার্চের দিন। ওদিকে রাজারবাগে পুলিশের প্রধান কার্যালয়ে আক্রমণ চলানো হলো। বাঙালি পুলিশেরা প্রতিরোধ করেছিল, কিন্তু আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত না থাকায় প্রতিরোধ তেমন শক্ত হয় নি। আরও শোনো, একই দিনে আওয়ামী লীগপন্থি পত্রিকা ‘দি পিপল’-এর অফিস আক্রমণ করে পাক-আর্মিরা। পত্রিকা অফিসের কর্মচারীরা পালাতে চেষ্টা করলে তাদের গুলি করে হত্যা করে। আর যা যা অবশিষ্ট ছিল তার সবকিছু পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। আওয়ামী লিগের নেতা, বিশেষ করে ছাত্রনেতাদের ওপর শিকারি কুকুরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। যুবা বয়সের যে কোনো বাঙালিকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে খুন করা হয় কারফিউ ভঙ্গের অভিযোগে। অথচ মধ্যরাতে আক্রমণ করার কারণে নিরীহ বাঙালি কিছুই বুঝে উঠতে পারে নি এবং সকাল হতে না হতেই কারফিউ – এই খবরটিও তাদের জানা ছিল না। এভাবে পূর্ব পাকিস্তানে আটচল্লিশ ঘণ্টা ধরে চলে অবিরাম রক্তস্নান।
-তার মানে পোড়ামাটি নীতিকেই গ্রহণ করেছিল পাকিস্তানি মিলিটারিরা বাঙালিদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্যে?
-ইয়েস, স্কর্চড আর্থ।
টুলটুল প্রশ্ন করে;
-সেটা আবার কী?
-এটা সামরিক কৌশল। সেনারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবার সময় প্রতিপক্ষের সামরিক বেসামরিক সব ধরনের মানুষকে হত্যা করার সাথে সাথে তাদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, অবকাঠামো, খাদ্য সরবরাহ কিংবা পানির উৎস, পরিবহন, যোগাযোগ মাধ্যম, শিল্পকারখানা, বিদ্যালয়, দোকান-পাট, বসবাসের ভবন, আসবাবপত্র সব কিছু পুড়িয়ে জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।
-ওহ্। এটাই ইয়াহিয়া-ভুট্টো গ্রহণ করেছিল পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যার শুরু ২৫শে মার্চের মধ্যরাতে। ঢাকায় ও প্রদেশের নানান জায়গায় পাকিস্তানি সেনারা যখন হত্যাযজ্ঞ শুরু করতো তখন একটা লিস্ট সাথে রাখতো।
-লিস্ট?
-হ্যাঁ। ওই যে তোমাকে বলেছিলাম না, ১৬টি চ্যাপ্টারে তৈরি নীল নকশার কথা? সেই নকশায় খুন করার প্রথম লক্ষ্য ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সৈনিকেরা, পুলিশ, ইপিআর, আধাসামরিক আনসার ও মুজাহিদ বাহিনির লোক, হিন্দু সম্প্রদায়, আ্ওয়ামী লীগের নেতৃত্বস্থানীয় সকল সদস্য, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ যুবক ও নারী, অধ্যাপক ও শিক্ষক – যারা বুদ্ধিজীবী। হিটলারের পর এ-বিশ্বে এমন পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞ আর একটিও দেখা যায় নি।
-আচ্ছা।
-ওরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিল, ‘বিচ্ছিন্নতার হুমকি থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানকে চিরদিনের জন্য ‘পবিত্র’ করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সেজন্য যদি বিশ লাখ কিংবা তিরিশ লাখ লোককে হত্যা করতে হয় এবং দেশটিকে যদি তিরিশ বছরের জন্য উপনিবেশ হিসেবে শাসন করতে হয়, তাহলে তাই করা হবে।
-একথা আবার কী করে জানলেন?
-কুমিল্লায় অবস্থিত ১৬ নম্বর ডিভিশনের প্রধান কার্যালয়ে মেজর বশিরের সামনেই এই কথাটি বলেছিল পাকিস্তান আর্মির একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা। পরে সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার একটা রিপোর্টে সেকথা লিখে গেছেন। মাসকারেনহাস ভারতে জন্ম গ্রহণ করা একজন সাংবাদিক ও লেখক। তিনি ঢাকা থেকে লন্ডনে পালিয়ে গিয়ে ১৯৭১ সালের ১৩ই জুন দ্য সানডে টাইমস পত্রিকায় এই তথ্য প্রকাশ করে বিশ্ববাসীকে পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যার আসল অবস্থাটি জানিয়ে দিয়েছিলেন।
টুলটুল আরও কৌতুহলী হয়ে ওঠে।
-আচ্ছা, শেখ মুজিবুর রহমানকে তো ওরা ধরে নিয়ে গেল।
-হুম। ঠিক সেই রাত থেকে পরদিন পর্যন্ত, বিশেষত ন’টি মাস ধরে চলল এই মানুষ-হত্যার হোলিখেলা। ২৫শে মার্চের রাতে অতর্কিত হামলায় বাঙালি সৈন্যরা, পুলিশ, বিডিআর, ইপিআর আর সাধারণ মানুষ হতভম্ব। সকাল হতেই জানা গেল শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়েছেন। বাঙালি তখন কিছুটা দিশেহারা। কিন্তু তারা জানতেন শেখ মুজিব নিশ্চয়ই এমন কিছু করে রেখে যাবেন, যার মধ্য দিয়ে বাঙালিরা সার্বিক মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ছিনিয়ে আনবে স্বাধীনতা। কিন্তু তখনও অব্দি অবস্থা থমথমে। কীভাবে এগোবে বাঙালিরা, যদিও তাদের সামনে রয়েছে ৭ই মার্চের সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ। বুদ্ধিজীবীরা ছাড়াও অসহায় নিরস্ত্র বাঙালিরা টের পেল গণহত্যা শুরু হয়ে গেছে।
-আর শেখ মুজিবুর রহমান?
-তিনি প্রাজ্ঞ রাজনীতিক। যখন জানলেন তার বাড়িতে আর্মি আক্রমণ করতে আসছে, সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি পালাবেন না, রাত আটটা কী নয়টার দিকে একটি ঘোষণা লিখলেন।
-ঘোষণা?
-হ্যাঁ। স্বাধীনতার চূড়ান্ত ঘোষণা। শেখ মুজিবুর রহমান লিখলেন,

This may be the last message – from today Bangladesh is independent. I call upon the people of Bangladesh wherever you might be and with whatever you have, to resist the army of occupation to the last. Your fight must go on until the last soldier of the Pakistani occupation army is expelled from the soil of Bangladesh and final victory is achieved.

-আচ্ছা! আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো মনস্বিতা।
-সাথে একটি নোটও ছিল এরকম :

Message embodying Declaration of Independence sent by Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman to shortly after midnight of 25th March, i.e. early hours of 26th March, 1971 for transmission throughout Bangladesh over the ex-EPR transmitter.

-তাহলে তিনি বুঝে গিয়েছিলেন কী হতে যাচ্ছে এবং তারপর কী ঘটবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাটি তিনি এজন্য লিখে রেখে প্রচার করতে দিয়েছিলেন যাতে তিনি বন্দী হলেও জনগণ যেন স্বাধীনতার যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
-কিন্তু কীভাবে এটি পৌঁছালো সাধারণ বাঙালিদের কাছে?
-শোনো, ঘোষণাটি তখনও বাংলার মানুষেরা জানে না। স্তব্ধবাক তারা। কী করবে! যদিও তখন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট নিজ নিজ জায়গা থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। মেজর খালেদ মোশাররফ লেফটেননেন্ট মাহবুবকে ডেকে বললেন;
-আমি এই মুহূর্তে স্বাধীন বাংলার আনুগত্য স্বীকার করলাম। এখনই সব সৈনিককে বলে দাও, আমরা আজ থেকে আর কেউ পাকিস্তানের অনুগত নই। স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দাও। এখন থেকে আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। সব সৈনিককে তৈরি হতে বল। প্রিয় সৈনিকেরা, আপনাদের প্রস্তুত হতে হবে, যে সংগ্রাম শুরু হলো সেটা কঠিন আর বিপদসংকুল।
-কিন্তু সাধারণ মানুষ, তারা কি করলো, তারা তো জানে না যে বাঙালি সৈনিকেরা প্রস্তুত। অস্ত্রহীন সাধারণ মানুষ ভাবছে, তারা কী এই সাজোয়া বাহিনি, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদে সুসজ্জিত পাকিস্তানি আর্মির সাথে শুধু শারীরিক শক্তি – লাঠি-বর্ষা-বল্লম কিংবা তীর-ধনুকে পেরে উঠবে? বিশেষত জাতি তখনো জানে না বাঙালি সেনারা বিদ্রোহ করেছে পাকিস্তান আর্মির বিরুদ্ধে। ২৭শে মার্চ বিকেল পাঁচটা হয়ে যায় ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে চট্টগ্রামে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাটি পৌঁছুতে।  ওই দিন রাতেই অষ্টম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রাম কালুরঘাট স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বাঙালির অবিস্মরণীয় নেতা বঙ্গবন্ধুর হয়ে পাঠ করেন স্বাধীনতার ঘোষণা। টুটুল, দেখ তো, আমার আলমারিতে হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত স্বাধীনতার দলিলপত্র নিয়ে প্রকাশিত একটা বই আছে। নিয়ে আসো। আমি সেখান থেকেই পড়ে শোনাবো। আসলে এই ঘোষণাটি পুরাপুরি না শুনলে বোঝা যাবে না, জিয়াউর রহমান নন, বঙ্গবন্ধুই ছিলেন বাংলাদেশের নেতা, মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা। টুটুল বইটা নিয়ে আসে। তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী পাতা উল্টে পড়তে থাকেন :

I am Mazor Zia, Provential Commander in Chief of the Bangladesh Liberation Army, hereby proclaims, on behalf of Sheikh Mujibur Rahman, the independence of Bangladesh. I also declare, we have already framed a sovereign, legal Government under Sheikh Mujibur Rahman which pledges to function as per law and the constitution. The new democratic Government is committed to a policy of non-alignment in international relations. It will seek friendship with all nations and strive for international peace. I appeal to all Government to mobilize public opinion in their respective countries against the brutal genocide in Bangladesh. The Government under Sheikh Mujibur Rahman is sovereign legal Government of Bangladesh and is entitled to recognition from all democratic nations of the world.

৭ই মার্চের ভাষণের সঙ্গে এই পাঠকে মিলিয়ে বাঙালিরা বুঝতে পারলো, শেখ মুজিব যে আহ্বান জানিয়েছিলেন – “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” – সেই সংগ্রাম এবার শুরু করতে হবে। তারা মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বুঝতে পারলো বাঙালি সেনাবাহিনি তাদের পাশে আছে। বঙ্গবন্ধু তো আগেই ঘোষণা করে গেছেন বাংলার স্বাধীনতা। এবার আর ঠেকায় কে। শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে গঞ্জে, সমস্ত জনপদে জ্বলে উঠলো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ! স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্যে যুবক সন্তানকে মা এগিয়ে দিলেন যুদ্ধে। মায়েদের কণ্ঠে শোনা গেল :
-কাপুরুষের মতো ঘরে বসে থেকো না। মাকে যদি ভালোবাসো, তাহলে স্বাধীনতা-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়। মুক্ত করো দেশকে।
স্ত্রী পাঠালেন স্বামীকে দেশ স্বাধীন করতে। বোন ভাইকে কপালে ভাইফোঁটা দিয়ে পাঠালো রণাঙ্গনে। নববিবাহিতাও পাঠালেন প্রিয়তম বরকে দেশের কাজে প্রাণ উৎসর্গ করতে। ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষক, জেলে, কামার, কুমোর, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যোগ দিল মুক্তিযুদ্ধে। কেউ বসে থাকলো না। যাঁরা শারীরিক কারণে যুদ্ধে যেতে পারলেন না, তারা বললেন :
-এ যুদ্ধে আমাদের চেয়ে দেশের বেশি প্রয়োজন তোমাদের। যাও, যুদ্ধে যাও। জয়ী হয়ে ফিরে এসো।

(চলবে)

পূর্ববর্তী লিংক (৭৯)

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-69/

পরবর্তী লিংক আসছে