শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮১]

0
213

পর্ব ৮১

বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে যাবার পর শুরু হলো তুমুল হত্যা। মানুষ নিধনযজ্ঞ। এ-ভূমি থেকে মানুষ নিশ্চিহ্ন করে কেবল মাটি নিয়ে আনন্দ করবে ইয়াহিয়া-ভুট্টোর দল। শুরু হলো পাকিস্তান পরিষ্কার অভিযান মানে শুদ্ধি অভিযান।
-পাকিস্তান শুদ্ধি অভিযান? এটা কেমন?
-পূর্ব পাকিস্তানকে হিন্দুমুক্ত এবং কমিউনিস্টপ্রভাবমুক্ত রাখা।
-বুঝতে পারলাম না। এমন তো শুনি নি।
-তোমরা তো জানতে চাও না। শেকড়ের খবর জানতে বড় অনীহা তোমাদের। তাই জানা হয় না এসব। এটা জনাতে হলে যেতে হবে তাহলে তোমাকে আরও আগে।
-মানে? কোথায়?
-বলছি, এ অনেক পুরানো কাহানি মনস্বিতা।
-বলুন না শুনি?
-১৯৪৭ এ ভারত ভেঙে দুই ভাগ হওয়া থেকেই পূর্ব পাকিস্তানে যেন বিছিন্নতাবাদী ও বামপন্থী আন্দোলন দানা বাঁধতে না পারে তার জন্য আমেরিকা তৎপর ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানও নিজেদেরকে কমিউনিস্ট নয় এটা বোঝাতে এবং হাত পাততে ছুটে গেছে আমেরিকার কাছে। কেবল ঢাল-তলোয়ারের জন্যই নয় ক্ষমতায় টিকে থাকার ছল পাকাপোক্ত করতেও তারা আমেরিকাকে বেছে নিয়েছে।
-আচ্ছা।
-ওদিকে পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিউনের প্রভাব বেড়ে চলেছে।
-আবার ১৯৪৮-এ তো মনে হয় চীনও আত্মপ্রকাশ করেছিল?
-হুম। তাতে আমেরিকার মাথাব্যথা আরও তীব্র হতে থাকে। দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে সমাজতন্ত্র যেন বিস্তৃতি লাভ না করতে পারে সে উদ্দেশ্যে তারা পাকিস্তানকে ব্যবহার করেছে।
-অহ হো। আচ্ছা
-সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে গুরুত্ব বিবেচনা করে ভারতের চেয়ে পাকিস্তানকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে থাকে আমেরিকা।
-ভারতকে কেন গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। সেটাই তো করার কথা?
-আরে না। শুরুতে ওরা ভেবেছিল নবগঠিত এই রাষ্ট্রটি হয়তো টিকবেই না। এ হলো প্রথম কথা। কিন্তু দ্বিতীয় ভাবনা ছিল অন্য।
-আবার দ্বিতীয় ভাবনা?
-হুম। পাকিস্তানের দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর সোভিয়েত মধ্যএশিয়া। মানে ইউরেশিয়ার যে অংশটা এশিয়াতে পড়েছে সেটা আর কি, বুঝলে না? তার কিছু দূরেই তো তুরষ্ক ও অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের দেশুগুলো।
-হুম। কিন্তু…
-বিষয়টি এখানেই, বোকা মেয়ে। ততদিনে যে সেখানে তেলের খনি আবিস্কৃত হয়ে গেছে।
-ওহ হো। নজর তাহলে তেলের খনিতে! আচ্ছা।
-আরব সাগরের পারে হওয়াতে পাকিস্তান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে সামরিক যান ও সেনা আনা নেওয়াও সহজ হবে। এটা আমেরিকার সামরিক পরিকল্পনাবিদরা ভালো করেই নকশা কেটে দিয়েছে।
-বুঝলাম।
-পাকিস্তানকে হাতে রাখতে পারলে সেখানে সামরিক বিমানঘাঁটি গড়ে তুলতে সহজ হবে।
-বিমানঘাঁটি কেন?
-আরে তাতে করে অনায়াসে সোভিয়েত রাশার ওপর বিমান হামলা করা সহজ হবে না?
-হুম।
-পাকিস্তানও স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল যে তারা সামরিক সাহায্যের বদলে আমেরিকা যা চাইবে তাই দিতে প্রস্তুত।
-বাহ্। এত সহজেই? যা চাইবে তাই?
-আমেরিকাকে আর পায় কে তখন। তারা সাফ সাফ জানিয়ে দিল কমিউনিজম ঠেকাতে হলে আমাদের সাথে এসো। জোট বাঁধো।
-পাকিস্তানও জানিয়ে দিল যে পাকিস্তান কোনোদিনও কমিউনিস্ট হবে না। বরং পূর্ব সীমান্তে যেন কমিউনিজম ঢুকতে না পারে তার প্রাচীর একমাত্র পাকিস্তানই। শক্ত প্রাচীর। যেমন পশ্চিম সীমান্তে তুরষ্ক। এবার বুঝেছ খেলাটা কোন জায়গা থেকে শুরু হয়েছিল, কত আগে থেকে?
-তাহলে তো পূর্ব পাকিস্তানের বামপন্থীরা শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
-হুম।
-একদম তাই। আরে, পাকিস্তান তো ব্যবহৃত হয়েছে। আসল মাথাব্যথাটাতো আমেরিকার।
-সমাজতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়ালে তেলের ওপর আধিপত্য করতে পারবে না তো।
-হুম।
-তখন ভারত ও পাকিস্তানের কমিউনিস্টরা মনে করতেন রাজনৈতিকভাবে দুর্বল পাকিস্তানে কমিউনিস্ট বিপ্লব খুব কাছেই। এ কারণে তারা পাকিস্তানের দুদিকেই সশস্ত্র বিপ্লবের প্রস্তুতি নেন। চীনে কমিউনিস্ট পা্র্টি আসায় তারা আরও সাহসী হয়ে ওঠেন।
-বাহ।
-না না। আনন্দিত হবার কোনো বিষয় নয় মনস্বিতা। বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের আগেই শুরু হয়ে যায় কমিউনিস্টদের ওপর নির্যাতন। সেনাবাহিনীর একটি অংশের সাথে যুক্ত হয়ে কমিউনিস্টরা সামরিক অভ্যুত্থানের চেষ্টায় আছে এমনভাবে তুলে ধরা হয়। সরকারি আক্রমণের শিকার হন কমিউনিস্টরা। ফলে অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান।
-হুম।
-আর কেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হিন্দুদের ওপর আগ্রাসন সেটা বলি।
-বলুন।
-কমিউনিস্ট বা কমিউনিস্ট ভাবাপন্ন বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশ ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। এছাড়াও কমিউনিস্টরা দুই বাংলায় অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনা করায় পাকিস্তান সরকারের উদ্বেগ বেড়ে যায়। তারা ইসলামি চেতনারও সম্প্রসারণ করার কথা ভাবতে থাকে। মানে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তুলবে এই আর কি। সিআইএ পূর্ব বাংলার মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলতে শুরু করে। এবং রাখঢাক ছাড়াই ঘোষণা করা হয়, সমাজতন্ত্র রুখতে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে সমঝতায় পৌঁছাতে হবে। এই হলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে মার্কিন হস্তক্ষেপের গোপন কথা। আর মুক্তিযুদ্ধে মৌলবাদী গোষ্ঠী পাকিস্তানের হয়ে বাংলাদেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতাও করেছে একই কারণে। আর তাই পাকিস্তান ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে শুদ্ধি অভিযান হিসেবেই ঘোষণা করেছে। তাদের ধারণা ভিন্নধর্মীরাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাঙনের মূল কারণ। তাই হিন্দুদের প্রথমে নিধন শুরু করে। আর বাদবাকি পাকিস্তানিদেরকে সাচ্চা মুসলিম বানিয়েই ছাড়বে ইয়াহিয়া-ভুট্টো। তাই হিন্দুদেরকে উৎপীড়ন-দেশছাড়া করা থেকে শুরু করে এমন কোনো জঘন্য কাজ নেই তাদের বিরুদ্ধে করে নি পাকিস্তান আর্মি। রাজাকার আলবদর আল শামসের সদস্য-নেতৃবর্গ-কর্মীবাহিনী, ওই যে বলেছিলাম না অক্সিলারী ফোর্সের কথা, এরা ছাড়া বাকি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী সকল মুসলিম তাদের হিসেবে সাচ্চা মুসলিম নয়। তাদেরকে খুন করে পাকিস্তান পরিশুদ্ধ করাই ছিল তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। যুদ্ধের প্রথম থেকেই পাক বাহিনীর অন্যতম টার্গেট ছিল অল্পবয়সী স্বাস্থবান যুবক যারা সম্ভাব্য মুক্তিযোদ্ধা বলে ধারণা করা হতো। তোমাকে তিনটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামের কথা বলি। তাহলে বুঝবে হত্যাযজ্ঞের স্বরূপ আর ভয়াবহতা।
মনস্বিতার মুখ রক্তাভ। বুকের গভীরে তার যাতনার নদীটি সুদূরে প্রসারিত। চোখে তার রূদ্ররূপ সহজেই অনুমিত। টুলটুল চেয়ে থাকে মনস্বিতার দিকে। ভেতরে ভেতরে প্রজ্জ্বলিত হাহাকারে ছেয়ে গেছে মনস্বিতার বাহ্যরূপ। সহজেই সেটা টুলটুলের চোখেও ধরা পড়ে। তমালকৃষ্ণও যেন ফিরে গেছেন সেই সব হত্যা রক্ত আর মানুষ খুনের হলির উৎসবে। টুলটুল একবার মনস্বিতার দিকে একবার বাবার দিকে তাকায়। তারপর প্রশ্ন করে;
-আলাদা করে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামেও আক্রমণ করেছিল?
টুলটুলের কথায় তমালকৃষ্ণ আবার বলেন;
-বলছিটা কী তাহলে? শোনো, চাঁদপুরের হাজিগঞ্জ। ব্রিটিশ আমল থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসাকেন্দ্র। কারণ এখান থেকে জলপথে স্থলপথে ও রেলপথে সারাদেশের সব জায়গায় যোগাযোগব্যবস্থা চালু ছিল। ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের বসবাস এখানে। অক্সিলারী বাহিনীর লিস্ট ও তৈরি করা ম্যাপ দেখে দেখে পাকিস্তানি খানসেনারা হাজিগঞ্জ বড়কুল ঠাকুরবাড়িতে প্রবেশ করে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে। তার আগে তারা কামানের গোলা নিক্ষেপ করে খেয়াঘাটের ওপার থেকে। যখন এপার থেকে কোনো প্রতিরোধ নেই বুঝতে পারে তখন নদী পার হয়ে ঢুকে পড়ে গ্রামে। শহর এলাকা থেকে ততদিনে বহু মানুষ পালিয়ে গ্রামে এসে আশ্রয় নিয়েছে এই ভেবে যে হত্যাযজ্ঞ হয়তো কেবল শহরকে কেন্দ্র করেই চলছে। কিন্তু গ্রামে এসেও রক্ষা হয়নি। গ্রামের নিরীহ সাধারণ মানুষ হতভম্ভ। তারা কখনো যুদ্ধ দেখেনি। এত গোলা এত গুলি তাদের ইহজীবনে প্রত্যক্ষদর্শন হয়নি কোনোদিন। এদিক-ওদিক পালাতে থাকে। ঠাকুরবাড়ির চারদিক ইটপাথরের বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা। বাড়ির ভেতরের শানবাঁধানো ঘাট বিশাল পুকুর সুন্দর নাটমন্দির বড় বড় তিনটি পূজার ময়ূর সিংহাসন। তাতে আছে অতিসূক্ষ্ণ কারুকাজ। দেখলেই প্রাণ জুড়িয়ে যায়। সিংহাসনে ছিল সোনা-রূপার ঝকঝকে বিগ্রহ। ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ করেই খান সেনারা নিবারণ চক্রবর্তীকে গুলি করে ফেলে দেয়। কোনো কথা নেই। এই দেখে পালাতে যান সীতারাম সাহা। দৌড়াতে থাকা অবস্থায় তাকে গুলি করে মাথার খুলি উড়িয়ে দেয়। সুন্দর ও দামী জিনিসগুলো লুঠ করে। তারপর সাদা গানপাউডার দিয়ে বাড়ির ভেতর আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুনের লেলিহান শিখা লক লক করে জ্বলে ওঠে ছাই করে নাটমন্দির আর ঠাকুর বাড়ির ঘরগুলোকে।
-কী বীভৎস! আহহা।
মনস্বিতা যেন হাহাকার করে ওঠে।
-আরও শোনো।
-মিলিটারির ভয়ে একটি ঘরে মা মেয়ে ছেলেসহ মোট চারজন দরজা বন্ধ করে বসেছিল। তাদের বের করার কোনো চেষ্টা না করেই বন্ধ ঘরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
-হায় আল্লাহ!
-খানসেনারা যখন গুলি করতে করতে এগুচ্ছিল তখন ব্রজলাল গোস্বামী ও রমা মালী দিঘির পাড়ের জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলেন। তাদের প্রত্যেককে টেনে হিঁচড়ে বের করে এনে ব্রাশফায়ার করে মেরে ফেলা হলো। কিছু নরনারী পুকুরের জলে শরীরটা লুকিয়ে কোনোমতো নাকটা উঁচিয়ে রেখে শ্বাস নিচ্ছিলেন। তাদের চোখে পড়ার সাথে সাথে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। রক্তের লালে পুকুরের জল লালে লাল…
মনস্বিতা দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস ফেলে;
-হায়! হায়!
-তারপর চলল তারা পদ্মলোচন সাহার বাড়ি। এ বাড়ির লোকেরা আগেই জেনে গেছিলেন খান সেনাদের কথা। তাই পাশের গ্রামে পালিয়ে গেছিলেন সবাই্। এক ঘন্টা ধরে খুঁজে কাউকে না পেয়ে মর্টারের গোলা দিয়ে বাড়িটি উড়িয়ে দেয়।
-খালি বাড়িটিও রেহাই পেল না?
-তোমাকে তো আগেই বলেছি এ স্কচড্ আর্থ।
-মনস্বিতা গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ে।
-বড়কুল গ্রামটি পোড়াতে পোড়াতে চলে রায়চো গ্রামের দিকে
-আরও!
-এরপর তিনটি গ্রাম থেকেই হিন্দুরা প্রাণভয়ে ভারতে পালাতে থাকে।
-মানুষ হত্যার এই খেলায় ওরা তাহলে পাশবিক আনন্দই পেয়েছিল?
-আনন্দটাকে পাশবিক বলবো নাকি জৈবিক বলবো, বলো! এ তো জীবনেরই খেলা!
মনস্বিতা আনতশিরে বলে;
-হুম।
-আসলে একটি দুটি মানুষ হত্যা তো গণহত্যা নয়, জানো তো?
-হুম।
-যত অল্প সময়ে যত বেশি প্রাণসংহার করা সম্ভব, গণহত্যার নীতি এটাই। তারা নিজেদের হন্তারক মনে করে না। মনে করে একটা বিশাল জনগোষ্ঠী অপরাধ করেছে। সেই অপরাধের শাস্তি দিচ্ছে তারা। তাই হন্তারক কখনো নিজেদেরকে হত্যাকারী মনে করে না। যখন ১৯৭০-এর নির্বাচনে পশ্চিম পাকিস্তান হেরে গেল, ছয়দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রণয়নে রাজি হলো না ভুট্টো, ওরা ভাবলো পূর্ব পাকিস্তানতো গেলই, এখন পশ্চিম পাকিস্তানকে বাঁচাতে হলে পূর্ব পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে হবে। যেন ইতিহাসে এর দৃষ্টান্ত থেকে যায়। আসলে কি জানো তো শাস্তি মানেই দৃষ্টান্ত স্থাপন। একসময় যখন মানুষ ব্যভিচারী ছিল। অত্যাচার আর অন্যায়ের মাত্রা মানবজাতিকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করছিল, তখন ভয় দেখানোর জন্যই শাস্তির বিধান প্রণীত হয়েছিল। শাস্তিটি যেন অন্যান্য অপরাধপ্রবণ মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। অন্য অপরাধীরাও যাতে এই দৃষ্টান্ত দেখে তাদের অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে। ১৯৭১-এর হ্যতাকারীরাও নিজেদেরে বিধানকর্তা মনে করে তাদের চোখে অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে চলছিল।
-হায়!
-ততদিনে গণহত্যার হাত থেকে বাংলার মানুষ যাতে বাঁচতে পারে সে জন্য ভারত তাদের পূর্ব পাকিস্তানের সব সীমান্ত চৌকি খুলে দিয়েছে। কারণ বঙ্গবন্ধু ধরা দেবার পরপরই আগে ঠিক করে রাখা পরিকল্পনা অনুসারে তাজউদ্দীন আহমদ ও ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম ভারত পৌঁছে গেছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করতে। বিএসএফের সর্ব ভারতীয় প্রধান কে এফ রুস্তমজি নিজে এসে তাদেরকে অভ্যর্থনা করে নিয়ে যান। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করেই তাজউদ্দীন আহমদ জানতে পারেন যে শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদ ইন্দিরা গান্ধীকে এটা বোঝাতে সমর্থ হয়েছিলেন, এ-যুদ্ধ বাংলাদেশের যুদ্ধ। সেনানিবাস ছাড়া সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান আজ মুক্ত। কিন্তু তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছিলেন, এই যুদ্ধকে পাকিস্তান আন্তর্জাতিকীকরণ করার চেষ্টা করবে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। ইন্দিরা গান্ধী যেন এ-যুদ্ধটা বাঙালিদের করতে দেন। ইন্দিরা গান্ধী খুব খুশি হয়েছিলেন তার কথায়। এবং সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছিলেন। শরনার্থী শিবিরের লাখ লাখ পালিয়ে যাওয়া বাঙালিকে আশ্রয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়ে, এমনকি ভারতীয় সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের মিত্রশক্তি হিসেবে বাংলার সেনাদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ইন্দিরা সরকার সে আশ্বাসের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। যা হোক ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করে তাজউদ্দীন আহমদ ও আমীরুল ইসলাম ফিরে আসেন কলকতায়। লর্ড সিনহা রোডের অতিথিশালায় বসে ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও অন্য নেতাদের সাথে আলোচনার পর আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার গঠনের সবকিছু চূড়ান্ত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দী থাকা অবস্থায় দেশের রাষ্ট্রপতি করলে তার জীবনের ঝুঁকি কমবে নাকি বাড়বে সে বিষয়টি আমলে নিয়েই তাকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হল। কারণ তিনি রাষ্ট্রপতি হলে তার জীবনের নিরাপত্তার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বাড়বে। তাছাড়া তিনিই তো একমাত্র বৈধ ও সাংবিধানিক নেতা। আর প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। পূর্ব বাংলার অসহায় মানুষ তখন বাধাহীনভাবে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নিচ্ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রীই প্রথম কোনো সরকারপ্রধান যিনি পূর্ব পাকিস্তানে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদ করেন। ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক তৎপরতায় বৃহৎ শক্তি রাশিয়াও পূর্ব পাকিস্তানে গণহত্যার শিকার আর্তমানবতার পক্ষে এসে দাঁড়ায়। এদিকে সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে চলছে তুমুল গণহত্যা।
২ এপ্রিল, ১৯৭১ সাল। এদিন ঢাকার দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার অপর তীরে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় সমবেত নিরীহ আশ্রয় প্রার্থীদের উপর পাকসেনাবাহিনী আক্রমণ চালায়। ভোর থেকে গণহত্যার উদ্দেশ্যে কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরায় সৈন্য সমাবেশ করতে থাকে এবং কেরানীগঞ্জকে চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে। তারা গভীর রাতে বুড়িগঙ্গার অন্য তীরে মিটফোর্ড হাসপাতাল দখল করে নেয় এবং হাসপাতাল সংলগ্ন মসজিদের ছাদ থেকে আনুমানিক ভোর ৫টায় ফ্লেয়ার ছুঁড়ে গণহত্যা শুরু করার জন্য সংকেত প্রদান করে। এদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তারা প্রায় ৫ হাজার মানুষকে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। পুড়িয়ে ছাই করে দেয় গ্রামের পর গ্রাম। মান্দাইলডাকের সড়কের সামনের পুকুরের পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনী ৬০ জন লোককে একসঙ্গে লাইনে দাঁড় করিয়ে হত্যা করে। সেদিনের একটা ঘটনা শোনো। নিজের চোখে দেখা। কবি নির্মলেন্দু গুণ বলছেন;
-হিন্দু মুসলমান কেউই সেদিন বাঁচতে পারে নি। সকলের রক্ত এক হয়ে ভেসে গেছিল সেদিন শুভাড্যা গ্রাম। একটি ডোবার জলের ভেতর মাথা গুঁজে বসে আছি আমি। আর দেখছি করুণ হত্যাদৃশ্য। ঠিক তখনই শেলের আঘাতে একজন ধাবমান মানুষের দেহ থেকে মাথাটি বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে এসে পড়েছে আমি যে ডোবায় লুকিয়ে ছিলাম তারই জলে। কিন্তু কী অদ্ভুত ঘটনা, আমি সামনে তাকিয়ে দেখি মস্তকবিহীন সে দেহটি তখনও দৌড়াচ্ছে। তার মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যেন সে খেয়ালই তার নেই।
টুলটুল এবার খানিক তটস্থ বিস্রস্ত হয়;
-হায়! কি বলছ তুমি। সত্যি ঘটনা এটি?
-একেবারে সত্যি। গুণ নিজে এই ঘটনাটির বয়ান করেছেন;
-তারপর কি হলো বলুন!
-আহ হা। মস্তকবিহীন দেহটিকে নিয়ে কিছুটা দূরত্ব অতিক্রম করার পর লোকটি আর পারল না, তার কবন্ধ দেহটি লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। মস্তকবিহীন দেহ থেকে ফিনকি দিয়ে ছোটা রক্তস্রোতে ভিজে আছে আজো শুভাড্যার মাটি।
এই কাহিনিটি শুনে মনস্বিতা যেন প্রলাপ বকতে শুরু করে;
-কী করুণ। কী বীভৎস, হায়, হায়!
-আরো বাকি আছে মনস্বিতা। আরোও অজস্র। অজস্র মৃত্যু। অজস্র হত্যা। অজস্র নারকীয় পৈশাচিক বীভৎসতা বাকি রয়ে গেছে।
-মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী। এই নরপশুর নেতৃত্বেই রাওফরমান, রহিম খান, টিক্কা খানের মতো পাকিস্তানী জেনারেল এদেশের উপর চালায় শতাব্দীর ঘৃণ্যতম গণহত্যা। মাঠে ঘাটে নদীর বাঁকে জলাভূমিতে এবং সেনা ক্যাম্পগুলোর পাশে হাত বাঁধা তরুণদের মরদেহ ছিল তখনকার প্রাত্যহিক দৃশ্য। অবাঙালি সেনারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলার নিরীহ জনগণকে হাত বেঁধে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে কিংবা তলোয়ার দিয়ে দেহ থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে কখনো টুকরো টুকরো করে নিকটের কোনো ড্রেন, ম্যানহল, ডোবায় নিক্ষেপ করতো।
-আচ্ছা একটা কথা আমার মাথায় ঘুরছে।
-বল।
-হত্যার এই রকমভেদ বা অস্ত্রের নির্ধারণ, মানে কি দিয়ে কীভাবে খুন করবে তাও কী নীল নকশার অন্তর্গত ছিল?
-গবেষক বা তাত্বিকরা বলছেন, যে পদ্ধতিতে তারা একদা তাদের নিজ বাসভূমে যেমন ধরো, বিহার বা অন্যান্য জায়গায় অত্যাচারিত-নির্যাতিত হয়েছিল, ঠিক একই পদ্ধতি তারা প্রয়োগ করেছে বাঙালি নিধনযজ্ঞে। সাথে এইসব বিকৃত রুচির জেনারেলদের পরিকল্পনায় সংঘটিত হয় ধর্ষণের মহোৎসব। কেউ কেউ লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধে প্রকৃত ধর্ষণের সংখ্যা হয়ত দশ লক্ষও হতে পারে। সম্ভবত পৃথিবীর যুদ্ধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম সময়ে সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের রেকর্ডটাও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। আর এই ধর্ষণ উৎসবেরও হালালাইজেশানটা করা হয়েছিলো ধর্মের নামে।
ব্রিগেডিয়ার আবদুল রহমান সিদ্দিকী তার East Pakistan The End Game বইতে লেখেন, “নিয়াজী জওয়ানদের অসৈনিকসুলভ, অনৈতিক এবং কামাসক্তিমূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতেন। ‘গতকাল রাতে তোমাদের অর্জন কি আমার বাঘেরা?’ চোখে শয়তানের দীপ্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করতেন তিনি। অর্জন বলতে তিনি ধর্ষণকেই বোঝাতেন।”
.সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানের সকল ডিভিশান কমান্ডারের কনফারেন্সে এক অফিসার তুলেছিলেন পাকিস্তানি সেনা কর্তৃক বাঙালি নারীদের ধর্ষণের প্রসঙ্গ। নিয়াজী তখন সেই অফিসারকে বলেন,
-আমরা যুদ্ধের মধ্যে আছি। যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নিও।
তারপর তিনি হেসে বলেন,
-ভালই তো হচ্ছে, এসব হিন্দুয়ানি মুসলমান বাঙালির রক্তে সাচ্চা মুসলিম পাঞ্জাবি রক্ত মিশিয়ে তাদের জাত উন্নত করে দাও।
আর এই ধর্ষণের পক্ষে তিনি যুক্তি দিয়ে বলতেন,
-আপনারা কিভাবে আশা করেন একজন সৈন্য থাকবে যুদ্ধ করবে মারা যাবে পূর্ব পাকিস্তানে এবং যৌনক্ষুধা মেটাতে যাবে ঝিলমে?
ধর্ষণে লিপ্ত এক পাকিস্তানি মেজর তার বন্ধুকে এই নিয়ে এরকম একটা চিঠি লিখেছিল;
-আমাদের এসব উশৃঙ্খল মেয়েদের পরিবর্তন করতে হবে যাতে এদের পরবর্তী প্রজন্মে পরিবর্তন আসে, তারা যেন হয়ে ওঠে ভালো মুসলিম এবং ভালো পাকিস্তানি।
স্বাধীনতার পর ধর্ষিতা বাঙালি মহিলাদের চিকিৎসায় নিয়োজিত অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার জেফ্রি ডেভিস গণধর্ষণের ভয়াবহ মাত্রা দেখে হতবাক হয়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে আটক পাক অফিসারকে জেরা করেছিলেন যে তারা কিভাবে এমন ঘৃণ্য কাজ-কারবার করেছিলো। অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক বিচলিত হলেও পাক অফিসারদের সাচ্চা ধার্মিক হৃদয়ে কোন রকম রেখাপাত ঘটেনি। তাদের সরল জবাব ছিল,
-আমাদের কাছে টিক্কা খানের নির্দেশনা ছিলো যে একজন ভালো মুসলমান কখনই তার বাবার সাথে যুদ্ধ করবে না। তাই আমাদের যত বেশী সম্ভব বাঙালি মেয়েদের গর্ভবতী করে যেতে হবে।
নিয়াজী ধর্ষণে তার সেনাদের এতই চাপ দিতেন যে তা সামলে উঠতে না পেরে কোনো এক সেনা অফিসার আত্মহত্যা করতে বসেন।
-হায় আল্লাহ।
-এভাবেই সম্মুখ যুদ্ধে যত না প্রাণ দিয়েছে বাঙালি, তার চেয়ে কয়েক লক্ষ বেশি মানুষ প্রাণ দিয়েছে ধর্ষণে যেখানে সেখানে অতর্কিত হত্যায়। ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে এপ্রিল/মে নাগাদ মানুষ খুন হয়েছে ১০ লক্ষ। আর এভাবেই প্রাণ দিতে দিতে নয় মাস শেষে রক্তে পিচ্ছিল বাংলাদেশে ওঠে স্বাধীনতার সূর্য।
মনস্বিতার চোখ বেয়ে ঝরে পড়ে অশ্রু। তমালকৃষ্ণ মনস্মিতার মাথায় স্বস্নেহে হাত রাখেন;
-আফসোস করো না মনস্বিতা। এসবই জৈবিক। জন্ম-খাদ্যগ্রহণ, মানব মানবীর প্রেম-বিশ্বাস-লেনদেন, স্বার্থ-স্বার্থপরতা-ভালোবাসা, যুদ্ধ-খুন-হত্যা এবং শাস্তি সবই জৈবিক মনস্বিতা, সবই জীবন সম্পর্কিত। সকলই রাজনৈতিক। মানুষ মাত্রই রাজনৈতিক মনস্বিতা। এভাবে দেখ। মানুষের জীবনও তাই এইসব জটিল জৈবিক রাজনৈতিক ঘূর্ণাবর্তের পাকে পড়ে কখনো উদ্ভাসিত কখনো বা নিমজ্জিত। এই উদ্ভাসন আর নিমজ্জনের চাকায়ই বেঁধেছে জীবন। এভাবেই এক দেশ থেকে আর এক দেশ। এক জীবনযাপন প্রণালী থেকে আর এক যাপনপ্রণালী। এক শেকড় থেকে উৎপাটিত মূল অন্য মাটিতে। স্বদেশের মানচিত্রও তাই বদলে যায় ঘটনায়। মূল ভূখণ্ড থেকে উৎপাটিত হয় মানুষ। বদ্ধমূল মানুষও সমূলে উৎপাটিত হয়ে ভেঙে পড়ে বৃক্ষের মতো। আহ্ কী যেন এক তুমুল আর্তনাদ অজানিতেই ভেঙে ফেলে দিতে চায় তমালকৃ্ষ্ণরাজ চক্রবর্তীকে। এ-যুদ্ধ এক অর্থে তার। আবার অন্য অর্থে তার নয়। স্বভূমে সংগঠিত এই ভয়ানক যুদ্ধের আঁচ কি তিনি ভারতে বসেও এড়াতে পেরেছেন! স্বদেশের প্রতি তার দায়হীনতাও মেনে নিতে পারেন নি। বাকিটাতো তার ব্যক্তিগত জীবন দিয়েই শোধ দিতে হচ্ছে। তমালকৃষ্ণের চোখে উদাসীন দৃষ্টি। শরীর যেন ব্যথায় কুঁকড়ে উঠেছে। এ-কোন ব্যথা! মনস্বিতা বুঝতে পারে না। মন আর শরীর দুটোর ব্যথা দুই। কিন্তু এই মুহূর্তে সব মিলেমিশে একাকার। বোঝা যায় না কিছুই। তবু মনস্বিতা চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ে;
-বুকে ব্যথা বেড়েছে? ডাক্তার ডাকার দরকার? টুলটুল ডাক্তার ডাকুন।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (৮০) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-70/

পরবর্তী পর্বের (৮২) লিংক আসছে