শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮২]

0
221

পর্ব ৮২

টুলটুলের চেয়ে বেশি ব্যথা বোধ করি এই মুহূর্তে মনস্বিতার বুকেই বেজে চলেছে। তাতেই এমন তটস্থতা;
-টুলটুল কী ভাবছেন অত? ডাক্তারকে ফোন করুন না।
মনস্বিতা একমাত্র জানে তমালকৃষ্ণের ফুসফুসের ইনফেকশনের কথা। তাই উত্তেজনাটা তারই চরমে। ততক্ষণে দাহ্যহৃদয়ের যাতনার আশ্লেষে তমালকৃষ্ণের নুয়ে পড়া মাথাটা হঠাৎ আবার উঁচু শিরে উঠে আসে;
-আমি ঠিক আছি। ডাক্তার ডাকার দরকার নেই।
তমালকৃষ্ণের কথায় মনস্বিতা বসে পড়ে তার পাশে ঠিকই। কিন্তু আশ্বস্ত হতে পারে না পুরোটা। বুকের ওপর রাখা তমালকৃষ্ণের ডান হাতটার ওপর হাত রাখে। কণ্ঠে যেন অযুত কালের স্নেহের বর্ষা ঝরে পড়তে থাকে;
-বুকে ব্যথা?
সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাকায় তমালৃকষ্ণের দিকে। তমালকৃ্ষ্ণ যেন এক দুর্ভেদ্য অন্ধকার পার হয়ে সদ্য নেমে এসেছেন অন্য কোনো পূণ্যভূমিতে। এখানে যেন তার অনাদি কালের পাপ কর্মের গ্লানি মাতৃভূমির প্রতি দায়হীনতা কিংবা প্রিয়তরের ক্রোধ আত্মজের অবহেলার যাবতীয় জটিল যন্ত্রণারা স্খলিত হয়ে উদ্ভাসিত হয়েছে এক নতুন আনন্দলোক। মনস্বিতার চোখের গভীরে এইমাত্র জন্ম নিয়েছে যে জলকণাটুকু, সেটিও তাই তমালকৃষ্ণের অন্তর্দৃশ্যে মূর্ত। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন সেদিকে। চোখে ভেসে ওঠে সাত মাসের অপুষ্ট এক কন্যা সন্তানের মুখ। ক্রমে সেই মৃত কন্যাটি সজীব হয়ে বৎসর বৎসর পার করে তুমুল প্রাণের শিহরণ ছড়াতে ছড়াতে এসে মুছে যায় মনস্বিতার সজল চোখের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা একটি মায়াবী মুখের ছায়াতে। ততক্ষণে দৃষ্টিগ্রাহ্য মনস্বিতার কালো চোখের আলোতে জলের প্রপাত। টুলটুল বিস্ময়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ়্। ভুলে যায় কীই-বা তার করণীয়। মনস্বিতার স্বর একটু উচ্চগ্রামেই বোধ করি পৌঁছেছিল, তমালকৃষ্ণের অবস্থাদৃষ্টে। তাই মাধবীও উৎকণ্ঠা নিয়ে বের হয়ে আসেন। কিন্তু আপাত শান্ত পরিস্থিতি দেখে বুঝতে পারেন, তেমন কিছুই ঘটে নি এখানে;
-কিছু কী ঘটেছে এখানে?
-না তো।
তমালকৃষ্ণের উত্তরে আশ্বস্ত হতে পারেন না। চোখ ফিরিয়ে ফিরিয়ে তাকান এদিকে-সেদিক। অবশেষে ক্লান্ত স্বর;
-দুপুরের খাবারটা সেরে নিলে ভালো হয়। বেলা অনেক। সূর্য হেলে পড়েছে অনেকক্ষণ।
মাধবী এসে পড়াতে আর বুকের ব্যথার গভীরতা কিংবা আঘাত কোনোটাই ঠিকঠাক জানা হয় না মনস্বিতার। খাবার টেবিলে সকলেই নিশ্চুপ। তমালকৃষ্ণই আবার কথা বলেন;
-বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূর্যর জন্ম হয়ে গেছে তখন। উদিত হতে কিছু সময় মাত্র বাকি। ১৯৭১ সাল। ওপারে পশ্চিম বাংলায় বিপ্লব কোণঠাসা। মাধবীর বাবা টুলটুল আর মাধবীকে নিয়ে তার বাড়ি ছাড়তে বলে দেবার পরও বেপরোয়া। পালাবো না। এই শপথ। পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজে মরছে কমরেড চারু মজুমদারকে। জেলগুলো উপচে পড়ছে নকশাল বন্দীতে। নভেম্বর মাস। শেষ দিক। আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। সকাল আটটা বেজে তিরিশ মিনিট।
বন্দী নকশালরা চা বানাচ্ছিলেন। একজন অন্য এক ওয়ার্ডের আর এক বন্দীর সাথে কথা বলছিলেন টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে। এটা ঘটে থাকে জেলের সেলগুলোতে। তা এমন কোনো বিশেষ ঘটনা নয়। কিন্তু সেদিন জেলসেপাই কী কারণে ক্ষেপে যায়;
-এই শালা, চোপ। কথা বন্ধ।
বন্দীর কানে ঢোকে না জেলসেপাইয়ের কথা। মানে সে পাত্তা দেয় না। পেছন থেকে সেপাই বন্দীর পিঠে বসিয়ে দেয় লাঠির এক ঘা। বন্দী নকশাল তাতে উত্তেজিত হয়ে গলা টিপে ধরে জেল সেপাইয়ের। ব্যস। বেজে ওঠে পাগলা ঘন্টি। বন্দীরা সকলে নেমে আসে খোলা জায়গায়। আর অন্যদিকে জেলহত্যাকারী সেপাই ও দালাল কয়েদিদের থেকে বাছাই করা লোকজন নিয়ে ৪০০ জনের জেল কর্তৃপক্ষের বিশাল এক বাহিনী মুখোমুখি। সবার হাতে পাঁচ হাত লম্বা লাঠি এবং ওয়ার্ডের বাইরে ইট ও পাথরের টুকরা। জেলের বাহিনী সরাসরি ঢুকে পড়তে পারে না কয়েদিদের সেলে। কারণ রেলিং গেটের তালা বন্ধ। যে কয়েদির কাছে চাবি ছিল সে চাবি নিয়ে সরে পড়েছে। কারণ সে চায় নি বন্দীরা মরুক। তাই ইটপাটকেল আর লম্বা লাঠির আঘাত চলতে থাকে অনবরত। কেউ কেউ লম্বা লাঠি কেড়ে নেন। লেপ কম্বল গায়ে দিয়ে ইট-পাথরের আঘাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে চেষ্টা করেন। ততক্ষণে সেপাই বাহিনীর কয়েকজন পাণ্ডাগোছের কয়েদি এসে তালা খোলার চেষ্টা করেন। এর মাঝে যারা যারা পারেন, তারা দোতালায় উঠে প্রবেশের একমাত্র লোহার গরাদ দেয়া দরজাটা চাদর দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেয়। তারা ওপরে উঠে আসার সময় সেপাই বাহিনীর নিক্ষেপ করা ইট পাথর যা-যা পারে কুড়িয়ে আনে। ততক্ষণে নিচতলার লোহার গারদের তালা খুলে জেলসেপাইরা ঢুকে পড়েছে। বন্দীদের মধ্যে যারা তাড়াহুড়ো করে দোতলায় উঠতে পারে নি তারা পরে মারাত্মক রকম লাঠিচার্জের কবলে। দ্রুততম সময়েই জেলসেপাই বাহিনী দোতলায় উঠে আসে। বন্দীরা ভেতর থেকে কুড়িয়ে আনা ইট-পাথর ছুঁড়তে থাকলে আহত হয় কেউ কেউ। লাঠি দিয়ে আঘাত করার চেষ্টা করলে ভেতর থেকে বন্দীরা লাঠি কেড়ে নেন। তখন জেলসেপাইয়ের লোকজন কেরোসিনে ভেজানো কাপড়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে চাদর দিয়ে আটকানো গরাদের বন্ধ খোলার চেষ্টা করেন। আর পারা যায় না। ঢুকে পড়ে। বন্দীরা কম্বল আর চাদরে মাথা মুড়িয়ে নিজেদের রক্ষা করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যেতে থাকে। বয়স্কদের নিজেদের পেছনে লুকিয়ে রাখে আঘাতের হাত হতে রক্ষা করার জন্য। বন্যার জলের মতো ঢুকে পড়ে জেলসেপাই বাহিনী দোতলার গরাদ খুলে। চলতে থাকে লোহার রড দিয়ে বেধরক পেটানো। যারা কোনোমতে দাঁড়িয়ে ছিল তাদের পায়ের তলায় অন্যদের গা থেকে ঝরে-পড়া রক্তে পিচ্ছিল ততক্ষণে ফ্লোর। দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না আর। নিজেদের সহবন্দীদের রক্তে আছাড় খেয়ে পড়ছে একের পর এক আত্মরক্ষায় প্রাণান্ত বন্দীরা। কী যে দুঃসহ এই দহন! এভাবে আধাঘণ্টার আক্রমণে বন্দী নকশাল সকলেই প্রায় সংজ্ঞাহীন অর্ধমৃত। ততক্ষণে জেলসেপাইরা নকশাল অমিয় চ্যাটার্জীকে বের করে নিয়ে যায়। হাসপাতালের সামনে আহত অবস্থায় ফেলে রাখে। তারপর তার বুকের ওপর একটা মোটা বাঁশ রেখে দুপাশে চারজন চারজন করে দাঁড়িয়ে লাফাতে থাকে। আহত অমিয় চ্যাটার্জির বুকের ওপর চারজন মানুষের ভারবহ লাফগুলো আর নিতে পারেন না বেশি সময়। এভাবেই শেষ হয়ে আসে অমিয় চ্যাটার্জীর জীবনদীপ। স্বপন দাসকে দোতলা থেকে উপুড় করে ছুঁড়ে ফেলা হয় নিচে। একটা লোহার পাইপের ওপর গিয়ে পড়ে তার বুকটা। একটা আর্ত চিৎকার শোনা যায়। তারপরই চিরতরে নিশ্চুপ হয়ে যান স্বপন দাস। রাজকুমার ছিলেন এমনিতেই অসুস্থ, শয্যাশায়ী। তাকে মারতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি জেলসেপাই বাহিনীকে। কয়েকটা বড় লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত, ব্যস। গৌরকে অবশ্য লাঠি দিয়ে আঘাত করতেই একজনকে বাগে পেয়ে কামড়ে ধরেছিল তার টুটি। পেছন থেকে এক দালাল লাঠি দিয়ে আঘাত করায় চিৎ হয়ে পড়ে যায় মাটিতে। আর সঙ্গে সঙ্গে বুকের ওপর দশটা লাঠির আঘাত। জিভ বেরিয়ে পড়ে। ওভাবেই শেষ। হাসপাতাল থেকে অপারেশনের নামে আনা ছুরি কাঁচি দিয়ে ফালা ফালা করে মুখের মাংস তুলে নেয়া হয় প্রলয়েশ মিশ্র, মনোজ সাহা, অজয় দের। লোহার রড দিয়ে উপুর্যুপরি আঘাতে বাকিদের দাঁত ভেঙে দেয়া হয়। একজন বন্দীও অক্ষত নয় ততক্ষণে। সাড়ে তিন ঘণ্টা এভাবে আঘাতে আঘাতে মৃত ও হাত-পা-ভাঙা মাথাফাঁটা বন্দীদের হাসপাতালে পাঠানোর প্রহসন শুরু হয়। এইভাবে বিনা কারণে নিরস্ত্র ও অসহায় বন্দীদের পাশবিকভাবে হত্যার ঘটনাও পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
তমালকৃষ্ণের গলা ধরে আসে। মাধবীর মুখ গম্ভীর। বিশেষত নকশাল কাহিনী তাকে থমথমে করে দেয়। তাকে বিস্রস্ত-বিষন্ন করে তোলে। তিনি মুখোমুখি বসে আছেন খাবারের টেবিলে। খানিকটা দূরে মনস্বিতার মুখোমুখি টুলটুল। মনস্বিতা কি বলবে বুঝে পায় না। এতটা বর্বর আর হিংস্র পৃথিবীর ইতিহাস! স্বার্থ! হায়! কিছু বুর্জোয়ার হাতে ক্ষমতা। তাদের এই হিংস্রতা স্বার্থপরতার মাঝে তার মতো এবং আরও লক্ষ লক্ষ শান্তিকামী মানুষের বসবাস। কী করবে তারা! সম্ভব হবে কী এ পৃথিবীতে আর কখনো শান্তির পতাকা ওড়ানো? এসব ভাবতে ভাবতেই তমালকৃষ্ণ আবার বলতে শুরু করেন;
-তখনও আমি বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাই নি। আসি নি।
-কবে ফিরলেন?
মনস্বিতার প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই মাধবীর সুতীক্ষ্ণ বাণ এসে বিঁধে তমালকৃষ্ণের বুকের ঠিক মাঝখানটাতে;
-বাংলাদেশে ফেরো নি তখনও, কী লাভ হয়েছে তাতে?
তমালকৃষ্ণ অবাক চোখে তাকান মাধবীর দিকে। মাধবীর ভেতরে এত ক্রোধ এত জ্বালা যেন আজ কথায় কথায় যেন পারগেশনের সুযোগ পায়। তিনি এতটা ক্ষুব্ধ, এতকাল। ঠান্ডা চোখ মেলে তমালকৃষ্ণ তাকান একবার মাধবীর চোখে। সেখানে প্রজ্বলিত আগুন আজ এত বছর পরেও জ্বলছে উন্মার্গ দহনে। তবু অস্থির নন তমালকৃষ্ণ রাজ চক্রবর্তী;
-ফিরে কী লাভ হয়েছে মাধবী? ফিরে পেয়েছ তোমার সব?
মনস্বিতা অধোবদন। স্বামী-স্ত্রীর বহু বছরের আবেগ-নিরাবেগ আর দ্বন্দ্বের পূণর্বার উন্মোচনের মাঝখানে তার অন্তত থাকা ঠিক নয়। সঙ্কোচে পড়ে যায়। একবার টুলটুলের দিকে তাকায়। তারপর চেয়ার ছাড়তে চায়;
-আমি আসছি একটু ওঘর থেকে।
-তুমি বসো মনস্বিতা।
তমালকৃষ্ণের এই আদেশে মনস্বিতা নির্বাক। একবার মাধবীর দিকে তাকায়। মাধবী নির্বাক। তার যেন কিছুই যায় আসে না মনস্বিতার থাকা না থাকায়;
-আমার সব? কী বলতে চাইছ তুমি?
-তুমি ফিরে পেয়েছ তোমার প্রাপ্য সব, মাধবী? ফিরে পেয়েছ সন্তানের অধিকার, উত্তরাধিকার? বল?
মাধবীর আহত হৃদয় ভেঙে চৌচির। কে বুঝবে এ যাতনার ভার? কে আছে ধারণ করবে এই দুঃসহ যাতনার অবশেষ? অবশেষে সব গিয়ে পড়বে ছেলেটারও ওপর। এই তার ভয়। আর কী আছে চাইবার। জগতে যার-যার কর্মফল সেই ভোগ করে। তার কর্মফল তো তাকেই ভোগ করতে হবে।
-ফিরে পেয়েছ দেশ? মাটি? সমূল অধিকার?
মাধবীর মাথা নিচু হয়।
-এ মাটি থেকে সে-মাটি। এ দেশ থেকে সে-দেশ। এ ভূখণ্ড থেকে সে-ভূখণ্ড। কী লাভ। কী অর্জন? জেদ আক্রোশ বিদ্বেষ স্বার্থচিন্তা যুদ্ধ হত্যা কখনো শান্তি আনে না মাধবী। কক্ষনো নয়।
একটানা কথাগুলো বলে একটা প্রলম্বিত শ্বাস টানেন তমালকৃষ্ণ। তারপর আবার ধীরোদাত্ত তার কণ্ঠ;
-ততদিনে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, শোনো মনস্বিতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ঠিক তার পরপরই, ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারী পাকিস্তান জেল থেকে ছাড়া পান বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে সরাসরি লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দর থেকে ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে আসেন লন্ডনে ভারতের হাই কমিশনার আপা ভাই পান্থ। মিস্টার পান্থ তাকে ‘ইয়োর এক্সিলেন্সি’ বলে সম্বোধন করায় শেখ মুজিবুর রহমান খুব অবাক হলেন।
-কেন? তিনি অবাক হলেন কেন?
-আরে তাকে তো জেলে বাংলাদেশের সমস্ত খবরাখবর দেয়া হয় নি। সবকিছু থেকে অন্তরালে রাখা হয়েছিল।
-আচ্ছা।
-শেখ মুজিবুর রহমানকে তখন আপা ভাই জানালেন যে আপনার অনুপস্থিতিতে আপনাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছে।
-হুম।
-আমি ভাবছি কী করবো। মাধবীর তুমুল চেষ্টা কী করে বাংলাদেশে চলে আসা যায় আমাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে। আমি গোঁ ধরি মনে মনে। দেখি, কমরেড কী করেন!
-আপনার ভয় করে নি? ততদিনে যদি ধরা পড়তেন। জেলে যেতেন?
তুমুল হাসির ঝর্ণা ছুটিয়ে হাসেন তমালকৃষ্ণ। সজোরে হাসেন, মনস্বিতার কথা শুনে?
-হা হা হা। মনস্বিতা বিপ্লবীর ভয় ডর থাকে না। হা হা।
মনস্বিতা লজ্জা পায়। সত্যিই। এ বড় অদ্ভুত কাণ্ড হয়ে গেল।
-শোনো। ১৯৭২ সাল। জুলাই মাস। রুনু সর্বশক্তি নিয়োগ করলেন চারু মজুমদারকে যে-কোনো মূল্যে গ্রেফতার করবেন।
-রুনু? কে তিনি?
-পুলিশ ডিপার্টমেন্টের তরুণ তুখোর অভিজ্ঞ গোয়েন্দা অফিসার রুনু গুহ নিয়োগী।
-আচ্ছা।
চারু মজুমদার ঊনসত্তর সাল থেকেই ভীষণ অসুস্থ। ফুসফুসের ইনফেকশন বাড়তে থাকে। ব্যথা বাড়লে প্যাথিড্রিন চলে। অক্সিজেন সিলিন্ডারও লাগে। তিনি ভুগছিলেন মায়োকার্ডিয়াল ইসকিমিয়া উইথ অ্যানজাইনাতে। ব্যাপারটা হচ্ছে হার্টে ব্লাড সাপ্লাই কমে যাওয়া। দুবার হার্ট অ্যাটাকও হয়ে গেছে। প্রথম ব্যথা হয় দার্জিলিংয়ে পার্টির মিটিংয়ে গিয়ে। হেঁটে ওপরে ওঠার সময় বুকে অসম্ভব ব্যথা হয়। সঙ্গে সঙ্গে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়, হার্ট অ্যাটাক। এক মাস ভর্তি ছিলেন ফ্রি বেডে। ডাক্তাররা বলে রেস্ট্রিক্টেড লাইফ লিড করতে হবে এবং সিগারেট ছাড়তে হবে। ন্যাশনাল মেডিকেলে চেকআপও করানো হয়। তারপর থেকে অ্যানজাইনার পেইনটা উঠত। তখন কন্ট্রোল করা যেত না। এমন চলতে চলতে বাহাত্তর সালে এসে শারীরিক অবস্থা আরও জটিল। তাকে ধরিয়ে দেবার জন্য ততদিনে সরকার ১০,০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছে। একই অঙ্ক ঘোষণা করেছে অন্ধ্র বিহার ও উড়িষ্যার সরকারও। এখানে কিছুদিন থেকে অন্য কোথাও কিছুদিন এভাবে পালিয়ে আছেন কমরেড। ঠিক এমন সময় তার নিজের হাতের লেখা চিঠিটি এসে পড়ে রুনু গুহনিয়োগীর হাতে। রুনু ততদিনে পাগলা কুকুরের মতো খুঁজে বেড়াচ্ছেন চারু মজুমদারকে। চিঠিটি চারু মজুমদার পাঠিয়েছিলেন তার স্ত্রীকে, ‘পারলে একবার কলকাতায় এসো।’ ব্যাস। আর যায় কোথায়। রুনু নিশ্চিত চারু কলকাতাতেই আছেন। এবার আর ছাড়াছাড়ি নেই। যে ছেলেটি কুরিয়ারসহ ধরা পড়েছিল তাকে নিয়েই চললো অভিযান কলকাতার এন্টালি এলাকায়।
বর্ষার রাতগভীর। পথঘাট জনমানবশূন্য। মাঝে মধ্যে দূর থেকে দুচারটি বোমা পটকার আওয়াজ। রাস্তায় কুকুরের ডাক। আর সব নিশ্চুপ। মৌলালির মোড় থেকে কিছু দূরে গাড়ি রেখে নিয়োগীর দল এসে দাঁড়ায় নয় নম্বর বাড়ির সামনে। বিরাট টিনের বাড়ি। সামনে বিশাল টিনের গেট। অন্ধকার। ভেতর থেকে গেট বন্ধ। কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে প্রাচীরে উঠে গেলেন অফিসার সমীর গঙ্গোপাধ্যায়। প্রাচীর টপকে নেমেও পড়লেন অফিসার। কিন্তু আগাতে গিয়ে পাহারায় বসে ঢুলতে থাকা ছেলেটির পায়ে লেগে যেতেই সে চেঁচিয়ে ওঠে;
-কে? কে?
ঘুটঘুটে আঁধারে দেখা যায় না কিছুই। অফিসার বুদ্ধি করে গলায় ভারীক্কি স্বর টেনে বললেন;
-আমি, কমরেড।
তাতেই ঘুম ঘুম চোখে ছেলেটি দরজা খুলে দিল। সাথে সাথে রুনুসহ অন্য অফিসাররা বাড়িতে ঢুকে পড়ে ছেলেটিকে আগে বেঁধে ফেলল। ভেতরে দুটো ঘর। দরজা বন্ধ। সারাদিনের খাটাখাটনির পর মিটিং সেরে নকশাল বিপ্লবীরা অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। ঘুমের আলস্যে থাকা অবস্থাতেই নজনকে পটাপট বেঁধে ফেলল। কিডন্যাপিংয়ের কায়দায় নয় জনকে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি ছুটলো লালবাজার। পুলিশ অফিসাররা চেহারা দেখে কাউকেই চিনতে পারলো না। সোর্স ছেলেটি যাদের নাম বলল তাদের মধ্যে ছিলেন সিপিআই (এমএল)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক দীপক বিশ্বাস, দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ প্রায় সকল সদস্য। রুনু আহত…
-আ আ আ হ্। চারু মজুমদার নেই এদের মধ্যে! ওহ শিট।
আর একজন অফিসার বলে উঠল;
-সোনা না হয় পেলাম না, কিন্তু কিছু রুপো-তামা তো পেয়েছি।
-রাখো তোমার রূপা-তামা। আমি সোনাই চাই, সোনা। সোনা। এবং আজই।
অফিসারটি বিক্ষিপ্ত;
-আজই।
-হুম। আজই। না হলে যে কোনো সময় কলকাতা থেকে পালাতে পারে। এরা ধরা পড়েছে খবর পৌঁছুনোর আগে আগেই চারুকে ধরতে হবে। তা না হলে হাত থেকে ফসকে যাবে। ও কলকতাতেই আছে। আমি নিশ্চিত। বৌকে দেখা করতে চিঠি লিখেছে। না না। অবহেলা করা যাবে না। সময় আজ রাতই।
-স্যার! এখন রাত প্রায় দুটো বাজে।
-চুপ থাকো।
নয় জনের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ঘরে নিয়ে জেরা শুরু হলো। ঘণ্টা এক-দেড় পার হয়ে যায়। কেউ কথা বলে না। বোঝা গেল কেউ জানে না চারু মজুমদার কোথায় আছে। ধূর্ত রুনু গুহ পড়লো এবার দীপক বিশ্বাসকে নিয়ে। রাত তিনটা বাজে। দীপক বিশ্বাস মুখ খুলল। মুহূর্তে দেরী নয়। ছুট আবার মৌলালির মোড়। নিস্তব্ধ শেষ রাত। একটা রিক্সায় বসে রিক্সা ওয়ালা ঝিমুচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার হাত পা বেঁধে গায়ের কাপড় খুলে নিয়ে দ্রুত লুঙ্গিটি পড়ে নিল নিয়োগী। গায়ের জামাটা খুলে কাঁধে ঝুলিয়ে নিল গামছাটি। বাড়িটার অবস্থান জানার জন্য এবার রুনু আর কাউকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। নিস্তব্ধ রাতের অন্ধকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিয়োগী দীপক বিশ্বাসকে পেছনে বসিয়ে রিক্সাটি টানতে শুরু করলো। অভ্যাস নেই। রিক্সা টানতে জানে না। তাই দ্রুত টানতে পারছে না। বেশ সময় গেল ধকলও গেল শরীরের ওপর দিয়ে। মিডল রোডের শেষ প্রান্তে রিক্সা থামালো নিয়োগী, দীপকের ঈশারায়;
-থামুন।
-এখানে?
-হ্যাঁ।
-কই? কোথায়?
-ওই যে। তিনতলার ফ্ল্যাট।
-ঠিক আছে তো সব। না হলে কিন্তু।
বলেই নিয়োগী দীপক বিশ্বাসকে একটা আঘাতের ভান করলেন। বিপ্লবী দীপক বিশ্বাস তখন কাঁদছেন। চোখে ঝর ঝর করে ঝরে পড়ছে জল। জলভরা চোখে দেখালেন;
-১৭০/এ মিডলরোড।
-আর?
দুহাতে চোখের জল মোছেন দীপক বিশ্বাস;
-তিনতলা বাড়ির নিচতলার পেছনের দিকের ফ্ল্যাটে চারুবাবু আছেন।
শেষ হয়ে আসা রাত্রির করুণ আর্তনাদ তখন বেজে চলেছে দীপক বিশ্বাসের বুকের ভেতর। আর কেউ জানে না শোনে না সে-আর্তনাদ। ক্ষ্যাপা কুকুরের মতো তেতে ওঠে রুনু গুহনিয়োগীর চোয়ালের হাঁড়। বাড়িটির দিকে তাকিয়ে শেষ রাতের অন্ধকারে ধূর্ত শেয়ালের মতো চোখ দুটো জ্বলে ওঠে…
(চলবে)
পূর্ববর্তী পর্বের (৮১) লিংক

পরবর্তী পর্বের (৮২) লিংক আসছে