শাপলা সপর্যিতা > সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮৪]

0
283

পর্ব ৮৪

একটা সবুজ বন ছিল মনস্বিতার। যার ফুলের ঘ্রাণ আর রঙের আকুলতায় সারাটা কিশোরবেলা কেটেছে আনমন। সে প্রদোষে একটা বিশাল পাহাড় ছিল। উঁচু-নিচু খাঁড়ি পথ যার। এখানে সেখানে বুনো পেয়ারার ঝোঁপ। গোলাপি শাঁস আর টকটক মিষ্টি স্বাদ। পথে পথে ছিল তার ক্ষুধা। পথে পথেই ছাড়ানো খাবার। পথে পথে তার ক্ষুধা পথে পথেই সাজানো সুন্দরতা। বিধাতা মনস্বিতাকে নিজহাতে করে দিয়েছিলেন অবাধ নৈসর্গিক চলাচলের পথটুকু। তার চুড়ার ওপর জমে থাকা আকাশটা ছিল দূরতিক্রম্য আর খোলা। কখনো নীল কখনো কালো। কখনোবা ছাইরঙে উড়ে চলা মেঘের দুপুর। কখনো বর্ষামাতাল রিমঝিম সন্ধ্যা। কখনো ঝড়ো বাতাসে আচরণ তার উন্মাতাল অথচ হৃদয়হরা। কখনো শান্ত লাল আভায় পূরবীর রঙে অস্তরাগ, আহা! মনস্বিতার উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য শান্ত সময় যাপনের জন্য, প্রেমে মু্গ্ধ থাকার জন্য, বিধাতা আমূল খুলে রেখেছিলেন একটা বিশাল প্রকৃতি। এই-ই মনস্বিতার ঈশ্বর। প্রকৃতিই প্রশান্তি। প্রশান্তিই ঈশ্বর। একটা নদী ছিল – অবাধে যার এপার-ওপারে ছিল তার চলাচল। একটা বৃক্ষ ছিল যার সবুজ পাতায় বরাবর চলেছে প্রাণের স্পন্দন, দিয়েছে গতি। বন থেকে এক-এক করে সবুজ উধাও হতে লেগেছে কবে থেকে যেন, মনস্বিতা মনে করতে পারে না। পাহাড়ের গা থেকে ঝর্ণা হারালো। নদীও নাব্যতা হারিয়ে বুকে বিশাল চর। মঙ্গল তার সকল নিয়ে রাহুগ্রস্ত। বৃক্ষ থেকে একটা একটা করে ঝরে পড়ছে পাতা। এভাবেই দিনে দিনে বছরে বছরে রুক্ষ হয়েছে জীবন। শুষ্ক হয়েছে সবগুলো জলধারা। সতেজতা হারিয়েছে সব। এক একটি বৃক্ষের কান্না নিয়ে আধখানা জীবন তার! হারানো ঝর্ণার জল নিয়ে বাকিটা যুদ্ধ! কেবল নেই। নেই নেই নিয়ে এ জীবন! কী বিস্ময়। একটা পশুর সাথে কতগুলো বছর কেটে গেল মনুষত্বের শিক্ষায়, মানবতার চর্চায়। পশুটি মানুষ হলো না, মানুষ বানানো গেল না। বরং আবব্ধ অযাচিত প্রতিবেশ আর বিরুদ্ধ পরিবেশে থেকে থেকে মনস্বিতার ভেতর থেকে উঠে এল একটা কঠিন মানুষ। একটি মানুষের জন্ম দেয়া হলো না। একটি মৃত সন্তানের মুখ বুকের ভেতর আগলে নিয়ে কতকাল! মনস্বিতার অপমানের আগুন তার মাকেও ছাড়লো না। পুড়িয়ে মারলো। দগ্ধ হতে হতে মা চলে গেলেন। বাবাও তার পিছু পিছু। তারপরও একজন মানুষ ছিলেন যেন একটা আকাশ ছিল মনস্বিতার। আকাশটাকেও পোড়ানোর সময় হয়ে এলো। এইতো সামনে তার শব। মনস্বিতার হাতের ওপর যার শেষ নিঃশ্বাসটির তপ্ত ওম এখনো লেগে আছে। কে ছিলেন তিনি মনস্বিতার! কেন তার পিছু পিছু মনস্বিতা এই শ্মশানঘাটে? মাধবী আসেন নি। নারীদের শ্মশানে আসা নিষেধ। মনস্বিতা তো নারী নয়। মনস্বিতা আজ আর কারো স্ত্রী নয়। কারো কন্যা নয়। মনস্বিতার কারো মা নয় প্রেমিকা নয়। সে মানুষ। তাই, তমালকৃষ্ণের শবযাত্রার পিছু পিছু মনস্বিতা হেঁটেছে এতটা পথ ঠিক যেমন সেই ঝড়বাদলের দিনে মনস্বিতাকে আগলে নিয়েছিলেন তমালকৃষ্ণ। আজ তিনি নেই। আহা, কী এক নেই নেই বেদনায় উথলে উঠছে মনস্বিতার ভেতরে এক দুর্নিবার সমুদ্র। ভয়ঙ্কর তার গতি। প্রমত্ত যার উচ্ছ্বাস। বুকের গভীর থেকে উন্মোথিত উঠে আসছে বিপুল বেগে আবেগের সমস্ত গতিধারা। রুখবে কি করে মনস্বিতা! ঢুকরে উঠেছে ভেতরে একটা সংক্ষুব্ধ সমুদ্র। মা বাবা তমালকৃষ্ণ তার কন্যা সবগুলো হারানো মুখ যেন সমুদ্রের এক একটা ঢেউ হয়ে হা হা রবে ছুটে আসছে মনস্বিতাকে জড়িয়ে নিতে। মনস্বিতা কী একা পেরে উঠবে এভাবে এতগুলো উন্মাতাল ঢেউয়ের সাথে একা একা! শ্মাশানঘাট থেকে বেশ দূরের একটা ঢিবির উপর বসে আছে মনস্বিতা। দেখা যাচ্ছে দূরের মানুষগুলোকে। টুলটুলকে শৈলকে অরুণকে আরো যতসব আত্মীয় পরিজনের দূরতম মুখগুলোকে, যারা তমালকৃষ্ণের শবদেহটার চারপাশে আগুন নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছেন প্রেতের মতো। তারা শুদ্ধাচারী। শুদ্ধ করবেন তমালকৃষ্ণের শরীর। যদি মৃত শরীরেও কিছু-বা রয়ে যায় আত্মার অংশ। কোনো তান্ত্রিক যেন তার আত্মাকে নিয়ে কোনো অশুভ যোগমায়ার খেলায় মত্ত হয়ে উঠতে না পারে। তমালকৃষ্ণ তার দেহ দান করে গেছিলেন চিকিৎসা সেবার কাজে। সেখানে দাঁড়িয়ে গেল মাধবীর একটি তীব্র ‘না’। মাধবী তার শেষ স্বপ্নটাও স্বার্থক করতে দিলেন না। কারণ, তমালকৃষ্ণ আরও দশটা মানুষের চেয়েও ছিলেন পাপী, ঘোর পাপী। তার সমস্ত পাপের স্খলন একমাত্র সম্ভব অগ্নিদেবীর কাছে সমর্পণের মধ্য দিয়ে। দেহ থাকলেই দেহাত্মবোধ জাগে। দেহাত্মবোধে বুদ্ধি সংকুচিত হয়। সংকীর্ণ বুদ্ধি মানুষের সর্বনাশ ডেকে আনে। দেহাত্মবোধ থাকলে ঈশ্বরপ্রাপ্তি অসম্ভব। তাই প্রয়োজন দেহাত্ববোধের অবসান। দেহকে বিনাশ করা। মাধবী তমালকৃষ্ণকে ঈশ্বরপ্রাপ্ত করাবেন। দেবলোকে তাকে পাঠাতেই হবে মাধবীকে। তমালকৃষ্ণের শরীর তিনি অবশ্যই অগ্নিদেবীকে আহুতি দেবেন। আর অগ্নিদেবী তমালকৃষ্ণের অতৃপ্ত আত্মার অতৃপ্ত শরীরের ভস্মিভূত অবশেষকে অর্চনাস্বরূপ স্বর্গে নিয়ে যাবেন। পরম শান্তি দান করবেন মাধবী তমালকৃষ্ণকে। মুখে আগুন দিয়ে দেবপুরোহিতকে সন্তুষ্ট করলেই কেবল তাকে পরিশুদ্ধ করা সম্ভব হবে। তাই কোনো মেডিকেল হসপিটালে নয়। তমালকৃষ্ণকে উঠতে হবে চিতায়,
– হা হা হা । হা হা হা।
মনস্বিতার হাসির শব্দে আকাশে উড়ে চলা নীড়ে ফিরতে থাকা পাখিগুলোর বুকেও ব্যথা ওঠে প্রবল, রিনরিনিয়ে। এতক্ষণ শান্তথাকা গাছের পাতাগুলো হঠাৎ একটা অলক্ষ্য বাতাসে কেঁপে কেঁপে সরসর শব্দে কী কথা বলে ওঠে! স্তিমিত হয়ে আসে কিছুক্ষণের জন্য সন্ধ্যার আলোটুকু! বুক ভেঙে হু হু শব্দে উড়ে যায় বাতাস! টুলটুল কি একবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়েছিল মনস্বিতার দিকে অতদূর থেকে! আবছা অন্ধকার। বোঝা যায় না কিছুই। দূর থেকে কেবল দেখা যায় ধোঁয়ার শরীর। শরীর-পোড়ানো পাপবিধ্বংশী আগুন বাড়ে লক লক করে। বাতাস বেয়ে ফিরে আসে সন্তানের কাছে আত্মার বিলাপ। সে বিলাপ কেউ শুনতে পায় না। অন্ধকার গাঢ় হতে থাকে। সন্ধ্যার ঘোরলাগা অন্ধকারে মনস্বিতা একা দূরে বসে দেখছে লক লক করে ধেয়ে ধেয়ে যাচ্ছে আগুন স্বর্গের দিকে। তমালকৃষ্ণের মুখ পুড়িয়ে যেন আকাশের দড়ি ছিঁড়ে শূন্য শূন্য শূন্যর পরাকাষ্ঠা বেয়ে। শুদ্ধ হয়ে উঠছেন একজন বিপ্লবী, যিনি পাপী। শুদ্ধ হয়ে উঠছেন একজন অধার্মিক, তিনি পাপী ছিলেন। শুদ্ধ হয়ে উঠছেন একজন মানুষ যিনি জাতভেদে মানুষকে বিচার করতেন না, যিনি পাপী ছিলেন। মহাপাপের জীবন থেকে তিনি ফিরছেন নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক আর এক জীবনে। আগুনের মহামন্ত্র তাকে পরিশুদ্ধ করছে। যজ্ঞের আগুন হু হু করে পোড়াচ্ছে বিপ্লব, পোড়াচ্ছে অভিমান, অসম্মান, দেশ, মাটি, মায়ের আঁচল, গাছের শেকড়। হায়, শিরায় শিরায় পরিবাহিত আজন্মের বেদনার আঁকাবাঁকা স্রোতগুলো পুড়িয়ে পুড়িয়ে কালো অন্ধকারকে ক্রমান্বয়ে গ্রাস করছে। হু হু তার রব। দেবী বিরামহীন। অদৃশ্য সিঁড়ি বেয়ে চলেছেন স্বর্গের পানে আগুনের দেবী। উঠে পড়েছেন সপ্তআকাশ অবধি। তার হাতে তমালকৃষ্ণের লুণ্ঠিত আত্মা। লুণ্ঠিত তমালকৃষ্ণের শরীর। মৃত্যুতেও তমালকৃষ্ণের দেনা শোধ হলো না। আহা! আহা! মনস্বিতা আকাশের দিকে তাকায়, শেষবারের মতো তমালকৃষ্ণ বুঝি হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বললেন,
-মা, হলো না রে। তবু চললাম।
-আহ…
এত বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে আজ বিষাদ। এত করুণ আর বাতাসের শব্দ। এত ম্রিয়মান সন্ধ্যার আকাশ। কখনো দেখে নি মনস্বিতা। চোখ বেয়ে জল গড়িয়েছে যতটা ধুলোয় শুষে নিয়েছে তার সব। শুষ্ক ধারা গালের মাঝ বরাবার তার চলমান পথের দিশা রেখে চলে গেছে অনেক্ষণ। তমালকৃষ্ণের শেষযজ্ঞও শেষ হয়েছে এইমাত্র। সকলেই চলেছে নিজ নিজ ঘরের দিকে। মনস্বিতার যেতে ইচ্ছে নেই। এই ঘোর অন্ধকারে কী এক মায়ার ঘোর জড়িয়ে ধরে রাখছে তাকে। যেতে ইচ্ছে নেই। একেবারেই ইচ্ছে নেই। সকলে এক এক করে প্রস্থান করেছে। মনস্বিতার সেদিকে খেয়াল নেই। ধীরে শূন্য হয় আকাশ। শান্ত হয়ে পড়েছে বাতাসও। আগুনের হুতাশনও নিভন্ত। পাখিরা ঘরে ফিরেছে সেও অনেক্ষণ। চিতায় জলঢালা আগুনটাও কিছুক্ষণের মধ্যেই পুরোপুরি নিভে গেলে ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে আসবে। মনস্বিতার ধারণা সকলেই চলে গেলে তমালকৃষ্ণ কিছু একটা বলতে ফিরে আসবেন তার কাছে। থাকুক কিছুক্ষণ একা।
-চলুন। সকলেই চলে গেছে।
টুলটুলের কথায় হঠাৎ যেন খেয়ালে আসে মনস্বিতা।
-আপনি যান। আমি কিছুক্ষণ পর আসছি।
-না। এখানে একা বসে থাকা ঠিক হবে না। চলুন। সকলেই চলে গেছে।
অনিচ্ছায় উঠে পড়ে মনস্বিতা।
-কোথায় যাবেন?
-আমার বাসায়।
-সেই ভালো। আজ মা আপনাকে …
বাকি কথাটি আর মনস্বিতার শেষ করতে দেয় না। হাতের ঈশারায় থামতে বলে টুলটুলকে ফেলে বেশ খানিকটা এগিয়ে যায়।

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বের (৮৩) লিংক 

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b6%e0%a6%be%e0%a6%aa%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%b8%e0%a6%ae%e0%a7%8d%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%95%e0%a6%9f-73/

পরবর্তী পর্ব আসছে