শাপলা সপর্যিতা >> সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮৬]

0
210

পর্ব ৮৬

খানিক অপেক্ষা করে খুব সন্তর্পণ রমা, আগান ওদিকে। কান পাতেন ওয়াশরুমের দরজায়। এত জোরে জোরে হাসির শব্দটি নিশ্চিত ভুল শুনছেন না তিনি! হাসির শব্দটি কি কোনো আধিভৌতিক কিছু হতে পারে? মেডিকেল সায়েন্স যদিও এসব কিছুকে স্বীকৃতি দেয় নি কখনো। তাহলে কি মাস দেড় দুই ধরে মনস্বিতার স্মৃতি পুরোপুরি ফিরে আসার পর যে স্বাভাবিক অবস্থার প্রত্যাশা করে আছেন এতদিন ধরে তার সবই বিফলে গেল। মনস্বিতা তবে পুরোপুরিভাবে মস্তিস্ক বিকৃতির শিকার হয়ে পড়লো? নানা প্রশ্ন তার মনে ততক্ষণে উঁকি দিতে শুরু করেছে। দরজায় হালকা করে টোকা দেন,
-মনস্বিতা?
শব্দ নেই। আবার ডাকেন
-মনস্বিতা
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ সব। বেসিনের কলে একটানা খলখল করে পানি গড়িয়ে পড়ার শব্দ শোনা যায়। বার কয়েক ধাক্কা দেন। বুঝতে চেষ্টা করেন দরজাটি আলগা আছে কি না। না, নেই। ভেতর থেকে বন্ধ। খুব নীরব সব। এক গভীর স্তব্ধতা যেন সীমানা ছাড়িয়ে। এই রোদেলা মধ্যদিনে ঘুঘুর ডাক যেন ব্যথার বেহাগ গাইতে গাইতে ভিজিয়ে দিচ্ছে রোদ। ভেতর থেকে জনমানবের জাগতিক শব্দবিহীন প্রবহমান জলের একটানা গড়িয়ে পড়ার শব্দটিকে এখন তার অসহ্য লাগছে। মনের অস্বস্তিটুকু পীড়া দিচ্ছে এই মুহূর্তে। কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। বারবার ওয়াশরুমের দরজায় ধাক্কা দেয়াটা খুব একটা শোভনও নয়। ভেতরে নীরব। মাথা ঘুরে কিংবা পিছল খেয়ে পড়ে গেলে তো শব্দ শোনা যেত। নাহ্ পড়ে নি। কিন্তু স্তব্ধ সব। ধীরগতি সময়। প্রবহমান রক্ত। স্নায়ুতে উন্মাদনার ঢেউ। মাত্রাতিরিক্ত একটা অসহনীয় অস্থিরতা গ্রাস করছে যখন রমাকে তখন হঠাৎ কলের জলের শব্দ বন্ধ হয়ে যায়। কেমন একটি বিচ্ছিরি অসহযোগ তৈরি করছিল জলের শব্দ সেটা শব্দটা বন্ধ হয়ে প্রকট হয়। স্তব্ধতা আরও প্রগাঢ় এখন। ঠিক এমনি সময় দরজাটাও খুলে যায়। রমার চোখের সামনে এক অন্য স্থিতধী মনস্বিতা বের হয়। তবু, একটা স্বস্তির ভাব কেন রমার মনটাকে খুব একটু হালকা করে দেয়। ধোঁয়াশা উড়ে যায়। ততক্ষণে মনস্বিতা হাত মুখটা তোয়ালে দিয়ে মুছে এসে বিছানাটায় গা এলিয়ে দেয়। খুব স্বাভাবিক। কথাও বলে যার জন্য উন্মুখ হয়ে আছেন ডাক্তার রমা,
-ঠিক আগের মতোই
রমা কথা বলেন না। মনস্বিতার চোখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করেন। স্বাভাবিক বুদ্ধিদীপ্ত চোখটা কি তার আজ এই মুহূর্তেই ঝলক দিতে শুরু করলো! রমা মনস্বিতার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তিনি এতগুলো দিন কি কখনো ওর চোখের দিকে তাকান নি! নিজেকেই প্রশ্ন করেন। হ্যাঁ। অসংখ্যবার তাকিয়েছেন। কিন্তু আজকের এই দৃষ্টির প্রক্ষেপনকে ব্যাখ্যায় আপ্রাণ তিনি। হুম অদ্ভুতই বটে। অভূতপূর্ব কিন্তু মোহন সে দৃষ্টি। গত কদিন দৃষ্টির এই প্রখরতা তিনি দেখেন নি। আলুথালু এলোমেলো চোখের মেয়েটির এই মুহূর্তের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা তাকে বুঝিয়ে দেয় আসল ব্যক্তিটি বোধ হয় এটিই। এই তার আসল চরিত্র। ভা্বনার মুহূর্তগুলোর অবসান হতে হতে মনস্বিতা সরব হয়,
-বমি হলো।
-আচ্ছা। শরীর খারাপ লাগছে?
-নাহ। এবার ভালো লাগছে।
-যাক নিশ্চিন্ত হলাম।
-কিন্তু আগেরই মতো মনে হচ্ছে সব।
-বেশ কবার বললে আগের মতো। আচ্ছা, আগের মতো কি ঘটেছে বলতো?
মনস্বিতা কয়েক সেকেন্ড ভাবে। বলা ঠিক হবে কি? সে কি পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে? মানসিক স্মৃতির ভারসাম্য তার ঠিকঠাক আছে তো? তা না হলে রমার এই আশ্রয়টি হারানোর ভয় তার আছে। কিন্তু না বললে তো চলবে না। কদিন লুকোবে? তাছাড়া কেন যে তার বুকের ভেতর একটা দারুণ সুখিসুখি খুশিখুশি বাতাস একট চিকন মিহিসুরের আনন্দ বয়ে নিয়ে চলেছে। কতকাল পর এমন সুখ তার অনুভূত হচ্ছে তা হিসেব করে বলতে পারে না। কেবল মনে হচ্ছে সব আগের মতো। প্রথমবারের মতো। কিছুটা সময় মনের ভেতর বাস্তবিক সমূহ সম্ভাবনা আর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ভাবনাগুলো দোলাচলে দোলাতে থাকে মনস্বিতাকে। রমা আবার জানতে চান,
-বলবে কিছু? তুমি আগের সব অবিকল মনে করতে পারছ?
-হ্যাঁ। আমার সব মনে পড়েছে। সব এবং সব।
মনস্বিতার ‘সব এবং সব’ শব্দটির উচ্চারণ খুব স্পষ্ট এবং আগ্রাসী। কোমলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসা একটা কাঁটা যেন। কিন্তু তাকে রূঢ় বলা যাবে না। কি যেন এক অহং। কি যেন এক প্রতিজ্ঞা অথবা প্রতিশোধ! না তাও কি বলা যায়?
-আমাকে বলবে?
-আসলে কি জানেন, আমি খুব একা ছিলাম। না না। একাও ছিলাম না। আমার চারপাশে অনেক অনেক মানুষ ছিলেন। আমি তাদের ভালোবাসতাম। ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু এক এক করে সকলে আমার জীবন থেকে চলে গেলেন। অথচ দেখুন, দিনে দিনে আমি জেনেছি অন্তর্হিত মানেই প্রস্থান নয়। তাই সকলেই আমার কাছে রয়ে গেলেন।
-কেমন?
-এই দেখুন, আট মাসে যে সন্তানটি আমার কোলের কাছে নিথর শরীর নিয়ে পড়েছিল। ছোট্ট শরীরটির যে ভার আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।
কথা শেষ না হতেই রমা প্রশ্ন করেন,
-মৃত সন্তান?
-হুম।
-সন্তান নয় ঠিক। একটি আলোর কণা। যার আসবার কথা ছিল না অথচ এসেছিল। আমার অন্ধকার হতে থাকা জীবনে আলো জ্বালবে বলে এসেছিল হয়তো। অথচ চলে গেল। কিন্তু দেখুন সে অন্তর্হিত ছিল।
-মানে কি?
মনস্বিতার দৃষ্টিতে একটা ক্ষীণ বেদনার আভাস, একটা সূক্ষ্ণ আনন্দের কণা রেণু রেণু স্পর্শে যেন ভেসে বেড়ায়। রমা দেখতে পান। সেই রেণুকণাসম আনন্দবেদনার সম্মোহনী অব্যাখ্যেয় অনুভবের মাঝ থেকে উঠে আসে স্থির নিশ্চিত এক উচ্চারণ,
-সে আবার আসছে।
রমার এ জীবনটা যাপনের অভিজ্ঞতা মারাত্মক। তবু অদ্ভুত ঠেকে তার কাছে।
-সে আবার আসছে?
-হুম। আবার আসছে?
এক মিনিট রমার দিকে একটা তীব্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বলে,
-আবার অন্ধকার আমার। আবার আলো আমার। আহ্।
খুব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে মনস্বিতা যেন বহু ঝড়ের রাত পার করে পৌঁছুতে পেরেছে কোনো স্থিরলক্ষ্য গন্তব্যে। বিষয়টি পরিস্কার হওয়া দরকার। তাই রমা রাখঢাক করেন না,
-তার বাবা কে? তুমি তার নাম মনে করতে পার?
-খুব মনে করতে পারি। বাবার খুব দরকার?
রমা ইতস্তত করেন। সত্যিই তো। প্রশ্নটি খুব ট্রাডিশনাল। তার অন্তত এ প্রশ্নটি করা ঠিক হয় নি। এমন সময় সেই মেয়েটি ঘরে ঢোকে। মনস্বিতা মেয়েটির দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। চলে গেলে,
-এই মেয়েটি বাঙালি কিন্তু বাঙালি নয়, কেন বলুন তো?
রমা বিস্মিত হন মনস্বিতার পর্যকেক্ষণ ক্ষমতা আর প্রশ্নের ধরন দেখে। সে স্থির। সে নিশ্চিত। উত্তরে রমা,
-মেয়েটি পুরোপুরি বাঙালি নয় বলে।
-কি ঘটনা?
-বাঙালি মায়ের গর্ভে জন্মানো এক পাকিস্তানি জেনারেলের কন্যা।
-ওহ্। জৈবিক? হা হা।
অদ্ভুতভাবে হাসে মনস্বিতা। হাসতে হাসতেই বলে,
-পাকিস্তানিরা তো এদেশের মুসলমানদের কলুষিত রক্ত সাচ্চা মুসলিম রক্ত দিয়ে পরিশুদ্ধ করে দিতে চেয়েছিল। বিপথগামী নারীদের সুপথে আনতে এই ব্যবস্থা করেছিল। হা হা। এই তো?
রমা গম্ভীর,
-হ্যাঁ। এই।
-আপনার কাছে?
-আমি তখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের এক হসপিটালে চাকরি করি। ওর মায়ের মতো অসংখ্য নির্যাতিত নারীর সেবায়। ওকে জন্ম দিতে গিয়ে ওর মা মারা গেলেন। আমি ওকে নিয়ে এলাম নিজের কাছে। সেই থেকে আমার কাছে।
-বাহ্, সম্পর্কটি তাহলে জৈবিক নয়!

মাধবী টুলটুলকে বার বার ফোন করে ফিরে আসতে বলেন। মাস দেড় দুই হলো। কিন্তু টুলটুল তখন বিধ্বস্ত এক মানসিকতায়। পাহাড়ে যে বাড়িটি কেনার জন্য দলিলপত্র রেডি সেটির টাকা দেবার কথা ছিল মনস্বিতার। মনস্বিতার নামে নকল দলিল করা হয়েছে। কিন্তু আসল দলিলটি টুলটুলের নামে। টাকাটা হাতে নেবার আগে আগেই মনস্বিতার সাথে ব্যাগটিও পড়ে গেল। সে রাতের কথাটি মনে হতেই আবার পার ভাঙে ঢেউ। পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা নিরীহ চেয়ারটাতে একটা সজোরে লাথি মারে,
-ওওও শিট…
কি করে এই ভুল করলো তাই ভেবে সারা। মনস্বিতার দুই কোটি টাকা থেকে যাবে তার কাছে। মনস্বিতা উঁচু পাহাড়ের ওপর থেকে নিচে পড়ে মরে যাবে। মনস্বিতার বাবা নেই। মা নেই। বর নেই। সন্তান নেই। পরদিন হয়তো পাহাড় থেকে পড়ে গিয়ে একজন নারীর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়বে। মামলা মোকদ্দমা করবে এমন কেউ নেই। বাড়িটি অনায়াসে নিজের নামে করে নেবে টুলটুল। ভূমিহীন আর থাকবে না সে। শৈল যদি ঠাকুর্দার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে, ভয় নেই তার। তার একটা গভীর শেকড় গেঁথে নেবে এখানেই। টাকার বিনিময়ে একজন নারীও বেছে নেবে। কি আছে তার? না দেশ। না শেকড়। না স্ত্রী। না সন্তান। যেখানে ভূমি সেখানেই শেকড় গেঁড়ে নেবে। কি আছে তাতে! টাকাই ঈশ্বর। টাকাই সম্মান। টাকাই ভূমি। টাকাই মান। অথচ ঘটলো ঠিক উল্টো। মনস্বিতার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত না হয়ে ফিরে যাওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। অত ওপর থেকে পড়ে বেঁচে থাকার কথা নয়। কিন্তু যদি বাইচান্স বেঁচে থাকে! ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন হিম হয়ে আসে টুলটুলের। যদি আইন-আদালত করে তাহলে ভবিষ্যৎ তার একেবারেই আকীর্ণ। কি ভেবেছিল আর হলোটা কি? নিজের মনেই কেউ একজন বলে ওঠে,
-না খেললেও পারতে টুলটুল।
-কোনটা খেলা?
-এই যে মেয়েটির সাথে ভালোবাসার ভান করে তার সব টাকা পয়সা বাগিয়ে নেবার চেষ্টার কথা বলছি আর কি?
-অন্য আর কি করা যেত?
-ওকে বিয়ে করতে পারতে। তাতেই তো সব তোমার হতো। বিশেষত মনস্বিতা তোমাকে ভালোবাসতো। আর সে তো তোমাকে সব টাকা দিতেই এসেছিল।
-হাহ্। মুসলমানের মেয়েকে বিয়ে?
-হায়, কি বল? মুসলমানের টাকা নিয়ে বাড়ি কিনতে পারো। শরীর নিয়ে খেলতে পারো…
কথা শেষ হয় না।
-কি বলছ কি তুমি? দীপার জায়গায় ওই মনস্বিতা?
-কেন নয়? দীপা তোমাকে টাকার জন্য ছেড়ে গেছে। আর মনস্বিতা তোমাকে টাকা দিতে এসেছিল। ভালোবাসার কাছে ওই কয়েকটা টাকা যার কাছে তুচ্ছ সেই তো মানুষ। সেই তো জানে ভালোবাসা কি জিনিস!
টুলটুলের মনে হতে থাকে একটা কালো ছায়া তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক তারই মতো দেখতে ছায়াটির অবয়ব। রাগে গা জ্বলে যাওয়া সব কথা বলছে তারই সামনে দাঁড়িয়ে। উঠে পড়ে ছায়াটির দিকে আগায়। কিন্তু ছায়া নির্ভিক। তাকে ভয় পায় না। করে দাঁড়ায় না। তার চোখ দেখা যায় না। তাই বোঝা যায় না সে ভয় পেয়েছে কি পায় নি। টুলটুল ছায়ার টুঁটি চেপে ধরে। সে নির্বিকার,
-কি বলছিস তুই। একজন অস্পৃশ্য নারীকে বিয়ে করবো। সম্ভ্রান্ত সনাতন আমি। দেবদেবীতে ভক্তিমান। আমাকে তুই কার অন্ন গিলতে বলছিস?
-ছিঃ কী বাবার কি সন্তান। হা হা…
টুলটুলের চোখের শিরা-উপশিরাগুলো আগুনের তাপে যেন লেলিহান। এখনই ছুটবে রক্তপ্রপাত। কিন্তু ছায়াটি টুলটুলের এই চেহারাতে একেবারেই ভীত নয়। আবার বলে,
-বিশ্বাস ধর্ম। মানবতা ধর্ম। ভালোবাসা ধর্ম। জাতপাত উচ্চাসন এসব ঠুনকো টুলটুল। তোমার দেবতাকে বলনা কেন তোমার প্রাপ্য সম্পদ ফিরিয়ে দিক।
-এত সাহস তোর?
ছায়াটা দাঁত কিড়মিড় করে এবার করে অসহনীয় সত্যের উচ্চারণ,
-এতটা সময় ধরে ছলনা করলে তুমি? তোমার জাত কোথায় ঠাঁই নেয় দেখ! তোমার পুজাপাঠ মাল্যদান ফুলবেলপাতার সকাল সন্ধিপূজোর ঘট তোমার ব্রহ্মত্বের অহংকার তোমাকে এই বুঝি দান করেছে? অমানুষ একটা। প্রতারক।
-কি বলছিস তুই?
-তোর এই পাপের শাস্তি তোকে মনস্বিতা দেবে। তোর কোনো ঈশ্বর কিংবা দেবতা নয় টুলটুল।
-তুই কে রে?
বলতে বলতে ধাক্কা দিয়ে ছায়াটাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে বুকের ওপর পাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। আজ নিশ্চিহ্ন করে দেবেই একে। কিন্তু অদ্ভুত ঘটনা। ছায়াটি তার পায়ের নিচে পড়ে থেকেও চেচায়,
-হা হা। তোর ধর্ম আর কর্মের কলুষ তোর শুদ্ধতা আর অস্পৃশ্যের তফাৎ ঘুচাতে আসবে কেউ। চেয়ে থাক। হা হা…
হাসতে হাসতে ছায়াটি কেমন করে সিল্কের মতো তার জোরে দাঁড়িয়ে থাকা পায়ের নিচ থেকে হালকা বাতাসে উড়ে উড়ে চলে যেতে থাকে। আকাশে বাতাসে একটা অসহনীয় অট্টাহাসির শব্দ দমকে দমকে ফিরে আসে কর্ণকুহরে। কে যেন আড়াল থেকে দেখেছিল সব। জেনেছিল তার নিভৃত পরিকল্পনার কথা। সেই মানুষটিই হাসছে। এ কি দিব্য? এ কি সত্য? এ কে? কে সে? নিজের বিবেকের কণ্ঠস্বর এই মুহূর্তে আবিষ্কার করতে পারে না টুলটুল। একলা নিথর নিস্তব্ধ বাড়িটিতে অট্টাহাসির শব্দটি প্রেতের মতো জড়িয়ে ধরছে তাকে চারপাশ থেকে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে হতে বার বার ফিরে আসছে তার কানে। কানে ঢালছে গরল-বিষ। পুড়িয়ে ছারখার করে সে শব্দ নামছে শরীর জুড়ে। উঠছে মস্তিষ্ক ভেদ করে ব্রহ্মতালুরও আরও ওপরে। বাতাসে লকলক করে উঠছে তার জারিত বিষের ধোঁয়া মাথা হাড় মগজ অস্থি কঙ্কাল ফুঁড়ে ওপর থেকে আরও ওপরে উড়ে চলেছে সে বিষের ধোঁয়া, চলেছে আসমান অবধি, চলেছে অসীমে।

(চলবে)