শাপলা সপর্যিতা >> সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮৭]

0
222

পর্ব ৮৭

মনস্বিতা বেশ তড়িৎগতি। বিছানায় এলিয়ে দেয়া দেহটা হঠাৎ উৎকণ্ঠিত। গায়ের কাঁথাটি এক পাশে সরিয়ে রেখে নেমে পড়ে বিছানা থেকে
– চলুন তো একটু বাইরে বের হই। আসুন।
বলে টানতে টানতে রমাকে নিয়ে চলে ঘরের বাইরে। রমা খুশি হন। মনস্বিতা শক্তি ফিরে পেয়েছে। বাহ। পূর্ণ তার উদ্যম স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে। তিনি খুশি। প্রায় দুটো মাস হতে চলল সে ঘরের ভেতর বন্দী জীবন যাপন করছে। যেভাবে বলে দিয়ে রমা হসপিটালে চলে গেছেন সেভাবেই থেকেছে। বাড়ির বাইরে পা তো দেয়ই নি কোনো কথারও অবাধ্য হয় নি। সব ওষুধ এবং পথ্য ঠিকমতো খেয়েছে। এ কদিনে বেশ বোঝা গেছে মেয়েটি ভালোবাসার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়ে অবনত হতে দ্বিধা করে না। বিকেলের নরম আলো ততক্ষণে নেমে পড়েছে পাহাড়ের উঁচু চূড়া থেকে সমতলেও। মফস্বল শহরের এককোণায় সারাদিনের রোদক্লান্ত রাস্তাগুলো ঝিমোচ্ছে। এই অবনমিত প্রকৃতির নীরবতা তাকে মুগ্ধ করে। প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতা তার মনটাকে হালকা করে দেয়। মনস্বিতা বলে ওঠে,
-কী সুন্দর!
-হুম। এটি শহর নয়। শহরতলী।
-বেশ নিরিবিলি। আমার কোলাহল ভালোলাগে না।
-তাই?
-এই ছায়াছায়া নির্জনতা, আমাকে আরাম দেয়। আনন্দ দেয়। আমি ছেলেবেলাটাই যেন খুঁজে পাই।
-তোমার ছেলেবেলা পাহাড়ে কেটেছে?
-হুম। লালমাই পাহাড়ের পায়ের কাছে আমার দিনের এবং জীবনের শুরু।
-আচ্ছা। দারুণ। তাই একদিন তুমি এ পাহাড়টির নাম জানতে চেয়ে লালমাই কি না প্রশ্ন করেছিলে আমাকে?
-হুম।
-এটি ধীবং পাহাড়। সমতল ছাড়াও ওপরেও কিছু বাড়িঘর আছে। কিছু মানুষ চূড়ায়ও বাস করে।
-হ্যাঁ। আমি ওই পাহাড়ের চূড়ায়ই গিয়েছিলাম সে রাতে।
-কি বলছ? রাতে? পাহাড়চূড়ায় একা?
-নাহ্। টুলটুল ছিল আমার সাথে।
মনস্বিতা রাতের নির্জনে পাহাড়চূড়ায় একজন পুরুষ তার সাথে ছিল একথা বলতে দ্বিধাহীন। রমা প্রশ্ন করেন,
-টুলটুল কে?
-আহ্।
মনস্বিতা বুকটা চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। হঠাৎ শেষ বিকেলের স্নিগ্ধ আলোটা মনস্বিতার মুখের ওপর এসে যেন মরে যায়। শেষ নিঃশ্বাসের করুণ ছায়া ফেলে হারাতে শুরু করে অন্ধকারে। আহত যন্ত্রণাহত মনস্বিতার মুখটা যেন এই আধো আলোছায়ার ঘনায়মান অন্ধকারে আরও বেশি ম্রিয়মান হয়ে আসতে থাকে। রমা এমনই দেখতে পান তাকে। এই শেষ নিঃশ্বাসের তপ্তভারের ভেতর থেকে চাপা আর্তনাদের মতো উঠে আসে একটি নাম,
-টুলটুল, একটি ভুল।
-ভুল?
-আবার শুদ্ধও বলতে পারেন।
-আমি বুঝতে পারছি না ঠিক। গুলিয়ে ফেলছি সব।
-আমার চিরায়ত শুদ্ধতায় সে ঠিক। আবার সমাজ সংসার জৈবিক চাওয়া-পাওয়ার প্রেক্ষাপটে সে ভুল। সে সে একটি জ্বলন্ত মিথ্যে। একটি পাপ।
-হুম।
-ভুল মানুষ।
-আচ্ছা।
রমা খুব গম্ভীর। তিনি উৎসুক ঠিক। কিন্তু তার ঔৎসুক্যের গতি তড়িৎ নয়। গম্ভীর আর ধীর। সংহত এবং অপেক্ষমান। একজন বেদনাহত মানুষকে তাড়া দিয়ে নিজস্ব কৌতুহল নিবারণকে দ্রুততর করার মতো অমানুষ তিনি নন। তিনি মানবিক। তিনি উদার। তিনি বেদনাহতের প্রতি অবনত। সে বেদনার ভার খানিক নিজেও বহনে সদাপ্রবৃত্ত। না হলে মনস্বিতাকে এতদিন ধরে লালন-পালনই বা তিনি করবেন কেন! আর এখন যে জটিল পরিস্থিতির সূচনা হয়েছে তাতেও তিনি বিক্ষিপ্ত নন। নন অধীর। সেই মানুষটার কাছে তাই মনস্বিতাও অসঙ্কোচ। আবার কথা বলতে শুরু করে,
-আসলে কী জানেন ভুলের ভেতর কত শুদ্ধ, শুদ্ধতার ভেতর কত যে ভুল জড়িয়ে থাকে মানুষ যদি তা দেখতে পারতো। আফসোস!
মনস্বিতা ব্যথিত। রমা তার বেদনাকে স্পর্শ করার চেষ্টায় নিবিষ্ট। তার ঘাড়ে হাত রাখেন।
-শান্ত হও মনস্বিতা।
ততক্ষণে অজস্র অন্ধকার নেমেছে পাহাড়ের বুক জুড়ে। দূরে পাহাড়ের গায়ে গায়ে ছড়ানো ছিটানো কিছু আলোর রেখা টিমটিম করে জ্বলে একটা আলোর মালার মতো মতো দেখা যায়। ওখানে মানুষ বাস করে। নির্জন নিভৃত জনারণ্যের অসহ শব্দ কিংবা মানবীয় জটিলতা নেই, এ বিশ্বাস ছিল মনস্বিতার। তার একটা ঘর দরকার ছিল। নিজের ঘর। তার একজন মানুষ দরকার ছিল। নিজের মানুষ।
-আচ্ছা বলুন তো, মানুষের জীবনে সবচেয়ে বেশি কোন জিনিসটি দরকার?
দ্বিধাহীন উচ্চারণ করেন রমা,
-মানুষ।
মনস্বিতা আশ্বস্ত হয়। মাথা নাড়ে হাঁ-বোধক,
-সবশেষেও মানুষের একজন মানুষ দরকার। হাত ধরে বহুদূর হেঁটে যাবার জন্য, দুঃখে যন্ত্রণায় মাথায় হাত রাখবার জন্য। বিপদে পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য। অসুস্থতায় একটু ওষুধ এনে দেবার জন্য। সর্বোপরি এসব তো পাওয়া সম্ভব ভালোবাসার বিনিময়ে, নয়?
-অবশ্যই। ভালো না বাসলে কি কেউ তোমাকে জল এনে দেবে? তোমার উঠোন কী ভরে দেবে রৌদ্র এনে?
-ঠিক তাই।
-তবে বলুন, আমিই ঠিক ছিলাম কি না? আমি একটি রৌদ্রভরা উঠোন দিতে চেয়েছিলাম টুলটুলকে। ওর সব রোদ কেড়ে নিয়ে গেছিল দীপা। আর আমার রোদ হেসে উঠতে-না উঠতেই নিভে গেছিল অন্ধকার হয়ে।
-আচ্ছা।
-তারপর তমালকৃষ্ণ আমাকে রোদের দিশা দেখাচ্ছিলেন। কী যে অনাবিল সে দিশার আনন্দ। ফারুককে ছেড়ে এসেছিলাম। সে মূর্খ। সে সুযোগসন্ধানী। সে স্বার্থপর। মূলত সে পাপী। তার পাপে আমার সব কালো হয়ে পড়েছিল। শরীরে পড়েছিল অজস্র কালো দাগ। বুকের গভীরে নোংরা আবর্জনা। আর সমগ্র জীবন অধিকার করে বসে থাকা এক খা খা শূন্যতা দিয়েছিল ফারুক আমাকে। সারাটা বুক ভরা একটি ‘মা মা মা’ ডাক শোনার ব্যর্থতা এবং লিপ্সায় আমি অতিক্রম করে আসছিলাম সব অপমান। আহ হা।
রমা স্তম্ভিত হয়ে যান মনস্বিতার মুখে উপচেপড়া যাতনার আভাস দেখে। বেদনাগুলো আজ কেমন যেন অস্থির। বুকের কপাট খুলে থৈ থৈ শব্দে বের হয়ে আসছে। তার মুখে উচ্চারিত একটি শিশুর ‘মা’ ডাকের মতো শব্দ শুনে আজ তার নিজেরও হৃদয় কী এক হাহাকারে ভরে ওঠে। সে উচ্চারণ হৃদয় বিদীর্ণ করে দিয়ে মনস্বিতার মাতৃত্বের ব্যকুল প্রত্যাশার তুমুল আকাঙ্ক্ষাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে রমার কাছে। আকাশে আকাশে ছড়িয়ে পড়ে প্রবল শূন্যতার হাহাকার। বেদনার সমুদ্র মন্থন করে যেন জলের ওপর উঠে আসে অপাপবিদ্ধ এক জন্মদাত্রীর আর্তনাদ। সন্তানের সঙ্গে আসঙ্গলিপ্সায় অধীর এক শাশ্বত মায়ের মুখ ভেসে ওঠে রমারও বুকের গভীরে। চরাচর জুড়ে কোথায় কোথায় কোথায়, কোথায় যে বেদনা বাজে!
-তাও শেষ রক্ষা হলো না। সে আমার সন্তানের হন্তারক।
হঠাৎ মনস্বিতার কথায় মহূর্তের প্রবল আলোড়নটা স্তিমিত হতে শুরু করে,
-হায়, কি বলছ?
-কিন্তু দেখুন সে আবার আসছে।
-আচ্ছা। তাহলে তুমি সন্তানসম্ভবা?
-হুম।
-আর টুলটুলই সে সন্তানের বাবা?
-বাবা?
মনস্বিতার তীব্র ভ্রুকুটিতে রমা খানিকটা অপ্রস্তুত হন। ইতস্তত করেন,
-না। মানে । বলছিলাম…
রমার ইতস্তত ভাবটা আর গ্রাহ্য করে না মনস্বিতা। সে উন্মুখ। সে অধীর। বলার জন্য। জানাবার জন্য। আসলে তার অদম্য যাতনার একটা পারগেশন দরকার,
-আমি যতটুকু ভাবতে পারছি এবার সে আমাকে খুঁজবে।
-হুম।
-সে আমার টাকার লোভে এখানে এনেছিল?
-কি বলছ?
-হুম।
-কি করে বুঝলে?
-আমি পড়ে যাচ্ছিলাম পাহাড়ের ওপর থেকে। পড়তে পড়তে যতটুকু মনে পড়ে ওপরে দেখছিলাম ও নিচে পড়ে যেতে থাকা আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। অপেক্ষা করছিল আমার মৃত্যুর।
-তাতে কী বোঝা যায়?
-দেখুন দূরে, তাকিয়ে দেখুন না একবার। ওই পাহাড়ের ওপরে। একটা ঘর। তার বাইরে উঠোনের মতো ফাঁকা অনেকটা জায়গা। আমি আর টুলটুল। আর কেউ ছিল না ওখানে।
-হুম। বুঝলাম।
-কে ধাক্কা দিল আমাকে? ধাক্কাই দিয়েছিল নাকি তুমি কোনভাবে পা ফসকে পড়ে গেছিলে?
-আমি শুয়েছিলাম তখন।
-মানে?
রমা বুঝতে পারেন না। প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেন। মনস্বিতাও দ্বিধাহীন, সে অপ্রতিরোধ্য। যে সত্য তার গভীরে আলোর মতো জ্বলে সেই সত্য প্রকাশে তার লজ্জা নেই, ভয় নেই, শঙ্কা নেই,
-আকাশে জোৎস্না। নিচে মাটির ওপর সবুজ ঘাসের ওপর শুয়ে আমি আর টুলটুল। আমাদের প্রথম সঙ্গম। আমাদের ভালোবাসার প্রথম পার্থিব আয়োজন হয়েছিল পরিপূর্ণ সেদিন। আর তখনই খাদের কিনারে শুয়ে থাকা আমার গায়ে একটা জোর ধাক্কা টের পাই। পড়ে যেতে থাকি,
-হায়! তুমি নিশ্চিত?
-চলুন, একটু পাহাড়ের চূড়ার দিকে এগুই?
মন্ত্রস্থিত যেন মনস্বিতা। এমনি করে পা বাড়িয়ে দেয়। ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা পাষাণ পাহাড়, অন্ধকার কিংবা জগৎ সংসারের আর সব কিছু এই মুহূর্তে তার বোধের বাইরে পড়ে থাকে। রমা মনস্বিতাকে হাত ধরে টানেন,
-আরে, কি করছ কি? রাত হয়ে আসছে। এখন ওদিকে যাওয়াটা বিপদের হতে পারে।
ফিরে আসে রমার হাত ধরেই। চোখের দৃষ্টি তার এলোমেলো। হঠাৎ প্রসঙ্গান্তরে যায় মনস্বিতা। হাতের পার্সটা থেকে একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি বের করে দেখায় রমাকে,
-দেখুন। এই যে।
স্ট্রিট লাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পান রমা, সুদর্শন পুরুষের মুখ। চোখে খানিক চটুল দৃষ্টি। বিভ্রম জাগায়।
-আচ্ছা? আপনি একটু খোঁজ লাগাতে পারবেন?
-অবশ্যই। কেন নয়।
-ড্রাইভারকে বলছি।
-টুলটুল আমাকে খুঁজবে।
-খুঁজবে?
-হুম। কারণ সে উদভ্রান্ত। শেকড়ের বিচ্ছিন্নতায় ওর জাগ্রত লোভ ওকে নরকে নিয়ে ফেলেছে, এখন বুঝতে পারছি।
-কি বলছ তুমি?
-হ্যাঁ। আমি ওকে সবকিছু দিতেই এসেছিলাম। আমার সকল। আমার সম্পদ।
-আচ্ছা, আমাকে বল এ সন্তানের তুমি কী জন্ম দেবে?
-কি বলছেন কি?
মনস্বিতা বিস্মিত রমার প্রশ্নে। তাকিয়ে থাকে তার চোখে,
-না বলছি…
-আপনি কী আমায় তাড়িয়ে দেবেন?
-একদম না।
-বলছি এ সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তুমি লড়তে পারবে তোমার সন্তানকে নিয়ে?
-আমার ঈশ্বর আমার গর্ভে। তিনি আমাকে পথ দেখাবেন। আমি যুদ্ধে যাব। হা হা। আমি যুদ্ধে যাব। ঈশ্বর আমার সহায়। তিনি আমাকে এ যুদ্ধে জিতিয়ে দেবেনই। আমি বিশ্বাস থেকে বলছি। হা। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর, মা বলতেন।
-মানে?
-আমার কেউ নেই। কিচ্ছু নেই। চিরকাল কেবল দিয়ে গেছি। সকলেই নিয়ে চলে গেছে। আমার বুকের ভেতর একটা টলটলে জলের পুকুর। আমার বুকভরা একটি সন্তানের তৃষ্ণা। স্বামী কিংবা প্রেমিক চিরকাল কেবল আমার কর্মযোগ্যতা আমার পরিশ্রম আমার সফলতা কিংবা আমার জয়ের মালা ভোগ করেছে। কেউ প্রাপ্য শোধ করে নি। এবার শোধ করার পালা। এবার আমি হিসেব বুঝে নেব।
-হুম।
রমা গম্ভীর। মনস্বিতা হঠাৎ যেন বানের জলে উপচেপড়া এক নদী। ছলছল করে পাড় ভেঙে পড়া এক স্রোতস্বিনীর বুকের ব্যথায় রমা স্তব্ধ। তার বন্যার জল ততক্ষণে উথলে পড়ছে মাঠ বন ঘর বাড়ি দুকুল প্লাবিত করে,
-এ এক অন্য আলো, জানেন? যে আসছে যে ধর্মাধর্মের ক্ষুরধার পথের সব কাঁটাকে তুলে নিজের বুকের ভেতর নিশ্চিহ্ন করতেই আসছে। বর্ণভেদ শুচি অশুচি হিন্দু মুসলিম জাত প্রথা মিথ্যে ধর্ম মিথ্যে অহঙ্কার সব শুধরে দিতে একজন মানুষ আসছে। আমি তার প্রবল অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। সে আসছে। আমার আজন্ম আস্তিকের রক্তে এক ব্রাহ্মণের অহংকার একজন নাস্তিকের যাতনা সব এক সমান করে দিতে চলেছেন এক প্রবল শক্তিধর, এক মহা শক্তিশালী পরাক্রম, এক সুপ্রিম পাওয়ার। তার কাছে হিন্দু নেই। মুসলিম নেই। শূদ্র কিংবা বৈশ্য নেই। তিনি অন্ধ। তিনি মানুষের রং চেনেন না। মানুষের বর্ণ তার কাছে অর্থহীন। তিনি এক মানুষ চেনেন। এ সন্তান বোধ করি তমালকৃষ্ণরাজ চক্রবর্তীরই জন্মান্তর। তাকে আমার জন্ম দিতেই হবে। আমার সকল হাহাকার আমার শূন্য বুকে তৃষ্ণার তুমুল আস্ফালন একমাত্র তিনিই জানতেন। তিনি আমার জন্মদাতারও অধিক। তাছাড়া, আমার সন্তান জন্ম দেবার অধিকার তো আমার আছে? আছে না?
-টুলটুল জানতে পারলে কী মেনে নেবে তোমাদের এ সন্তান?
-কখনোই নয়। আমি নিশ্চিত।
-তাহলে?
মনস্বিতার চোখেমুখে এক প্রখর প্রতীজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট হতে থাকে,
-এ সন্তান আমার। আমি তাকে জন্ম দেব। দেবই।
-আর এই টাকা? চেক? এসব কী করবে বলতো?
-আমাকে একটি একাউন্ট খুলে দিতে পারেন?
-আমিও তাই ভা্বছিলাম। এভাবে ঘরে এসব রাখাটা ঠিক নয়। চলো আগামী কালই ব্যাংক হয়ে একটু হসপিটালে।
-হসপিটাল কেন?
-তোমার কিছু টেস্ট করা দরকার।
-ঠিক আছে।
বলতে বলতে রমা আর মনস্বিতা বাড়ির দিকে পা বাড়ান।
সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমে গাঢ়তর হতে শুরু করেছে। হাত খানিক দূরে একটা ছোট চায়ের দোকান। জটলা করে কিছু মানুষ গল্প করছে। কয়েকজন চায়ের কাপ হাতে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছে। একজন লম্বা ফর্সা মানুষ এসে বসে চায়ের দোকানে। চারপাশে সতর্ক দৃষ্টি তার। ঘোরাফেরা করে তার চোখের তারাটি। স্থির নয়, সন্দিগ্ধ। চায়ের দোকানির কাছে বিষয়টি খুব অন্যরকম লাগে। এ মানুষটিকে মাসখানেক ধরে দেখছে এখানে। পরিচিত নয়। এই শহরতলীতে যারা যারা বিকেলে কিংবা সকাল দুপুরে চা খেতে আসে তারা মোটামুটি তার পরিচিত। হয় স্থানীয় নয় তো চাকরির সুবাদে বহুদিন ধরে এখানে রয়েছে। কিন্ত এই মানুষটিকে কেমন উদভ্রান্ত দেখায়। দিনের আলোতে তাকে দেখা যায় না। অন্ধকার গাঢ় হলেই তাকে এই দোকানে এসে বসতে দেখা যায়। দূর থেকে রমা আর মনস্বিতা হাঁটতে হাঁটতে চায়ের দোকানটির পাশ ঘেঁষে চলেন। কি একটা সুবাসে ভেসে গেলে বাতাস চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বাঁদিক দিয়ে চলে যাওয়া দুজন নারীর ছায়া দেখে চমকে ওঠে টুলটুল,
-আরে, মনস্বিতা নয়? হ্যাঁ। ওইতো, লাইটপোস্টের আলোয় তার দীঘল ছায়া।
সেই যে তাদের বাড়ি থেকে বের হয়ে চলে যাচ্ছিল। আর বারান্দা থেকে সে দেখেছিল। তার মন হরণ করে নিয়ে চলে গেছিল যে মনস্বিতার দীর্ঘ ছায়া! আজও লাইটপোস্টের আলোতে একইরকম দীর্ঘ ছায়া তার। মনে মনে বলে,
-হ্যাঁ। মনস্বিতাই। ওই তো পেছন থেকে দেখা যায় হেঁটে চলেছে সে। পাশে আরও একজন নারী। কিন্তু কে সে?
মনস্বিতা মনস্বিতা মনস্বিতা বলে ডাকতে ইচ্ছে হয় তার। কিন্তু বুকের ভেতর ছমছম করে ভয় বাজে। অপরাধী মন তার অজানা আশঙ্কা জানান দেয়। তবু একটা তৃপ্তির নিঃশ্বাস বের হয়ে আসে তার বুক চিরে। একটা ভার নেমে যায় বুকের ওপর থেকে।
-বেঁচে আছে তবে! মরে নি। টাকাগুলো সাথে করে নিয়ে মরে গেলে তার নিজের আর কী লাভ হলো? বেশ বেশ।
আবার নিজেকে প্রশ্ন করে,
-আচ্ছা, টাকাটা ওর কাছে আছে তো? যে তাকে উদ্ধার করেছে সে আবার নিয়ে নেয় নি তো?
এসব ভাবতে ভাবতে পেছনে বেশ অনেকটা দূর থেকে ওদের অনুসরণ করতে করতে টুলটুল এসে দাঁড়ায় রমার বাড়ির সদর দরজার কাছাকাছি। বাড়ির ঝলমলে আলোর রোশনাই এতক্ষণের অস্পষ্ট আলোর ধাঁধাঁটাকে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। দূরে পাহাড়ের কোনো নাম-না জানা অজানা গাছের ডালে বসে ডেকে ওঠে একটি তক্ষক। কী এক ঘোর অন্ধকারের অমানিশা দূর পাহাড়টার মাথার ওপর ঝকঝকে পরিষ্কার আকাশটাকে ঘিরে ঘুরে ঘুরে পাক খায়। রাত্রির ডালে জমতে থাকে এক ঘোর অমানিশা।
(চলবে)