শাপলা সপর্যিতা >> সম্পর্কটি শুধুই জৈবিক >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৮৮]

0
228

পর্ব ৮৮

মনস্বিতা আর রমা ভেতরে ঢুকে সদর দরজাটা আটকে দিলে টুলটুল নির্ভয়ে বাড়িটার সম্মুখ অংশে এসে দাঁড়ায়। চোখ পড়ে সদর দরজা ভেদ করে ভেতরে মাথা উঁচু করে একঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকা দালানটার ওপর। বহু পুরোনো আমলের বাড়ি। সে যে দরজাটির কাছে দাঁড়িয়ে আছে সেটি আসলে একটি লোহার গেট। এর ভেতরে প্রায় হাত পনেরো দূরেই মূল দালানটি। দালানটিকে দেখে অনুমান করা যায় এর স্থাপত্য আরও ৫০/৬০ বছর আগেকার। পুরোনো পুরু দেয়ালের দালান। দালানের মাথার ওপর দুটো মুখোমুখি বসে থাকা সিংহমূর্তি তখনকার রাজা-জমিদারদের রাজমহলগুলোর মতো দেখায়। সেখানে বড় বড় অক্ষরে খোদাই করে লেখা আছে ‘রাজনারায়ণ চৌধুরী’। বোঝাই যায় এখানে যিনি বাস করেন এটা তার নিজের পৈতৃক সম্পত্তি। বনেদি পরিবার। কিন্তু মনস্বিতা এখানে কী করে এল? অত উঁচু পাহাড় থেকে পড়েও কি মনস্বিতা সজ্ঞান ছিল? ব্যাগের টাকা-পয়সা-ব্যাংকের চেক সব ঠিকঠাক ছিল তো জায়গামতো? নাকি সেই ঠিকমতো খুঁজে পায় নি ওসব? এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়ে থাকা সবকিছু হয়তো অন্য লোকেরা এসে টুকিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু অত টাকা কেউ নিয়ে গেলে কোথাও না কোথাও তো কিছু না কিছু পড়ে থাকতো! কিছু কথা কানে আসতো তার। বিশেষত সে তো এই পাহাড় এবং সমতল ছেড়ে একদিনের জন্যও চলে যায় নি। লোক সমাগমে গিয়ে ভীড়ের মাঝে বসে এখানে সেখানে নানা জটলায় সন্তর্পনে কান পেতে আছে। পত্রিকাগুলোও তন্নতন্ন করে ঘেঁটেছে গত দুটো মাস ধরে। অথচ এখানেই রয়ে গেছে মনস্বিতা! জীবিত! সুস্থ! কেউ কিচ্ছুটি জানে না! অদ্ভুত। এসব ভাবতে ভাবতেই বাড়ির ভেতর থেকে লম্বা দরজার দুটো অংশ মিলিত হয়েছে যেখানে তার মাঝখানের ফাঁকা অংশটি দিয়ে চোখ রেখে দেখছিল, ভেতরের বাঁধানো রাস্তাটি গেট থেকে সোজাসুজি চলে গেছে মূল দালান অবধি। দু’ধারে ফুলের গাছ। পাশে একটি একতলা ঘর। ঘরের ভেতর মৃদু আলো জ্বলছে। সামনে দড়িতে ঝুলছে পুরুষ মানুষের কাপড়। লুঙ্গি জামা গেঞ্জি এসব। আবার রাস্তার আর এক পাশে ঘন ঘাসের ওপর একটা প্রাইভেট কার দাঁড় করানো। মূলবাড়ির বিশাল প্রশশ্ত বারান্দায় পুরানো কালের বিশাল আকারের চারটে পিলার ছাদটিকে ধরে রেখেছে সযত্নে। এত প্রশস্ত এগুলো যে তার মতো দু’তিনজন মানুষ হাত ধরাধরি করে তবেই বেড় পাওয়া সম্ভব। সুবিশাল বারান্দাটিতে একটা পুরোনো আমলের ইজি চেয়ার রাখা আছে। কাঠের ফ্রেমে বেতের বাঁধাই। কেউ হয়তো রাস্তার দুপাশের ফুলের ঘ্রাণ নিতে নিতে আয়েশ করে গা এলিয়ে দেয় এই ইজিচেয়ারটাতে। টুলটুল যখন দরজার ফোকরে চোখ রেখে এসব ভাবছে ঠিক তখনই বন্ধ দরজার দুটো অংশের জোড়ায় লম্বা ফাঁকাটি দিয়ে দুটো চোখ যেন প্রায় টুলটুলের চোখের সাথে লেগে যায় এমনি করে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
-কাউকে খুঁজছেন?
প্রশ্নটি শুনেই টুলটুল চোখ সরিয়ে নিয়ে স্থান ত্যাগ করতে উদ্যত হয়। সঙ্গে সঙ্গে দরজাটি খুলে যায়। বের হয়ে আসে একজন প্রায় সত্তর-আশি বছরের অশিতীপর বৃদ্ধ মানুষ। মানুষ পেছন থেকে প্রশ্ন করে,
-শুনুন?
টুলটুল চলার গতি দ্রুত করে। সে চায় না তার চেহারাটি বাড়ির ভেতরের লোকে দেখে ওকে চিনে রাখুক। পেছন থেকে লোকটি তাকিয়ে থাকে। টুলটুলের লম্বা দীর্ঘ দেহ, কোঁকড়ানো চুল আর তার হাঁটার প্রতি পদক্ষেপ যেন লোকটি মুখস্ত করতে থাকে। টুলটুল ঊধ্বর্শ্বাসে ছোটে। যেন পেছনে পেছনে কেউ তাকে তাড়া করে আসছে। ঘোর অন্ধকার পাহাড়ের সমতলে এই মুহূর্তে লম্বা লম্বা লাইটপাস্টের আলোগুলোকে বড় অসহ্য লাগে টুলটুলের। কেউ সবগুলো আলো নিভিয়ে দিলে পারতো। কবে থেকে যেন সে অন্ধকারকে ভালোবাসতে শিখেছে। কবে থেকে যে সে অন্ধকারে নিজেকে গোপন রাখতে চায়! কবে থেকে! এসব ভাবনা বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটাতে থাকে। মনে হয় এই আলোর কারণে খুব সহজেই কেউ গোপনে তার পিছু পিছু এসে দেখে ফেলবে। চিনে রাখবে তার চেহারা। কিন্তু ঘটানাটি সত্যিই এমনই ঘটে যায়। তারই অজান্তে। বাড়িটি ঘুরে যখন টুলটুল নিজেকে লুকোতে দ্রুতবেগে হাঁটে, মনস্বিতা ততক্ষণে বাইরের কাপড় বদলে জানালায় চোখ মেলে দিয়েছে। ওই জানালার ধার ঘেঁসে চলেছে টুলটুল, তা সে জানতো না। মনস্বিতা হঠাৎ টুলটুলকে দেখে চমকে ওঠে! এমন মনে হলো যেন হঠাৎ তার সামনে দিয়েই পলকে উড়ে গেল টুলটুল। স্বপ্ন? ঘোর? হ্যালুসিনেশন? উঁহু। না। এ সত্য! হঠাৎ যেন কয়েক ঝলক রক্ত তার শরীরের শিরা-উপশিরায় ছলকে ছলকে ওঠে। তারপরই অসাড় হতে শুরু করে চৈতন্য। ততক্ষণে নিরালা নামের সেই আধো-বাঙালি আধো-পাকিস্তানি মেয়েটি এসে দাঁড়ায় ওর সামনে। হাতে একগ্লাস গরম দুধ। মনস্বিতা নির্বাক। পাথরের মতো ঠান্ডা ওর চোখ। নিরালা প্রশ্ন করে,
-শরীর খারাপ লাগছে আপা?
মনস্বিতা কোনো কথা বলে না। নিরালার দিকে স্থির চোখে একপলক তাকিয়ে কি যেন কি ভাবে, তারপর আবার বাইরে এমনভাবে তাকায় যেন নিরালাকে সে দৃষ্টি অনুসরণ করে জেনে নিতে বলছে সে কি দেখেছে। তখনো টুলটুলের ছায়া পাহাড়ের উঁচু চূড়ায় ছায়ায় মিশে যায় নি। ওই তো, লম্বা, টুলটুল। হ্যাঁ টুলটুলই। কোনো ভুল নয়। ওর গায়ের ঘ্রাণ এখনো বাতাসে বিষ ছড়িয়ে চলেছে। মেয়েটি মনস্বিতার দৃষ্টি অনুসরণ করে বাইরে তাকায়। কিছু চোখে পড়ে না তার। স্তব্ধবাক মনস্বিতার দিকে চেয়ে কিছুটা বিস্মিত। ফিরে যায়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রমা আসেন,
-মনস্বিতা, কি হয়েছে?
খুব শান্ত কংক্রিট মনস্বিতার কণ্ঠস্বর। হাতের আঙুল তুলে যেদিকে নির্দেশ করে সেদিকে তাকিয়ে রমা কিছুই খুঁজে পান না।
-ওদিকে কি?
-টুলটুল।
রমাও যেন খানিক আঁতকে ওঠেন,
-কি বলছ? টুলটুল?
-হ্যাঁ। আমি স্পষ্ট দেখলাম। চলে এসেছে এখানেও।
-ঠিক দেখেছ?
-আমার দেখায় কোনো ভুল নেই রমা।
-দাঁড়াও। রব চাচা, রব চাচা?
গলা চড়িয়ে ডাকেন রমা। ডাকাডাকির শব্দ শুনে নিরালার দাদা মুন্সী আব্দুর রব এসে দাঁড়ান সামনে। একজন লম্বা এবং বৃদ্ধতর মানুষ। হাতপায়ের চামড়ায় গভীর ভাঁজ বলে দেয় বয়সের নাম। গম্ভীর তার উপস্থিতি। মনস্বিতা এই প্রথম মানুষটিকে খুব কাছ থেকে দেখে। আগে দুচারবার দেখেছে। কিন্তু আজ মুগ্ধ হয় সে মানুষটিকে দেখে। লম্বা সাদা দাড়ি প্রায় বুক ছুঁয়েছে। কপালে সেজদার দাগ স্পষ্ট। খুব বিস্মিত হয়। হিন্দু বাড়িতে একজন মুসলমান পুরুষের এমন আস্তিক্যবাদের ধার ঘেঁষে অবস্থান! পরম ঈশ্বরে আনত মানুষটির এ বাড়িতে বিশ্বস্ত অবস্থান তাকে বিস্মিত করে। মনে মনে ভাবে,
-এও সম্ভব তবে? একই ঘরে পুজোপাঠ। নামাজ। হিন্দু মুসলিম সবে মিলে পরম শান্তিতে বসবাস! এটাই বুঝি ঈশ্বরবাসের পবিত্রতম স্থান! এখানেই তো ঈশ্বরের সর্বোৎকৃষ্ট খেলার মাঠ। তাতেই বুঝি এই বাড়িটির বাতাস এতটা নির্মল। এ কারণেই এখানে বাক্য এত নরম। শান্ত এখানে মন। মানুষ এখানে সরল আর ভালোবাসে মানুষকে।
-বলুন বেটি?
মুন্সী রবের কথায় মনস্বিতার ভাবনায় ছেদ ঘটে। রমা প্রশ্ন করেন,
-কেউ এসেছিল? কিছু জানো?
-হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ চারজন। সামনে মারাত্মক কোনো বিপদের আশংকায় সন্ত্রস্ত এখানে দাঁড়ানো চারটি মানুষ। নিরালা কিছু বুঝে কিছু না-বুঝে চুপচাপ। মুন্সী রব অনেক চড়াই উৎড়াই পার করেছেন জীবনের। পাকিস্তানিদের ক্যাম্প থেকে ছাড়া পাবার পর নিরালাকে জন্ম দিতে গিয়ে তার একমাত্র মেয়ের মৃত্যুশোকের পাথর এখনো চেপে আছে তার বুকে। নিরালাকে ছেড়ে থাকতে পারেন নি। যুদ্ধদিনের মধ্যেই তিনি চলে আসেন রমার কাছে। মেয়ের ঘরের নাতির সাথে থাকার জন্য আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তখনো রমার স্বামী ডাক্তার রাজর্ষী বেঁচে। রমা সন্তানসম্ভবা। তিনমাসের নিরালা রমার আদরে আহ্লাদে বড় হতে থাকে। রমা ইন্টার্নি করছেন। যুদ্ধে বিপর্যস্ত বিধ্বস্ত নারীদের সেবায় নিয়োজিত ডাক্তার রমা আর ডাক্তার রাজর্ষী নারায়ণ দুজনই। কিন্তু তারপর আরও ঝড়। বাকি রয়ে যায় অনেক ভাঙন। তছনছ করে দিয়ে যায় সব। রমার জীবন। তার সন্তান। স্বামী। নিজের মেয়েটির এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর যন্ত্রণার রেশ শেষ হতে না হতেই এখানে এই বাড়িতে নিজের চোখে দেখতে হয় আরও বীভৎস হত্যাদৃশ্য।
সেদিন বিকেলে হসপিটাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন মাত্র রমার স্বামী রাজর্ষী নারায়ণ চৌধুরী। নাইট ডিউটি ছিল রমার। ইভনিং সিকনেস সেদিন প্রচণ্ড তার। ন’মাসের গর্ভবতী রমা তাই ছুটি নিয়েছেন। বিকেলে টেবিলে নিজের হাতে নাস্তা লাগিয়ে অপেক্ষা করছিলেন স্বামী হাতমুখ ধুয়ে আসবেন। তারপর একসাথে নাস্তা সারবেন। ঠিক তখনি সদর দরজায় একটানা দুমদাম শব্দে মুন্সী রব দরজা খুলে দিয়েছিলেন। হুমমুড় করে ঢুকে পড়েছিল ঘরে তিনজন মুক্তিযোদ্ধা। ছেলেগুলো তাদের চেনা। প্রায়ই আসা যাওয়া রয়েছে তাদের এ বাড়িতে। আজ দু’জনের হাতেপায়ে রক্তাক্ত ক্ষরণ। গুলি খেয়েছে। ডাক্তার রাজর্ষী হাতমুখ ধুয়ে টেবিলে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের দেখে ওদের দিকেই আগে এগিয়ে যান। খেতে বসা হয় না। মুন্সী আব্দুর রব নিরালাকে রমার কোলে দিয়ে খুব দ্রুত বেগে বালতি ভরে জল আনেন। তারপর দ্রুতহাতে নিজেই একটা কাপড় ভিজিয়ে নিয়ে মাটিতে ঝরেপড়া রক্তের দাগ মুছতে লেগে যান। সদর দরজাটা ভুল করে লাগানো হয় নি। ঘটনার আকস্মিকতায় কারো সেদিকে খেয়াল হয় নি। মুন্সী মাথা নিচু করে সন্তপর্ণে রক্তের দাগ মুছে ফেলার প্রাণপণ চেষ্টায় রত। ততক্ষণে মুক্তিযোদ্ধাদের তাড়া করা খানসেনার একটা দল ঢুকে পড়ে একেবারে ভেতর বাড়িতে। নুয়ে থাকা মুন্সীর ঠিক মাথার কাছে হঠাৎ একজোড়া বুট এসে থেমে যায়। বাকিরা ভেতরে এগিয়ে যায়। হিম হয়ে আসা শরীরের সব ভার যেন এসে জড়ো হয় তার মাথায়। মাথাটি তুলবে কি তুলবে না ভাবে। দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে একটা খারাপ গালি দেয়,
-শালা বেজন্মা… আহ্।
ঠিক তখনি থুতনিতে একটা লাথি খেয়ে উড়ে ছিটকে গিয়ে পড়ে দূরে,
-মুক্তি কাঁহা হ্যয়?
মুন্সীর উত্তরের তোয়াক্কা না করেই রক্তের দাগ ধরে ধরে ভেতর বাড়িতে ঢুকে পড়ে। রমা বিস্ফারিত চোখে দেখছেন। ছুটে আসে মুন্সী রমার কাছে। রমা কোলের নিরালাকে তার কোলে এগিয়ে দিতে দিতে ভাবেন কি করবেন কি বলবেন এসব। ঠিক তখনই আবার প্রশ্ন,
-মুক্তি কাঁহা হ্যায়?
-মুক্তি?
-হা হা মুক্তি কাঁহা হ্যায়?
-ইধার কোই মুক্তি নেহি?
-আ আ আহ, তুম ঝুট বোলতি হ্যায়।
-নেহি। ম্যায় সাচ কহুঁ।
– সালি, বাঙালি।
গালি শুনেই জ্বলে ওঠে রমার চোখ।
-সব সালা বাঙালি, বেঈমান হো।
রমার শিরদাঁড়া টনটন করে ওঠে আগত সন্তানের ভারে। কিন্তু বুকের ভেতর অপমানের ক্রুদ্ধ আস্ফালন। জ্বলে ওঠে ক্রোধ। শিরশিরে কণ্ঠে দাঁত চেপে উচ্চারণ করেন,
-বাঙালি… বেঈমান নেহি হ্যায়।
ভয়ঙ্কর শৃগালের মতো চকচক করে ওঠে খানসেনার চোখ। একবার তাকিয়ে দেখে রমার শরীরের দিকে। রমা অন্তঃসত্তা। তারপর, একটা সজোর লাথি লাগায় নয় মাসের গর্ভবতী রমার পেটে। চিৎকার করতে থাকে,
-সালি, ওর কোই বাঙালি কি ওলাদ প্যায়দা নেহি হোনে দেঙ্গে।
রমা কিছু বুঝে ওঠার আগেই টের পান গলগলে গরম রক্তের স্রোতে ভেসে ভিজে যাচ্ছে তার পায়ের নিচ থেকে সারা শরীর, গায়ের কাপড়। অসহ্য ব্যথা সহ্য করে আর শরীরের ভার রাখতে পারেন না একা। মরিয়া হয়ে দুহাতে আগলে ধরেন পেটের নিচের দিকটায় আসন্ন সন্তানের জীবনটা যদি কোনোমতে বাঁচানো যায়!
-আহ্।
বুক ফেটে একটা আর্তনাদ বের হয়ে আসে তার। ততক্ষণে পেছন থেকে মেরুদণ্ডের মাঝবরাবর বন্দুকের বাটের আরও একটা আঘাত খেয়ে আর টাল সামলাতে পারেন না। রক্তের ওপর পিছল খেয়ে উপুড় হয়ে পড়ে যান। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখেন নয় মাস ধরে তিলতিল করে নিজের শরীরে ধারণ করা সন্তানের সব রক্ত গলে গলে পড়ে যাচ্ছে মাটিতে। কিছু করার নেই। অন্ধকার হয়ে আসছে চোখের সামনের সব। কোন এক গভীর কুয়াশারাত্রির হিমজর্জর শীতলতার ভেতর থেকে কেবল শুনতে পান একটি অসহায় মানব শিশুর ডাক,
-মা… মা… মা…
-আহ্…
বুকের ভেতর থেকে কেউ ছিঁড়ে নিয়েছে বুঝি তার নাড়ি। জ্ঞান হারাবার শেষ মুহূর্তেও স্বামীর নাম ধরে ডাকেন না। পাছে খান সেনারা টের পেয়ে যায় সব। ততক্ষণে পাশের বাড়ির পাঁচিল গলে রাজর্ষি নারায়ণ চার মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন যেখানে পাশের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান। এখন আর কেউ নেই বাড়িটিতে। সুনসান নীরব। বাড়ির লোকেরা যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই বাড়ি ছেড়ে গ্রামে পালিয়েছেন। এখন নিস্তব্ধ অন্ধকার বাড়িটি। কোনোমতে হামাগুড়ি দিয়ে তারা যে জায়গাটিতে পৌঁছান সেখানে পাশাপাশি কয়েকটি কবর। ঘাস লতাগুল্ম আর পাগাড়ে বোঝাই। সেদিকে তাকিয়ে একজন মুক্তিযোদ্ধা হতবিহ্বল। আশাহত শূন্য দৃষ্টি। প্রশ্ন করে,
-স্যার, কি করবো এখন?
-কি করবে মানে? ঢোকো। কবরের ভেতর ঢুকে পড়ো।
মুক্তিযোদ্ধা কবরের ভেতর ঢুকে পড়তে গেলে রাজর্ষি নারায়ণ বাধা দেন।
-আগে দেখি, দাঁড়াও।
আধো অন্ধকারে দেখতে পান ভেতরে চারপায়ে ছেনে তোলা শেয়ালের গলি। বিশাল করে একটা সুড়ঙ্গও কেটেছে শেয়ালেরা। পরের কবরটার সামনেও একটা সুড়ঙ্গ। কবরের ভেতর হামা দিয়ে আগে তিনিই ঢুকে পড়েন শেয়ালের সুড়ঙ্গ বেয়ে। এছাড়া এই মুহূর্তে আর কিচ্ছু করার নেই। আবার বের হয়ে আসেন,
-শোনো, দুটো কবরে দু’জন দু’জন করে সুড়ঙ্গ গলে ঢুকে পড়ি চল।
মাথায় তখন কেবল বাঁচার চিন্তা। মাটি ও বাঁশের চাঙের দিকটা না সরিয়ে দুটো কবরেরই সুরঙ্গের মুখটা বড় করেন চারজন মিলে। কবরের ভেতর নিঃছিদ্র অন্ধকার। অন্ধকারেই জ্বলজ্বল করে জ্বলছে একটা কাফনের কাপড়। মৃতদেহটা পঁচে মিশে গেছে মাটিতে বহু আগেই। কেবল সাদা কাপড়টি কবরের অন্ধকারে উজ্জ্বল আলো ছড়িয়েছে। রাজর্ষি নারায়ণের মনে হল আজকের রাতের অন্ধকারকে দূর করে আলো জ্বালাতেই এই সাদা ঝকঝকে চাঁদের আলোর মতো সাদা কাফন। ও বাড়িতে উঁকি দিতেই ভেসে আসে এলোপাথাড়ি গুলির শব্দ। কী এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা ভার হয়ে আসে তার। মুক্তিযোদ্ধাদের সেটা বুঝতে না দিয়ে বরং তাড়া দেন,
-এসো, ঢুকে পড়ো। ভেতরে ঢুকে পড়ো তোমরা?
-আপনি?
-তোমরা আগে নিরাপদে ঢোকো। আমি শেষে।
আগে পা দুটো ঢুকিয়ে দেয় মুক্তিযোদ্ধা দুজন দুটি কবরে। তারপর শরীরটা গলায়। মুখটা কেবল বাইরে। রাজর্ষি র্নারায়ণ লতাগুল্ম মরা গাছ গাছালি টেনে কবরের মুখটা ঢেকে দিয়ে নিজের মাথাটিও ভেতরে ঢুকিয়ে চোখ দুটো বাইরে রেখে তাকিয়ে থাকেন। ও বাড়িতে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। বুকের ভেতর স্তব্ধ যাতনা, ভেতরে রমার কি অব্সথা কে জানে। গুলির শব্দ শোনা যায় আরও বার কয়েক। কানে তালা লাগে। খানসেনাদের বুটের শব্দে ভারি হয়ে আসে রাতের অন্ধকার। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে কেঁপে ওঠে মন। বুকের ভেতর একটা চাপ অনুভব করেন ডাক্তার রাজর্ষী। ওপরে মুখ তুলে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলেন,
-রমা… রমা…
কবরের ভেতর দমবন্ধ করা গরম। গা তেতে উঠছে। বাইরে গুলির শব্দ। দুই বাড়ির দেয়াল ভেদ করে কিছু গুলি এসে পড়ে কবর দুটোর কাছাকাছি। পর মুহূর্তেই ঝপাঝপ্ করে নেমে পড়ে এ বাড়িতে কয়েকজন খানসেনা। কবরের সামনে দুটো চোখ বের করা ওদের। চোখের ওপর দিয়ে ঘুরে ঘুরে এদিক সেদিক খানসেনাদের বুটের অস্থির চলাচল দেখে বোঝা যায় সন্তর্পণে ওরা খুঁজে চলেছে মুক্তিযোদ্ধাদের। দুটো কবরের ভেতরে অন্ধকার। কে জানতো মৃত মানুষের কবর একদিন বাঁচার আশ্রয় হবে জীবিত মানুষের! তবু সেখানে অনিশ্চিত এক ফাঁপর। প্রাণ ওষ্ঠাগত যেন। কোন সময় খানসেনারা চলে গেছে ঠাহর করতে পারে নি কেউ। আদৌ গেছে কিনা কেউ জানে না। সমস্ত বাড়িটি নিচ্ছিদ্র, নিশ্চুপ। কেবল শিশু নিরালার কান্নার শব্দ সুবেহ সাদিকের সূক্ষ্ণ সাদা রেখাটিকে ভেঙে দিয়ে জানান দিয়ে যায় কোনো এক অশুভ খবর!
দুজন মুক্তিযোদ্ধা কাকডাকা ভোরে বের হয়ে এসে যখন ডাক্তার রাজর্ষীকে টেনে বের করে। ততক্ষণে তিনি বাংলার স্বাধীনতাযুদ্ধ শেষ করেছেন। তাকে বের করে বাইরে এনে শুইয়ে দেয়। তার পেছনে কবরে লুকিয়ে ছিল যে, সেই মুক্তিযোদ্ধাকে যখন উদ্ধার করা হয় ততক্ষণে সেও মুমুর্ষু। ত্রস্তপায়ে মুক্তিযোদ্ধারা ডাক্তার রাজর্ষীর বাড়িতে ঢোকেন। তখনো মৃত্যুভয়। ততক্ষণে মুন্সী আব্দুর রবের হাতে রিসিভার,
-হ্যাঁ। আসুন। এখনো প্রাণ আছে মনে হচ্ছে।
রমাকে নিতে অ্যাম্বুলেন্স আসে। ডাক্তার রাজর্ষী নারায়ণের মৃত্যুর খবর তখন জানানো সম্ভব হয় না রমাকে। সুবেহ সাদিকের পরপর আলো-অন্ধকারের ভোরে রমাকে নিয়ে দ্রুতবেগে ছুটে যায় অ্যাম্বুলেন্স। তিনজন মুক্তিযোদ্ধা আর মুন্সী রব তিনমাসের নিরালাকে কোলে করে রাজর্ষী নারায়ণের শবদেহ নিয়ে ছোটেন শশ্মানে…
সেই থেকে এ বাড়িতে মুন্সী আব্দুর রব ছায়ার মতো পিতার মতো রক্ষীর মতো বটবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বহু বেদনার ধারক হয়ে। অনেক কিছুর সাক্ষী হয়ে।
স্মৃতির পাতাগুলো আজকাল ঝাঁপসা দেখা যায়। বয়স হয়েছে। তবু মনে হচ্ছে তিনি ভুল দেখেন নি। ফিরে আসেন আবার বর্তমানে,
-মা। যিনি এসেছিলেন তার গতিবিধি সুবিধের নয়।
মুনশীর কণ্ঠে অদ্ভুত এক নির্দিষ্ট এবং নিশ্চিত হবার সুর। মনস্বিতার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। রমা খানিক অস্থির হয়ে ওঠেন।
-মনস্বিতা, টুলটুলের ছবিটা বের করে দেখাও তো।
সম্মোহিতের মতো মনস্বিতা ছবিটি বের করে সামনে মেলে ধরে। মুন্সী সত্তর বয়সের চোখ একটু কুচকে নেন। তারপর বড় বড় করে তাকিয়ে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়েন।
-হ্যাঁ। এই ব্যক্তিই এসেছিলেন।
রাত্রি ঢলে পড়েছে গভীরে। ঘন রাত্রির বুকে পাহাড়ের গভীর অরণ্য থমথম করে বেজে ওঠে। মনস্বিতা দিব্যচোখে দেখতে পায়, এ বাড়ির সদর দরজা থেকে ফিরে একটা শিকারী ঈগলের মতো ভীম আকার নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে আবার বসেছে। ডানায় ক্ষিপ্ততা। চোখ দুটো রক্তাভ, লাল। পায়ে তীক্ষ্ণ নখর। নিঃশ্বাসে বিষ। বিশাল ডানা দুটো মেলে দিয়ে বসে রয়েছে পাহাড়ের ওই চূড়ায়। যে কোনো মুহূর্তে ডানা দুটো ছড়িয়ে সূর্যের সব আলো ঢেকে দিয়ে নেমে আসবে নিচে, ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে তার গর্ভের সন্তান।

(চলবে)