শাহাদুজ্জামানের সাক্ষাৎকার > “সাহিত্যে সাইলেন্ট মেজরিটির শক্তিতে আমি বিশ্বাস করি…” >> সাক্ষাৎকার গ্রহণে : ইলিয়াছ কামাল রিসাত

0
2811

[সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ : ২৫ নভেম্বর ২০১৯। স্থান : ব্রাইটন, ইংল্যান্ড।]

বেশ কয়েক মাস ধরে কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক শাহাদুজ্জামানের অধীনে আমি পিএইচডি গবেষণার কাজ করছি। এতটা নিবিড় সান্নিধ্যের পর এতদিনে সুযোগ হল তাঁর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবার। অনেক সাক্ষাৎকারেই তিনি সাহিত্যের নানান দিক, তত্ত্ব, নিজের লেখালেখি, যন্ত্রণা সংগ্রাম- নানান কথা বলেছেন। কিন্তু আমি এই যে সাক্ষাৎকার নিয়েছি তাতে আমার কৌতূহল শুধু লেখক শাহাদুজ্জামানের লেখালেখির বিষয়আশয়ের দিকে নিবদ্ধ ছিল না, তাঁর জীবনপরিক্রমাতেই বেশি মনোযোগ দেয়ার চেষ্টা করেছি। লেখকজীবনের নানা চড়াই-উতরাই থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিষয়ে তিনি যে কাজ করেছেন, সেসব কথাও আমি জানবার চেষ্টা করেছি। সামগ্রিক বিচারে, কৌতূহলী মানুষ ও লেখক শাহাদুজ্জামানের অবয়বটি স্পষ্ট করে বুঝবার জন্যে এই সাক্ষাৎকার। পাঠকেরা এখানে শাহাদুজ্জামান সম্পর্কে নতুন কিছু বিষয়ের হদিশ পাবেন বলে মনে করি।

রিসাত : একটু হালকা করেই বলি- আপনি লেখালেখি না করলে পাঠকদের কি ক্ষতি হত বলে মনে করেন? প্রশ্নটা আপনার লেখক পরিচয়ের সার্বভৌমত্বে হানা দিতে পারে, তাও সম্প্রতি আপনার ‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখি’র প্রথম গল্প ‘জনৈক স্তন্যপায়ী প্রাণী, যিনি গল্প লেখেন’ পড়ে মনে হল আপনি আপনার লেখক জীবনের এই পর্যায়ে এসে আপনার লেখার জগত ও এর জন্য উপযোগী পাঠককুলের সন্ধান পেয়ে গেছেন। অনেকটা ইনক্লুশন/এক্সক্লুশনের মতো।

শাহাদুজ্জামান : প্রথমেই বলি পাঠক পাঠিকার লাভ ক্ষতি বিবেচনা করে তো কোনদিন লিখিনি। লিখি আসলে নিজেকে বাঁচাতে। জীবন, জীবিকা, মন, শরীর সব নিয়ে এই বেঁচে থাকার যাত্রাটা তো খুব সহজ না। লিখে আমি আমার এই বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজি। প্রতিবার লেখা শেষে আমি বেঁচে উঠি। লিখতে লিখতে আমি আমার ভেতরের প্রশ্ন, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব- এসবের মোকাবেলা করি। লেখা আমার কাছে ক্যাথেরসিসের মতো। লিখতে লিখতে এক পর্যায়ে দেখেছি অনেক পাঠক পাঠিকাও আমার এই বেঁচে থাকার যাত্রার সঙ্গী হয়েছেন। আমি না লিখলেও তাদের ক্ষতি হত না, তারা হয়তো অন্য কারো সঙ্গী হতেন। আসল কথা কারো জন্যই পৃথিবীর কোন কিছু থেমে থাকে না। আমি না লিখলেও পৃথিবীর কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হতো না। আমি সত্যিই পাঠক সন্ধান করে কখনো লিখিনি। তিন দশক আগে লেখা শুরু করেছি, কিন্তু এই ২০১৯ সালে এসেও এমন পাঠকের সন্ধান পেয়েছি যিনি আমার লেখা প্রথম পড়ছেন। ফলে আমার পাঠক-পাঠিকা গোষ্ঠীর ইনক্লুশন, এক্সক্লুশন সব নির্ধারিত হয়ে গেছে সেটা বোধহয় ঠিক না।

রিসাত : আমি আসলে প্রশ্নটা করেছিলাম আপনার ‘জনৈক স্তন্যপায়ী…’ গল্পের সূত্র ধরে। সেই গল্পে আপনি ‘অভিযাত্রী’ পাঠকের কথা উল্লেখ করেছেন, যারা ‘নতুন মানচিত্রে পা রাখতে ভয় পায়না। এমন এক মানচিত্র যার নদী, পাহাড়, লোকালয় তাদের অপরিচিত’। অভিযাত্রী পাঠকের বাস্তবতা আমাদের দেশে দুরূহ ব্যাপার। প্রচলিত ধারার গল্প-উপন্যাসের বাইরে নিরীক্ষাধর্মী লেখার প্রতি আগ্রহী অভিযাত্রী পাঠক পাওয়া তো কঠিন।

শাহাদুজ্জামান : অভিযাত্রী পাঠক-পাঠিকা পাওয়া কঠিন ঠিকই কিন্তু অসম্ভব না। পাঠক-পাঠিকাকে আন্ডারএস্টিমেট করার কোন কারণ নাই। পাঠক-পাঠিকার রুচিকে শুধু ফলো করলে চলে না, রুচি তৈরিও করতে হয়। সেটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। ধৈর্যের ব্যাপার। আমার প্রথম বই ‘কয়েকটি বিহবল গল্পের‘ গল্পগুলো মোটেও প্রচলিত ধারার ছিল না। এসব গল্প কেউ পড়বে কী পড়বে না সেসব নিয়ে আমি ভাবিনি। যারা পড়েছেন তাদের অনেকেই হয়তো এই ধারার গল্প পড়ায় স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি কিন্তু অনেকেরই এর নতুন স্বাদ পছন্দ করেছে। তারা আগ্রহ নিয়ে আমার পরের বইয়ের অপেক্ষা করেছে। তাদের ভেতর সেই অভিযাত্রী পাঠকের মন জেগে উঠেছে। সাহিত্যের নতুন মানচিত্রে ঢুকবার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে দীর্ঘ দিন ধরে আমার একটা পাঠক-পাঠিকা গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। পাঠক-পাঠিকা নিরীক্ষাধর্মী লেখা পড়ে না, একতরফাভাবে সেই কথাটা হয়তো সত্য না। তাদেরকে নিজের লেখার দিকে মুখ ফেরাবার জন্য সময় দিতে হয়।

রিসাত : ১৯৯৬ সালে ‘কয়েকটা বিহবল গল্প’, ১৯৯৯ সালে ‘পশ্চিমের মেঘে সোনার সিংহ’। দীর্ঘ বিরতির পর ২০১২ সালে ‘কেশের আড়ে পাহাড়’। গল্পের মধ্যে আপনার চিন্তাজগতের একটা সাযুজ্য এবং বিবর্তন খোঁজার জন্য এই সময়ের ব্যবধানের বিষয়টা উল্লেখ করলাম। আপনি আগেও বলেছেন বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে, প্রথম বই দুইটির মধ্যে পোস্ট-মার্ক্সিস্ট একটা ক্রিটিক এবং কমিউনিস্ট স্বপ্নভঙ্গের যাবতীয় বিষয় হাজির হয়। কিন্তু ২০১২’র দিকে এসে গল্পগুলোতে সাইকোএনালিটিক, এবং বিশ্বায়িত পৃথিবীতে বিভিন্ন অফট্র্যাক মানুষের নানাবিধ ‘দিশেহারা তৎপরতা’ দেখা যায়, যেখানে সারভাইভালকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছেন। এই যে একটা জ্ঞানতাত্ত্বিক বা এপিস্টেমোলজিক্যাল শিফট এটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? আপনি প্রথমদিকে আপনার বিষয়কে যে লেন্সে দেখতেন সেই লেন্সটাও বদলেছে ২০১২ সালের গল্পে। এই ট্রানজিশন নিয়ে যদি কিছু বলতেন। অর্থাৎ আপনার ব্যক্তিগত চিন্তাজগতের দার্শনিক রূপান্তর সম্পর্কে জানতে চাইছি আমি। এটাও বলে রাখি, আপনি ১৯৯৯ ও ২০১২-এর মধ্যে বিদেশে পাড়ি দিয়ে অবস্থানও শুরু করেছেন।

শাহাদুজ্জামান : গল্পের ভেতর চিন্তাজগতের একটা বিবর্তন যে এসেছে সেটা তুমি ঠিকই বলেছো। আমার গল্প লেখার শুরু প্রধানত নব্বই দশকের শুরুর দিকে যখন বিশ্বপরিস্থিতির একটা বড় বাঁক বদল হয়েছে, সমাজতান্ত্রিক ব্লকের পতনের ভেতর দিয়ে। তারুণ্য যে কারুর জন্য একটা ফর্মেটিভ সময়, সেই পুরো আশির দশকে আমার তারুণ্য কেটেছে একটা ভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। আমাদের দেশে তখন মিলিটারি শাসন, আমরা তার বিরুদ্ধে লড়ছি। পৃথিবীর দেশে দেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বপ্ন নিয়ে তরুণ-তরুণীরা আন্দোলন করছে। শিল্প সাহিত্যেও সেই বিপ্লবী ভাবনার চর্চা হচ্ছে। তো আমাদের মনোজগতে এসবের একটা বড় অভিঘাত তো ছিলই। আমি ঠিক সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলাম না, কিন্তু রাজনীতির সাংস্কৃতিক, দার্শনিক দিকটাতে বেশ আগ্রহী ছিলাম। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলাম, লেখালেখি করতাম। লেখালেখি কোন অরাজনৈতিক কাজ না সেটা খুব ভালই টের পেতাম। মার্ক্সীয় ভাবনা অনুপ্রাণিত করতো। কিন্তু নব্বই দশকে আমাদের চোখের সামনে এই বিশ্বপরিস্থিতি বদলে গেল। সমাজতান্ত্রিক বলয়ের পতন ঘটলো। এই নতুন বাস্তবতায় পৃথিবীর দিকে, জীবনের দিকে, সংসারের দিকে নুতন করে তাকাতে শুরু করলাম। অনেক চেনা ভাবনাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলাম। এইসব প্রশ্ন, দ্বিধাগুলো ধরতেই আমি তখন গল্প লিখতে শুরু করি। আগে আমি প্রবন্ধ লিখতাম মূলত, কিন্তু দেখলাম প্রবন্ধ কেবল সিদ্ধান্ত চায়। আমি তো তখন কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছিলাম না, কিংবা বলা যায় চাচ্ছিলামও না। বরং নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে আগ্রহী ছিলাম। গল্পে সেটা সম্ভব। আমার গল্পের চরিত্রগুলো আমার এইসব প্রশ্নগুলোই বয়ে বেড়ায়। তারপর ধরো এর মধ্যে আমার ব্যাক্তিগত জীবনেও নানা পরিবর্তন এসেছে। পেশাগত কারণে বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে ঘুরেছি, বিয়ে করেছি, সন্তান হয়েছে, তারপর তুমি যেমন বললে, এক পর্যায়ে ইউরোপে পড়াশোনা করেছি, কাজের সুত্রে বৃটেনে বসবাস শুরু করেছি। তো আমার মনোজগতে এসবের প্রভাব আছেই। আমিই তো আমার লেখার বাহন। আমার সাবজেকটিভিটি তাই জরুরি। আমার ব্যাক্তিজীবনের অভিঘাত লেখাতে আসাটা স্বাভাবিক। এইসব নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাওয়ার কারণে আগে যেমন বাইরের পৃথিবীর দিকে তাকানোর ঝোঁক ছিলো বেশি, ধীরে ধীরে মনের ভেতরটার দিকে তাকানোর ঝোঁকও বাড়লো। আমার ‘কেশের আড়ে পাহাড়’ বইটার গল্পের ভেতর সেই বাঁক-বদলের চিহ্ন আছে সেটা তুমি ঠিকই বলেছো। জ্ঞানতাত্ত্বিক দিক থেকেও চিন্তার বদল হয়েছে। ইউরোপ, যা মডার্নির্টির পীঠস্থান, সেখানে বসবাস করতে করতে মডার্নিস্ট ধারণার ফাঁক-ফোকরগুলোও চোখে পড়েছে। মার্ক্স অসামান্য চিন্তক কিন্তু মার্ক্সের ভাবনাও এক ধরনের মর্ডানিস্ট প্রজেক্টের অংশ। আমি ক্রমশ প্লুুর‌্যালিস্টিক মডার্নিটি নিয়ে যাঁরা ভেবেছেন তাদের চিন্তার ব্যাপারে আগ্রহী হয়েছি। সেই সূত্র ধরে ডিকলোনাইজেশন নিয়ে যারা ভাবছেন তাদের চিন্তা অনেক প্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। আমি ক্রমশ আরো বেশী সচেতন হয়েছি যে আন্তর্জাতিকার প্রেক্ষাপট চিন্তায় রাখলেও ভাবনায় স্থানিকতা খুব জরুরি। বলতে পারো, এই যে বইয়ের নাম দিচ্ছি ‘কেশের আড়ে পাহাড়‘ যা লালনের গান বা ‘মামলার সাক্ষী ময়না পাখী‘, যা একটা পুঁথি ইত্যাদি; আমার ওই স্থানিকতার ভাবনা থেকে এসেছে। চিন্তার এই বিবর্তনকে আমি সক্রিয়ভাবে বেঁচে থাকার শর্ত বলে মনে করি। চিন্তার এই বিবর্তন মানে তো এই না যে আমার আগের চিন্তাকে একেবারে বাতিলের খাতায় রেখে দিচ্ছি। এক চিন্তার উপর দাঁড়িয়েই তো আমি পরের চিন্তায় যাচ্ছি। কোনটা চূড়ান্ত সত্য সেটা নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে সত্য খোঁজার চিন্তাটা আমার কাছে জরুরি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোন একটা উপন্যাসের চরিত্র বলে- ‘জীবনের মূল সত্য কি আমার কখনো তা জানব না তবু আমাদের জীবনের মূল সত্য খুঁজতে হবে, এটাই হচ্ছে জীবনের মূল সত্য।’ কথাটা সেই নবীন কিশোর বয়সে পড়েছিলাম কিন্ত মনে গেঁথে আছে এখনও।

রিসাত : বাংলাদেশের লেখকগোষ্ঠীর কিছু প্রসঙ্গ আনতে চাই। খোলা চোখে দেখি, আমাদের লেখক ‘গোষ্ঠী’ একধরনের কৌম আনুষ্ঠানিকতায় বেশ ব্যস্ত থাকেন। ফেসবুক কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আসার পরে বিষয়টা আরো পরিস্কারভাবেই চোখে পড়ে। একধরনের দলাদলির প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই ধরনের কোন তৎপরতায় আপনাকে দেখেছি বলে আমার মনে পড়ে না কিংবা আপনার বিভিন্ন সাক্ষাৎকারেও এসবের প্রতি একটা তির্যক মনোভাব লক্ষ করি। এর পেছনের কারণ সম্পর্কে জানতে চাই। এটা কি আপনি যে সমস্ত লেখকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন (যেমন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির) তাদের প্রভাব নাকি নিজের একটা বোধ থেকে এই ধরনের আনুষ্ঠানিকতা থেকে দূরে থাকেন? এই বিষয়ের সাথে সম্পর্ক রেখে নতুন যারা লিখছে তাদের জন্য আপনার কিছু বলার আছে কিনা জানতে চাই।

শাহাদুজ্জামান : সাহিত্য যারা করতে আসে তারা তো একরকম দলছুট মানুষ। ফলে এই দলছুট মানুষেরা একসাথে বসে নিজেদের সুখ-দুঃখের কথা বলতে ভালোবাসে। সেটা ঠিক আছে। এই গোষ্ঠীবদ্ধতার ভেতর একটা স্বাভাবিকতা আছে। কিন্তু এ ব্যাপারটাই যখন দলবাজিতে পরিণত হয় তখন সেটা বিপদজনক হয়ে ওঠে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই দলাদলি অবশ্য কালে-কালে ছিল, এখনও আছে। সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমার সুহৃদ আছে, সমমনা মানুষ আছে, কিন্তু এই যে জোট বেঁধে একে অন্যের সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা করা, নিজেদেরকে সাহিত্যের প্রধান প্রতিনিধি ভাবা, অন্য দলের লেখকদের ধুলিসাৎ করা- এসবে সত্যিই আমার রুচি নাই। আমার সাহিত্যের সাথে যুক্ত হবার পথ এবং প্রণোদনাটা ওই ধারার না। তুমি যাদের কথা বললে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বা শহীদুল জহির এদের ভেতর এসব দলাদলির প্রবণতার ছিঁটেফোটাও কখনো দেখিনি। তারা এসব, যাকে তুমি বললে ‘কৌম আনুষ্ঠানিকতা’, সেগুলো তাঁরা এড়িয়ে চলতেন। আমার মনে হয় যারা খুব দল পাকিয়ে চলে তাদের ভেতর হয়তো লেখক হিসেবে একটা ‘ষ্টাটাস এ্যাংজাইটি‘ থাকে। তারা ঠিক নিশ্চিত হতে পারে না সাহিত্যে তাদের অবস্থান ঠিক কোথায় কিম্বা অবস্থানের নড়চড় হচ্ছে কিনা। ফলে তাদের খুব কাছে সবসময় কাউকে লাগে যারা তাকে প্রতিনিয়ত এই নিশ্চয়তা দেবে যে তুমি খুব বড় লেখক। গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে থাকলে এক ধরনের কমফোর্ট জোনের ভেতর থাকা যায়। ইংরেজিতে একটা কথা আছে ‘সেফটি ইন নাম্বারস‘, দল সংখ্যার ওই নিরাপত্তা দেয়। ইলিয়াস ভাই, শহীদুল ভাইকে দেখেছি সাহিত্যিক নিরাপত্তা নিয়ে তাদের কোন দুশ্চিন্তাই ছিলো না। তারা জানতেন যে আল মাহমুদ যাকে বলেছিলেন ‘কালের র‌্যাঁদার টান’ তাতে বিচার্য শুধুমাত্র লেখাটাই। তারা কালের গর্ভের কাছে কমিটেড ছিলেন এবং সর্বোচ্চ শ্রম দিয়েছেন লেখাটাকে তৈরি করতে। কোন কমফোর্ট জোনের ভেতর থেকে আত্মশ্লাঘা নিয়ে সাহিত্যচর্চার কোন প্রয়োজন তারা বোধ করেননি। ইলিয়াস ভাইয়ের বাসার আড্ডায় সাহিত্যিক যত না থাকতো, তার চেয়ে সাহিত্যের বাইরের মানুষই বেশী থাকতো দেখেছি। শহীদুল জহির তো লোকজনের সাথে কথাই তেমন বলতেন না। তাঁরা দলবল নিয়ে সাহিত্য করতেন না। অথচ তাঁদের লেখা কেমন দিনে দিনে আরো ইনফ্লুয়েন্সিয়াল হয়ে উঠছে। আমি তাদের এই সাহিত্যিক অ্যাপ্রোচকে সবসময়ই পছন্দ করেছি। আমার নিজের সাহিত্যচর্চায় তার প্রতিফলন আছে। সাহিত্যের আনুষ্ঠানিকতার মূল্য আছে কিন্তু আমার কাছে সেসব প্রধান বিবেচ্য হয় নাই কখনো। কাউকে আমি আমার কোন বইয়ের ভূমিকা লিখতে বলিনি, আমার কোন বইয়ের কোনদিন মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়নি, আমি কাউকে কোনদিন আমার বইয়ের আলোচনা লেখবার জন্য অনুরোধ করিনি। ‘ক্রাচের কর্ণেল’, ‘একজন কমলালেবু’ বইগুলো নিয়ে প্রকাশনা উৎসব করবার উদ্যোগ ছিল। আমি সচেতনভাবে তা বাতিল করেছি। তাতে আমার বইয়ে প্রচার, পাঠক-পাঠিকা তৈরিতে বিশেষ সমস্যা হয়েছে বলে মনে হয় না। আমার এই অ্যাপ্রোচই যে সবার জন্য প্রযোজ্য হবে, এমন দাবি আমি করি না। অনেক লেখক মনে করতে পারেন পণ্যের মতো বইয়েরও নানারকম প্রচার প্রচারণা প্রয়োজন। সেটা যার যার সাহিত্যযাত্রার নিজস্ব পথ। আমি আমার বিশ্বাসটার কথা বললাম। আমার মনে হয় না কর্পোরেট মার্কেটিং পলিসি সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিশেষ কাজে দেয়। সেদিন শহীদ কাদরীর এক পুরনো লেখায় পড়ছিলাম, তিনি বলছেন তার সময়েও অনেক কবি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করে সেই অনুষ্ঠানের ছবি বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে অফিসে বিলি করতেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সম্পাদকের অফিসে বসে থাকতেন আর অনুরোধ করতেন যেন তার কবিতাপাঠের ছবি পত্রিকায় ছাপানো হয়। তো এইসব বিজ্ঞাপন-প্রবণতা সাহিত্যের জগতে সবসময়েই ছিল। লেখালেখি করতে এসে এই নেটওয়ার্কিং, প্রচারণা ইত্যাদিকে অনেকে একটা প্রধান কর্তব্য মনে করেন। সৎ-সহিত্যের জন্য সেসব খুব জরুরি বলে আমার মনে হয় না। আর এখন ফেসবুকের যুগে নিজেকে আড়ালে রাখবার মানসিকতার চর্চা করা তো রীতিমতো দুরূহ। একেবারে নগদ লাইক, ফলোয়ার ইত্যাদির স্রোত থেকে একধরনের এডরিনালিনবাহিত তৃপ্তির সুযোগ তো আছেই। নানারকম ফেসবুককেন্ত্রিক দল এবং তাদের নিজস্ব সেলিব্রিটি ইত্যাদির ব্যাপার আছে। যার যার গণ্ডির ভেতর একটা তৃপ্ত সাহিত্যিক জীবন যাপনের যথেষ্ট সুযোগ আছে। আমি ফেসবুকের ব্যবহারিক নানা সুবিধার জায়গাগুলো লক্ষ্য করি এবং তার সদ্ব্যবহার করার চেষ্টাও করি। কিন্তু সতর্কও থাকি। এসব নানা প্ল্যাটফর্ম সাহিত্যের সহfয়ক শক্তি হতে পারে কিন্তু তাতে একটা ‘ফলস’ ইমেজ তৈরিরও ঝুঁকি থাকে। অন্তরের প্রণোদনার চেয়ে বাহ্যিক প্রণোদনাটা প্রধান হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সাহিত্যের সংগ্রাম শেষবিচারে অন্তরের গভীর, নিংড়ানো বোঝাপড়ায়। সে কাজটা করতে হয় নিভৃতে, ধ্যানমগ্ন হয়েই। একজনের লেখার শাক্তি সম্ভবত বেশি স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায় তার চেনা জানা গণ্ডির নানা স্বার্থ নির্দিষ্ট সম্পর্কের বাইরে একেবারে অচেনা পাঠক-পাঠিকার অন্তরে সেই লেখা সত্যিকার অভিঘাত তৈরি করছে। সাহিত্যে সাইলেন্ট মেজরিটির শক্তিতে আমি বিশ্বাস করি।

রিসাত : এই সাইলেন্ট মেজরিটির ব্যাপারটা যদি আরেকটু খোলাসা করতেন।

শাহাদুজ্জামান : আমি বিশ্বাস করি একটা বড় পাঠক-পাঠিকা গোষ্ঠী আছে যারা এইসব সাহিত্যিক ডামাডোলের বাইরে থেকে নীরবে লেখক খুঁজে বেড়ায় যারা তার অন্তর স্পর্শ করতে পারবে, তাকে তাড়িত করতে পারবে। তারা নানা পাবলিক ফোরামে উচ্চবাচ্য করে না। যে-লেখক তাদের তাড়িত করে, ধীরে ধীরে তারা সেই লেখকের চারপাশে অদৃশ্যভাবে জড়ো হয়। লেখক হিসেবে সেটা টের পাওয়া যায়। এই নীরব পাঠক-পাঠিকা গোষ্ঠীকে আমি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।

রিসাত : গল্প ছেড়ে উপন্যাসের আলোচনায় আসতে চাই। যদিও আপনি এসব বিষয়ে অনেক কথা বলেছেন এবং আপনার ‘ক্রাচের কর্ণেল’ ও ‘একজন কমলালেবু’ নিয়ে অনেক ধরনের আলোচনা হয়েছে। আমার সরাসরি একটা প্রশ্ন : চরিত্রনির্ভর এসব ডকুফিকশনের বাইরে আমাদের তথাকথিত যে উপন্যাসের একটা ইমেজ আছে, সেরকম উপন্যাস আপনি লেখেন না কেন? অবশ্যই এটা আপনার আগ্রহ-অনাগ্রহের ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। কিন্তু আপনার যে অভিযাত্রী পাঠক তারা ওই ধরনের উপন্যাসে ডুবতে চায়। এ-তৃষ্ণা জন্মেছে আপনার গল্পের গভীরতা থেকে। ‘মহাশূন্যে সাইকেল’-এর রেজাউল করিমের বিচ্ছিন্নতা ‘The Unbearable Lightness of Being’-এর থমাসের চেয়েও গভীর মনে হয় মাঝে মধ্যে। আমি আরো জানতে চাই রেজাউল করিম সম্পর্কে।

শাহাদুজ্জামান : আমি তো বহুদিন শুধু প্রবন্ধ লিখেছি। গল্প যে কোনদিন লিখব, বা লিখতে পারবো, তা ভাবিনি। একপর্যায়ে মনে হয়েছে কিছু কথা আর প্রবন্ধে বলতে পারছি না, তখন গল্প লিখতে শুরু করেছি। কিন্তু তথাকথিত গল্প আমি লিখতে চাইনি। আমার প্রথম লেখা গল্প ‘অগল্প’। এটা একটা গল্প না লেখার গল্প। গল্পের তথাকথিত ফর্মকে ভেঙে ফেলেছি সেখানে। আবার একপর্যায়ে মনে হয়েছে কিছু কথা ঠিক গল্পের পরিসরে বলতে পারছি না, আরেকটু বড় পরিসর দরকার। আমার প্রথম উপন্যাসের অ্যাটেমপ্ট বলতে পারো ‘বিসর্গ তে দুঃখ‘। এটাতেও তো আঙ্গিক একেবারে ভেঙে দিয়েছি। এক-একটা বর্ণমালা দিয়ে তৈরি করেছি এক-একটা পর্ব। বাংলা সাহিত্যে এরকম আর দ্বিতীয় কোন উদাহরণ আছে কিনা আমার জানা নেই। এটা ঠিক উপন্যাস হয়েছে কিনা সেটা অন্য প্রশ্ন। শহীদুল জহির এই বইটার বুক রিভিউয়ে একে বলেছিলেন ‘মেটা ফিকশন’। কনটেন্টের মতো ফর্ম আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি এসব বলছি এটা বোঝাতে যে আমি আসলে কখনোই তথাকথিত গল্প-উপন্যাস লিখতে চাইনি। আমি আগের লেখকদের লেখার পুনরুৎপাদন করতে চাইনি। কোন বিশেষ ঘরানার লেখকদের দলে ভিড়তে চাইনি। আমি প্রচুর সময় কাটিয়েছি হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহিরের সাথে। তাদের লেখা আদ্যপান্ত পড়েছি কিন্তু তাদের মতো লিখতে চাইনি কখনো। যখনই আমি উপন্যাস লিখতে গেছি অনেকটা ডেলিবারেটলি আমার মন বলেছে পূর্বসুরি যাঁরা লিখেছেন তাঁদের চেনা পথ ছেড়ে ভিন্ন পথ নেয়া যায় কিনা। কারণ আমার নিজের কথাটা আমি পুরনো পথে বলতে পারছি না। ফলে আমার উপন্যাসগুলো আদৌ উপন্যাস কিনা, সেসব নিয়ে বরাবর বিতর্ক হয়েছে। ঠিক তথাকথিত উপন্যাস আমাকে দিয়ে লেখা হবে কিনা জানি না। তবে হ্যাঁ চরিত্রভিত্তিক, ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস কিছু লেখা হলো। এই জঁরের (genre) বাইরে হয়তো এবার লিখব। তুমি যেমন বললে রেজাউল করিমের মতো অখ্যাত কাউকে নিয়ে হয়তো লিখব যে নিজের বাসায় ফোন করে নিজেকেই চায় কথা বলবার জন্য।

রিসাত : বাংলাদেশে বহু মাধ্যমে লেখালেখি করার মানুষ গুটিকয়েক ছিলেন। তবে আপনার অবস্থানটা আলাদা হবে একেবারেই। কারণ যদি আমি গুণগত ওজন করি এসব কাজের, আমার মনে হয় সব মাধ্যম সমান রিডিং দেবে। আপনার গল্পের যেমন আলাদা পাঠক, প্রবন্ধের তেমনি। আপনি নিজেই বলেছেন আপনার কোন লেখা পড়েননি কিন্তু শুধু ‘ক্রাচের কর্ণেল’-এর পাঠক আছে এমন সংখ্যাও ব্যাপক। আপনি সাক্ষাৎকার যে কয়েকটা নিয়েছেন, খুব অল্প যদিও, তাও সাড়া জাগানিয়া, ভাবানুবাদের মতো সৃষ্টিশীল ট্রেন্ড চালু করেছেন। এত মাধ্যমের লেখক পরিচয়ের পেছনের ‘কৌতুহলী মানুষ শাহাদুজ্জামান’ সম্পর্কে জানতে চাই। আপনি কি ওই যুক্তিতেই লিখেছেন যে- ‘আমাকে এই বিষয়ে কথা বলতে হলে এই ফর্মে লিখতে হবে’, নাকি অন্য কোন বোধ আছে এর পেছনে?

শাহাদুজ্জামান : এটা ঠিক যে আমি বহু মাধ্যমে কাজ করেছি। শুধু বহু মাধ্যমে না, আমি জীবনে বহু বিষয়েই কৌতুহলী হয়েছি। কতরকম বিচিত্র ব্যাপার নিয়ে যে মেতে থেকেছি জীবনের বিভিন্ন সময়ে, সেটা শুনলে হয়তো তুমি অবাকই হবে। এই সুযোগে তোমাকে আমার কিছু পাগলামির কথা শুনাই। আমার স্কুল-কলেজ জীবনে আমার কিন্তু বড় নেশা ছিলো দাবা খেলায়, রীতিমত অ্যামবিশন ছিলো এ নিয়ে। আমি ক্যাডেট কলেজে টানা, জুনিয়র, সিনিয়র দুটাই চ্যাম্পিয়ান ছিলাম, চিটাগাং মেডিকেল কলেজে চ্যাম্পিয়ান ছিলাম। জাতীয় পর্যায়ে খেলে হাই র‌্যাংকিংয়ে গিয়েছিলাম। গ্রান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদের সাথেও কমপিট করেছি। নিজে গ্রান্ডমাস্টার হবার প্রস্তুতিও নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, দাবাই হবে আমার ডেসটিনি। আমার দাবার হিরো ছিলো একসময়ের ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ান কিউবার দাবাড়ু রাউল কাসাব্লাঙ্কা। তার জীবন নিয়ে অনেক পড়েছি। আমার সাথে তখন প্রচুর দাবার বই থাকতো। দাবা খেলা শিখেছিলাম আমার আব্বার কাছ থেকে। আব্বা খুব ভালো খেলতো এবং তারও দাবার নেশা ছিল। তো, সেই দাবার নেশা একসময় ছুটে গেল। আমি গানও করি। গানটাও একসময় সিরিয়াসিলি নিয়েছিলাম। আমার আব্বা-আম্মা দুজনেই গান করতো। মেডিকেল কলেজের এমন কোন ফাংশন ছিল না যে আমি গান করিনি। জাতীয় পর্যায়ে গানে অনেক পুরস্কার জিতেছি। আমি রেডিওর এনলিস্টেড শিল্পী ছিলাম। চিটাগাং রেডিওতে নিয়মিত রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতাম। চিটাগাং সঙ্গীতভবনে ওস্তাদ প্রিয়দারঞ্জনের ছাত্র ছিলাম। তার দুই মেয়ে পুরবী দি আর কাবেরী দি’র কাছে গান শিখেছি। একসময় গানের এমন নেশা পেয়ে বসলো যে মেডিকেলের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সঙ্গীতভবনে বসে রেওয়াজ করতাম। আমার মনে আছে একদিন হারমোনিয়াম বাজিয়ে রেওয়াজ করছি সঙ্গীত ভবনে, ওস্তাদ প্রিয়দারঞ্জন আস্তে আমার পেছনে এসে দাঁড়ালেন। আমার ঘাড়ে হাত রেখে বললেন, ‘গান বড় কঠিন নেশা, এর ভেতর ঢুকো না। গান ছেড়ে দাও। মেডিকেলের পড়াশেনায় মনোযোগ দাও।’ বুঝতে পারি, অনেক অভিজ্ঞতার জায়গা থেকে কথাগুলো বলেছিলেন তিনি। গান ঠিক ছেড়ে দেইনি, নানা ঘরোয়া অনুষ্ঠানাদিতে গাই, কিন্তু গানকে সিরিয়াসলিও নেয়া হয়নি। তারপর মেডিকেলে পড়া অবস্থাতেই চাপলো নতুন নেশা, ফিল্মের নেশা। ফিল্ম আর্কাইভে ট্রেনিং করেছি, ফিল্ম নিয়ে বহু কাজ করেছি। আমি ইন ফ্যাক্ট মস্কো ফিল্ম ইন্সটিউটে ভর্তি হবার সব ব্যাবস্থা সেরে ফেলেছিলাম। স্কলারশিপও যোগাড় হয়েছিল। তো, সে আরেক পর্ব, সে পর্ব নিয়ে অন্য জায়গায় লিখেছি। পরে সেই ফিল্মের লাইনেও যাইনি। এই সময়ে সমান্তরালভাবে শুরু করেছিলাম লেখালেখি। লেখায় আনন্দ পেয়ে গেলাম। মেডিকেল পাশ করলাম ঠিকই কিন্তু পালাবার পথ খুঁজছিলাম কী করে নিয়মিত ডাক্তারি না করে এমন কোন ডাক্তারি পেশায় ঢোকা যায় যাতে লেখার সুযোগ পাব। তোমাকে আরেকটা ইনফরমেশন দেই। আমি পাশ করে সরকারি চাকরিতে না গিয়ে দুটা জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছিলাম। একটা হচ্ছে চা বাগানের ডাক্তার হিসেবে কাজ করার আর আরেকটা এক বিদেশী জাহাজে ডাক্তার হিসেবে জয়েন করার। একেবারে লোকালয়ের বাইরে পালাতে চেয়েছিলাম। দুটা থেকেই ইন্টারভিউ কার্ড পেয়েছিলাম। এসময় ব্রাকের গ্রামীণ স্বাস্থ্য প্রকল্পের ডাক্তার হিসেবে চাকরি পেলাম। সেটাই ভলো মনে হলো। এতে লোকলয়ের ভেতরই থাকা যাবে আবার ঠিক টিপিকাল ডাক্তারিও করতে হবে না। যা-হোক এসব বলছি এজন্য যে লক্ষ করবে আমার ভেতর একটা অস্থিরতা কাজ করেছে সময়ে-সময়ে, আমার ইন্টারেস্ট শিফট করেছে। এক-এক সময় এক-এক ব্যাপারে কৌতূহলী হয়েছি। আমি আলবেরুনীর একটা কথা প্রায়ই কোট করি, ‘সৃষ্টিকর্তা তুমি আমাকে দীর্ঘ জীবন দিও না, বিস্তৃত জীবন দাও।’ তো এই বিস্তৃত জীবনের লোভেই হয়তো নানা কিছু করার চেষ্টা করেছি।
তারপর লেখা যখন কনটিনিউ করলাম তখন কোন একটা নির্দিষ্ট ধারার লেখার ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ থাকলো না। অনেক লেখক একটা বিশেষ পরিচয়ে পরিচিত হতে চান, কবি বা গল্পকার ইত্যাদি। তারা ভার্টিকাল লেখক। তারা একটা বিশেষ ধারার লেখার স্তম্ভ তৈরি করেন। আমি বরং হরাইজন্টাল লেখক। নানা ভাবনা দিয়ে তাড়িত হয়েছি, কোন ভাবনা গল্পে প্রকাশ করেছি, কোনটা প্রবন্ধে, কোনটা উপন্যাসে। কোন বিশেষ সৃষ্টির স্তম্ভ তৈরির কোন আকাঙ্ক্ষা আমার ছিলো না। তবে যেটা বলছিলাম এসব প্রবণতার পেছনে হয়তো আছে বৈচিত্রের প্রতি প্রবল কৌতূহল। একজীবনে অনেক জীবনের স্বাদ নেয়া। তবে এটা বিশ্বাস করি যে লেখালেখির একেবারে মূল জায়গাটাতে আছে কৌতূহল। মানুষের আর জীবনের ব্যাপারে অপার কৌতূহল না থাকলে লেখা কোথা থেকেই বা আসবে? প্রতিটা মানুষ তো এক-এক গল্পের, ভাবনা, ঘটনার, দুর্ঘটনার ক্যাপসুল। সেই ক্যাপসুলের খাপটা খুলে দেখতে ইচ্ছা জাগে।

রিসাত : আপনি বলছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক হবার অদম্য বাসনা ছিল আপনার। মস্কোতে স্কলারশিপও পেয়ে গিয়েছিলেন। পরে যাননি। আমাদের সমাজের পারিবারিক বন্ধনের যে টান তাতেই বাঁধা পড়েছেন নাকি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের প্রতিবন্ধকতাই (তথাকথিত বিকল্প বনাম মেইনস্ট্রিম কোন বিভাজনেই আমি যাবনা, সব অর্থেই প্রতিবন্ধকতা) আপনাকে নিরুৎসাহিত করল?

শাহাদুজ্জামান : আগের প্রশ্নের উত্তরে যেমন বলছিলাম চলচ্চিত্রকে পেশাই করতে চেয়েছিলাম। চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, আর্কাইভে কোর্স করা, ফিল্ম বানানো এসব নিয়ে মেতে থেকেছি। চলচ্চিত্রে যে শেষ পর্যন্ত থাকলাম না তার যে কারণগুলো তুমি বলেছো তার দুটোই কাজ করেছে। আমি তখন পড়ছি মেডিকেলে, সেখান থেকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছি মস্কোতে ফিল্ম নিয়ে পড়তে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য তো এত বড় পাগলামি নেয়া সহজ কাজ না। তারপরও আমার বাবা-মা আমাকে কিন্তু যে বাধা দিয়েছে তা না তারা শুধু শঙ্কিত হয়েছে আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে। তবে আমি নিজেও আর বাংলাদেশের ফিল্মজগতে কাজ করার মতো নিজেকে যোগ্য মনে করিনি। তারেক মাসুদকে কাছ থেকে দেখেছি। আমরা একসাথে ফিল্ম ওয়ার্কশপ করেছি। একসাথে ‘চিত্রলেখা’ নামে একটা পত্রিকা করেছি। দেখেছি মুল ধারার বাণিজ্যিক ছবির বাইরে নুতন ধরনের ছবি বানাতে যাওয়ার জন্য কি অসম্ভব পরিশ্রম করেছে সে। আমার মনে হয়েছে তারেকের মতো স্রোত ঠেলে সেই সংগ্রাম করবার শক্তি আমার নাই। ফিল্ম তো শেষবিচারে একটা ইন্ডাস্ট্রি। টাকা পয়সা ছাড়া এক-পা এগোনোর কোন পথ নাই। তো আমি যে ধরনের ছবি করতে চেয়েছি তার জন্য অর্থ যোগাড় আমার সাধ্যের বাইরে ছিলো। আমি বরং লেখায় ফিরেছি। লিখতে তো আর টাকা লাগে না। নিভৃতে অন্তত সৃষ্টির কাজটা সারা যায়। তো সব মিলিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতা আমার হওয়া হয়নি। কিন্তু চলচ্চিত্র নির্মাণ না করলেও চলচ্চিত্রের সাথে আমার যোগাযোগ তো অব্যাহত আছে। এখন ফিল্মের স্ক্রিপ্ট লিখছি। আমার গল্প নিয়ে বেশকিছু চলচ্চিত্র হয়েছে। তুমি জানো যে ‘কমলা রকেট’ ফিল্মটা আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত হলো। একসময় চলচ্চিত্র নিয়ে টিভি অনুষ্ঠান করতাম। চলচ্চিত্র নিয়ে নিয়মিত লিখছি। এভাবে চলচ্চিত্রের সাথে যুক্ত তো আছি।

রিসাত : ‘কমলা রকেট’-এর প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ল। সিনেমাটা দেখার পর আমাকে আরেকজন লেখক বলেছিল, ‘বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংসের জন্য এই ধরনের সিনেমা নেটফ্লিক্সে প্রমোট করা হচ্ছে।’ এই যে আমাদের দেশে যে-কোন ক্রিটিকাল দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের ক্ষেত্রে একধরনের তথাকথিত ‘ইমেজ’ রক্ষার প্রবণতা চালু হয়েছে, এই ব্যাপারটাকে আপনি কিভাবে দেখেন? এটা শুধুমাত্র আপনার উদাহরণ দিলাম। এমন অনেক কিছুই দেখছি চারপাশে। রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে, মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে। একদিকে সরকার বলছে, তাকে সময় দিতে হবে, যারা সরকারের সমালোচনা করে তারা উন্নয়ন চায়না- এই ধরনের বাইনারি অবস্থানের অর্থ কি মনে হয় আপনার কাছে? সমালোচনার যে একটা ধূসর জায়গা আছে, তা ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। শুধু সরকারের দিক থেকে নয়- যে কোন ক্ষেত্রে পুরো সমাজে।

শাহাদুজ্জামান : ‘কমলা রকেট’ নিয়ে এ মন্তব্যে মজা পাওয়া ছাড়া তো আর কিছু করার নাই। সেই হিসাবে তো সত্যজিৎ, মৃণাল, ঋত্বিকের প্রায় সব ছবিই ভারতের ইমেজকে বরবাদ করে দিয়েছে। এটা ঠিক যে সাধারণভাবে আমাদের সমাজে ক্রিটিকাল থিংকিংয়ের চর্চা খুব বেশী আছে বলে আমার মনে হয় না। ব্যতিক্রম আছে, কিন্তু প্রায়ক্ষেত্রেই খুব উপরিতলের কথাবার্তা, চিন্তা দেখি। নানা বিষয়ে মেঠো বক্তৃতা বেশ আছে, কিন্তু গভীর প্রজ্ঞাসম্পন্ন আলোচনা খুব বেশী চোখে পড়ে না। অনেকের ভেতর এমন অ্যাটিচুড দেখি যে তারা সব জেনে গেছেন এখন তাদের কাজ শুধু বাণী দেয়া। অবতার হয়ে গেলে আর তো কোন প্রশ্নই নাই। কিন্তু আমি প্রশ্নতাড়িত মানুষ খুঁজি। খুব বেশী চোখে পড়ে না। দেশের উন্নয়নের জন্যও তো অবিরাম বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক, সমালোচনা দরকার। সমালোচনার একটা ‘ধূসর’ জায়গা, কথাটা ভালো বলেছো তুমি। কিন্তু দলীয় বা বিরোধী কেউ তো আর সেই ধূসর জায়গায় দাঁড়িয়ে বিতর্ক করে না। এটাও বুঝি যে আমরা একটা বিশেষ ইতিহাসের পথপরিক্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি, ফলে, একটা ধূসর জায়গায় দাঁড়িয়ে খুব অবজেকটিভ সমালোচনা করা কঠিন হয়ে পড়ে অনেক সময়। একটা পক্ষ-নির্ধারণ অবধারিত হয়ে পড়ে। কিন্তু লেখক-শিল্পীকে তো শেষ পর্যন্ত ধূসর জায়গাতেই দাঁড়াতে হয়। ফলে তাকে সবসময়ই একটা ক্রিটিকাল মন নিয়ে চারিদিকে তাকাতে হয়।

রিসাত : সাহিত্যে সমালোচনার ধারাতে এখন প্রায়ই একটা ‘অ্যাটেনশন সিকিং’ প্রবণতা দেখতে পাই। প্রতিষ্ঠিত কোন লেখককে ধুম করে একবাক্যে ‘কিছু হয়নি’ টাইপের কথা বলে উড়িয়ে দেয়া হয়। আপনি কি খেয়াল করেছেন এমন প্রবণতা? এই ধরনের সমালোচনা নিয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই।

শাহাদুজ্জামান : তা তো খুবই খেয়াল করেছি। তবে ব্যাপারটা যে খুব নতুন তা না। আমাদের তারুণ্যে আমরা যখন চায়ের স্টলে, বাড়িতে আড্ডা দিতাম, তখনও কারো করো ভেতর এমন প্রবণতা দেখতাম। সাহিত্যের প্রতিষ্ঠিত কোন লেখককে একেবারে দু-আঙুলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতো তারা। এমন একটা অবস্থা তৈরি করতো যে ওই চায়ের স্টলটাই হচ্ছে বিশ্বসংসার এবং ওই চায়ের স্টলে সেই হচ্ছে বিধাতা। তার রায়ের উপরই নির্ভর করবে বাংলা সাহিত্যের ভূত-ভবিষ্যত। সবাই যাকে প্রশংসা করছে তাকে নস্যাত করাই তার বীরত্ব। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, ‘নার্সিসিজম ফর ডিফারেন্স’। মানে শুধু নার্সিসিজম না, অন্যরকম হওয়ার প্রতি নার্সিসিজম। এই যে অন্যকে ধুলিসাৎ করার প্রবণতা অনেক সময় কাছের মানুষদের ভেতর একটা চমক তৈরি করে। নজরুল যাকে বলেছেন ‘অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস।’ তো, এই সাহস দেখে অনেকে ভড়কে যায়। তার বেশ অ্যাডমায়ারারও জুটে যায়। এসব আগেও দেখেছি। তবে নতুন ব্যাপার হচ্ছে এই ফেসবুক। ফেসবুক এই ‘নার্সিসিজম ফর ডিফারেন্স’ চর্চার একটা বেশ ভালো প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠেছে। ধরো কেউ ফেসবুকে একটা পোস্ট দিলো, ‘রবীন্দ্রনাথ একজন তৃতীয় শ্রেণির লেখক’, হয়তো সাথে সাথেই অনেককেই দেখা যাবে লিখছে, ‘সহমত’, কেউ বলবে ‘দারুণ বলেছেন’, আরেকজন ‘অভিনন্দন’ জানাবে। ফেসবুক পোস্টে শো-কেসের মূল্যবান সামগ্রীর মতো ওই মন্তব্য টানানো থাকবে এবং একে-একে বাড়তে থাকবে লাইক, লাভ ইত্যাদির সংখ্যা। কেউ হয়তো বিতর্কও জুড়ে দেবে, না এটা আপনি ঠিক বলেননি ইত্যাদি। তো ফেসবুক এধরনের একটা মজাদার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে পারে। কথা হচ্ছিল ক্রিটিকাল সমালোচনা নিয়ে। তার জন্য দরকার গভীর আলোচনা, মতের পক্ষে যুক্তি। রবীন্দ্রনাথেকে তৃতীয় শ্রেণীর লেখক কেউ বলতেই পারেন। আমি তার মন্তব্যের নিংড়ানো ব্যাখ্যা খুঁজবো। কিন্তু যেটা আগে বলছিলাম, সমালোচকের ভেতর অবতারের ভাব দেখা দিলো তো মুশকিল, যেন তার দায়িত্ব শুধু বাণী দেয়া। এটাও মনে রাখা দরকার যে সমালোচক ছায়া মাত্র, মূল অবয়ব নন। মূল আকার না থাকলে ছায়ার কোন অস্তিত্ব নাই। মেধাবী সমালোচনা সাহিত্যের জন্য স্বাস্থ্যকর, কিন্তু তা শুধু অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহসের ব্যাপার না। আর যিনি সৃজনশীল লেখক হতে চান, তাকে শেষ পর্যন্ত কাজ দিয়েই জবাব দিতে হবে। অন্যকে খারিজ করার ভেতর দিয়ে নিজের পরিচয় দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় নিজের লেখার ভেতর দিয়ে। আমাদের চায়ের স্টলে সবাইকে খারিজ করা তেমন বহু নামজাদা নার্সিসিস্ট অথচ সাহিত্যের পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া মানুষদের মুখ মনে পড়ে।

রিসাত : আপনার গল্পের বিষয়ে আসতে চাই আবার। ‘ওয়ানওয়ে টিকেট’ গল্পের মধ্যে যে একটা প্রতারণার গল্প, অবিশ্বাসের গল্প আছে, এমন কিছু কী আপনার জীবনে ঘটেছে? এই প্রসঙ্গ আমি তুলছি, কারণ, প্রতারণার আরেকটা গল্প ‘পৃথিবীতে হয়তো বৃহস্পতিবার’ আছে। জানি, একজন লেখক হিসেবে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আপনি গল্প লেখার অনুপ্রেরণা আশপাশ থেকেই নিয়ে থাকেন। কিন্তু আপনি ১১১ পৃষ্ঠার গল্পের বইয়ে যে বিষয়গুলোকে উপজীব্য করে লিখছেন, সে বিষয়গুলোর পেছনে একটা চিন্তা তো কাজ করেছেই। প্রতারণা কিংবা ঠকানো, এই মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে যদি একটু সার্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করেন… আরেকটা উদাহরণ দিতে পারি, ‘ক্রাচের কর্ণেল’-এ কর্ণলে তাহেরের সাথে জিয়া’র যে প্রতারণা- সব মিলিয়ে এটার একটা জাতীয় সম্পর্ক কি থেকে থাকতে পারে? আমি জানিনা বোঝাতে পেরেছি নাকি?

শাহাদুজ্জামান : বিশ্বাসভঙ্গের ব্যাপার তো আমার জীবনে ঘটেছেই। আমার ধারণা সবার জীবনেই কম-বেশী এমন অভিজ্ঞতা আছে। চারপাশে তাকিয়ে কিংবা নানান কাছের মানুষের অভিজ্ঞতার ভেতর থেকে বুঝতে পারি, দৈনন্দিন জীবনে এই বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণার ব্যাপারগুলো বেশী ঘটছে আজকাল। নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারগুলো তুচ্ছ হয়ে উঠছে। সমাজে প্রতিযোগিতার ব্যাপারটা খুব প্রবল হয়ে উঠেছে। সম্পর্কগুলো তো এখন গিভ অ্যান্ড টেকের অংক মেনে তৈরি হয় প্রায়শই। সম্পর্ক তৈরি হয় কে কার কাছ থেকে কতটুকু আদায় করতে পারবে, সেই হিসাব করে। তো এসব ক্ষেত্রে বিশ্বাসভঙ্গ তো ঘটবেই। জীবনানন্দের এক গল্পের চরিত্র বলে, ‘একটু আলতো করে বাঁচতে চাই’; তো সেই আলতো করে বাঁচা এখন অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপক অহং নিয়ে চলে সবাই। অহং আর অহং-এ টক্কর চলতে থাকলে বিশ্বাস, আন্তরিকতা, ভালোবাসার অনুভূতিগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। আমার শেষ গল্পের বইটাতে এই বিশ্বাসভঙ্গের থিম বেশ কয়েকটা গল্পে এসেছে। বিশ্বাসের ব্যাপারগুলো এমন ঠুনকো হয়ে গেলে মানুষ আর কী নিয়ে বাঁচবে? এসব আমাকে ভাবায়। তবে জাতীয় পর্যায়ের প্রতারণার কথা যা বললে তাও বেশ ইন্টারেস্টিং অবজারভেশন। আমাদের জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে বিশ্বাসভঙ্গের ব্যাপক সব উদাহরণ আছে। তাহের-জিয়ার বিশ্বসাভঙ্গের আগেও তো আরো বড় বিশ্বাসভঙ্গের ব্যাপার ঘটেছে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। ব্যক্তিজীবনে, জাতীয় জীবনের এইসব বিশ্বাসভঙ্গের ব্যাপারগুলো নিয়ে আমাদের ভাবার আছে।

রিসাত : আপনি একদিন আড্ডা দেবার সময় বলেছিলেন – ‘সাহিত্যের সাথে নৃবিজ্ঞানের একটা দারুণ সম্পর্ক আছে।’ এ-বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাই। আপনার পেশার সাথে প্যাশনের এমন একটা যুৎসই মিলন সম্পর্কে জানার আগ্রহ আমার আছে।

শাহাদুজ্জামান : নৃবিজ্ঞানের তো একটা নেতিবাচক ইতিহাস আছে। নৃবিজ্ঞানকে একসময় উপনিবেশের জনগোষ্ঠীকে শাসনের কাজে লাগানো হয়েছে। কিন্তু নেতিবাচক ব্যাবহার হয়েছে বলেই এই বিশেষ জ্ঞানকাণ্ডের শক্তি তো কমে যায় না। নৃবিজ্ঞানের প্রধান মেথোডলজি হচ্ছে অবজারভেশন বা পর্যবেক্ষণ। সাহিত্য সৃষ্টির জন্য এই জীবন পর্যবেক্ষণ একটা অবশ্য কর্তব্য কাজ। নৃবিজ্ঞান পড়তে গিয়ে অবজারভেশনের পদ্ধতিগত ব্যাপার অনেক কিছু শিখেছি। চোখ থাকলেই তো আর সব দেখা যায় না। দেখার ব্যাপারটাও শেখার আছে। নৃবিজ্ঞানের এই মেথোডলজির দিকটা আমার সাহিত্যের কাজে লেগেছে। তাছাড়া নৃবিজ্ঞানে অন্যের দৃষ্টিকোণকে বোঝার উপর জোর দেয়া হয়, যাকে বলে ‘এমিক ভিউ‘। এই বিষয়টাও সাহিত্যের জন্য জরুরি। আগেই বলেছি যে আমি গলায় স্টেথোস্কোপ ঝোলানো অ্যাপ্রন পড়া হাসাপাতালের ডাক্তার হবার পথ ছেড়ে এমন কিছু করতে চেয়েছি যাতে আমার মেডিকেল ডিগ্রিকে কাজে লাগিয়েও লেখালেখি, পড়াশোনা ইত্যাদি করা যায়। এই সিদ্ধান্তটা সহজ ছিলো না। ডাক্তারি করেও সাহিত্যচর্চা করেছে তেমন উদাহরণ বিশ্বসাহিত্যে যেমন আছে, বাংলা সাহিত্যেও আছে। কিন্তু আমাকে ডাক্তারির চেয়ে বেশী টেনেছে অধ্যাপনা, গবেষণার পথটা। নানা ঘটনাচক্রে চিকিৎসানৃবিজ্ঞান, জনস্বাস্থ্য ইত্যাদি পড়বার সুযোগ এসেছে আমার। দেখেছি, সেসব পড়তে আমার ভালো লাগছে। এসব পড়াশোনার সূত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজ পেয়েছি। এভাবে এমন একটা পেশায় যুক্ত হয়েছি তাতে আমার লেখার কাজটাও চালিয়ে যেতে পেরেছি। তবে পেশা আর প্যাশনের এই মেলানোর ব্যাপারটায় কোন সূত্র আছে বলে মনে হয় না। আমি আমার হৃদয়ের ডাক অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। তবে সেই পথ অনুসরণ করতে আমাকে অনেক চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।

রিসাত : অধ্যাপনার জগতে আপনার অনেক ক্ষেত্রের মধ্যে ‘প্যালিয়াটিভ কেয়ার’ একটি। এ ব্যাপারে গবেষণায় আসার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত কোন ঘটনা কী তাড়িত করেছে? ‘মৃত্যু সম্পর্কে আমার অবস্থান পরিষ্কার’, এই গল্পে যে পর্যবেক্ষণ পাওয়া যায় তা কিন্তু প্যালিয়াটিভ কেয়ার লিটারেচারে রিমার্কেবল একটা সংযোজন হতে পারে।

শাহাদুজ্জামান : হ্যাঁ, ওই গল্পটা সরাসরি আমার মুমূর্ষু আব্বার স্মৃতির পরিপ্রেক্ষিতেই লেখা। আমার আব্বার অন্তিম দিনগুলোতে আমি তার কাছে ছিলাম। আমি খুব কাছ থেকে ধীরে ধীরে তার মৃত্যুর দিকে যাওয়ার যাত্রাটাকে দেখেছিলাম। মৃত্যু অনিবার্য আমরা তো সবাই জানি। কে যেন বলেছেন যে জীবন এক সুন্দর মিথ্যা আর মৃত্যু একটা নির্মম সত্য। কিন্তু বাবার মতো এতো কাছের একজন মানুষের মৃত্যুকে এত কাছ থেকে দেখার কারণে আমার ভেতর জীবন এবং মৃত্যু দুটোর ব্যাপারেই নতুন করে ভাবনা তৈরি হয়েছে। আব্বার ওই মৃত্যুর সূত্র ধরেই আমি প্যালিয়াটিভ কেয়ার বা মুমুর্ষ রোগীর সেবা বিষয়ে ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠি। এখন আমি তো প্যালিয়াটিভ কেয়ার নিয়ে গবেষণাও করছি তুমি জানো। বাংলাদেশের একজন প্যালিয়াটিভ কেয়ার নিয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। তিনি আমার গল্পটা পড়ে বলেছিলেন এ গল্পে তার গবেষণার মূল কথা সব বলা হয়ে গেছে।

রিসাত : একটা দার্শনিক প্রশ্ন করতে চাই। দীপেশ চক্রবর্তীর ‘প্রভিনশিয়ালাইজিং ইউরোপ’ বইয়ে লৌকিকতার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আপনি চিন্তা ভাবনায় ইদানীং এই লৌকিকতা কিংবা শেকড়ের ইতিহাস নিয়ে অনেক কিছু ভাবছেন। অন্য দিকে হারারি কিংবা আরো অনেক সমকালের ইতিহাসবিদেরা বলছেন- ভবিষ্যতে এমন সব বিপর্যয় আসছে (জলবায়ু পরিবর্তন, জৈব-প্রযুক্তির বিপর্যয়, নিউক্লিয়ার বিপর্যয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি) ইত্যাদি পরিস্থিতিতে যত ধরনের অমিল থাকুক না কেন, সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। এ-ব্যাপারে আপনার কোন অবস্থান কিংবা বক্তব্য জানতে চাই।

শাহাদুজ্জামান : এটা একটা জরুরি কিন্তু জটিল প্রশ্ন। শুধু হারারি না দীপেশদাও কিন্তু এখন কাজ করছেন ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে। ইতিহাসের বাঁকে-বাঁকে পুরো মানব সভ্যতাই এক-একটা নতুন নতুন সংকটের ভেতর এসে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন মানব সভ্যতার জন্য সাম্প্রতিক কালের এক বিরাট সংকট। বিষয়টা প্রাকৃতিক হলেও সংকটটা মানুষেরই সৃষ্টি। পরিবেশবিদরা যাকে বলছেন ‘এনথ্রোপোসিন’। সংকটটা আদর্শিক, নৈতিকও। কারণ, এই জলবায়ু সংকট মোকাবেলা করাটা কোন একক দেশের পক্ষে সম্ভব না। গ্রীন হাউজ এফেক্ট কমাতে হলে মানুষের ভোগবাদী জীবনের একটা পরিবর্তন আনতে হবে। এটা তো আদর্শিক প্রশ্ন। পরিবেশবাদীরা বলছেন ধনী পৃথিবীর মানুষেরা ভোগকেন্দ্রিক যে জীবনযাপন করছে, পৃথিবীর সাত বিলিয়ন মানুষের যদি ঠিক একই রকম জীবন নিশ্চিত করতে হয়, তাহলে পৃথিবীর মতো আরো দুটো গ্রহ দরকার। জীবনযাপনের সব সম্পদ আসে তো পৃথিবী নামের এই গ্রহটা নিংড়েই। জীবনযাপনের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে তো জলবায়ু পরিবর্তনে কোন বদল আনা যাবে না। সেটা আদর্শিক ও নৈতিক প্রশ্ন। দীপেশ তাঁর লেখায় দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্যের কথিত প্রগতিকেন্ত্রিক যে আধুনিক ধারণা চালু রয়েছে, তার সাথে এই পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্পর্ক আছে। পুঁজি মুনাফাকে সর্বোচ্চ গুরত্ব দিয়েছে ফলে মুনাফার জন্য পরিবেশ বিপর্যয় ঘটাতেও সে দ্বিধা করেনি। সুতরাং বিকল্প আধুনিকতার ধারণার সাথে ক্লাইমেট চেঞ্জের এই ধারণার যোগসূত্র আছে। তবে তুমি সংকটটা ঠিকই ধরছো। বিকল্প আধুনিক ধারণা চর্চা করার জন্য যেমন স্থানিকতা জরুরি, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন আন্তর্জাতিকতা। পৃথিবীর সবার জন্য একই রকম ঝুঁকি নিয়ে হাজির হয় এই ক্লাইমেট চেঞ্জের সংকট। এটা কোন স্থানিক সংগ্রাম শুধু না। জীবনানন্দ লিখেছিলেন, ‘পৃথিবী গ্রহবাসী।’ আমাদের সবাইকে পৃথিবীগ্রহবাসী হিসেবেই জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টাকে মোকাবেলা করতে হবে। আবার আধুনিকতার ধারণাকে মোকাবেলা করতে হবে স্থানিকতা দিয়েই। দুই সংগ্রাম তো সমন্তরালভাবেই চালু রাখতে হবে। সেটা সহজ কাজ না।

রিসাত : আপনার লেখালেখির শুরু হয়েছিল মার্ক্সিস্ট নন্দনতত্ত্বের আলোকে। প্রায় ৩০ বছর পর আজকে আপনি কিসের আলোকে লিখছেন। মানুষ গড়ার একটা বাসনা ওই নন্দনতত্ত্বে ছিল। এখনো ওই বাসনা কি আছে? থাকলে কোন সমাজ নির্মাণের জন্য?

শাহাদুজ্জামান : আগেই বলেছি, লেখালেখি শুরু করেছি তো জীবনের প্রতি কৌতুহল থেকে, জীবনের অর্থ খুঁজতে। জীবনের অর্থ খুঁজতে জীবনের খুঁটিনটি ছোট ব্যাপারগুলোর দিকে চোখ রাখতে হয়, তেমনি তাকে তো একটা আইডিয়া বা দর্শনের আলোকেও দেখার দরকার পড়ে। সেই পথ ধরেই একসময় মার্ক্সবাদী দর্শনের সঙ্গে পরিচয়। আমরা এমন একটা সমাজে থাকি যেখানে প্রতিপদে বৈষম্য। মার্ক্সবাদ একটা নতুন সমজের স্বপ্ন দেখিয়েছিল আমাদের। তবে অভিজ্ঞতায় বুঝেছি পরিবর্তন একটা জটিল প্রক্রিয়া, মানুষের জীবন, সম্পর্ক, ইত্যাদি এক ধূসর এলাকা। আমার মানসগঠন হয়েছে একটা সুন্দর কালেকটিভ জীবনের স্বপ্ন নিয়ে। সেই স্বপ্ন তো মরেনি। কিন্তু বুঝেছি জীবনানন্দ যাকে বলেছিলেন সেই ‘শুভ মানবিকতার ভোর’, অনেক দূরের স্বপ্ন। এই অবসরে মানুষের মনটাকে সত্য, সুন্দর, কল্যাণের দিকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। সাহিত্য সে-কাজটা করতে পারে। নানা অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে পৃথিবীর মানুষও তাদের ভাবনাগুলোকে রিভাইজ করছে। মানুষের চিন্তার দিগন্ত খুলছে। তৃতীয় বিশ্বের মানুষের সংগ্রামের ধরন, মাত্রা, বদলেছে। সেগুলো বুঝবার চেষ্টা করি। পৃথিবীর বহু দেশ দেখবার সুযোগ হলো। সব জায়গাতেই দেখেছি সাধারণ মানুষের অপার সম্ভাবনা। সেইসব সম্ভাবনাকে নতুন দার্শনিক বীক্ষার আলোকে দেখতে চেষ্টা করি। আগেই বলেছি পোস্ট স্ট্রাকচারালিস্ট, সাবঅলটার্ন, ডিকলোনাইজেশন, প্লুর‌্যাল মডার্নিটির নানা নতুন ভাবনা দিয়ে নতুন পৃথিবীকে বুঝবার চেষ্টা করি। কিন্তু এসব বড় বড় ভাবনাকে বাদ দিলেও স্রেফ জীবনের প্রতিদিনের ছোটখাটো যে বিস্ময়কর আনন্দ, দুঃখের উপলক্ষ তৈরি হয়, তার দিকেই তাকিয়ে থাকি। রবীন্দ্রনাথ যেমন বলেছেন, ‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে, তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ ফলে, লেখার উপলক্ষের তো শেষ নাই। এবার দেশে গিয়ে ময়মনসিংহের হাওর অঞ্চলে ঘুরলাম। ভৈরব থেকে সাত ঘণ্টার লঞ্চ জার্নি করে পৌঁছালাম কলিমপুর, সেখান থেকে অষ্টগ্রাম। জীবনের কী যে অসাধাণ জঙ্গমতা দেখলাম। ফিরবার পর থেকেই মনে ঘুরছে কবে যে এই অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখবো। তো, জীবনের দিকে তাকিয়ে অবাক হওয়া তো আমার শেষ হয়নি, সেই অবাক হবার গল্প শোনাবার ইচ্ছাও মরে যায়নি। লিখি এই লোভে যে লিখতে লিখতে আশ্চর্য এই জীবনটাকে দেখার, একে নিয়ে ভাবার সুযোগ পাব।

রিসাত : সাহিত্য অঙ্গনে কিছু মানুষ আছে যাঁরা সাহিত্যের জন্য জীবন দিয়ে দিতে রাজি থাকেন (প্রতীকী অর্থে বলছি)। আপনার মতো একজন পুরোদস্তুর সাহিত্যমগ্ন মানুষ সেইসব মানুষদের ইঙ্গিত করে আমাকে একদিন বলেছিলেন- ‘সাহিত্য কি জীবনের চেয়ে বড় হতে পারে? না, হতে পারেনা’ এই কথাটা আমি প্রায়ই ভাবি, কেন বলেছেন? এই বক্তব্যের গভীরতায় যেতে চাই। সাহিত্য, জীবন এই দুইকে আপনি কিভাবে এক করেন? আবার কোথায় আলাদা করেন?

শাহাদুজ্জামান : জীবনের চেয়ে বড় কিছুই না। শিল্পসাহিত্য এসব তো জীবনকে সার্ভ করার জন্যই। জীবনকে আরো নানা পেশার মানুষই সার্ভ করে, লেখক তাদের মতোই একজন। সাহিত্যের জন্য একটা উঁচু আসন রাখার কোন কারণ আমি দেখি না। সাহিত্যের জন্য জীবন দিয়ে দেয়া যেতে পারে, তার মানে এই না যে সে জীবনের চেয়ে বড়। জীবনের অনেক কাজের মতোই সাহিত্য একটা কাজ। অনেক লেখককে দেখেছি লেখা ছাড়া অন্য কাজকে নীচু করে দেখতে। তারা মনে করেন যে-কাজ অ্যাবস্ট্রাক্ট না, সেটা কোন কাজ না। তাহলে তো কৃষকের কাজ কোন কাজই না। আমি একথাটাই বলতে চাই যে সাহিত্যের কাজটাকে মহান এক কর্মকাণ্ড ভেবে, জীবনের অন্য সব মাত্রাকে ছোট করে দেখলে লেখক-জীবনটাতেও ভারসাম্য হারাবার সম্ভাবনা থাকে। মৌমাছি অনেক সময়ে নিজের তৈরি মধুতেই ডুবে মরে।

রিসাত : লেখক হুমায়ূন আহমেদ নিয়ে আপনি কখনো তেমন কিছু বলেন নি। খুব হালকাভাবে বলেছেন। একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবে লেখক হুমায়ূন আহমেদের মুল্যায়ন শুনতে চাই। কেন তিনি এত জনপ্রিয়? এর পেছনে কোন সমাজবিজ্ঞান কি আছে?

শাহাদুজ্জামান : হুমায়ূন আহমদ আমাদের সাহিত্যজগতে একজন প্যারাডক্স। সিরিয়াস এবং জনপ্রিয় ধারার সাহিত্যের যে প্রচলিত ডাইকোটমি আছে, তাকে উনি একটা চ্যালেঞ্জের ভেতর ফেলে দেন। তার এতটা জনপ্রিয় ইমেজের কারণে তিনি অনেক সময়েই সাহিত্যের সিরিয়াস আলোচনায় উপক্ষিত থেকে গেছেন। বাংলাদেশের সাহিত্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে আমি মনে করি। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে মধ্যবিত্ত জীবনকে ঠিক যেভাবে তিনি সাহিত্যে এনেছেন, তার আগে এভাবে আমাদের দেশের সাহিত্যে তা ছিলো না। তার বাক্যগঠন, ভাষা ব্যবহারেও কলকাতার সাহিত্যের প্রভাব বিশেষ ছিল না। মানুষের একটা ইনহেরেন্ট গল্পের তৃষ্ণা আছে, সেই তৃষ্ণা তিনি মেটাতে পারতেন। তাঁর চরিত্রগুলো একেবারেই বাংলাদেশের বলে চেনা যায়। সাধারণ পাঠকের কাছে বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন বলতে কলকাতার যে লেখকরা পরিচিত ছিলেন, তাদের গল্পের প্রেক্ষাপট, চরিত্র, পথঘাট কোনটাই আমাদের বিশেষ চেনা না, মিল কেবল এই বাংলা ভাষায়। হুমায়ূন বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের একেবারে চেনা চেহারাটা সাহিত্যে তুলে আনলেন। সব মিলিয়ে ব্যাপক পাঠক তাকে গ্রহণ করলো। একসময় আমাদের ট্রেনে, বাসে, লঞ্চে, দেখতাম নিমাই ভট্টাচার্য, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়- এদের বই ব্যাপক বিক্রি হতো। আর বাংলাদেশে জনপ্রিয় বই বলতে ছিলো মাসুদ রানা। সাধারণ পাঠক কলকাতার সেইসব লেখকের কাছ থেকে ক্রমশ সরে এলো। হুমায়ূন আহমেদের বই মফস্বলে, গ্রামে পৌঁছে গেলো। তার একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের প্রকাশনায়। বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের বিকাশেও হুমায়ূন আহমেদের ভূমিকা আছে। তাঁর প্রথম দিকের বইগুলো আমার বিশেষ প্রিয়। তার ‘নন্দিত নরকে’ নামের ছোট বইটাতে তিনটা মৃত্যু ঘটে এবং এমন একটা ছোট পরিসরে এতগুলো মৃত্যুর ঘটনা অসাধারণ নির্মোহ ভঙ্গিতে তিনি উপস্থিত করেছেন। তাঁর ‘নিশিকাব্য’ নামের ছোটগল্পের বইয়ের গল্পগুলো খুব শক্তিশালী বলে আমি মনে করি। তার ‘ফেরা‘ নামে গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে লেখা উপন্যাস আমার পছন্দের একটা বই। একটা মেধাবী সাহিত্য পরিমণ্ডলে তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। আহমদ শরীফ তাঁর ‘নন্দিত নরকে’ বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। আর তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু রফিক কায়সার, যিনি মেধাবী সমালোচক- কমলকুমার মজুমদারে উপর প্রথম পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছিলেন, হুমায়ূন আহমদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ রফিক কায়সারের একটা কবিতার নাম। আশির দশকের গোড়ায় আমি ‘বাংলা প্রগতিশীল সাহিত্য’ বিষয়ক এক সেমিনারে পেছনের সারিতে বসে আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রমুখের বক্তব্য শুনছিলাম। মনে আছে, হুমায়ুন আহমেদ চুপচাপ এসে পেছনের সারিতে বসেই সবগুলো বক্তৃতা শুনেছিলেন। আমি এসব বলছি এটা উল্লেখ করতে যে, তিনি চারণ-ভঙ্গীতে সাহিত্যে আসেননি, সব জেনেশুনেই এসেছেন। একটা বিশেষ ধারায় তারপর তিনি নিজেকে নিযুক্ত করলেন। তিনি তাঁর গল্পবলার শক্তিকে প্রধান পুঁজি করলেন। তিনি টেলিভিশনের নাটকে যুক্ত হলেন। তাঁর নাটকের চরিত্র বাস্তবের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠলো। তার সৃষ্ট বাকের ভাই তো গণ-হিস্টিরিয়া তৈরি করেছিলো। শরৎচন্দ্রের তৈরি চরিত্র শ্রীকান্তের বেলায় তেমন ঘটেছে। এসব নিঃসন্দেহে শক্তির ব্যাপার। তবে তিনি তাঁর শক্তির অপচয়ও করেছেন বলে আমি মনে করি। তিনি শেষ দিকে নেহাত এন্টারটেইনার হয়ে উঠলেন। যতক্ষণ পড়ছি ততক্ষণ তার বই আমাকে হয়তো আনন্দ দিচ্ছে, তারপর তাঁর কোন স্মৃতিই আর মনে থাকছে না। অনেকটা ম্যাজিক শোর মতো। মুহূর্তের আনন্দ। সেই মুহূর্তের আনন্দ দিতে তিনি বহু অযত্নের বই লিখেছেন। তাঁর শেষের অনেক বই পড়ার চেষ্টা করেছি, কিন্ত এগোতে পারিনি। জনপ্রিয়তার জাল তাকে পেয়ে বসেছিল। পাঠক পাঠিকাকে হুমায়ুন আহমেদ একটা আরামের ভেতর রাখার ফর্মুলা পেয়ে গিয়েছিলেন, সেই আরামে রাখার নানা চেষ্টা তিনি করে গেছেন। কিন্তু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখায় জীবনের জটিলতার গভীর তল যেমন নিংড়ে উঠে চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করে, সেই চালেঞ্জের ভেতরও আনন্দ আছে। কিন্তু হুমায়ুন শেষের দিকের লেখায় সেই প্রাণ আমি পাইনি। আহমদ ছফা, যিনি ‘নন্দিত নরকে’র প্রকাশনার ব্যাপারে সহায়তা করেছিলেন, তিনি একপর্যায়ে বলেছিলেন, হুমায়ূনের লেখা চানাচুরের মতো, খেতে ভালোই লাগে কিন্তু পেট ভরে না।

রিসাত : আমি লক্ষ করেছি, আপনি তরুণদের সাথে খুব মেশেন, তাদের কথা শুনতে চান। দেশে গেলে আপনি নানা তরুণ-গোষ্ঠীর ভেতর গিয়ে বক্তৃতা দেন। আপনি অনেক তরুণের উচ্চশিক্ষার ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে সাহায্য করেছেন, আমি জানি। তরুণদের ভাবনা শোনার এই প্রবণতা, তাদেরকে প্রমোট করার এই ইচ্ছা সিনিয়রদের ভেতর সচরাচর দেখি না। কোন ভাবনা থেকে আপনি তা করেন, সেটা জানতে চাই।

শাহাদুজ্জামান : আমি তো সময়ের সাথে থাকতে চাই। তরুণ-তরুণীদের সাথে কথা বললে আমি সমকালের পালস্টা বুঝতে পারি। সেটা খুব জরুরি আমার কাছে। নতুন বাংলাদেশ তো তাদের ভেতরই সুপ্ত হয়ে আছে। আমি তাই সুযোগ পেলেই যেমন আমার অভিজ্ঞতা তরুণদের সাথে শেয়ার করার চেষ্টা করি, তেমনি তাদের কথাও শুনতে চাই।

রিসাত : নতুনদের মধ্যে যারা কথাসাহিত্যে লেখালেখি করছেন, তাদের কার লেখা আপনার ভালো লাগে?

শাহাদুজ্জামান : আমি নতুনদের লেখা সমসময়ই পড়বার চেষ্টা করি। বিচ্ছিন্নভাবে কারো কারো নির্দিষ্ট কিছু লেখা চমৎকার লাগে কিন্তু তবে তার ধারাবাহিকতা অনেক সময় খুঁজে পাই না। বিশেষভাবে যদি নাম বলতে বলো তাহলে আমি বলবো সাম্প্রতিককালে সুমন রহমান আর সাগুফতা শারমিন তানিয়ার গল্প আমার ভালো লাগছে। তাদের ঠিক নতুন লেখক হয়তো বলা যাবে না। তবে তারা আমার পরের প্রজন্মের তো বটেই। দু’জনের লেখাতেই শক্তি আছে। সুমনের একটা বৈশ্বিক দৃষ্টি আছে, পৃথিবীর দিকে, সমসাময়িক কালের দিকে তার খুব সজাগ পর্যবেক্ষণ আছে। সুমন কবিতা লেখেন এবং তিনি পপুলার কালচারের ভালো একডেমিকও। তার গল্পে একাধারে কবিতার নাজুকতা আর মননের ঋজুতার ভালো সমন্বয় আছে। সাগুফতা শারমিন তানিয়াও ভালো লিখছেন। তাঁর ভাষার একটা নিজম্ব আবহ আছে। বাংলা শব্দের অপার ঐশ্বর্যের সদব্যবহার করেন তানিয়া। জীবনের অনেক তুচ্ছ খুঁটিনাটির দিকে তার নজর আছে। অনেক অভিনব বিষয়েও গল্প লিখেছেন তিনি। তার গল্প আমি আগ্রহের সাথে পড়ি।

রিসাত : লেখক শাহাদুজ্জামান- অধ্যাপক শাহাদুজ্জামান- পারিবারিক শাহাদুজ্জামান- তিন ক্ষেত্রেই একজন সার্থক মানুষ আপনি। লেখকদের যে একটা ক্যালাস, চালচুলোহীন জীবন তার পাল্টা হিসেবে আপনি অনেকের আইডল। এই যে ব্যাল্যান্স, এই ব্যাল্যান্সটুকু তো আপনার অনেক প্রিয় লেখকেরাই করতে পারেন নি। আপনার গল্পটা শুনতে চাই।

শাহাদুজ্জামান : সাফল্য, সার্থকতা এসব তো খুব ইলিউসিভ ব্যাপার। আপাতভাবে আমার নানা সাফল্য চোখে পড়ছে, কিন্তু এর পেছনের নানা সংগ্রাম, না পাওয়ার ব্যাপারও আছে। সাফল্য দেখা যায়, সংগ্রাম দেখা যায় না। আমার পেশাগত একটা প্রাপ্তি হয়তো আছে এখন, আমার লেখালেখির একটা পাঠকগোষ্ঠীও আছে। এসবকে একধরনের সার্থকতা হয়তো বলা যায়। কিন্তু এই বাহ্যিক প্রাপ্তিই তো একজন মানুষের পরিচয়ের সবটুকু না। কতরকম চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়েছে এই পথচলায়। আমি আমার জীবনকে একটা জার্নি হিসেবেই দেখি। আমার পড়াশোনার সময়কার জীবন কিন্তু খুব এলোমেলো ছিল। মেডিকেলের পড়ায় গ্যাপ দিয়েছি। ডাক্তারি পড়বো না ঠিক করেছিলাম। সেটা খুবই কনফিউশনের একটা সময়। আমার মধ্যবিত্ত পারিবারিক পরিমণ্ডলে আমি তখন তো রীতিমত ব্যর্থ এক মানুষ। অনেক গভীর যন্ত্রণার দিন সেসব। বঙ্কিমচন্দ্রের সেই কথা- ‘এ জীবন লইয়া কি করিব, কি করিতে হয়’- এই প্রশ্ন নিয়ে ছুটছি তখন। উত্তর হাতে নাই। উদভ্রান্তের মতো সময় কেটেছে। আমার সাথের বন্ধু-বান্ধবরা সব পাশ করে বেরিয়ে গেছে আর আমি পড়া বাদ দিয়ে নানা সব পাগলামি করছি। আমার দিকে তারা করুণার চোখেই তাকিয়েছে তখন। তারপর একসময় ডাক্তার হলাম কিন্তু ডাক্তারের যে টিপিকাল ইমেজ, গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে রোগী দেখা, তা করলাম না। পাশ করে গ্রামে-গ্রামে ঘুরে লোকেরা টয়লেট বানিয়েছে কিনা, হাত ধোয় কিনা, এসব নিয়ে কাজকর্ম করেছি। ডাক্তার হিসেবে এসব তো অনেকের কাছেই অধঃপতন। আমার ডাক্তার বন্ধুরা তখন সব নানা ডাক্তারি হায়ার ডিগ্রি নিচ্ছে, যশ, অর্থ উপার্জন করছে। আর আমি তখন এক বখে যাওয়া ডাক্তার, যে-কিনা ফিল্ম বানাবে বলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শেষে এক পর্যায়ে পড়তে গেলাম অ্যানথ্রোপলজি। এসব তো নেহাত মাথা খারাপ লোকের কাজ। স্রোতের বিপরীতে চলার সেইসব একাকী সংগ্রামের দিনগুলোর গল্প তো আড়ালেই আছে।
লেখালেখি করছি সেই তরুণ বয়স থেকেই। কিন্তু সেগুলো খুব সিরিয়াস সব বিষয় যা গুটিকয় লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক-পাঠিকা ছাড়া কেউ পড়ে না। সুতরাং সার্থকতার কথা যা বলছো তার ধারেকাছে ছিলাম না আমি। তবে আমার নিজের উপর আস্থা ছিলো। আমি আমার প্রাণের আনন্দের ব্যাপারগুলো ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র একটা জীবিকা অর্জনের জন্য জীবনযাপন করতে চাইনি। আবার মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে আমার একটা দায়িত্বের ব্যাপারও আছে। আমি দায়িত্বহীন একটা জীবনও যাপনও করতে চাইনি। আমি নিজের ভেতর যুদ্ধ করেছি কী করে জীবন আর জীবিকাকে মেলাব। আমার সেই সময়ের মনের অবস্থাটা হয়তো কিছুটা টের পাবে আমার ‘মিথ্যা তুমি দশ পিঁপড়া‘ গল্পের প্রথম চিঠিটায়। আমি ভেবেছি, কী করে আমার সহজাত আগ্রহের ব্যাপারগুলোকে, অন্যান্য অভিজ্ঞতাকে আমার জীবিকার সাথে মেলানো যায়। নানা পথ ঘুরে শেষে এই গবেষণা আর অধ্যাপনার জীবিকায় এসেছি। এতে অর্থনৈতিক লাভ বিশেষ নাই কিন্তু একটা মোটামুটি ডিসেন্ট জীবনযাপন করে লেখাপড়ার সাথে থাকা যেতে পারে।
আমার প্রাণের তাগাদা ছিলো ক্রিয়েটিভ কাজের, সেটা আমি ছাড়তে চাইনি। কিন্তু নানারকম কাজ না করে লেখালেখিতেই মনোনিবেশ করলাম। কিন্তু লেখাকে পেশা করার কথা ভাবিনি, কারণ জানি তাতে হয়তো অনেক কম্প্রোমাইজ করতে হবে। আমি ঠিক করলাম নিজের প্রাণের আগ্রহ ছাড়া কোন ফরমাইশি লেখা কখনো লিখব না। তো, এভা্বেই ধীরে যাত্রা শুরু করলাম। লেখা কোন প্রতিযোগিতার ব্যাপার না। এখন এসব বলছি ঠিকই, কিন্তু এসব খুব যে হিসাবনিকাশ করে করেছি তা না। আমি আমার প্রাণের ডাককে অনুসরণ করেছি। তবে সেক্ষেত্রে আমার কাছের অনেক মানুষের সহযোগিতা পেয়েছি। আমার কিছু বন্ধু, আমার স্ত্রী, আমার বাবা-মাও আমার সেইসব বিভ্রান্তির দিনে আমাকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। তবে লেখাকে যখন সিরিয়াসলি নিয়েছি তখন এটা বুঝেছি যে ক্যালাস জীবন যাপন করে এসব হবে না। আর পেশা আর প্যাশনের এই হিসাব মেলাতে আমাকে অনেক অর্গানাইজড হতে হবে। আমি মুরাকামির কথাটা খুব মানি যে লেখকের জীবন ডিসিপ্লিনড হওয়া দরকার। লেখকের জীবন খুব পরিশ্রমী জীবন। মুরাকামি তো লেখালেখি করার জন্য নিয়মিত ম্যারাথন দৌঁড়ান। তবে লেখালেখির জন্য আমাকে অনেক কিছু ত্যাগও করতে হয়েছে। লেখালেখি তো ভীষণভাবে প্রাণশক্তি কেড়ে নেয়। যে প্রাণশক্তি আমি লেখায় ব্যয় করেছি তা আমি জাগতিক সাফল্যের পেছনে ব্যয় করলে হয়তো অন্যরকম অর্জন হতো। তাছাড়া লেখালেখিতে মগ্ন থাকতে গিয়ে অনেক কাছের মানুষ যে মনোযোগ দাবী করে তা দেয়া হয়ে ওঠে না। সেখানেও কত মান-অভিমানের চড়াই-উৎরাই থাকে। আমি প্রায় তিন বছর ধরে ‘একজন কমলালেবু’ লিখেছি। টানা গবেষণা করেছি, লিখেছি দিনের পর দিন। যেহেতু বিদেশের একটা ইউনিভার্সিটিতে চাকরি করি, সেখানে অনেক কাজ আর দায়িত্ব। লেখার কাজটা তাই আমাকে করতে হতো সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে। ফলে, এ-সময়টায় আমার দুই ছেলেকে যতটা সময় দেয়া দরকার ছিলো, তা মোটেও দিতে পারিনি। এ-সময়টা ওরা পার করেছে একটা বয়োসন্ধির কাল। আমার সঙ্গ থেকে ওরা বঞ্চিত হয়েছে। মনে আছে ওদেরকে গল্প করেছি যে আমি একজন কবিকে নিয়ে উপন্যাস লিখছি, যিনি ট্রামের নীচে পড়ে মারা গেছেন। ওরা যতটা আমাকে কাছে চায় সেটা পেত না বলে মনে আছে একজন একদিন জিজ্ঞাসা করেছিলো, ‘তোমার ওই পোয়েট কবে ট্রামের নীচে পড়বে?’ ওদের ধারণা, কবি ট্রামের নীচে পড়লেই আমার লেখা শেষ হবে। তো, এসবে মন খুব বিষণ্ন হয়েছে। ‘একজন কমলালেবু’ নিয়ে যখন কেউ নির্মম কোন মন্তব্য করে তখন মনের খুব গভীরে ক্ষত তৈরি হয়। এখন প্রবাসে আছি, সেখানেও আছে নানা চাপা বেদনা। তো তথাকথিত সাফল্যের নেপথ্যে অনেক না-পাওয়ার গল্প আছে, সংগ্রাম আছে। নিজের সার্থকতা নিয়ে তাই আমি ভাবি না। আমি নিজেকে সব সময় ইংরেজিতে যাকে বলে ‘গ্রাউন্ডেড’ রাখতে চাই। প্রতিদিনের ছোটখাটো, আনন্দ, বেদনা, বিস্ময়ের ভেতর জড়িয়ে রাখতে চাই।
আর একের জীবনের সাথে অন্যের জীবনকে মেলানোতেও বোধহয় বিশেষ লাভ নাই। আমার গল্পটা হয়তো আমার একান্ত নিজস্বই। আমার গল্পের সঙ্গে অন্যের গল্পকে মেলানোর তো সুযোগ নাই। তরুণ প্রজন্মকে বলার এইটুকুই যে, নিজের ভেতরের গল্পটার খোঁজ নেয়া দরকার এবং আর দরকার সেটাকে অনুসরণ করা। তবে অন্যকে পরামর্শ দেয়া কঠিন কাজ, কারণ, জীবন এক-এক জনের কাছ এক-এক রকমভাবে ধরা দেয়। নতুন প্রজন্মের কাছে আমার বলার কথাগুলো হয়তো অনেকটুকুই ধরা আছে আমার ‘মামলারর সাক্ষী ময়না পাখী’ বইটার শেষ গল্প ‘নাজুক মানুষের সংলাপ’ গল্পে।

রিসাত : অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

শাহাদুজ্জামান : তোমাকেও ধন্যবাদ।