শিকদার ওয়ালিউজ্জামান >>  গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে কবি >> প্রবন্ধ >> জন্মবার্ষিকী

0
257

গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে কবি  

গত শতকের পঞ্চাশ পরবর্তী বাংলা কবিতার ধারায় আধুনিকতা আর জীবনবোধ সৃষ্টিতে যে কজন কবির নাম উল্লেখযোগ্য, শহীদ কাদরী তাঁদের অন্যতম। বলা যায় প্রধানতম। নাগরিক-নাগরিকতাবোধ, স্বদেশ-স্বাদেশিকতা, নগর আর নগরজীবনের সুখ-দুঃখ, রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা, কূটকৌশল তাঁর কবিতার প্রধান উপজীব্য বিষয়। পঞ্চাশের তরুণতম কবি হয়েও কবিতার দিকনির্মাণের নিপুণ কারিগর তিনি। শহীদ কাদরী কবিতার চরণে চরণে গভীর ভালোলাগা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। নতুন কবির জন্য তাঁর কবিতা ভাবজগতের নিয়ামক। দর্শন, বিজ্ঞান, মানুষের ভেতরের আরেক মানুষ এবং তার কুটিলতা, এমনকী নাগরিক মননের কোনো পঙ্কিলতাও বাদ পড়েনি তাঁর কবিতায়। প্রতিটি কবিতাতেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব স্বর।
একজন কবির কবিতা যখন গণমানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে তখন তিনি হয়ে যান সর্বজনীন। কবির আঁচড়ে আমরা আমাদের যাপিত জীবনের চিত্রকল্প খুঁজে পাই। আমাদের চেতনা-প্রেম-মিলন-বিরহ। কবি শহীদ কাদরী সমকালের কবি। সমকালের স্বপ্নজাগানিয়া কবি। সমকালকে ধারণ করেছেন বলেই তিনি আমাদের প্রিয় কবি। শহীদ কাদরী সচেতন মনোভঙ্গির অধিকারী। অন্য কবিরা যেসব বিষয়কে অবলম্বন করেন তাঁর মূলে থাকে সমাজ-সচেতনতা, মানবিক জীবনের পরিগ্রহণ চরণে চরণে। এবং তা নিত্যকার পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকেই সংগৃহীত। কবিকে জীবনভর সচেতনতাকেই সঙ্গী করে জীবন কাটাতে হয়। সেই চেতনায় ধরা দেয় মানুষের বোধ, য- বোধ থেকেই তৈরি হয় উজ্জ্বল চিন্তার ফসল। কবি শুধু মানুষকেই মানুষের মাঝে খোঁজেন না, নিজেকেও খোঁজেন নিজের স্বকীয়তায়-অস্তিত্বে-সত্তায়। শহীদ কাদরী তাঁর বাবার জীবনে বিচিত্র পরিবর্তন দেখেছেন- তাকে সংস্কৃতিবান সম্পাদক থেকে জাঁদরেল অফিসার হতে দেখেছেন, স্বপ্নের ভেতর টাকা নিয়ে লোফালুফি খেলতে দেখেছেন। বিপরীতে তিনি লোফালুফি করেছেন নক্ষত্র নিয়ে। বাবার সক্ষমতা যখন-তখন যাকে-তাকে চপেটাঘাত করা আর কবির সামর্থ মাঝে মধ্যে একে-ওকে চুম্বন ছুঁড়ে দেওয়া। নাটকীয় বাচনভঙ্গিতে পিতা-পুত্রের চেতনাগত বৈষম্য ফুটিয়ে তুলেছেন, ‘একটি উত্থান-পতনের গল্প’ কবিতায় –

‘বাবার নাম খালেদ-ইবনে-আহ্মাদ কাদরী/ যেন দামেস্কে তৈরি কারুকাজ করা একটি বিশাল ভারি তরবারি,/ যেন বৃটিশ আমলের এখনও নির্ভরযোগ্য কোনো/ ঝনঝন ক’রে ওঠা ধাতব ওভারব্রীজ,/ আমার নাম খুব হ্রস্ব/ আমার নাম শহীদ কাদরী।’

শহীদ কাদরীর জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলের সময়। শৈশবেই তিনি বৃটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়া ভারত দেখেছেন, পাকিস্তান দেখেছেন। দেখেছেন পূর্ব পাকিস্তানের উপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক ও সৈন্যদের নির্যাতন-দমন-পীড়ন, কৈশোরে দেখেছেন ভাষা আন্দোলন। স্থিরতা-শান্তি নষ্ট হতে দেখতে দেখতে তিনি দিনে দিনে বৈগগ্ধ্য ও পাণ্ডিত্য লাভ করেছেন খুব অল্প বয়সে। তাই তিনি দেশকে ‘প্রিয়তমা’ ডাকতে পারেন, ভাবতে পারেন, তাকে অভয়বাণী শোনাতে পারেন, তাকে অভিবাদন জানাতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেননি। দীর্ঘদিন নির্বাসনে থেকেও তিনি দেশের মানুষের হৃদয় থেকে একটুও নির্বাসিত হন নি। বাংলার মাটি-জল-বাতাস কখনো ভুলে যাননি। ভুলতে পারেননি এদেশের বিকৃত মস্তিস্কের কিছু দানব যারা মানুষরূপী, বাংলা বুলিই যাদের আশ্রয়, তাদের নির্মমতার কথা, পঁচাত্তরের বুট পরা দানবের হিংস্রতা কাঁদিয়েছিল কবিসত্তাকে। তার ‘হন্তারকের প্রতি’ কবিতাটি হয়ে উঠেছে ঐতিহাসিক দলিল –
বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়,/বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়/না, কোনো উপমায় তাদেও গ্রেপ্তার করা যাবে না/তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম/ বুট, সৈনিকের টুপি,/ বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের কথাও হয়েছিল,/ তারা ব্যবহার করেছিল/ এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো/ বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো/ দেখতে, এবং ওরা মানুষই/ ওরা বাংলা মানুষ/ এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনব না কোনোদিন।

শহীদ কাদরীর কবিতায় দেখেছি অসাধারণ আবেগ। এত আবেগ রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ ব্যতিত অন্য কারো কবিতায় কমই দেখা যায়। এই আবেগ থেকে জন্ম নিয়েছে তাঁর অনুযোগ-অভিযোগ-অভিমান। তবে বিদ্বেষভাব তার কোনো কবিতায় পাওয়া যায় না। তাঁর আবেগ দেশপ্রেমের আবেগ, দেশবিচ্ছেদের আবেগ, একাকীত্বের আবেগ এবং বঞ্চনার আবেগ। তাই তিনি সকলের কবি হয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন প্রতিটি পাঠকপ্রাণে। সহজ-সরল কথার তীব্র আবেগের কারণে তিনি বাংলাদেশে পাঠকসমাদৃত হয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন। যদিও তিনি এমন কৃত্রিম আকাঙ্ক্ষা কখনোই করেন নি। স্বয়ংক্রিয়ভাবে হয়ে গেছে। কারণ তিনি অনেক বছর দেশের বাইরে থেকেও পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই থেকেছেন। নিজ দেশে অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েও পাড়ি জমান পর্যায়ক্রমে ইংল্যান্ড, জার্মানি ও আমেরিকায়। কোথাও তিনি স্থির হতে পারেননি। স্বদেশ ছেড়ে এ যেন স্বেছায় করাবরণ। বন্দিত্বকে বরণ করেও তিনি এদেশের করাত-কলের শব্দকে দেশপ্রেম চেতনার প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছেন।
শহীদ কাদরী আধুনিক নগর ভাবনার কবি। বেড়ে ওঠা এবং যৌবনের পুরোটা সময় তিনি শহরের হাওয়া-বাতাস গায়ে মেখে বেড়ে উঠেছেন। তাই তাঁর কবিতায় শহর আর শহরের মানুষের ভাবনা-বিপর্যয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। কবিতার এই বিষয়বৈভব আশ্চর্য অনুভূতিপ্রবণ। অতলস্পর্শীও। এরকমই অভিনব ও আশ্চর্য অনুভূতি সৃষ্টিকারী কিছু কাব্যছবির স্রষ্টা তিনি; যিনি শহরে থেকেও বাংলাদেশের নিসর্গকে কবিতা নির্মাণের অন্যতম অনুষঙ্গ করে তুলেছেন। বাংলাদেশের গ্রামজীবনের বিচিত্র বিস্ময় এবং আবেশ শহীদ কাদরীর কবিচিত্তে অচেনা ঝড় তুলতে পেরেছে। অন্যদিকে নগরজীবনের নিত্যকার যন্ত্রণা তাকে উৎকণ্ঠিত করে তুলেছে। তার নগরজীবন যেন তরুণ হাতের বিলিকরা নিষিদ্ধ ইশতেহার। নগরজীবনের এই বিচ্ছিন্ন বোধ থেকে উদগীরিত কয়েকটি চরণ ‘বোধ’ কবিতা থেকে –
‘ব্যতিব্যস্ত মস্তো শহর জুড়ে/ এই এলো আশ্বিন,/ আমার শূন্য হলো দিন/ কেন শূন্য হলো দিন?’

মহাকালের অব্যর্থ যাত্রী শহীদ কাদরী ১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট চেতনা জাগানিয়া এক মোহনীয় কবিতাপ্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কলকাতায় জন্ম নেওয়া কবি আজীবন যাযাবর হিসেবেই কাটিয়েছেন। বাংলাদেশে এসেছেন, আবার কখনো কলকাতা, কখনো লন্ডন-জার্মানি-নিউইয়র্কে থেকেছেন। কবিতাকে জীবনযাত্রী করেছেন বলেই তিনি এমন পরিব্রাজক। ১৪ বছর বয়সে তার প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয়। বাংলা কাব্য-সাহিত্যের ভুবনে তিনি শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন তিনটি কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে। সেইগুলি হচ্ছে ‘উত্তরাধিকার’ (১৯৬৭), ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ (১৯৭৪), ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ (১৯৭৮)। একত্রিশ বছরের একটা দীর্ঘ বিরতি শেষে ২০০৯ সালে ৩৬টি কবিতা নিয়ে ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ প্রকাশ করলেন। কবিতায় নান্দনিক প্রত্যাবর্তন হলো তাঁর। শহীদ কাদরীর প্রতিটি কবিতাই তীক্ষ্ণ। মাত্র এই চারটি গ্রন্থই সৃষ্টি করেছে ষাটের কবিতার মূল ধারা। বলা যায়, এই স্বল্প পরিসরের আয়োজনেই তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তিনি বিচিত্র ভাষা নির্মাণ করেছেন। কবিতায় তিনি নগরজীবনের ক্লেদ, বিকলতা, বিফলতা এবং আত্মজৈবনিক স্বীকারোক্তি প্রকাশ করেছেন।
উত্তরাধিকারের প্রথম কবিতা ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ তেই কবির অনুভবে অস্তিত্বের সংকট। যে-বৃষ্টি নাগরিক বাতাসকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। বিপদগ্রস্ত ঘর-দোর, জানালা-কপাট নড়ে ওঠে। জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায় জনারণ্য, শহরের চকচকে, ঝলমলে এভিনিউ বেসামাল হয়ে ওঠে। এই বৃষ্টি প্রতীকী বৃষ্টি, নগরজীবনের বিপদসাইরেন। ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’র ‘ছুরি’ কবিতায় কবি বলেন, ‘জলও আপন স্রোতের ভেতর লক্ষ কোটি বর্শা পোষে’। একই কবিতায় দেখা যায়, ‘বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে, বৃষ্টি পড়ে/ তীক্ষ্ম কালো ছুরির মতো চতুর্দিকে বৃষ্টি পড়ে।’ একই বৃষ্টি আবার আগুনের ভয়াবহ শিখা হয়ে দেখা যায় কোনো কোনো পঙ্ক্তিতে – ‘অগ্নিময় বৃষ্টিতে তুমি হিম, সোনালি ছুরি প্রিয়তমা!’। ইতিবাচক আর নেতিবাচক যেভাবেই হোক বৃষ্টি শহীদ কাদরীর খুবই প্রিয়। ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ কাব্যগ্রন্থের ‘আজ সারাদিন’ কবিতাটিতে বৃষ্টিভেজা একটি কালো কাক নৈরাশ্যব্যঞ্জক হলেও ‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ কাব্যগ্রন্থে ‘প্রবাসের পঙ্ক্তিমালা’ কবিতায় বৃষ্টিকেই আহবান করেছেন আকুতিভরে –

হে মেঘ! হে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ। তুমিও ঠকাবে নাকি/ হে নিরুদ্দেশগামী?/ কাউকে বিশ্বাস সেই আর এই বিরূপ বিদেশে।/ তবু বলি : যদি পারো,/ হে নন্দিত মেঘ তুমি নেমে এসো/ ঘন ও নিবিড় হয়ে, করুণাধারায় নেমে এসো/ শ্রাবণে শ্রাবণে তুমি, হে বন্ধু স্পন্দিত করে দাও/ এই অফুরান পরবাস।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা এবং অসাম্প্রদায়িকতাকে তিনি কবিতায় নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। ‘তুমি’ কবিতায় তিনি বলেন, “মার্ক্সবাদী বিপ্লব অর্থাৎ অনবরত গণ-অভ্যুদয় ছাড়া আমাদের এই বিব্রত তৃতীয় বিশ্বে অন্য কিছু কবিতার বিষয়বস্তু হতে পারে না কিছুতেই – এইটুকু লিখে আমাকে থামতে হলো।” অন্য একটি কবিতায় তিনি বলেন, “দু টুকরো রুটি কিংবা লাল শানকি ভরা এবং নক্ষত্রকুচির মন কিছু লবণের কণা/ দিগন্তের শান্ত দাওয়ায় আমাকে চাওনি তুমি দিতে/ তাই এই দীর্ঘ পরবাস।” ‘তাই এই দীর্ঘ পরবাস’ কবিতার শেষ চরণটি তার ব্যর্থ ব্যাকুলতাকেই ফুটিয়ে তুলেছেন “চিরকাল পরবাসী আমি স্বদেশে-বিদেশে।”

‘যাপিত জীবনের কিছু ছায়া লেখকের রচনায় পড়ে, এ কথা জানা। লেখকের আপন জীবনই তাঁর রচনার সর্বোৎকৃষ্ট উপাদান এ কথাও অনেকে বলেন। সময়, সমাজ, দূরদেশ, পরিপার্শ্ব এসব নিয়েও কথা হয়- লেখকের রচনায় কী পরিমান প্রভার ফেলে ওইসব। কিন্তু‘ সময়, সমাজ, স্বদেশ, দূরদেশ, পরিপার্শ্ব, পরিবেশ ইত্যাকার লেখককে রচনাবিমুখও করে।’

গ্রাম-বাংলার উপমায় রবীন্দ্রনাথ থেকে যেমন জীবনানন্দ ভিন্ন, ঠিক সেভাবেই শহীদ কাদরী পাঠকচিত্তে নতুন স্পর্শ এনে দিয়েছেন। তাইতো তিনি বিপুল সংখ্যক পাঠকের প্রিয় কবি হতে পেরেছেন। জীবনের বিশৃঙ্খ দিকগুলি শহীদ কাদরীর কবিতায় শৃঙ্খলার মতো। শহীদ কাদরীর আত্মসমালোচনা, আত্মউন্মোচন। তিনি আসলে পাঠকচিত্তে স্মৃতির শহীদ কাদরী হয়েই থাকবেন অনন্তকাল। কবিতায় সরব-সুতীব্র শহীদ কাদরী এক আশ্চর্য সম্মোহন হয়ে থেকে যাবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। তাঁর নীরবতা-যন্ত্রণা-অভিমান প্রজন্মকে সাময়িক পীড়া দিলেও তাঁর আশা জাগানিয়া কবিতাসমূহ পাঠকের উদ্দীপনার ধারক হয়ে থাকবে। এমন কবির ভাবমূর্তি বাঙালি বিস্মৃত হলে জাতি যে কেবল ধূসর স্মৃতির বাহক হয়ে থাকবে। সমকালীন কেন, পরবর্তীকালের কবিদেরকে তিনি যেভাবে প্রভাবিত করে রেখেছেন তাতে তাঁর স্বল্পকালে কবিতা রচনার কালকে শহীদ কাদরীর যুগ বলা হলেও বেশি বলা হবে না। কারণ তিনি পাশ্চাত্যে থেকেও কখনোই তিনি পাশ্চাত্য মনস্কতা লালন করেন নি, পাশ্চাত্যকে অনুসরণও করেন নি। তাঁর সমস্ত কবিতাই হৃদয় থেকে উৎসারিত।

শহীদ কাদরী একবিংশ শতাব্দীর প্রজন্মকে উপহার দিয়েছেন আশাবাদের অমীয় বাণী। তিনি এই প্রজন্মের মধ্যে হানাহানি, রক্তপাত, যুদ্ধ চান নি। তিনি নবজাতককে উপহৃত করেছেন শিউলি ফুলে, গোলাপ আর জোনাকি রাতের আবাহনে।
‘আমি জানালা থেকে দেখলাম/ মনজুর এলাহীর গোটা বাগান/ জোনাকিরা দখল করে নিয়েছে/ বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে।’

একজন কবির কাছে পরবর্তী প্রজন্মের চাওয়া থাকে নিরন্তর। কবি তাঁর নিপুণ হাতে মানুষের জন্য, মানবতার জন্য বুনে যান সৃষ্টির বীজ। শহীদ কাদরী অনেক দূর, তথা পরবাসে থেকেও নিজ জাতি, নিজকাল আর নিজ দেশের জন্য বিশ্বস্ত প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছেন। সুশীল সমাজের প্রতি তাঁর সন্দেহের প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন, তাঁর কবি ও কবিতার প্রকৃত মর্মবাণী উপলব্ধি করতে পারলে বাংলাদেশ কেন কোনো রাষ্ট্রেই কোন সমস্যা থাকার কথা নয়। কবিতার শানিত অস্ত্রেই গুপ্তঘাতকের চেতনা জাগিয়ে তোলার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন। কবিতার মন্ত্র ব্যতিত কোনো ধরণের নিধনযজ্ঞে তিনি বিশ্বাসী নন। এমন উচ্চারণতো গণকণ্ঠেরই উচ্চারণ। এই উচ্চারণই মহাকাল যাত্রার মানবীয় বচন হতে পারে। ‘যদি মুখ খুলি’ কবিতায় তিনি লিখেছেন –
‘যদি মুখ খুলতেই হয়/ আমি বলবো : আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা/ ক্রমশ কমে যাচ্ছে, উত্তর বাংলায়/ শীতের পোশাক যাওয়া দরকার,/ আমেরিকা না বেজিং সাহায্যের হাত/ প্রসারিত হবে কার দিকে? এ ব্যাপারে/ সুশীল সমাজ কী মনে করেন?/ কার কণ্ঠে তুলে দেবো/ কবিতার এই মণিহার?
আমি জানি গুপ্তঘাতকেরা/ ছড়িয়ে রয়েছে আমার শহরে।/ তাদের নিধন চেয়ে/ কবিতাকে অস্ত্রের মতো/ ব্যবহার করতে চেয়েছি আমি বহুবার।
আধুনিক কবিতা উপমা-রূপকাশ্রিত। তা না হলে কবিতা যেন পূর্ণতা পায় না, কেমন সাদামাঠা হয়ে যায়। ফাঁকা ফাঁকা লাগে। শহীদ কাদরীর কবিতা তেমনটাতে হয়ইনি বরং প্রতিটি কবিতাতেই তিনি রূপক-উপমা ব্যবহার করে কবিতায় এনে দিয়েছেন কাব্যসুধা। হৃদয়ের সকল সৌরভ। চিত্রকল্পের অসামান্যতা তাঁর কবিতার বিশেষ গুণ। গাল্পিক কথোপকথনের মধ্যেও তাঁর ছন্দ ও অলঙ্কার খুঁজে পাওয়া যায়। নাগরিকবোধের কবি হলেও নিসর্গের উপকরণগুলো অবহেলিত থাকেনি তাঁর কবিতায়। বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা অপূর্ব চিত্রকল্পঋদ্ধ হয়েছে। শহীদ কাদরীর কবিতায় ব্যবহৃত জ্যোৎস্না অসাধারণ চিত্রকল্প। শহীদ কাদরীর কবিতায় জ্যোৎস্না অনেক কবিতাকেই সমৃদ্ধ করেছে। এই জ্যোৎস্নাকে তিনি বর্ণনা করেছেন বিভিন্নভাবে। ক্যাপটেনের বুটের ভেতর সে শুয়ে থাকে, শিশিরের টলটলে ফোঁটার ভেতর জ্যোৎস্না হয়ে ওঠে করোগেট শিট। রাতের গাছের পাতায়, ঘাসের ফাঁকে, পরিত্যক্ত প্রস্রাবও ঝলমল করে জ্যোৎস্না মেখে। সুদূর মার্কিন মুল্লুকে থেকেও তিনি বিদিশার তীরে বসে চন্দ্রজ্যোৎস্না উপভোগ করেন পরম আগ্রহ ভরে। দীর্ঘ প্রবাসজীবনের যন্ত্রণাকে তিনি বড় করে দেখেছেন, মা-মাটি আর শেকড়ের টানে। সেখানেও সাদা খরগোশের মতো কম্পমান অবস্থায় আবির্ভূত হয়েছে চাঁদ। বস্তুত, চাঁদ-জ্যোৎস্নাকে কবি ভুলতে পারেন নি কখোনও, এমন সত্য তাঁর সকল কবিতাপাঠেই অনন্য। জ্যোৎস্নালোকের চিত্রমালা শহীদ কাদরীর কবিতার অপরূপ সৌন্দর্য। নশ্বর জ্যোৎস্নায় দেখা যায়, কবি জ্যোৎস্নামুগ্ধ হয়ে যান। জ্যোৎস্নার সৌন্দর্যকে কবি বর্ণনা করেছেন এভাবে –

‘জ্যোৎস্নার জ্বলজ্বলে লাবণ্য/ আজীবন খুচরো পয়সার মতো পার্কে, ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে/ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে।’

শহীদ কাদরী নাগরিক কবি। নগরজীবনই তাঁর কবিতার প্রধান উপাদান। চাঁদ-জ্যোৎস্না ছাড়া নিসর্গের আর কোনো উপাদানই তাই বিশেষ স্থান করে নিতে পারেনি তাঁর কবিতায়। এখানে জোনাকি আছে, তারা সোনালি জরির মতো নকশা জ্বেলে দেয়, অমাবশ্যার অন্ধকারে গোলাপঝাড়ের মতো পুঞ্জ পুঞ্জ ভরে থাকে সে জোনাকিও আবির্ভূত হয় জ্যোৎস্না কিংবা অনুকিছুর অনুষঙ্গ হিসেবে; বলা যায় জোনাকির যে একটা স্বতন্ত্র ও সৌন্দর্যময় অস্তিত্ব রয়েছে, তার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। কাদরীর কবিতায় শর্করার মতো রাশি রাশি নক্ষত্রবিন্দুর দেখা পাওয়া যায়; হীরার কৌটোর মতো শিশির টলটল করে ফুটপাতে শুয়ে থাকা ন্যাংটো ভিখিরির নাভিমূলে; কবি নিজেও ওষুধের ফোঁটার মতো বিন্দু বিন্দু গলাঃধকরণ করতে চান প্রতিশ্রুতিশীল শিশির; গাছ-মাছ-জলসহ সকল গ্রাম্য আবহই দু-একবার হাজির হয়েছে তাঁর কবিতায়; নিসর্গকে নিপুণ জেলে বলেও ভেবেছেন কখনওবা; নিসর্গের আকর্ষণে বারবার যেতেও চেয়েছেন গ্রামে; তবুও, নৈসর্গিক চিত্র অথবা পল্লীপ্রধান বাংলাদেশ, কোনোটাই কাদরীর কবিতার কেন্দ্রীয় বিষয় নয়। বরং নগরের বাসিন্দা বলেই হোক আর নাগরিকতার সর্বগ্রাসী রূপের প্রভাবেই হোক, নগরজীবনই তাঁর কাব্যের প্রধান উপাদান। এমনকি তিনি যখন নৈসর্গিক কোনো উপাচারের নান্দনিক পঙক্তি উপস্থাপন করেন, তখনও নগর ও নাগরিক ভঙ্গি এবং ভাষাপ্রয়োগেও নাগরিকতা লক্ষ করা যায়। তারপরও, বঙ্গ-প্রকৃতি আর বাংলার নিসর্গের যে ছবিগুলো তিনি আঁকেন, যে মমতায় আঁকেন, তা কেবল কাব্য হিসেবেই নয়; স্বদেশ, স্বজাতি এবং স্বনিয়ন্ত্রিত জীবনদর্শনেরও অনিন্দ্য নান্দনিকতার অসামান্য প্রতীক।
শহীদ কাদরীকে শুধু নাগরিক কবি বলা যাবে না। তিনি পরিশুদ্ধ মানবকুলের কবি। তিনি আমাদেরকে শিখিয়েছেন সম্মিলিত প্রয়াসে দেশ গড়ে তোলার মূলমন্ত্র। এক্ষেত্রে তিনি আমাদের অক্ষমতা, ব্যর্থতা, নপুংসকতাকে ধরিয়ে দিয়েছেন। আমাদেরকে বোঝাতে চেয়েছেন কেমন হবে আমদের রাজনৈতিক-সামাজিক চিত্র। যদিও তিনি বলেন ‘কবিতা, অক্ষম অস্ত্র আমা ‘ – এটা তো একধরনের উদারতা। বরং তাঁর কবিতাকে আমরা পাই ভোরের আবেশী সূর্যের মতোই –

‘আমরাই বিকৃত তবে? শান্ত, শুদ্ধ এই পরিবেশে/ আতর লোবান আর আগরবাতির অতিমর্ত্য গন্ধময়/ দেবতার স্পর্শ-পাওয়া পবিত্র গ্রন্থের উচ্চারণে/ প্রতিধ্বনিময় সব্জীক্ষেতের উদার পরিবেশে।’
এলোমেলো আর অন্ধকার আলো-হাওয়া শহীদ কাদরীর মনকে বিক্ষিপ্ত-বিষণ্ণ করেছিল। তার বাউল মনই তাঁকে দেশ-বিদেশে ঘুরতে সাহস যুগিয়েছিল। উত্তরাধিকার কাব্যগ্রন্থিত ‘অগ্রজের উত্তর’ কবিতায় তিনি পলায়নপর মনোবৃত্তি অবলম্বন করেছেন। হয়তো অচেনাকে চিনতে পারার অতৃপ্তি থেকেই এমন স্বীকারোক্তি। পরিশ্রান্ত জীবনে শ্রান্তির অ্ন্বেষা তাঁকে তাড়িত করেছে সবসময়। একজন সত্যিকার কবির ক্ষেত্রে এমনতর হওয়াটাই স্বাভাবিক।
‘না শহীদ সেতো নেই, গোধুলিতে তাকে/ কখনও বাসায় কেউ কোনদিন পায় নি, পাবে না।’
শহীদ কাদরীর জীবনসাম্পান ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’-এর মাঝে দোদুল্যমান। তাঁর সুখ-আনন্দ-হাসির মাঝেও যেন শূন্যতার অন্ধকার। তাঁর বোহেমিয়ান কবিচিত্ত অস্থির-চঞ্চল। এত অস্থিরতার মাঝেও না-পাওয়ার আর্তি আর বিরহে কবির স্বপ্ন যেন অধরাই থেকে যায়। তবুও তাঁর সরল উক্তি আমাদেরকে আলোর দিকে নিয়ে যায়, আশার সঞ্চার করে। প্রাণ-সুখ-ভালোবাসার দিকে নিয়ে যায়। তারপরও শান্তি যেন প্রার্থিত উপাদান হয়েই থাকে, শান্তি মেলে না কোথাও। শাহরিক জীবনের সুখ, দুঃখ, চিত্র, বৈচিত্র, ইট-কাঠ দালানকোঠার কংক্রিট-বুনন খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করেছেন বলেই নাগরিক শব্দমালা তাঁর কবিতার অনন্য অলংকার। মোটরের বনেট, পার্ক, সিনেমার কিউ, ল্যাম্পপোস্ট, কারফিউ, রেস্তোরাঁ, সিগন্যাল, ফুটপাত সবই কবির আবাল্য চেনা। তখন থেকেই এসবের সঙ্গে তার একাত্মতা। কিন্তু নাগরিকবোধ তাঁর স্বস্তির উপাত্ত নয়। বরং নগরজীবনের নিঃসঙ্গতা, রুগ্নতা, হীনতা, সংকীর্ণতা, নিঃসঙ্গতা আর ক্লেদ সবই শূন্যতাময়। তিনি লিখেছেন –
বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা/ মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ,/ কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা/ ঘন জঙ্গলে ময়ূর দেখাবে নাচ/ প্রেমিক মিলবে প্রেমিকের সাথে ঠিকই/ কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না…।
‘শহরের ভেতরে কোথাও হে রুগ্ন গোলাপদল,/ শীতল, কালো, ময়লা সৌরভের প্রিয়তমা।’
কিন্তু এই অস্বস্তি ও নিঃসঙ্গতা থেকে মুক্তি পেতে চান তিনি। জ্যোৎস্নামুখর রাতের আকাশ আর নিষ্কলঙ্ক সুন্দর সকাল কবির আরাধ্য। পূণ্যতার আধার। তাই তিনি লিখতে পারেন –
‘ সেই স্যাঁতসেতে ঠাণ্ডা উপাসনালয়ে পেতে দাও/ জায়নামায, শুকনো কাঁথা, খাট, স্তূপ স্তূপ রেশমের স্বাদ/ আলিঙ্গনে, চুম্বনে ফেরাও শৈশবের অষ্ট আহ্লাদ।
কবি নিরন্তর ভালোবাসায় স্বপ্নের জাল বুনে যান। আলোর স্পর্শটুকু পেতে তাঁকে অনেকটা বন্ধুর পথ মাড়াতে হয়। ব্যক্তিক অনেক নৈরাশ্য, নৈঃসঙ্গ্য, হতাশা ও বঞ্চনা সত্ত্বেও তিনি এদেশের মানুষকে রূপালি জ্যোৎস্নার স্বপ্ন জাগাতে ভালবাসেন। প্রিয়তমা দেশকে গুচ্ছ গুচ্ছ গোলাপ, চকোলেট, সোনালি গীটারের ভালোবাসা দিয়ে অভিবাদন জানাতে চান। রাজনীতি-সচেতন কবি শহীদ কাদরী রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল কূটকৌশল এড়িয়ে প্রিয়তম স্বদেশকে সুস্থির আর সুন্দর দেখতে চান। সেনাবাহিনী গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে যে দেশে মার্চপাস্ট করবে। স্যালুট জানাবে। ছুরির পরিবর্তে হন্তারকের হাতে থাকবে আর্কেডিয়ান। নাগরিক বিপ্লবের জয় হবে শহরে শহরে। এমন ভাবনা থেকে তিনি ‘রাষ্ট্রপধান কি মেনে নেবেন?’ কবিতায় লিখেছেন –
‘রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো/ পররাষ্ট্রনীতির বদলে প্রেম, মন্ত্রীর বদলে কবি / মাইক্রোফোনের বদলে বিহবল বকুলের ঘ্রাণ?’

কিন্তু শাসকমাত্রই শোষক। এ যেন নির্মম বাস্তবতা। এদেশ কেন বিশ্বায়নের পৃথিবীর বেশিরভাগ রাষ্ট্রনায়কদের জন্য এটাই সত্য। তারা কেন মেনে নেবেন এমন অমীয় সুর? তাদের শাসনে শুধু কনকনে শীতের দাবদাহ! ভালবাসা আর মানবতাপিয়াসী যাযাবর কবি রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতায় নিদারুণ আশাহত। ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ কাব্যগ্রন্থে জীবনের শূন্যতা ও নিষ্ঠুর নিয়তির অভিসন্ধি কবিতায় ঘুরপাক খায়। সমাজ ও জনজীবনের অস্থিরতা, পাওয়া-না পাওয়ার ব্যাকুলতা ও বিষণ্ণতা ব্যক্ত করেছেন গ্রন্থটিতে। ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’কাব্যগ্রন্থের অন্যতম আলোচিত কবিতা এর নামকবিতাটি। কবিতাটিতে কবি সুস্থ, সবল, নান্দনিক, গণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসমুক্ত রাষ্ট্রকাঠামো নির্মাণের কথা বলেছেন। তিনি তাঁর আশৈশব স্মৃতিকাতরতার দেশের মানুষের জন্য লিখে গেছেন আশীর্বচন –
ভয় নেই/ আমি এমন ব্যবস্থা করবো যকে সেনাবাহিনী/ গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে / মার্চপাস্ট ক’রে চ’লে যাবে / এবং স্যালুট করবে / কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।’
আবার এই আশা জাগানিয়া কবিকেই নিদারুণ ব্যর্থ-আশাহত-উদ্বেলিত করে তোলে। আশার বাণী যখন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয় তখন দৃঢ়চিত্তের কবি মুহূর্তের জন্য হয়ে ওঠেন নৈরাশ্যের সহযাত্রী –
‘তুমি গান গাইলে,/ জাতিসংঘের প্রস্তার লঙ্ঘন করে সারি সারি ট্যাঙ্ক/ জলপাই পল্লবের ফাঁকে ফাঁকে/ খুব ভয়াবহভাবে যুদ্ধবিরতির সীমারেখা পার হলো।’
যুদ্ধ নয় শান্তি চাই। এই বিশ্বাস তিনি হৃদয়ে ধারণ করেছেন। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বলতে পারেন –
‘ক্যাপটেন, এবার তুমি চিৎকার করে বলে ওঠো ‘হ্যান্ডস আপ’/ টলে-পড়া গোলাপ দাঁড়িয়ে পড়ুক তার ঝাড়ে,/ হন্তারকের হাত থেকে পড়ে যাক ছুরি।’
‘আমার চুম্বনগুলো পৌঁছে দাও’ শহীদ কাদরীর চতুর্থ ও সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ। প্রবাসে বসেই লিখেছেন গ্রন্থটি। গ্রন্থটির কবিতাগুলোতে দেশপ্রেম আর প্রতিশ্রুতিবোধ বহুমাত্রিকভাবে উম্মোচিত। স্বাধীনতা-স্বদেশ, প্রকৃতি-প্রতিবেশ এবং আত্মমগ্ন উপাদানকে সামনে রেখে একমাত্র তিনিই দেশাত্মবোধের মমতাকে ছুঁতে পেরেছেন। তিনি বলেছেন –
‘একটি আংটির মতো তোমাকে পরেছি স্বদেশ/ আমার কনিষ্ঠ আঙুলে, কখনও উদ্ধত তলোয়ারের মতো/ দীপ্তিমান ঘাসের বিস্তারে, দেখেছি তোমার ডোরাকাটা/ জ্বলজ্বলে রূপ জ্যোৎস্নায়।’
শহীদ কাদরীর প্রথম কবিতা ‘পরিক্রমা’ ছাপা হয়েছিল ‘স্পন্দন’ পত্রিকায়। ‘এই শীতে’ প্রকাশিত হয় সে যুগের আরেকটি বিখ্যাত পত্রিকায়। অগ্রজ কবি শামসুর রাহমানসহ তিনি খুব অল্প বয়সেই সান্নিধ্য পেয়েছিলেন আল মাহমুদ, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ফজল শাহাবুদ্দীনদের। তিনি অগ্রজদের সমীহ আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন। শুরু থেকেই তিনি প্রগতিশীলতাকে ধারণ করতেও সক্ষম হয়েছিলেন। শহীদ কাদরী অনন্য প্রতিভার কবি। বিরলপ্রজ। বাংলাদেশের যে কোন কবির তুলনায় তার কাব্যগ্রন্থ ও কবিতারসং খ্যা নিতান্তই অল্প, যা কেবল তিরিশের সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সাথে তুলনীয় হতে পারে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত হয়, এর সাত বছর পরে দ্বিতীয়টি, আরো পাঁচ বছর পরে তৃতীয়টি (১৯৭৯), আর এর ত্রিশ বছর পরে প্রকাশিত হয় শেষ কাব্যগ্রন্থটি।
আমার চুম্বনগুলি পৌঁছে দাও কাব্যগ্রন্থের শেষ কবিতা ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’। এই কবিতায় তিনি ফিরতে চেয়েছেন নিজ দেশে, নিজগৃহে, একান্ত নিজস্বতায়, শুধু প্রাণভরে নিঃশ্বাস নিতে। কবিতাটিতে তিনি লিখেছে্ন –
‘আমার নিজস্ব ঘরে প্রতিষ্ঠিত হব বলেই/ আমি নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়েছিলাম একদা/ আমার আজন্ম-চেনা গৃহচ্ছায়া থেকে-/ আমার প্রথম কৈশোরের রৌদ্রকরোজ্জল ভোরে।’
শহীদ কাদরীর জনপ্রিয় কবিতাসমূহের মধ্যে রয়েছে ‘রাষ্ট্রপ্রধান কি মেনে নেবেন?’, ‘ তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’, ‘উত্তরাধিকার’, ‘সঙ্গতি’, ‘অলীক’, ‘পরস্পরের দিকে’, ‘আলোকিত গণিকাবৃন্দ’, ‘অবিচ্ছিন্ন উৎস’, ‘পতন’, ‘চন্দ্রাহত সাক্ষাৎ’, ‘রাষ্ট্র মানেই লেফ্ট রাইট লেফ্ট’, ‘স্কিৎসোফ্রেনিয়া’, ‘নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে’, ‘ব্লাক আউটের পূর্ণিমায়’, ‘দাঁড়াও আমি আসছি’, ‘একটি ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল’, ‘একটি মরা শালিক’ ইত্যাদি। কবিতাগুলো পাঠকের মুখে মুখে ফেরে। কবিতাগুলোতে তিনি মনুষ্যসত্তার দ্রোহ আর উত্থানকে নিজের মতো করে চিত্রায়িত করেছেন। এই হচ্ছে তাঁর জনপ্রিয় আর চিরায়ত হওয়ার সূত্র । মাত্র দু’টি চরণও যদি ধরি, শহীদ কাদরীর মানবিকতাকে চিরস্মরণযোগ্য করে রাখবে।
‘এই গ্রহের মহাপুরুষেরা কে কী বলেছেন/ আপনারা সবই জানেন। এখানে বক্তৃতা আমার উদ্দেশ্য/ নয়। আমি এমন নগন্য মানুষ, আমি
শুধু বলি : জলে পড়ে যাওয়া ঐ পিঁপড়াটাকে ডাঙায় তুলে দিন।
দেশকে ভালবাসার কথা কখোনও শহীদ কাদরী ভোলেন নি। মুক্তযুদ্ধ ও মুক্তবুদ্ধির প্রতি আস্থাশীল কবিকে প্রেমের অবতার বললেও ভুল হবে না। তবে এই প্রেম দেশপ্রেমের, দেশবিচ্ছেদের, বিরহকাতরায় হতবিহবলতার। তাঁর জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে প্রবাসযাপনে, মাতৃভূমির স্মৃতিবিহনে। দোলাচলের মধ্য দিয়ে কেটেছে জীবনের সিংহভাগ। প্রবাসজীবনকে তিনি তুলনা করেছেন মাঝনদীতে একাকী ভেসে চলার মতো। চোরা ঘুর্ণির ভেতর। এই ঘুর্ণিজলে ডুবসাঁতার দিয়ে তিনি জীবন কাটিয়েছেন। ‘দাঁড়াও আমি আসছি’ শহীদ কাদরীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। এটি প্রেমের কবিতা, ব্যর্থতার কবিতা। তিনি তাঁর হতবিহবলতাকে ব্যক্ত করেছেন এভাবে –
‘এখন আমি কোনদিকেই আর যেতে পারছি না/ সে কোন সকাল থেকে শুরু হয়েছে আমার অঙ্গভঙ্গি/ আমার ডুবসাঁতার, চিৎসাঁতার,/ উবু সাঁতার, মৃদু সাঁতার, মরা সাঁতার, বাঁচা সাঁতার/ হ্যাঁ, সত্যি। সাঁতার দিতে-দিতেই আমার বয়োবৃদ্ধি হ’লো,/ জলের ওপর আমার কৈশোর, আমার যৌবন/ কচুরিপানার মতো ভেসে/ বেড়াচ্ছে কী দারুণ সবুজ!’
এমন বিহবলতা-বিষণ্ণতায় তিনি ফিরতে চান তাঁর কাঙ্ক্ষিত কূলে। ফিরেছেনও। প্রিয়তমার লাল-সবুজ আঁচলতলে। মৃতনিঃশ্বাসে। এ জন্যই তিনি হয়তো লিখেছিলেন –
‘দাঁড়াও, আমি আসছি/ তোমাকে চাই ভাসতে ভাসতে/ ডুবতে ডুবতে/ ডুবে যেতে যেতে আমার/ তোমাকে চাই/ দাঁড়াও, আমি আসছি…।’