শুভদীপ মৈত্র > গুল্মলতার মেয়ে >> ছোটগল্প

0
245

“এই মেয়ে কতকাল ধরে, এভাবেই রয়ে গেছে। এই যে বাসে করে সে ফিরছে, এই সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা, এ এক আদিম সত্তা, যেভাবে পিঁপড়েরা খাবার মুখে নিয়ে ঘরে ফেরে। তবু এর মাথার মধ্যে ঘুরে চলেছে একটা নিজস্ব স্বপ্ন, না কি স্মৃতি? কতটা তার মধ্যে বাস্তব ঘটনা আর কতটাই বা তার শরীরী তাড়না থেকে তৈরি হওয়া কল্পনা?”

পুড়ছে। সিগারেট ফিল্টার পর্যন্ত টেনে, নিকোটিন হলুদ আঙুল, অপেক্ষা, টেবিলে মাথা দিয়ে বসা, একটা কার্ভেচার খণ্ড ‘ৎ’-এর মতো, যার থেকে ধোঁয়া বেরিয়ে চলেছে কারণ সিগারেট একটি থেকে আরেকটি প্রজ্জ্বলিত। এই যে গোল টেবিল, সে জোগাড় করেছিল পুরনো আসবাব ঘেঁটে, নিচু এবং একটা মোড়া বা ছোট টুলে বসে কখনো আরাম কেদারায় বসেও সেই টেবিল চমৎকারভাবে ব্যবহার-যোগ্য। ফলে, প্রথম যৌবনের এই শৌখিনতা সে বজায় রেখেছে। অবশ্য সে যে খানিক ‘অ্যান্টিক্যুরিয়ান’তা সবাই জানে।
খক খক করে কাশি – শুকনো কাশিটা তার এই সিগারেট অপরিমিতির কারণ – তবু সে এর থেকে নিষ্কৃতি চাইছে না, অন্তত এখনই নয়, অন্তত নায়িকা না পাওয়া গেলে…
এমন ঘটনা তার এই মধ্য-চল্লিশে কখনও ঘটেনি। সে তার লেখালেখিতে স্বচ্ছন্দ, রাইটার্স ব্লককে সে চিরকাল মনে করে এসেছে স্টান্টবাজি, অথচ তার নিজের মাথায় আসছে না কিছুই। একটি চরিত্র, একটি মেয়ে তাকে সে কল্পনা করতে পারছে না কেন? সে কোনও দিন একটা মেয়েকে নিয়ে গল্প লিখে উঠতে পারেনি, কখনওই কোনও মেয়ে তার গল্পের প্রধান চরিত্র হয় না। ‘এই বাজারে আপনি সেটা না লিখলে চলে’ এমনটা তাকে সম্পাদক হুমকি দিয়েছে প্রায়, কথাটা সে হেসে উড়িয়ে দিলেও, তারপর থেকে তার অস্বস্তি কাটেনি। এবং লিখতে চেষ্টা করলেও বারবার ফিরে আসছে।
তামাম দুনিয়ায় লেখার বিষয়ের অভাব নেই। মেয়েদের নিয়ে লেখা বলতে ধর্ষণ, ট্র্যাফিকিং, শ্রমিক, মার-খাওয়া-বউয়ের সমস্যা, এমনকি ত্রিকোণ প্রেমের ক্লিশেকে নতুনভাবে ভেঁজে – কিন্তু সে লিখতে পারছে না। বিষয়ের অভাব নয় আসলে, সমস্যাটা পাতি, সে কোনও মেয়ের মুখ ভেবে উঠতে পারছে না। লিখতে গেলে একটা মুখ কল্পনা করতে হয় তো, সে উলটো দিকের মোটাসোটা মাঝবয়সী হোক বা দীপিকা পড়ুকোন, কোনও একটা কিছু তো লাগে, সে যুৎসই কাওকেই পাচ্ছে না বলে গল্পটা শুরু হচ্ছে না কিছুতেই…
মাথার ভিতর যে মুখটা ঘুরছে সেই উদাস সুদূর মুখটা কি তোমার? ক্লিম্ট-এর ডায়ান-এর মতো, কী এক জলজ প্রকৃতি থেকে উত্থিত, কিন্তু মন্থন নয় স্বকীয় তাড়নায় কোনো। গুল্মলতার মতো সেই মেয়ের শরীর, যমুনার জল ভেঙে সে উঠেছে। যতই তার শরীরকে বেষ্টন করছে ততই সে বুঝতে পারছে এ জলজ গুল্ম, এ শুধু তাকে বেড়তে পারে, অথচ সে কোনোও দিন পাবে না তার শরীর ধরে শক্ত নির্ভরতা, তবু এই দোদুল্যমানতা ঝিম ধরায়, মাথার ভিতর একটা ঝিমুনি সমস্ত কাজ আয়োজনে বিতৃষ্ণা নিয়ে আসে।
ওড়নাটা বাঁ কাঁধের উপর তুলতে তুলতে চোখে পড়ল ছেলেটিকে, রাসবিহারী মোড়ে পড়ন্ত রোদে অটো ধরার দৌড়াদৌড়িতে সে অচঞ্চল দাঁড়িয়ে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ে গেল ও, না? আরে নামটা কী যেন, নামটার কাছাকাছি অনেক নাম খেলে যাচ্ছে মাথায় এদিকে, চোখে চোখ সরেনি এখনও। ও তো সেই-ই না? মনে পড়ল সাত-আট বছর আগেকার কথা স্মৃতিতে ভেসে আসছে যে ছবিগুলো তাতে চোখ নামিয়ে ফেলতে হল। সে একটা সিগারেট মুঠো পাকিয়ে ঠোঁটের কাছে নিয়ে এসেছে, তখনও এমন অদ্ভূত ভঙ্গিতে সিগারেট টানত, ওর ডান হাতের কব্জিতে একটা তিল আছে। মনে পড়তেই শরীর শক্ত হয়ে গেল, মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। তিন বছর আগে। অফিসে আলাপ হয়েছিল, খুব দ্রুত আলাপ ঘনিষ্ঠতার দিকে ভাসে, যদিও সে ভাসার পিছনে ছেলেটির অভিজ্ঞ ও শক্ত হাতের মুঠো ছাড়া তা অত সুনির্দিষ্ট পথ পেত না। মনে পড়ছে কিছুটা জোরজার করেছিল যদিও তাকে বেআইনি কিছু বলা যায় না, বা বলা-না-বলার মাঝে একটা ধূসর অবস্থান। শান্ত সাদামাঠা বিবাহিত জীবনে হঠাৎ একটা নতুনত্ব, এখনও যেটা উত্তেজনা দিচ্ছে এই চোখ পড়াটা, প্রথম দিনগুলোর মতো, সেই কালো পাথর কোঁদা চেহারা আর ওই চওড়া কাঁধ। অফিস ফাঁকি দিয়ে দুপুরে তার বাড়িতে, ছোট্ট ঘরটায় চৌখুপি, পর্দা টানা জানলা, খাটের এক কোণে কাগজ, বই, ল্যাপটপ। সেখানেই ওই কব্জি ও আঙুল এসে ছিনিয়ে নিত, পোশাক, আব্রু, সংযম…
গুল্মলতার মেয়েকে এভাবে সে আড়ালে রেখেছে। আমরা তাকিয়ে দেখলে বুঝতে পারব যে ঘরটার কথা মাথায় ঘুরছে তার সেই চৌখুপি পর্দা, খাটের উপর ছড়ানো জিনিস যা ওর গোল টেবিলের কোণাকুণি দেখা যাচ্ছে, তা কতটা বস্তুনিষ্ঠ করতে পেরেছে সে। এইটুকু সে তৈরি করতেই পারে, এখান ওখান থেকে জোড়াতালি দিয়ে – জোড়াতালিই বা বলব কেন, একটা চমৎকার গৃহিনীপনাও রয়েছে তার মধ্যে – সে বানিয়ে তোলে তার গল্পের জগত। কিন্তু এখন সে খুশি নয়, এই এতটা এসেও সে বুঝতে পারছে না গুল্মলতার মেয়েটাকে সে আদৌ ধরতে পারবে কি না?
দুপুরে স্নান করতে তার দেরি হয়ে যায়। বাসি কাপড় ছেড়ে তোয়ালে জড়িয়ে সে যখন বাথরুমে ঢোকে তখন ট্যাঙ্কের থেকে আসা পাইপের জল গরম, ফলে তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, শাওয়ারটাও ভোগাচ্ছে বছর দুয়েকের উপর ফুটোগুলো পরিষ্কার করা হয়নি। গরম জলের ধারাটা থেকে সন্তপর্ণে দূরে সরে সে ভাবছিল ব্যাপারটা এমনি যে গরম না ঠাণ্ডা সেটা বোঝার জন্য হাত দেওয়া দরকার, তেমনি চরিত্রটার জন্যও কাউকে, এটা ভেবে সে খুশি হল, তারপর মনটা বিষাদে ভরে গেল, এমন কাউকে আর তো খুঁজে পাব না কখনও। এই আর শব্দটার উপর সে জোর দিল যেভাবে তাতে বোঝা গেল আপাতত একটা বিরহ মুড সে তৈরি করছে।
রাসবিহারী মোড় থেকে সে অনেকক্ষণ বাসে উঠে পড়েছে, কিন্তু অস্বস্তিটা তার যাচ্ছে না। নামটা কিছুতেই মনে পড়ছে না। এমন নয় যে সে নিম্ফো – না কি আমি নিম্ফোই? এটা কি তারই লক্ষণ? কিন্তু এমন তো নয় আমি যার তার সঙ্গে, যখন তখন। এমন সম্পর্ক আমার খুব যে হয়েছে তাও না। মনে পড়ছিল ছেঁড়া-ছেঁড়া কিছু স্মৃতি সৌপ্তিকের কথাও। আশ্চর্য সৌপ্তিকের নাম আজও মনে আছে, সেই যে বিয়ের আগে, হঠাৎ আলাপ, ফোনে কথা হোত রোজ, প্রেমেও পড়েছিল, সে সৌপ্তিককে মনে করার চেষ্টা করল, তেমন মনে নেই, ফ্রেঞ্চকাট ছিল, একটা না চশমা পড়ত বোধহয়, ধুর ভাবতে গিয়ে কেমন কলেজের এক প্রফেসর, নাহ্ বান্ধবীর বর, তাদের চেহারা মাথায় আসছে। অথচ প্রেমে দু’জনেই পড়েছিল, সারা রাত কথা হত। কী আশ্চর্য সাহস করে বিয়েটা কেন ভাঙিনি, সৌপ্তিকও কেমন চুপচাপ সরে গেল। অথচ তারপর এই ছেলেটা, সেসবে পাত্তাও দিল না। এদিকে হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ আসছে, বাড়িতে বর অপেক্ষা করছে, ছেলেটার আয়া তাড়াতাড়ি ভেগে গেছে আজ। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ইশ্ যদি এই মুহূর্তে ওই ছেলেটা থাকত। হয়তো জোর করে নামিয়ে নিত, লেকে নিয়ে যেত, কোমর ধরে হাঁটত, চুমু খাওয়ার জন্য সাধত…প্রবল ইচ্ছেটা জেগে উঠল শরীরে। কী সহজই না ছিল ব্যাপারটা – এদিকে গল্পে সিনেমায় পরকীয়া নিয়ে কত কিছু দেখায়। ধ্যুস অত নাটকীয় কিছু হয় না কি? আবার টেক্সট, লোডশেডিং একটা মোমবাতির প্যাকেট নিয়ে এসো। হাতের ফোনটা বিরক্তির সঙ্গে হ্যান্ডব্যাগে চালান করে দিল, এসি বাস। জানলার শক্ত কাঁচে মাথাটা এলিয়ে দিল, তার মুখ এখন দূর উদাস।
এই মেয়ে কতকাল ধরে, এভাবেই রয়ে গেছে। এই যে বাসে করে সে ফিরছে, এই সন্ধ্যায় ঘরে ফেরা, এ এক আদিম সত্তা, যেভাবে পিঁপড়েরা খাবার মুখে নিয়ে ঘরে ফেরে। তবু এর মাথার মধ্যে ঘুরে চলেছে একটা নিজস্ব স্বপ্ন, না কি স্মৃতি? কতটা তার মধ্যে বাস্তব ঘটনা আর কতটাই বা তার শরীরী তাড়না থেকে তৈরি হওয়া কল্পনা?
দুপুরে খাবার খেয়ে একটা মৃদু ঢুলুনি আসে, সিয়েস্তা ব্যাপারটা তার খুবই প্রিয়, হঠাৎই ভবানীপুরের এই পুরনো স্যাঁতস্যাঁতে বাড়িটা নিঝুম হয়ে যায়, জানলার কাঠের পাল্লা টেনে বন্ধ করে দিলে একটা ভিজে আচ্ছন্নতা – এই ঘুমটা সে ভালবাসে। কিন্তু আজ নয় – একটা মেয়ের কথা মনে পড়ে। তখন দু’জনেই চাকরি করে। অফিসে ডুব দিয়ে এই দুপুরবেলা, খাটে ছড়ানো চার-পাঁচ দিনের বাসি কাগজ ডাঁই তুমুল আন্দোলন মিছিল বাংলার কৃষকদের লড়াইয়ের পাশে বুদ্ধিজীবী, ঘরময় ম ম করতো সময়ের তাৎক্ষণিকতার গন্ধ। তার মাঝে পামুক-এর বরফ শাদা মলাট সরিয়ে, ডেরেক ওয়ালকটের বাউন্টিকে ভুলে নিজেদের জন্য একটা ছোট উপনিবেশ তৈরি করত সে।
দূরত্ব তৈরির এই খেলাটা তখন ও খেলত, এখন দূরত্ব ওকে নিয়ে খেলে। এত মিটিং, মিছিল, সাহিত্য-সভা, উৎসব সবার থেকে সরতে সরতে কি ও সেই মেয়েটার থেকেও সরে গেল। এটা কি অনিবার্য? ওই মেয়েটাই কি গুল্মলতার মেয়ে, একটা জলজ উন্মেষ ছিল – ঘাম, স্নান করা ভিজে শরীরে ভাপ এসব কী তাকে উসকোচ্ছে কিন্তু তাও সেই মেয়েও তো এ নয়, কিছুতেই মিলছে না।
অথচ গল্প সে অনেক লিখেছে, রাজনীতি, প্রেম, যৌনতা, কিন্তু সবগুলোর থেকে টুকরো টাকরা নিয়ে যা ফিরে আসছে তা নেহাতই নিজের জীবনের পুঁজি কিছু। সন্দীপন লিখেছিলেন গল্প আসলে নিজের জীবনেরই মাংসের দোকানে সাজানো টুকরোর মতো – বা এমন একটা কিছু – বোগাস, এত প্রিয় লেখক এইটুকুতে হাল ছাড়া কি করে? ট্রিকি বাস্টার্ড – নিজের মনেই উচ্চারণ করে, তারপর হেসে ফেলে, বেশি হেমিংওয়েয়ান হল এই গালাগালটা। খচ্চরও বলা যেত, ভালবেসে গাল দেওয়াটা দস্তুর নয়। অবশ্য আজকাল পলিটিকাল কারেক্টনেসের বাজারে কেমন প্রাগৈতিহাসিক। এবার গরম লাগছে, এসি’র রিমোট খুঁজে চালাতেই হেঁপো রুগীর মতো কেশে সেটা চলে উঠল। তারই মতো যন্তরটার কাশি কমে না, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই চলেছে, অত্যাচারও তো কম হল না। একটু আরামবোধ হচ্ছে। এই আরামে ঘুম এসে যাওয়ার সম্ভাবনা, যদিও সে লিখতে চায় আজ। এমন নয়, না লিখলে কিছু যায় আসবে। তার এখন সত্যি কিছু যায় আসে না, লেখাটা একটা পত্রিকা চেয়েছে সত্যি, কিন্তু গত এক বছরে এমন কতজন চেয়েছে – সে দেয়নি, লেখেইনি বা লেখা শেষ করেনি। শেষ করলেই বা কী হতো? কিন্তু এই লেখাটা তেমন নয়, সে বুঝতে পারছে এটা তাকে শেষ করতেই হবে, সেই মেয়েটাকে ধরতেই হবে।
মেয়েটা বাস থেকে নেমে হেঁটে যেতে যেতে ফিরে তাকাল – সেই ছেলেটা একটু দূরত্ব রেখে, ওর পিছন পিছন আসছে – ঘাবড়ে গেল মেয়েটা। পিছু নিয়েছে কখন, একই বাসে উঠেছিল, আমি খেয়াল করিনি, কিন্তু কী করি এখন, বাড়িটা চিনে যাবে। হঠাৎ এসে পড়ে যদি, কী ক্ষতি করতে পারে সেটা ভেবে শিউরে উঠল, হাঁটার গতি মন্থর করল, ছেলেটার সাথে কথা বলবে, একবার পিছন দিকে তাকাল কিছুটা আলগোছে। না সাহস নেই কথা বলার, আবার কথা বলা মানে একটা নতুন শুরু, ফিরে যাওয়া, সেটা ভাবতেই আবার মনে পড়ল কাটানো সময়গুলোর কথা, একটা ইচ্ছে আবার শরীরে জন্মাচ্ছে। মেয়েটা তাড়াতাড়ি হেঁটে বাড়ির দিকে চলতে শুরু করল।
বাড়ির ভিতর ঢুকতেই সাংসারিক টুকিটাকির স্রোত তার পায়ে লেপ্টে গেল। পোশাক ছাড়া – মোমবাতি আনতে ভুলে যাওয়ার একটা অজুহাত – রান্নার ব্যবস্থা, ছেলেকে সময় দেওয়া। একটা বাঁচোয়া, কারেন্ট এসে গেছে, প্রত্যেক জানলার দিকে তাকালে বোঝা যায় দৈনন্দিনতায় উজ্জ্বল বাসাগুলো, সে একবার বাইরের দিকে তাকালো, আশপাশের প্রত্যেকটা বাড়ির জানলাগুলো যেন খোলা চোখ, ব্যস্ত, ফ্যাকাশে। নিচের দিকে তাকাতেই বুকটা ধ্বক করে উঠল – সে তাদের জানলার দিকে তাকিয়ে আনমনে সিগারেট টানছে। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সে ঘরের ভিতর তাকাল তার বর দেখছে কি না, যদিও অমূলক একটা আশঙ্কা, কারণ কিছুই তো সে জানে না।
ছেলেটা কেন দাঁড়িয়ে আছে? এবার কি বাড়িতে চলে আসবে, তাহলে আমিই বা কী করব? এসব ভাবতে ভাবতে কেঁপে উঠল সে। শক্ত করে জানলাটা ধরে দাঁড়াল। ভয়ে ভয়ে নিচের দিকে তাকাল আবার, ছেলেটা এক দৃষ্টিতে তাকে দেখছে, কিন্তু কোনও তাড়া নেই, নিজের মনেই দাঁড়িয়ে রয়েছে, মনে হল না সে বেপরোয়া কিছু করবে। এবং করলেও ছেলেটারই বিপদ, সে অস্বীকার করলে আদপে স্টকার ছাড়া আর কিছু হিসেবেই পরিচিত হবে না এবং তার ফলাফল ভোগ করতে হবে ছেলেটাকেই। এটা ভেবে সে স্বস্তি পেল। এবার সে পূর্ণদৃষ্টিতে দেখল একবার ছেলেটাকে, চোখে চোখ রাখল। ছেলেটাও কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল টানা, তারপর সিগারেট ফেলে হাঁটা লাগাল।
এখনও নামটা মনে পড়ছে না, ফোন থেকেও উড়িয়ে দিয়েছে, অফিসও বদলে গেছে। এই বিস্মৃতির ফলে সে নিজে থেকে ছেলেটার কাছে ফিরতে পারবে না – কিন্তু ছেলেটা যদি ফোন করে, বা বাড়িটাও চিনে গেছে, যদি রাস্তায় কথা বলতে চায়? এই দোলাচলটা থেকেই গেল। ভিতরের ঘর থেকে ডাক এল “কী করছ, চা বসাবে একটু?” মেয়েটা জানলার পর্দা টেনে দিল।
একটা গল্প লিখতে গেলে ঘটনা লাগে, কিছু একটা ঘটে-টটে, পড়ার পর একটা স্বস্তি পাওয়া যায়, তার রেশ থেকে যায়। তারপর আরও ঘটনা মাথার ভিতর জমতে শুরু করে মৌচাকে যেমন ছোটছোট খুপরিতে মধু ভরে ওঠে। কিন্তু তার ধরতাইটা পাবো কী করে, যখন চিনেই উঠতে পারছি না চরিত্রগুলোকে? সে ভাবছিল, এক সপ্তাহ কেটে গেল প্রায় অথচ মেয়েটার অবয়বই তৈরি হল না। মেয়েটার গল্পটা তাই একটা ঠাট্টা হয়ে গেল, একটা প্রতিশোধ, নারীবিদ্বেষ, মিসোজিনি? সে এলোমেলো ঘুরে চলেছে শহরের পথে, সূর্য উত্তরায়ণে এখন, এখন প্রখর গ্রীষ্ম, তবু সন্ধের আকাশে ধূসরতা আছে – এত যন্ত্র, এত গাড়ি, এত মানুষ নিঃসৃত ধোঁয়া, ক্লেদ – ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে মনে হল, এর থেকে বেশি কিছু লেখা গেল না, স্রেফ পরিচিতি থেকে দূরে সরে যাওয়া ছাড়া কিছুই নেই। কিন্তু কখনও সে পাবে না আর, পাবে না এমন একটা আভাস সেই গুল্মলতার মেয়েটার। অথচ কী কেজো, সামান্য কিছু লিখল সে!
ঘুরতে ঘুরতে কখন সে পৌঁছে গেছিল চেনা একটা বাড়ির সামনে, তার দোতলার একটি জানলায় আলোর ডিফিউশন। এই বাড়িটা চেনা, এই জানলাটাও। পরিচিতার এই বাড়িটা গল্পের ভিতর ঢুকে গেছে। কিন্তু সে এখানে থাকে না কি আর – সে তো নেই বহুকাল। থাকলেও, যদি বা জানলায় দেখা মেলে, সে তো এখনকার কেউ, অচেনাই বলা যায়। সে একটা সিগারেট ধরিয়ে একটা ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। তারপর চুলে হাত বুলিয়ে পিছন ফিরল, ওই আভাসটুকু থাক নিজের মনেই। পিছন ফিরে হাঁটতে হাঁটতে তার হঠাৎ মনে হল – একজোড়া চোখ তখনও যেন তার দিকে তাকিয়ে ছিল।