শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায় > অসাড়লিপি ৬ >> দীর্ঘকবিতা

0
530

অসাড়লিপি ৬

প্রশ্ন ওঠে যুদ্ধ দেখেছি কিনা
পরপর গ্রামের ভাঙা মেরুদণ্ড দিয়ে
নেমে আসা বিন্যাসের নিজস্ব দিন
সে তো আসলে একটা শল্যছুরি
মধ্যচ্ছদার ঠিক ওপর থেকে
সরলরেখা বরাবর উন্মোচিত হয়ে যায় আন্তরযন্ত্র
আমাদের নষ্ট বাসা
ভাষা ও কিছু মেদস্তর
অস্পষ্ট উড়ালবীজ ছিল কিনা বোঝা যায় না
শুধু স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজস্ব ভ্রম বা সমসময়ের কবিতাগুলো
কিছু চিৎকারের সামনে কোনওদিন প্রতিরক্ষা থাকে না
কিছু আগুনের সামনে বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ থাকে না
অথচ দূর থেকে আমরা চেঁচিয়ে উঠি
খবরের অক্ষরে একফোঁটাও ছাই লেগে নেই

আমি কেন প্রকাশ্যে চিৎকার করতে পারি না?
আমরা কেন রাস্তায় নেমে বলি না না-হওয়া নির্বাচনের কথা
কেন আমার কথা অন্য কেউ বলে দেবে
কেন আমার কৌতুহল সূর্যের প্রশ্নের সামনে কৈফিয়ত দিতে পারবে না?

বাতাসকে ভয় পাওয়ানোর মুখোশ পরে আছি আমরা
সমস্ত জীবন্ত ঠোঁট চুপ
সমস্ত ধর্মের সমস্ত পতাকা আমরা পুঁতে দিয়েছি পরস্পরের কাঁধে
কবিতার একমাত্র কাজ ভাষার সুরক্ষা করা বুঝে গেছি আজ
ধড়ের উপরে গুঁজে নিয়েছি পতাকা
দল বেঁধে এগিয়ে চলেছি স্রোতে
শব দিন শব কাল একই রকম
শবেদের ধর্ম নেই পরিজন শোকার্ত হলে
জ্বালিয়ে নিয়েছি পতাকার লাঠি
প্রতিশোধ বলে তো একটা কথা আছে
ভুলে গেলে চলবে কি করে
আমাকে পাঠানো সাদা থান
এবার তোমাকে দেবো, শুরু হবে আমার উৎসব
আমার ভাষায় কেউ কথা বলবে না
আমার হরফ ছুঁয়ে পড়ে থাকবে ছাই
আমার শরীর জুড়ে উৎসবের ঢেউ
আমার সমস্ত রং তোমাকেই লাগাতে হবে তোমাদের সমস্ত বাড়িতে
আমাদের দশটা মানে ওদের কুড়িটা
এভাবেই স্পষ্ট হোক দেয়ালের লেখা
দেয়াল তো লোকের দেয়ালেই মুছে যায় পুরনো চিহ্নেরা
আমার সময় এলে বুঝে নেব হাড়ের হিসেব
হাতে অস্ত্র এলে তবেই না বিদ্রোহ
বন্দুকের নল সংক্রান্ত সব কথা পুরনো হতেই
ঘরে ঘরে বিলিয়ে দিয়েছি কাটারি
জাতি হিসেবে আমাদের পরিচয় শান্তিপূর্ণ
আমার শরীর জুড়ে শত্রুতার গাছ
তোমার শরীর জুড়ে শত্রুতার বীজ
রাস্তা কারও ভুল হতে পারে না
কয়েকটা পতাকা ঘাড়ে পুঁতে দিয়ে প্রমাণ দেবোই
তুমি তো আমার ভয়ে রেখে দিয়েছো অস্তিত্ব
ভয় কী? ভিয়েতকং এর কানে চেপে ধরা বন্দুক?
ঘুম তাড়িয়ে অনন্ত দ্রুত পায়চারির পথে ঠেলে দেওয়া
মাংস খাবার জন্য খুন? শুধুই দরজায় আওয়াজ শুনতে পাই
পরপর প্রতিবেশিদের জানলা বন্ধ করে দেওয়ার শব্দ
পরপর পতাকার দায়ে রান্নাঘরে আগুন লাগাবার শব্দ
আমার সামনে একটা পাথরের বিস্ময় রং
কোনও এক সুতীব্র চোখ ভয়মুক্ত দিন
যদিও ভূতাত্ত্বিক বের করে দেবেন
পাথরের উপরে পর্বতের অসীম ভার
তার ভিতরের ভাঁজ
ভয় তো আসলে একটা অভ্যাস মাত্র
এই নিস্তরঙ্গতায় ভাল লাগে
আমার ঘরের নিচে তেমন কেছু নেই
দু-একজন বন্ধু শুধু অযথাই কুঁকড়ে থাকে
অন্যেরা দলবদ্ধ শান্তিপূর্ণ মিছিল
প্যালেস্তাইনের হয়ে
সে কোন গহ্বর থেকে উঠে এসেছিল শ্বাস?
সে কোন আলোর মধ্যে লুকিয়ে ছিল দুর্বলতর নক্ষত্রের প্রতিধ্বনি?
সে কোন রাতের ফুলে লেগেছিল বাদামি ছিটে?
সে কোন গন্ধের পুস্প বমি তুলে এনেছিল মুখে?
জিভে এসে বাসা করছে লাগাম ছাড়া হিংসা আর আমি ভুলে যাচ্ছি
গ্রীষ্ম ছাড়া আর কোনও সম্ভাবনা আমি বিশ্বাস করি না
একটানা লক্ষ্য করছি সমস্ত পতঙ্গের ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়া
আমি পিষে দিচ্ছি কিছু সন্ধিপদ
সন্ধি শব্দটার আর কোনও অর্থ নেই
কেউ এসে টুকরো করে দিয়েছে মাংস
পেশির আঁশটে গন্ধ ফ্যাকাশে লাল
আমার সমস্ত আকুতি থেকে নিজেকে বাঁচাও
নিজের আকুতি থেকে ঝাঁপ দিয়েছি নিজেরই মাংসের আলোয়
মেলে দিয়েছি হিংস্র মমতা
আমার জন্মের কারণ ও প্রলোভন
হাওয়া আসলে দোমড়ানো পুরনো মুখ
বন্ধু বা না মনে করতে চাওয়া
চিরে দিচ্ছে না-দেখতে চাওয়া বিকেল
আমার সামনে সদ্য কাটা পুরনো গাছের মত
চোখ নিয়ে যে কৃষক দাঁড়িয়ে রইল
আমার সামনে সংস্কার সমেত
যে সব গ্রাম্য মেয়েদের গঙ্গাযাত্রা ভেসে রইল
তার শুধু দৃষ্টিহীন ভঙ্গি আছে
পরপর খুলে যাওয়া জানলাগুলোর সামনে যে সকাল
তা কি কোনও আহ্বান হয়ে উঠতে পারে?
আমিও আবিষ্কার করে নিই আমার দৃষ্টিভঙ্গিহীন চোখ
বাতাসের হালকা লেন্স
যেভাবে সকাল গ্রাস করে সামনের পার্ক
সামনে মাথা নামিয়ে থাকে সমস্তরকম লোভ
চোখে চোখ রেখে কথা বলতে চায় না
পরপর বেড়ে ওঠা আমাদের উপমাবহুল পালাতে চাওয়া
আমাদের জোর করে আত্মীয়বিলাসী হয়ে থাকা
আমাদের বিচ্ছিন্ন হতে গিয়েও আটকে থাকা
বেড়ে ওঠা যাবতীয় হিংস্রতার গোপন নখ
প্রতিটা পেশি উন্মোচনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে
এগিয়ে চলার ক্লান্তির জীবাশ্মপ্রতিম দাগ
এমনকি অনৈচ্ছিক পেশিরও নিজস্ব সংকোচন ও প্রসারণ থাকে
যদিও আমরা সবরকম সংকটেই তাকে ধরতে চেয়েছি
বাঁধতে চেয়েছি স্পন্দিত স্বার্থ
ক্রমশ বেড়ে উঠেছে বিকেল তার ফ্যাকাশে ভাব
ছড়িয়ে গেছে আমাদের জিভে
আমরা চিৎকার করে উঠতে চেয়েছি তীব্রতা
এই প্রতিদিনের কাঁটা ফোটানোর খেলা আমার নয়
ফিসফিস করে বলতে চেয়েছি
প্রতিটা ভালবাসা সাময়িক
যে অসুখে পাশে কেউ থাকে না
সে-ই প্রকৃত অর্থে মুক্তি দেয়
এই দেহ শল্যছুরির সামনে
সাদা রাবারের দস্তানার উপর রেখে দিয়েছে
কিছু বদভ্যাসের মাংস
সামান্য কিছু অনৈচ্ছিক পেশি
বিনিময়ে রক্তে ছড়িয়ে গেছে ঘুম
বিনিময়ে স্পষ্ট হয়ে গেছে ভয়
সামনে যুদ্ধের ভিতরে যুদ্ধ
গুলির আওয়াজে দ্রুত খাওয়ার মত উত্তেজনা
একেই যুদ্ধ দেখা ভেবেছি
অথচ আমরা রাস্তায় নেমেছি
বলেছি ইচ্ছে আসলে এক বেশি কথা বলা কিশোর
সে তখনও জানে না কেন চুম্বনস্পৃহা
বিষিয়ে দেয় জিভ
সে বুঝতে চাইল না কেন নদীমাতৃকতা ছাড়িয়ে
বেড়ে ওঠে ছাইয়ের মিনার

 

কবি পরিচিতি

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৫টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য ভারতের জাতীয় সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার পেয়েছেন। পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কার। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসবে। কৌরব অনলাইনের সম্পাদক। পেশায় স্পেন সরকারের ভাষাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইন্সতিতুতো সেরবান্তেস, নয়াদিল্লিতে স্পেনীয় ভাষার সহকারী অধ্যাপক।