শেলী নাজ অনূদিত >> সমকালীন তিন অস্ট্রেলীয় কবির কবিতা

0
532

আমাদের বিষাদকন্যা
ফ্রাঞ্চেস অলিভ

পথেরা আঁকছে ছোট ছোট বৃত্ত।
শাদা বাতি দ্বিধান্বিত
মথগুলো (এক হন্তারক আলো চার্চের পাশেই)।
ফুটপাথে চকখড়ি বলে
তারা ফিরে আসবে
আলোর ঘণ্টাধ্বনি
টুংটাং ডানার মধ্যে বাজে
আর ভারি দেহ
কাঁচের উপর বিকট শব্দে মাথা ঠোকে
এটা সেই স্বর্গদূতদের শব্দ-
পরিত্যাক্ত মাংস
আলোকের প্রতি। পান
এক গুঞ্জনরত পতঙ্গ
দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকি পলক না ফেলে ওই ল্যাম্পের দিকেই
আমি অন্ধ হয়ে যাই যখন তারা
আমার এ দেহ খুঁজে পায় আর তাদের শরীর
আমার ভেতরে দ্রিমিদ্রিমি শব্দে বিপুল আঘাত হানে!

ডল্‌স হাউজ

ডেভিড ম্যাকক্যুই
[১]
মঞ্চসজ্জা
একটা রক্ষণশীল বাড়ি এটা; ত্রিতলবিশিষ্ট;
পিচের ছাদ; গরাদহীন জানালা, কাঁচমুক্ত।
যেন ইউরোপীয় যুদ্ধের মধ্যে একটা বাড়ি, পেছনের পুরো
দেয়াল বন্ধ।
(কিন্তু হলুদ ছাদটা সুন্দর) উপরতলায়
একটা ব্যালকনি, তৈরি করে দূরত্বের ধারণা। নিচে
রান্নাঘর (একটা পাই রান্না হয়ে এল প্রায়),
একটা টেবিল, তিনটা চেয়ার আর একটা অতিরিক্ত বড় উঁচু চেয়ার।
শূন্য ডেস্ক, তার ওপর থেকে এসব দেখছে একটা ঘড়ি
এখন একটা বেজে পনের মিনিট। ফোনটা বছরব্যাপী বিকল।
প্রশস্ত বাথরুম, আয়না থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছে ঘোলাটে আলো
নিষ্ঠুর কৌতুকের মতো বাড়িটির কোন সিঁড়ি নেই।
উপরতলার বেডরুমে একটা বিছানা, গোলাপি, বালিকাসুলভ
আর বেবি কট, যা দুলবে না (পিতামাতার জন্য কোনো বিছানা নেই)
একটা আদর্শ পরিবার। তারা তাদের বাহু নাড়াতে পারে আর কোমরও
বাঁকাতে পারে, এ কারণে তারা জানে কীভাবে নুয়ে পড়ে কুর্নিশ করতে হয়।
অথবা বসতে, বসে খেতে ধূলি ও সূর্যালোকে বানানো আহার!
[২]
বাবা
ক্যাজুয়াল পোশাকে, বাড়ির সবচে’ দীর্ঘকায় মানুষ সে
মণিবন্ধে ঘড়ি, যদিও ঘড়িটির মুখ আবছা, অস্পষ্ট,
যখন থেকে সে তার কব্জি আর উল্টে দেখতে পারছে না
তার ব্লন্ড পরিবারের মতো
তার আছে গুরুগম্ভীর বাদামি চুল, যেন
ষাট-দশকের শুরুর সেই গালা-বার্নিশ
সে বসে থাকে টেলিভিশনের সামনে
একটা নির্দিষ্ট হাসি মুখে নিয়ে, যদি তুমি
খুব কাছ থেকে দেখ,
দেখতে পারবে টেলিভিশনের পর্দায় তার চোখ নেই
বরং মধ্যবর্তী দূরত্বের দিকে চেয়ে আছে নির্নিমেষ, বিশেষ কিছুই না দেখে
রাত্রিকালো তার চোখ, শাদা সূচিমুখ
সে আর তার স্ত্রী, এক্ষেত্রে দুজনে একইরকম
যেন তারা তাদের দুচোখ দিয়ে দিয়েছে সন্তানদের।
[৩]
মা
তার আছে নিতম্ব ও স্তন, যার ফলে
সন্তানরা তাকে চিনতে পারে
তার রূপালি কানের দুল, ‘শুধু তারই’।
সে তার স্বামীর চেয়ে কিছুটা আলাদা, কিন্তু বাচ্চাদের থেকে আলাদা নয়
তার ঠোঁট গোলাপি।
হাঁটুর নিচ থেকে নগ্ন দুটি পা।
জ্যোতির্বিজ্ঞানী থাইকো ব্রাহের মতো
সে তার নাক হারিয়েছে
সে দেখে রাত্রির আকাশ
যতোটা সম্ভব রান্নাঘরের টেবিল থেকে
যেমনটা ব্রাহে আর তার সহকারী কেপলার দেখেছিল
তার কোন টেলিস্কোপ নাই
ভরসা শুধুই নগ্ন দুই চোখ
সে তার স্বামীকে বলে না,
কিন্তু সে অর্জন করতে চলেছে বিশেষ প্রতীতি
যাতে সহজেই অনুমান করা যায় গ্রহাণুদের গতিসূত্র!

যা-কিছু নারীর মুখের মতো

জিল জোন্স
একটি বৃক্ষের মুখ যেন তা নারীর
প্রত্যাখ্যাতের চেহারা, একইসঙ্গে
যেন ওই মুখ জাহাজের উদ্ধারকারীর
বালুচর, সে চেহারা
আত্মসৌন্দর্যে জাগছে পথিমধ্যে
যেন তার মুখ দুর্ঘটনাকবলিত, রক্তজমাট
জুতোর তলায় রাখা সে আদল
তেষ্টাজল বিয়োজিত, বৃত্তাকার
একটা স্বাপ্নিক মুখ, হাতলের ওপর
যেন সে মুখ অতীত
নারীমুখ যেন এক রাউন্ডঅ্যাবাউট
গোলকধাঁধা, চাইছে উদ্ধার
অঙ্গুরিবিহীন, ষড়যন্ত্রের বিপরীতে
ক্ষতমুখ থেকে বাতিমুখের দিকে
আর এই দুই অবয়বের কোনটিতে
দেখায় স্বমুখ এবং বৃক্ষশাখা আর বায়ু আর রক্তাক্ত জগাখিচুড়ি আর সৌন্দর্য আর যা-কিছু রয়েছে বাকি
শিশু, ঘামের ঘ্রাণ,
ট্রেন বরাবর সতেজ পায়ের ছাপ
যারা গুলি ও পেশির অনুগামী
নারীর সৌন্দর্য এক জ্লন্ত কাঠের মুখ, কলঙ্কসমেত
পোড়া চিহ্নলাগা এবং কিছুই না থাকাসহ
পূজা আর বৃষ্টিসহ পরিবর্তনশীল, উদ্বৃত্ত
অক্ষাংশের মধ্যে কখনই না-ফুরানো ঝুড়ি
বাজারের দু’ মাইলের মধ্যে, সঙ্গীতের মধ্যে
গতিমুখ পাল্টে দেয়া হলো হাতুড়ি পিটিয়ে
মাংসকুঞ্জের ভেতরে, আবর্জনাসহ, আর
জরাজীর্ণ, বাজে, দুশ্চরিত্র ও তীব্র হওয়ার বদলে
ব্যান্ডেজ সত্ত্বেও একটা একমাত্রিক পথ
বেরোল শৃঙ্খলিত প্রিজমের মধ্য দিয়ে
একটা উদ্যানের স্বাদ যেনবা নারীর সৌন্দর্যের মতো
সৌন্দর্য হারাই, চলো
আত্মপ্রসাদ নিতে
ক্ষতমুখি পথ অস্বীকার করতে
মিষ্টি ঘামের ঘ্রাণ থেকে মুক্তি পেতে

কবি পরিচিতি

ফ্র্যান্সিস অলিভ
অস্ট্রেলীয় কবি ও গল্পকার। তার কবিতা নিউ ক্যাসেল পয়েট্রি প্রাইজ-এর জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়াসহ আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে তার কবিতা। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনে ডক্টরেট করা এই কবি মনে করেন, শব্দ এমন একধরনের জাদু যা মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে দারুণভাবে চিত্রায়িত করার ক্ষমতা রাখে।
ডেভিড ম্যাকক্যুই
অস্ট্রেলিয়ান কবি ও ক্রিটিক। তার গবেষণার বিষয় অস্ট্রেলীয় কবিতা ও জীবনীসাহিত্য। তিনি ডিকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অফ আর্টস অ্যান্ড এডুকেশন বিভাগের প্রধান। ২০১০ সালে তিনি অস্ট্রেলীয় এডুকেশনাল অ্যাওয়ার্ড পান ‘পেন এনথোলোজি অফ অস্ট্রেলিয়ান লিটারেচার’-এর জন্য।
জিল জোন্স
অস্ট্রেলিয়ার নারীবাদী কবি। অ্যাডেলেইড বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচারার। ২০১৫ সালে কবিতার বই দ্য বিউটিফুল অ্যাংজাইটির জন্য ভিক্টোরিয়ান প্রিমিয়ারস লিটারেরি অ্যাওয়ার্ড পান।

অনুবাদকের পরিচিতি

শেলী নাজ
বাংলাদেশের কবি। জন্ম ১১ মার্চ, হবিগঞ্জে। বাবা মো. রহমত উল্লাহ, মা রহিমা খাতুন। শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের উজ্জ্বল দিনগুলো কেটেছে সমুদ্রনগরী চট্টগ্রামে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর। কর্মজীবনের শুরু জীবাণুবিদ হিসেবে। বাংলাদেশ সরকারের সিভিল সার্ভিস ক্যাডারের সদস্য নাজ বর্তমানে অস্ট্রেলিয়াতে ছুটিতে থেকে পড়াশোনা করছেন। তাঁর লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে। কবিতাই তাঁর ধ্যানবিন্দু। প্রথম কাব্যগ্রন্থ নক্ষত্রখচিত ডানায় উড্ডীন হারেমের বাঁদী। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় বিষাদ ফুঁড়ে জন্মেছি বিদ্যুৎলতা, শেকলে সমুদ্র বাজে, চর্যার অবাধ্য হরিণী, মমি ও মাধুরী, সব চাবি মিথ্যে বলে এবং সুচের ওপর হাঁটি। নাজ শুরু থেকেই প্রথাবিরোধী নান্দনিক ভাবনা থেকে কবিতা চর্চা করছেন। আত্মজৈবনিক কবিতার প্রাতিস্বিক যাপনের মধ্য দিয়ে সর্বমানবিক বোধ থেকে নারীর কথাই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার উপজীব্য বিষয়। তাঁর কবিতায় প্রতিভাসিত হয় আত্মনির্ণয়ের যন্ত্রণা, বিপন্নতা, সমাজ-ব্যক্তির দ্বান্দ্বিক বোধ। নারীর জগৎ, ভাবনা, সমস্যা, উপলব্ধির কথা গভীরভাবে তুলে আনার সূত্রে বাংলাদেশের সমকালীন কাব্যচর্চায় বিশিষ্ট স্থান করে নিয়েছেন তিনি।