শেলী নাজ >> আগুনপরিখা ও অন্যান্য অসুখ >> কবিতাগুচ্ছ

0
305

শেলী নাজ >> কবিতাগুচ্ছ

আগুনপরিখা

এইসব নীল শাড়ি পুষে রাখে সতত আগুন
এসো পুত্রস্নেহ দেব, প্রেমিকারতিও, রাত্রিতীরে,
তাঁবু ফেলো দেহমন্দিরে আর আনো শ্বাসের গুঞ্জন
নরম কণ্ঠার হাড়ে গেঁথে দাও তোমার নখর

ধীরে ধ্যানে ধীবর ছড়াও জটিল জাল, বোঝ জলের জোয়ার
মৎস্য তোলার আগে শোন নদীটির গোঙানো ও কান্না
জেলেনৌকোর ওঠানামা, হাওয়ার শীৎকার
অপমানখচিত দেহ ঘিরে জেগে ওঠা ক্লেদ, সাজানো পান্নার

কলঙ্ক, কামনা গিলে এত ফুলে গেছে কোষ, সেই কোষাগারে
অভ্রমঞ্জরি খনিতে, ধীরে নামো, নাও তার অধিকার
আর দেখ অপমানবীর্যে ভরা কতোটা ক্ষুধার্ত এই আগুনপরিখা

লকডাউন

বিবাহ বিচ্ছেদের জীবাণু সংক্রমণের পর
এগার বছর ধরে বাড়িটি লকডাউনে, বাহিরে উড়ছে লাল ফ্ল্যাগ
ধুকপুক বুকে কতটা মধু ও ধুতুরার বিষ, কতোটা অসুখ
দেখতে বাড়িটি ঘিরে জমে ওঠে উৎসুক, বিবাহিতের উদ্বেগ
পুরুষের ভিড়, গনগনে লোভ, আমাকে আরও বেশি
অচ্ছুৎ, অসতী আর একা করে তুলতে তারা
গলিতে বসায় রাত্রিচর কামুকের পাহারা

তোমাদের ধর্ষকাম প্রেমের জীবাণু থেকে বাঁচতে
হৃদয়ও গেছে জরুরি লকডাউনে, বহুদিন জ্বর
আছি গর্তে মৃতবৎ, শিরদাঁড়া দুহাতে কুড়িয়ে, নিঝুম
ভাঙা দেহে ফিরি, নিচু ছাদ, লৌহগরাদ, তাতে ফুটে থাকে
বিবাহউদ্যান থেকে বিচ্যুত নগ্নতাশোভিত কুসুম
আত্মঅবদমনের আংরাখা পরে হাসি, চৌদ্দশিকের ভেতর
একাকী স্বৈরিণী, তার সোনালি মুখোশ ভেঙে দেয় তোমাদের যৌথঘুম

মেঘের পাথর ফেটে বৃষ্টি এলে আড়ষ্ট গন্দম ফাটে, একা লাগে
দেহভর্তি দাহ্যকাঠ, তাতে ধূপগন্ধে জড়ানো গাউন
একার সিংহাসনে বসে দেখি, তোমরাও একা হচ্ছ খুব, পরস্পর
আর তোমাদের শহরে অচেনা অসুখ, লকডাউন!

অসুখের প্রেমে পড়ে

অসুখের প্রেমে পড়ে থেকে গেছি তোমার সাথেই
আগুনের ফোয়ারায় স্নান, স্পর্শ করি পোড়া ত্বক
কোথাও ফোটেনি ফুল, ভ্রমরের মন গেছে উড়ে
দূরে, জানি বিভাবরী সাজিয়েছে মরণসড়ক

অসুখেরও এত বর্ণ, চেয়ে দেখি উজ্জ্বল মুকুর
তাতে আবছায়া ভেসে ওঠে রাত্রিপ্রদাহের জলা
প্রেম ছাড়া আর কোন আশ্রয় ও আহার্য চাই না
জীবাণুপরাগমাখা ওই ওষ্ঠ তৃষ্ণার পেয়ালা

লকডাউন শহরে খুলে রেখে হৃদয়ের তালা
করোনা ছোঁয়ার আগে, মৃত্যুপ্রেম তোমাকে ছুঁয়েছি
পাঁজরে কুজ্ঝটিকা, ডুবে গেছে তারার কাফেলা
শবযাত্রা শেষে, ভস্মে জল ঢেলে মেখেছি কাজল

শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যাথা এইসব ভাল লাগে খুব
প্রেমের কফিনে তুমি-আমি শুয়ে, নিরালা, নিশ্চুপ!

আফ্রিকা

একদনি দেখা হলো, কালো হীরে, তোমার উদগ্র বিষ
শিরা ভরে নিই দাহ, আমারই কালিদহ, কালিন্দিতে
মৃত্যুপ্রেমে সারারাত্রি চলে এক ইঞ্জনি, র্মমরে
দেখি আফ্রোএশিয়ান দুর্ঘটনা, হাওড়ের ভাঙছে পাঁজর
তার খুব জ্বর, ঝিঁঝিঁমুখর রাত্রিতে তোমার জঙ্গলে
খুঁজি টারজান, আমার সকল গান জেনে গেছে একান্ত হাঙর

শ্বেতাঙ্গপ্রধান দেশে কি নিয়তি, হাবশি রাত্রিতে ঢুকে যাচ্ছি
তোমার গভীর গ্রহে, কৃষ্ণপ্রদেশে, হে তরুণ আফ্রিকা!
অন্ধ এ গ্যালাক্সি, জ্বলে ক্ষুধার্ত নক্ষত্ররাজি, জাফরানি কাজ
কি সুন্দর তমসার জলে সারারাত্রি ভাসছে মান্দাস
স্পর্শমাত্রই ভাঙছে জার, গমখেত জাগে নাইজারের কুলে
সন্ধ্যার শরীরে অযুত ইয়েলো ট্রাম্পেট, আমার ভূগোল
তোমার পেশির নিচে কম্পমান, ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো
একটা উদাস করতোয়া গিলে খেল কিলিমাঞ্জারো

কালো অগ্নি, এই দেখো নাভিমূলে বসানো ফোয়ারা
তার একশ প্রশাখা খুলে বসে আছি মরুতীরে
আমি নদীমাতৃক, তাতে যদি স্নান করে তোমার সাহারা!

জানোয়ার

ঝড় এক জানোয়ার, তার
আলিঙ্গনে ভাঙে হাড়
আয়নাতে হিংস্র অবয়ব
সে ছুঁলেই জাগে শব

এমন একটা ঝড়ের জন্যই
ছিল বুঝি মূক বাড়িটা নীরব