শ্বেতা শতাব্দী এষ  >> কবিতাগুচ্ছ

0
405
বিকেল অশ্রুতসুরে
যেন জানালার এই পাড়ে আমিও মটরশুঁটি
খেতের কিনারে বসি—কথা বলি
বিকেল অশ্রুতসুরে
তোমার মুখের কথা ভেবে—ভেসে যাচ্ছে কুয়াশারেণু যার যার একার বাতাসে!
এইসব আকাশ পৃথিবী থেকে কত দূরে মানুষের
কল্পনার পা যায়—শীত পেরোলেও
কেউ কেউ যেতে পারে না নিজস্ব বসন্তের কাছে!
হীম হয়ে আসা চোখে কেবলই লেগে থাকে মূকের অভিনয়—
আমাদের বাড়িতে শীত
বরফকল ছিল না কোনো
আমাদের বাড়িতে তবু বারোমাস শীত—
আগুনে হাত সেঁকে সেঁকে
পুড়ে গেছে ভাগ্যরেখা, হাতের অলীক!
বসন্ত আসবে ভেবে হাওয়ার বাগানে
প্রতিদিন সকালে বৃষ্টি দিতাম;
রক্তকরবীর শরীরে কেবলই
পাতা ভরা অসুখের খাম!
এভাবে আমরা বড় হতে হতে
শীতকেই মনে হতো স্বাভাবিক—
বাকিসব ঋতু ভুল-সর্বনাম।
কে কোথায় চলে গেলো বাড়ি থেকে দূরে,
সবার প্রথম আমি বসন্ত পেলাম
এইখানে তোমাদের ভিড়ে।
সময়-স্নায়ুভরা বিচ্ছিন্ন বাতাস
বসন্ত বেশিদিন ভালো লাগে না!
কুয়াশাছায়ার বুকে ফিরে যাওয়া সুর
আমাদের বাড়ির গভীরে
জমে থাকা শীত শীত গান!
কূট
অমোঘ শূন্যতার ভেতর
কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে সাজানো প্রেম—
অর্থহীন অহঙ্কারে একটা কুকুরের চোখ
জ্বলজ্বল করে—
দূরের থেকে অন্ধ ফকিরের গান ভেসে এলে
হঠাৎ বিদীর্ণ হয়ে যায়
ভেবে রাখা সমস্ত দাবার কৌশল!
সংহিতা
মানুষ বড় হতে হতে একদিন খুব
ছোটো হয়ে যায় নিজস্ব ক্রন্দনের কাছে—
একদিন কোথাও একটা ফুল ফোটে ওঠে
মলিন পথের বাঁকে একা একা বিলিয়ে দেয় ঘ্রাণ!
যে কখনও সমুদ্র দেখেনি সে জানে
মায়ের কাছে জমা থাকে সমস্ত আশ্রয়—
একদিন হঠাৎ অদেখা কারো কৈশোর থেকে
ভেসে আসে উদাসীন বনের ধূসর!
সময়কে পাশ কাটিয়ে কথা বলে মানুষের ছায়া
যা-আছে মনের ভেতর, একদিন—
নির্লিপ্ত
ভালোবাসা মরে যাবার মতো হাওয়া—
এ-গ্রীষ্মে বুকের ভেতর উত্তাপ নেই, চলো ফিরে যাই।
গলি থেকে বাড়ি বেশি দূরে নয় ! শর্তবন্দি মন ;
চলো ফিরে যাই, এ-হাওয়া মনের জন্য ক্ষতিকর।
আমাদের রক্তের নিথর প্রবাহ ধরে ফিরে যাওয়া ভালো—
মৃতদের আর্তনাদ মিশে যাক হাওয়ার হাসিতে…
মনে হয় কবিতা
দূর থেকে দেখে একটা গ্রামকে কবিতা মনে হলো—
মনে হওয়াটাই কবিতা, বাদবাকি গ্রাম ঝাপসা অবয়ব।
সময়ের স্বরে যে গল্প শোনা যায়,
সেইসব তুমি-আমি বলি।
দূর থেকে দেখি, মনে করি,
আকাশে কোনো নক্ষত্র নেই, তখন আকাশ শূন্য—
শূন্য বৃত্তে ধীরে ধীরে কী একটা স্পষ্ট হতে থাকে !
তারপর আবার নক্ষত্রের জন্ম হয়;
জন্ম হয় প্রত্যাশা,ব্যর্থতা,যন্ত্রণা, ক্ষোভ—
ক্ষোভ থেকে কি আবার শূন্যতা ?
এমনতো হবার কথা নয়—
দূর থেকে দেখে তাই যে কোনো দৃশ্যকেই
কবিতা মনে হয় ! মনে হতে পারে—
নদীর শরীরে কান্না, কান্না জমে জমে পাথর
এবং পাথরের বুকে কবিতা জ্বলে ওঠে—
যাকে দূর থেকে দেখে আগুন মনে হয়!