সজল আশফাক > কারাগার >> ছোটগল্প >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
812

কারাগার >> ছোটগল্প


অনেকেই ভাবেন তার নাম রওশন আরা বেগম। কেউ কেউ ভাবেন রওশন আরা খানম। তার ছেলে মেয়েরাই তার পুরো নাম নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত। জিজ্ঞাসা করলে তাদের কেউই মায়ের নাম পুরোপুরি সঠিকভাবে বলতে পারবে না। এ জন্য তাদেরকে দোষ দেয়া যাবে না। অতি সাধারণ মানুষ এই রওশন। নিজেই পুরো নাম নিয়ে কখনোই ভাবেন নি। নামের এই বিষয়টা গুরুত্ব পায় তখন, যখন তাকে আমেরিকা আনার জন্য একমাত্র ছেলে শাহীন আহমেদ ইমিগ্রেশন বিভাগে আবেদন করে। সেই থেকে তার পুরো নাম- রওশন আরা।
রওশন আরা বেগমের আজ মন খারাপ। খুবই মন খারাপ। এত মন খারাপ যে চারিদিকের কোন কিছুই তার চোখে পড়ছে না। সবকিছু ঝাপসা লাগছে। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন কয়টা বাজে। কিন্তু বুঝতে পারলেন না। বিছানা থেকে নামতে যেয়ে মনে হচ্ছিল মাথাটা এক দিকে টলে যাচ্ছে। ভাবলেন, সুগারের কোন সমস্যা হলো না তো? যদিও গত একমাসে একদিনও গ্লুকোমিটারে সুগার চেক করা হয়নি। কে চেক করবে? এই রুমে তিনি একা, প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নিজের রুমেই বন্দী হয়ে আছেন। এমন বন্দী জীবন তার জীবনে কখনো আসে নি। যদিও পাশের রুমেই আছে একমাত্র ছেলে শাহীন। শাহীনও তার মতই বন্দী। রওশন আরার এই বাড়িতে তিনতলায় রওশন নিজে, দোতলায় ছেলে শাহীন ও ছেলের বৌ রুমানা, নিচতলায় ছেলের মেয়ে মানে তার নাতনি শাহানা ও তার সংসার। এছাড়া আরও অনেকেই আছে, কারুরই সময় থাকে না, অনেক রুম তাই সাজানো-গোছানো অবস্থায় খালিও পড়ে থাকে।
এত লোক তারপরও দেখাশোনা করার জন্য কেউ তার কাছে আসে না। এ নিয়ে কারো কাছে কোন অনুযোগ করেও লাভ হবে না সেটা তিনি জানেন। ছেলেমেয়েরা সবাই ইতোমধ্যে তাকে অনেকবার বুঝিয়েছেন, এ অবস্থায় তার এভাবে একা থাকাই ভালো। এটি যেমন তার নিজের জন্য মঙ্গল, পরিবারের বাকি সবার জন্যও মঙ্গল। তিনি তো আর অন্যের অমঙ্গল চাইতে পারেন না! তাছাড়া এই পরিবারে তিনি সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ। বয়স কম করে হলে সত্তর তো হবেই। শাহীন তার বড় সন্তান, ওর বয়সই তো ষাটের কাছাকাছি। এই বয়সে তাকে তো আর অবুঝ হলে চলবে না। এটা তিনি বোঝেন। তারপরও কখনো কখনো নিজেকে আর সংযত রাখতে পারেন না। অবুঝের চেয়েও যদি বেশি কিছু থাকে, তেমন আচরণ করেন।

তিন বছর আগে স্বামীকে হারানোর পর থেকে তিনি বড় একা। জীবনে একাকীত্ব কতোটা দুর্বিষহ হতে পারে সেটা তিনি স্বামীকে হারানোর পর বুঝতে পারছেন। ক্রমশ তার একাকিত্বের সাথে যুক্ত হয়েছে অদ্ভুত এক ভয়। কিসের ভয় তা তিনি বুঝতে পারেন না। অবর্ণনীয় এক ভয় তাকে রাতে গ্রাস করে, যখনই তিনি একা থাকেন। চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসে, দম বন্ধ হয়ে যেতে চায়। মনে হয় রুমের ছয়টি দেয়াল ক্রমশ তার দিকে চেপে আসছে। এ সময় তিনি চোখবুঁজে পড়ে থাকেন। এভাবে কত রাত যে ভোর হয়েছে হিসাব নেই। তবে তার সাথে বিছানায় কেউ থাকলে এমনটি হয় না।
নিউ ইয়র্ক সিটির উডহিভেনের এই বিশাল বাড়িতে কম করে হলেও গত ২০ বছর ধরে বসবাস করছেন। বাড়ির যে রুমটাতে রওশন আরা থাকেন, এখানে তার সাথে থাকতেন তার স্বামী রাজীব আহমেদ। এক ছেলে আর চার মেয়ে নিয়ে তাদের সংসার। ছেলে ছাড়া মেয়েরা সবাই বাংলাদেশে থাকতো। কয়েক বছর হল সবাই স্বামী সংসার নিয়ে নিউ ইয়র্কে চলে এসেছে। আর রাজীব সাহেব সীমাহীন নিদ্রায় শুয়ে আছেন লং আই ল্যান্ডের ওযাশিংটন মেমোরিয়াল পার্কে। রওশন আরাকে নিয়ে তার ছেলেমেয়েদের ধারণা তাদের মা খুব নিরীহ, বাবাকে খুব ভয় পায়। তার একটা কারণও ছিল। কোন কিছু হলেই বাংলাদেশের নামকরা এক টেক্সটাইল মিলের ডাকসাইটে এই অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার রাজীব সাহেব, ‘রওশন’ ‘রওশন’ বলে চিৎকার করতেন। প্রতিদিনের এই চিৎকারের আড়ালে যে চমৎকার ভালোবাসার এক গভীর এবং শক্তিশালী অভিব্যক্তি ছিল, একমাত্র সাদাসিধে রওশন আরাই তা বুঝতে পারতেন। যে কণ্ঠের প্রখর মুখরতা তাকে আবিষ্ট করে রাখতো, হঠাৎ তার চলে যাওয়া রওশন আরাকে চরম নিস্তব্ধতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তারপর থেকে তিনি প্রকৃতপক্ষে নিজেকে খুব নিঃসঙ্গ মনে করেন। মাঝেমাঝে মনে হয় তিনি একটা বিশাল খোলা মাঠের মধ্যে হারিয়ে গেছেন, দৃষ্টি সীমানায় কেউ নেই। এখনই বুঝি সন্ধ্যা নেমে আসবে। ছেলেমেয়েরা তার এই নিঃসঙ্গতাকে ঘোচানোর জন্য নিজের সংসারের কাজে ব্যস্ত থাকার পরও প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাতে তার একাকীত্ব কিছু সময়ের জন্য হয়তো দূর হয় কিন্তু রাত হলেই সেই অন্ধকার রুমের ছয়টি দেয়াল তাকে একসাথে চেপে ধরে, তিনি ভয়ে কুঁকড়ে যান। রওশন আরা তাই রাতে একা থাকতে পারেন না। এ কারণে অনেক আগে থেকেই তার সাথে কেউ না কেউ নিয়ম করে থাকে।

গত মার্চ মাসে নিউ ইয়র্কে যখন করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে যায় তখন থেকেই সবার মুখে মুখে এ নিয়ে আলোচনা শুনে আসছেন তিনি। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় বাংলা চ্যানেল টিবিএন টুয়েন্টিফোরের খবরটা তিনি নিয়মিত দেখতেন। প্রতিদিন খারাপ খবর দেখতে দেখতে সবাইকে নিয়ে তিনি বেশ আতঙ্কিত ছিলেন। এর মধ্যেই তার একমাত্র ছেলে শাহীনের কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হওয়ার খবর পান রওশন আরা। তিনি তখন সেজো মেয়ে রেখার বাসায় অবস্থান করছিলেন। কারণ নিউ ইয়র্কে তখন লকডাউন শুরু হয়ে গেছে। সাধারণত তিনি মেজো মেয়ে রেবার সাথেই থাকেন কিংবা রেবা এসে তার কাছে থাকেন। সেই হিসাবে লকডাউনের সময় তার ছেলের বাসায় পৃথক নিজস্ব রুমেই থাকার কথা। কিন্তু মেয়েরা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, মা রেখার সাথেই থাকুক। ভাইয়ের বাসায় থাকলে মাকে রাতে একা থাকতে হবে, যা মায়ের জন্য আরও কষ্টকর হবে। তাছাড়া রেবা সবে বাংলাদেশ থেকে এসে নিজেই ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে আছে। তারও মায়ের কাছে যাওয়া বারণ। সে কারণে সেও মায়ের কাছে যায় নি বা মাকে নিজের কাছে আনতে উদ্যত হয় নি। রওশন আরা এত প্যাঁচঘোচ বোঝেন না, তিনি রেখার সাথেই রয়ে গেলেন। রেখার বাসায় থাকলে ওর একটু সুবিধা হয়, রওশন তাকে টুকটাক সাহায্য করেন। রওশন আরা বাংলাদেশে পুরো সংসার একাই সামলিয়েছেন। কাজ ছাড়া বসে থাকতে তার ভাল লাগে না। কোভিড-১৯ না থাকলে প্রতিদিন তিনি ৫-৭ ব্লক হাঁটেন। তিনবার এঞ্জিওপ্লাস্টির পর হার্টে ৪টা রিং বসানো আছে। আছে ডায়াবেটিসও। তাই এমন হাঁটাহাঁটি তার ডাক্তার তাকে নিয়ম করেই করতে বলেছেন। ছোটবেলার দুরন্ত রওশনের কাছে এইসব ঘোরাঘুরি ভালোই লাগে। ঘুরতে বেরিয়ে আশেপাশে মেয়ের বাসা, ছেলের বাসা, মানে নিজের বাসায় অতিথির মতো করে ঢুঁ দেন। আবার হুট করে উধাও হয়ে যান। কথনো কখনো সাথে তার সমবয়সী অকালবিধবা বান্ধবীও থাকেন। কিন্তু কোভিড-১৯-এর এই মহামারির আগে বান্ধবীর হার্ট অ্যাটাক হওয়ায় তিনি বাইপাস সার্জারির জটিলতা নিয়ে দীর্ঘ হাসপাতাল বাসের পর রিহ্যাবে আছেন। রওশন আরা তাই এখন আরো একটু বেশি একা, পুরোপুরি সঙ্গীহীন। তাই রেখার বাসাতেই তিনি একটু বেশি স্বাছন্দ্যবোধ করেন। নিজের বাসার মতই রেখার রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়ে নেন। রেখার আবার কোমরব্যথার সমস্যা আছে, তাই মা সাহায্য করতে চাইলে সহসা তাতে নিষেধ করে না। তাছাড়া রেখার স্বামীর সাথেও রওশনের বোঝাপড়া ভাল। রেখার স্বামী সালাম শাহীনের পরীক্ষিত পুরনো বন্ধু। করোনাভাইরাস যখন দোর্দণ্ডপ্রতাপে নিউ ইয়র্ক সিটিকে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে, সেই মুহূর্তে একমাত্র ছেলের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর রওশন আরাকে ব্যাপকভাবে বিচলিত করলো। পায়ের নিচে যেন ভূমিকম্প টের পেলেন তিনি। অজান্তেই তিনি রেখাকে বললেন- আমি শাহীনের কাছে যাব, ওকে কে দেখাশুনা করবে? পরিবারে সবার দায়িত্ব নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে পছন্দ করেন রওশন, তাই তার এই ধরনের প্রশ্নে অনেকেই বিরক্ত হন, ভাবখানা এমন যেন সংসারে আর কেউ নেই শাহীনের দেখভাল করার। আসলে বিষয়টা তা নয়, রওশন কারো ওপর ঠিক আস্থা রাখতে পারেন না। অন্যকে কোন কাজ দিলে তিনি তা আবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন, কাজটা ঠিকঠাক হলো কী না।
যা হোক, মেয়েরা তাকে একে একে ফোনে বোঝালো- মা, এটি খুবই মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। তুমি কেন, কেউ-ই দাদা ভাইয়ের কাছে যেতে পারবে না। ওকে একা থাকতে হবে, এক রুমে একা, আশেপাশেও কেউ যেতে পারবে না। ছয় ফুট দূরে থাকতে হবে সবসময়, তুমি দেখছো না টিভিতে? এটাই চিকিৎসা। আর দাদা ভাইয়ের দেখাশোনা করার জন্য তো ও-বাসায় ভাবী আছে, দাদার মেয়ে শাহানা আছে।
রওশনের মেয়েরা আরো অনেক কিছু বললো, তবে পাছে মা ভয় পায় সেই কথা ভেবে, কিছু কথা সবাই চেপে গেল। যেমন এই রোগের কোন চিকিৎসা নেই। তাছাড়া যাদের বয়স ষাটের বেশি, ডায়াবেটিস, হার্টডিজিজ আছে তাদের মৃত্যুর হার অনেক বেশি। মায়ের কাছে বিষয়টি চেপে গেলেও, মাকে নিয়ে নিজেদের ভয়কে কীভাবে চেপে যাবে? সন্তানদের মধ্যে মাকে নিয়ে উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগ চরম আকার ধারণ করলো। সর্বক্ষণ তাদের নানান পরিকল্পনার মূল বিষয়, মা যেন কোনভাবেই আক্রান্ত না হয়। আর এই পরিকল্পনায় স্বভাবতই নেতৃত্ব দেয় কনিষ্ঠ কন্যা ডাক্তার লায়লা। ডাক্তার বলেই এক্ষেত্রে তার ওপর প্রকাশ্যে কেউ কথা বলে না। তবে আড়ালে তার কথা যাচাইবাছাই ছাড়া পালনও করে না। সাথে আমজনতার কাছ থেকে হারবাল জাতীয় চিকিৎসা পদ্ধতিও যোগ করে দেয়। ডাক্তারের কাছে হারবাল চিকিৎসার প্রসঙ্গ তুলে অনেকেই আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানকে একহাত নিতে ছাড়ে না। রেবা তাদেরই একজন। সবাই যখন বলছে কোভিডের কোন চিকিৎসা নেই, তখন ডাক্তারের সাথে এসব পদ্ধতির গুণগান তুলে ধরার মাধ্যমে তাদের অসহায়ত্বকে তুলে ধরার মধ্যে অন্য রকম একটা প্রশান্তি আছে। তাছাড়া নিজস্ব প্রাচীন বিশ্বাস কীভাবে ত্যাগ করবে? বরং এই দুর্যোগে প্রাচীন বিস্মৃত অকার্যকর পদ্ধতির মধ্যেই কার্যকারিতার গন্ধ পেয়ে স্বস্তিতে সুস্থতার আশায় বুক বাঁধতে চায়। হারবালের ওপর চূড়ান্ত আস্থাশীল রেবা, বাসায় বসে দিবারাত্রি হারবাল সামগ্রীর নানাবিধ ব্যবহারে নিজেকে ব্যস্ত রেখে, নিজের নিরাপত্তা বিধান করতে পারছে বলে মনে করলেও বড় ভাই শাহীনকে নিয়ে টেনশন কাটছে না। তাই প্রতি রাতে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ভাইবোনেরা যখন আড্ডায় মেতে ওঠে তখন সেই আড্ডায় রেবার একটা হারবাল রেসিপি থাকবেই। মূলত ভাই শাহীনকে উদ্দেশ্য করেই এই রেসিপি।

ফেসবুক মেসেঞ্জারের এই আড্ডায় রওশন থাকেন না। তার মন, কোন কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছে না। বড় সন্তান, একমাত্র ছেলে শাহীনের কোভিড-১৯ পজিটিভ শুনে তিনি ভেঙে পড়েছেন। কিন্তু বাইরে থেকে তার এই ভেঙে পড়া বোঝার উপায় নেই। হাজার বছরের কোন পুরনো বাড়িকে বাইরে থেকে আস্তরণ বদলে, রং করে দিলে যেমন বোঝা যায় না ভেতরটা কতটা ভঙ্গুর, রওশনও তেমন। কোন দুঃসংবাদ শুনলে আগেও রওশনের তেমন কোন অভিব্যক্তি প্রকাশ পেত না। কোন চিৎকার চেঁচামেচি কান্না না করে নিথর তাকিয়ে থাকতেন, তারপর ধপাস করে মূর্ছা যেতেন। এটাই রওশন।
রাজীব সাহেব চলে যাওয়ার পর তার মন এখন আর বিচ্ছেদের আশংকায় আগের মতো কাতর হয় না। একমাত্র ছেলে শাহীনের অসুস্থতার কথা শুনে ভাবলেশহীনভাবে তাই রওশন আরা বললেন, আমি যাব শাহীনের ওখানে, আমি ওর খুব কাছে যাব না, দূরে দূরে থাকবো, শুধু দূর থেকে দেখবো- বলে মেয়েদের কাছে ছেলের কাছে যাওয়ার মৌখিক দরখাস্ত করলেন। চাইলে উনি একাই হেঁটে ছেলের কাছে চলে যেতে পারতেন, উডহিভেনের রাস্তাঘাট তার চেনা। তিনি তা করলেন না, তার মৌখিক দরখাস্ত সম্মানের সাথে প্রত্যাখাত হলো। ডাক্তার ছোটকন্যা তাকে আপাতভাবে বোঝাতে সমর্থ হলেও রওশন আরার মন থেকে ছেলের কাছে যাওয়ার তীব্র বাসনা মুছতে পারলো না। একবুক দীর্ঘশ্বাস নিয়ে তাই তিনি বললেন, কবে যে শাহীনের কাছে যাবো। তার এই দীর্ঘশ্বাস খুব বেশি দীর্ঘায়িত হয় নি। দীর্ঘশ্বাস সংক্ষিপ্ত হওয়ার ঘটনাটাও বেশ সংক্ষিপ্ত।

কয়েকদিন পরই, হঠাৎ সকালবেলা ধপাস শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায় রওশন আরার। পাশ ফিরে দেখে বিছানায় রেখা নেই। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে তার। অজানা শঙ্কা নিয়ে কোনমতে পুরনো দুর্বল শরীরটাকে বিছানা থেকে নামিয়ে ‘ধপাস’ শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে দেখে বাথরুমের দরজার সামনে চিৎ হয়ে পড়ে আছে রেখা। রওশন আরা বুঝতে পারছিলেন না কী করবেন। রওশন আরার মনে হলো, তিনি রেখাকে নিয়ে চোরাবালির মধ্যে তলিয়ে যাচ্ছেন। ঠিক তখন তার কানে দূর থেকে ভেসে এলো সেই চেনা কন্ঠস্বর – রওশন, রওশন। আমার জায়নামাজ কই। রাজীব সাহেবের কণ্ঠের তীব্রতায় ঘোর কাটে রওশন আরার। তাকিয়ে দেখে রেখা আধফোঁটা চোখে দৃষ্টি মেলে ডাকছে – মা, মা। সকলের অগোচরে মা-মেয়ে নিজেদেরকে অনেক কষ্টে সামলে নিলেও সেদিন থেকেই রেখা বুঝতে পারে তার শরীরটা ভীষণ দুর্বল। এত দুর্বল তার কখনোই লাগে নি। এ অন্যরকম দুর্বলতা, মনে হচ্ছে শরীরটা কাগজের মত হালকা। হালকা শরীরটা তো বাতাসে উড়ে যাওয়ার কথা কিন্তু উড়ছে তো না-ই, উল্টো মাটির সাথে লেপ্টে আছে, কোনভাবেই তুলতে পারছে না। অগোচরে মা-মেয়ে একে-অপরের সাহায্য নিয়ে কোনমতে উঠে দাঁড়ায়। সালাম তখনও ঘুমে, বেশ অসুস্থ, কাশি আর হেঁচকি, কিছুতেই কমছে না। শেষরাতে একটু ঘুমিয়েছে তাই সালামকে ডাকার কথা ভাবেন নি।

কিন্তু রেখার অসুস্থতার নানাবিধ বিবরণ শুনে ডা. লায়লার মাথায় অন্যচিন্তা এসে ছুঁচোর মতো উঁকি দিচ্ছে। আর দেরি করতে চাইছে না। ইমিডিয়েট বড় বোন রেখাকে তাই একরকম হুকুম দিয়েই করোনাভাইরাস পরীক্ষা করে দেখা গেল কোভিড-১৯ পজিটিভ। ভাইয়ের পর এবার বোন আক্রান্ত হওয়ার খবরে চরম আতঙ্কিত ডা. লায়লা। কারণ রেখার বাসায় আছেন তাদের মা। বিষয়টা অনেকটা যেন, ‘যেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয়’-এর মতো। কী করা উচিত বুঝতে পারছে না। তাহলে মাকে কী নিজের বাসায় এনে রাখবে? কিন্তু তার বাসায় তো মায়ের কষ্ট হবে। একটা মাত্র বাথরুম৷ তিন ছেলে আর স্বামী নিয়ে পাঁচজনের সংসার। বড় ছেলে কলেজ ছাত্র, মেঝটা মিডিল স্কুলে; দুজনে বাথরুমে ঢুকলে ৩/৪ ঘণ্টা পার করে দেয়। এই মুহূর্তে মায়ের নিরাপত্তা ছাড়া কিছুই ভাবতে পারছে না সে। তাছাড়া ক’দিন থেকে রওশন আরা অস্বাভাবিকভাবে ক্লান্ত অনুভব করছেন। না, রেখার কাছ থেকে এখনই মাকে আলাদা করতে হবে। ডা. লায়লা বরাবরই একরোখা। করোনাভাইরাসে হাইরিক্স পেসেন্ট হিসাবে বিবেচিত তার মা। মাকে সে কোনভাবেই ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না। বলতে গেলে অনেকটা একক সিদ্ধান্তে রেখার বাসা থেকে রওশন আরাকে তার নিজের গৃহে পাঠালো লায়লা।
ভাই-বোন মিলে শলা-পরামর্শ করে রওশন আরার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে তার নিজের রুমেই। পাশের একরুম পরে ভিতরে দিকে আছে কোভিড-১৯-এর সাথে লড়াই করে ক্লান্ত, এখন অনেকটা উপসর্গহীন শাহীন। রওশন আরা ছেলেকে কাছ থেকে দেখার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। এবার সেই ব্যবস্থা হওয়ায় ভিতরে ভিতরে কিছুটা খুশি। আবার অসুস্থ রেখাকে ফেলে যেতেও খারাপ লাগছে। রেখার স্বামী সালামও অসুস্থ কয়েকমাস হলো। ক্যান্সারের জন্য কেমাথেরাপি পাচ্ছে সে। দুর্বলতার জন্য নিজের শরীরকেই নিজে তুলতে পারছে না সালাম। এই তো দুইদিন আগে কেমোর তৃতীয় ডোজ নেয়ার পর সালামের হেঁচকি শুরু হয়েছে, সেই হেঁচকি এখনো চলছে।
কিন্তু সবার সিদ্ধান্ত আবারও শান্তভাবে মেনে নিলেন রওশন। সেই সাথে মনের গহীনে শাহীনের কাছাকাছি পৌঁছানোর বাসনা পূরণের উচ্ছাস চেপে গেলেন।


রেখার ছেলে টিমন সেদিনই দুপুরবেলা গাড়ি করে নিজের বাসায় রওশনকে নামিয়ে দিয়ে গেছে। সবার ধারণা, টিমনের করোনা হয়ে সেরে গেছে। বয়স কম, নিয়মিত ব্যায়াম করে, হয়তো রোগ প্রতিরোধ শক্তি ভালো বলে সহজেই সেরে উঠেছে সে। সাহস করে বাইরের কাজকর্ম এখন সে-ই করে।
নিজের বাসায় পৌঁছানোর পর রওশনের মনে হল তিনি এখন অনেক সুস্থ। দুর্বলতাও কিছুটা কমে গেছে। অন্য জায়গা থেকে নিজের বাসায় পৌঁছালে এমন অনুভূতি অনেকেরই হয়। তাছাড়া ছেলেটার সাথে আজ একমাস পর দেখা হবে ভাবতেই ভালো লাগছে তার। সিঁড়ি বেয়ে সোজা তিনতলায় চলে গেলেন রওশন। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে মনটা তার বিষাদে ডুবে গেল, কেউ একবার তার দিকে তাকিয়ে উঁকিও দিল না। তিনি এই বাড়ির কারো দাদী, কারো শাশুড়ি, কারো মা! কেউ তাকে অভ্যর্থনা জানাবে না, এমনটি তিনি আশা করেন নি। বাড়ির দরজাটা উনি নিজেই চাবি দিয়ে খুলেছেন, নিউ ইয়র্কে এটাই নিয়ম। বাড়ির প্রত্যেকটি সদস্যের কাছেই চাবি থাকে। কেউ তো আর জানে না যে উনি এসেছেন। তবে উনি আসছেন এটা তো সবারই জানার কথা। বাড়ির পরিস্থিতি কেমন থমথমে। এত মানুষ একসাথে থাকে কিন্তু সাড়া শব্দ নেই! পরক্ষণেই বুঝলেন, এটাই তো এখন স্বাভাবিক। বাড়ির কর্তা অসুস্থ তাই এই স্থবিরতা, বাইরে মৃত্যুআতঙ্ক। রওশনের এখন আর বুঝতে বাকি রইলো না, কেন সবার এই দূরত্বে অবস্থান। রেখা কোভিড পজিটিভ, সালামেরও পজিটিভ হতে পারে, ছোট মেয়ে ডা. লায়লারও তাই ধারণা। ওদের কাছ থেকে ফিরেছেন তিনি। তাই সাথে করে করোনা নিয়ে এসেছেন, সবার মধ্যে এই ভয় কাজ করছে। কিছুটা অভিমানের মেঘ যেন এসে তড়িৎ তার বুকে জমাট বাঁধলো। তিন তলায় পৌঁছানোর পর রওশন আরা আস্তে করে শাহীনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো ডাকলেন- শাহীন, শাহীন। নিজেকে এতটা অনাহুত মনে হয় নি কখনো, যেন নিজভূমে পরবাসী।
শাহীন নামাজ পড়ছিল, তাই জবাব দিতে দেরি হচ্ছে। দরজার ফাঁক দিয়ে তিনি তা দেখেছেন, বুঝতে পারছেন। তারপরও রওশনের কাছে কয়েক মিনিটকে মনে হচ্ছিল কয়েক ঘণ্টা। তখনই রওশন আরার ফোন বেজে উঠলো- হ্যালো, মা পৌঁছাইছো। কন্ঠ শুনেই বুঝতে পারে ছোট মেয়ে লায়লা।
– হুম, ছোট করে উত্তর দেয় রওশন। কিন্তু নীরব এবং সম্ভাষণহীন একাকী আগমনের কথা চেপে গিয়ে, অন্যভাবে বললেন- কাউরে তো দেখলাম না। আর শাহীন নামাজে।
– হ, আমিও সবাইরে কল দিলাম, কেউই ধরলো না। হয়তো সবাই আসরের নামাজে।
আসলেই এটা সত্য। রোজার দিন তাই সবাই ওয়াক্ত মতো নামাজ পড়তে চায়। ইতোমধ্যে শাহীন দরজা ফাঁক করে মাস্কেঢাকা মুখের ভেতর থেকে বললো- আম্মা, আসসালামু আলাইকুম।
– কেমন আছো, জ্বর আছে? কাশি কমছে? অনেক কষ্টে আবেগ চাপা দিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন রওশন।
– না, জ্বর নাই আজ পাঁচ দিন, কাশি অনেক কম।
যদিও মায়ের মুখটা মাস্কেঢাকা কিন্তু ছেলের প্রতি মায়ের অপত্যস্নেহ রওশনের চোখে এসে ভর করলো। রওশন আরার চোখ দুটো স্থির, স্থির গোটা শরীর। স্থির চোখে তিনি শাহীনের আপাদমস্তক দেখলেন। এ এক অচেনা শাহীন। লিকলিকে শরীর, চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে একটু ঝুলে আছে, যেমনটি ঝুঁকিপূর্ণভাবে জানালা দিয়ে দুষ্ট বাচ্চারা বাইরের দিকে ঝুঁকে থাকে।
রওশন আরা এক-পা সামনে এগুতেই, শাহীন বললো, আম্মা বেশি কাছে আইসেন না। রওশন আরা বিভ্রান্তি ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছিলেন। তাকে সাহায্য করলো নাতনি শাহানা, নিচতলা থেকে অনেকটা চিৎকার করার মতো করে ডাকলো- দাদি, দাদি। আমি নামাজে ছিলাম। উপরে আসবো না, তোমারে কল দিতেছি।

এর মধ্যে এই বাসার বিভিন্ন ফ্লোরে থাকা প্রায় সবার সাথে ফোনে কথা বলতে বলতে হয়রান হয়ে গেছেন রওশন। কিন্তু কারো সাথেই দেখা হয় নি। ফেসবুক মেসেঞ্জার চালাতে জানেন না, তাই ভিডিওতেও কাউকে দেখার উপায় নাই। এরই নাম বুঝি কোয়ারেন্টিন। ডাক্তার কন্যা লায়লা অনেকবার তাকে বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কোয়ারেন্টিন না স্বেচ্ছায় কারাবাস। নিজের ঘরে একা। কারো সাথে দেখা নেই। চুপচাপ কেউ একজন এসে কিচেনের টেবিলে খাবার রেখে যায়। মাঝেমধ্যে রুমের বাইরে পায়ের শব্দ পাওয়া যায়, আবার একটু পড়েই তা মিলিয়েও যায়। মাঝে মধ্যে নিচতলায় নাতনির কন্ঠ, ওর চার বছরের ছেলের ক্ষীণ কন্ঠ শুনতে পায় রওশন আরা। খুব কাছ থেকে দরজার বাইরে শাহীনের সাথে কথা হয়। তাও খুব দরকারি, এবং সংক্ষিপ্ত। আম্মা কিছু লাগবে, ওষুধ খাইছেন, টেবিলে খাবার আছে খেয়ে নেন ইত্যাদি ইত্যাদি। রওশন আরা একবার ভাবে একটু নিচের তলায় যায়, ঘুরে আসে। একটু রান্না করতে মন চায়। ভাবে সবাইকে ডেকে বলে- কী হইছে, দুনিয়াডার কী হইলো, এভাবে আর কতদিন। জানালা দিয়ে বাইরে সাদা চেরিফুলে ঢাকা, নীরব সন্ধ্যা দেখতে দেখতে দিন তারিখ, রাতদিন সবকিছু ভুলে গেছেন রওশন আরা। রাস্তায় একটাও গাড়ি নেই, নেই কোন শব্দ। অসহ্য এই নীরবতা। মাঝমধ্যে দূর থেকে ভেসে আসা অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন যেন চারিদিকে একপশলা বৃষ্টির মতো করে সতর্ক সংকেত বিলিয়ে যায়। নিজের ঘরের বাইরে শুধুমাত্র কিচেন আর বাথরুম, এ দুটো জায়গার বাইরে পা বাড়ানোর অধিকার নেই তার। নিজের ঘরের বাইরে বেরুলেই, প্রতিটি কদমে লায়লার সর্তকতামূলক কথাগুলো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের মতো ভেসে ভেসে কাগজের চোঙ্গের ভিতর দিয়ে আসা বিশেষ ধরনের শব্দের মতো রওশনের কানে ঘুরপাক খেতে থাকে। যার মূল সুর- মা, সবার থেকে দূরে থাকবা, দূরে থাকলে ভাল থাকবা, তুমি ভাল থাকলে আমরা ভাল থাকবো।

রওশন আরা আগের চেয়ে কিছুটা ভাল। তিনি কোভিড-১৯ পজিটিভ কী না তা এখনও নিশ্চিত না। তারপরও সে বন্দী। তার কাছে নিজের বাড়িকে মনে হয় সেন্ট্রাল জেল। পুরনো ঢাকার সেন্ট্রাল জেল তিনি ভালোই চেনেন। সে আরেক ইতিহাস। নিজের গড়া এই সেন্ট্রাল জেলে তিনি আর কতদিন থাকবেন? নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করেন রওশন।
বরাবরের মতো আজও ফোন করেছে ছোট মেয়ে লায়লা।
– মা, কাল দাদা ভাই টেস্ট করাতে যাবে। দাদার তো একমাসের বেশি হয়ে গেল। জ্বর নাই ১০দিন, কাশি নাই বললেই চলে। বলছি, দাদার সাথে যেয়ে তুমিও টেস্টটা করাইয়া আসো। তোমার তো মনে হয় নেগেটিভ আসবে। দাদারও এতদিনে নেগেটিভ আসা উচিত। নেগেটিভ হলে তুমি বাড়ির সবার কাছে যাইতে পারবা। আর তোমারও রেখা আপার বাসা থেকে আশার পর ১৪ দিনের বেশি হয়ে গেছে। গড়গড় করে কথাগুলো বলে গেল লায়লা।
– শাহীন কখন যাইবো, আস্তে করে জিজ্ঞাসা করলো রওশন আরা।
– কাল সকালে, ১০টার দিকে। তুমি রেডি থাইকো। মাস্ক পরবা, গ্লাভস পরবা। গাড়িতে একেবারে পিছনের সিটে বসবা। দাদার থেকেও দূরে থাকবা। বুঝছো?
রওশন আরা সবই বুঝেছে। কিন্তু সেটা বোঝানোর জন্য কোন শব্দ ব্যয় করতে ইচ্ছা করলো না।
শুধু নিরুত্তাপ জানতে চাইলো – গাড়ি কি শাহীন চালাইবো? দুর্বল শরীরে পারবো চালাইতে? শাহানারে কও চালাইতে।
– তোমার যে কথা মা। শাহানারে তো তাইলে কোয়ারেন্টিনে যাইতে হবে, ওর ছোট বাচ্চা, বাসায় বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়ি, ভাবি আছে।
রওশন আরা মনে মনে বিরক্ত হয়, আসলে তার নাতনিটাকেও দেখদে ইচ্ছা করছে বলেই স্বার্থপরের মতো এমন কথা বলেছে। কথা না বাড়িয়ে তাই তিনি চুপ থাকেন। সারা দুনিয়া যেখানে চুপ মেরে গেছে সেখানে সারাজীবন চুপ করে থাকা রওশন আর কী বলবে!

টেস্টের ফলাফলের জন্য সবাই উদগ্রীব হয়ে আছে। রওশন আরাও মনে মনে কিছু প্ল্যানও করে ফেলেছেন। রেবাকে বলবেন চলে আসতে। রেবাও মায়ের বাসায় রেডি চলে আসার জন্য।
দুই দিন পর রিপোর্ট এলো। রিপোর্ট শুনে মা-ছেলেসহ গোটা পরিবার আরেক দফা স্তব্ধ হয়ে গেল। যেন গত কয়েকদিনের ঠান্ডা পানি হঠাৎই জমে বরফ হয়ে গেছে। দু’জনেই কোভিড পজিটিভ। রওশন আরা বিছানায় শুয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। তিনি আর কিছুই ভাবতে পারছেন না। আবারও কোয়ারেন্টিন। সেন্ট্রাল জেলে কারাবাসের সময়সীমা আরও ১৪দিন বাড়বে! ছোট মেয়ে ডাক্তার লায়লা ইনিয়েবিনিয়ে সেকথাই বলেছে।

১০

চৌদ্দ দিন পর আবার টেস্টের দিন এসেছে। একই গাড়ি, একই ড্রাইভার, একই যাত্রী।
আবারও অপেক্ষা রিপোর্টের জন্য। আর্জেন্ট কেয়ার থেকে বলেছে দুই দিনের মধ্যেই ফোন করে রিপোর্ট জানাবে, লং আইল্যান্ডের সেই একই আর্জেন্ট কেয়ার থেকেই করিয়েছেন সব টেস্ট। টেস্ট পজিটিভ হলে দ্রুত জানিয়ে দেয়। দুই দিন পেরিয়ে রিপোর্ট আসলো চারদিন পর।
রিপোর্টে এবার শাহীন নেগেটিভ তবে রওশন আরা আবারও পজিটিভ। রিপোর্ট দেখে শাহীন প্রথম জানালো লায়লাকে। বললো মাকে কীভাবে জানানো যায়। সবাই বুঝতে পারছে এই রিপোর্ট পেয়ে তাদের মা আরও ভেঙে পড়বেন। কিন্তু রিপোর্ট তো জানাতে হবে। রওশন আরা একা থাকতে পারবেন না, এটাকেই বিশেষভাবে বিবেচনা করছে সবাই। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে ভাই-বোনদের একটা উৎকণ্ঠানির্ভর উত্তেজনাপূর্ণ মিটিং হয়ে গেল। মায়ের আবার কোভিড পজিটিভ হওয়ার খবরে বড় মেয়ে সাফিয়া হাউমাউ করে কাঁদলো। সাফিয়া একটু দূরে ইউনিয়ন টার্নপাইকে থাকে। মায়ের সাথে অনেকদিন দেখা নেই। সিদ্ধান্ত হল, রওশন আরাকে নিজগৃহ থেকে অন্যগৃহে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হবে। কারণ এখন যে বাসায় তিনি আছেন সেখানে উনি একাই পজিটিভ। তাই রেখার কাছেই তাকে পাঠানো হোক। ছেলেমেয়েদের ধারণা, মা রেখাদের সাথে কমফোর্টেবল। লায়লাই দায়িত্ব নিল মাকে জানানোর।
লায়লার কাছ থেকে প্রস্তাবটা শোনার পর রওশন আরার মনটা খুবই খারাপ। এত মন খারাপ যে চারিদিকের কোন কিছুই তার চোখে পড়ছে না। সবকিছু ঝাপসা লাগছে। দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলেন কয়টা বাজে। কিন্তু বুঝতে পারলেন না। বিছানা থেকে নামতে যেয়ে মনে হচ্ছিল মাথাটা এক দিকে টলে যাচ্ছে। ভাবলেন, সুগারের কোন সমস্যা হলো না তো? যদিও গত একমাসে একদিনও গ্লুকোমিটারে সুগার চেক করা হয়নি। কে চেক করবে? এই রুমে তিনি একা, প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নিজের রুমেই বন্দী হয়ে আছেন। এমন বন্দী জীবন তার জীবনে কখনো আসে নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই রওশন আরা সব সামলে নিয়েছেন। সেদিন বিকেলেই তাকে নিজের বাসা থেকে রেখার বাসায় স্থানান্তর করা হয়েছে। যেন সেন্ট্রাল জেল থেকে কাশিমপুর জেলে স্থানান্তর। কারাবাস আরও বর্ধিত হয়েছে। এবার সশ্রম কারাদণ্ড, রেখাকে কাজে সাহায্য করতে হবে। সাহায্য করতে রওশন আরার সব সময়েই ভাল লাগে।

১১

আবারও সেই একই দৃশ্য। একই গাড়ি, একই ড্রাইভার, একই যাত্রী, একই সাজ-পোষাক। শুধু একজন পজিটিভ, একজন নেগেটিভ।
মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস, নিরাপদ দূরত্ব।
রেখার বাসার দিকে যাওয়ার সময় গাড়িটা যেন তার বাসার সামনে দিয়ে যায় শাহীন দাদাকে এমন অনুরোধ করলো লায়লা।
শাহীন জিজ্ঞাসা করলো- কেন? কিছু দরকার।
– না, মাকে একটু দূর থেকে দেখবো। বরফজমা কণ্ঠে উত্তর দিলো লায়লা।
শাহীনের বাড়ির পাঁচ ব্লক পরেই লায়লার বাসা। শাহীন গাড়ি নিয়ে লায়লার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েছে। লায়লা মাস্ক, গ্লাভস পরে দুই মাস পর এই প্রথম বাসা থেকে রাস্তায় নেমেছে।
গাড়ির কাছে দৌঁড়ে গিয়ে মাকে দেখলো। মা পিছনের সিটে চুপচাপ বসা, মায়ের মুখেও মাস্ক পরা। সুন্দর একটা সুতি শাড়ি পরেছেন। সাদার ওপর পার্পল কালারের ছোট বড় ফুল। উপরে বোরকা পরেন নি। সব সময় তিনি বোরকা পরেন। লায়লা মাকে মুগ্ধতা নিয়ে দেখছে। মাথায় ঘোমটা টানা, চুল সুন্দর করে গোছানো খোঁপা করা বোঝা যাচ্ছে। লায়লা ভাবছে, মাকে বলেকয়ে এভাবে সাজাতে হয় আর আজ মা নিজেই কত সুন্দর ছিমছাম করে সেজেছে। মায়ের সাথে কথা হলো লায়লার, বিশেষ কোন কথা নয়। কুশলাদি জানার মতো করে প্রচলিত কিছু প্রশ্ন। কিন্তু মায়ের মুখটা দেখতে পেলো না বলে মন ভরলো না লায়লার। কোনমতে কান্না সামলে নিয়ে জল টলটলে চোখ নিয়ে দৌঁড়ে বাসায় ফিরলো সে। গ্লাভস পরা হাতে চোখটাও মোছার উপায় নেই। রওশনের চোখেও তখন জল থাকার কথা কিন্তু বয়স তার চোখের জল কেড়ে নিয়েছে। শুষ্ক চোথের জন্য দুইবেলা করে তিনি এখন আর্টিফিশিয়াল টিয়ার ব্যবহার করেন। কান্নার জন্য এখন তার ওষুধ লাগে।

১২

হঠাৎ রওশন আরা লক্ষ করলেন তার গাড়িটি দ্রুত ছুটছে, যেন লং আইল্যান্ড এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে যাচ্ছে। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হোন্ডা এসইউভি এত দ্রুত চলছে যেন আরেকটু হলে আকাশে উড়াল দেবে। তিনি আস্তে আস্তে অনুভব করলেন তার গা ঘেঁষে কে যেন বসে আছেন। গায়ের গন্ধটা খুব চেনা, লোমশ হাতের স্পর্শ টের পাচ্ছেন তিনি। কী অবাক, রওশনের ভয় করলো না। তিনি ডানে ধীরে ঘাড় ফিরিয়ে দেখলেন, বাটিকের প্রিন্ট করা ঝলমলে একটা রঙের ফতুয়া পরা একটা লোক, ইংরেজদের মতো গায়ের রঙ, সৌখিন আদলে কাটা শ্মশ্রু।
– রওশন, আজকে তোমার আমার সাথে বেড়াতে যাওয়ার কথা ভুলে গেছো।
এই পুরুষ কন্ঠস্বর শুনে রওশন যেন ভয়ের চেয়ে আরো বেশি আশ্বস্ত হলেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করে আরও নিশ্চিত হলেন, ডানপাশের লোকটা রাজীব সাহেব। রাজীব সাহেব সবসময় তাকে তার বামপাশে বসাতেন। আর রোমান্টিকতা করে বলতেন, বামপাশে হার্ট থাকে, তাই তুমিও বামদিকে থাকবে। সাথে রসিকতা করে আরো বলতেন, বামপন্থী মানেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ। তুমি হলে বামবন্থী, আমার সকল ভুলের প্রতিবাদ করবা।
রওশন এই দিনটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। একাকী জীবনে কোয়ারেন্টিন রাতদিন মানে, জেলখানার মধ্যে জেলখানা। আজ তিনি মুক্ত।
রওশন আরার মনে হলো উনি বোররাকে চড়ে উড়ে চলেছেন। বোররাকটা উড়ে সবক’টি হাইওয়ের ওপর দিয়ে সবকিছু ছাড়িয়ে ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল পার্কের দিকে যাচ্ছে। হালকা মেঘের কারণে ড্রাইভার আছে কী নেই, বোঝা যাচ্ছে না।

 

সজল আশফাক

ছড়াকার ও লেখক। প্রকাশিত গ্রন্থ প্রায় ৩৫টি। শিশুসাহিত্যে অগ্রণী ব্যাংক পুরস্কার পেয়েছেন। পেশায় চিকিৎসক। টেলিভিশনে চিকিৎসা বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এ নিয়ে পত্রপত্রিকাতেও নিয়মিত লেখালেখি করেন। থাকেন নিউ ইয়র্কে।