সত্যজিৎ রায় > ‘এবার বাংলাদেশে গেলে ছবি করতেই যাব’ >> চলচ্চিত্র

0
329

সত্যজিৎ রায় > ‘এবার বাংলাদেশে গেলে ছবি করতেই যাব’ >> চলচ্চিত্র

 

[সম্পাদকীয় নোট : আজ কিংবদন্তি বাঙালি চলচ্চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের (১৯২১-১৯৯২) আটানব্বইতম জন্মদিন। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সত্যজিৎ চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়াও ছিলেন চিত্রনাট্যকার, শিল্প নির্দেশক, সঙ্গীত পরিচালক ও লেখক। জন্ম ও তাঁর বেড়ে ওঠা যদিও কলকাতায়, কিন্তু তাঁর পূর্বপুরুষ ছিলেন কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার মসূয়া গ্রামে। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ফরাসি চলচ্চিত্র নির্মাতা জ্যঁ রেনোয়ারের সঙ্গে সাক্ষাতের পরে চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং ইতালির নব্য বাস্তবতাবাদী চলচ্চিত্র লাদ্রি দি বিচিক্লেত্তে (বাইসাইকেল চোর) দেখার পর চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্বুদ্ধ হন। ‘পথের পাঁচালী’সহ (১৯৫৫) তিনি ৩৭টি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, প্রামাণ্য ছবি ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ‘পথের পাঁচালী’ ১১টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার অর্জন করে। এর মধ্যে কান চলচ্চিত্র উৎসবে (১৯৫৬) ‘শ্রেষ্ঠ মানবদলিল’ পুরস্কারে ভূষিত হয়। সত্যজিৎ কল্পলেখক, প্রকাশক, চিত্রকর, গ্রাফিক নকশাবিদ ও চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবেও পরিচিত। বহুবর্ণিল জীবনে তিনি বহু আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে ১৯৯২ সালে পাওয়া বিখ্যাত সম্মানসূচক অস্কার পুরস্কার রয়েছে, যা তিনি সমগ্র কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে অর্জন করেন। এছাড়া ৩২টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, ১টি গোল্ডেন লায়ন, ২টি সিলভার বিয়ার লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি একবার স্বল্প সময়ের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন। ইচ্ছা ছিল এরপর বাংলাদেশে এলে চলচ্চিত্র নির্মাণ করার জন্যই আসবেন। কিন্তু তাঁর সেই আশা পূর্ণ হয়নি। কলকাতায় তাঁর সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অনুরাগী ও কর্মী মাহবুব আলমের সঙ্গে। সত্যজিতের আটানব্বইতম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তীরন্দাজে সেই স্মৃতিচারণটি প্রকাশ করা হলো।]

মাহবুব আলমের স্মৃতিচারণ

“তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন যে বাংলাদেশে যেভাবে ভারতীয় হিন্দি ছবির অবাধ অনুকৃতি হচ্ছে তাতে অচিরেই বাংলা চলচ্চিত্র তার বৈশিষ্ট্য হারাবে। একপক্ষীয়ভাবে ব্যবসায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এত অশ্লীলতা এবং সেক্স-ভায়োলেন্স কী করে আরোপিত হয়, তাও তাঁর বোধের অগম্য বলে তিনি জানান।”

“বাংলাদেশ থেকে বৃষ্টি নিয়ে এলাম।”
এভাবেই বোধ হয় প্রথম কথা শুরু করেছিলাম; তখন মে মাসের মাঝামাঝি। কলকাতায় গুমোট গরম। মেঘের সঘন আয়োজন, কিন্তু বৃষ্টি নেই। সেদিনই প্রথম যেন অনেকটা আত্মগতভাবে বললেন- খোলা জানালা দিয়ে দুদ্দাড় বাতাস ঢুকে কাগজপত্রগুলো যে কোথায় উড়িয়ে নিয়েছে, পরে খুঁজে দেখতে হবে।

“আমার যা বলার ছিল, অর্থাৎ গত পহেলা বৈশাখ যে আমরা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মেলায় ‘পথের পাঁচালী’র পোস্টার এঁকে ‘চলচ্চিত্রপত্র’ বিক্রি করেছিলাম, সেই কথা বললাম।”

টেবিল চেয়ারের তলায় এবং এদিক ওদিক আঁকা-লেখা অনেক কাগজ ছড়ানো-ছিটানো দেখে তাই মনে হল।
“বই কি এনেছ দেখি।” – বলে তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদের দুটি সাম্প্রতিক প্রকাশনা ‘ক্যামেরা যখন রাইফেল’ এবং ‘চলচ্চিত্রপত্র’ নিবিষ্ট মনে দেখতে শুরু করলেন। ‘চলচ্চিত্রপত্র’টি ‘পথের পাঁচালী’র পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সত্যজিৎ রায়কে উৎসর্গ করে প্রকাশিত হয়েছিল।
আমার যা বলার ছিল, অর্থাৎ গত পহেলা বৈশাখ যে আমরা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মেলায় ‘পথের পাঁচালী’র পোস্টার এঁকে ‘চলচ্চিত্রপত্র’ বিক্রি করেছিলাম, সেই কথা বললাম।
তিনি শুনছিলেন এবং দেখছিলেন।

“ছবি করার ব্যাপার আসলে একটা প্রজেক্ট মাত্র। যখন ছবি তৈরি করি তখন সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাতেই ডুবে থাকি। তারপর আবার এই আঁকা-লেখা।”

হঠাৎ আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে বলে উঠলেন- “আমান লিখেছে?” আমান, অর্থাৎ বাংলাদেশের কৃতি আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হকের কথা বলছিলেন তিনি। আমানুল হক দীর্ঘদিন ধরে সত্যজিৎ পরিবারের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তিনি তাঁকে কলকাতা যাবার জন্য বিশেষভাবে বললেন।
“তোমাদের বাংলাদেশের প্রোডাকশনগুলো খুব ভালো।”
কিন্তু তাঁকে অস্বাভাবিক মুদ্রণ ব্যয়ের কথা বলতেই তিনি অনেকটা অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকালেন।
এ যাবৎ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছবিতে দেখা সেই দীর্ঘ ঋজু সত্যজিৎ রায়কে মনে হল কিছুটা যেন নুয়ে পড়েছেন। এর সবটাই বয়সের কারণে নয়। অন্য কারণটাও বোঝা গেল যখন তিনি বললেন যে তাঁর ওই বসা পুরু গদি-আঁটা চেয়ারটাতে বসেই দিনের ষোল ঘণ্টা সময় কাটে আঁকা-লেখার কাজ করে। বিশেষ করে ‘সন্দেশ’-এর কাজ। প্রাথমিকভাবে লীলা মজুমদার সমস্ত লেখা দেখে দিলেও তারপর আবার প্রায় অনেক লেখাই সংশোধন করে দিতে হয় সত্যজিৎ রায়কে। ছড়া-কবিতার ছন্দ ঠিক করা থেকে শুরু করে গল্প লেখা পর্যন্ত। ছবি আঁকার কাজ তো রয়েছেই।
এছাড়া তাঁর নিজের লেখা এবং অন্যান্য ছবি আঁকার কাজে দিনের এই ষোলটা ঘণ্টা প্রতিদিনই অতীত হচ্ছে।
“তাহলে ছবি করার ব্যাপারটা?”
“ছবি করার ব্যাপার আসলে একটা প্রজেক্ট মাত্র। যখন ছবি তৈরি করি তখন সেটা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাতেই ডুবে থাকি। তারপর আবার এই আঁকা-লেখা।” যেমন তখন তিনি কেবলমাত্র ‘হীরক রাজার দেশে’র কাজ সম্পূর্ণ করেই আবার আঁকা-লেখা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কারণ সামনেই পুজো। আর পুজো মানেইতো পুজো-বার্ষিকী।
ঝড়ো বাতাস একটা আস্ত কৌটো নিয়ে যেতে পারে, এমন বিশ্বাস তাঁর ছিল না, তবুও বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর সেটা পেতে হল। সেই কৌটো থেকে তিনি সুপুরি খেলেন কি তামাক খেলেন, এখন ঠিক মনে নেই। তবে কৌটোটা যে ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ী’র এটা নিশ্চয়ই করে বলতে পারি। এবং এই বিশ্বাসটা আরো গাঢ় হলো যখন পাশেই দেখলাম সেই দাবার ছক-আঁকা চৌকো টেবিলটা। মনে হয় আরেকটু সময় নিয়ে খুঁজলে তাঁর বিভিন্ন ছবির সেটের অনেক জিনিসপত্র খুঁজে পাওয়া যেত ওই ঘরটাতে- যার মধ্যে বসে তিনি কাজ করছেন সারাক্ষণ।

“ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘অযান্ত্রিক’ নিয়ে কোনো এক লেখায় লিখেছিলেন যে তিনি ছবিটির প্রথম প্রদর্শনের সময় একটি হলে ছবিটা দর্শক নিচ্ছে কিনা তা দেখতে গিয়েছিলেন। তখন গিয়ে দেখলেন যে, হলের মাথায় বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে ছবির সেই ‘জগদ্দল’ গাড়িটাকে লটকে দেয়া হয়েছে এবং তার ভাঙা হর্নের মধ্যে এসে বাসা বাঁধার চেষ্টা করছে একটা চড়ুই। চড়ুইটি এসে বসামাত্র তিনি ওখান থেকে চলে এসেছিলেন। কারণ তিনি ভাবতে চাইছিলেন চড়ুইটি উড়ে না যাক, ওখানেই বাসা বাঁধুক।”

লেখা নিয়ে কথার সূত্রেই তিনি জানতে চাইলেন, বাংলাদেশে বিনা অনুমতিতে কলকাতার নামি-দামি লেখকদের অজস্র বইপত্র প্রকাশিত হচ্ছে সেটা সত্যি কিনা! অগাধ সত্যি, জানালাম তাঁকে। এবং শংকর, নীহাররঞ্জন, নিমাই ভট্টাচার্য ও সমরেশ বসু যে এই অননুমোদিত প্রকাশনা প্রচারের শীর্ষে এই তথ্যটাও দেখলাম তার জানা। তবে তিনি জানালেন যে তাঁর বইগুলো বাংলাদেশে লালন প্রকাশনী তাঁর অনুমতি নিয়েই ছাপছে।
কি করে যেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছবির কথা উঠলো। এবং তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন যে বাংলাদেশে যেভাবে ভারতীয় হিন্দি ছবির অবাধ অনুকৃতি হচ্ছে তাতে অচিরেই বাংলা চলচ্চিত্র তার বৈশিষ্ট্য হারাবে। একপক্ষীয়ভাবে ব্যবসায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এত অশ্লীলতা এবং সেক্স-ভায়োলেন্স কী করে আরোপিত হয়, তাও তাঁর বোধের অগম্য বলে তিনি জানান। এইসব খবর তিনি জানেন দেখে আমার আর নতুন করে কিছু বলার ছিল না। তবে যাঁরা ভালো ছবি করছেন তাঁদের কথাও বললাম। স্বাভাবিকভাবেই পুনা ফিল্ম ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে যেসব চলচ্চিত্র সংসদ কর্মীরা সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা করছে তাঁদের কথাও উঠলো। তিনি ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ ছবিটি সম্পর্কে কিছু জানতে চাইলে আমি শুধুই অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম। কারণ তখন পর্যন্ত ছবিটি ঢাকায় মুক্তি পায়নি। অথচ ছবিটি উনাশির শেষে শুধুমাত্র নাটোরে মুক্তি পেয়ে সারা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রামোদীদের আলোড়িত করেছে। দেখলাম ছবিটি সম্পর্কে আগ্রহ সত্যজিৎ রায়েরও।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ঋত্বিক ঘটক এবং রাজেন তরফদারের ছবি করার কথা তুললে তিনি বললেন, “এবার যখন বাংলাদেশ যাব ছবি তৈরির পরিকল্পনা নিয়েই যাব।”
মনে মনে বলি, তাই যেন হয়।
এরপর কথায় কথায় কি কথা হয়েছিল তার সব মনে নেই। তবে একসময় দু’দেশের মধ্যে সুস্থ চলচ্চিত্র বিনিময়ের কথা উঠেছিল। সেই সূত্রে তাঁকে জানিয়েছিলাম, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার কথা। এ খবরও তিনি জানেন। কথা হলো বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন এবং তার সমস্যা নিয়ে। কথা হল সুস্থ চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারি অনুদান নিয়েও।
তাঁর সঙ্গে হয়তো আরো কিছু কথাবার্তা হতো। কিন্তু সে-সময় টেলিভিশনে ‘পথের পাঁচালী’র পঁচিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠান দেখবেন বলে উঠে এলাম।
ঋত্বিক ঘটক তাঁর ‘অযান্ত্রিক’ নিয়ে কোনো এক লেখায় লিখেছিলেন যে তিনি ছবিটির প্রথম প্রদর্শনের সময় একটি হলে ছবিটা দর্শক নিচ্ছে কিনা তা দেখতে গিয়েছিলেন। তখন গিয়ে দেখলেন যে, হলের মাথায় বাড়তি আকর্ষণ হিসেবে ছবির সেই ‘জগদ্দল’ গাড়িটাকে লটকে দেয়া হয়েছে এবং তার ভাঙা হর্নের মধ্যে এসে বাসা বাঁধার চেষ্টা করছে একটা চড়ুই। চড়ুইটি এসে বসামাত্র তিনি ওখান থেকে চলে এসেছিলেন। কারণ তিনি ভাবতে চাইছিলেন চড়ুইটি উড়ে না যাক, ওখানেই বাসা বাঁধুক।
তেমনি ‘চলচ্চিত্রপত্রে’ আমানুল হকের লেখায় যেমন জানতে পারি যে, ‘পথের পাঁচালী’র চিত্রনাট্যেনর খসড়া এবং আরো কি যেন একটা সত্যছজিৎ একটা পুঁটলিতে বেঁধে নিয়েছিলেন। ইচ্ছে ছিল আরো কিছুক্ষণ বসে জিজ্ঞেস করি সেই পুটলিটা আছে কিনা এবং থাকলে একবার তা দেখে যাই। কিন্তু পরক্ষণেই ঋত্বিক ঘটকের সেই লেখাটার কথা মনে হতেই ভাবলাম, না থাক। পঁচিশ বছরের অপু-দুর্গা তো এখনও চিনিবাস ময়রার মতো আমাদের স্মৃতিতে ধাবমান। এবং সত্যজিৎ রায় যখন এখনও বাংলা চলচ্চিত্রের সম্রাটের আসনে অধিষ্ঠিত।
রচনাকাল ১৯৮১