সন্ন্যাসী আরণ্যক >> ক্রান্তি >> ছোটগল্প

0
287

ক্রান্তি

পরদিন ফজরে স্বপ্নের ব্যাপার জানাজানি হয়। তখন প্রভাতের আলো ক্রমশ স্পষ্টতর হচ্ছিল—সর্বব্যাপী নিস্তব্ধতার শান্ত সমুদ্রে মুয়াজ্জিনের ভাঙা কণ্ঠ মৃদু ঢেউ তুলতে শুরু করে। আধভেঁজা ভারি দাড়িতে আঙুলি করে নিয়ে মুয়াজ্জিন বলে, শেষরাতে বিন্দুস্বর খোয়াবের মধ্যি কলো গ্রামে রাত নামবি, যে রাতির কোনো শ্যাষ নাই—প্রগাঢ় আন্ধারের মহাকালীন রাত! শেষরাতের উপর মুয়াজ্জিনের অত্যাবশ্যক বাড়তি চাপ ও তার খড়খড়ে কণ্ঠের তরল আতংক গ্রামের লোকেরা সহজেই ধরতে পারে। তারা জানে শেষ রাতের স্বপ্ন মিথ্যে হয় না।মুয়াজ্জিনের স্বপ্ন বয়ান উপস্থিত লোকেদের মুখে বাসি চুলার ছাই ঢেলে দেয়—ছাইগাদায় মুখেদের কথা চাপা পড়ে এবং আলাদা করে কোনো মুখ সনাক্ত করা যায় না। ছাইগাদাগুলো বিশ্বাসগত সংকটে পড়ে কারণ মুয়াজ্জিনের বয়ান তারা অবিশ্বাস করতে পারেনা। হাটে-মাঠে-ঘাটে—অভিন্ন স্বপ্নের বৈচিত্র্যহীন বর্ণনা ভিন্ন ভিন্ন কথকের জবানিতে উপস্থাপিত হলেও শ্রোতাদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে না। কেবল, বাজার সমাবেশের মজমা থামিয়ে পান্নু শেখ বলে, ওই দাড়ে শালার কথায় কোনো বিশ্বাস নাই; শালার বিটা শালা মসজিদি ঢুয়ার আগে মিথ্যে কথা কয় আবার বারোনুর পরে মিথ্যে কতি না পাল্লি প্যাটের ভাত হজম অয়না। আমার মনে অয় শালা মসজিদির মদ্যিও মিথ্যে কথা কয়। এমনটা কোনো ভাবেই ঘটতে পারে না এই মর্মে পান্নু শেখ মুখেদের হতাশ না হতে পরামর্শ দেয়। সে বলে, ও মিয়ারা আল্লার এট্টা বিচার আছে না? রাতির পর দিন আসবি ইডাইতো নিয়ম। আল্লা কি তুমার আমার মতো বিড়ি ধরাতি যায়ে লাইট মারে দেয় নাকি! এমন অলিপরা আল্লাতাল্লা মিথ্যে অয়ে যাবি নে! কও মিয়ারা মিথ্যে অয়ে যাবিনে? আসরের লোকদের মধ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় পান্নু শেখ। লোকেরা শেখের লেকচারে আস্বস্ত হতে পারে না বরং তার উন্নাসিক মন্তব্যের জন্য ভেতরে ভেতরে পুড়তে থাকে। তারা তাদের মৌলিক জিজ্ঞাসায় ফিরে যেতে চায়। কলেজ পড়ুয়া এক যুবক জানতে চায় নদী আবার কথা কতি পারে নাহি? যুবকের ঠোঁট থেকে জিজ্ঞাসা কেড়ে নেয় গোলজার মিয়া। তার তেষট্টি বছুরে রঙচটা আড়ষ্ট জিহ্বা সুড়সুড়িয়ে ওঠে। সে বলে, পারেরে মনি, পারে। আল্লার অলিরা সব বুজতি পারে। ক্যা তুরা সুলেমান পয়গম্বরের কিচ্ছা শুনিসনেই? —আসরের লোকেরা হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়ে বাড়ি ফিরে যায়। পুরুষেরা সেদিন বউদের সাথে হম্বিতম্বি করে না, আশ্চর্য হয়ে বউয়েরা জানতে চায় তাদের কি এমন ঘটছে। পুরুষেরা তাদের ম্লান-শুষ্ক মুখ আরো বেশি মলিন ও বিবর্ণ করে বলে, গ্রামে রাত নামবে। বিশাল অন্ধকার হা’য়ের গহ্বরে লীন হয়ে যাবে তাদের আজন্ম আশ্রয়ের গ্রাম।
বউদের সবাই স্বপ্নের ব্যপারটা খুব সহজে বিশ্বাস করার পারদর্শিতা দেখালেও পারুল বেগম কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না। সে লিঠনের মুখোমুখি দাঁড়ায়—বটের শেকড়ের মতো সরু লম্বা হাত দুটি প্রসারিত করে লিঠনকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে। কণ্ঠস্বর সামান্য নীচু করে পারুল বেগম বলে, দেখপা এমন কিচু অবি নানে। এতো ভয় অত্তিছো ক্যা, আমি আছি না তুমার সাথে? বুকের তাপে লিঠন সাময়িক স্বস্তি অনুভব করে। বিয়ের অনেক আগ থেকেই তারা যখন লুকোচুরি লুকোচুরি করতো তখন থেকেই সে পারুলকে নির্ভরতার একমাত্র অবলম্বন ও সংকটের পরম সমাধান বলে জেনে আসছে। এমন সব ভাবানার সাময়িক বিরতিতে বউয়ের কপালে চুমু খায় লিঠন। আরেকটা চুমু খেতে মন চাইলেও খেতে পারেনা কারণ সংগমকাল ব্যতীত তারা কখনো চুমু খায় না। এমন অবস্থায় পারুল বেগম কিছুটা লজ্জিত এবং লিঠন কিছুটা বিব্রতবোধ করে। সে-রাতে গ্রামবাসী সংগম করতে ভুলে যায়; বউ-বরেদের ঘুম ভাঙার পর তারা নিজেদেরকে একে অপরের বুকের উপর আবিষ্কার করে। স্মরণাতীত কালে এমন আন্তরিক ঘুম কখনো হয়েছিল বলে তারা মনে করতে পারে না। তাদের ঘুম ভাঙে ফজরের আজানের প্রথম ঘোষণায়। সে প্রভাতে পুরুষেরা সাত-পাঁচ না ভেবে মসজিদ অভিমুখে পা বাড়ায়—মনে হয়, কোনো অদৃশ্য ম্যাজিশিয়ানের প্রবল ম্যাজিকের সম্মোহনী শক্তি—জিপসির পিছে ছোটা একপাল শিশুর মতো ছুটতে থাকা নব্য নামাজিদেরকে সুবহেসাদিকের নরম অন্ধকার গলিয়ে—মসজিদ মুখ এগিয়ে দিচ্ছে। মুরুব্বিরা বলে সেই প্রভাতে তারা স্মরণকালের সবচে বেশি নামাজি হতে দেখেছে। নামাজ শেষে মুসল্লিরা ইমাম সাহেবকে বিশেষ মোনাজাতের অনুরোধ জানায়। বৃদ্ধ ইমাম আহ্লাদে আটখানা হয়ে ৫৩ মিনিট ৫৭ সেকেন্ডের নাতিদীর্ঘ মোনাজাত শেষ করে। যার সারমর্ম এই, আল্লাহ যেন তার পিয়ারে বান্দাদের সকল ধরনের বালা-মুসিবত থেকে রক্ষা করে এবং শয়তানের যাবতীয় কুকর্ম ও প্ররোচনা থেকে হেফাজত করে। বিশেষ মোনাজাতের শেষ পর্যায়ে—প্রত্যেক মুসল্লির মৃত মা-বাপের নানাবিধ গুণকীর্তন পরবর্তী—নাম ধরে ধরে তাদের জন্য জান্নাতুল ফেরদৌস নসিবের আল্টিমেটাম পেশ করা হয়। মোনাজাত শেষে নামাজিদেরকে মসজিদ ত্যাগের দোয়া পাঠাবস্থায় দেখা যায়; যারা পড়তে জানে না তারা অন্তরে পাঁচ মহাসাগর ভক্তিজল ও কণ্ঠ যথাসম্ভব গদগদ করে কলিমায় তয়্যিবা আওড়াতে আওড়াতে মসজিদ ত্যাগ করে—এবং এই ধারা ঘরে পৌঁছানো পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
বিকেলের নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে গ্রামের লোকেরা পুনরায় সমবেত হয়। তারা জানতে পারে অন্ধকার এত ঘনীভূত হবে যে কেউ কাউকে দেখতে পাবে না, চিনতে পারবে না—স্ত্রী স্বামীকে, সন্তান বাবা-মাকে, প্রেমিক প্রেমিকাকে, পড়শী অন্য পড়শীকে… । এসময় কিশোর মুরাদ বলে ওঠে—বুঝিছি হাশরের ময়দানের নেগাল, তাই না কাকা? তাৎক্ষণিক সাদৃশ্যপূর্ণ উপমার সম্মোহনে সমবেত মানুষেরা চমৎকৃত হয়। অথচ এই মাসায়ালা সভাস্থ মানুষদের দুই তৃতীয়াংশ গত জুম্মাবারে শুনে থাকে—বাকিরা প্রায় প্রতি জুম্মাবারে অর্থাৎ তাদের বয়সের সমান শুক্রবার ধরে এই মাসওয়ালা শুনে আসছে। প্রতিবারই বৃদ্ধ ইমাম তার সরু কণ্ঠে জলীয়বাষ্পের অনুপাত কয়েকগুণ বাড়িয়ে—বর্ণনা করেন, মানুষ ইয়া নাফসি ইয়া নাফসি বলে উলঙ্গ অবস্থায় দিগবিদিক ছুটতে থাকবে; কেউ কাউকে চিনতে পারবে না; ইহকালে যারা দিনের পথে—সত্যের পথে থাকবে এবং যারা আল্লাহ রসুলের উপর ইমান রাখবে তারাই কেবল জান্নাতে কাঙ্ক্ষিত মানুষের সাক্ষাৎ পাবে ইত্যাদি ইত্যাদি… ফলত মুরাদের মন্তব্য তাদেরকে বেশিক্ষণ চমৎকৃত রাখতে পারে না। ইতোমধ্যে তারা জেনে যায় আগত দুর্যোগে কোনো ধরণের আলো—হোক সে প্রাকৃতিক, হোক বা কৃত্রিম জ্বালানো সম্ভব হবে না। চাঁদ-সূর্য জ্যোতি গুটিয়ে নেবে—সকল ধরনের বৈদ্যুতিক বাতি অচল হয়ে যাবে এবং কেরোসিন জাতীয় জ্বালানি অ্যারাবিয়ান সুগন্ধিতে রূপান্তরিত হবে।
গ্রামের লোকেরা চূড়ান্ত হতাশার মুখোমুখি হয়—কোনো গায়েবি নির্দেশ পাবে এমন বাসনার নিমিত্তে তারা বিন্দুস্বর নদীতে সিন্নি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিন ৪৩ কেজি দুধ ও ৪৭ কেজি আতপ চালের লবন ছাড়া সিন্নিসহ রফিক মুয়াজ্জিনের কাফেলা নদী অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। গায়ে আতরের ঘ্রাণ, পরনে সবুজ আলখাল্লা, পরিস্কার সুতি কাপড়ের গোলটুপি মাথায়—শাল কাঠের কোঁকড়ানো লাঠি হাতে কাফেলার পথ প্রদর্শক রফিক মুয়াজ্জিন। সিন্নি নামিয়ে গ্রামবাসী কাঁধে কাঁধ মিশিয়ে নদীমুখ হয়ে আরামে দাঁড়ানোর কায়দায় দাঁড়ায়। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলার আগ্রহ পায় না। মুয়াজ্জিন হাতের লাঠিটা এমনভাবে অর্ধেক জল অর্ধেক কূল করে রাখে যে গ্রামবাসীর চোখের সামনে সেটা সাপ হয়ে নদীতে সাঁতার দেয়। প্রথম ডেকচি সিন্নি ঢালা হয় মুয়াজ্জিনের হাত দিয়ে এরপর গ্রামের শিশু-কিশোর-বাল-বৃদ্ধরা একে একে তাদের কোটা পূরণ করে। সিন্নি-ঢালা পরবর্তী কার্যক্রম নদীর নির্দেশনা শোনা। মধ্যরাত পর্যন্ত অপেক্ষার পরেও যখন গ্রামবাসী কোনো ধরনের গায়েবী আওয়াজ শুনতে ব্যর্থ হয় তখন মুয়াজ্জিনের আহ্বানে লোকেরা তাহাজ্জুদের নামাজে দাঁড়ায়। কেবল লিঠনকে কোনো এক অদৃশ্য জাদু বলের প্রভাবে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়—মনে হয়, সে যেন নদীজাত বা নদী তার বহুজন্মের কাঙ্ক্ষিত কামিনী রূপ নারী। বস্তুত নদীর রূপে মুগ্ধ হয়ে নয় বরং সে নদীর মাছেদেরকে জলসীমা অতিক্রম করে—কলাৎকলাৎ ছলাৎছলাৎ শব্দে বালুর উপর উঠে আসতে দেখে। ঝাঁক ঝাঁক মাছ—হাঁটু জলে, পাতা জলে, বালুর উপর—এমনকি মাছদেরকে কূল অতিক্রম করে নামাজিদের দিকে এগোতে দেখা যায়। লিঠনের মনে হয় মাছেরা যেন নামাজিদের সাথে নামাজে অংশ নেবে। সে সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না—সিন্নির তেত্রিশটা ডেকচি তাজা মাছে ভরে ফেলে। আরো মাছ শার্টের পকেট লুঙ্গির কোরচ ও গামছার কোনায় বেঁধে বাড়ি ফিরে আসে। পঙ্গপাল সদৃশ মাছের ঝাঁক নামাজিদের গোড়ালি পায়ের পাতা ও আঙুলে সুড়সুড়ি দিতে থাকলে—দুর্দমনীয় কৌতূহল ও প্রবল সুড়সুড়ি বশত তখনকার মতো নামাজ স্থগিত করা হয়। মুয়াজ্জিন মাছেদেরকে স্বাগত জানিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে পৃথিবী বিস্তৃত এক বিশাল মোনাজাত তোলে—হে পরয়ারদেগার, হে রহমানুর রহিম—তুমার মেহেরবানের শ্যাষ নাই! তুমি মীনরূপে রহমতের ফেরেশতা পাঠাইছো—তুমি করুণার সাগর তুমিই একমাত্র রক্ষাকর্তা! মুয়াজ্জিনের পরবর্তী বক্তব্যের জন্য গ্রামবাসী তার হাড়ভাঙা চোয়ালের দিকে পলকহীন চোখে চেয়ে থাকে। খকখকানি যুক্ত গলা ঝেড়ে নিয়ে মুয়াজ্জিন বলে, মিয়ারা আল্লাবিল্লে হরো,বাড়ি ফিরে চলো আর কোনো বিপদ নাই। আলো আসবিই! আলো আসবিই!
পুরুষেরা নদী থেকে ফিরেই বউদের কোলে ঢুকে—একটানা চারদিন তিনরাত কাটিয়ে দেয়। এসময় তাদের সংগমকালীন ক্লান্তি ও ক্ষুধার কথা মনে পড়ে না। এমন সুযোগে পান্নু শেখের বড় ছেলে এবং লিঠনের মেঘ-রঙা যুবতী বোনকে পরপর তিন সন্ধ্যা ঝিঁঝিঁপোকা হয়ে যেতে দ্যাখে ফিরোজ মিয়ার শ্যামলা রঙের গাই গরুটা। এই রূপান্তরের খবর গ্রামবাসীর কাছে ওয়াজ মাহফিলের শেষরাত পর্যন্ত অজ্ঞাত থেকে যায়। গ্রামবাসী সংগম থেকে উঠে প্রথমে ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করে কিন্তু সংগত কারণে তাদের সংগ্রহে কোনো রুচিসম্মত খাবার থাকে না। এসময়ের মধ্যে সারা গ্রাম আঁশটে গন্ধে ছেয়ে যায়—মনে হয় সারা গ্রাম যেন বিশাল এক জেলেপল্লি। গ্রামবাসীরা মাছের গন্ধ লক্ষ করে একযোগে লিঠনের বাড়িতে উপস্থিত হয় এবং লুটপাট শুরু করে। আকস্মিকভাবে সংগ্রহের সমুদয় সম্পদ হারিয়ে মুষড়ে পড়ে লিঠন। এসময় তার সব ব্যথার সমভাগিদার—সদ্য সন্তানবতী পারুল বেগম অন্তরে অসীম সহানুভূতি ও প্রেম নিয়ে তার স্ফীত ও ব্লাউজ ফাটোফাটো বুকে স্বামীর মুখটা ঈষৎ চেপে ধরে। সমূহ অন্ধকারের সূচনা পর্বে লিঠন আলো ঝলমল ঐশ্বর্যমণ্ডিত এক বিশাল খাদ্য সম্ভার আবিষ্কার করে এবং সেখানে আলত করে নাক ঘষতে থাকে। কাঁচা দুধের গন্ধ—দুরতিক্রম্য ক্লান্তি ও হতাশায় প্রাকৃতিক প্রতিশেধক হিসেবে নিরব ডোজ প্রয়োগ করে—তার ভেতরের আদিম ক্ষুধার্তটিকে পুনরায় জাগিয়ে তুললে বউকে পাঁজকোলে করে খাটে শোয়ায় লিঠন। সেদিন তাদের সংগমকালীন চিৎকার চেচামেচি গ্রামের শেষ ঘরের লোক পর্যন্ত শুনে থাকে। পারুলের বুকের উপর থাকা অবস্থাতেই লিঠন শিশু খাদ্যের অর্ধ অংশ নিজের অধিকারে নিয়ে নেবে বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বাপের এই দখলিদারী মানুষিকতার বিরুদ্ধে সদ্যজাত কোনো প্রতিবাদ করে কিনা জানা যায় না। তবে বরফে রূপান্তরের আগে একবার তার রক্তশূন্য কোমল পা বাপের সিনায় ছুঁড়ে দিয়ে থাকবে; সেদিন বাপ সন্তানের কচি পা দুটি করতলে রেখে অন্ধকারের ভেতর পরপর সাতটা চুমু খাবে।
মাছ লুটের সাতাশ ঘণ্টা পর বুধবার বিকেলে সালাম ব্যাপারি ঝোঁপের আড়ালে প্রথম টুকরো অন্ধকার আবিষ্কার করে—সে ঝোঁপ সামনে রেখে প্রস্রাব করতে বসেছিল। চোখের সামনে অন্ধকারের টুকরোটাকে আয়তন বৃদ্ধি করতে দেখে ভয়াবহ আতংকে তার মুশলধার প্রস্রাব থেমে যায়। সে ঝুলে থাকা আলু ফলের মতো হোলটাকে কোনমতে লুঙ্গিতে ঢেকে হাফাতে হাফাতে বাড়ি ফিরে আসে—গ্রামের লোকেরা তখনই ব্যপারটা জেনে যায়। তারা জরুরি আলোচনা সভার প্রয়োজন অনুভব করে এবং তাদের বুঝতে বাকি থাকে না যে গত দিনের সিন্নিতে বিন্দুস্বর ও তার আল্লায় যথেষ্ট সন্তুষ্ট হতে পারেনি। সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক—দুর্যোগ মোকাবেলার চূড়ান্ত প্রস্তুতি হিসেবে প্রত্যেক পরিবার একটা করে আলো ধরে রাখার সিন্দুক নির্মাণ করবে; গ্রামবাসী খামারে জোনাকি পোকার চাষাবাদ শুরু করবে এবং পরপর তিনরাত ইসলামি জলসার আয়োজন করা হবে। মাহফিলের বদলে কবিগান, গাজিগান বা বাউলগানের আয়োজন করা যায় কিনা বলে একটা নাতীভীরু প্রস্তাব রাখে ফকির মুন্নাফ; তার প্রস্তাব অধিকাংশ সভাসদের মন প্রাথমিকভাবে ছুঁয়ে গেলেও রফিক মুয়াজ্জিনের গর্জনে সবাই মাটির কলস হয়ে যায়। মুয়াজ্জিন পাঞ্জাবির ভেতরের বাঘটাকে সামনে রেখে দাঁত খিঁচিয়ে বলে, মিয়ারা আল্লাবিল্লে হরো ওসব বেশরিয়তী চিন্তা মাথাত্তে সরাও নাহলি ধ্বংস হয়ে যাবা! বিশ্বাস রাহো— আন্ধার দিবি যে আল্লা আলোও দিবি সেই আল্লা। ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হলে গ্রামের আবালবৃদ্ধবনিতারা বিভিন্ন আকৃতি ও রঙের মাথা দিয়ে মাহফিলে ময়দানের সৌন্দর্য বর্ধনে অংশ নেয়। কিন্তু লিঠনের ছোটো বোন ও পান্নু শেখের বড় ছেলেকে এক মুহূর্তে জন্যেও মাহফিল ময়দানে কেউ দেখে থাকে না।
বৃহস্পতিবার সকালে গ্রামবাসী সরজিৎ কর্মকারের বাড়ি যায়। কর্মকার তখন টকটকে লাল একখণ্ড লোহার টুকরো চিমটিতে ধরে ফোসসস করে চাড়ির পানিতে ডুবিয়ে দেয়। আলো ধরে রাখা যায় এমন প্রকার সিন্দুক গড়ে দেওয়ার জন্যে গ্রামবাসী তাকে অনুরোধ জানালে—মুখখানা কাকের বাসার অনুরূপ করে কর্মকার বলে, আমিতো এমন সিন্দুক বানাতি পারিনে দাদা।
তালিপরা এদ্দিনধরে কি মানষির ধন বানানু শিখছির?—গ্রামবাসীদের একজন মেজাজ হারিয়ে জানতে চায়। কর্মকার দোকানে ঝোলানো বিশ্বকর্মার ছবির দিকে একবার তাকায় এবং কণ্ঠে প্রবল শক্তি সংযোজন করে বলে—শেষ পর্যন্ত সে সিন্দুক বানানোর চেষ্টা চালিয়ে যাবে। সিন্দুক পাওয়ার মোটমুটি আশ্বাস পেয়ে গ্রামের লোকেরা বাড়ি ফিরে ব্যাপকভাবে জোনাকিপোকার চাষাবাদ শুরু করে। তারা যথেষ্ট স্বস্তি অনুভব করতে পারে না। তাদের মন কেন্দ্র থেকে ভাঙতে শুরু করে কেননা, জোনাকির আলো সংরক্ষণ প্রকল্পে—বিন্দু পরিমাণ সাফল্য দেখাতেও তারা ব্যর্থ হয়। এসময় গ্রামের লোক খেতে, সংগম করতে ও মসজিদে যেতে সাময়িক ভুল করে। সরিজিৎ কামার তার এযাবৎ কালের অর্জিত অভিজ্ঞতার সবটুকু দিয়েও আলোর গতিপ্রকৃতির উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আনতে ব্যর্থ হলে গ্রামবাসীদের সিন্ধুক নির্মাণের খায়েশ ব্যপকভাবে আহত হয়।
পরদিন সকালে কিংকর্তব্যবিমুঢ় গ্রামবাসী গালে হাত রেখে বারান্দায় বসে। এভাবে বসা পুরুষদের মধ্যে ফকির মুন্নাফ করুণ কণ্ঠে গান ধরে, পারে লয়ে যাও আমায়… পাশ থেকে তার খেতাবী ঝগড়াটে বউ কণ্ঠে তীব্র ঝংকার তুলে বলে, শয়তান চুদা বিটার মুহি আল্লা নবীর নাম নাই, দিনরাত খালি গান আর গান! তুই কি গান নিয়ে কয়বরে যাবিরে বুড়া? অন্য পুরুষদের মতো মাগিকে আচ্ছা করে ধুলাই দিতে ইচ্ছা হয় ফকিরের—কিন্তু পারে না। সেদিন থেকে মুন্নাফের বৌ তার স্বামীর কণ্ঠে আর কখনোই গান শুনতে পায় না। এমতাবস্থায় সালাম ব্যাপারি বাজারের সবগুলো বৈদ্যুতিক বাল্ব জোড়া দিয়ে একান্ন’শ ওয়াটের সমান আলো দেওয়া একটা বাতি প্রস্তুত করে। গ্রামবাসীদেরকে আবার আস্বস্ত হতে হয় কারণ বাল্বের আলো ব্যাপারি বাড়ি অতিক্রম করে গ্রামের প্রায় প্রত্যেক ঘরে পৌঁছে যায়। মধ্যবয়সী বউয়ের ভাঁজপড়া কোমরে আড়চোখ রেখে মৃদু হাসে কুটিমিয়া। সে সন্ধ্যায় সাধনা ঔষধালয় থেকে দুই ফাইল যৌনশক্তিবর্ধক মাধুপুরী এনে বউকে আগাম যুদ্ধের ইঙ্গিত জানিয়ে দেয় কুটিমিয়া। পুটকের মা কুটিমিয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ফিরতি হাসি দিয়ে ঘরে ঢোকে।
সেদিন কী বার ছিল গ্রামের মানুষ তা স্মরণ করতে পারে না কিন্তু এর ঠিক তিন দিন আগে গ্রামের হাটবার ছিল এবং নিশ্চত করে বলা যায় সেদিন ছিল মঙ্গলবার; যেদিন পান্নু শেখের বড় ছেলে এবং লিঠনের ছোট বোনকে শেষ বিকেলে পুকুরপাড়ে মুখোমুখি দাঁড়ানো দেখতে পায় পারুল বেগম এবং তারা দুজন বিপরীত দিকে চলে গেলে সেখানে ১৩ ফোঁটা চোখের পানি দেখতে পাওয়া যায়—যা ক্রমশ পুকুরের জলের দিকে গড়াচ্ছে। অতলস্পর্শী অন্ধকারে গ্রাম সম্পূর্ণভাবে অবগাহন করতে শুরু করলে গ্রামের লোক চূড়ান্তভাবে দিন-তারিখ ভুলে যেতে থাকে। টানা রাত নামার সপ্তাহখানেক পর সময়ের কোনো এক অংশে ফকির মুন্নাফের স্ত্রী একটা গান শোনানোর জন্য স্বামীকে অনুরোধ জানায়। স্ত্রীর কণ্ঠে এমন দরদ মেশানো অনুরোধ সে ৪৩ বছর বিবাহিত জীবনে আজ প্রথমবারের মতো শুনে থাকে কিন্তু সেদিন মুন্নাফের ঘর থেকে গানের সুর শুনতে পায় না কেউ—হুঁহুঁ কান্নার দীর্ঘ ফোঁপানো আওয়াজ ছাড়া। তার মুর্শিদ অগতির গতি না দিয়ে; নিজ নামে অখ্যাতি রেখে চুপ মেরে আছে বসে আছে শূন্যের ঘরে। তারে আর ধন্যধন্য বলতে পারে না মুন্নাফ। ভানু বহু আগে পাটে বসেছে, মুন্নাফ তার স্ত্রীকে নিয়ে অপারেই থেকে যায়।
অন্ধকার নামার দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে গ্রামে তুষারপাত শুরু হয়। ক্রমাগত তুষারপাতের কারণে গ্রামের লোকদের মনে হতে থাকে তারা যেন অনন্তকাল ধরে সর্বব্যাপী বরফের হিম আলয়ে বাস করে আসছে। তারা আলোর স্বাদ হারিয়ে ফেলে—তাদের মনে হয় পৃথিবীতে কখনো দিন ছিল না, আলো ছিল না, তাপ ছিল না… আলো ও আগুনের শেষ উপকরণ অন্তর্ধানের ২৭তম দিনে গ্রাম পুরোপুরি শব্দহীন হয়ে যায়। এমন সূচিভেদ্য শীতল অন্ধকারে লিঠন নিজের ঠোঁটকে আবিষ্কার করবে কিচমিচ আকৃতির শীতল এক বরফ কুচিতে—এটা যে তার বৌয়ের স্তনের বোটা তা অনুমান সামান্য সময় লাগে। সন্তানের সাময়িক স্থাবর সম্পদে মুখ রেখে সে সাতাশ দিন শরীরের তাপ ধরে রাখতে সক্ষম হয়। লিঠন অনুভূতির শেষ অংশ দিয়ে বৌয়ের ৫ ফুট ২ ইঞ্চি শরীরকে একবার হাতড়িয়ে দেখে—তখনো হয়তো বৌয়ের শরীরে সামান্য তাপ অবশিষ্ট ছিল অথবা ছিল না। সে সন্তানের শরীর ছুঁয়ে দেখে—যাকে একটা আয়তকার বরফক্ষেত্রের মতো মনে হয়। লিঠন শেষবারের মতো সন্তানের বরফ জমা কপালে তার জমে যাওয়া করতল রাখে। সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে একবার চিৎকার করে কাঁদার ইচ্ছা হয় লিঠনের কিন্তু পারে না। অনুভূতি যে সম্পূর্ণ বরফের মতো তখনো জমে যায়নি তা নিশ্চিত হওয়া যায় রফিক মুয়াজ্জিনের কথা মনে পড়ায়। রফিক মুয়াজ্জিন সম্পর্কে বাজারের প্রথম সমাবেশে পান্নুশেখ যেন তার হয়েই মন্তব্যটা করেছিল কিন্তু আজ লিঠনের তেমন মনে হয় না—সে আর দাড়ে শালা বলে মুয়াজ্জিনকে গালি দিতে পারে না। মুয়াজ্জিনের জন্য অসীম সহানুভূতিতে মন ভরে ওঠে, লিঠন ভাবে একটা পূর্ণ জীবন এমন অটল বিশ্বাসে কাটিয়ে দেওয়া কেবল বিশ্বাসী মানুষের পক্ষেই সম্ভব অথচ শেষ আলোর দেখা কেউই পায় না। বিশ্বাসের প্রসঙ্গ মনে আসাতে তার হাসতে ইচ্ছা হয়—হয়তো ঠোঁটের কোণার শীর্ণ জলরেখার মতো একটু হাসি দেখা গিয়েছিল। তাতে এতোটা বিদ্রুপ ছিল যে, তা গলে নুহুর প্লাবন হতে পারতো। লিঠন পারুলের বিশাল বরফ শরীর নিজের দিকে আকর্ষণের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। সমুদয় শক্তি পুঞ্জিভূত করে মাথাটা সামান্য উপরে তোলে লিঠন। কয়েক মুহূর্ত মুখে চেয়ে থেকে বৌয়ের ঠান্ডা গালে শেষবারের মতো চুমু খায় সে।