সাইফুল চৌধুরী >> শেকল >> জীবনের গল্পস্বল্প >> ছোটগল্পের বিশেষ সংখ্যা

0
443

সাইফুল চৌধুরী >> শেকল

পার্কের বেঞ্চে বসে আছে মৃণাল। মফস্বলের একটি শহর। এখানে ডাক্তার হিসাবে এসেছে কিছুদিন আগে। বান্দরবানের এই পাহাড়ি উপজেলার এক দুর্গম এই অঞ্চলে তার পোস্টিং। আশেপাশে তেমন কোন বিনোদনের জায়গা নেই। প্রতি শনিবার সে এখানে আসে, একটু বসে, প্রকৃতি দেখে সময় কাটায়। পার্কটা তার অফিসের পাশে, ছোট, অল্প কিছু বেঞ্চ বসানো আছে।
‘বসতে পারি?’ লোকটার দিকে তাকাল মৃণাল। বয়স্ক একজন ভদ্রলোক। একটু অবাক হল। লোকটাকে লোকাল মনে হচ্ছে না। এখানে আউটসাইডার যারা আছে তাদের প্রায় সবাই-ই সরকারি কর্মকর্তা। তাদের কেউ ফ্যামিলি নিয়ে এখানে আসবে না।
‘বসতে পারেন’, বেঞ্চে অনেক জায়গা । আসেপাশে আরও বেঞ্চ আছে, খালি। মনে হচ্ছে লোকটা কথা বলার জন্যই পাশে বসতে চাচ্ছে।
বসুক, এই কয়দিন প্রতিদিন একই মানুষ দেখতে দেখতে সেও হাঁপিয়ে উঠেছে।
‘বসুন।’
‘আপনি কি এখানে নতুন? আগেতো কখনও দেখি নি!’
‘জি, নতুন। আমি এখানকার নতুন ডাক্তার ।’
‘সত্যি! এখানেতো কোন ডাক্তার আসতে চায় না। এ রকম একটা অজ পাড়াগাঁয়ে, কে আসবে। এর আগেতো শুধু একজন নার্স ছিল। দুই একজন লোকাল সহকারী । এখনতো সরকারের কারণে একজন ডাক্তার প্রায়ই থাকে। তবে একবছর পর পর বদলি হয়ে যায়, কেউ থাকতে চায় না। আপনাকে ধন্যবাদ এখানে আসার জন্য।’
‘আপনি কি এখানে থাকেন?’
‘বলতে গেলে আসলে এখানেই থাকি, অনেক বছর হল।’
‘তাই, আগে কোথায় থাকতেন?’
‘আসলে আমি ঢাকায় থাকতাম। বেশ অনেক বছর আমেরিকায় ছিলাম।’
মৃণাল একটু নড়েচড়ে বসল। ফালতু লোক মনে হচ্ছে না। আমেরিকা থেকে এসে এখানে পড়ে আছে। খুন-টুন করে এখানে পালিয়ে আছে নাতো? নাহ, এটা হলে এখানকার ওসি সাহেব নিশ্চয়ই অনেক আগেই বের করে ফেলত।
‘এখানে আমার একটা বাংলো আছে। আগে মাঝেমধ্যে এসে থাকতাম। এখন চলে এসেছি একেবারে। আসলে আর যেতে পারছি না।’ বলে লোকটা একটা রহস্যময় হাসি দিল। কেমন যেন একটা চাপা বেদনা মুখে। ‘ঐ যে দূরে বাড়িটা দেখছেন, ওটা আমার বাসা। এত দূর থেকেও পাহাড়ের উপরে বিশাল বাংলোটা দেখা যাচ্ছে।’
‘তাই নাকি! আমি শুনেছি ওটা একটা পরিত্যক্ত বাড়ি।’
‘আরে না, আমি নিজে খুব দেখেশুনে রাখি না, তাই বাইরে থেকে এরকমটা মনে হয়। এছাড়া স্থানীয়রা আমার এখানে এসে বাড়ি করে থাকা পছন্দ করে নি কখনো। আজেবাজে কথা বলে বেড়ায়। আচ্ছা, আপনি কি এখানে প্রতিদিন আসেন?’
‘আরে না, আজকে আসলাম। এই পাশে একটা চমৎকার পার্ক আছে, তা জানতাম না। তবে শনি অথবা রবিবার আসার চেষ্টা করি। ছয়দিন আমি মেডিক্যাল সেন্টারে থাকি।’
‘আপনার কী গল্প? এখানে পড়ে আছেন কেন?’
হাসল লোকটা, ‘গল্পটা শুনতে চাইলে বলতে পারি।’
‘বলুন, আপাতত কোন সমস্যা নেই। বই পড়ে সময় কাটাই। আজ না হয় আপনার গল্পই শুনলাম।’
‘আসলে আমি এবং আমার স্ত্রী খুবই ঘুরতে পছন্দ করতাম। আমার স্ত্রী খুবই ড্যাশিং টাইপের। সে পছন্দ করত পাহাড়। হাইকিং করা তার হবি ছিল। অনেক জায়গায় আমরা ঘুরেছি, দেশে বিদেশে। এই জায়গাটা কেন জানি আমার স্ত্রীর এত পছন্দ ছিল, কেন তা জানি না। আমি এখানে তাকে নিয়ে অনেক বার এসেছি। আমার বাবা ছিল বাংলাদেশের একজন বিশাল ধনী ব্যবসায়ী । আমি বাবার একমাত্র ছেলে। বাবা মারা যাওয়ার পর আমার হাতে অফুরন্ত টাকা। আমি এখানে একটা বাংলো বানিয়ে রাখলাম। প্রতি একবছর পর পর আমি এবং আমার স্ত্রী আসতাম এখানে বেড়াতে।’
মৃণাল মনে মনে একটু হাসল। মনে হচ্ছে সেই পুরনো প্রেমের গল্প। স্ত্রী বিয়োগের পর বিবাগী হয়ে যাওয়া। ছয়মাস হল তার স্ত্রী বিয়োগ হয়েছে। তার নিজেরই জীবনে তীব্র অশান্তি, নিজেই পোস্টিং নিয়ে সে এখানে এসেছে। সবকিছু ভুলে থাকতে চায় সে।
‘বাবা মারা গেল। আমার হাতে সব সম্পত্তি। আমার মা আগেই মারা গিয়েছেন। তারপরও আমরা প্রতি বছর আসতাম। সে বার আমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা । আট মাসের সময় তার শখ হল, সন্তান জন্মের আগে সে এখান থেকে ঘুরে যাবে। আমি মানা করেছিলাম, শুনেনি, অবশ্য আমি জানতাম সে শুনবে না। আমরা আসলাম, কয়েকদিন বেশ ভালই গেল। খুব বেশি হাঁটাচলা করতে মানা করেছিলাম। কিন্তু তার যে স্বভাব, সে কি আর আমার কথা শোনে! আমাদের ডাক্তার এখানে আসতে মানা করেছিল। বলেছিল, এটা একটা হাই রিস্ক প্রেগ্নেন্সি। কিন্তু হটাৎ করে তার প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হয়ে গেল। এখন যেমন হেলিকপ্টার, মোবাইল ফোনের যত্রতত্র ব্যবস্থা, আগে সেটা ছিল না। যাই হোক, আমার কিছু করার ছিল না, আমি হুড়াহুড়ি করে নিয়ে গেলাম হেলথ সেন্টারে। ৩৫ বছর আগের ঘটনা। তখন কোন ডাক্তার ছিল না, একজন শুধু নার্স আর একটা স্থানীয় মেয়ে আয়া হিসাবে কাজ করে।’
মৃণালের মুখ একটু গম্ভীর, ‘তারপর?’ লোকটা একটু অবাক হল মৃণালের অখণ্ড মনোযোগ দেখে। ‘আসলে এত মনোযোগ দিয়ে কেউ আমার গল্প শোনে না, আপনি শুনছেন তাতেই আমি খুশি।’
‘আমি প্রচণ্ড অস্থিরতায় বাইরে অপেক্ষা করছি, নার্স আমার স্ত্রীকে ভিতরে নিয়ে গেল। আরেকটা বেশ কম বয়সী লোকাল মেয়ে দেখলাম, তারও বাচ্চা হবে। একজন বয়স্ক মহিলা দেখলাম সাথে, আর কাউকে দেখলাম না। আমি অস্থির হয়ে হাঁটাহাঁটি করছি। বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনলাম, মনে হচ্ছে। কিন্তু কেউ বের হয়ে আসছে না। প্রায় ঘন্টাখানেক পরে নার্স বের হয়ে আসল। তার সারা মুখে আতঙ্ক, সে তোতলাতে লাগলো, তারপর অস্ফুটে বলল, আমার স্ত্রী আর নেই। আমি চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়লাম, বললাম, আমার বাচ্চা! দেখলাম, নার্স আমার দিকে না তাকিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে, বলল আপনার ছেলেটা, সে প্রসবের সাথে সাথে মারা গেছে। আমি দুঃখিত, আপনার স্ত্রীর ব্লাড প্রেশার এত উপরে চলে গিয়েছিল, আমরা আর বাঁচাতে পারলাম না। ছেলেটা হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই মারা যায়। আমাদের এখানে যদি আরও উন্নত ব্যবস্থা থাকত তাহলে বাঁচাতে পারতাম।’
আমি ভেতরে ঢুকলাম, আমার স্ত্রী নিথর হয়ে পড়ে আছে বেডে। মনে হচ্ছে মাঝখানে পর্দা দিয়ে ঘেরা দুটি রুম। মরা বাচ্চাটা পাশে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আমি হাউ মাউ করে কেঁদে উঠলাম।
হটাৎ করে বাচ্চার কান্নার শব্দ শুনে লাফ দিয়ে উঠলাম। মনে হচ্ছে পাশের বেডে কম বয়সী মেয়েটার বাচ্চা হয়েছে।
আমি লাশ ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার চিন্তা করলাম। আমার বাবা এবং মা মারা গেছেন। আমার স্ত্রীর বাবা মা কেউ বেঁচে নেই। আমি ভাবলাম, আমার স্ত্রীর এত ভালবাসার জায়গা, এখানেই আমি তাকে সমাহিত করব। আমি তাকে এবং আমার বাচ্চাকে আমার বাংলোর পেছনে কবর দিলাম।
মৃণাল একটু চুপ করে রইল, বলল, ‘তারপর?’
আমি একসপ্তাহ ওখানে থাকলাম। ঢাকায় ফিরে আত্মীয়-স্বজনকে জানালাম। আমি প্রতিরাতে স্বপ্ন দেখতাম স্ত্রী আর ছেলেকে। তারা আমাকে বলছে, আমরা ভাল আছি, তুমি আমাদের কাছে চলে আসো। স্বপ্ন আমার রুটিনের মতো হয়ে গেল। মাঝেমধ্যে মনে হত আমরা বাসায় একসাথে মুভি দেখছি, আর বাচ্চাটা আমার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। আমি বুঝলাম, আমি সিজোফ্রেনিক হয়ে পড়ছি। আমাকে এর থেকে বের হতে হবে। সব কিছু গুছিয়ে চলে এলাম আমেরিকাতে। আমেরিকাতেই আমার জন্ম। বাবার পড়াশোনার সময় আমার জন্ম হয়েছে সেখানে। আমার প্রাণ-রসায়নের উপর আমেরিকাতে পড়াশোনা, পরে আবার বাবার চাপে এমবিএ করেছিলাম লন্ডন থেকে। আমেরিকাতে এসে ডাক্তারি পড়লাম জন হপকিন্সে। ফেলোশিপ করলাম, নিউরো সার্জারির উপর। আমি ব্যস্ত থাকতে চাইতাম, সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রমের পর বাসায় ফিরে আসতাম।
‘সন্ধ্যা হয়ে আসছে’, মৃণাল বলল। আমার বাসায় ফিরতে হবে। কাল রবিবার আপনার গল্পটা শুনব।
‘ধন্যবাদ। আমার অফুরন্ত অবসর। তাহলে গল্পটা কালই শোনাব। আপনি একমাত্র মানুষ যাকে আমি আমার গল্পটা বলতে পারছি। কেউতো শুনতেই চায় না।’
‘না, আমি শুনব। একই সময়ে চলে আসব।’ যেতে যেতে পিছন ফিরে তাকায় সে। লোকটা এখনও বেঞ্চে বসে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।
মৃণাল একটু চিন্তা করল। লোকটার কথা কি সত্যি! আমেরিকার একজন অভিজ্ঞ নিউরোসার্জন এই দুর্গম এলাকায় পড়ে আছেন। হয়ত লোকটার সিজোফ্রেনিয়া এখন ভাল পর্যায়ে চলে এসেছে।
রবিবার দিন মৃণাল একটু অবসর থাকে। একজন নার্স আছে মেডিক্যাল সেন্টারে। যদি কোন ইমারজেন্সি কেস আসে, তাকে কল করা হয়। সকালে তার মায়ের সাথে কথা হল। মায়ের শরীর খুবই খারাপ। ৮০ বছর, তার এখানে আসাটা তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার পারিবারিক সমস্যাও মাকে অস্থির করে রেখেছে।
সব সময় ফোন করে বলে, ‘বাবা, তুমি চলে আস। আমি যে কোন সময় চলে যেতে পারি।’ মৃণাল কষ্ট পাচ্ছে। আপাতত সে ঢাকায় থাকতে চাচ্ছে না। তার স্ত্রীর আত্মহত্যা তার সমস্ত পৃথিবীকে ওলটপালট করে দিয়েছে। তীব্র মনোবেদনায় আছে সে। মনে হচ্ছে সবাই তাকে নিয়ে তামাশা করছে। আপাতত সে এখানে থাকতে চায়, তারপর বিদেশে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা তার।
রবিবার সারাদিন তেমন কাজ ছিল না। রান্না করার লোক আছে। অনেক বই নিয়ে এসেছে, পড়বে বলে। এছাড়া মেডিক্যাল সেন্টারের জন্য গাড়ি আছে। একজন ড্রাইভার আছে। কল করলে চলে আসে। বিকালের একটু আগে পার্কে গিয়ে বসল। লোকটাকে কোথাও দেখছে না। একটু পর দেখল, লোকটা আসছে। মৃণাল লোকটাকে একটু ভালমতো লক্ষ করল। অনেক লম্বা, চমৎকার চেহারা, সফেদ দাড়ি। ভাবলেশহীন একটা চেহারা, কেমন জানি রোবটের মত। মনে মনে ভাবল, তার চেহারার মধ্যেও কি একই ভাব বিদ্যমান!
পাশে এসে দাঁড়াল লোকটা। মৃণাল বলল, ‘বসুন’।
‘ভাবি নি আপনি আজকে আসবেন। সাধারণত কেউ আমার সাথে কথা বললে পরের দিন এড়িয়ে যায়। অবশ্য এখানে যারা আসে, তারা সবাই স্থানীয়। এছাড়া আপনি ডাক্তার, আরেকজন ডাক্তারের সাথে কথা বলতে ভাল লাগবে। আমাদের এখানে আর ডাক্তার নেই। আপনি মাঝেমধ্যে ভলান্টিয়ার হতে পারেন মেডিক্যাল সেন্টারে।’ লোকটা হাসল।
‘যাই হোক, আপনার নামটি জানা হয়নি। আচ্ছা, আমার নাম আরশাদ হোসেন।’
‘আমার ডাক নাম মৃণাল, আসলে সবাই আমাকে ডাক্তার শিহাব জামান হিসাবে জানে।’
‘আপনার গল্পটি শেষ করুন, শুনি।’
‘আজকে আমি যা বলব, হয়ত আপনি বিশ্বাস করবেন না। বিশ্বাস না করাটাই স্বাভাবিক।’
‘যাই হোক, আমি ব্যস্ত নিউরো সার্জন হিসাবে রাতদিন কাজ করতাম। আমার জীবনে আর কাউকে চিন্তা করতে পারতাম না। প্রতিটা দিন আমি আমার স্ত্রীর কথা ভাবতাম। ভাবতাম, আমার ছেলেটা বড় হয়ে দেখতে কেমন হত। নিউরো সার্জারির এই কাটাকুটি থেকে হটাৎ করে আমার সোজা বাংলায় বলা যেতে পারে ভূত চাপল আমার মাথায়। আমাদের এই শরীর, এই পৃথিবী, মহাবিশ্ব সবই একের সাথে একের পরিপূরক। আমাদের এই ফিজিক্যাল বিশ্বের সবকিছু আবেগ-অনুভূতি, দুঃখ-কষ্ট সবকিছু আমাদের জীবনের এক একটি ডায়েরি। এর সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তিন পাউন্ডের ওজনের জেলির মত একটি বস্তু, আমাদের ব্রেনের মাধ্যমে। আপনার দাঁত ব্যথা হল, আপনার বাচ্চা হওয়ার আনন্দ, আপনি একটা ভাল খাবার খেয়ে যেই তৃপ্তি পাচ্ছেন এই সব অভিজ্ঞতাই বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় কনশাসনেস। আপনাকে হয়ত এত লেকচার দেয়ার প্রয়োজন নেই। এখন এই বিষয়ে আমরা অনেক কিছু জানি, তখন এত গবেষণার অগ্রগতি ছিল না। তবে এই কনশাসনেসের সাথে আমাদের ব্রেনের কী কী পরিবর্তন এবং কোথায় হচ্ছে এটা নিয়ে আজকাল অনেক গবেষণা হচ্ছে। আমাদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা এই ব্রেনের মেমোরিতে জমা হচ্ছে। কিন্তু আবার মুছেও যাচ্ছে। ধরেন, আপনার কম্পিউটারে আপনি কোন ওয়েবসাইটে যাচ্ছেন, আপনার ফেসবুক প্রোফাইল, এইসব বিষয় থেকে আপনার সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়া যাবে। কিন্তু এই জিনিষগুলো ধীরে ধীরে আপনার কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে জমা হচ্ছে। কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে যেমন তথ্যগুলো জমা থাকে, ব্রেনের ক্ষেত্রে আমাদের কনশাসনেসের এই অনুভুতিগুলো অনেক জটিল। আমি ভাবলাম, আমাদের ব্রেনের এই তথ্য, অনুভূতিগুলো যেমন জমছে, তেমন ভাবে, অবশ্যই প্রতিদিন কোন না কোনভাবে কোথাও ডাউনলোড করা হচ্ছে। তার মানে আপনাকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। এই ফিজিক্যাল বিশ্বের সাথে আমাদের অদৃশ্য না দেখা বিশ্বের জীবিত অবস্থায় যোগাযোগ আছে। বৈজ্ঞানিক উপায়ে কি এটা প্রমাণ করা সম্ভব? এই ক্লাউড মেইন সার্ভারের লোকেশনটা কোথায়, কিভাবে এর অস্তিত্ব প্রমাণ করা যায়? এটা বিজ্ঞানের বিষয় হিসাবে কখনোই স্বীকৃতি পায় নি, সব সময়ে প্যারা নরমাল বিষয়ের অংশ। ধর্মবিশ্বাসীরা আত্মা, পরবর্তী জীবন, বেহেস্ত কত কিছুতেই বিশ্বাস করে। আসলে যে কোন মানুষ আমাকে পাগল ভাববে। আমি সত্যিই পাগল হয়েছিলাম, আমার স্ত্রী আমাকে কি মিস করে, আমার বাচ্চাটা এখন দেখতে কেমন? আমি যেহেতু অজ্ঞেয়বাদী, মানে এটা থাকতেও পারে অথবা নাও পারে, এই মতবাদে বিশ্বাসী।
আমি অনেক কাজ শুরু করলাম। আমি যেহেতু নিউরোসার্জন, আমার কাছে প্রচুর রোগী আসত, যাদের মধ্যে অনেকে কোমায় চলে যেত। এছাড়া এনডিএ বলে একটা কথা আছে, নিয়ার ডেথ এক্সপেরিয়েন্স, অনেকে মৃত্যুর দুয়ার অথবা মরার কিছুক্ষণ পরে ফিরে আসে। এ নিয়ে এখন প্রচুর খবর আজকাল পাবেন। ওইসময় এই ধরনের গবেষণা তেমন ছিল না। এখন অনেকে দাবি করছেন তারা এনডিএ থেকে ফিরে এসেছেন, তাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন। আমি ব্রেনের সাথে কিছু ইলেকট্রোড দিয়ে এই রোগীদের ব্রেনের পরিবর্তনটা দেখতাম। আমার ধারণা ছিল ব্রেনের ভাইব্রেশন এবং ফ্রিকোয়েন্সির সাথে বাইরের পরিবেশের কোন একটা ফিকোয়েন্সির ইকুইলিব্রিয়াম আসতেই হবে এই তথ্যগুলো ট্রান্সপোর্ট হওয়ার জন্য। এর সাথে যারা রেগুলার নরমাল সার্জারির জন্য আসত তাদের নিয়ে একটা কন্ট্রোল গ্রুপ তৈরি করলাম। আমি একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ফেলোও হায়ার করলাম। আশেপাশের পরিবেশের কী পরিবর্তন হচ্ছে তার বিভিন্ন ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যাল দেখতাম। কিন্তু ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ এত বেশি যে সত্যিই কোন কিছু নির্ণয় করা সম্ভব হত না। পরে আমার ফেলোকে নিয়ে আমরা কিছু রুমকে নয়েজ প্রুফ করলাম। শুধুমাত্র রাত্রে এটাকে আমরা সচল রাখতাম। একবছর পরে, আমার ফেলো বলল, সে কিছু একটা বুঝতে পারছে। সে বলল শুধু একটা ফ্রিকোয়েন্সি না বেশ কিছু ফ্রিকোয়েন্সির একটা ওভারল্যাপ সে দেখতে পাচ্ছে, তার সাথে রোগীর ব্রেনের কম্পনের কিছু সামঞ্জস্য দেখতে পারছে। আমি উত্তেজিত হয়ে পড়লাম। একটা বছর অক্লান্ত পরিশ্রমের পর আমরা একটা ডিভাইস তৈরি করতে সক্ষম হলাম। এটা মাথার কনশাসনেসের যে কিছু জায়গা আছে তার সাথে ইলেট্রোড সংযোগ করে বাইরের এই ফ্রিকোয়েন্সির সাথে ইকুইলিব্রিয়ামে আনা যাবে। আমার ফেলোর অত্যন্ত উৎসাহ ছিল এতে। প্রথমে আমি একটা বানরের উপর চেষ্টা করলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, ওই ফ্রিকোয়েন্সিতে আনার সাথে সাথে বানর ডিপ কোমায় চলে গেল। কিন্তু আর বাঁচল না। আমরা দুজনেই খুব হতাশ হলাম। এরপর আমি সবচেয়ে বড় একটা সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি এটা নিজের উপর পরীক্ষা করার চিন্তা করলাম। আমার ফেলোকে বললাম, আমাকে মনিটর করার জন্য।
তৈরি হলাম। এর এক সপ্তাহ আগে উইল করে গেলাম, আমার যদি কিছু হয় তাহলে আমার সম্পত্তির ব্যাপারে কী হবে। আমি খুবই উত্তেজিত, আমার এই ফেলো, প্যারানরমাল বিষয়ের উপর তার সারা জীবনের উৎসাহ, তার উত্তেজনা দেখার মতো। সে জানাল, একটা সময়ের পর ডিভাইসটা স্বয়ংক্রীয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
ডিভাইসটি পরার পর আমার আর কিছু মনে নেই। সবকিছু অন্ধকার। কিছুক্ষণ পর মনে হল, আমি দাঁড়িয়ে আছি, নিকষ কাল অন্ধকার, এই অন্ধকারের মধ্যে দেখলাম, আমি আসলে আমার শরীরের বাইরে। আমি এই অন্ধকারে বসে রইলাম, আমি আমার শরীর স্পর্শ করতে পারছি না। মনে হচ্ছে আমি বুঝতে পারলাম, এখানে আমার আর কিছু করার নেই, অপেক্ষা করা ছাড়া। এরপর আর কিছু মনে নেই। আমার যখন জ্ঞান ফিরল, দেখলাম, আমি হসপিটালের বেডে। আমার পাশে অনেক ডাক্তার, আমার ফেলোকে দেখলাম। জানলাম, আমি একমাস কোমায় ছিলাম হাসপাতালে। ডিভাইসটি একদিন পরেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আমাকে সে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছে। ডাক্তাররা বুঝতে পারে নি, হঠাৎ করে আমি কেন কোমায় চলে গেলাম।
আমার ফেলো বলল, ডিভাইসটা সে আর একটু ফাইন টিউন করতে চায়। একমাস পর সে বলল, সে মনে করে ডিভাইসটা রেডি। কিন্তু এইবার সে নিজে টেস্ট করতে চায়। আমি সম্মতি দিলাম। আমি এক সন্ধ্যায় সবকিছু সেট করলাম, আমার বাসায়। কিন্তু আমার জীবনের আরেকটি দুঃসংবাদ এল। আমার বাসায় আসার পথে গাড়ি এক্সিডেন্টে মারা গেছে ফেলো মাইকেল।
আমি চাকরি থেকে রিজাইন করলাম। আমার বিত্তের অভাব নেই। ডিভাইসটি নিয়ে চলে আসলাম বাংলাদেশে। এরপর সরাসরি এইখানে। বাংলাদেশে মাঝে মধ্যে আমি এসেছি এর আগে, এই বাংলোতে আমি একটা কেয়ারটেকার রেখে দিয়েছিলাম। এসে এটাকে রিনোভেট করলাম। আমার ভাবনা, শুধু ডিভাইসটি দিয়ে সঠিক ফ্রিকোয়েন্সিতে ফাইন টিউন করা যাবে না, পজিটিভ এনার্জি লাগবে। আমি আমার পরিবারের পাশে থাকলে এই এনার্জিটা আসবে। কেয়ারটেকারকে বিদায় করে দিলাম। একজনকে দিয়ে রান্না আনিয়ে রাখতাম, সে বাসার ভেতর আসত না।
প্রস্তুতি নিলাম, ডিভাইসটি টেস্ট করার জন্য। আমার বাংলোয় পিছনের দিকে একটা গোপন রুম আছে, সেটা থেকে সরাসরি আমার স্ত্রী এবং সন্তানের কবরটা দেখা যায়। আমি জানি আমি হয়ত কোমায় চলে যাব, আর ফিরব না।’
কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে, মৃণাল টের পায়নি। আরশাদ সাহেব বলল, ‘আজ থাক। আমি জানি আপনি কিছুই বিশ্বাস করতে পারছেন না। সেটাই স্বাভাবিক।’
মৃণাল বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করে। আরশাদ সাহেব বেঞ্চে এখনও বসে আছেন। ঘুরে দাঁড়ায় মৃণাল।
‘এক কাজ করেন, আপনি কাল আসেন বিকালে, আমি থাকব। আর একটা কাজ করতে পারেন, আপনি সকালে মেডিক্যাল সেন্টারে আসতে পারেন, আমি আপনার একটা মেডিক্যাল চেক আপ করতে চাই।’
‘দুঃখিত, কাল সেটা হয়ত সম্ভব হবে না, আপনি বিকালে আসুন দেখা হবে।’
বিকালের একটু আগেই মৃণাল চলে আসল। আরশাদ হোসেনকে দেখা গেল একটু পরে।
‘ডক্টর সাহেব, আপনার আগ্রহ দেখে আমি একটু আশা পাচ্ছি। আপনি কি গ্রিক মিথলজি পড়েছেন?’
‘না, তবে কিছু মুভি দেখেছি। তাহলে নিশ্চয়ই ট্রয়ের কাহিনি জানেন। গ্রিক মিথলজিতে কাসান্ড্রা নামে একটা চরিত্র আছে। ট্রয়ের রাজপুত্র হেক্টরের ছোট বোন। সে ছিল এপোলো দেবতার অনুসারী। দেবতা তাকে একটা বর দিয়েছিল, সে ভবিষ্যতের ঘটনা বলতে পারবে। কিন্তু বর পেয়ে সে বিশ্বাসঘাতকতা করল, দেবতাকে অস্বীকার করল। দেবতা তখন তাকে অভিশাপ দিল যে তার ভবিষ্যদ্বানী কেউ বিশ্বাস করবে না। আমার অবস্থা কিছুটা এই কাসান্ড্রার মতোই। আমি কাউকে আমার গল্প আজও বিশ্বাস করাতে পারি নি। তবে কাউকে পুরোটা বলতেই পারি নি। আজকে মনে হয় আপনাকে পুরোটা বলতে পারব।’
‘শুরু করুন’, মৃণাল বলল। এই ভদ্রলোককে সে সাহায্য করতে চায়। মনে হচ্ছে ভদ্রলোক মানসিক ট্রমার সর্বোচ্চ পর্যায়ে আছে। যে কোন সময় ভারসাম্য হারাবেন।
‘যাই হোক, যা বলছিলাম। চলে আসলাম, এখানে। সবকিছু গুছিয়ে এক রাত্রে বসলাম ডিভাইসটা নিয়ে। ভিতরে এক পাশে কাচঘেরা একটা রুম তৈরি করেছিলাম। বাইরে থেকে বোঝা যায় না। ভেতর থেকে আবার বউ এবং সন্তানের কবরটা দেখা যায়।
চিন্তা করলাম, আমারতো হারানোর আর কিছু নেই। আমার ফেলো একটা টাইমার সেট করেছিল। দুই ঘন্টা পর যন্ত্রটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
যন্ত্রটি মাথায় পরলাম। সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। মনে হচ্ছে একটা বিশাল শূন্যে আমি ভাসছি, সাঁতার কাটছি, আশেপাশে নিকষ কালো অন্ধকার। কিছুই আমি দেখছি না। এভাবে চলল কিছুক্ষণ, আমার মনে হল, আমি একটা অনন্তকাল ধরে বসে আছি এক জায়গায়। হঠাৎ করে আমার চোখ খুলে গেল। ডিভাইসটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। আমি আবার ফিরতে পেরেছি, কোমায় না যেয়ে। আমার সাহস বেড়ে গেল। পরের দিন দুই ঘণ্টা বেশি টাইমার দিলাম। একি ব্যাপার, সেই অনন্তকাল ধরে বসে আছি। আবার ফিরে আসলাম। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলাম। আমার শরীর ঠিকই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমার কনশাসনেস বাইরে আসতে পারছে না, কারণ বাইরের শক্তির সাথে ইকুইলিব্রিয়ামে আসার নিশ্চয়ই অন্য একটা ব্যাপার আছে, তার জন্য সময় দিতে হবে। আমি টাইমারটা সেট করলাম ২৪ ঘণ্টা। ডিভাইসটি পরলাম। আমি জানি আমার আর ফিরে আসা না-ও হতে পারে, ব্রেনের সম্পূর্ণ ড্যামেজ হতে পারে। অন্ধকারে মনে হল অনেকক্ষণ বসে আছি, হঠাৎ মনে হল কেমন যেন ধীরে ধীরে সব পরিষ্কার হচ্ছে। আমি দেখলাম আমি দাঁড়িয়ে আছি রুমে, পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্কারভাবে দেখলাম, ডিভাইসটি পরে বসা আমার শরীরটাকে। নিজেকে ছুঁতে চেষ্টা করলাম, ছুঁতে পারলাম না। আমি আমার আমার শরীর থেকে বের হয়ে এসেছি। এটাকে কী বলব? আমার আত্মা? আমি বাইরে চলে আসলাম, আমার স্ত্রী এবং সন্তানের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। অদ্ভুত একটা অনুভূতি। হঠাৎ মনে হল একটা ঘূর্ণির মতো আমার শরীর উপরের দিকে ওঠা শুরু করল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আমাকে নিয়ে আসল একটা বিশাল মাঠে। আমার মতো অনেক শরীর বাতাসে ভেসে আছে, হাঁটছে, অদ্ভুত সুন্দর একটি জায়গা। আমি হা হয়ে তাকিয়ে দেখছি। কত মানুষ, সবার মুখে এক ধরনের পরিসমাপ্তি। পাশে তাকিয়ে দেখি আমার স্ত্রী, বুঝলাম এনার্জির সাথে ম্যাচ করে সঠিক মানুষের কাছে আত্মাকে এরা নিয়ে আসে। আমাকে দেখে আমার স্ত্রী অসম্ভব খুশি। তুমি চলে এসেছ? আমাদের সন্তান কেমন আছে? আমি বললাম, ও তো তোমার সাথেই এসেছে। না, তা কীভাবে হবে? মনে হচ্ছে ও একটু অবাক। তুমি কীভাবে এসেছ? তোমার তো আরও দেরি হওয়ার কথা।’
মৃণালের খুবই হাসি পেল। মুখে কিছু প্রকাশ করল না। চেহারায় আগ্রহ নিয়ে শুনতে লাগল।
হঠাৎ দেখলাম আমার চারপাশে বেশ কিছু চমৎকার চেহারার বিভিন্ন বর্ণের মানুষ। তারা আমাকে ঘিরে ধরল। আমার স্ত্রীকে আর দেখতে পেলাম না। সবার হাতে আইপ্যাডের মত ডিভাইস। তাদের সবাই আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। একজন বলল, তুমি আমাদের ডাটাবেসে নেই। এছাড়া তুমি অতৃপ্ত আত্মা। তোমার এখানে আসার কথা নয়। এরপর তারা দেখলাম নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, একজন দেখলাম তার ডিভাইসে কিছু একটা করছে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, লোকটা আমার দিকে তাকাল। তার মুখে বিস্ময়।
আমরা সত্যিই বিস্মিত এবং মুগ্ধও। তুমি কীভাবে এসেছ এখানে, আমরা এখন জানি। কিন্তু তুমি জগতের নিয়ম ভঙ্গ করেছ। তোমাকে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু এর পরিণতি ভয়াবহ। আমাদের নিয়ম নির্দয় এবং পক্ষপাতমুক্ত নয়। তোমাকে এর শাস্তি পেতেই হবে। হয়ত বংশ পরম্পরায় পেতে হতে পারে। তবে এক সময় তুমি মুক্ত হবে।
আমি বললাম, সমস্ত শাস্তি আমি মাথা পেতে নেব। তোমরাতো জানো, কেন আমি এটা করেছি। আমি কি আমার স্ত্রী এবং সন্তানকে আর একবার দেখতে পারি?
লোকটা আবার তার ডিভাইসে কী যেন চেক করল। তুমি তোমার স্ত্রীর সাথে কথা বলেছ। আমি বললাম, আমার সন্তানকে দেখতে চাই। তোমাদের এখানে কি বয়স বাড়ে? লোকটা আবার ডিভাইসে কী যেন দেখল। তোমার সন্তান এখানে নেই। তোমার স্ত্রীর মৃত্যুর সময় ওই জোনে একটি বাচ্চার মৃত্যু আমি দেখছি ডাটাবেসে, কিন্তু সে তোমার সন্তান নয়। এর থেকে বেশি তথ্য আমি দিতে পারব না। এই স্তর থেকে আমার কাছে এর থেকে বেশি তথ্য নেই।
আমার মনে হল, আমি এত বছর আমার স্ত্রীকে পূজা করে আসলাম, আর এই সন্তানটি আমার নয়। ভাবলাম, আর একটা কারণ হতে পারে, আমার সন্তান হয়ত জীবিত। আমার মনে হল, আমার পৃথিবী যেন লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।
আমি দেখলাম, আবার আমার শরীর একটা ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে গেল। চোখ খুলে দেখি, আমি ফিরে এসেছি আমার রুমে।’
হাসি চেপে রেখে গম্ভীর হয়ে মৃণাল প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি চেষ্টা করেছেন, বের করতে আপনার সন্তানের ব্যাপারটা কী?’
‘জি, করেছি। আমি ভাবলাম, ওই নার্স ছাড়া এই ব্যাপারটা এর কেউ জানবে না। এই নার্সের নাম আমি বের করতে পেরেছিলাম। কিন্তু এছাড়া আর কিছু পাই নি। তবে অনেক চেষ্টা করেছি। লোকটা উঠে দাঁড়াল। আপনাকে ধন্যবাদ, আমার গল্পটি পুরোপুরি শোনার জন্য।’
‘আপনি এক কাজ করুন, কাল মেডিক্যাল সেন্টারে আসুন। আমি আপনার একটু চেক আপ করব।’
মৃণাল ভাবল লোকটার চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি।
‘ঠিক আছে, আসব।’
‘আচ্ছা, ডিভাইসটা আপনার কাছে এখনো আছে?’
‘প্রতিদিন ভাবি, ধ্বংস করে ফেলব। এই প্রযুক্তি কারো হাতে যাওয়া উচিৎ নয়। আবার পারি না। যদিও আমার আর যাওয়া সম্ভব নয়।’
মনে মনে হাসল মৃণাল। পাগলে কিনা বলে, আবার একটু মন খারাপ হল লোকটার কথা ভেবে।
মেডিক্যাল সেন্টারে অনেক রোগী। অত্যন্ত ব্যস্ত দিন কাটল। সকালে আরশাদ হোসেনকে দেখলেন না। না, একে ধরে আনতে হবে মনে হচ্ছে। এর চিকিৎসা অত্যন্ত জরুরি। লোকটা নিজের বলয়ে অবিশ্বাস্য একটা পৃথিবী তৈরি করেছে। কিন্তু একটা ব্যাপার তার কাছে খটকা লাগছে। এটা করলে সে তার স্ত্রী এবং সন্তানকে নিয়ে এই স্বাপ্নিক জগত তৈরি করত। কিন্তু এরকম একটা গল্প ফাঁদার কী কারণ আছে? এছাড়া আর একটা ব্যাপার, লোকটাকে সে জানায় নি যে, তার মা একসময় এখানকার নার্স ছিল। তার যখন বয়স এক বছর তখন তার মা এখান থেকে চলে যায়। তার মার কাছ থেকে এই এলাকার নাম শুনেছে। তাই সে এখানে তার জন্মস্থানে ফিরে এসেছে। কিন্তু আরশাদ সাহেব যে নার্সের নাম বলছে, সে চেক করে দেখেছে এই নামে কোন নার্স এখানে কাজ করত না। রাত্রের দিকে মাকে কল করে জিজ্ঞেস করতে হবে।
লোকটার ডিভাইসের গল্পটি রূপকথা। চিন্তা করল, এরকম একটা ডিভাইস পেলে সে তার মৃত স্ত্রীর সাথে একবার দেখা করতে পারত, জিজ্ঞেস করত, কেন সে তার প্রিয় বন্ধুর সাথে পরকীয়া করতে গেল। একবার দেখা করলে পারলে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো চাইত। তীব্র এক রাগে তার সারা শরীর কেঁপে উঠল।
রাত এগারটায় দরজায় ঠক্ ঠ্ক্ শব্দ। দরজা খুললেন আরশাদ হোসেন।
মৃণাল দাঁড়িয়ে আছে বাইরে। গম্ভীর, ভাবলেশহীন মুখ।
কী ব্যাপার, ডক্টর মৃণাল? এত রাতে আপনি!
সরাসরি লোকটার দিকে তাকাল মৃণাল, আপনার ডিভাইসটা আমাকে দেখান। আরশাদ হোসেন একটু অবাক হলেন।
কেন, ডক্টর মৃণাল? প্রথমত, আপনার চিকিৎসা প্রয়োজন, দ্বিতীয়ত, আপনার কথার সত্যতা যাচাই করতে চাই।
আপনার কথা কোন পাগলেও বিশ্বাস করবে না, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, আপনার ব্যাপারটা আমি মাথা থেকে ফেলেতে পারছি না। আপনি সত্য কি-না তার একমাত্র উপায় হচ্ছে, এই ডিভাইসটি পরীক্ষা করা। আপনার এই গাঁজাখুরি গল্প আমি মাথা থেকে কেন সরাতে পারছি না?
এটা যদি সত্য হয়, আমি ডিভাইসটা যাচাই করতে চাই। এত বড় একটা আবিষ্কার এভাবে থাকতে পারে না।
মৃণাল সাহেব, ডিভাইসটা আপনাকে দেখাব, তবে ব্যবহার করলে আপনার সমস্যা হতে পারে। পুরো ঘটনাটি সত্য। কেন জানি না আপনি হচ্ছেন একমাত্র ব্যাক্তি যাকে আমি সত্য ঘটনা বলেছি। যদিও আপনিও আগ্রহ নিয়ে শুনেছেন।
বিশাল বাসা। আরশাদের পিছু পিছু নিচের তলায় একটি রুমে ঢুকল মৃণাল। মাঝখানে চেয়ার, পাশে বিরাট একটা যন্ত্রের প্যানেল। অনেকগুলো নব্ এবং মনিটর দেখা যাচ্ছে। টেবিলের উপর হেলমেটের মতো একটা ডিভাইস।
না, মনে হচ্ছে কিছু একটা হচ্ছে এখানে। মৃণালকে একটু কনফিউজড মনে হল।
আরশাদ সাহেব, আমি কি যন্ত্রটা পরীক্ষা করতে পারি?
দিতে পারি, কিন্তু আপনি শুধু শুধু নিজেকে এই ধরনের একটা সমস্যায় ফেলতে যাচ্ছেন কেন? আমার একটা কারণ ছিল, আপনারতো কোন কারণ নেই। আপনার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আপনি জেনেশুনে নিজের ক্ষতি করতে চাচ্ছেন।
আরশাদ সাহেব, আসলে আমারও সত্যিই একটা কারণ আছে। আমি এটা ব্যবহার করতে চাই। এত বড় একটা আবিষ্কার, এটা আমি নিজে পরীক্ষা না করে শান্তি পাচ্ছি না।
ঠিক আছে, আমি সব সেট করে দিচ্ছি। ডিভাইসটি পরার কিছুক্ষণ পর শরীরে একটি হুল ফোটার মতো যন্ত্রণা হয়, তার পর আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যায়।
চেয়ারে বসল মৃণাল, আরশাদ সাহেব সবকিছু চেক করলেন, মাথায় হেলমেটটি পরিয়ে দিলেন।
আপনি রেডি, মৃণাল সাহেব? আপনি নিজে এটা স্টার্ট করতে পারেন, অথবা আমি করে দিচ্ছি। হেলমেটের পাশে একটা সুইচ অন করলেন আরশাদ হোসেন। এক ধরনের মৃদু শব্দ, ধীরে ধীরে শব্দটা বাড়ছে। আরশাদ সাহেবের চেহারাটা অস্পষ্ট হয়ে আসছে। হাতে হুল ফোটার মতো বেদনা, এরপর সব অন্ধকার।
জেগে উঠল মৃণাল, শরীরটা কেমন জানি ম্যাজম্যাজ করছে। কিন্তু একধরনের প্রশান্তি তার মুখে। আরশাদ সাহেব তাকিয়ে আছে তার দিকে, চোখে কৌতূহল।
মৃণাল ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আছে। আমি খুবই দুঃখিত আপনাকে পাগল ভাববার জন্য। আপনি যে ডিভাইসটা তৈরি করেছেন, তা সত্যিই অসাধারণ। আমি আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে পেরেছি।
একটু থামল মৃণাল। ডঃ হোসেন, এছাড়া আমার একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনার সাথে আলোচনার দরকার।
সেটা পরে শুনব। তার আগে এটা শুনুন। আরশাদ সাহেব একটা জাম্প স্টিক হাতে নিয়ে পাশের টেবিলের উপর একটা কম্পিউটারে লাগালেন।
মৃণালের কথা শোনা যাচ্ছে –
আমার ইচ্ছে ছিল, তোমার সাথে আবার দেখা করতে পারব। আমার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তুমি চলে গেলে।
মেয়ে কণ্ঠের কথা শোনা যাচ্ছে, তুমি এখানে কীভাবে আসলে?
সেটা তোমার জানার দরকার নেই, বল কেন তুমি আমার সাথে প্রতারণা করলে, কী দেইনি আমি তোমাকে! কীভাবে তুমি পারলে, আমার সাথে এরকম বিশ্বাসঘাতকতা করতে? তাও আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সাথে!
-তুমি বাসায় থাক না, আমাকে সময় দাও না, সম্মান কর না, একবার আমার গায়ে হাত তুলেছ মদ খেয়ে। আমারতো একটা জীবন আছে, তাই বলে তুমি আমাকে মেরে ফেলবে?
-তুমি ভাল মতোই জানো, এটা এক্সিডেন্ট, আমি স্বাভাবিক ছিলাম না। আমার তোমাকে মারার ইচ্ছা ছিল না, আমি ভাবি নি দেয়ালের পেরেকের সাথে তোমার মাথা ঠুকে যাবে, তোমার ব্রেইন ড্যামেজ হয়ে যাবে।
-আমি তোমার সাথে আর কথা বলতে চাই না।
আমি আসব, এখন বার বার আসব। আমাকে ছেড়ে গেলেও আমি তোমাকে ছাড়ব না।“
বিস্ফারিত চোখে মৃণাল তাকিয়ে আছে আরশাদ হোসেনের দিকে। মৃণাল দেখল, ঘরে আরও তিনজন লোক ঢুকল। দুইজনের গায়ে মিলিটারির পোশাক, একজন পুলিশের।
ডক্টর মৃণাল, আমি মিলিটারি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান ব্রিগেডিয়ার হাসান খান। আমাদের একটা সাইবার সিকিউরিটি ডিভিশন আছে। ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি নিয়ে আমাদের একটি ইন্টেলিজেন্স উইং তিন বছর ধরে কাজ করছে গোপনে। কিছুদিন আগে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন থেকে আমাদের কাছে একটা অনুরোধ আসে, একটা ক্রিমিনাল কেইসের ব্যাপারে, আপনার স্ত্রীর অপমৃত্যুর কেইস। তাদের ধারণা, আপনার কেইসের মধ্যে কোন একটা ঘাপলা আছে, যদিও আপনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। ডঃ আরশাদ জামান আমাদের এই প্রজেক্টের প্রধান বিজ্ঞানী। উনি জন হপকিন্স থেকে বাংলাদেশের এই অঞ্চলটায় এসে বসবাস করছেন, এটা আমরা জেনেছি। গত তিন বছর ধরে আমরা তার সাথে কাজ করছি। তার শর্ত অনুযায়ী ওনার ল্যাব আমরা এখানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছি। উনি পুরো প্রোগ্রামটি এখান থেকেই পরিচালনা করেন। আপনি হচ্ছেন প্রথম কেইসের আসামি। আপনার কেইসটা আমাদের সফল একটা কেস। অবশেষে আপনাকে আমরা ধরতে পেরেছি।
কিন্তু, আমি আমার স্ত্রীকে হত্যা করি নি, ওটা একটা দুর্ঘটনা ছিল।
আপনি ব্যপারটা আত্মহত্যা বলে ধামা চাপা দিয়েছেন, শাস্তি আপনাকে পেতেই হবে, পুলিশের ইউনিফর্ম পরা লোকটা বলল।
আরশাদের দিকে তাকাল মৃণাল, কিন্তু আপনি যা বলেছেন সব সত্য, আমি পরিষ্কার ভ্রমণ করেছি। আপনার সমস্ত কথাই মিলে গিয়েছে।
ডঃ মৃণাল, এটা ভারচুয়াল রিয়েলিটির একটি প্রোগ্রাম, আপনার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে করা হয়েছে। আর হাতে হুল ফোটার যে ব্যথা হয়েছে, তা আর কিছু নয় একধরনের হ্যালুসিনেটরি ওষুধ, যা দিয়ে আপনার ব্রেনের সবচেয়ে ভয়ের এবং সংবেদনশীল অংশটিকে আমরা বের করে এনেছি। এরপর, মৃণালের চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল ডঃ আরশাদ, তবে আপনাকে আমার যে গল্পটি বলেছি, তার সবটাই সত্যি। আপনাকে অন্যভাবে টোপ ফেলার কথা ছিল। কিন্তু আপনাকে দেখার পর কেন জানি মনে হল, আপনাকে সত্য ঘটনাটা বলি। আপনি আগ্রহ নিয়ে পুরোটি শুনবেন তা কখনই ভাবিনি। এছাড়া এত তাড়াতাড়ি আপনি ফাঁদে পা দেবেন সেটাও ভাবিনি।
মিলিটারি অফিসারকে দেখে মনে হল, মৃণালের সাথে ডঃ আরশাদ সাহেবের কী গল্প হয়েছে তাতে তাদের কোন উৎসাহ নেই। ডঃ আরশাদের টোপ মৃণাল এত সহজেই গিলেছে তাতেই তারা খুশি।
মৃণালকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মৃণাল দাঁড়ায়, তারপর বলে, আমি কি ডঃ আরশাদের সাথে আলাদা দুই মিনিটের জন্য কথা বলতে পারি? আরশাদের দিকে তাকাল অফিসার। আরশাদ মাথা নাড়ল।
ডঃ আরশাদ, আপনি নিশ্চয়ই ভাবেন নি, আপনার গাঁজাখুরি গল্প শুনে আমি রাত ১১টায় আপনার বাসায় হাজির হব। রাত এগারোটায় আপনার বাসায় আসার একমাত্র উদ্দেশ্য আপনার ডিভাইসটি ব্যবহার করা নয়। আমি আপনার সেই নার্সের ঠিকানা খুঁজে পেয়েছি। আপনার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আপনার সন্তানটি জীবিত ছিল। সেই নার্সটি নিঃসন্তান ছিল। নার্সটির সাথে স্থানীয় কমবয়সী মেয়েটির কথা হয়েছিল তার বাচ্চাটি সে নিঃসন্তান নার্সটিকে দেবে। দুর্ভাগ্যক্রমে, কম বয়সী মেয়েটি একটি মরা সন্তান প্রসব করে। আপনার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর নার্সটি এই সুযোগটি নেয়। দ্রুত সন্তানটি বদল করে নেয়। আপনার গল্প শোনার পর আমি সব কাগজপত্র চেক করেছি। কারণ সেই নার্সটি আমার মা। আমার জন্ম এখানে। আমার বয়স যখন এক বছর, আমার মা আমাকে নিয়ে ঢাকা চলে যান, এবং তিনি তার নাম পরিবর্তন করেন। আমার মা এখন অত্যন্ত অসুস্থ। আমি এই বিষয়টি জানালে তিনি আমাকে এসব সবিস্তারে বলেছেন। আপনার কথা সত্য কি-না তা জানার জন্য আমি ডিভাইসটি ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম।
বিস্ফারিত চোখে ডঃ আরশাদ তাকিয়ে আছে মৃণালের দিকে। তার চোখ দিয়ে এক বিন্দু জল নেমে এল। মিলিটারি এবং পুলিশ অফিসার তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে তার দিকে। এভরিথিং অল রাইট, ডঃ আরশাদ?
ইয়েস, এভরিথিং ইজ ফাইন।
আমি আগামীকাল আপনাদের অডিওটি নয়েজ ক্যান্সেল করে পাঠিয়ে দেব।
গাড়িতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে মৃণালকে। আরশাদ হোসেন তাকিয়ে আছেন। অবাক হচ্ছেন, তার চোখে পানি, এটা কীভাবে সম্ভব, এত বিষণ্ণ লাগছে কেন? তার কি অনুভূতি আবার ফেরত আসছে? তার মুক্তির কি সময় এসে গেছে?
দরজা বন্ধ করে ঘরে ঢুকলেন ডঃ আরশাদ, আস্তে আস্তে করে নিজের ল্যাবে গেলেন। চারদিকে তাকালেন। কর্নারের পাশে একটা বড় বইয়ের শেল্ফ। মাঝখানের বইগুলো সরানোর পর বড় বোতামের মতো একটি জিনিষ দেখা গেল। চাপ দেয়ার সাথে সাথে দেয়ালটা সরে গেল। দেয়ালের পাশের রুমটি বেশ বড়। সরাসরি তাকালে রুমের গ্লাস দেয়া দেয়ালের একপাশ দেখা যাচ্ছে। বাইরের কেউ দেখতে পাবে না, কিন্তু ভেতরের মানুষরা বাইরে পরিষ্কার দেখতে পাবে। গ্লাসে ঘেরা দেয়ালটির পাশের লনটি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, দুটো কবর পাশাপাশি। রুমের মাঝখানে চেয়ারের উপর বসা মানুষটির দিকে তাকিয়ে দেখল আরশাদ। মাথায় হেলমেটটি বিপ্ বিপ্ করে জ্বলছে। তার নির্জীব প্রতিবিম্বটির দিকে আর একবার তাকিয়ে বের হয়ে আসলেন তিনি।
কাল অনেক কাজ। প্রোগ্রামটির কিছু সমস্যা দেখিয়ে মৃণালকে বের করে আনতে হবে। তার মুক্তির সময় এসে গেছে। তার উইলও পরিবর্তন করতে হবে।
পরের দিন ব্যস্ত গেল ডঃ আরশাদের। প্রোগ্রামের গ্লিচ দেখিয়ে অফিসারদের সম্মত করতে পেরেছেন। এছাড়া ব্যপারটা কোর্টে গেলে টিকবে না, সেটাও বোঝাতে পেরেছেন তিনি। দুর্বল কেইস। পাশাপাশি নিজের রেজিগনেশন লেটারটাও পাঠিয়ে দিলেন।
রাত এগারটা। ঠক্ ঠক্ শব্দ। দরজা খুললেন ডঃ আরশাদ। অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। বাইরে মৃণাল দাঁড়িয়ে আছে।
ভিতরে ঢুকতেই হাতটা ধরলেন মৃণালের। আস্তে করে নিয়ে গেলেন রুমের ভেতরে। বইগুলো সরিয়ে বোতামটি চাপ দিলেন আরশাদ হোসেন। মৃণাল চুপ হয়ে অবাক বিস্ময় দেখছে। রুমের ভেতর ঢোকার পর কাচের দেয়ালের ওই পাশটা দেখা গেল।
তোমার মায়ের কবর। কাচের দেয়ালের ওপারে লনের উপর কবর দুটোর দিকে তাকাল মৃণাল। শ্বেত পাথরের লেখা স্পষ্ট ভেতর থেকে পড়া যায়, ‘মৌসুমি হোসেন’। এরপর রুমের মাঝখানে তাকাল মৃণাল। ডিভাইস পরা ডঃ আরশাদের নির্জীব শরীরটা স্থির হয়ে চেয়ারে বসে আছে। অবাক হয়ে তাকাল মৃণাল। পাশে দাঁড়ানো আরেক ডঃ আরশাদের দিকে।
গল্পের যে অংশটুকু তোমাকে বলা হয় নি। আমি যখন ঘূর্ণি দিয়ে ফিরে আসলাম, চোখ খুলে দেখি, আমি ফিরে এসেছি আমার রুমে। আমি দেখলাম, আমার ডিভাইসের টাইমারটা বিপ্ বিপ্ করছে, কিন্তু আমি আমার শরীরে আর ফিরে যেতে পারছি না। ফিরে আসলাম, কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার, আমি একটা রোবটের মতো। আমার সবই আছে কিন্তু কোন অনুভূতি নেই। আর একটা ব্যপার, এটার পর আমি এই এলাকার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই অঞ্চলের একটা নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে গেলে আমার শরীর নিথর হয়ে যায়। সবাই আমাকে নিয়ে আসে। আবার আমি স্বাভাবিক হয়ে যাই। কত চেষ্টা করেছি, কত গোয়েন্দা আমি ভাড়া করেছি তোমাকে ফিরে পাবার জন্য। কিন্তু ওই নার্সকে আমি বের করতে পারি নি। এখন বুঝতে পারছি কেন। আমার এই এলাকা থেকে বের হওয়ার উপায় নেই।
আমি পাঁচ বছর এখানে পড়ে আছি। রোবটের মতো এভাবে ঘুরে বেড়াই। লোকগুলো বলেছিল, শাস্তি আমাকে পেতেই হবে, বুঝলাম আমার শাস্তি শুরু হয়ে গিয়েছে। যখন মিলিটারিরা যোগাযোগ করল, ব্যস্ত থাকার জন্য আমি এই কাজটি শুরু করলাম। আমি তাদের জন্য ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির প্রোগ্রাম তৈরি করে দিতাম। ওরা বলেছিল, মুক্তি আমার একদিন হবে। এতদিন অপেক্ষা করছি সেই মুক্তির। মনে হচ্ছে আমার মুক্তির সময় এসে গেছে। আমার মৃত্যুর পর তুমি যাতে কোন ঝামেলায় না পড়ো, তার সমস্ত কাগজপত্র আমি তৈরি করে রেখেছি। আমার বিদায় এখন তোমার হাতে।
রুমের মাঝখানে ডঃ আরশাদের ডিভাইস পরা শরীরের দিকে তাকাল মৃণাল। নির্জীব চেয়ারে বসে আছে একটা মানুষ, চোখ বন্ধ। আবার তাকাল তার পাশে দাঁড়ানো আরেক জীবন্ত ডঃ আরশাদের দিকে। চেহারা দেখে এখন মনে হচ্ছে, আসলেই এই চেহারায় কোন প্রাণ নেই, মনে হচ্ছে একটা রোবট দাঁড়িয়ে আছে তার পাশে।
মৃণাল এগিয়ে গেল। ডিভাইসটিতে হাত দিল সে। ডিভাইসটির শক্ত উপরিভাগটির স্পর্শ পেল। আস্তে করে ডিভাইসটি উঠিয়ে ফেলল মৃণাল। নির্জীব মানুষটির চোখ খুলে গেল। মৃণাল তাকাল পাশে, ধুলোয় মিলিয়ে গেল তার পাশে দাঁড়ানো ডঃ আরশাদ।
মৃণাল হাত ধরল মানুষটির। ডাকল, বাবা। মানুষটির চোখ খুলে গেল, মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে ঘুমিয়েছিল একটি মানুষ। হাতটি কঠোর ভাবে চেপে ধরল মৃণালের হাত। উচ্ছল, কিন্তু তীব্র বেদনার্ত একটি মুখ, ধীরে ধীরে ঢলে পড়ছে মৃণালের বুকে। অস্ফুটে বলল, ‘আমাকে ক্ষমা কর, মৃণাল। বিদায়।’
তোমার অপেক্ষা শেষ, বাবা। দেখো, মা তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে কবরের উপর একটি মহিলার আলোর মূর্তি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছে দুহাত বাড়িয়ে। অঝোরে কেঁদে উঠল মৃণাল।

বহুদিন পর…
বাবা, মা বলেছে তোমাকে বাসায় যাওয়ার জন্য। পাঁচ বছরের ছোট একটি মেয়ে। চেহারায় বান্দরবনের আদিবাসী মানুষদের ছাপ। আসছি, মা। না, তোমাকে এখনি আসতে হবে, এখন পাঁচটা। আজকে ৭টা পর্যন্ত তার থাকার কথা ছিল অফিসে। পাশের নার্স মেয়েটি বলল, আপনি বাসায় চলে যান, স্যার। দরকার পড়লে আমি আপনাকে আমি কল দেবো। অফিসের পাশেই কোয়ার্টার।
বাবা, তুমি আমাদের সাথে কোথাও বেড়াতে যাও না কেন? আমরা একা একা কত জায়গায় যাই। মা বলেছে, তোমাকে এখান থেকে আমি বাইরে যাওয়ার জন্য যেন জোরাজুরি না করি। তুমি কেন যেতে পার না, বাবা?
জানি না, মা। হয়ত আমি একটা পাপ করেছি।
আমি ভাল কাজ করলে তোমার পাপ চলে যাবে।
হ্যাঁ, মা। হয়ত বিধাতা একদিন তোমার ভাল কাজের জন্য আমাকে আমার পাপ থেকে মুক্তি দেবেন।
ছোট একটি হাত ধরে মেয়ের সাথে গুটিগুটি পায়ে ঘরে ফিরে যাচ্ছে মৃণাল। আর একটি ক্লান্ত দিনের জন্য অপেক্ষা করছে তার শেকলে বাধা জীবন।