সাখাওয়াত টিপু / শিল্পী বাহরামের রূপকথা

0
200

[রিকশা আর ট্যাক্সিশিল্পী তিনি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিল্পশিক্ষা ছিল না তার। শিল্পীসমাজে তাই তাকে সাবঅল্টার্ন-শিল্পী বা ‘অপর’-শিল্পী বলা যায় । কিন্তু এরকম প্রান্তিক অবস্থানে থেকেও অসাধারণ কাজ করে গেছেন এই ‘অপর’-শিল্পী। পড়ুন তাঁর উপর শিল্প-সমালোচক ও কবি সাখাওয়াত টিপুর লেখা – “শিল্পী বাহরামের রূপকথা” শীর্ষক লেখাটি। – সম্পাদক]

জগত সংসারে মানুষের জগত দুই। এক তার জ্ঞানকাণ্ড। অপরকাণ্ড মানুষের কর্ম। জ্ঞান আর কর্মের জগতে বিরাজ করে ধর্ম। ধর্ম মানে বিশ্বাস নয়, মানে মানুষ যা ধারণ করে বেঁচে থাকে। আদি জ্ঞানকাণ্ডের প্রশ্ন তুললে বলতে হবে, জগত সংসার বেঁচে আছে অধরাকে ধরার ভিতর দিয়েই। এককালে এও ভাবা হতো, মানুষের বাঁচা-মরা ভর করে মৃত্যুর পর। অর্থ্যাৎ মানুষের মৃত্যুর পর যার নাম জগত সংসারে উচ্চারিত হয়, তিনি দীর্ঘায়ু। দীর্ঘ আয়ুর সামনের দুয়ার – একালের জ্ঞান সেকালের দুয়ারেও কড়া নাড়বে। নিছক কড়া নাড়া মানে আলাপের ধ্বনিকেই ধরে নিচ্ছি, যাকে হাল দুনিয়ায় বলা হয় সমালোচনা। কিন্তু সমালোচনাকে কীভাবে আমরা বাগে আনি?

Catalog Bahram 2014.cdrCatalog Bahram 2014.cdr

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিদ্যাবুদ্ধির দুয়ার খাট। কেন খাট? আমাদের সাহিত্য নাই, শিল্প নাই, সংস্কৃতি নাই, ইতিহাস নাইÑ বিষয়খানা এমন নয়। এত সব থাকার ফলেও ভেদ-অভেদের বিচার খুব বেশি চোখে পড়ে না। ফলে সমালোচনা সাহিত্য বলে বাজারে যা চলে তাতে বিদ্যাবুদ্ধির গতির নড়চড় নাই। নতুন করে নতুন বিদ্যা জাহির করবার সুযোগও কম। আমরা আগে-পিছে তত্ত্ব তালাশ করে দেখেছি বাংলাদেশের বাংলায় চারুবিদ্যার কোন ইতিহাস নাই। দুই চারি যা আছে হাতে তসবি গোনার মতো। কী নিয়া লাগি এই বঙ্গদেশে? কোন সমাজ বা রাষ্ট্রে বিকাশিত হয় তিন পদে। এক সংস্কৃতিশাস্ত্র, দুই অর্থশাস্ত্র, তিন রাজনীতিশাস্ত্র। দেশের আনুষ্ঠানিক বিদ্যালয়ে হয়ত অনেক শাস্ত্রী আছেন, কিন্তু তাদের বেশির ভাগেরই তুল্যমূল্য কোন শাস্ত্র বিশেষ নাই। কারণ আমরা অপর জ্ঞানকে আমলে নেই কম। এই না থাকার বঙ্গ দুনিয়ার আমরা মুখ ফিরাবো কোন দিকে? জ্ঞান গরিমার কেবলা আমাদের দুস্তর অতীত। তাই অপরের কোশেশ করতে চাই। অপর কি?

শিল্পী বাহরামের জন্ম ঢাকায়, ১৯৫০ সালে। আদি নাম সৈয়দ কৌমার হোসেন সিরাজী। মাত্র ১১ বছর বয়সে শুরু করেন শিল্পীর কাজ। প্রথম জীবনে ব্যক্তিগত আঙ্ক্ষাখায় তিনি পেন্সিল স্কেচ করতেন। কিন্তু শীঘ্রই তিনি এটাকে পেশা হিসাবে বেছে নেন। আর্থিক সঙ্গতির অভাব তাঁকে নানা পেশার করুণ পথে ধাবিত করে। বয়স পনেরতে রিকসা পেইন্টিঙে হাত দেন তিনি। রিকসা শিল্পের শ্রমিকের যে শৃংখলাবদ্ধ শ্রম, যে নিদিষ্ট ছকের শিল্পের কোশেশ করতে হয়, বাহরাম তাতে তৃপ্ত হতে পারেননি। কারণ বাহরামের অসম্ভব কল্পনাশক্তি শিল্পের নানা পথে চরতে বাধ্য করে। এই শক্তি তাঁকে নতুন দৃষ্টিপাত ও ভঙ্গির দিকে চালিত করেছে। তার আগে তের বছর বয়সে বাহরাম টেক্সি পেইন্টিং হতে আঁকিবুকির শিল্পশিক্ষা, তাঁকে এ পেশায় পারদর্শী করে তুলেছে। প্রথম দিকটা বিবেচনায় আনলে দেখা যাবে, বাণিজ্যিক পন্থার শিল্প কোশেশের কারণে তিনি পেয়েছিলেন সব ধরনের চিন্তা বা কল্পনা অন্বেষণের স্বাধীনতা। তাঁর কাজের পরিধিতে দেখা মিলবে হরেক রকম কাজের। যেমন সাইনবোর্ড, ব্যানার আর সিনেমা স্টুডিওর ব্যাক স্কিনের সিনারি বা শিল্পকর্ম। এইসব কর্ম তৎপরতা তাঁর দৃশ্যকল্প বা শিল্প চিন্তার দিগন্ত প্রসারিত করেছে।

বাহরামের শিক্ষাদীক্ষার হাতেখড়ি পিতার হাতেই। যিনি আদৌ শিল্পী ছিলেন না। তাঁর অপর ভ্রাতা তাঁকে শিল্পকর্মে নিয়ে এসেছেন। তাঁর কাজের জায়গা ছিল পুরান ঢাকার আগামছি লেইন। ওই হিসেবে বলা যায়, শিল্পী আবদুলই তাঁর শিক্ষাগুরু। কাজ করেছিলেন তাঁরই সহযোগী শিল্পী হিসেবে। কিছুদিন যেতে না যেতেই তিনি শিল্পের নানা কৌশল রপ্ত করেন। এই শিশু বয়সে ১৯৬০ সালের দিকে, বাহরামের গুরু আঁকতে দেন সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের প্রতিকৃতি। সে সময় তিনি আঁকতেন পাকিস্তানের চিত্রতারকা ওয়াহিদ মুরাদ, জেবা আর ভারতীয় সুপার স্টার দিলীপকুমার, কিশোর কুমার আর মধুবালার প্রতিকৃতি।

যৌবনে বাহরাম প্রায়শ ঘুরে বেড়াতেন নানা ধরনের আর্ট স্টুডিওতে। সে সময়কার ঢাকার খ্যাতনামা স্টুডিও শিল্পী সৈয়দ ভাই, লাদলা ভাই, পাপ্পু ভাইয়ের সান্নিধ্য লাভ করেন। এইসব শিল্পীর সান্নিধ্য লাভের ফলে তিনি চলচ্চিত্র শিল্পীদের প্রতিকৃতি আঁকার কৃৎকৌশলে আরো পারদর্শী হয়ে ওঠেন। গোটা ষাটের দশকে তিনি চলচ্চিত্রের ছোট-বড় অসংখ্য ব্যানার এঁকেছেন। শেষ নাগাদ জনপ্রিয় এই শিল্প-মাধ্যমই জীবন কর্মের আয়-রোজগারের একমাত্র উপায় হিসেবে দাঁড়ায়। প্রথাগত এই শিল্পের পথ কোমল নয়। শিল্প-শ্রমের অর্থমূল্য অনর্থের মতো। অর্থের দিকে তাকালে জীবন যেন-বা পরশ পাথর। তবে এ কাজের ফাঁকে ফাঁকে অবসরে তিনি রিকসা, ব্যানার আর ট্যাক্সি পেইন্টিঙের কাজও করতেন।

জাতিগতভাবে বাহরাম বাঙালি শিয়া মুসলমান। স্বাধীনতা উত্তরকালে, বিয়ে করেছেন ১৯৭৪ সালে। সে একটা সময় কেটেছে তাঁর, জনপ্রিয় প্রথাবদ্ধ সেই শিল্পকর্মের যোগান দিতে দিতে। দিনাতিপাত চলছিল চলতিভাবেই। নব্বই দশকে এসে এই শিল্পের জায়গা দখল করে নেয় ডিজিটাল শিল্পমাধ্যম। শিল্প-জীবনে চরম সংকট দেখা দেয় তাঁর। বাহরাম তাতেও পেশার বদল ঘটান নাই। তিনি নেন শাড়ির কাজ। কাজটা নকশা তৈরির। কাজটা করতে এসে তাঁর নৈপূণ্যের কারণে একবিংশ শতকের শুরুর দিকে শিল্পানুষ্ঠান বৃত্তের এক কর্মশালায় অংশ নেন। পরে আস্তে আস্তে সান্নিধ্য পান প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পীদের। অংশও নেন দু-একটি যৌথ প্রদর্শনীতে। ফলে তিনি সুযোগ পান মূলধারার শিল্পের সাথে সম্বন্ধ স্থাপনে। এই সম্বন্ধ স্থাপনে বাহরামের শিল্প ব্যক্তিত্ব অনন্য। কেন অনন্য? তিনি শিল্পকর্মে দুই ধারার শিল্পের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। মিশ্রণের ঘটনাটি নতুনত্বের সাক্ষ্য বহন করে। কারণ তিনি না প্রথাগত না প্রাতিষ্ঠানিক।

কাজের প্রতি নিষ্ঠা আর অনুবর্তিতায় তিনি এক জাতশিল্পী বনে যান। জাতশিল্পী বলার পেছনে কারণ তাঁর কোন আনুষ্ঠানিক শিক্ষা নাই। মানে শিল্প জিনিসটা তাঁর মজ্জাগত বা প্রকৃতিগত। তাত্ত্বিক দিক দিয়ে এটাকে সহজ বলা হয়। তাত্ত্বিক দিকটা কি? কেননা তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই একজন শিল্পী-মানুষে পরিণত হয়েছেন। শিল্পের ভাষা রপ্ত করেছেন। সাধারণত আমরা যাকে বলি সহজ শিল্প। শুধুই কাজের অভিজ্ঞতা একে সহজ মজ্জাগত রূপে সৃষ্টি করেছে। ঠিক তার বিপরীতে আছে প্রাতিষ্ঠানিক শিল্প। এই শিল্প রপ্ত করতে প্রয়োজন শিক্ষা-পুঁজি। বাহরামের তা ছিল না আদৌ। সমাজের চলতি কাঠামোর ভেতর যে জ্ঞান তা তাঁকে শিল্পী করে তুলেছিল। প্রথাগত ইমেজকে ভেঙে তিনি শিল্পে যোগ করেন নতুন ভাষার। সমাজের অন্তর্দশা হয়ত বাহরামের ছবিতে নাই। আছে প্রকৃতির অন্তর্দশা। তাঁর উত্তরণ সরল নয়, সহজ, যা প্রকৃতির স্বভাবজাত। ভেদবুদ্ধির অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি এমনই শিক্ষা রপ্ত করেছেন। তাই তাঁকে আমরা বলছি সহজাত শিল্পী।

tiger-taught-by-a-monckey-130x107cm

ক্যানভাসের ফিগার বা অবয়ব দেখলে কখনো কখনো মনে হবে বাহরামের শিল্পে মিথ বিরাজিত। অনেক ফিগার বা অবয়ব এক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। পাখির সাথে বাঘ, হাতির সাথে মানুষ, ঘোড়ার সাথে হাতি, প্রাকৃতিক দৃশ্যের ভেতর মানুষ-পাখি আর নিত্যকার পদ আর পদার্থে ভরা তাঁর শিল্প। শিল্পে প্রকৃতির সরলতাকে সহজভাবে তুলে আনা কম কথা নয়। সহজ ভাব তাই জীবের সাথে জীবের সম্পর্ক নির্ণয়। আর জীবের সাথে প্রকৃতির সম্বন্ধ নির্ণয়। এই সম্পর্ক চেনা জগতকে অচেনা করে দেয়। স্বভাবত বস্তুর আকার সরল। এক আকারের সাথে অন্য আকারের সম্পর্ক সৃষ্টিকে বলছি, সহজাত শিল্প। মানে এক অদ্ভুত জৈবিক তত্ত্বে একে অপরের ভিতর রূপ ধরে আছে। মানুষ, বাঘ, হরিণ, বক, পাখি, গাছ-গাছালি একই ক্যানভাসের ভিতর বাস করছে। এই বাস শুধু উপযোগের নিবাস নয়। প্রাণের সাথে প্রাণের সজীব মিলন। সহজ রেখায় অতি বা মহাজাগতিক এক সম্পর্কের সূত্র আবিষ্কার করছেন তিনি। ফলে বাহরামের শিল্পে দৃষ্টির আরাম কম। দৃষ্টির আরাম কম কেন? অসম্ভব এক কল্পনাশক্তির সম্মিলনে তাঁর ক্যানভাসের অবয়বগুলো এক অভিনব জগত সৃষ্টি করে। নিছক গল্প নয়, যেন কাহিনির বিস্তার ঘটে। খোদ দর্শককে কল্পনাপ্রবণ হতে বাধ্য করে। মানে দর্শক তাঁর ছবির ভিতর দিয়ে কল্পনার অন্যলোকে পৌঁছাতে পারে।

সরল চোখে দেখলে বাহরামের শিল্পকর্ম মনে হতে পারে কিম্ভুতকিমাকার বা অ্যাবসার্ড। একটি অবয়বের ভেতর আরেকটি অবয়ব, একটি প্রাণীর ভেতর আরেকটি প্রাণী, একটি চিত্রকল্পের ভেতর আরেকটি চিত্রকল্প, একটা বাস্তবের ভেতর আরেকটা বাস্তব। এমন নহে যে তার শিল্পকর্মে বাস্তব শুধু বাস্তব আকারে হাজির। এই বাস্তব অপর বাস্তবকে খর্ব করে। খর্ব মানে পরিণতি নয়, পরিণত কাহিনির বাস্তবের জন্ম দেয়। তাঁর শিল্পকর্ম অনেকটা সার্কাস্টিক রিয়েলিটি বা উদ্ভট বাস্তবতার সম্মিলন। এই চিত্রকল্পের বড় গুণ উদ্ভট রস সৃষ্টি করা। আপাত মনে হতে পারে উদ্ভট রসে কোন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা নাই! শুধুই নান্দনিকতার অদ্ভুদত্ব! কিন্তু শুদ্ধ নন্দনতাত্ত্বিক বাস্তবকে বাহরামের শিল্পকর্ম নাচক করে। শিল্পের প্রাথমিক নন্দনতাত্ত্বিক ভিত চিত্রকল্পের বাস্তব উপস্থাপনের ভিতর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু বাহরাম সেই ভিত বদলে দেন। এটা আদতে সমাজ বাস্তবতার বিরুদ্ধে এক অভিনব রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা। কেননা বাহরামের শিল্পকর্ম রাজনৈতিক নন্দনতত্ত্বের অপর দুয়ার খুলে দেয়। এমন রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা বলা চলে চলতি সমাজের অন্তর্নিহিত শক্তি। মানে ভেতরগত রূপকে শিল্পে রূপান্তর করা। যদি বলি বাহরাম কি? এক বাক্যে, বাহরাম বাংলা চারুশিল্পে একক আর অনন্য।

বড় অসময়ে চলে গেলেন শিল্পী বাহরাম। মানব প্রকৃতিতে ৬৬ তেমন কোন বয়স নয়। বেশকিছু যৌথ প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তবে একক প্রদর্শনী করেছেন একটি মাত্র। ঢাকা আর্ট সেন্টারের তাঁর সেই প্রদর্শনী বেশ সাড়া জাগিয়ে ছিল শিল্প সমাজে। তার কারণও ছিল। কেননা বাহরাম লোকজ শিল্পের সাথে আধুনিক শিল্পের এক জৈব রসায়ন সৃষ্টি করেছিলেন। ইমেজ বা আকারে একক কোন প্রাণ বা বস্তুর রেখা আঁকেন নাই। একই রেখায় উম্মীলিত একাধিক প্রাণ বা বস্তুর আকার তাঁর ক্যানভাসকে স্বতন্ত্র করে তুলেছিল। রঙের ব্যবহারের ক্ষেত্রে তিনি অবচয়ী। এই অবচয় ফিগার বা অবয়বকে নস্যাৎ করে না, বরং নতুন রূপে শিল্পে আবির্ভূত হয়। অন্তত বাংলাদেশের শিল্পালয়ে বাহরাম স্বশিক্ষিত এক শিল্পচিহ্নের নাম। অনাগত ভবিষতে শিল্পে তিনি চিহ্ন আকারে থাকবেন। চিহ্ন নিছক ছকে বাঁধা নয়, ছকহীনতার অপূর্ব দুয়ারে। নতুন ভাষায়, নতুন শিল্পের রূপকথায়। বাহরামের রূপকথা ভুলি কি করে!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here