সাজ্ জাদ আরেফিন > স্মৃতিচূর্ণ ও কবি হায়াৎ সাইফের ৩টি কবিতা >> স্মৃতিকথা/কবিতা

0
78
[সম্পাদকীয় নোট : গত ১৩ মে কবি হায়াৎ সাইফ (জন্ম ১৯৪২)  মৃত্যুবরণ করেছেন। এ উপলক্ষে নিচের লেখাটি প্রকাশ করা হলো। সেই সঙ্গে প্রকাশিত হলো তাঁর তিনটি কবিতা। তিনি যেমন ছিলেন পরিশীলিত রুচির মানুষ, তেমনি তাঁর পঠনপাঠনও ছিল পরিশীলিত, সুনির্বাচিত। স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক পাশ্চাত্যের সাহিত্যের প্রতি ছিল ঝোঁক। কবিতা লেখার পাশাপাশি তিনি যেমন প্রবন্ধ লিখেছেন, তেমনি অনুবাদও করেছেন। বিশেষ করে হার্বার্ট রীডের চিত্রকলা বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থ The Meaning of Art অনুবাদ করে গেছেন। তাঁর স্মৃতির স্মরণে এই স্মৃতিচারণটি প্রকাশিত হলো। সঙ্গে থাকলো তাঁর তিনটি কবিতা। এই কবিতাগুলি বাছাই করে দিয়েছেন নান্দীপাঠ-এর সম্পাদক ও কবি সাজজাদ আরেফিন।]

স্মৃতিচূর্ণ

গত শতকের নব্বুইয়ের দশকের শুরু থেকেই ঢাকায় বাস করছি।
কূলহীন কিনারহীন ঢাকা শহর। পরিচিতজন হাতের করে গোনা।
গেন্ডারিয়ার কবি শিশুসাহিত্যিক প্রবন্ধকার হায়াৎ মামুদ। পল্লবীতে অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম-মাঝখানে ইন্দিরা রোডে নাগরিক অধ্যাপক মুস্তাফা নূরউল ইসলাম। আর অনাথাশ্রম বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র।
এরই মধ্যে বাংলা একাডেমির চাকরি। এক নতুন স্বপ্নের প্রাসাদের স্থায়ী অতিথি।
এই প্রাসাদে সারা দেশের স্বপ্নের মানুষেরা আসেন। দেখি। মুগ্ধ তাকিয়ে থাকি।
‘একটি দশ টাকার নোটে’র লেখক আরশাদ ভাইয়ের বন্ধু তাপস মজুমদার। সত্তরের গল্পকার। তাপসদা একদিন আলাপ করিয়ে দিলেন কবি হায়াৎ সাইফের সঙ্গে। অসাধারণ ভদ্রলোক।
তিনি কেন ‘জাতীয় কবিতা পরিষদে’র বিপরীতে স্বৈরশাসকের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত ‘বাংলাদেশ কবিতা কেন্দ্রে’ যোগ দিয়েছিলেন-সে বিষয়ে আমাদের ক্ষোভের কথা জানিয়েছিলাম। তিনি আমাদের তরুণ মনের ক্ষোভকে যথার্থ বলেছেন। তাঁকে কীভাবে যুক্ত করা হয়েছিল জানালেন। সরকারি উচ্চপদে চাকরি করার সীমাবদ্ধতা ও তার অসহায়ত্বের কথা বললেন। শুধু তিনি না-আরো বেশ কয়েকজন কবির কথাও বললেন। কে কে নিজের আগ্রহেই বাংলাদেশ কবিতা কেন্দ্রে যোগ দিয়েছিলেন সে-কথাও জানতে পারি। সেদিন তাঁর কথা অবিশ্বাস করার মতো কোনো যুক্তি খুঁজে পাইনি। বরং কিছুটা লজ্জাই পেয়েছিলাম।
তাঁর প্রকাশিত কবিতার বইয়ের প্রায় সবকটি তিনি আমাকে দিয়েছেন। প্রকাশনা ও কবিতা বিষয়ে মতামত জানতে চেয়েছেন। গদ্য লিখতাম না বলে কখনোই লিখে আমার প্রতিক্রিয়া জানাতে পারিনি। পাঠক সমাবেশ থেকে প্রকাশিত ‘নিমগ্নতা ও ভালোবাসার কবিতা’ ভিন্নরকম ভালো লাগার বই দিয়ে বলেছিলেন পড়বেন। কেমন লাগল অকপটে জানাবেন। আমি কথা রেখেছিলাম…
প্রায় চব্বিশ বছরের পরিচয়। ‘নান্দীপাঠ’ নিয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। কেন নিয়মিত বের করছি না খোঁজ-খবর নিয়েছে। কীভাবে পত্রিকাটি নিয়মিত বের করা যায় পরামর্শ দিয়েছেন। ভরসা দিয়েছেন-বলেছেন আমি একটু সুস্থ হয়ে উঠি তারপর…
তাঁর ভালো লাগা ও ভালোবাসার বই হার্বার্ট রীডের  The Meaning of Art-এর অনুবাদ ‘নান্দীপাঠে’ ধারাবাহিকভাবে ছাপতে দিয়ে ‘নান্দীপাঠে’র প্রতি তাঁর ভালোবাসার স্মারকচিহ্ন রেখে গেলেন।
নান্দীপাঠে ‘শিল্পকলার তাৎপর্যে’র প্রথম কিস্তি প্রকাশের পর কুরিয়ারে পত্রিকা পাঠিয়ে হায়াৎ ভাইকে জানিয়েছিলাম। তিনি কিছু না জানিয়ে অফিসে হাজির। বললেন কুরিয়ারের ঠিক নেই। পত্রিকাটি হাতে পেয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলেন।
প্রথম কিস্তি বের হওয়ার পর একাধিক প্রকাশক তাদের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বইটি প্রকাশের জন্য তাঁকে অনুরোধ করেছেন। তিনি শুধু আমাকে জানিয়েছেন-আপনি আগে শেষ করেন-তারপর আপনার যাকে ইচ্ছে তাকে গ্রন্থাকারে প্রকাশের জন্য দিতে পারেন। শুধু খেয়াল রাখবেন যাতে যত্ন করে ছাপেন। তারপর হেসে বলেছিলেন, আপনার রুচির প্রতি পূর্ণ আস্থা আছে।
তাঁর সঙ্গে শেষ দেখা বাংলা একাডেমির নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মহোদয়ের কক্ষে। তিনি হয়তো তাঁর কবিবন্ধুকে শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন। মহাপরিচালক মহোদয় আমাকে তাঁর ‘শিল্পকলার তাৎপর্য’-এর পাণ্ডুলিপি বাংলা একাডেমি থেকে গ্রন্থাকারে প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে বললেন। আমি মহাপরিচালক মহোদয়কে আগামী সংখ্যায় ‘নান্দীপাঠে’ বাকি অংশ ছাপার পর পাণ্ডুলিপি গুছিয়ে একাডেমিতে জমা দেয়ার কথা জানালাম। সেও প্রায় দু’মাসের মতো হবে। গুছিয়ে উঠতে পারিনি। হায় ব্যস্ততা…
হায়াৎ ভাই এ মাসেই ‘নান্দীপাঠে’ আপনার ‘শিল্পকলার তাৎপর্যে’র দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশিত হচ্ছে–আপনি দেখবেন না কেমন ছাপা হলো?

হায়াৎ সাইফের তিনটি কবিতা

বৈশাখের বিবেচনা
প্রতি বছর বৈশাখ এসে ঘুরে যায় যথারীতি
পয়লা বৈশাখের বর্ণাঢ্য আচার-অনুষ্ঠান হয় গতানুগতিক,
আবার কখনো সখনো পয়লার পরেও চলতে থাকে
নতুন বৎসরের নানাবিধ আবাহন যেন আমাদের বর্ণহীন জীবনের
চোয়ালে, হয়তো-বা কিছুটা পশ্চিমের অনুকরণে, নানারঙের প্রলেপ
লাগাবার বাচাল চমক।
বাংলার আবহমান সংস্কৃতির জন্যে অন্তত এই একদিন
উপচে পড়ে আমাদের নিষ্প্রাণ নিষ্প্রভ আনুষ্ঠানিক ভালোবাসার পেয়ালা।
এমনি করে ১৪১১ বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখও অপস্রিয়মাণ
জ্যৈষ্ঠ আষাঢ় শ্রাবণ আর ভাদ্রের টানে
প্রতি বছরই যেমনটা হয় পৃথিবীর অমোঘ আবর্তনে।
এবারও বৈশাখ এসেছে সশব্দে তবে ততটা মেঘের করতালিতে নয়
যতটা রাজপথে ঘাতকের গুলিতে প্রচণ্ড সন্ত্রাসে জনজীবন গুঁড়িয়ে দিয়ে
নিয়ন্ত্রণহীন বর্বরতায় প্রাণ দেয় যত সাধারণ মানুষ
আমরা ততই অপার নির্বেদে জনগণের জন্যে অঢেল অশ্রু বিসর্জন করি
এই প্রমত্ত বৈশাখে।
আমাদের এইসব নানাবিধ নির্লজ্জ হৈচৈয়ের জনান্তিকে
বৈশাখ এবারও কিন্তু অলক্ষ্যে চলে যাবে
এবং হয়তো-বা কিছুটা অভিমানভরে চলে গিয়ে বেঁচে যাবে,
কিন্তু আমাদের দৃশ্যপটে সে যা ফেলে যাচ্ছে
তাতে না আছে বিগত বছরের আবর্জনা বিদায় করার উচ্ছ্বাস
না আছে নতুন বছরের প্রথম বর্ষণের আনন্দধারার করুণাময় আর্দ্র নরম নিবেদন।
মনে হয় যেন চারদিকের খটখটে খরায় চৌচির ফেটে যাচ্ছে মাটি।
এবার এসেছিল আমের বোল অনেক সম্ভাবনায় প্রতিটি ডাল নুইয়ে দিয়ে
আমাদের যত্নে লালিত আকাঙ্ক্ষাগুলোর মতো,
কিন্তু বৃষ্টি নেই ঊষর বরেন্দ্রে
তাই হয়তো ঝরে যাবে সবই অনিবার্যভাবে।
এবারও বৈশাখে পেয় পানির অভাবে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বিপর্যস্ত জনজীবন,
মনে হয় আপাতত কণ্ঠাগত আমাদের অর্থহীন প্রাণ এই অবিবেকী বিপন্ন নগরে।
ভয় হয় মানুষের অসহ্য চাপে হঠাৎ থেমে যাবে সমস্ত ট্রাফিক
যেন প্রস্তরীভূত হয়ে যেতে পারে রাস্তার সমস্ত চলাচল
যেমন ভারী হয়ে চেপে থাকে বিশ্রী দূষণে হতভাগ্য এই নগরীর অসহায় বাতাবরণ।
কেবল উঠছে চারদিকে গণ্ডায় অভ্রভেদী দরদালান
কোন উৎস থেকে আসে তার প্রবল রসদ তা কি এই বৈশাখ জানে?
এখন এই বিশ্লিষ্ট সময়ে ঐ অট্টালিকাগুলোকে মনে হয়
মৃত নগরীর একেকটি চিত্রার্পিত খণ্ডিত দৃশ্য,
এক প্রকাণ্ড শূন্যতার ভিতের ওপর শেকড়হীন সমাজের মাথায়
নড়বড়ে ঐ দরদালান আর কতকাল এমন মর্মান্তিক দাঁড়াতে পারবে বৈশাখের ঝড়ে?
আগামী কোনো এক বঙ্গাব্দের পয়লা বৈশাখে
আমাদের কেউ কেউ হয়তো থাকব না এমন অনুষ্ঠানে
কিন্তু কালবৈশাখী যদি এসেই পড়ে সেবার
সমস্ত আকাশজুড়ে ফুঁসে ওঠা কড়কড় মেঘের বিদ্যুতে
আর ঝেঁটিয়ে নিতে চায় এই শেকড়হীন সমাজের আবর্জনারাশি-
নড়বড়ে দরদালান গলির সমস্ত নোংরা বস্তির দুঃসহ অস্তিত্বের যত গ্লানি?
সূর্যটা যদি আজকের প্রখর উষ্মার চেয়েও সহস্রগুণ বর্ধিত উষ্ণতায়
হঠাৎ গলে গলে পড়তে থাকে বঙ্গোপসাগরে আর গনগনে হল্কায়
সমুদ্র থেকে জবাকুসুমসঙ্কাশ জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে উঠে আসে
অতিকায় ডায়নোসরের মতো লেলিহান আগুনের বিদ্যুৎবাহ জিহ্বা
এবং তার প্রচণ্ড শক্তিতে চেটে নেয় আমাদের সমতলের সমস্ত জঞ্জাল?
তাহলে তারপরে কি উদয় হবে আবার করুণাময় সুন্দরের?
জীবনের উন্মেষের সম্ভাবনায় শুচিস্নাত প্রতীকের মতো একটা স্নিগ্ধ মঙ্গলময় লাল সূর্য?
আপাতত এই মুণ্ডুহীন ভয়াবহ শহরে অনড় অবস্থান নিয়েছে সবাই
কেউ কেউ কথা বলবে না কেউ কেউ আবার কাউকে কথা বলতে দেবে না
কেউ কেউ আবার পূর্বাপর অসংলগ্ন কথা বলবে,
আর মাঝে মাঝে বেঁকে বসা গোঁয়ার পশুর মতো
থেমে যাবে সাধারণ মানুষের যাপিত জীবন এই দুঃস্বপ্নের মতো অবিশ্বাস্য সন্ত্রস্ত শহরে
এবং তারপরে গতায়ু চৈত্রের খরার মতো যে ক্ষুধা জ্বলবে সর্বত্র
তাতে পানি ঢালবে কে?
কেউ কিছু ভাবে না-দারুণ তুখোড় লালফিতে, উচ্চকণ্ঠ বক্তৃতামঞ্চ
মধ্যপ্রাচ্য ফেরত স্লাইডরুল, ব্রিফকেস, স্টেথোস্কোপ আপাদমস্তক
অন্যের কাপড়কাটা রপ্তানিকারক কাঁচি-সবাই সমান উদাসীন।
সুশীল সমাজ কোথায় চলেছে?
দিগন্তে দেখা যায় না কিছুই
বিশ্রী দূষণে সব অন্ধকার হয়ে আসে
চতুর্দিকে কুজ্ঝটিকায় আক্রান্ত বায়ুস্তর।
তাহলে এখন কোথায় ফেরাবো চোখ?
কোন পথে যাবো ভবিতব্যের দিকে?
আর নয় এমন ক্রান্তিতে থাকা,
সটান চলে যেতে চাই পুষ্পের দিকে শস্যের দিকে
কোনো এক অনন্য বৈশাখে।
এখন এমন দুঃসময়েও তাই চোখ বুজলেই দেখতে পাই
অনেক পুষ্পের সমারোহ বিস্তৃত চোখজুড়োনো দোদুল্যমান সবুজ শস্যখেত
নদীর ওপারে কাজলকালো বনানীর গাঢ় দিগন্তরেখা
কল্লোলিত দুকূল উপচে-পড়া নদীর বাঁকে সারি সারি রংবেরঙের পালতোলা নৌকো।
আর ঢেউয়ের উপরে লাফিয়ে উঠছে ঝকঝকে রোদে
ঝাঁকে ঝাঁকে রুপোলি ইলিশ।
অভিবাদন
সেদিন দারুণ বসন্ত ছিল
ভয়ঙ্কর আগুন ছিল কৃষ্ণচূড়ার
আর আগুন ছিল হৃদয়ে তাদের
অনেক স্বপ্ন ছিল ফসলের ফুলের
বিস্তৃত স্বাধীনতার
বিন্যস্ত হৃদয়ে তাদের নীড় বেঁধেছিল,
গানের পাখিরা
সুর তুলেছিল দোতারায় বিবাগী বাউল,
নদীতে ছলচ্ছল বেজেছিল মৃদঙ্গ মন্দিরা।
তারা সুবেসাদেকের কুমারী আলোয় জেগে
শুনেছিল দূরাগত আজানের ধ্বনি
তারা শুনেছিল সন্ধ্যার উচ্চকিত মাঙ্গলিক
কাঁসর ঘণ্টার
এবং দোরগোড়া পেরিয়েই তারা দেখেছিল
একটি ঘাসের শীর্ষে জড়ানো
শিশিরের বিচ্ছুরিত স্বেদ।
তারা দেখেছিল অনাগত দিনে ঝলকিত তরবারি
তারা দেখেছিল সন্ধ্যাসকালে আবেগতাড়িত লাল
তারা শুনেছিল স্নিগ্ধসবুজে জীবনের করতালি
তারা দেখেছিল শাণিত ফলায় ক্ষুরধার বীর্যের
তারা দেখেছিল সমাগত দিনে
জীবনের রেণু ছড়ায় সূর্য
প্রখর রৌদ্রে রমণীয় রাজপথে।
তাদের কি দিয়ে অভিবাদন জানানো হবে আজ
এই অর্বাচীন বসন্তে?
তোমার বিনষ্ট হৃদয়ে আজ শঙ্কা ভীতি সন্ত্রাসের রাহু,
বাস্তুহীন ছিন্নমূল সত্তায় তোমার কেবলই ঘুরতে থাকে
এক নিদারুণ সর্বগ্রাসী ক্ষুধা-
সে ক্ষুধা বিবেক বিপন্ন করে আগ্রাস করে করে আগ্রাসন
ইচ্ছায় লিপ্সায় আকাক্সক্ষায় এমনকি ভালোবাসায়,
সে ক্ষুধা সর্বক্ষণ কুরে কুরে খায় অস্থিমজ্জা
যেমন পিঁপড়েরা খায় দলবদ্ধ সহস্র দাঁড়ায় ছিঁড়ে ছিঁড়ে
আরশোলার অসহায় শব,
যেমন পিরানহার সুতীক্ষ্ণ দাঁত মুহূর্তে নিঃশেষ করে
জলজ্যান্ত দেহ এবং
রক্তিম করে শ্রান্ত স্বচ্ছ জল।
এমন ভীষণ ঘাতিনী তুই তবু বারবার কেন অরূপ ফাল্গুনে
পুষ্পের দিকে শস্যের দিকে ফেরাই অমিত চোখ?
আর আচম্বিতে বের করে আনি একটি পুরানো বিপর্যস্ত ব্যানার
বাংলা বাংলা বাংলা
জননী আমার।

এপিটাফ

আমাদের এই ঘরদোর ছেড়ে যদি বদ্ধপরিকর হয়ে চ’লে যেতে চাই। যেইখানে যাই সেইখানে যেন নিস্তরঙ্গ হয় তরঙ্গিত প্রবুদ্ধ সময়। যেন স্বস্তি রাখি প্রশান্ত করতলে। সেখানে দেখতে চাই না কোনো তিক্ত অতীত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত। সেখানে শুনতে চাই না আর কোনো গুজব। সেখানে দেখতে চাই না দেয়ালের গায়ে সাঁটা লিফলেট আর বিদ্বেষী সংঘাত বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করে। দেখতে চাই সেইসব রহস্যাবৃত মানুষেরা অতিপ্রাকৃত সতর্কতায় কেবল লাভের অঙ্ক কষে। দেখতে চাই না কেবল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব রয়েছে যাদের তারাই নিচ্ছে শুষে আকাশের সমস্ত সুবাতাস। আর বাকি সব বাস্তুভিটা ছাড়ে আর চিরকাল অনিকেত থাকে। যদি নিশ্চিতভাবে যাই তাহলে আম জাম নিম আর কাঁঠালের কাছাকাছি একটুকু ঘাসে ঢাকা সূর্যালোকিত ক্ষুদ্র আয়তন যেন পাই।