সাদী ইউসেফ >> কবিতাগুচ্ছ >> ভূমিকা ও ভাষান্তর মঈনুস সুলতান

0
146

সাদী ইউসেফ >> কবিতাগুচ্ছ

সাদী ইউসেফের জন্ম ১৯৩৪ সালে দক্ষিণ ইরাকে – বসরার কাছাকাছি আবুল খাসিব-এ। এ অব্দি রচনা করেছেন পয়তাল্লিশটি কবিতা ও সাতটি গদ্য গ্রন্থ। বাগদাদে তাঁর পড়াশোনার বিষয়বস্তু ছিলো আরবি সাহিত্য। প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেন কিছুকাল। পরে পেশাগতভাবে সাংবাদিক ও প্রকাশক হিসাবে কাজ করেছেন। রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্ট হিসাবেও তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ বয়সে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে শামিল হন, এবং বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন সমাজতন্ত্র ও সম্পদের সুষম বণ্টনে। প্রভাবিত হন প্যান-আরব ভাবধারায়। রাজনীতিতে যুক্ত থাকার পরিনামে ইরাকে কারাবরণ করেন।  পরে ১৯৭৯ সালে স্থায়ীভাবে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। প্রবাসজীবনে স্বল্পমেয়াদে বাস করেছেন আলজেরিয়া, ইয়েমেন,লেবানন, যুগশ্লাভিয়া, ফ্রান্স, গ্রিস, সাইপ্রাস প্রভৃতি দেশে। অবশেষে স্থায়ীভাবে থিতু হন বিলাতে।
তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৫২ সালে। কবিতায় মৌলিক অবদান ছাড়াও আরবি ভাষায় অনুবাদ করেন ফেদেরিকো গারসিয়া লোরকা, ওয়াল্ট হুইটম্যান প্রমুখের কবিতা। সমালোচকরা সাদী ইউসেফকে আরবি সাহিত্যের সাম্প্রতিককালের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসাবে বিবেচনা করে থাকেন। তাঁকে আধুনিক আরবি কবিতার পথিকৃত বলা হয়। জনপ্রিয় এ কবি তাঁর কিছু কবিতার জন্য বিতর্কিতও হয়েছেন। যেমন, কুর্দিদের নিয়ে রচিত একটি কবিতার জন্য কুর্দিস্থানের স্থানীয় প্রশাসন তাঁর তাবৎ রচনা স্কুল কারিকুলামে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
২০১২ সালে কবি অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ নগিব মাহফুজ পুরস্কারে ভূষিত হন। ২০০৪ সালে তাঁকে আল কায়েস পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করা হলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শাসক শেখ জায়েদ বিন আল নাহিয়ানের সমালোচনা করার জন্য তাঁকে পুরস্কার গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হয়। ২০০২ সালে খালেদ মাত্তাওয়ার ইংরেজি অনুবাদে প্রকাশিত হয়। তাঁর নির্বাচিত কবিতার বই – উইদআউট অ্যা অ্যালফাবেট, উইদআউট অ্যা ফেইস-এর ছয়টি কবিতার অনুবাদ এখানে সংকলিত হলো।

কবিতাগুচ্ছ

দৃষ্টিপাত

আমাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়ে গেলো যা
তা কিন্তু এ পৃথিবীকে হারিয়ে ফেলা নয় –
থাকবে না আবাসযোগ্য এ গ্রহ
যদিও কখনো পুষেছি মনে তীব্র ভয়।
চলছে মানববিশ্ব জনপদে নিসর্গের নিবিড় রথে
হারাইনি পৃথিবী আমরা – ঘুরছে তা
আগের মতো নিজস্ব কক্ষপথে।

বেঁচে থাকবে এ সাবুজিক গ্রহ আমরা বিগত
হওয়ার হাজার নিযুত বছর পর-ও
সংগীত সাধকের পৃথিবী
এবং যাদের প্রিয় মৌনব্রত
ভাঙবে না তাদের নীরব বাসর-ও।

এবং যারা গৃহহীন ঘুরছে ছন্নছাড়া নিরন্তর
যুঝছে অস্তিত্বের সাথে সাময়িকভাবে,
এ গ্রহ তাদেরও বাসভূমি ডেরা ও ঘর
হারিয়ে যাবে না পৃথিবী তাদের অভাবে।

ঘুরবে কক্ষপথে – বদলাবে ঋতু
নীরবে খুলে দেবে দিগন্তের দুয়ার,
সকলে শামিল হবো নিসর্গের জল মৃত্তিকার;
হারিয়ে গেছে যা তা কিন্তু এ পৃথিবী নয়
জলধারায় বয়ে যাচ্ছে আমাদের সময়,
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে
আমাদের মিথস্ক্রিয়ায় সংযোগের অভাব,
পাউরুটি ভেঙে খেতে খেতে শিশুরা করছে না
একে অপরের দিকে দৃষ্টিপাত,
তাদের মুখে হচ্ছে না আলোকের সম্পাত,
বদলে যাচ্ছে পারষ্পরিক সহযোগিতার স্বভাব।

ডিসেম্বর

জানালা খুলবো না আমি আর
বুকে বাসা বাঁধছে অনিশ্চিত সন্ত্রাস,
সামুদ্রিক বাও বাতাসে নুয়ে পড়ছে সাবুজিক ঘাস,
বৃষ্টিপাতের নিচে কাঁপছে বৃক্ষের সবুজ পল্লব
আমার জোড়া জানালায় নিথর নিস্তরঙ্গ
পাপড়ি ঝরা ফুলের টব।

দেয়াল ঘড়িটি যাচ্ছে বেজে
শব্দ শুনি – টিক… টিক… টিক… টিক,
লেজ নাড়ে টিকটিকি – হাসে কী ফিক ফিক?

শুনতে পাই বহুদূরে পুকুরে তরঙ্গের শব্দ
মাছরাঙার ঠোঁটে মাছ হলো কী জীবনের মতো জব্দ?

খুব কাছে আঙুলের মৃদু ছোঁয়া
ঊর্মিময় আধো আধো স্বর
ফিরেছে কী আমার ভালোবাসা দীর্ঘ সফরের পর?

বড়ো আগে আগে এবার ফুটলো দেখি
চৌকাঠের হলুদ ফুল,
আমার দুয়ারে নাড়ে না কেউ কড়া
এমন কী পাখীদের নীড়ও হয়ে গেছে গড়া
শুধু আমরাই এখনো আছি গৃহহীন উন্মূল।

কাঠবেড়ালি ও আমি জোগাড় করছি খড়কুটা
বাসা বাঁধবো তো –
তাই খুঁজে নিতে হয় কিছু একটা।

বেড়াতে এসেছে মৌমাছি

উড়ছে একটি মৌমাছি আমার কাছেই
তারপর আরেকটি এসে বসলো আমার কামিজে
ঝলমল করছে ফুলের পাপড়ি জীবনের দীপ্ত মনসিজে।
বাতাস নাড়াচ্ছে ব্রিচনাট বৃক্ষ
কাঁপছে বাগিচা বাসন্তী স্বভাবে,
মৌমাছিগুলো এখানে আসলো কীভাবে?

আমার টেবিলে নেই তো এমন কিছু
শুধু এক টুকরা রুটি ও পনির,
উপচে পড়ছে ফরাসী মদিরা
গন্ধে মৌমাছি হয়েছে কী অধীর?

আমার কামিজে লেপ্টে আছে মৌমাছি
ব্যাপারটি আজব,
যাবে না উড়ে – করবে ঘুরপাক
ছড়াবে তারা ফুলের অনুভব!

তারা কী জানে – মধু
এ বিশ্বের সমাপ্তি চারবেলা চারদিকে
আমার কামিজের তলায় কাঁপছে
ফুলের রেণু অনিমিখে।

আশাপথ চেয়ে

সে তাকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো একদিন
রাজপথের ঠিক মাঝখানে –
পদচারী, হরেকরকমের যানবাহন চলমান,
উপেক্ষা করে সমস্ত কিছু বলতে চেয়েছিলো কথা
একটি প্রশ্নও ছিলো তার মনে
ভাঙাতে চেয়েছিলো তার অভিমান।
দেখা যখন হয়েই গেলো চলার পথে তার সাথে
বর্মের মতো দুহাত তুলে মেয়েটির অবাক হওয়া চোখে
তেড়ছা হয়ে পড়া রোদ চেয়েছিলো ফেরাতে।
কিন্তু সে হেঁটে গেলো নীরবে – তাকালো না ফিরে
ইচ্ছে হয়েছিলো কষে লাগাতে একটি চড়,
নিমেষে জীবনের তাবৎ নামতায় হয়ে গেলো গড়বড়
হৃদয়ে তার ছড়িয়ে পড়লো আগুন অপ্রাপ্তির দগ্ধ সমীরে।

শুনতে চেয়েছিলো তার মুখ থেকে একটি শব্দ
সে যদি সত্যি সত্যি এ শব্দটি করতো উচ্চারণ,
পৃথিবীতে পুষ্পবৃষ্টি হতো
কোরকের সন্ধানে প্রজাপতিরা হতো উন্মন।
আর মুদে আসতো তার চোখ দুটি গাঢ় আবেশে
শব্দ সে খুবই ভালোবাসে,
একটি ব্যাকুল শব্দ প্রজাপতির মতো উড়তো তার চারপাশে।

সমস্ত জীবন আমার বয়ে গেলো সাদী –
একটি শব্দের পিপাসায়… মননের তরী বেয়ে,
বসে আছি আমি সংকীর্ণ এক আশাপথ চেয়ে।

সুইয়ে সুতো পরিয়ে

আমাদের পারষ্পরিক কামনার মাঝখানে
পড়ে আছে দোলাচলের বিপুল প্রান্তর,
এই যে হাত ধরাধরি করে হাঁটছি একত্রে
উষ্ণতার প্রতিফলনে মন-মেঘনায় হচ্ছে রূপান্তর।

কিন্তু যেতে যেতে সামনে পড়ে একগেয়েমির প্রবল প্রাচীর,
ফাটল ধরে কী সম্পর্কে – দেখা দেয় পলেস্তারায় চীর?

আমরা কী বলতে পারি না কথা বসে বসে কোন রেস্তোরাঁয়,
অথবা পারি না যেতে নদীরতীরে – মুখ দেখতে জলের আয়নায়?
বসতে তো পারি পানিতে হাত ডুবিয়ে,
মাথার উপর দিয়ে উড়ে যাবে একজোড়া সবুজ টিয়ে।
আমাদের তৎপরতা শুধু কী নিশ্বাস প্রশ্বাসে রাখবো সীমিত,
নাকি পরষ্পরের প্রশ্নবানে কেবলই হবো বিব্রত?
যখন-ই দেখা হয় তোমার সাথে
মন তোমার ডুবে আছে অজানা কোন মোহনায় – তুমি শ্রান্ত,
কোন স্রোতে ভাসাবো গা পারি না বুঝতে
দুশ্চিন্তায় আমিও ভারক্রান্ত।
সময় মতো আসতে পারিনি তো তাই – আমার বড় লজ্জা পায়,
সুইয়ে সুতো পরিয়ে তুমি অপেক্ষা করছিলে গাছের সুশীতল ছায়ায়।

অলীক ফানুস

আমি এসেছি তাকে তা জানানো হলো,
হাসির রেখা ছুঁয়ে গেলো তার ঠোঁট – চোখ ছলছল।
অপেক্ষা করলো সে দুটি দিন – তারপর পুরো দু-মাস
প্রতীক্ষায় গুনলো প্রহর,
কুরুশ কাটায় পশমে উল বুনে বুনে দোদুল্যমান অন্তর।
মোহনায় চোরা স্রোতে নাওয়ের মতো দোলাচলে,
অপেক্ষা করলো সে নক্ষত্রের চলে যাওয়া অব্দি অস্তাচলে।

আমি যা লিখছি সেদিকে তাকিয়ে নিজেই আজ
হেসে উঠি আপন মনে – ফেলে রেখে জরুরি কাজ;
বলি সাদী – যুক্তিবাদী হে মানুষ,
আজ রাতে কী লিখছো তুমি
কোন আকাশে ওড়াচ্ছো অলীক ফানুস?