সাধনা আহমেদ > প্রার্থিনী [২] >> কাব্যনাটক

0
428

পর্ব ২

ঠাকুর পরিবারের বহুল আলোচিত কাদম্বরী-রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক নিয়ে এই কাব্যনাটক।

[পূর্ববর্তী পর্বের (১) লিংকটি এই পর্বের নিচে দেয়া আছে]

কাদম্বরী >>
স্বামী ছাড়া তোমার নারীজন্মের সব কিছু অর্থহীন।
তাকে ঘিরে জীবন ধরা দেবে তোমার কাছে।
তোমার ধ্যান-জ্ঞান-প্রেম-বাঁচা-মরা- সব তার জন্য।
তোমার এই নারী জীবনের লক্ষ্য শুধুই স্বামী।
বেড়ে উঠেছি এমন হাজারটি পদ শুনে শুনে
নারী হয়ে ওঠা এই সব ধ্যান করে করে।
এরপর এই নারীজীবনে সেই স্বামী কোথায়?
কী তার ভূমিকা? প্রেম নয়! সম্মান নয়! শুধুই প্রভুত্ব!
আর অন্য নারীর সঙ্গে সারাক্ষণ নিজ-স্ত্রীর তুলনা।
হ্যাঁ- বেঁচে থাকার জন্য আছে আরও অনেক কিছু।
আমারও ছিল।
প্রাণপণে আঁকড়ে ধরেছিলাম পুষ্পশিশু উর্মিকে।
ওরে সোনা তুই যে আমার তৃষিত নৌকার নোঙর
আয়- তোর অমল এই মুখ চেয়ে ভুলে থাকব সব।
সুবাসিত উর্মির ঝুমঝুম নুপুরে বেজেছে জীবন
হাসতে হাসতে ছুটেছি ওর পিছে পিছে- হা-হা-হা-
ছুটতে ছুটতে… কখন গড়িয়ে পড়ল অন্য পৃথিবীতে
আহ…উর্মি প্রাণের ধন ফিরে আয়…ফিরে আয়…।
সন্তানহীন মাতৃমনের হাহাকার মেটাতে- স্বর্ণদি
নিজকন্যা উর্মিকে দিয়েছিলেন আমায় উপহার।
ভালবাসার সেই দান রাখতে পারিনি আমি।
উর্মিহারা স্বর্ণদি- লেখার টেবিলে নির্র্নিমেষ চোখে
স্তব্ধ রাতদিন- কতবার গিয়ে দাঁড়িয়েছি তাঁর সামনে
দৃষ্টিতেও যদি একটিবার তিরস্কার করতেন আমায়
তবে শান্তি পেতাম- বেঁচে যেতাম আমি।
স্বর্ণদি- এতো ভালো কেন বাসলে আমায়
কেনই বা এমন স্তব্ধতার আঘাতে মারলে
বুঝলে না- উর্মির সঙ্গে সেদিন মরেছিলাম আমিও।
কাদম্বরীর রোদন বয়ে যায় বৈশাখের তপ্ত বাতাসে।
রেশটুকু তার দোলনার শেকলে কম্পিত হয় নীরবে।
কাদম্বরীকে জড়িয়ে নিয়ে প্রার্থিনী বসে দোলনায়
হাতে হাত রেখে প্রেমাভাসিত মৃদুকণ্ঠে বলে।
প্রার্থিনী >>
প্রেমও তো ছিল কাদম্বরী।
তোমারই জন্য মিহি বুননে রচেছিল কত সোনালি মসলিন
ব্রহ্মাণ্ডের অগণন আভা নিয়ে ছিল দাঁড়িয়ে চৌকাঠের পারে
তোমার বালিকাবেলার পুতুল বিয়ের সেই অতিথি।
অহঙ্কারিনী তুমি তাই অঞ্জলি নেবার পাওনি ফুরসৎ
দেখনি খুলে দরজা নির্ঘুম প্রতীক্ষায় আছে দাঁড়িয়ে
পদাবলীর আড়ালে ছদ্মবেশী কিশোর ভানুসিংহ।
প্রার্থিনীর কথায় চঞ্চল কাদম্বরী- ওঠে বেজে কিশোরী পায়ে।
যৌবনের পরতে পরতে বেজেছিল যে সেঁতার একদিন-
চোখের চাওয়ায়- মুখের কথায়- হাসির ঝঙ্কারে-
শাড়ির আঁচলের দূরন্ত বাতাস আনে উড়িয়ে সেই অতীত
জলতরঙ্গ হয়ে চলে ভেসে ভেসে চরণে চরণ তার।

কাদম্বরী >>

আমের আচার- ডালের বড়ি- ঝগড়া- খুনসুটি-
পুতুলখেলা- ফুলকুঁড়ানো- মালাগাঁথা- ধারাপাতের সুর-
কুমারসম্ভব- নীলখাতা- লোটাস ডায়রি নিয়ে
কাড়াকাড়ি হাসাহাসি- মেঘনাদবধ কাব্য শেষে
স্বপ্নপ্রয়াণ কাব্যের অপরূপ রাজপ্রাসাদ তখন
মেলে ধরেছে আমাদের সামনে অবারিত আকাশ।
কল্পিত প্রাসাদের অজানা কক্ষে ঘুরেছি নিবিড়
কত চিত্র-মূর্তি আর বাগানবাড়ির ফোয়ারার জলে
আমরা দু’জন করেছি খেলা দুপুরের অবসরে।
পৃথিবীর অগোচরে নির্মিত হয়েছে অন্য পৃথিবী
দুজনের অভিন্ন প্রাণে বাঁধা একটি জগত।
নিজস্ব জল-হাওয়ায় জীবনে গজিয়েছে পত্রপল্লব
গভীর অরণ্যে প্রাকৃত বৃক্ষ হয়ে আমরা উঠেছি বেড়ে
রৌদ্রের কারিগর প্রজাপতি নিয়েছে শুষে মরণের রঙ
ষোড়শসন্ধিতে উঠেছিল বেজে পদাবলীর সুর
নওল সে কিশোর আপন মনে কেঁদেছিল একা।
আর না জানে তো কেউ- জানে তা অন্তর্যামী
যতটা কেঁদেছিল সে- অধিক ঝরেছি আমি…।
আভূমি প্রণম্য ভঙ্গিতে আছড়ে পড়ে কাদম্বরী
স্তব্ধ দিঘির জলে শিশির পতনের মতো
নিঃশব্দ কান্নার ঢেউ ওঠে শরীর জুড়ে।
একদা পদাবলীর সেই বিরহ-সুর আসে ভেসে
বায়ুস্পর্শে তার পিঠময় ঢলা চুলে করে খেলা।
কাদম্বরীর রোদন প্রার্থিনী দেখে নিরাবেগ চোখে
হঠাৎ রণরঙ্গিনী রূপ ঝংকৃত হয় তার দুহাতে।
লুটিত কাদম্বরীকে টেনে তুলে দাঁড় করায় মুখোমুখি
লুপ্ত পৃথিবীর হাওয়া ক্ষোভের হল্কা হয়ে আসে দৃষ্টিতে
প্রতিবিম্বের সামনে অগ্নিময় ভাষায় ফেটে পড়ে সে।
প্রার্থিনী >>
ততদিনে বুঝতে বাকি ছিল না স্বামী তোমার বহুগামী
পড়ে থাকেন নানা রূপজীবীনীর অন্দরে-
তবু করেছ অপেক্ষা চিরকালের সাধ্বী স্ত্রী হয়ে।
নিজ হাতে করা সূচিপুষ্পের বিছানায়
কত রাতের দুপুর একলা গেছে গড়িয়ে
মৃত্যুর মতো জ্যোৎস্না ভিজিয়েছে জানালার খড়খড়ি
তৃষ্ণার জল চেয়ে ছুটেছে দখিনা বাতাস
একাকী অন্ধকারে অবিরাম কেঁদেছে সেই নারী
তোমার অšর্তগত এই আমি- প্রাথির্নী।
চেয়েছে আজলা ভরে তুলতে প্রেম জীবনে
মিটিয়ে নিয়ে তৃষ্ণা করতে স্নান শরীর ভরে।
কিন্তু শুনতে পাওনি তুমি শুনতে চাওনি বলে
কিংবা সতীত্বের কুসংস্কারে ভরে রেখেছিলে মন।
কাদম্বরী >>
সতীত্ব- সে তো একটি নির্বোধ ধারণা।
প্রেমের সামনে দাঁড়ানোর কী শক্তি আছে এর!
প্রেম যে স্রষ্টার মতো পৃথিবীর আদিতম বিশুদ্ধ জল
কেবল মাত্র মরে গিয়েই যাকে স্পর্শ করতে হয়।
প্রেম নামের স্পন্দমান সেই নুপুর কেঁদেছে সত্তার গহীনে
তবু পারিনি করতে স্বীকার- শুধুই দিয়েছি দূরে ঠেলে
নানা ছলে পরিহাসে আর তিরস্কারে।
আমি যে মরেছিলাম জ্যোতিরিন্দ্রজলে
কেমন করে স্পর্শ করি অন্য সরোবর?
প্রার্থিনী >>
চমৎকার- নানা বাহানায় করনি তাকে স্বীকার।
তবু অন্য কাউকে নয় আঁকড়ে ধরেছিলে রবিকেই
ছিল যত কষ্ট তোমার নির্দ্বিধায় ঢেলেছ ওরই কাছে।
নিজেকে ভুলে নিভৃতে বয়েছে তোমার বেদনাভার।
ভেবেছিলে কি একবার! তোমার ভার বইতে গিয়ে
নিঃশব্দে কত বেদনায় বিদ্ধ করেছে সে নিজেকে?
সেই মুখে তাকিয়েছ কোনদিন? কী অসম্ভব স্বার্থপর তুমি!
কিন্তু এতকাল ধরে যে স্বামীর প্রেমে আছো তুমি মজে
নাটকের নামে তিনি পড়ে থাকছেন নটীদের বেশ্যালয়ে।
কাদম্বরী >>
প্রার্থিনী দোহাই তোমার। কোনো নারীকে বলো না এমন।
জগতের কোনো নারী কখনও কি হতে চেয়েছিল বেশ্যা?
নারীকে ওপথে নামিয়েছে যারা- তারাই অধিক বেশ্যা।
কিন্তু এই সত্য সমাজ করবে না স্বীকার কোনোদিন
নারীর জন্য গড়েছে তারা পছন্দমতো নিয়মনীতির বেড়া।
যাক সেকথা- আমার স্বামী নাটক করেন যাদের নিয়ে
ওদের কেউ কেউ সেখানে ছিলেন হয়তো কখনও
কিন্তু এখন তাঁরা শুধুই নাটকের নটী- শিল্পী।

প্রার্থিনী >>

আরও চমৎকার- স্বামীর জন্য কত প্রেমভক্তি।
যদি এতোই প্রেম তোমার তবে মৃত্যু চাও কেন?
পতিব্রতা হয়ে স্বামী-পুজোয় কাটিয়ে দাও জীবন।
স্ত্রীকে রেখে স্বামী পড়ে থাকেন অন্য নারীর কাছে
তবু পতিব্রতা সতীর মহান উপাধি পাবার লোভে
হওনি বিচলিত- করনি প্রতিবাদ! তাই না?
কাদম্বরী >>
ঠাকুরপরিবার বধূ করে এনেছেন সামান্য এক কর্মচারীকন্যা।
শিখিছেন পড়ালেখা আদব-কেতা- এটাইতো বড় সৌভাগ্য
আর কী চাই জীবনে তার!
স্বামী যদি হয় পরনারীগামী কী ভাষায় করবে সে প্রতিবাদ?
যখন পরিবারের সবাই সে-প্রশ্নে উদাসীন!
তখন নীরবতা ছাড়া আর কোনো ভাষা কী থাকে?
তাদের তো দরকার শুধু নিজেদের আভিজাত্যের পুতুল।
আর সেই জন্য প্রথমেই কেড়ে নাও তার অতীত-
কখনও যেন যেতে না পারে জন্মের আতুর ঘরটির কাছে।
এরপর আঘাত করো তার চৈতন্যে-
প্রতিক্ষণের নানা ঘাত-উপঘাতে স্তব্ধ করে দাও
যেন নিজেকে আর চেনার চেষ্টও না করে সে।
চারদিক ঘিরে দাও শত আড়ম্বরের ঊর্ণজালে
আর তখনই হয়ে উঠবে সে উৎকৃষ্ট পুতুল।
প্রার্থিনী >>
যদি সে না পারে তাকে বিদ্ধ করো দৃষ্টির অবজ্ঞায়।
প্রতিপদে আচরণে বুঝিয়ে দাও সেই অযোগ্যতার কথা।
কেন কাদম্বরীকেও ইংরেজি-কেতায় দূরস্ত হতেই হবে!
শুধু ইংরেজি কেতারই আছে মূল্য প্রেমের নেই?
তবু নিজেকে লুপ্ত করে অন্যের মতো চেয়েছে হতে।
আড়ালে সে হয়ে উঠল সুক্ষ্ণবোধের এক অন্য নারী
যে কিনা শিখেছ চিনতে সম্পর্কের অভিরূপ
উপেক্ষা অপমান সহ্য করতে করতে বুঝেছে-
আসলে সে কেউ নয় শুধু একটি পদবী মাত্র- ‘স্ত্রী’।

কাদম্বরী >>

ততক্ষণে জীবনের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে দুই কাদম্বরী
বিষন্ন। নিঃসঙ্গ। বিচ্ছিন্ন। এমনকি নিজের থেকেও।
না পারে ফিরে যেতে না পারে মেনে নিতে।
তবু জ্বলে থাকে প্রেম নির্ঘুম বহ্নিশিখা হয়ে
নিজস্ব সেই আগুনে প্রতিপলে দগ্ধ হওয়া শুধু
ভস্ম হতে হতে অস্থিমজ্জা আমার জেনেছে
একান্ত নিজের এই অগ্নিকুণ্ডের নামই প্রেম
জীবনের মৃত্যু না হলে কখনও হবে না নির্বাপন।
এসো মৃত্যু… অনন্ত আলিঙ্গনে হই আবদ্ধ…
তোমার শীতলগর্ভে হোক সমাপন প্রেমের অগ্নিহোত্র।

একথা বলেই কাদম্বরীর ছুটে গিয়ে আবার তুলে নেয় আফিমজলপাত্র।
ফড়িং-শিকারী উড়ন্ত ফিঙের মতো এসে প্রার্থিনী তা ছিনিয়ে নেয়।
প্রতিহত কাদম্বরী বসে পড়ে সাজ-টেবিলের সামনের আসনে।
একে অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকে- দৃষ্টির সেই তীব্রতা যেন-
প্রাগৈতিহাসিক কোনো প্রাণীমুর্তির চোখে থেমে থাকা আগুন।
ঝড়োবাতাস ততক্ষণে নিশ্চল- অপার স্তব্ধতায় নিমজ্জিত ঘর
অবিরাম ঝিঁঝিট আরও জমাট করে তোলে নৈঃশব্দ্যের শরীর।
তেতালার ছাদ-কার্ণিশ ঘেঁসে প্রস্ফুটিত কৃষ্ণচুড়া গাছে
দুটি হলদে পাখির সঙ্গম শীৎকার-
ক্ষীণ চির ধরায় শীতল স্তব্ধতায়- সম্বিত ফেরে তাদের।
ঘরের কোণের ছোট টেবিলে পাত্রটি নামিয়ে রেখে
প্রার্থিনী গিয়ে দাঁড়ায় ছাদের আঙিনায়।
পাখি দুটি উড়ে যায়- বাতাসে রঙের তরঙ্গ তোলে ওদের ডানা।
নন্দনের টবে লাগানো গাছগুলো বৈশাখী তৃষ্ণায় কখন গেছে শুকিয়ে
দু-একটি ডালে আধফোটা শুকনো গোলাপকলি তখনও আছে ঝুলে।
ঊর্ধ্বমুখে তাকিয়ে প্রার্থিনী দেখে মেঘদল স্থির আকাশের মাথায়।
কক্ষের ভেতরে বসা কাদম্বরীর দিকে ফেরায় তার দৃষ্টির আহ্বান।
মন্ত্রপুতের মতো সেও এসে দাঁড়ায় বিগত নন্দনে। বলে প্রার্থিনী-
প্রার্থিনী >>
তোমার এই নন্দনকানন- এখানে বসতো সাহিত্যবাসর।
ছিল ভরা সৌরভমঞ্জরি তখন- আজ নির্জল বিগত পুষ্পবিতান
পত্রগভীরে জীবনতৃষ্ণা হয়তো আছে জেগে সঙ্গোপনে।
মনে কি পড়ে কাদম্বরী- একদিন তুলেছিলে গড়ে নিজ হাতে
বপনে-রোপনে ছিল সাথে তোমার খেলার সাথী- সেই রবি।
মুহূর্তে কুঁচো মাছের রূপালি ঝাঁক কাদম্বরীর চোখে।
বিভাবতী নারীর তরঙ্গায়িত শরীর ভুলে যায় মৃত্যুর কথা।
ছুটে গিয়ে পুষ্প-চারাদের কাছে স্পর্শ করে প্রেমে
দৃষ্টিতে ভাসে যৌবনশিক্ত সতেজ ফুলপূর্ণ কানন
হারানো সৌরভমঞ্জরি কণ্ঠে তার ওঠে বেজে।

কাদম্বরী >>

হ্যাঁ- সকাল বিকাল আমার সাথে রবিও জল দিতো গাছে।
আমার পছন্দের কত গাছ এনে নিজহাতে করেছে রোপন।
এই দেখ বেলফুলের গাছ- যেদিন এর চারাটি নিয়ে এলো-
আমি বললাম- সেকী এ তো বেল ফুলের চারা!
টবে কিছুতেই বাঁচবে না- ভূমিতে রাখতে হবে ওকে।
প্রার্থিনী >>
শুনে মাস্টার মশাইয়ের মতো গম্ভীর হয়ে বললে-
ওকে প্রতিদিন গান শোনাব- কবিতা শোনাব-
সাধ্য কী ওর যে আমার বিনা আজ্ঞায় মরবে?
এরপর গাছটির একটি ডাল ধরে নিয়ে বললে-
শোনো হে সুরভিত কুসুমবৃক্ষ
সময় মতো বউঠানের মালা গাঁথার ফুল ফুটিও কিন্তু-
না হলে তোমাকে নির্বাসনের দণ্ড দেওয়া হবে।
ভাবখানা এমন যেন পৃথিবীর সব গাছের বাঁচামরা-
আর ফুল ফোটানো ওর আজ্ঞার উপর নির্ভরশীল হা হা হা…।
কাদম্বরী >>
কখনও ভার হলে মন- চুপ করে বসে থাকতাম বেদির ওপর।
তখন কিচ্ছুটি বলতো না মুখে- ফুল তুলে মালা গেঁথে এনে
আমার খোঁপায় দিতো জড়িয়ে।
এরপর আমার পছন্দের কোনো একটি বই
না হলে নিজের কবিতার খাতা নিয়ে এসে
পায়ের কাছটিতে টুপ্ করে বসে শুরু করতো পড়া।
কখন বিকেল ঘুমিয়ে যেতো সন্ধ্যার কোলের ভেতর-
উঠে আসতো চাঁদ রবির মুখের মতো- তাকিয়ে মনে হতো
এমন চাঁদ এর আগে কখনও ওঠেনি পৃথিবীর আকাশে।
অদ্ভুত জ্যোৎস্নায়- কবিতায়- ওর কণ্ঠের মেদুরতায়
নিজেকে আবিষ্কার করতাম অন্য এক রূপে।
মনে হতো আমি যেন পৃথিবীর একমাত্র আলোকবৃক্ষ
প্রতিটি পল্লবে যার জ্বলছে অগণন নক্ষত্ররাজি
সেই বৃক্ষের নিচ দিয়ে বয়ে চলে ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত নদী
এর পাড়ে বসা শামুকের মালার মতো মুরলি পাকানো
লতানো চুলের অমল এই রাখালের পাঠ শুনে শুনেই
নির্দ্বিধায় কাটিয়ে দেওয়া যায় পুরো একটি জীবন…।
প্রার্থিনী >>
যায় ডুবে যদি পৃথিবীর আকাশের চাঁদ
নক্ষত্রের মেলা যায় মুছে অবর্ণনীয় অন্ধকারে
যাক ভেসে প্লাবনে ঘাস-বনের সবুজ
নেই ক্ষতি তাতে।
পুণ্যাহের আড়ালে খাজনার পরিহাস যাবে মিটে
অনশ্বর প্রেম খাবে না ঠুকরে করাত মাছের দল
আঙিনার প্রান্তে এসে সময়ের গতি হবে নিশ্চল
পুরাণের ভূমি থেকে হবে শুরু মন্থনের পুনরুত্থান
নোনা ঘামের উষ্ণতা দেবে জন্ম সঙ্গমের অক্ষরমালা।
কাদম্বরী >>
আহ… প্রার্থিনী… ধ্বংসের কণ্ঠ তোমার স্তব্ধ হোক।
কী নির্মম নির্লজ্জ তুমি- রীতিনীতি সংসার সমাজবোধ
কোনো কিছু বিচলিত করে না তোমায়!
আমার ভেতরের আমি এত কঠোর! কী লজ্জা হায়…।
ঘৃণায় লজ্জায় বেদনায় কেঁদে ফেলে কাদম্বরী।
হাতের মুঠোয় ধরা গোলাপ গাছটির কাঁটা ফুটে গিয়ে
রক্ত বের হয়ে আসে তার অনামিকার ডগায়।
বিস্ফারিত চোখে গাঢ় লাল রক্তে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে।
হঠাৎ বজ্রপাতের শব্দে বাড়ির উত্তর কোণের মহুয়া গাছ থেকে
বাদুরের ঝাঁক ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গিয়ে বসে আরেকটি গাছে।
প্রার্থিনী এসে দাঁড়ায় কাদম্বরীর সামনে- হাত তুলে নেয় হাতে
আঙুলের রক্তে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে।
প্রার্থিনী >>
তোমার অন্তর্গত আমি- তারও থাকতে পারে অন্য আমি।
পৃথিবীর প্রথম মানবীর মত মুক্ত- অকৃত্রিম জলাভূমি সে-
নিষিদ্ধ বাগানে প্রবেশের অধিকার যার জন্মগত
যেখান থেকে সৃজিত হয়েছে মানুষের ইতিহাস।
রীতিনীতি ভনিতা সে তো সামাজিক কাদম্বরীদের জন্য।
তোমরা যারা জীবনের চৌদিকে আজীবন রাখো ঘিরে
নিজের সাথে প্রতারণার এক বিস্তৃত জাল।
পাও না দেখতে নিজের মুখটিই- আত্ম-অন্বেষণ তো বহুদূর।
কোন আকাঙ্ক্ষায় আমাকে নিজস্ব আমি বলে আবদ্ধ করো?
রবির কথায় একটু আগে যেভাবে নেচে উঠল তোমার হৃদয়-
গভীর দৃষ্টি মেলে তাকাও সেদিকে।
সন্ধান করো কাদম্বরী- কোনটি তোমার নিজস্ব সত্য।
প্রেমপূর্ণ রক্তাভ রবি নাকি ধুলিধূসর প্রতারক জ্যোতি।
যদি হয় সত্য রক্তিমতা তবে মরতে চাও কেন?
আর যদি ধূসররতা হয় তোমার একমাত্র আস্বাদ
তবে মৃত্যুর আগে কেন এমন আত্মজিজ্ঞাসার ঢেউ!
বিভ্রান্ত কাদম্বরী তাকায় প্রার্থিনীর দিকে।
একি তার নিজেরই মুখ? কোথায় লুকিয়েছিল!
নিজেকে বোঝার কোথাও কী তবে হয়েছিল ভুল-
তা না হলে কেন এতো প্রশ্ন জেগে উঠল মনে?
এ-কোন নতুন অন্তরীক্ষে সে দাঁড়িয়ে আজ-
কিছুতেই স্থির করতে পারে না নিজস্ব সত্য কোনটি।
এবার কাদম্বরীর কাঁধে হাত রেখে বলে প্রার্থিনী।

প্রার্থিনী >>

স্থির করতে পারছ না তো? একবার দেখেছ কি ভেবে
কী আর্শ্চয প্রেমোলব্ধি লুকিয়ে নিজের সঙ্গে প্রতারণা!
চরণে তোমার নিবেদিত হয়ে লিখেছিল রবি।
‘যেথা আমি যাইনাকো, তুমি বিরাজিত থাকো
আকুল এ আঁখি পরে ঢাল গো আলোকধারা।’
নিজেকে আড়াল করে কেন এমন পাষাণ হলে কাদম্বরী।
তোমার উপেক্ষার বেদনায় নিমজ্জিত হয়ে আবার লিখেছে।
‘পাষাণ হৃদয়ে কেন সঁপিনু হৃদয়
মর্মভেদী যন্ত্রনায়, ফিরেও যে নাহি চায়
বুক ফেটে গেলেও যে কথা নাহি কয়
প্রাণ দিয়ে সাধিলেও, পায়ে ধরে কাঁদিলেও
একতিল একবিন্দু দয়া নাহি হয়
হেরিলে গো অশ্রুরাশি, বরষে ঘৃণার হাসি,
বিরক্তির তিরষ্কার তীব্র বিষময়।’
একজনের উপেক্ষার আগুনে জ্বলতে জ্বলতে-
অন্যজনকে একই আগুনে করেছ নিক্ষেপ তুমিও।
জ্যোতিরিন্দ্রের মতো একই অপরাধ কেন করলে?
কাদম্বরী >>
আকুতি রবির জ্বালিয়েছে আমার সহস্র দুপুর
বিকেল-রোদ বেজেছে শরীরের খাঁজে খাঁজে
কতবার চেয়েছে দিতে খুলে জানালার শেকল
নিভৃত ভাবনায় নির্ঘুম রাত গড়িয়েছে ভোরের চরণে
প্রতিটি মুহূর্তে হয়েছে মনে- ফুটেছে যা আমারই জন্য-
করলে স্পর্শ সেই অমলিন পুষ্পরাশি-
হয় যদি মলিন নিমেষ হারালে!
হৃদয় আমার করেছ কে অধিকার-
কাকে ভালোবাসি আমি প্রাণমন দিয়ে?
করতে সন্ধান সেই সত্য লড়েছি নিজের সাথে
প্রতিবার বলেছে অনুভব- সত্তা আমার ডুবে আছে
জোতিরিন্দ্রের জ্যোতির্ময় ডানায়।
না জানুক সংসার সমাজের রক্তচোখ- জানি শুধু আমি
জ্যোতিরিন্দ্র বিনা কখনও বাজেনি হৃদয়ে অন্য নিক্কন।
প্রার্থিনী >>
সেই স্বামীর উপেক্ষায় দগ্ধ হতে হতে কখনও কখনও
রাগ-ক্ষোভ-দুঃখে চেয়েছি ফেলতে ভেঙে সবকিছু।
যত চেয়েছি- প্রবল ঝড়ে তত বেজেছে ডানার শব্দ
বৃষ্টির শরীর উঠেছে ভরে জ্যোতিরিন্দ্র-ঘ্রাণে
সেই গন্ধজলে একলা অবগাহনের ক্লান্ত চোখ তুলে
তাকিয়ে দেখি- স্বসৃজিত আরেক সরোবর হাতে
নিভৃতে নিবেদিত রাখাল-রবি তখনও আছে দাঁড়িয়ে
চোখে তার আত্মদানের দুনির্বার আকাঙ্ক্ষা
দৃষ্টিতে আছে জমে অদেখা ভুবনের বিপুল আলো।
এর সামনে পারে কি দাঁড়াতে আমার প্রতারক মন?
একজনের বহ্নিশিখায় ডুবে থেকে
কীভাবে দেবো ডুব আরেক সরোবরে!
কাদম্বরী >>
তার চেয়ে এই ভালো- তিরষ্কারের বেদনায় নিমগ্ন হয়ে
কাঁদে কাঁদুক অবিরাম- খেলার সাথী রোদনের সখা আমার
অখণ্ড প্রাণের বিচ্ছিন্ন শরীর।
ক্ষুদ্রতার গণ্ডি পেরিয়ে যুক্ত হোক বিশ্বভূবনে।
দৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে যখন গিয়েছিল বিলেতে
তখনও দুই মন পড়েছিল আত্মার কাছে
দুজনের মগ্নতা ছিল চিঠির ভাষায়।
বিলেতে কতকিছু দেখা আর শেখা হলো রবির
ফিরে এসে সমস্ত গল্পের ঝুলি দিয়েছিল উপুড় করে।
[চলবে]

 

প্রথম পর্বটি (১) পড়তে হলে নিচের লিংকটি ক্লিক করুন :

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80-%e0%a6%95/