সাধনা আহমেদ > প্রার্থিনী >> কাব্যনাটক

0
542

প্রার্থিনী >> কাব্যনাটক

[ঠাকুরবাড়ির বহুল আলোচিত কাদম্বরী দেবীকে নিয়ে এই নাটক।]

জগতের যত নারী ফোটে পারিজাত হয়ে
জীবন-রঙ্গভূমে সৃজন অভিসার যাঁদের
সুরভিত সেই নারীদের করি নমস্কার।
সুন্দরের সঞ্চয় দিয়ে যে গড়েন নিজেকে
যৌবনের প্রতীক অপরূপ মানুষরূপে
করি নমস্কার অমিত সেই পুরুষদের।
অকারণ দোষ অন্বেষণে বৈরীভাব ধরে
রূঢ় দুর্বাক্য যাদের ফণিজিহ্বায় নিত্য
সংসারী সেই জীবদের জানাই মিতভাষ।
আর চিত্তবান যারা কূহুকুজনের মতো
মনোহরণ পদাবলীতে প্রশান্ত প্রাণ
জগতের সে মানবপদে হই প্রণমিত।।

ওহে জন্মবিহীন নিরাকার আলোকিত সত্তা
আকারমঞ্চে আজ তোমাকেই করি আহ্বান।
আলো অন্ধকারে দৃশ্য ও শ্রাব্যের চিত্তপটে
তোমারই মতো অপার নিঃসঙ্গ আরেক সৃজক
হৃদয়তন্তু ছিঁড়ে সৃষ্টি করবে যে অস্তিত্বমানকে
বুদ্ধি-শক্তি-বোধ-বাস্তব ও কল্পনায় অসমন্বিত
শস্যভূমির মতো উদার অমলিন প্রাকৃত সে নারী
জন্মের পরম্পরায় অস্থিমজ্জায় লেগে আছে যার
সুপারিবাগান ঘেরা নদীতীরের তৃণভূমির গন্ধ
নিয়তির বিপুল খেয়ালে সে পড়েছিল আছড়ে
আভিজাত্যের গাম্ভির্যে নির্মিত প্রস্তর প্রাঙ্গণে।।

জীবনের ছায়াপথ মায়াপথে নটরাজ নদী
মাদলধ্বনিতে যে সব জ্যোৎস্নানরনারী
স্ফুলিঙ্গের প্রেষণায় করে সৃষ্টি পারিজাতশিশু
যৌবনভূমি সাপের ফণাও করে আলিঙ্গন
শ্লাঘ্য সেই যৌবন তুচ্ছ কেন হয় জীবনতটে!
প্রেমধমনীর মিহিকণারা গেঁথে চলে স্বর্গনদী
জীবনচিত্রকলার পরতে পরতে বিচিত্র ছলনা
গভীর সঙ্গোপনে চলে বাড়িয়ে প্রেমের অপচয়
সুন্দরের দুঃসহ যন্ত্রণারা তোলে বেহাগের ধুণ
মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় হয় ব্যকুল বসন্তবাহার প্রেম
বিপুল ক্ষুধার আড়ালে বাড়ায় হননেচ্ছার সঞ্চয়।।

আসন্ন কালবৈশাখির অবিরাম ধ্বনিতে
কাদম্বরীর মহল ঘোরগ্রস্ত হয়ে থাকে
দখিণের অলিন্দে শূন্য দোলনার শেকলে
বায়ুস্পর্শে চলে বেজে জীবনের কলহাস্য
সকালে ও সাঁঝে প্রতিদিন ওখানেই বসতো সে
মুখ তার ঠেকে আছে আজ উত্তরের জানালায়।
হাওয়ায় যখন যায় উড়ে কেশের বিন্যাস
দৃষ্টি ফেলে সেগুন কাঠের আসবাবের খাঁজে
দেখে কত স্মৃতি উঁকি মেরে আছে সেখানে।
কাদম্বরী দাঁড়ায় এসে আলমারির সামনে
খোলে অতি যত্ন করে রাখা আফিমের গুলি
পৃথিবীর আদি উপাদান জলে দ্রবিত করে নিলে
আফিমযোগে তৈরি হয়ে যায় মৃত্যুজল।
এতবছর একাকী অশ্রুপান করে এসেছে সে
আজ মৃত্যুজল পানের হয়েছে তার প্রয়োজন।
মৃত্যুপাত্রে ওষ্ঠ স্পর্শ করতে গিয়ে কেঁপে ওঠে দেহ
দৃষ্টি তার যায় আটকে সাজটেবিলের আয়নায়
তাকিয়ে নিজের প্রতিবিম্বে দ্বিধাভর করে শরীরে
বসে পড়ে সে দর্পনসম্মুখে রাখে নামিয়ে বিষপাত্র
নিবীড় দৃষ্টি প্রতিবিম্বজুড়ে কণ্ঠে আত্মজিজ্ঞার ঢেউ।

কাদম্বরী >>
পৃথিবীর প্রথম সমুদ্র নীরবে কম্পিত। যেখানে ছিলাম আমি।
নাম যার মাতৃগর্ভ। ছিল কি তা অন্ধকার কিংবা আলোকিত?
এইক্ষণে- মৃত্যু নামক যে গর্ভে প্রবেশ করতে চাই আজ
সেকি আলোকতরঙ্গে ভরা নাকি তমসাশঙ্কুল!
আমি কি জানি তা? আচ্ছা কে আমি!
জীবনের কোনখানে এলে পাওয়া যায় আত্মপরিচয়
সত্তার অনুভবে যাকে বলা যায় ‘আমি’।
কখন মানুষ হয়ে উঠতে পারে ‘আমি’
জেনেছি কি তাও?
মাতৃশরীরের কবোষ্ণ পথ পার হয়ে পঁচিশ বছর আগে
যখন আমার স্বর ছড়িয়েছিল পার্থিব জল ও হাওয়ায়
আঙিনা আর অন্দরে- কেমন ছিল সেই ‘আমি’?
কেমন হতে পারতো সে আজ? ভেবেছি অনেক বার।
আজ আমি নাম তার দিয়েছি ‘প্রার্থিনী’
নৈঃশব্দে লুপ্ত- আমার অন্তর্গত সেই ‘আমি’
আমর্ম খোলস ভেঙে একবার এসো সম্মুখে
মোহঘোর পেরিয়ে মৃত্যুজলে তলিয়ে যাবার আগে
জীবনের অগ্নিহোত্র তোমার সাথেই করি সমাপন।

কাদম্বরীর প্রার্থনা গুঞ্জরিত হয় প্রকৃতির মর্মজুড়ে।
স্তব্ধতার চাঁদোয়ায় অকস্মাৎ কূজিত বনকুঞ্জ
আকাশমুখো হয়ে প্রাসাদ প্রান্তরে আসে প্রার্থিনী।
নুপুরের শব্দ তার চলে ভেঙে নিরবতার দেহ
তাকায় বনবিথী তরুলতা আলো-ছায়ার ভাঁজে
পাপড়ি মেলে তিতলীঝাঁক সেই চাউনিতে
প্রবল বাতাস সমুদ্রসম ঢেউ তোলে জানালার পর্দায়।
ত্রস্ত পদক্ষেপে কাদম্বরী ছোটে দেয়ালের কোণে
তৃষ্ণায় ডুবে থেকে জীবন ভর করেছে প্রতীক্ষা যার
শ্রবণেন্দ্রিয়ের বিভ্রম শোনায় তারই পদধ্বনি
সত্তার গভীরে জাগে অমলিন সেই উত্তরীয়র ঘ্রাণ
উন্মুক্ত করে দরজা- দেখে নয় সেই কাঙ্ক্ষিত পুরুষ
নৃত্যসাজে সজ্জিত হাস্যমেদুর প্রার্থিনী আছে দাঁড়িয়ে।
নূপুরে বোল তুলে নিয়ে প্রার্থিনী বসে গিয়ে দোলনায়
চোখে চোখে মন্থর ভ্রুভঙ্গে করে জিজ্ঞাসা কাদম্বরীকে।।

প্রার্থিনী >>
আফিমগুলিতে করো বুঝি অমৃতের সন্ধান!
ছিলে রংউচ্ছল ছোট নদী যত্নে ভুলেছ যাকে
হয়ে উঠতে আজকের নন্দিত কাদম্বরী
এসেছো ফেলে তাকে অন্য জন্মপাড়ে।
আজ তুমি জল ছেড়ে ওঠা ডানাখসা গাঙচিল
আবার কেন লুপ্ত পৃথিবী করো আহ্বান!
হেরে গিয়ে মৃত্যুতেই চাও যদি পেতে নিস্কৃতি
আমায় ডাকার তবে হলো কী প্রয়োজন?

কাদম্বরী >>
প্রার্থিনী! অসূর্যস্পশ্যা আমার অন্তর্গত ‘আমি’
নবজন্ম চেয়ে সঙ্গোপনে দিয়েছি যাকে নির্বাসন।
বহু মৃত্যুর পর এক মরণে বিলীন হবার আগে
ঝড়ের কেন্দ্রের শূন্যে ভাসমান খড়কুটোর মতো
একবার আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে হলো তোমায়।
মনে হলো আমার ভেতরে বিরাজিত যে ‘আমি’
আজ তার সঙ্গেই হোক তবে শেষ আলাপন।

প্রার্থিনী >>
হয়তো বিরাজিত ছিলাম কোনো একদিন আজ নেই।
মানুষ কি আর আছ তুমি! শুধু ছাঁচে ঢালা মাংসপিণ্ড
কী কথা বলবো আমি ছাঁচপ্রতিমার সাথে?
তোমার শরীরে চলে বয়ে উত্তরের জড় হাওয়া
জীবনের উল্টোদিকে যার অবস্থান।
আমি দখিনা বাতাস জীবনের কেন্দ্রে যে বহমান
কীভাবে তোমার ভেতরের ‘তুমি’হই ‘আমি’!

কাদম্বরী >>
আহ্ কী নির্মম প্রার্থিনী তুমি- কোথায় ভেবেছিলাম
অনন্ত নীরবতায় পৌঁছোনোর আগের সময়টুকু
তোমার সাথে হয়ে উঠবে নদীমন্থর কলস্বরা।
আর তুমি কিনা এভাবে আঘাত করছ আমায়!
ছাঁচে কি নিজেকে আমি ঢেলেছিলাম?
ছিল কি কিছুই আমার আয়ত্তে?
মনে পড়ে তোমার- এসেছিলাম যেদিন পালকি চড়ে
সোনায় মোড়ানো পুত্তলি-প্রতিমা হয়ে এই প্রাসাদে
বোধের হাওয়ায় আমার তখনও বাজেনি বাঁশি।
প্রার্থিনী দাও বাড়িয়ে তোমার হাত দুটি আজ
মৃত্যুর আগে স্মৃতিতে ভাসতে চাই একবার
থাকে যদি কোনো অনুতাপ মুছে যাবে তাও।

প্রার্থনী >>
স্মৃতি তো অক্ষমের সম্বল।
কথায় আছে না- ভুতের পা থাকে পেছন দিকে-
এখন দেখছি শুধু মাংসপিণ্ডই নও ভুতও বটে
কেন ছুটতে চাচ্ছ পেছনে! কী লাভ হবে আর?
জীবনের অধিকার ছেড়ে দিয়ে যখন চাচ্ছ মরতে
সমস্ত স্মৃতি এবং অনুতাপ অর্থহীন এখন।

কাদম্বরী >>
অর্থ-অনর্থের ব্যবধান জীবন কখন দিয়েছে ঘুঁচিয়ে
এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আরেকটু অনর্থ হলে যোগ
অক্ষম এই নারীর কী এমন ক্ষতি আর হবে বলো?
পৃথিবীর অগণন সক্ষম নারীর অন্তরের কোণে
নিভৃত একবিন্দু অশ্রু হয়ে হয়তো যাবে থেকে
অযোগ্য-অক্ষম-ভঙ্গুর হারমানা এই কাদম্বরী।

মিনতির চোখে প্রার্থিনীর দিকে বাড়ায় হাত কাদম্বরী
হাসির ছন্দে নটরাজ্ঞী হয়ে ঘরময় চলে নেচে প্রার্থিনী
হঠাৎ চিল হয়ে ছোঁ মেরে কাদম্বরীকে নিয়ে যায় উড়ে
ছায়াপথ দূরত্বের সেই অতীতাকাশের বালিকাবেলায়
রক্তের নদীগন্ধে গাঙচিলের ঘুঙুরে আসে ভেসে শৈশব
আদি-অন্তহীন সেঁতারে বাজে ঠাকুরবাড়ির ধ্রুপদি সুর
পাটভাঙা শাড়ী চোখের তারায় কঙ্কন বিচ্ছুরিত আলো।।

প্রার্থিনী >>
পড়ে মনে সেই তোমার বিবাহদিনে
গরজিত মেঘবৃষ্টির ঘ্রাণ দুরু দুরু বুক
ছোট সে নদী গড়িয়ে পড়ে প্রাসাদসমুদ্রে
সেকি ভয়! সেকি আনন্দ! কিংবা বিষাদ
বোঝেনি কিছুই সোনায়-মোড়া বালিকা।
উপদেশ-বাণীতে জেনেছে শুধু হয়েছে সে
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির নতুন বউ
নেই এমন বোধ বুঝবে নিজের সৌভাগ্য।

কাদম্বরী >>
তবু উত্তরীয়ের সুবাস ছুটিয়ে যখন চলেন আমার স্বামী
নতুন সেই রূপকুমার জ্যোতিরিন্দ্র জ্যোর্তিময় পুরুষ
হংসরাজ শুভ্রবরণের সে আভায় অরুণাভ হয় প্রাসাদ প্রাঙ্গন
বালিকার দুই চোখে দৃষ্টির কুহক তার ছড়ায় অচেনা দীপ্তি
উপদেশে জেনেছিলাম হতে হবে যোগ্য সে আভার।

প্রার্থিনী >>
প্রাসাদের সুবেশী নারীরা উঠেছে মেতে আমায় নিয়ে
মনে গাঁথা মায়ের মুখ করেছে আড়াল মমতার স্পর্শে।
ভোরের শরীরে বাজে বাবা-মশাইয়ের ধ্যানগুঞ্জন
ঠাকুরবাড়ির জানালার রশ্মিঘিরে জীবনের মিহিকণা
ঘাসের ডগার শিশিররঙে দৃষ্টি হয়েছে তরঙ্গসঙ্কুল
স্বর্গের চিত্ররাশি উড়ে বেড়িয়েছে ধুলোকণা ভর করে
স্বপ্নগুচ্ছ ঝুলে থেকেছে শোভিত পুষ্পের মতোই
বালিকার ঝুটিবাঁধা চুলে।

কাদম্বরী >>
শরীরভুমিতে প্রকৃতির বুনে দেওয়া নারীত্বের শোণিতে
প্রথম ভেসেছিলাম এখানেই।
শিহরণে শিহরণে রাতভর কেঁপেছিল দেহ
পুতুলবাক্স গুটিয়ে অপেক্ষা করেছিলাম হয়ে ওঠার।

যায় থেমে কাদম্বরী- ভেঙে পড়ে দেহ কান্নার গমকে।
কী হতে চেয়েছিলেন কাদম্বরী দেবী?
কবি-শিল্পী-বিদুষী কিংবা রাজেন্দ্রানী?
নাকি আজকের গ্রন্থবাণিজ্যের বাজারি উপাদান!
বণিকেরা যাকে বিপণনে রমন করায় বাঙালির ঘরে ঘরে?
যেমন জানেন না আপনারা- জানেন না এই অভাজনও।
ইতিহাস বলা নয় অভিপ্রায় সৃজকের-
করে অবগাহন নিজস্ব অনুভবের সমুদ্রে
অন্তরের রক্তকার্পাসে বোনে তাঁর বসন।
হয়েছিলেন যিনি ‘কবির অন্তরে কবি’
কেমন ছিল সেই মানবীর অন্তর্গত জীবনকাব্য?
দৃশ্য ও শ্রাব্যের বন্ধুগণ- চলুন হাঁটি আরও কিছু দূর।
চলতি পথের ঝর্ণায় গড়িয়ে পড়ে যদি নুড়ির আঘাত
তবে ক্ষমা করবেন আমায়- করি এই নিবেদন।

প্রার্থিনী হাঁটুগেড়ে বসে কাদম্বরীর সামনে
আহা কত অভিমান জমেছে নিজের ভেতর
স্পর্শ করে হাত-অশ্রুসিক্ত চিবুক- মেঘকেশ
যেন আত্মা স্পর্শ করে দেহ- বুঝতে চায় আশ্রয়কে
মুখের আড়ালে ক্ষতমুখ তার পড়ে আছে ঢাকা।
বাইরে তখন গাছের মাথায় ঝড়ো-ঢেউ বয়ে যায়
উড়ন্ত ঈগল পাখির ডানায় ডানায় ভর করে
আবার আসে ভেসে অতীত শব্দের ঐকতান।

প্রার্থিনী >>
বাল্যশিক্ষা ধারাপাতের গণ্ডি পেরিয়ে কত তাড়াতাড়ি
নন্দননের সাহিত্যবাসরে হয়ে উঠেছিলে অনুপমা তুমি।
বেলফুলের গুচ্ছ- সাঁঝের প্রদীপ- ভোরের শেফালি-
ধ্রুপদী হাওয়ার নাচন তোমার চৌদিকে।
তোমাকে ঘিরেই কবিতা-সঙ্গীত-নাট্যের মহলা
যেমন নক্ষত্রঘিরে আলোকিত হবার আত্মদান গ্রহের।
কেন তবু এত খেদ নন্দনকাননের রাজেন্দ্রানী?

কাদম্বরী >>
আমি কি চেয়েছিলাম হতে রাজেন্দ্রানী-
কিংবা সমাজ-পথের মহীরুহ জ্ঞানন্দিনী?
জানালার পাশে একটি ছোট কুসুমবৃক্ষের মতো
জলচূর্ণে সিক্ত হয়ে ফোটাবে ফুল ঋতুভর।
তাকিয়ে সেদিকে আনন্দিত হবে রূপকুমার-
করতে ফলবতী জলসিঞ্চনে স্পর্শ করবে প্রেমে।
সংসারে যেমন থাকে নারী- জীবনের পাশে জীবন হয়ে
এতটুকুই চেয়েছিলাম শুধু আর কিছু নয়।
মেলে দিয়ে প্রাণ যতই ডেকেছি তাকে-
জ্যোতিরিন্দ্র হংসরাজ উড়েছে ততোই অজানায়।
কোথায় মজেছিল মন তার দেখেনি তাকিয়ে
শুধু একটু স্পর্শ পেয়ে ঝরে পড়ার আশায়
আমার দুচোখে নির্জনে জমেছিল কত আকাশ
অনšেতর প্রতীক্ষায় জীবনের অগণন কলি
ঝরেছে কেমন করে মরেছে দৃষ্টির আড়ালে।

প্রার্থিনী >>
কিছুই আর না ভেবে শুধু এতেই করেছ অভিমান?
যখন সংসারের নারীরা হেঁসেলের উপাদান হয়ে
পড়ে থাকে অন্দরে- প্রথার মুখে তুড়ি মেরে তখন
তোমায় নিয়ে হয়েছেন তিনি সওয়ার অশ্বপিঠে।

কাদম্বরী >>
সেকি আমার জন্য?
নাকি দেখাতে নিজের আভিজাত্যের গরিমা।
করতে প্রমাণ সমাজে নিজের উদারতা।
অশ্বপিঠ থেকে ঠাকুরদালান নাটমন্দির
যেন এক অভিনেত্রী আমি- ক্রীড়নক নির্দেশে
সুঁতোটানা পুতুলের মতই চলেছে জীবন আমার।

প্রার্থিনী >>
ক্ষোভের আগুন পুড়িয়েছে তোমায়।
যা কিছু ছিল নিজের দেখনি তাকিয়ে-
মৃত্যু- সে তো নিশ্চিত আসবেই একদিন।
এখনই কেন মৃত্যুকে চাও করতে আলিঙ্গন?

কাদম্বরী >>
বেঁচে কি আছি আমি! ছিলাম কখনও!
করেছি জাপন অন্যের ইচ্ছার জীবন।
অক্ষরজ্ঞানহীন কন্যা বুঝবে কি নতুনের কথা?
ঠাকুরপরিবারে এমন বউ! অনাসৃষ্টি আর বলে কাকে!

প্রার্থিনী >>
পরিবারের মতো করে তৈরি করো ওকে নতুনভাবে
শেখাও লেখাপড়া আদবকেতা- হয় না যেন অন্যথা।
বলতে কথা কণ্ঠের স্বর সরবে কতদুর
তাকানোর চোখ যাবে কতটুকু খুলবে কেমন করে
টানবে কতখানি কাজলের রেখা চোখের পাতা জুড়ে
কেশবিন্যাস সূচিকর্ম হেসেলের ব্যস্ততায়
ঠোঁটের কোণে হাসির আভা জাগবে কতখানি
আঙিনা আর অন্দরে-
চলতে গিয়ে পায়ের শব্দ কতটুকু তার হবে।।

কাদম্বরী >>
শুধু নিয়মের মাপে মাপে জীবনকে ফেলা।
পত্তন দেওয়া এই জীবনে আমার জীবন কোথায়!
কে আমি? ইচ্ছা প্রকাশের নেই কোনো অধিকার।
নিজেকে শুধু ছাঁচে ঢালার চেষ্টাকে যায় বলা জীবন?
তবু ভরে নিয়েছিলাম প্রাণ সহজ আনন্দে
সেই জীবনই মনে হয়েছিল বড়ো অর্থপূর্ণ
ভেবেছিলাম সংসারের কত প্রয়োজন আমাকে
তাই নতুন তালে ঝংকৃত হয়েছিলাম আমি।
নাটক কবিতা বসন-বিন্যাসে হয়ে উঠতে অনুপমা
সবকিছু ভুলে বদলে নিয়েছিলাম আমর্ম নিজেকে
চরণে চরণ ফেলে নীরবে নিঃশব্দে হেঁটেছি কত পথ
সঞ্চিত প্রেম যত ছিল হৃদয়ে ঢেলেছিলাম অকাতর
ঠাকুরবাড়ির খিলানে খিলানে বেজেছিল যত সুর
সব প্রাণে নিয়ে পূর্ণ-আকাঙ্ক্ষায় যখন মেলেছি মন
তখনই দেখি উপেক্ষার কুয়াশায় ঘিরেছে দিগন্ত।
যোগ্যতার মাপকগণ করেছেন আমাকে উত্তীর্ণের সুবচন
এরপরও হলো কী? দৃষ্টি কেন এড়িয়ে গেল আমায়?
ছিল যে প্রেম আমার অনশ্বর প্রতীক্ষায়-
এলো না তাও দৃষ্টির গোচরে! প্রেমও তবে কিছুই নয়!
হৃদয় আমার নিঃশেষিত হয়ে জেনেছে এই সত্য।
তবু নিজের প্রেমই বৃষ্টিচূর্ণ হয়ে জাগায় শিহরণ
ষোড়শী শরীরে তারাগাঁথা আকাশ পড়ে ঝরে-
একটির পর একটি ছায়াপথ পেরিয়ে যাবার মতো
ছুটতে থাকি- জীবনের মাঝে খুঁজি তাকে প্রাণপণ
নেই- কিছু নেই- চারিদিকে শূন্যতা- শুধু শূন্যতা
যেখানে নিজেকে ফিলেছি হারিয়ে।

প্রাথির্নী >>
স্বদেশের মঙ্গল চিন্তায় বিভোর থাকতেন তিনি
করছেন অনেক অনেক কর্মের সংস্কারধ্যান।
ভারতবর্ষের নিজস্বতা রক্ষায় লর্ডের ছড়ি উপেক্ষা করে
রাজনারায়ণ বসুর পৌরহিত্য ও অন্যান্য সভ্যযোগে
জাতীয় হিত ও উন্নতির জন্য করছেন সঞ্জীবনী সভা।
সর্বজাতিক ভারতীয় ঐক্য সাধনের জন্য
চেয়েছেন করতে সর্বজনীন পোশাক প্রণয়ন।
এছাড়াও ব্রাহ্মসমাজ- শিক্ষা- রাজনীতি- সাহিত্য-
স্বাদেশিকের সভা- শিল্পবাণিজ্যের মুক্তি-
বাংলা নাটক এবং সঙ্গীতে নতুন সুরের মূর্ছনায়-
শিল্পে নতুন পথের সন্ধান করতে তিনি ছিলেন মত্ত।
তুমি কি চেয়েছিলে সবকিছু ছেড়ে-ছুঁড়ে দিয়ে
এমন মানুষটি হয়ে উঠুক শুধু তোমারই চাওয়ার মতো!
দিতে পরীক্ষা কতটা ভালোবাসেন তোমায়?

কাদম্বরী >>
তার মতো করে আমায় যদি হয়ে উঠতে হয়-
তারও থাকবে না কেন হয়ে ওঠার প্রয়োজন!
নাকি পুরুষজন্মে নেই কোনো পরীক্ষার অবকাশ?
জ্ঞানে-গরীমায় দীপ্যমান সরস্বতির বরপুত্র তিনি
বাংলা নাটকের কৃচ্ছসাধনে দিন-রাত মাস-বছর
কত নটীর বিচ্ছুরিত রূপের স্ফুলিঙ্গে জ্বলছেন।
সবই সিদ্ধ তার জন্য- প্রশ্নাতীত- তাই না?
তার জীবনে কে আমি! কোথায় আমার স্থান!
সংসার-জীবনে ছিল কি কোথাও কোনো বিষয়ে-
কোনো সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আমার?
এমনকি নিজের ইচ্ছা অনিচ্ছারও একটু নেই মূল্য।
আমি তার কাছে কী চেয়েছিলাম- কীভাবে চেয়েছিলাম
তাকে নিয়ে কী স্বপ্ন নির্মিত হয়েছিল আমার পৃথিবীতে
একটি বারের জন্যও কী বুঝতে চেয়েছেন তিনি!
আমি বিবাহ নামক উপলক্ষের এক আগন্তুক মাত্র
প্রদীপের নিচে অনিবার্য অন্ধকারের মতো স্থির।
কিংবা শূন্য আকাশে দলছুট এক পরিযায়ী পাখি
গন্তব্যের খোঁজে অক্লান্ত ওড়া- উড়ে চলা শুধু।
এই ভার বহনের শক্তি আজ হারিয়েছে ডানা-
বুকের ভেতরে গভীর শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই
ওখানে ডুবে থেকেই মুছে যেতে চাই শূন্যে…

তখনই ছিন্ন পাতাদের উড়িয়ে আনে বৈশাখের বাউকুড়ানি।
আধখোলা জানালা দিয়ে ভরিয়ে দেয় কাদম্বরীর শয়নঘর।
জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আরেকটি পাতার মতো
মেঝেতে বিছিয়ে থাকা পত্রশয্যায় লুটিয়ে পড়ে কাদম্বরী।
কিছু পাতা আটকে থাকে জানালার শার্শি ও গরাদের মাঝে।
মেঘচাদরের কালোরঙ ঈশান কোণ ছেড়ে আকাশের কাঁধে
দিগন্ত জুড়ে চুইয়ে পড়ছে অপার্থিব আলোকরশ্মি।
লুটিত কাদম্বরীর ওপর একচিলতে আলো এসে পড়ে।
একই সঙ্গে আলো আর অন্ধকারে- পূর্ণ কিংবা শূন্য ঘর।
মানুষের শূন্যতাবোধ আসলে কী! আলো- না অন্ধকার!
অনুভুত সেই শূন্যতার আছে কি ভার ও আকার?
নাকি নির্ভার নিরাকার এক বোধের নামই- শূন্যতা!
অথবা জানালার শার্শি আর গরাদের মাঝে
ঠেকে থাকা পাতার মতো- বাস্তব ও স্বপ্নের মাধামাঝি
দোদুল্যমান মানুষের অনস্তিত্ত্বের নাম- শূন্যতা?
বজ্রপাতের শব্দের সঙ্গে বাতাসের তরঙ্গ ওঠে ঘরে
তারা কান পেতে শোনার চেষ্টা করে- শূন্যতা বা পূর্ণতার স্বর
শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া কিছুই যায় না শোনা।
আলো ছেড়ে কাদম্বরী পা বাড়ায় ঘরের অন্ধকার প্রান্তে
জীবনকে নিঃশেষ করে দিয়ে চলে যেতে চায়
অন্ধকারে বিরাজিত নিজ অনুভূত শূন্যতার কাছে।
প্রার্থিনী দাঁড় করায় তাকে হ্যাঁচকা টানে
জীবনকে ধরে রাখতে চায় আলোতে বিরাজিত
তার অনুভূত পূর্ণতার কাছে।
হঠাৎ বাতাস ভেঙে হেসে ওঠা অশ্রুতপূর্ব এক কণ্ঠ বলে।
কোন শূন্যপূর্ণবোধে জীবনকে ধরে রাখতে বা নিঃশেষ করতে চাও?
মানুষ কি কখনও তা করতে পারে!
জীবন তো শূন্যপূর্ণ কিংবা আলো-অন্ধকারের ধারণাহীন বহমানতা
সেখানে মানুষ নিজেকে যুক্ত বা বিচ্ছিন্ন করতে পারে মাত্র।
থমকে যায় দু’জন খোঁজে শ্রুত সেই কণ্ঠের অস্তিত্ত্ব-
কিছুই দেখতে বা শুনতে পায় না আর।
বিভ্রান্ত দুই নারী হাঁটুমুড়ে বসে মুখোমুখি-
আলোতে প্রার্থিনী- অন্ধকারে কাদম্বরী-
পরস্পর তাকিয়ে থেকে গভীর ভাবনায় ডুবে যায়।
কোনটা সত্য- আলো? না অন্ধকার? শূন্যতা? নাকি পূর্ণতা?
জীবনের ধারণা তাবে আলাদা কিছু!
মানুষ জীবন নয়- যুক্ত বা বিচ্ছিন্ন হবার উপাদান মাত্র!
জীবন তবে কী? আলো অন্ধকারের বিভ্রম শুধু!
আর মৃত্যু! সেও কি জীবনের মতো আরেকটি বিভ্রম!
আর এই দুই বিভ্রম মিলে হয় কি অখণ্ড একটি গোলক!
যে পরিধির ভেতর দিয়ে মানুষ- অজান্তে করে শুধু ভ্রমণ!
জানালা দিয়ে এসে পড়া একচিলতে ক্ষীণ আলো-
যেমন করে বিভক্ত করে রেখেছে এই ঘরটিকে-
তেমন করেই মানুষ তার নশ্বর শরীরকে মাঝখানে রেখে-
জীবন ও মৃত্যু নামক বিভ্রমের খÐরূপ প্রত্যক্ষ করে মাত্র!

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে- একে অন্যের কাঁধে ভর করে দাঁড়ায়।
কাদম্বরীকে আবার নিজের বিশ্বাসের দিকে ফেরাতে চায় প্রার্থিনী।
শয়নঘরে জমে থাকা শুকনো পাতাদের স্পর্শ করে বলে।

প্রাথির্নী >>
এই দেখ- শুকনো পাতাদের ঝরিয়ে দিয়েছে বৃক্ষ-
আবার নতুন পাতা গজাবে বলে- এইতো জীবন।
অগণন বনপুষ্প যায় মরে সূর্যের আঘাতে
রাত্রি-নিভৃতে আবার ফোটে শিশিরের ছোঁয়ায়।
এভাবেই অবিরাম নিজেকে পূর্ণ করে চলে জীবন
শূন্যতার নেই কোনো স্থান প্রকৃতির কাছে।
হেঁসেলে বাসন-হাঁড়ি কুটনো-বাটনা সম্ভারঝাঁজে
জীবনের ঘ্রাণ।
ফেরিওয়ালার হাঁক তাঁতীনির নাকছাবি-
কাহারদের হুহুমনা সুরে দোলে জীবনের দোলনা।
স্নানঘরে সঙ্গমরত টিকটিকির চোখে ঝরে পড়ে- সুখ
কাঁথার ভেতর নিঃশব্দে ওম নিতে আসা
বেড়ালছানার কম্পমান ভঙ্গিতে- সুখ
বিকেলে গড়িয়ে যাওয়া দুপুরের শরীর জুড়ে- সুখ।
স্বামী নামের একজন মানুষ ছাড়াও
সংসারে বেঁচে থাকার এতো কিছু রেখে
তুমি কেমন করে শূন্য হলে কাদম্বরী?

[চলবে]

পরবর্তী পর্ব (২) পড়তে হলে নিচের লিংকে ক্লিক করুন

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80-%e0%a6%95-2/