সাধনা আহমেদ > প্রার্থিনী [শেষ পর্ব] >> কাব্যনাটক

0
727
প্রার্থিনী [তৃতীয় ও শেষ পর্ব]

কাদম্বরী দেবী ও রবীন্দ্রাথের সম্পর্ক নিয়ে এই কাব্যনাটক

প্রার্থিনী >>
ব্রাইটনের স্কুলে বিলেতি নাচ-গান শিখেছিল বেশ।
ওর প্রিয় একটি গান অনেকবার গেয়ে শুনিয়েছিল।
The bright stars fade
The morn is breaking
The dewdrops pearl
Each bud and leaf
And I from thee
My leave ’am taking
With bliss too brief
How sinks my heart
With fond alarms
The tear is hiding
In mine eye
For time doth thrust me
From thine arms
Good-bye, sweet heat, good-bye.
ছাদের কার্নিস ঘেঁসে লেপ্টে আছে প্রস্ফুটিত কৃষ্ণচুড়ার মুখ।
অগ্নিরূপবতীর জ্বলন্ত চোখ বৃষ্টির আকাঙ্ক্ষায় আকাশে
গানের সুরে সুরে কাদম্বরী দাঁড়ায় সেই অগ্নিময় চিত্রপটে
জীবনের বিপরীতে শোণিতের শ্বেত-কণিকার মতো।
কৃষ্ণচুড়ার উজ্জ্বল শাখায় স্পর্শ করে ভাবে-
জীবনপুষ্প প্রস্ফুটিত হলো না কখনও তার।
কিংবা হয়েছিল সেই গানটির গ্রীষ্মগোলাপের মতো!
যেটা রবি গেয়েছিল অনেক বার।
তখন তৃষ্ণার্ত চোখ তার শয়নঘরের জানালায়
স্মৃতির হাওয়া এসে দুলিয়ে দেয় তার আঁখিপল্লব
রবির কণ্ঠ ঝংকৃত মনের কোণে- মৃদুস্বরে বলে সে।
কাদম্বরী >>
নিঝুম বৃষ্টিতে ওই জানালায় নীরবে বসে
মিহি সুরে গাইতো সে আরও একটি গান।
শুনতে শুনতে কেবলই মনে হতো-
আমিই সেই গোত্রহীন ফুল- সংসার-বৃক্ষে ফুটেছিলাম
পৃথিবীর জল হাওয়ায় একটি কুঁড়িও গজায় নি যার-
ক্ষণিকের জন্য হলেও যে-কিনা ধরবে টেনে পিছু।
ফুরালে প্রয়োজন নিভৃতেই একদিন যাবো ঝরে
সন্ধ্যার আকাশ থেকে যাবে মুছে অপরিচয়ের গ্লানি
গ্রীষ্মগোলাপের গন্ধাবেশ নেবে ধুয়ে শ্রাবণের জল।
Tis(it is) The Last Rose of Summer,
Left blooming alone;
All her lovely companions
Are faded and gone;
No flower of her kindred,
No rosebud is nigh,
To reflect back her blushes,
Or give sigh for sigh.
I’ll not leave thee, thou lone one!
To pine on the stem;
Since the lovely are sleeping,
Go, Sleep thou with them
Thus kindly I scatter,
Thy leaves o’er(over) the bed,
Where thy mates of the garden
Lie scentless and dead.
So soon may I follow,
When friendships decay.
And from love’s shining circle
The gems drop away.
When true hearts lie withered,
And fond ones are flown,
Oh! who would inhabit
This bleak world alone?
গানের সুরে কাদম্বরীর শুষ্ক চোখ তখন বিষাদের নদী
হাতের মুঠোয় ধরা কৃষ্ণচুড়ার শাখায় তরঙ্গ তোলে।
নৈঃশব্দ্যর ঢেউয়ে কাঁপে কাদম্বরীর শরীর
সেদিকে তাকিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে প্রাথির্নী।
চমকে তাকায় কাদম্বরী- বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করে।
কাদম্বরী >>
তুমি এমন করে হাসছো কেন প্রাথির্নী?
প্রার্থিনী >>
দুঃখ থাকলে তো মরা যায় না- মরতে হয় আনন্দে।
কাদম্বরী >>
কী সব বলছ- তোমার হেঁয়ালিপনা বুঝতে পারছি না।
প্রাথির্নী >>
কী অশ্চর্য কাদম্বরী- চাও মরতে অথচ ডুবে গেলে বিষন্নতায়-
জীবনের জন্য মমতা যার অপার- বিষাদ আশ্রয় করে তাকেই।
এই সত্য না জেনেই মৃত্যুর জন্য হয়েছ ব্যাকুল।
প্রাথর্নীর হাসিতে সঙ্কুচিত কাদম্বরী।
নিজের অজান্তেই বসে পড়ে কার্নিশে
দুই হাঁটুর মাঝে লুকিয়ে নিয়ে মুখ
শুয়োপোকার মতো থাকে গুটিয়ে।
প্রাথির্নী এসে মমতায় তুলে ধরে কাদম্বরীর মুখ
আবার তাকে নিয়ে যায় টেনে গল্পের পৃথিবীতে।
প্রাথির্নী >>
এরপর লন্ডনের অন্য স্কুলে চলেছে রবির লেখাপড়া।
সেখানে ফ্যান্সি- বলে গিয়েছিল- ওটা ছদ্মবেশী নাচের ঘর
গ্যাসের আলোয় আলোকিত প্রকাণ্ড ঘরে- ব্যান্ডের বাজনায়
ছ’সাত শো সুন্দর নারী-পুরুষ- নানা রকম সেজেগুজে
দলে-দলে স্ত্রী-পুরুষে হাত ধরাধরি করে ঘুরে ঘুরে নাচে।
একবার একজন মেম সেজেছিলেন তুষারকুমারী-
একজন মুসলমানিনী- অন্যজন আমাদের দিশি মেয়ে।
কেউ অযোধ্যার তালুকদার কিংবা আফগান সেনাপতি
আর রবি সেজেছিল বাংলার জমিদার।
জরি দেওয়া মখমলের কাপড়- মখমলের পাগড়ি।
কাদম্বরী >>
একেক জনের বাড়িতে একেক দিন নাচ-পার্টি হয়।
ঝলমলে আলোয় পিয়ানো-বেহালা-বাঁশির সুর মোহময়।
নাচঘরে প্রবেশের সময় সবার হাতে- সোনার জলে ছাপানো
কাগজ দেয়া হয়- কী কী নাচ হবে এতে থাকে লেখা।
রাউন্ড ডান্স- স্কোয়্যার ডান্স- মুখোশ-নৃত্য আরও কতো কী।
নাচ শুরু হবার আগে গৃহকর্তৃ সবাইকে দেন পরিচয় করিয়ে।
কোনো মিসের সঙ্গে পরিচয় হবার পর নাচবার ইচ্ছে হলে-
পকেট থেকে কাগজটি বের করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করতে হয়
“আপনি কি অমুক নৃত্যে বাগদত্তা হয়ে আছেন?”
প্রাথির্নী >>
যদি তিনি ‘না’বলেন তখন তাকে বলতে হবে-
“আমি কি আপনার সঙ্গে নাচবার সুখ ভোগ করতে পারি?”
তিনি থ্যাঙ্ক য়ু বললে বোঝা যাবে-
কপালে তাঁর সঙ্গে নাচবার সুখ আছে- হা হা…
কাদম্বরী >>
নাচের সময় খারাপ জুড়ি পড়লে মেয়েরা ভারি চটে যায়।
রবি ভালো নাচতে পারে না বলে একবার ওর এক
নৃত্যসহচরী গিয়েছিল চটে- তখন ওর মনে হয়েছিল যে
মেয়েটি হয়তো মনে মনে রবির মরণ কামনা করেছিল।
নাচ শেষ হলে দু’জনেরই মনে হলো
আহ্ হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম- হা হা…
সে দেশের মেয়েদের জীবন নাকি আমাদের মতোই!
ওখানেও তাদের বেশি লেখাপড়া শেখানো হয় না!
মেয়েদের তো আর আপিসে যেতে হবে না তাই
বিয়ের জন্য প্রস্তুতি নেওয়াই তাদের আসল কাজ।
প্রাথির্নী >>
মাগ্গি দরে বিকোবার জন্য ছেলেবেলা থেকেই
নিজেকে পালিশ করা চলতে থাকে।
একটু গান গাওয়া- পিয়ানো বাজানো- নাচ
খানিকটা ফরাসি ভাষার বিকৃত উচ্চারণ- বোনা ও সেলাই।
বিয়ের দোকানে সাজিয়ে রাখবার রঙচঙে পুতুল।
তফাত মাত্র একটা দিশি পুতুল একটা বিলিতি পুতুল।
কিন্তু দুই-ই দোকানে বিক্রি হবার জন্য তৈরি- হা হা…।
কাদম্বরী >>
মেরুদূরত্বেও বসে তবে একই রকম পুতুলের আসর।
উপাদনের আড়ালে পড়ে ঢাকা জীবনের সব আয়োজন
গোধূলি পেরিয়ে স্বপ্নেরা যায় ছুটে অ্নন্ত অন্ধকারে
গল্প ফুরিয়ে যায় একদিন- আলাপও হারিয়ে যায়
প্রলাপের মতো হয়ে ওঠে অর্থহীন।
আজ নিজেকে মনে হয়- পথের পাশে নিষ্ফলা বৃক্ষের মতো
আমি যেন দণ্ডায়মান এক উপহাস।
তবু অনাত্মার শরীরে থাকে তাকিয়ে বজ্রভস্মে স্থির মৃতনেত্র।
জীবন করেছিল যত আয়োজন সবই হয়েছে মিছে তামাশা
বেশভুষার ভেতরে ওঠে উথলে বিপুল অনামা জলরাশি
অধিকার করতে নদী পলকে হারিয়েছি স্পর্শ-নাগালের সমুদ্র
উপেক্ষার বিচ্ছিন্ন দ্বীপে অসহ্য এই বেঁচে থাকা ঘিরে
শূন্যতার সঙ্গে ছায়াযুদ্ধের ঝঞ্ছায় বাজে হননের গান।
ধীর পায়ে কাদম্বরী বসে গিয়ে একটি বেদীতে।
চারদিকে ঘন হয়ে আসে সন্ধ্যার আকাশ
রোদনের অপেক্ষায় মেঘদল ঠায় দাঁড়িয়ে তখনও
পাখিদের স্বরে কুজিত প্রেম- করে বৃষ্টির বন্দনা
প্রাথির্নী বসে পায়ের কাছে যেভাবে রবি বসতো এখানে।
স্তব্ধ কাদম্বরী দেখে অন্য পৃথিবীর বদলে যাওয়া ভাস্কর্য
একদিন যে মূর্তি ছিল এখানে- কোথায় সে আজ!
কাদম্বরীর ভাবনা চূর্ণ করে প্রাথির্নীর স্বর।
প্রার্থিনী >>
সমুদ্র ছিল দাঁড়িয়ে স্পর্শের নাগালে
তবু এঁদো-পুকুরের জন্য করেছ রোদন!
একথা বলে নিজেকে করতে চাও মহান।
এসব কপটতার খোলস ছাড়ো কাদম্বরী।
আসলে সারদামঙ্গলের কবিতে ডুবেছিলে তুমি-
বিহারীলালের সুর বেজেছিল তোমার নিভৃতে।
কাদম্বরী >>
হ্যাঁ- বেজেছিল বৈকি- এসেছিলেন তিনি সরব চরণে।
তাঁর কবিতায় পেয়েছি কতো অজানা অনুভবের সন্ধান
ভক্ত পাঠিকার মনে কবির জন্য জাগতেই পারে
নিষ্কলুষ ভক্তিরসে ভরা প্রেম- কেন মিছে দোষ খোঁজো?
প্রার্থিনী >>
‘হে যোগেন্দ্র
যোগাসনে
ঢুলু ঢুলু দু’ নয়নে
বিভোর বিহ্বল মনে কাঁহারে ধেয়াও?’-
বিহারী বাবুর জন্য তোমার বুনে দেওয়া পশমাসনে
তাঁর ‘সারদামঙ্গল’ কাব্যের ছত্র- কেন তুলে দিয়েছিলে?
কাদম্বরী >>
তিনি আমার প্রিয় কবি- ভক্ত পাঠিকা হিসেবে
শ্রদ্ধা জানাবার এতটুকু অধিকার কি নেই আমার?
কী আর দিয়েছি এমন পশমের একটি আসন-
আর নিমন্ত্রণ করে একটু সেবা দেওয়া ছাড়া?
নন্দনকাননে বসেই ‘ভারতী’পত্রিকা প্রকাশের কথা হলো।
আমার স্বামীর সাথে ছিলেন অক্ষয়বাবু- রবি আর আমি।
‘ভারতী’পত্রিকার কাজ নিয়ে তারা বিহারী বাবুর বাড়ি যেতেন।
স্বর্ণদি ও তাঁর স্বামী জানকীনাথ বাবুর রামবাগানের বাড়িতে
ওদের সাথে আমিও মাঝে মধ্যে চলে যেতাম।
‘ভারতী’র সাথে লেখায় যুক্ত হয়ে গেলেন বিহারী বাবু।
প্রার্থিনী >>
তবে বেশিরভাগ সময় এখানেই বসতো এর আসর।
সবার সাথে তিনিও এসে সাহিত্যালোচনায় মেতে উঠতেন।
‘বিদ্বজ্জনসমাগম’ বলে সাহিত্যিকদের যে সম্মিলন হতো
রবি বিলাত থেকে ফেরার পর এই সম্মিলন উপলক্ষে
সবাই মিলে করে ঠিক করলেন যে-
দস্যুরত্নাকরের কবি হবার কাহিনি নিয়ে একটি নাটক হবে।
কাদম্বরী >>
‘আর্য্যদর্শনে’ প্রকাশিত বিহারী বাবুর ‘সারদামঙ্গল’ কাব্যে
বাল্মীকির কাহিনি যেমন বর্ণিত হয়েছে-
তারই সঙ্গে দস্যু রত্নাকরের বিবরণ জড়িয়ে নিয়ে
রবি লিখলো ‘বাল্মীকি প্রতিভা’
বাল্মীকির অভিনয় নিয়ে দিনরাত সে কী সাজ-সাজ রব
সারাদিন আমার স্বামী পিয়ানোয় নানান সুর তৈরি করছেন
অক্ষয়বাবু পাশে বসে চোখ মুঁদে-
বর্মী-সিগার টানতে টানতে গানের কথা চিন্তা করছেন।
আর তাঁর পাশে নীরবে বসে রবিও লিখেছে গান।
প্রার্থিনী >>
হাসিমুখে সকাল বিকেল জলখাবারের ব্যবস্থা করা-
ওদের এই রান্না- সেই রান্নার আবদার মেটাতে তুমি।
এখানেই পাল খাটিয়ে স্টেজ বেঁধে অভিনয় হলো।
বাল্মীকি প্রতিভায়- প্রথম ‘বাল্মীকি’ রবিই সাজলো-
প্রতিভা হলো ‘সরস্বতী’ আর সুশীলা সাজলো লক্ষ্ণী।
‘বাল্মীকি’ >>
রাখ্ রাখ্ ফেল ধনু, ছাড়িস নে বাণ।
হরিণশাবক দুটি প্রাণভয়ে ধায় ছুটি,
চাহিতেছে ফিরে ফিরে করুণ নয়ান।
কোনো দোষ করে নি তো, সুকুমার কলেবরÑ
কেমনে কোমল দেহে বিঁধিবি কঠিন শর!
থাক্ থাক্ ওরে থাক্, এ দারুণ খেলা রাখ,
আজ হতে বিসর্জিনু এ ছার ধনুক বাণ।
দস্যুগণ >>
আর না, আর না, এখানে আর না-
আয় রে সকলে চলিয়া যাই।
ধনুক বাণ ফেলেছে রাজা,
এখানে কেমনে থাকিব ভাই!
চল্ চল্ এখনি যাই।
তোর দশা রাজা ভালো তো নয়!
রক্তপাতে পাস রে ভয়!
লাজে মোরা মরে যাই।
পাখিটি মারিলে কাঁদিয়া খুন,
না জানি কে তোরে করিল গুণ-
হেন কভু দেখি নাই।’
প্রার্থিনী >>
দর্শকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র মহাশয়।
নাট্যের অভিনয় দেখে তিনি খুব তৃপ্তি প্রকাশ করেছিলেন।
অথচ- রবির কবিতা এতটুকু গ্রহণ করনি তুমি।
সেই শিশুবেলা থেকে কখনও দাওনি স্বীকৃতি।
নির্মম হয়ে বলেছ- রবি কিছুই নয়- বিহারী বাবুই বড় কবি।
কাদম্বরী >>
হ্যাঁ- তীব্র তিরস্কারে রবির কবিতা ফেলেছি নির্মম প্রাণে।
আমার সেই অগ্রহণের হেলাতেই বুঝি জ্বলেছিল রবি।
হয়তো তাতেই অমূল্য অগ্নিশিখা হয়েছে ওর অন্তর্গত।
জানবে না রবি কোনোদিন- কী কারণে দিয়েছি আঘাত।
ওর গভীর চোখে তাকিয়ে মনে হতো শুধু আমার জন্য নয়
বিশ্বভূবনের জন্য ঠিকড়ে পড়ার অপেক্ষায়-
অদ্ভুত এক আলোকমালা করছে সেখানে বিরাজ।
যেখান থেকে জন্ম নেবে কাব্যের অমলিন প্রদীপ।
আমার মলিন প্রশংসায় অন্ধকারে ঘটে যদি তার নিমজ্জন
সেই আশঙ্কায় বার বার করেছি ওকে তিরস্কার।
বলেছি- বিহারী বাবুর মতো কবিতা লিখতে পারবে না তুমি।
সখা আমার ব্যাথিত হয়েছে- আর নীরবে দেখেছি আমি-
ব্যাথার আড়ালে দৃষ্টিতে ওর উঠেছিল জ্বলে সৃষ্টির প্রলয়।
প্রার্থিনী >>
কিন্তু নন্দনের আকাশ নিয়ে খসে গিয়েছিল তোমার স্বামী।
তার শত খেয়ালের মাঝে বিলিতি জাহাজের বিপরীতে
দেশি কায়দার জাহাজ ব্যবসায় মেতে উঠলেন তিনি।
জাহাজ সাজাতে হবে অনেক আড়ম্বরে- না হলে চলবে কেন?
এর সৌন্দর্য্য বর্ধনে যোগ্যতার প্রশ্নে বর্জিত হলে তুমি।
কারণ- কাদম্বরী নয় বিলিতি কেতায় দুরস্ত
জাহাজের সৌন্দর্য্য কীভাবে বাড়াতে হবে তা জানবে কেন?
তোমাকে ফেলে চলে গেল সবাই।
তবু প্রতীক্ষার চৌকাঠে ঝুলে থেকে আবারও বুঝলে
স্বামীর কাজে নেই তোমার কোনো অধিকার।
উপেক্ষার ভূবন তোমার ঠেকলো গিয়ে মৃতচরাচরে-
বিনাকৃষ্ণের বৃন্দাবনে কদম্বরী রাধার মিছে অভিসার- হা হা…
কাদম্বরী >>
আছে যত পরিহাস সবটুকু দাও ঢেলে- ক্ষতি নেই আর।
কী চেয়েছিলাম- পাইনি কী- সে হিসাব হবে সাঙ্গ এবার।
তবু জেনে রেখো ছিনিয়ে নেবার বস্তু নয় সম্মান বা অধিকার।
যখন পরিবারে কোনো নারী আসে স্ত্রী হয়ে
স্বামীর সদিচ্ছাই দেয় তার প্রাপ্ত সম্মান।
কিন্তু স্বামী যখন হয় পরনারীগামী- তখন শুধু স্ত্রী নয়-
সমগ্র নারীকেই করে সে অপমান।
আর যোগ্যতার প্রশ্নে আমাদের সামজিক সংসারে-
কী শক্তি আর থাকে স্ত্রীর?
বাঙালি স্ত্রী- সে কী আসলেই কোনো মানুষ?
প্রার্থিনী- তবু যে সহ্য হয় না উপেক্ষার অপমান।
সমাজের ইচ্ছায়- বাইরের নারীটি নেয় মেনে সবকিছু।
অন্তরে বেঁচে থাকে শুধু ভয়ঙ্কর যন্ত্রণার অগ্নিকুণ্ড
সেই আগুনে ভস্ম হয়ে যায় সমস্ত পৃথিবী তার।
আত্মপ্রশ্নবানে বিদ্ধ করে নিজেকেই- রক্তচোখে বলে-
কাদম্বরী এইক্ষণে দেখে নাও- তুমি আসলে কে।
শুধু সাংসারিক উপলক্ষে অপসৃত উপাদান আজ!
এখনও ভাঁড়ের মতোই কেন সেখানে রয়েছ বসে?
আহ্ ভাঁড়ের মতো… প্রয়োজনের মনোরঞ্জনকারিনী।
আর সেই চরিত্রের নামই হলো স্ত্রী।
তাদের নাট্যের এই চরিত্রে অভিনয় করতে করতে
আমি যখন বিধ্বস্ত অবসন্নতার অন্ধকারে নিমজ্জিত
তখন ভালোবাসার আহ্বান বাজে মৃত্যুর কণ্ঠে- বলে-
এসো আমার ছায়াতলে দেবো ঘুচিয়ে সমস্ত সন্তাপ।
প্রার্থিনী >>
কিন্তু টেনে ধরে মোহময় জীবন- মৃত্যুরে দেয় না স্থান।
আবার ভানুসিংহ বাজায় বাঁশি গঙ্গাতীরে-
‘ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর…’
মরণ নিল না তোমায়- তাই স্বামী নিয়ে গেলো গঙ্গাতীরে।
সেখানেও তোমায় একলা রেখে কলিকাতায় চলে গেলেন
উড়ে বেড়ানো সুখপাখিরা ডেকে নেয় জ্যোতিকে তোমার
নাটকের মহলা ঘিরে বয়ে যায় তার কৃষ্ণলীলার লহর।
আর গঙ্গাতীরে ঝরাপালকের মতো ছায়াহীন কায়া তুমি।
তখনই বিদ্যাপতি কেঁদে ফেরে রবির সুরে সুরে-
‘বিদ্যাপতি কহে কেইছে গোয়ইবি হরিবিনা দিন রাতিয়া’।
কাদম্বরী >>
জানি জানি আমি- বাঁশিতে কাঁদিয়েছিল আমারই শূন্যতা।
হয়তো মিলেছিল তাতে রবির নিজস্ব শূন্যতাও।
প্রেম- সে যে নিঃশর্ত নিবেদন শিখেছি ওর কাছে।
শেষ শরতের মেঘভেলায় যখন গিয়েছিলাম করোয়ায়
শৈলমালার বাহুবেষ্টনে কারোয়ার অরণ্যবাহী কালানদী
বিহ্বল রাতে চেয়েছিল ভাসতে জ্যোৎস্নার জাহাজে
চৈতন্যজুড়ে রবির বেজেছিল তখন আসীমের সুর।
নির্জনতা ঘিরে করোয়ার পাথরের বুক কেটে লিখেছিল-
‘পাষাণ হৃদয় কেটে
খোদিনু নিজের হাতে
আর কি মুছিবে লেখা
অশ্রুবারিধারাপাতে।’
ফিরে আসার পর হেমন্তের লঘু কুয়াশায় করে ভর-
সমস্ত পৃথিবী নিয়ে রবির চরণ গেল হেঁটে সংসারগহিনে।
তখন অঘ্রাণহাওয়া অগ্নিতরঙ্গ হয়ে গ্রাস করে আমার পৃথিবী।
মনে হয়ে দৃষ্টির সীমানায় ভস্ম হয়ে গেছে সব কিছু
প্রতিটি কেশবৃন্ত-রক্তের চলন- সহ্যাতীত হল্কাময়-
মর্মের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবলরূপে পৌঁছে যায় সেই অগ্নি।
একদা হৃদয় উৎপাত ভেবেছিল যাকে- যখন সে গেল চলে
তখন দেখি জগতজুড়ে এক অনিঃশেষ হাহাকার
রবিকরহীন তীব্র অন্ধকার ঘিরে ধরে আমায়
ভেবেছিলাম যাকে- সে আমার ছিল না কেউ
বুঝেছি তখন সে-ই আছে একমাত্র-
ব্রহ্মাণ্ডের কোথাও- অন্য কেউ ছিলনা কখনও।
অজান্তে কখন সে হয়ে উঠেছিল নিঃশ্বাসের বাতাস
সমুদ্রপ্রতিম অঞ্জলি হাতে চৌকাঠের ওপারে ছিল দাঁড়িয়ে।
এই নশ্বর জীবনে হলো না করা স্পর্শ তাঁকে-
এ এমন এক শূন্যতা- সমস্ত অনুভব ধংস করে দিয়ে
জেগে থাকে শুধু অনন্ত তৃষ্ণা…তৃষ্ণা…আর তৃষ্ণা…
প্রার্থিনী >>
এ কী মহাভুল কাদম্বরী! জ্যোতিকে অধিকারে পেলে না বলে
করলে না গ্রহণ রবিকে- জীবনের কাছে ছিল যত পাওনা তোমার
নিজেই তা করেছ নস্যাৎ- এই বিপুল অনুতাপ অর্থহীন আজ।
জীবনের মতো করে পেলে না তো তুমি জীবন
এখন আত্মহননে কেন আর হারাতে চাও স্বর্গ?
কাদম্বরী >>
যাপনে জীবন পাইনি যখন- চাই না নিতে স্বগের্র অধিকার।
স্বপ্নের পালকি চড়ে এসেছিলাম এই প্রাসাদে একদিন
প্রতিটি ইটের পাঁজরে রেখে গেলাম রোদনের দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
যত ভয়-দ্বিধা-সন্দেহ দুর্জনের লেলিহান জিভ করে নিশ্চল
বিসর্জনের স্তব্ধতায় মুক্তি লাভ করুক জীবনের সঙ্গীত।
এই প্রাসাদ প্রাঙ্গনের ধুলোকণা থেকে চিরতরে লুপ্ত হোক
নারীত্বের অপমান।
প্রার্থিনী >>
আর কোনো সংসার-অন্দরে যেন না বাজে রোদনের সন্তাপ
প্রকৃতির কাছে ছড়িয়ে দিয়ে গেলাম শেষ এই প্রার্থনার সুর।
স্বামী আমার করতে উপেক্ষা- পাবে না খুঁজে কোনদিন।
করেছিল যত হেলা আজীবন- মৃত্যুতে নেবো তার শোধ।
আত্মবিসর্জনই হোক- নারীত্বের অপমানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে
শেষ প্রতিবাদ।
কাদম্বরী >>
দিয়েছিল যে কবি অনিঃশেষ প্রেম।
অবুঝের মতো সীমার প্রাপ্তি চেয়েছিল পেতে।
একরাতে সদর স্ট্রিটের বাড়িতে হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিলাম
আলোকমালার উৎসদ্বারের সম্মুখে-
শোনাতে তাকে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের সঙ্গীত।
এরপর প্রত্যাশার পাত্র তার কঠোরতায় করেছিলাম চূর্ণ।
বলেছিলাম কবি- আছে তোমার কবিতার অসীমতা
কবিবর তুমি- জগৎ রয়েছে তাকিয়ে তোমার দিকে
ক্ষুদ্র এই কাদম্বরীর সীমায় কেন হতে চাও লীন!
চোখের জলে চরণ স্পর্শ করে বলেছিলেন কবি-
‘সীমার মাঝে অসীম তুমি।’
আজ মৃত্যুভর করে নিঃসীমতায় মিলিত হোক সেই প্রেম
দাও আমার অমৃত-বিষপাত্র যাই মিলিয়ে অসীমে…।
প্রার্থিনী >>
নিঃসীম নীলিমায় দেখো তাকিয়ে
জলভারে মেঘ করছে শুরু আনন্দবর্ষণ।
নটরাজ্ঞী- হৃদয়নুপুর বৃষ্টির ছন্দে তুলেছে নৃত্যের ঝড়
শোনো কণ্ঠে তার উঠছে বেজে প্রেমের জয়ধ্বনি
প্রেম কখনও করে না বরণ মৃত্যুকে
প্রকৃতির অনিঃশেষ জীবনে থাকে সে বহমান
অন্তশলিলে মানুষের বাঁচায়- কর্মে- সঙ্গমে-
জন্মমৃত্যু-সঙ্গীত-যুদ্ধ-ঘৃণায় আর শিল্পের সৃজনে।
আজ থেকে কাদম্বরীর নাম হোক প্রেম। জীবনের আরেক অভিজ্ঞান।
ব্রহ্মাণ্ডের ধ্বংসবিনা কখনও যার পূজা হবে না সমাপন।
জগতের মানব-মানবীর অন্তরে প্রেম হোক অক্ষয়।
পৃথিবীর প্রেমী-মানুষেরা চলো আজ সিক্ত হয়ে উঠি বৃষ্টিতে…
রচনাকাল : ১৪ অক্টোবর ২০১৮ থেকে ২২ এপ্রিল ২০১৯

[সমাপ্ত]

পূর্ববর্তী পর্বের (২) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%a7%e0%a6%a8%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%b9%e0%a6%ae%e0%a7%87%e0%a6%a6-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%a5%e0%a6%bf%e0%a6%a8%e0%a7%80-%e0%a6%95-2/