সিকদার আমিনুল হকের অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার > গ্রহণ করেছেন সালাম সালেহ উদদীন >> স্মরণ

0
702

অগ্রন্থিত সাক্ষাৎকার >> সিকদার আমিনুল হক

‘শিল্প বিষয়টা কী, সেটা বড় কথা নয়, বড় হচ্ছে প্রকরণ’

সম্পাদকীয় নোট : আজ ষাটের অন্যতম প্রধান কবি সিকদার আমিনুল হকের জন্মবার্ষিকী। তাঁর জন্ম কলকাতার কাঁচড়াপাড়ায় ৬ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে। মৃত্যু ঢাকায় ২০০৩ সালের ১৭ মে। পৈত্রিক নিবাস কুমিল্লার মতলব থানার মাদারতলি গ্রামে। তবে জীবনের উল্লেখযোগ্য সময়টা কাটিয়েছেন ঢাকায়। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ : ‘দূরের কার্নিশ’, ‘তিন পাপড়ির ফুল’, ‘সুলতা আমার এলসা’, পারাবত এই প্রাচীরের শেষ কবিতা’, ‘সতত ডানার মানুষ’, ‘কাফকার জামা’ প্রভৃতি। হাতেগোনা কয়েকজন লেখক ছাড়া আমাদের অনেক কবি-লেখক মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে হিমাগারে ঢুকে যান। তাঁদের সেই প্রকোষ্ঠ থেকে বের করে এনে যে এখনকার পাঠকদের কাছে উপস্থিত করা প্রয়োজন, লেখক-শিল্পীদের জন্মদিনে আমরা অনেকেই সেটা ভুলে যাই। কিন্তু ‘তীরন্দাজ’ এসব লেখককে আমরা যাতে ভুলে না যাই, সে-কারণে লেখক-শিল্পীদের জন্মদিন-মৃত্যুদিন উপলক্ষে তাঁদের স্মরণ করে। এই দায়বদ্ধতা থেকে আজ প্রকাশিত হলো কবি সিকদার আমিনুল হকের একটি সাক্ষাৎকার। এটি প্রকাশিত হয়েছিল অধুনালুপ্ত দৈনিক ‘আজকের কাগজ’-এ। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলন কথাসাহিত্যিক সালাম সালেহ উদদীন। ‘তীরন্দাজ’-এর পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি আবার প্রকাশ করা হলো।

সালাম সালেহ উদদীন : ষাটের দশকে সামাজিক কিংবা রাষ্ট্রিক অস্থিরতার পাশাপাশি তরুণ কবিরা বিরুদ্ধ পরিবেশ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে তা থেকে নিস্কৃতির জন্যে কাব্য-আন্দোলন শুরু করেছিল। এই আন্দোলনে আপনার কি কোনো ভূমিকা ছিল? না কি আপনি তা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন? কাব্য-আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যটা তখন কী ছিল?

সিকদার আমিনুল হক : কবি হিসেবে আমি আত্মপ্রকাশ করি ষাটের দশকের শুরুতে। এই সময়ে আমরা ‘স্বাক্ষর’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন বের করতাম। আমি, রফিক আজাদ, প্রশান্ত ঘোষাল- এই তিনজনই প্রধান ছিলাম। পরবর্তীকালে আবদুল মান্নান সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী এসে যোগ দিলেন। ষাটের দশকের শুরুতে সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ততটা প্রকট ছিল না। এর মধ্যে আমি বিয়ে করার কারণে সাহিত্য থেকে একটু বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। তা সত্ত্বেও আমাদের দলের অর্থাৎ ষাটের প্রথমার্ধের রফিক আজাদ, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আসাদ চৌধুরী- এদের মধ্যে মান্নান সৈয়দই সক্রিয় ছিলেন বেশি। অন্যরা হলে চলে গিয়েছিলেন। এরপর ষাটের দশকের শেষ দিকে আমরা আবার একত্রিত হই এবং এ-সময়ে বেশ কিছু তরুণ কবিরও আবির্ভাব ঘটে। যেমন নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আবুল হাসান, হুমায়ুন আজাদ এরা। এ-সময় সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তুঙ্গে ছিল এবং এর প্রভাব নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহার কবিতায় প্রবলভাবে লক্ষ করা যায়। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এই ধারা থেকে একটু বিচ্ছিন্ন ছিলাম। কারণ আমার বরাবরই সুস্থ কবিতা লেখার প্রতি ঝোক ছিল। এই কারণে আমি একটু বিতর্কিত হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, কবিতায় রাজনীতিটা সরাসরি আসা ঠিক নয়। সে-কারণেই ষাটের দশকের আন্দোলনের সঙ্গে আমি ঠিক ওইভাবে জড়িত ছিলাম না। ফলে, আমি একে দূরে সরে গিয়েছিলাম। আর যারা ওই সময়ে সরাসরি রাজনৈতিক বক্তব্য-প্রধান কবিতা লিখলো তারা দ্রুত সামনে চলে এলো।

সালাম সালেহ উদদীন : এটা কি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে করেছিলেন না কি অন্য কোনো উদ্দেশ্য থেকে?

সিকদার আমিনুল হক : এটা আমার স্বভাবের ব্যাপার বলতে পারেন। আমার শিল্পবিশ্বাস এবং অনেকটা আমার শিল্পরুচির কারণেই এমনটা হয়েছিল। আগেই বলেছি আমি বিশুদ্ধতায় বিশ্বাসী ছিলাম, যার কারণে সরাসরি বক্তব্যকে আমার কবিতায় কখনোই প্রাধান্য দিতাম না। কবিতার ব্যঞ্জনাটাকেই বেশি গুরুত্ব দিতাম। আমি মনে করি, কবিতা বা শিল্প বিষয়টা কী, সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা হচ্ছে প্রকরণ। এই প্রকরণকেই আমি বরাবর গুরুত্ব দিয়ে থাকি।

সালাম সালেহ উদদীন : তাহলে কি বলতে চাচ্ছেন কবিতার বিষয়ের চাইতে তার প্রকরণ ও নান্দনিকতার দিকটাকেই আপনি বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন?

সিকদার আমিনুল হক : আমি কবিতার নান্দনিকতা, কবিতার প্রকরণ, কবিতার ব্যঞ্জনা- এগুলোকেই সব সময় প্রাধান্য দিয়ে থাকি কবিতার বক্তব্যের চাইতে। কারণ, আজকের বক্তব্যটা যতখানি শক্তিশালী মনে হবে, পরবর্তীকালে হয়তো এর কোনো আবেদনই থাকবে না। কিন্তু কবিতার চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, ছন্দ, টেকনিক এগুলোই প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।

সালাম সালেহ উদদীন : আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দূরের কার্নিশে’ গদ্যছন্দের যে একচেটিয়া ব্যবহার লক্ষ করি, তা থেকে আপনি আস্তে আস্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছন্দবদ্ধ কবিতা লিখতে শুরু করেন। পরের কাব্যগ্রন্থগুলো এর প্রমাণ দেয়, অথচ আপনার শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘সতত ডানার মানুষ’-এ পুরানো ধারাতেই ফিরে গিয়েছেন- এই প্রত্যাবর্তনের কারণ কী?

সিকদার আমিনুল হক : আপনার হয়তো খেয়াল নেই যে ‘দূরের কার্ণিশে’ও কিন্তু কিছু ছন্দবদ্ধ কবিতা ছিল। তবে টানা গদ্যের কবিতা আমার প্রথম থেকেই প্রিয় ছিল। যার কারণে আমার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘তিন পাপড়ির ফুলে’ও কিন্তু গদ্যকবিতা ছিল। পরবর্তীকালে আমি গদ্যকবিতা লিখিনি তা বলা যাবে না। বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু গদ্যকবিতা লিখেছি। কবিতাগুলো সম্পূর্ণ ভিন মেজাজের এবং সেই কবিতাগুলোই ‘সতত ডানার মানুষে’ সংযোজিত হয়েছে। সুতরাং কোনো পরিকল্পনা করে কিন্তু আমি ‘সতত ডানার মানুষ’ লিখিনি। তাছাড়া ‘সতত ডানার মানুষ’ আমার আত্মজীবনীরই প্রতিফলন। সেখানে আমার শৈশবের কথা আছে, যৌবনের কথা আছে। মৃত্যুচিন্তা বিষয়ক কবিতা আছে। ‘সতত ডানার মানুষ’ মূলত ফরাসি কাব্যধারার মতো। ফরাসি কবিরা এই ধরনের গদ্যকে আশ্রয় করে কবিতা লেখেন।

সালাম সালেহ উদদীন : আপনার ‘সতত ডানার মানুষ’ পড়ে মনে হলো আপনি বাংলা কবিতার প্রবহমান ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটা স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করার চেষ্টা চালিয়েছেন। আমার এ-ধারণা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে তার ব্যাখ্যা দেবেন কি?

সিকদার আমিনুল হক : হ্যাঁ, একথা অস্বীকার করবো না যে ‘সতত ডানার মানুষে’র মাধ্যমে আমি কবিতার ক্ষেত্রে একটা ভিন্ন স্টাইল অবলম্বন করার চেষ্টা চালিয়েছি। কতটুকু সফল হয়েছি তা কেবল পাঠকই বলতে পারবেন। পুরো কাব্যগ্রন্থ জুড়ে টানা গদ্যের কাজ করেছি। পরে আমি উল্লেখ করেছি, আমার জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা, আমার শৈশব আমার যৌবনের কথা। তাছাড়া আমাদের এখানে টানা গদ্যের কবিতা সৃষ্টি হয়েছে খুব কম। যেমন আমেরিকার হুইটম্যানের কবিতায় আপনি টানা গদ্যের ধারাটি দেখতে পাবেন। তবে ফরাসি দেশে টানা গদ্যের কবিতা খুব বেশি। যেমন সাঁ ঝঁ পার্স, জুলে লাফর্গ, এদের বেশিরভাগ কবিতাই টানা গদ্যের। বাংলায় অরুণ মিত্র এবং মান্নান সৈয়দের বেশকিছু টানা গদ্যের কবিতা আছে। তিরিশের কবিদের মধ্যে বুদ্ধদেব বসু কিছু টানা গদ্যের কবিতা লিখলেও তাঁর ভেতর অন্তর্লীন ছন্দ আছে- যা থেকে আমার কবিতা সম্পূর্ণ আলাদা। আমার সময়ে অনেকেই এই ধারার কবিতা লিখতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তারা অন্তর্লীন ছন্দটা ঠিক ধরতে পারছেন না বা আমার মতো হচ্ছে না।

সালাম সালেহ উদদীন : আপনার ‘সতত ডানার মানুষ’ কাব্যগ্রন্থে ফরাসি অনেক কবিরই প্রভাব রয়েছে বলে যে-কথা বলা হয়, তা কতখানি সত্য? অনেকেরই ধারণা, ওখান থেকেই এ-ধারাটি আপনি আত্মস্থ করেছেন।

সিকদার আমিনুল হক : ‘সতত ডানার মানুষ’ কাব্যগ্রন্থে টানাগদ্যের যে প্রকরণটা, ওই প্রকরণটা ফরাসি কবিতা থেকে গ্রহণ করার কারণে অনেকেই এই ধারণা পোষণ করে থাকেন। তাছাড়া আমি বাংলা ভাষার কবি, আমার অভিজ্ঞতা এ-দেশের সীমানার মধ্যে আবদ্ধ। তবে এর আঙ্গিকটার কারণে অনেকেই এই মন্তব্য করতে পারেন। সাঁ ঝঁ পার্স কিংবা জুলে লাফর্গের কবিতার স্টাইলে লেখাও বলতে পারেন। মূলতই এটা প্রকরণের জন্যে, টানা গদ্যের জন্যে।

সালাম সালেহ উদদীন : আপনার সমসাময়িক কোনো কবির কবিতা কি আপনাকে নাড়া দেয় কিংবা আপনার ভেতর দ্যোতনার সৃষ্টি করে?

সিকদার আমিনুল হক : আমার সমসাময়িক কবিদের ব্যাপারে আমি বলবো যে শিল্পীর যে একটা নিজস্ব ভাবনা থাকে, যা কবিকে দূরে নিয়ে যায়, ইমাজিনেশন- যা একজন কবির জন্যে প্রয়োজন তা আমাদের সময়ের কবিদের মধ্যে কম। আমাদের সময়ের কবিরা বক্তব্য-প্রধান, বিবৃতি-প্রধান কবিতা লিখতেই বেশি উৎসাহী ছিলেন। যেমন, রফিক আজাদের কবিতায় দেখবেন আঁটসাট গড়নের অক্ষরবৃত্তের কবিতা- যা পড়লে বিবৃতির মতো শোনায়। কিন্তু এর মধ্যে একটা স্বপ্ন, একটা ভাবুকতা, অস্পষ্টতা, রহস্যময়তা- এই ধরা যায় আবার ধরা যায় না ভাব- এসব নিয়ে আমার সমসাময়িক কবিরা খুব কম কবিতাই লিখেছেন। যারা লিখেছেন তাদের মধ্যে আবদুল মান্নান সৈয়দের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতা আমার চেতনায় নাড়া দিয়েছে। প্রথম থেকেই তাঁর কবিতার আমি একজন একনিষ্ঠ পাঠক। আমি তাঁর কবিতা বেশ পছন্দ করি। সুতরাং আমাদের সময়ের মধ্যে মান্নান শ্রেষ্ঠ কবি। একজন কবি হিসেবে আমি তাকে শ্রদ্ধা করি।

সালাম সালেহ উদদীন : মান্নান সৈয়দের কথা যে বললেন- মান্নান – সৈয়দকে তো আমরা জীবনবিমুখ কবি হিসেবে জানি। তিনি জীবনের চাইতে শিল্পকে প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। এখানে আমরা তাকে চিহ্নিত করি শিল্পের কাছে সমর্পিত এক কবি হিসেবে। আপনার মধ্যেও এমন বৈশিষ্ট্য সহজেই লক্ষ করা যায়- এটাকে কি মান্নানের প্রভাব হিসেবে সনাক্ত করবো, নাকি আপনারা সতীর্থ হিসেবে?

সিকদার আমিনুল হক : মান্নানের দ্বারা তো প্রভাবিত হবার প্রশ্নই আসে না। কারণ আমরা একই সময়ের কবি। হ্যাঁ, যদি প্রভাবিত হতে হয় তাহলে বিশ্বসাহিত্য পড়ার জন্যে। আমি বিশ্বাস করি যে একেক জন মানুষের মধ্যে একেকটা প্রবণতা কাজ করে। কবিরাও এর ব্যতিক্রম নন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে মান্নান বিশুদ্ধ শিল্পসৃষ্টির দিকে মনোযোগী হয়েছে সব চাইতে বেশি। আমার মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষণীয়। সেজন্য এটাকে প্রভাব হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। আবার মোহাম্মদ রফিকের কথা যদি ধরি, তবে তার মধ্যে জীবন-ঘনিষ্ঠতার ছাপ স্পষ্ট। কুমার, কামার এবং জেলেদের জীবন নিয়েই তিনি বেশি কবিতা লিখেছেন। আবার রফিক আজাদের কবিতায় মধ্যবিত্ত জীবনের বিভিন্ন অস্থিরতা টানাপোড়েন লক্ষ করা যায়। এটা একেক জনের একেকটা জন্মগত স্টাইল। যেমন আমি শৈশব থেকেই বিশুদ্ধ কবিতা ভালোবাসতাম, বিশুদ্ধ কবিতা খুঁজে খুঁজে পড়তাম। মান্নানের কবিতা যদি মনোযোগ দিয়ে পড়েন তাহলে দেখবেন বিষয়ের দিক থেকে আমরা পরস্পর ভিন্ন। তবে একটা দিকে আমাদের মধ্যে মিল আছে, সেটা হলো প্রকরণের দিক দিয়ে আমরা উভয়ে শিল্পশুদ্ধতায় বিশ্বাসী।

সালাম সালেহ উদদীন : ইদানীং পশ্চিমবঙ্গের অঞ্জন সেন, প্রবাল দাশগুপ্ত এঁরা উত্তর-আধুনিকতা নিয়ে বেশ হৈচৈ করছেন। ফলে উত্তর আধুনিকতা প্রসঙ্গটি বেশ আলোচিত এবং সাহিত্যে এর উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে- এ ব্যাপারে আপনার মতামত বলুন?

সিকদার আমিনুল হক : এই আন্দোলনটা সময়ের সীমান্ত পার না হলে বলা যাবে না যে কতটুকু সফল বা সাহিত্যে কতটুকু অবদান রাখতে পারবে। সবসময় সাহিত্যে নতুন কিছু চিন্তাভাবনা হয়। যদি চিন্তাভাবনা না হতো তবে সাহিত্য স্থবির হয়ে যেত। সাহিত্য অগ্রসর হতে পারতো না। এখন যে উত্তর-আধুনিকতার কথা বলা হচ্ছে, এ-বিষয়ে সঠিক কিছু বলা যাবে না, তবে সাহিত্যে নতুন কিছু সংযুক্ত নিশ্চয়ই তারা করে যাবেন, যদি সফল কবির আবির্ভাব ঘটে। সাহিত্য এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না, সব সময়ই নতুন কিছু করার চেষ্টা চলে। আমরা যদি দাদাইজম, সুররিয়ালিজম বা কিউবিজমের কথাও ধরি, এর প্রভাব কম-বেশি আমাদের সাহিত্যে এখনো বিদ্যমান। সুতরাং উত্তর-আধুনিকতারও প্রভাব থাকবে।

সালাম সালেহ উদদীন : অন্যান্য আন্দোলনের মতো এই আন্দোলনটি কি আপনার কাছে স্পষ্ট মনে হয়?

সিকদার আমিনুল হক : এটা স্পষ্ট নয় এই জন্য যে, এই আন্দোলনের সঙ্গে কোনো বড় প্রতিভাবান কেউ জড়িত হয়নি। তারা কী বলতে চান, কী লিখতে চান, কী করতে চান, বা তাদের কবিতার মেনিফেস্টোটা কী, তারা সেটা প্রকাশ করতে পারতো। আমি আগেই বলেছি এই আন্দোলনের সাথে যদি শক্তিমান কোনো লেখক না থাকে, তবে এই জিনিসটি টিকবে না। তাছাড়া অন্যান্য আন্দোলনের মতো এটা হাতে-কলমে প্রমাণ দিতে হবে। এর সফল প্রয়োগ দেখাতে হবে। তা না হলে এটা কথার কথা থেকে যাবে।

সালাম সালেহ উদদীন : আপনি দীর্ঘদিন কবিতা লেখা থেকে বিরত ছিলেন। আবার নতুন করে যখন কবিতা লিখতে শুরু করলেন। এখন আপনার কবিতায় আঙ্গিকগত এবং কলাপ্রকৌশলগত বিবর্তন লক্ষ করার মতো, এটা কী আপনার দীর্ঘ সময়ের কাব্যভাবনার ফল না অন্য কিছু?

সিকদার আমিনুল হক : সত্যি কথা বলতে কি, যে-সময়ে আমি কবিতা লেখা থেকে বিরত ছিলাম সে-সময়ে কবিতা সম্পর্কে সিরিয়াসলি ভাবিনি। তবে অন্যান্য বই প্রচুর পড়েছি। বিশেষ করে বিদেশী বই। তখন লেখার প্রতি আমার আগ্রহ কমে গিয়েছিল। তারপর নতুন করে আবার যখন লিখতে শুরু করলাম তখন চিন্তা চেতনায় একটু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করলাম। দীর্ঘদিন পর লেখা শুরু করলে যা হয়।

সালাম সালেহ উদদীন : একজন কবি বা লেখকের ব্যক্তিগত জীবন তার রচনায় কতটা প্রভাব ফেলে? আরেকটু প্রসারিত করে বললে একজন কবি কী কেবল নিজেকেই রচনা করেন?

সিকদার আমিনুল হক : হ্যাঁ, একজন কবি মানেই তার অভিজ্ঞতা। কবি বলেন, ঔপন্যাসিক বলেন, গল্পকার বলেন, আসলে তাঁর জীবনাভিজ্ঞতাই তাঁর লেখার মধ্যে ফুটে ওঠে। তবে অভিজ্ঞতা দু’ধরনের : বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা এবং বইপুস্তক পড়ার অভিজ্ঞতা। যেমন বাস্তব জীবনে আমি অনেক কিছুই দেখিনি, জানি না, কিন্তু বইপুস্তক পড়লে সে-সম্পর্কে জানা যায়। তবে বাঙালিদের সৌভাগ্যই বলেন আর দুর্ভাগ্যই বলেন, বাঙালি-জীবন খুব নিস্তরঙ্গ জীবন, ঠিক ইউরোপের জীবনের মতো গতিময় না। তা সত্ত্বেও সব মিলিয়ে আমরা যে-জীবন তৈরি করি, তার মধ্যে স্বপ্ন থাকে, কল্পনা থাকে, এসবের মিশ্রণে আমরা জীবনকে উপলব্ধি করি এবং তা একজন লেখকের লেখার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে। অর্থাৎ জীবন কী রকম হওয়া উচিত। এ-সম্পর্কে একজন লেখক হিসেবে আমি কী ভাবি, আমার লেখায় তার কতখানি প্রতিফলন ঘটেছে সেটাই বড় ব্যাপার, যদিও একজন কবির অভিজ্ঞতা অন্যদের চাইতে ভিন্নতর হয়ে থাকে, একজন কবিকে ঔপন্যাসিকের মতো জীবনের আনাচে-কানাচে প্রবেশ না করলেও চলে। রহস্যময়তা কল্পনা প্রবণতা কবিদের মধ্যে বেশি কাজ করে।

সালাম সালেহ উদদীন : এখানকার কোনো কবি কি আপনাকে প্রভাবিত করে? এর বাইরে কোনো বিদেশী কবি প্রভাবিত করে থাকলে বলুন। প্রভাব শব্দটার প্রতি আপনার কোনো এলার্জি আছে কি-না? এই শব্দটার ব্যাখ্যা আপনি কীভাবে দেবেন?

সিকদার আমিনুল হক : কোনো কবি বা তাঁর কবিতা বিচ্ছিন্ন নয়। প্রত্যেক কবির ওপরই প্রত্যেক কবির কিছু না কিছু প্রভাব থাকেই। কোনো কবির উপমা চিত্রকল্প আমার ভালো লাগলে আমার কবিতায় তা অন্যভাবে প্রয়োগ করার চেষ্টা করি । কবিতা হচ্ছে অনন্তস্রোত, এর মধ্যে আমি নিজেকে সংযোগ করি মাত্র। অন্যান্য কবিদের ভূমিকাও তাই। এই স্রোতধারা চলতেই থাকে। কেউ আমাকে ঠিক ওইভাবে সরাসরি প্রভাবিত করেছে বলা যাবে না, তবে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত প্রভৃতি কবির কবিতা আমাকে সামান্য হলেও প্রভাবিত করেছে। বিদেশী কবিদের প্রভাবও আমার ওপরে পড়েছে- চিন্তায়, ভাবনায় বা শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশের ক্ষেত্রেও। প্রত্যেক তরুণ কবির কবিতায় তার পূর্ববর্তী কারো না কারো কবিতার প্রভাব পড়বেই। যদি কেউ বলে যে সে নিজেই সার্বভৌম কিংবা নিজে নিজেকে তৈরি করেছে, এটা অন্তত আমি বিশ্বাস করবো না। সে-অর্থে প্রভাব শব্দটার প্রতি এলার্জি থাকা উচিত নয়। আমার কথাই যদি বলি তাহলে বলতে হয়, আমি ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুলের কবিতা নকল করে লিখেছি এবং প্রত্যেক কবিরই প্রথম জীবনে কারো না কারো প্রভাব থাকবেই। যদি না থাকে তবে ভাববো সে লেখকই না। প্রভাব কোনো খারাপ জিনিস না। কিন্তু শেষ কথা হলো প্রভাবটা যদি চিরকালই থাকে, তাহলে তো সে লেখা কেউ পড়বে না।

সালাম সালেহ উদদীন : এদেশের অনেক কবিই কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, খ্যাতি কুড়িয়েছে এবং নানান পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে, অথচ একজন কবি হিসেবে আপনার স্বতন্ত্র কাব্যভাবনা থাকা সত্ত্বেও ঠিক ওই অর্থে আপনার স্বীকৃতি মেলেনি- আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কিছু বলুন।

সিকদার আমিনুল হক : আমি নিয়তি বা ভাগ্যে বিশ্বাস করি। অনেক দেশেরই খুব বড় মাপের লেখকটি নোবেল পুরস্কার পাননি। আবার অপেক্ষাকৃত কম খ্যাতিসম্পন্ন লেখক তা পেয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা অন্য রকম। এখানে অনেক অকবি কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। এ কাজটি করে গেছেন পঞ্চাশের দশকের কবিরা। তারা নিজেদের মধ্যে হানাহানি করে দল ভারি করার জন্য অনেক অকবিকেই কবি বানিয়েছে এবং সেই ধারাটি আজও চলে আসছে। অথচ পশ্চিমবঙ্গে এটা হয় না। ওখানকার কবিদের লেখার একটা গড় মান আছে। কিন্তু আমাদে্র এখানে কোনো বাছ-বিচার নেই। আর এদের পড়াশোনার এতো অভাব যে তা বলাই বাহুল্য। বিদেশী সাহিত্য তো দূরে থাকুক, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসও যদি সঠিকভাবে পড়তো, তাহলে কবিতা লেখার সাহস পেতো না। তারাই আবার বড় বড় পুরস্কার পাচ্ছে। আমি যথার্থ স্বীকৃতি পাইনি এটা আমার নিয়তি। এ প্রসঙ্গে ডি এল রায়ের কথা বলতে পারি। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাল আমার প্রতি উদাসীন ছিল’। এখানে যারা পুরস্কার দেন এবং যারা নেন তারা কীভাবে নেয় এবং দেয় তা সবই জানি। আমি ওভাবে নিতে চাই না। কারণ সাহিত্যকে আমি মহাপবিত্র জিনিস বলে মনে করি। তাছাড়া পুরস্কার দিকে থাকে না। যা টিকে থাকে তা হচ্ছে সাহিত্য। আর সেটাই করার চেষ্টা করছি। যদি সফল হই তবে পঞ্চাশ বছর পর হলেও পাঠক আমাকে স্মরণ করবে। এবং সেটাই আমার জন্য যথেষ্ট।

সালাম সালেহ উদদীন : ষাটের দশকে সামাজিক জীবনে তারুণ্যের রে অবক্ষয়, সেই অবক্ষয়কে পুঁজি করে কাব্যক্ষেত্রে যেভাবে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছিল এবং কবিতায় পলাদলের ক্ষেত্রে একটা হৈ চৈ পড়েছিল, অথচ সত্তরের দশকে তা মিইয়ে যায় এবং আশির দশকের কিছু তরুণ কবি অনেকটা পূর্ববর্তী ধারায় আন্দোলনে মুখর হয়ে দাবি তোলে যে তারাও কাব্যক্ষেত্রে নতুন পালাবদল ঘটাতে যাচ্ছে। কাব্যক্ষেত্রে এই পালাবদল, এই ষাটের দশকের কবিরা কতটুকু ঘটাতে পেরেছিল এবং আশির দশকের তরুণ কবিরাই-বা কতটুকু সফল হয়েছে?  

সিকদার আমিনুল হক : সময় থেকে দূরে না গেলে জিনিসটা স্পষ্ট হবে না। যেমন আমরা এখন তিরিশের কথা বলতে পারি, কারণ তিরিশ বেশ দূরে চলে গেছে। তিরিশ সম্পর্কে এখন আমাদের ধারণা খুবই স্পষ্ট। পঞ্চাশের আন্দোলন থেকে ষাটের আন্দোলন একটু ভিন্ন ছিল কারণ ষাটের দশকে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল প্রবল এবং এটাকে কেন্দ্র করে প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। কিন্তু এখনই বলা যাবে না যে, ষাট আমাদের জন্য কী করেছে। আর আশির কবিরা নিজেরা যতই গলাবাজি করুক না কেন, এরা শামসুর রাহমান কিংবা আল মাহমুদকে উত্তীর্ণ করে কিছু করেছে বলে মনে হয় না। তাদের দাবি দেখছি যে তারা নতুন কিছু করতে যাচ্ছে। তবে তাদের কবিতায় এরকম কোনো প্রমাণ আমি পাইনি। তাদের অনেকেরই সমসাময়িক বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় আছে, পড়াশোনা করছে, কিন্তু তারা নিজেদের লেখার ব্যাপার পরিশ্রমী নন। এটা খুবই দুঃখজনক ব্যাপার।