সিলভিয়া প্লাথ > জার্নালের ফুলকি >> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
462

সিলভিয়া প্লাথ > জার্নালের ফুলকি

[সম্পাদকীয় নোট : রাজিয়া সুলতানা মার্কিন প্রবাসী কবি, লেখক ও অনুবাদক। আজ তাঁর জন্মদিন। তীরন্দাজের পক্ষ তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাই। পড়ুন তাঁরই অনুবাদে সিলভিয়া প্লাথের জার্নালের কিছু অংশ। সিলভিয়া প্লাথের জীবন নিয়ে নিরন্তর গবেষণা চলছে। নিজের জীবনদীপ নিজেই নিভিয়ে দেয়া এই কবির কবিসত্তাকে বোঝার জন্যে এই জার্নালের গুরুত্ব যে অপরিসীম, গবেষকরা একবাক্যে সেটা স্বীকার করেছেন। যা-ই লিখে থাকুন না কেন প্লাথ, তা যে কল্পনা আর ভাষার অবিস্মরণীয় সৌন্দর্যে প্রকাশিত হয়েছে সেটা এই জার্নাল পড়লেও বোঝা যায়। এখানে সংকলিত অনূদিত অংশগুলি পড়ুন, তাতেও পাওয়া যাচ্ছে সেই ভাষিক-নান্দনিক উদ্ভাস। চমৎকার অনুবাদ করেছেন অনুবাদক রাজিয়া সুলতানা। তাঁর জন্মদিনে তিনি আমাদের উপহার দিলেন সিলভিয়ার লেখা অবিস্মরণীয় জার্নালের আলোর ফুলকি।] 

এক

এমিল। হ্যাঁ ওর নাম এমিল। কী বলতে চাচ্ছি? বলতে চাচ্ছি যে শনিবার রাত ন’টায় ও আমাকে ফোন করেছিল। আজ সকালে আমার দুটো আক্কেল দাঁত তোলায় সেই ব্যথায় এখনও দুর্বল আমি। বলতে চাচ্ছি আমরা জোড় বেঁধে মানে ডাবল ডেটিং করতে গিয়েছিলাম `টেন অ্যাকর’ রেস্টুরেন্টে। সেখানে সারাটা সন্ধে জুড়ে নেচেছি আর মদ খেয়েছি। আমি পাঁচ গ্লাস চকচকে টনি জিঞ্জারেলের সবটুকু, এমনকি তলানিটুকু পর্যন্ত গলাধঃকরণ করতে ছাড়িনি। অন্যরা বীয়ার খেয়েছিল। শুধু কি তাই? আরও কথা আছে। এবার সেই কথায় আসা যাক।
আমি সময় নিয়ে আস্তে-ধীরে তৈরি হচ্ছিলাম সেদিন; ওপরতলায় বসে বসে আলতোভাবে পারফিউম আর পাউডার মাখছিলাম। বাইরে নরম ধূসর গোধূলি-আলোয় টুপটাপ বৃষ্টি ঝরছিল আর নিচে সবাই বারান্দায় বসে কথা বলছিল, হাসাহাসি করছিল। আমি ঘরের ভেতরে সাজগোজ করতে করতে ভাবছিলাম – এই আমি এক মার্কিন কুমারী, কাউকে প্রলুব্ধ করতেই আজ আমার এই প্রস্তুতি, এই সাজসজ্জা। আমি তো জানি, এই সন্ধেয় আমার মাথায় শুধু যৌন-আনন্দের কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবছি, আমরা ডেটিংএ যাই, আনন্দ করি। ভালো মেয়ে হলে একটা সময়ে এসে সংযমীও হই। হলোও তাই – আমরা হেঁটে হেঁটে একটা পানশালায় ঢুকে দুজন দুজন করে বসলাম। এমিল আর আমি। আমরাই প্রথমে কথা বলতে শুরু করলাম। অদ্ভুত ধরনের ছিল সেই কথাবার্তা। ও বলছিল আজ সকালে সে এক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় গিয়েছিল। ওর কুড়ি বছর বয়সী কাজিন কোমর ভেঙে বিছানায় পড়ে আছে, সারাজীবনের জন্য সে পঙ্গু হয়ে গেছে। বারো বছর বয়সে ওর আরেক বোন নিমোনিয়া হয়ে মারা যায়। এরপর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে ও বলেছিল “হায় ঈশ্বর, আজ রাতটা তো শুরুই হলো রোগবালাইয়ের কথা দিয়ে।” বলেছিল, “জানো, কালো চোখ আর সোনালি চুল আমার খুব পছন্দ।” এরপর আমরা ছোটছোট বিষয় নিয়ে কথা বলেছিলাম; বলেছিলাম বারবার একই কথা বললে কীভাবে সেই কথার অর্থ হারিয়ে যায় – কীভাবে নিগ্রো গোত্রের কারো সঙ্গে ব্যক্তিগত পর্যায়ে জানাশোনা না থাকলে ওদের সবাইকে একইরকম মনে হয়। আর যে বয়সে আমরা সবচেয়ে ভালো থাকি সেই বয়সটা আমাদের কতোই না প্রিয়। অন্য ছেলেটাকে লক্ষ্য করে ও বলেছিল –“ওয়ারির জন্য আমার করুণা হয়। ও এসেছে অ্যামহার্স্ট থেকে। দ্যাখো, ওর বয়স বাইশ বছর, ওকে কিন্তু সারাজীবন কাজ করে খেতে হবে। অথচ আমার আর মাত্র দুবছর। কলেজের পড়াশোনা শেষ হলেই…”
আমি বলেছিলাম – “ঠিক, সেজন্য জন্মদিনকে আমি সবসময় ভয় পাই।”
এমিল বলেছিল, “বয়সের চেয়ে বয়স্ক দেখায় আমাদের।”
“আমি বুঝি না কীভাবে মানুষ বার্ধক্য সহ্য করে। তখন তো ভেতরে সবকিছু শুকিয়ে যায়। অথচ তরুণ বয়সে নিজেদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করা যায়। ধর্মটর্মও অত লাগে না।”
“তুমি কি ক্যাথলিক নাকি?” ও আমাকে এমনভাবে জিজ্ঞেস করল যেন তা না হওয়াটাই ভালো।
“না, তুমি?”
ও খুব নিচু গলায় বলল “হ্যাঁ, আমি ক্যাথলিক।”
এটা-সেটা, আরও টুকরো কথা, হাসাহাসি – মাঝে মাঝে পাশ থেকে অলক্ষ্যে মুখে ক্ষণিক দৃষ্টিনিক্ষেপ, শরীরের সঙ্গে ঘষা লাগা, যেন না-বলা কথাগুলোর, আনন্দের প্রকাশ ছিল সেগুলো। বাতাসে পুরুষালি একটা তীব্র গন্ধ বেঁচে থাকার আনন্দকে উস্কে দিচ্ছিল। এমিলের মধ্যে কী একটা আকর্ষণ অনুভব করছিলাম। কোথাও গভীরে ও আমাকে ছুঁয়েছে। গাম্ভীর্যের একটা স্পর্শ, একটা রসায়ন আজ রাতে আমার ভাবাবেগের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আমাকে ওর দিকে চুম্বকের মতো টানছে, যেন কোনো শিশুর পাজেলের দুটো টুকরো ঠিকঠাক মতো মিলে গেছে। ওর সুন্দর অবয়ব, গভীর কালো চোখ, চোখের বড় বড় মণি, খাঁড়া নাক, বাঁকা গালের কোণ থেকে উচ্ছ্বল হাসি, দাঁড়িহীন ধারালো চিবুক এবং স্পর্শকাতর দুটো হাত; এককথায় কাটাকাটা চেহারার নিটোল গড়নের একটা ছেলে সে। জানতাম এরকমই হবে। নাচতে গিয়ে ডান্স ফ্লোরে ও আমাকে কাছে টেনে নিল। যখন আমরা অনেক ঘনিষ্ঠ হয়ে নাচছি, তখন অনুভব করলাম আমার পেটের কাছে ওর শিশ্নটা সেঁটে আছে। ওর বুকের চাপে আমার স্তন ব্যথা করছে, শক্ত হয়ে আছে। আর আমার ভেতরে বইছে এক উষ্ণ মদিরার বন্যা। ঘুমঘুম একটা ঝিমুনি অনুভব করছিলাম। এর মধ্যে আমার চুলের কাছে মুখ এনে ও আমার গালে একটা চুমু খেলো। বলল, “আমার দিকে তাকিও না। আমার শরীর ভেজা আর উত্তপ্ত। ভেবে নিতে পারো এইমাত্র সুইমিংপুল থেকে উঠে এসেছি।” (ঈশ্বর, আমি জানতাম এমনটিই হবে)। আমার দিকে ওর তখন গভীর সন্ধানী দৃষ্টি। দুজনেরই দৃষ্টি তখন একে অন্যের চোখে নিবদ্ধ। এ-এক অন্যরকম অনুভূতি। আমি যেন ডুবছিলাম, ডুবে মরে যাচ্ছিলাম। দুবার এমন হলো। এমিল ওর দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিল। মধ্যরাতে যখন ওয়ারির বাসার দিকে যাচ্ছিলাম, গাড়ির মধ্যে ও আমার মুখে নরম করে চুমু খেলো। ভেজা ছিল সেই চুমু। ওয়ারির বাসায় বারান্দার মৃদু আলোয় আরও নাচ, আরও জিঞ্জারেল আরও বীয়ার চলল। আমার শরীরের সঙ্গে এমিলের শরীর শক্ত হয়ে সেঁটে ছিল তখন। উষ্ণ, মোলায়েম প্রেমের গানের সঙ্গে আমরা দুলে-দুলে নাচছিলাম। নাচ তো সঙ্গমেরই স্বাভাবিক পূর্বরঙ্গ, ছল। ছোটবেলায় যখন নাচের ক্লাসে নাচ শিখতাম তখন তো বোঝার বয়স হয়নি। বড় হয়ে এখন বুঝতে পারছি। এমিল বলল, “আমাদের এখন বসা দরকার।” আমি মাথা নাড়িয়ে অসন্মতি জানালাম। ও বলল, “না? আচ্ছা, চলো পানি খাই। তুমি ঠিক আছ তো?” (হ্যাঁ, হ্যাঁ, সবকিছু ঠিক আছে। থ্যাংক ইউ)। ও আমাকে ধরে কিচেনের দিকে নিয়ে গেল। বাইরে বৃষ্টির সঙ্গে কিচেনে লিনোলিয়ামের মিষ্টি একটা গন্ধ। আমি বসে পড়ে ওর আনা পানি খাচ্ছি। ও নিচের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আধো আলোয় ওকে ক্যামন অদ্ভুত লাগছিল দেখতে। আমি জানালার কাঁচ নামিয়ে দিলাম। ও বলল, “বাব্বাহ! এমন ঝটপট শেষ করে দিলে। আমি বললাম, “আরও কী সময় নেয়ার প্রয়োজন ছিল?” বলে দাঁড়াতেই ও আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে আমাকে ওর বাহুপাশে আবদ্ধ করে ফেলল। কিছুক্ষণ পর আমি ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললাম, “এর চেয়ে বরং বৃষ্টিই ভালো। বৃষ্টির শব্দ শুনতে ভালো লাগে। ব্যাপারটা আধিদৈবিক।” তখন সিঙ্কের দিকে পিঠ দিয়ে আমি দাঁড়িয়ে। এমিল কাছে এলো। অনুভব করলাম মিষ্টি একটা উষ্ণতা ওর মধ্যে আর ওর চোখদুটো চকচক করছিল। ওর মুখে যৌনাকাঙ্ক্ষা ফুটে উঠেছে, ওকে সুন্দর লাগছে দেখতে। আমি ইচ্ছে করেই বললাম, “শরীর ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারো না তুমি আমাকে, না?” যে-কোনো সাহসী প্রণয়প্রার্থী ছেলে একথা অস্বীকার করবে। মিথ্যে বলবে। কিন্তু এমিল তা করল না। ও আমাকে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “এই কথাটা বলা তোমার ঠিক হলো? বলো? সত্যি করে বলো, ঠিক হলো, বলাটা?”
“আসলে কী জানো, সত্যিটা বলেছি তো, তাই মনে কষ্ট পেয়েছ।” (অথচ বারবার একথা বলা যায়)। এমিল এবার শব্দ করে হেসে দিল। বলল, “এমন তিক্ত কথা বলো না তো। তোমার শরীরই আমার কাছে সব নয়। সিংক থেকে এদিকে সরে এসো, এসে দ্যাখো।” ও সরে দাঁড়াল, আমার পেট একটু ছুঁয়ে দিয়ে আমাকে কাছে টেনে নিয়ে লম্বা সময় নিয়ে মধুর করে একটা চুমু খেলো। তারপর ছেড়ে দিয়ে মৃদু একটা হাসি দিয়ে বলল, “দেখলে তো, সত্যটা কিন্তু সবসময় আঘাত করে না, কষ্ট দেয় না। বলো, দেয়?” এরপর ঝুমবৃষ্টির মধ্যে আমরা বের হলাম। গাড়িতে ও আমার মাথায় মাথা রেখে আমাকে জড়িয়ে ধরে রইল। আমরা বৃষ্টিস্নাত অন্ধকার রাস্তায় ঝাপসা লাইটগুলো দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। বৃষ্টি মাথায় করে বাসায় গিয়ে পৌঁছুলে এমিল ঘরে এসে পানি খেলো। আমাকে বিদায়ী চুমু দিয়ে চলে যাবার পর মনে হলো ওর মধ্যে কিছু একটা আছে – আমি ওকে চাই। ও মদ খায়, ধূমপান করে, ক্যাথলিক হয়েও একটার পর একটা মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়… তারপরও আমি ওকে চাই। ও চলে যাবার সময় দরজায় দাঁড়িয়ে বলেছিলাম, “বলব না খুব ভালো সময় কেটেছে বরং বলব দুর্দান্ত কেটেছে সময়টা।”
“আমি তোমাকে ফোন দেব। নিজের যত্ন নিও।” বলে ও চলে গেল। বাইরে তখন ধুমল বৃষ্টি, যেমনটি এডি কোহেন গায়, “আই সে… ফিফটিন থাউজ্যান্ড ইয়ারস… অব হোয়াট? উই আর স্টিল নাথিং বাট এনিম্যালস।” কোথাও হয়তো ওর ঘরে এমিল শুয়ে আছে, বৃষ্টির গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ছে। ঈশ্বরই ভালো বলতে পারবেন ও এখন কী ভাবছে।

দুই

কখনো কখনো মনে হয় আমার বোঝার শক্তির বাইরে কিছু কিছু ব্যাপার অপেক্ষা করে থাকে – কখন সেগুলো আমার কাছে বোধগম্য হবে এই ভাবনায়। এই চৈতন্যটা প্রতারণামূলক একটা বোধের নাম, যা পেটের মধ্যে ঘুরপাক খায়, কিন্তু মুখে আসে না। মানুষের কথা ভাবলেই আমার এই অনুভূতিটা হয়। মানুষের বিবর্তনের ধারায় চোয়াল সংকীর্ণ করার আর প্রয়োজন নেই কারণ, যে ভুষি চাবাতে অভ্যস্ত ছিলাম, এখন আর তার প্রয়োজন হবে না, তাই এখন আক্কেল দাঁত উৎপাটন করো। ধীরে ধীরে মানুষের মাথার চুল উধাও হয়ে যায়। আবার ক্ষুদ্র অক্ষরে কিছু পড়তে হলে চোখেরও সামঞ্জস্য বিধান করো, বিংশ শতাব্দীর এই ক্ষিপ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলো। মনুষ্য প্রজাতির জন্ম, বিয়ে আর মৃত্যুর আচার-অনুষ্ঠানগুলো আমার কাছে ভুয়া আর অস্পষ্ট মনে হয়। আদিম বর্বরোচিত আচার-বিধিগুলো আধুনিক সময়ের দিকে ধাবিত হতে থাকে। আমি বলি কি, যুক্তিহীন পাশবিক বিশুদ্ধতাই সবচে ভালো। ওহ! কিছু একটা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সম্ভবত কোনো একদিন সেই বিস্ময় আমার ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটাবে। তখন এই চির-গুরুত্বপূর্ণ হাস্যকর কৌতুকটির অন্যপিঠটাও দেখতে পাব। আমি দেখব আর হাসব; তখন বুঝতে পারব জীবন কী…

তিন

আজ রাতে ঘুমোতে যাবার আগে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যেতে চাই; ঘরে ভ্যাপসা গুমোট বাতাস রুদ্ধ হয়ে আছে একদম। ঘুমোবার জন্য পাজামা পরে নিয়েছি। সদ্য-ধোয়া চুল কার্লারে পেঁচিয়ে রেখেছি। সামনের দরজাটা খুলতে গিয়ে চাবিটা ভেঙে গেল। হাতল ধরে খুলতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু দরজা খুলল না। বিরক্ত হয়ে হাতলটা বিপরীত দিকে ঘোরালাম; তাতেও কাজ হলো না। শেষে মোচড় দিয়ে সেটা ভেঙেই ফেললাম। হাতল আর তালার বিভিন্ন অবস্থানে মাত্র চারটা কম্বিনেশন। তাও খুলছিল না। কম্বিনেশনের বিভ্রান্তির জন্য এই ভোগান্তি। ওপরে তাকিয়ে দেখি কাঁচের ভেতর দিয়ে দরজার ওপরে রাস্তার ধারে সারি সারি পাইনের গাছ। তারই পেছনে পাইনের সূঁচালো অগ্রভাগ দিয়ে অনুপ্রবিষ্ট একটুকরো আকাশ; সেই আকাশে উজ্জ্বল হলুদ রঙের পূর্ণ চাঁদ। হঠাৎই আমার নিঃশ্বাস ধরে এলো, যেন, ছোট্ট বর্গাকার দরজার সেই কাঁচ দিয়ে রাতের সেই প্রহেলিকা, ছোট্ট আকাশ আমার কণ্ঠ রোধ করে ধরেছে, আমায় ফাঁদে আটকে ফেলেছে। ঘরের উষ্ণ, মেয়েলি পরিবেশ আমাকে ঘন পালকের নিঃশ্বাস বন্ধ করা আলিঙ্গনের খামে বন্দি করে ফেলেছে।

চার

গতরাতে ঘুম হয়নি একদম। সারারাত এপাশ-ওপাশ করেছি। হেঁটেছি, ছোটছোট অসংলগ্ন, বিক্ষিপ্ত স্বপ্ন দেখেছি। সকালে জাগলাম যখন তখন মাথাটা ভারি হয়ে আছে। মনে হচ্ছে দূষিত গরম পানির পুলে সাঁতার কেটে উঠেছি। তেলে ভর্তি চুল শক্ত হয়ে আছে, ত্বকও তেলে ভরা, হাত দিয়ে কর্দমাক্ত আর নোংরা কিছু স্পর্শ করেছি। আগস্টের ভারি বাতাসে অবস্থা আরও খারাপ। ঘাড়ের পেছনটা ব্যথা করছে আর আমি গাধার মতো এখানে বসে আছি। মনে হচ্ছে, সারাদিন পরিস্কার ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুলেও আঁঠালো থকথকে এই ময়লা দূর করা সম্ভব হবে না। দাঁত ব্রাশ করা হয়নি। মুখের ভেতরে পশম-পশম একটা স্বাদ – এই বিরক্তিকর কটু গন্ধটাও দূর হবে না।

পাঁচ

আজ রাতে কিছুক্ষণের জন্য ভেতরটা শান্তিতে ভরে ছিল। বারোটা বাজার একটু আগে আমি রাস্তায় বের হলাম। মনে অতৃপ্ত বাসনা, একা লাগছিল খুব আর রাগ হচ্ছিল নিজের ওপর। এমন সময় লক্ষ্য করলাম – আগাস্টের অলৌকিক রাত। একটু আগে বৃষ্টি পড়া থেমেছে। কুয়াশাময়, ভেজা, উষ্ণ ভারি বাতাস। পেছন থেকে দ্রুত ধাবমান খণ্ডখণ্ড মেঘের ফাঁক থেকে উঁকি দিচ্ছে আলোবতী পূর্ণচাঁদ। মায়াবী সেই আলোর ফ্রেমে বাঁধা টুকরো টুকরো মেঘগুলো ছবির পাজেলের মতো ভাঙা ভাঙা। মনে হচ্ছে বাতাস থেমে আছে, অথচ গাছের পাতাগুলো অনবরত দুলেই চলেছে। রাস্তা দিয়ে কেউ হেঁটে যাচ্ছে এ রকম শব্দ করে যে সেগুলো থেকে বড় বড় ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পড়ছে। বাতাসে ছ্যাৎলা-পড়া মরা পাতার স্যাঁতসেঁতে বিদঘুটে গন্ধ। সিঁড়ির প্রথম ধাপের ওপরে কুয়াশাচ্ছন্ন দুটো বাতি বর্ষণমেঘে ঢাকা, তবুও উজ্জ্বল আর দেদীপ্যমান সেই আলো! বাল্বের আলোয় ভঙ্গুর, বিভ্রান্ত হালকা ডানার পতঙ্গগুলো অবসন্নের মতো ডানা নাড়ছে আর ঝিমোচ্ছে। আকাশে এমনভাবে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে যেন মঞ্চে অভিনয়ের দৃশ্য পরিবর্তনের সময় কেউ হাত দিয়ে সুইচ টিপে আলো জ্বালাচ্ছে আর নেভাচ্ছে। গ্রানাইট পাথরের সিঁড়ির ফাঁকে দুটো ঝিঁঝিঁ পোকা শিকারের উদ্দেশ্যে মিহিসুরের ঢেউ তুলে গান গাইছে। চারপাশে বাতাসের ভারি প্রবাহমানতা, চাঁদ, রাস্তায় বাতির আলো বিভক্ত হয়ে সিজোফ্রেনিক বিষাদে অদ্ভুত একটা ছায়ামূর্তি তৈরি করেছে; আর সেই মূর্তিটি আবছায়ার মতো ক্রমাগত দুলে চলেছে।

ছয়

ওপর তলার বাথরুমটায় সাদা উজ্জ্বল আলো; টুথপেস্ট আর উষ্ণ মাংসের গন্ধে কোনো কিছু না ভেবেই ফসেটের চকচকে ক্রোমিয়ামের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ আমি। ভঙ্গুর, অন্ধ করে দেয়ার মতো চোখ-ধাঁধানো আলোর ঝলকে রোজকার মতো সিংকে উপুড় হয়ে মুখের ভিতরের বিভিন্ন স্থান ব্রাশ করছি, মাজছি। বাথরুম তো রুমই একটা – সেখানে সবুজ রঙের মসৃণ যষ্ঠির মিষ্টি গন্ধ; ঠাণ্ডা-গরম পরিচ্ছন্ন আবেশ ছড়ানো আবহে পেন্সিলে আঁকা পাতলা চুল, সাদা এনামেলের ওপর আঁকিবুঁকি, ডেন্টিস্টের রঙিন প্রেসক্রিপশন, কাঁচের বয়াম, বোতলে রাখা জিনিসপত্র – এসবকিছুই ঠান্ডার উপসর্গ নস্যাৎ করে দিতে পারে অথবা একঘণ্টার মধ্যে ঘুম এনে দিতে পারে চোখে। আর বিছানায় তেমনি প্রচ্ছন্ন আরামদায়ক বাতাস, সুগন্ধি ল্যাভেন্ডার, লেসওয়ালা পর্দা, কস্তুরির মতো বিড়াল-বিড়াল উষ্ণ গন্ধ অপেক্ষা করে আছে আপনাকে একীভূত করে দিতে… সবখানেই এই বিষণ্ণ অপেক্ষা। আর আপনি হচ্ছেন এসবের চলন্ত প্রতিমূর্তি। সবকিছুই হচ্ছে আপনার জন্য, আপনার দ্বারা। ঈশ্বর, নিজেরই অর্চনা আর ঘৃণায় এভাবেই কী তাহলে হাসি আর কান্নার করিডোরে নিজেরই মহিমা আর বৈরাগ্যে সবেগে উদ্বেল হয়ে ওঠা?

সাত

চুলে শিশুদের ফুল পরিয়ে দেয়ার মতো ছোট্ট একটা ব্যাপারও ল্যানলিন ক্রিমের মতো আমার আত্মবিশ্বাসের ফাটলটা ঘুঁচিয়ে দিতে পারে। কেমন যেন ভয় হচ্ছিল আর অস্থির লাগছিল আজ। মনটা বিক্ষিপ্ত ছিল, তাই বাইরে সিঁড়িতে এসে বসেছিলাম। পিটার নামে রাস্তার ওপারে যে ছেলেটা থাকে, সেই ছোট্ট ছেলেটি ওর বোন লিবিসহ এলো। মিষ্টি একটা মেয়ে লিবি। কাটা-কাটা চেহারা, ফর্সা মুখ, গভীর নীল চোখ, আর ঠোঁটে মধুর হাসি। শরীরের গড়ন মজবুত। পিটার একটা সাদা অপরাজিতা ফুল তুলে এনে আমার চুলে পরিয়ে দিল। আমি চুপ করে বসে রইলাম। এরপর লিবি বারবার দৌড়ে গিয়ে গাছ থেকে নানান রঙের অপরাজিতা তুলে এনে জড়ো করতে লাগল; এক মজার খেলায় মেতে উঠল সে। আর পিটার আমার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই ফুলগুলো গুছিয়ে নিল। এরপর দুই ভাইবোন মিলে ওদের ছোট্ট কোমল হাতে ফুলগুলো একটার পর একটা আমার কোঁকড়ানো চুলের চারপাশে ধীরে ধীরে লাগিয়ে দিতে থাকল। আমি ওদের ছোট্ট হাতের স্পর্শ গভীরভাবে অনুভব করার জন্য মনোযোগী হলাম; চোখ বন্ধ করলাম যখন, তখন এতটাই আরাম বোধ হচ্ছিল যে সেই আবেশে ভীষণ নম্রস্বরে অস্ফুট কণ্ঠে বলতে থাকলাম, “এবার একটা সাদা ফুল লাগাও। গোলাপি, টকটকে লাল, আরক্তিম, আবার সাদা লাগাও – এইভাবে নানান রঙের বেছে নিয়ে একটার পর একটা লাগাও…।” অপরাজিতার প্রথম তীব্র সেই ঘ্রাণ ক্রমে হালকা হয়ে এলে মিষ্টি আর স্তব্ধ সেই গন্ধ আমার কষ্ট, ব্যথা-বেদনা সব দূর করে দিল। বাচ্চা দুটোর অকপট, অকৃত্রিম নীল চোখ, ওদের নরম শরীর আর নিস্তেজ হয়ে আসা ফুলগুলোর গন্ধ আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল, আমি অনুভব করলাম ছুরি দিয়ে কপ করে কেটে ফেললে যেমনটি হয়, মুহূর্তে আমার মধ্যে আমি সেইভাবে ছিন্ন হলাম। আলতো একটা ব্যথা অনুভব করলেও আমার হৃদয়ে কলকল করে ভালোবাসার রক্ত ছলকে উঠে বইতে শুরু করলো।